• মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
Sunday, September 20, 2026
নবজাগরণ
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
No Result
View All Result

মুঘল আমলের বিচারব্যবস্থা: আইন, আদালত ও ন্যায়বিচার

মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
September 20, 2026
in ভারতবর্ষের ইতিহাস
0
মুঘল আমলের বিচারব্যবস্থা: আইন, আদালত ও ন্যায়বিচার

মুঘল আমলের বিচারব্যবস্থা: আইন, আদালত ও ন্যায়বিচার

Share on FacebookShare on Twitter

ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে মুঘল যুগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। মুঘল শাসকেরা দিল্লি সালতানাতের কাছ থেকে কাজি, মুফতি, সদর, কোটওয়াল, মাজালিম ও স্থানীয় পঞ্চায়েতের মতো বহু প্রতিষ্ঠান উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু বৃহত্তর ভূখণ্ড, বিস্তৃত রাজস্বব্যবস্থা, মনসবদারি কাঠামো এবং বহুধর্মীয় সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সেগুলোকে নতুন রূপও দিয়েছিলেন। তাই মুঘল বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুন সৃষ্টি বলা যায় না, আবার দিল্লি সালতানাতের অপরিবর্তিত অনুলিপি বলাও ভুল। ওয়াহিদ হুসাইন মনে করেন, কিছু পরিবর্তনসহ মুঘল বিচারপ্রথার ছাপ পরবর্তী ভারতীয় ব্যবস্থায়ও রয়ে গেছে। তিনি যদুনাথ সরকারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছেন, মুঘল প্রশাসনিক কাঠামো এক সময় ভারতের প্রায় সব সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে উন্নত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছিল।১  তবে এই প্রভাবকে সরল ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা উচিত নয়; ঔপনিবেশিক আইন, দেশীয় প্রথা ও আধুনিক সংবিধান বিচারব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে।

ওয়াহিদ হুসাইন মুঘল প্রশাসনের কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে এটি ছিল শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম শক্তিশালী সরকার, বিস্তৃত প্রশাসনিক যন্ত্রসহ কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র, শিল্প ও সাহিত্যের নবজাগরণের যুগ এবং এমন একটি সাম্রাজ্য যেখানে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞান দিয়ে শাসনকে সমৃদ্ধ করেছিল।২ এই মূল্যায়নের একটি অংশ গ্রহণযোগ্য। মুঘল শাসনে রাজস্ব জরিপ, মনসবদারি, দাপ্তরিক নথি, প্রাদেশিক প্রশাসন, সড়ক, ডাক এবং শিল্প-সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছিল। কিন্তু সাম্রাজ্য সর্বত্র সমান শান্তি বা অবিচ্ছিন্ন ঐক্য নিশ্চিত করেছিল, এমন দাবি টেকে না। উত্তরাধিকারযুদ্ধ, আঞ্চলিক বিদ্রোহ, অভিজাত গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, কৃষক প্রতিরোধ এবং সীমান্তসংঘাত ছিল নিয়মিত। জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গের সামাজিক বৈষম্যও বিলুপ্ত হয়নি। ফলে মুঘল রাষ্ট্রের শক্তি স্বীকার করেও তার অভ্যন্তরীণ অসাম্য ও সংঘাতকে আড়াল করা যায় না।

মুঘল রাষ্ট্রকে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাও সাম্প্রতিক ইতিহাসচর্চায় সংশোধিত হয়েছে। সম্রাট ছিলেন সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এবং নিয়োগ, পদোন্নতি, রাজস্ব, সামরিক ও বিচারিক ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করতেন। তবু সুবাদার, মনসবদার, জমিদার, স্থানীয় প্রধান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ সমাজের সহযোগিতা ছাড়া শাসন সম্ভব ছিল না। দূরত্ব, যোগাযোগের সীমা এবং প্রাদেশিক শক্তির কারণে কেন্দ্রের আদেশ স্থানীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হতো। মুজাফফর আলম, সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম ও হরবংশ মুখিয়ার মতো ইতিহাসবিদেরা রাষ্ট্রকে নিছক একমুখী কেন্দ্রীয় কাঠামো না দেখে দরবার ও অঞ্চলের চলমান সমঝোতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতার অংশীদারত্বের প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মদদ-ই-মাশ অনুদান, জমিদারি অধিকার ও প্রাদেশিক অভিজাতের উত্থান কেন্দ্রের সীমা প্রকাশ করে। তাই বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সম্রাটের ঘোষিত নীতি এবং স্থানীয় আদালতের বাস্তব আচরণের মধ্যে পার্থক্য ছিল।

মুঘল যুগকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ মিলনের যুগ বলাও অতিরঞ্জিত। তুরানি, ইরানি, আফগান, রাজপুত, দাক্ষিণাত্য এবং ভারতীয় মুসলমান অভিজাতেরা দরবারে অংশ নিতেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে পদ, বেতন, মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল। আকবর রাজপুতদের সাম্রাজ্যিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করেন এবং ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি প্রসারিত করেন; তবু গ্রামীণ সমাজে জাতিভেদ, শ্রমের অসমতা ও নারীর অধস্তনতা বহাল থাকে। ইরফান হাবিব মুঘল কৃষিব্যবস্থার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র ও জমিদারি দাবির সম্মিলিত চাপ কৃষকের উদ্বৃত্তের বড় অংশ শোষণ করত; জাট, সতনামী ও অন্যান্য বিদ্রোহ এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে যুক্ত। অভিজাতেরা সাম্রাজ্যের সেবা করলেও ব্যক্তিগত সম্পদ, জাগির ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। অতএব মুঘল ঐক্য ছিল স্থায়ী সামাজিক সমতা নয়, বরং রাজকীয় কর্তৃত্বের অধীনে বহু শক্তির পরিবর্তনশীল সমন্বয়।

ইবন হাসান মুঘল রাষ্ট্রের বিচারিক আদর্শ ব্যাখ্যা করতে ইসলামী রাজনীতিতত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর মতে মুসলিম শাসকের কর্তব্য ছিল কুরআন ও শরিয়তের আলোকে রাজ্য পরিচালনা করা, মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন রক্ষা করা এবং অমুসলিম প্রজাকে জিম্মি হিসেবে জীবন, সম্পদ ও ধর্মাচরণের সুরক্ষা দেওয়া। এই অবস্থান অমুসলিমকে মুসলমানের সমান রাজনৈতিক মর্যাদা দেয় না, কিন্তু নির্ধারিত শর্তে নিরাপত্তা ও ধর্মচর্চার অধিকার স্বীকার করে।৩ এই তাত্ত্বিক কাঠামো মুঘল বাস্তবতার একটি অংশ ব্যাখ্যা করে, কিন্তু পুরো সাম্রাজ্যকে নিখুঁত ইসলামী রাষ্ট্র বলে প্রমাণ করে না। শাসকের নীতি, দরবারি সংস্কৃতি, রাজস্বস্বার্থ এবং স্থানীয় প্রথা শরিয়তের গ্রন্থগত বিধানকে নিয়ত পরিবর্তিত করেছে।

মুঘল সম্রাটদের শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে “মুসলিম রাজা” বলা বিশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট নয়। শাসকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁর রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজা ছিলেন অমুসলিম, প্রশাসনে বহু হিন্দু ও রাজপুত কর্মকর্তা কাজ করতেন এবং বহু সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো সামরিক, রাজস্ব ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে। একইভাবে “ইসলামী রাষ্ট্র” বা “ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র” শব্দও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। যদুনাথ সরকার, আর. পি. ত্রিপাঠী ও কে. এস. লালের মতো পুরোনো ইতিহাসবিদেরা মুঘল রাষ্ট্রের ইসলামী চরিত্রে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সাম্প্রতিক গবেষকেরা আকবরের সুলহ-ই-কুল, রাজপুত অংশগ্রহণ, দেশীয় রীতি, রাজকীয় ফরমান এবং শাসকদের ব্যক্তিগত আচরণের বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন। মদ্যপান, দরবারি আচার, শিকার, চিত্রকলা কিংবা সম্রাটের নিজস্ব আইন সব সময় রক্ষণশীল শরিয়তি আদর্শের সঙ্গে মেলেনি। ফলে মুঘল রাষ্ট্রে ইসলাম ছিল বৈধতা ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ভাষা, কিন্তু রাষ্ট্রকে কেবল উলামাশাসিত ধর্মতন্ত্র বলা যায় না।

ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় ন্যায়কে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রমকারী রাজকীয় কর্তব্য হিসেবেও দেখা হয়েছে। ইবন হাসান বলবন ও বুগরা খানের নামে প্রচলিত উপদেশ উদ্ধৃত করে বলেছেন, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয়ের জন্য বিচার ও অনুগ্রহ প্রযোজ্য। রাজা আল্লাহর ছায়া, আর ঈশ্বরের দয়া কেবল মুসলমানের জন্য সীমিত নয়। দুর্বলের ওপর অত্যাচারীর হাত থামানো শাসকের দায়িত্ব, কারণ অত্যাচারিতের আর্তি, সে অমুসলিম হলেও, আল্লাহর কাছে অগ্রাহ্য হয় না।৪ এই নৈতিক দাবি রাজনৈতিক ও সামাজিক সমতা নিশ্চিত করেনি, কিন্তু আদালতে অমুসলিমের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষাকে ধর্মীয়ভাবে সমর্থন করার সুযোগ দিয়েছে। বাস্তবে কর, সাক্ষ্য, পদলাভ ও সামাজিক মর্যাদায় বৈষম্য ছিল; তবু ন্যায়ের এই সর্বজনীন ভাষা অত্যাচারের বিরুদ্ধে আবেদনকারীর গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হয়ে উঠতে পারত।

ইউ. এন. ডে ইসলামী বিচারতত্ত্বের প্রচলিত ব্যাখ্যায় তিনটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন: রাজার প্রধান কর্তব্য ন্যায়বিচার পরিচালনা, প্রয়োগযোগ্য আইনের মূল ভিত্তি শরিয়ত এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানদের বিশেষ অবস্থান।৫  তৃতীয় দাবিটি মুঘল ভারতের বহুধর্মীয় বাস্তবতায় পুরোপুরি কার্যকর হতে পারেনি। দেওয়ানি লেনদেন, ভূমি-রাজস্ব, বাজার, অপরাধ ও প্রশাসনিক বিধান সব প্রজার ওপর প্রযোজ্য ছিল। হিন্দুর বিবাহ, উত্তরাধিকার ও ধর্মীয় দানের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে পণ্ডিত ও দেশীয় আইন ব্যবহৃত হতো। গ্রাম পঞ্চায়েত স্থানীয় প্রথায় বিরোধ মেটাত। সুতরাং শরিয়ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিচারিক ক্ষেত্র ছিল আইনি বহুত্বের জগৎ, যেখানে সম্রাটের ফরমান, প্রশাসনিক কানুন, ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন ও প্রথা পাশাপাশি চলত।

মুঘল বিচারসংগঠনের মূল কাঠামো দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বহন করে। সম্রাট ছিলেন ন্যায়ের সর্বোচ্চ উৎস, প্রধান কাজি বিচারিক বিভাগের কেন্দ্রীয় কর্মকর্তা, সদর ধর্মীয় অনুদান ও আইনজ্ঞদের তত্ত্বাবধায়ক, মুফতি আইনের ব্যাখ্যাকারী, মীর আদল বিচারকার্যের সহায়ক এবং কোটওয়াল নগর নিরাপত্তার দায়িত্বশীল। প্রদেশ, সরকার, পরগনা ও শহরে কাজি এবং অন্যান্য কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকতেন। পরিবর্তন ঘটেছিল সাম্রাজ্যের বিস্তার, নথিপত্রের বৃদ্ধি, প্রাদেশিক বিভাগ এবং পৃথক সম্রাটের নীতিতে। আকবর ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, তদন্ত ও সম্রাটের বিবেচনাকে গুরুত্ব দেন; জাহাঙ্গীর ন্যায়ের শৃঙ্খলের প্রতীক ব্যবহার করেন; শাহজাহান দপ্তর ও পদগুলোর সমন্বয় বজায় রাখেন; আওরঙ্গজেব হানাফি ফিকহের বিস্তৃত সংকলন ফতোয়া-ই-আলমগিরি প্রস্তুত করান। তাই প্রতিষ্ঠান একই নাম বহন করলেও তার কার্যকর চরিত্র সময়ের সঙ্গে বদলেছে।

সম্রাট ছিলেন মুঘল বিচারপ্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। মুসলিম আইনজ্ঞদের মধ্যে সম্রাট কাজি ছাড়া নিজে বিচার করতে পারেন কি না, সে বিষয়ে মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে তাঁর ব্যক্তিগত বিচারাধিকারের স্বীকৃতি ছিল। সম্রাট মূল মামলা শুনতে, নিম্ন আদালতের রায় পর্যালোচনা করতে, কর্মকর্তা ও অভিজাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করতে এবং দণ্ড লাঘব বা ক্ষমা করতে পারতেন। কিন্তু শরিয়তের সূক্ষ্ম নিয়ম প্রয়োগে কারিগরি জ্ঞান দরকার; এজন্য যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের মধ্য থেকে প্রধান কাজি নিয়োগ তাঁর দায়িত্ব বলে বিবেচিত হতো। জটিল আইনি প্রশ্নে ফতোয়া দেওয়ার জন্য যোগ্য আলেমের দল দরকার ছিল এবং তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিকে কাজি-উল-কুজাত করা উচিত।৬ বাস্তবে সম্রাটের বিচার ছিল ব্যক্তিগত রাজতন্ত্রের অংশ, তবে আইনি বিশেষজ্ঞ ছাড়া তা নিয়মতান্ত্রিক হতে পারত না।

তত্ত্বে সম্রাট শরিয়তের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তিনি নিজেকে আল্লাহর প্রতিনিধি বা ছায়া হিসেবে উপস্থাপন করলেও ঈশ্বর ও নবীর মাধ্যমে প্রকাশিত আইনের অধীন বলে দাবি করতেন। প্রজার আনুগত্যকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে দেখানো হতো এবং বিদ্রোহকে নৈতিক অপরাধ বলা হতো। কিন্তু বাস্তবে সম্রাটের ক্ষমতার কার্যকর আইনি সীমা দুর্বল ছিল। তিনি ফরমান, নিশান ও প্রশাসনিক বিধান জারি করতেন; নিয়োগ ও পদচ্যুতি করতেন; মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করতেন; রাজস্বনীতি ও সামরিক শৃঙ্খলা নির্ধারণ করতেন। শরিয়তের প্রকাশ্য বিরোধিতা উলামা ও মুসলিম জনমতের অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারত, কিন্তু কোনো স্থায়ী আদালত সম্রাটের ফরমান বাতিল করার ক্ষমতা রাখত না। ফলে রাজকীয় আত্মসংযম, দরবারি পরামর্শ এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধই বাস্তব সীমা। আর. পি. খোসলার ভাষায় মুঘল রাজত্ব ব্যক্তিগত ও ব্যাপক নিয়ন্ত্রণনির্ভর ছিল, যদিও শাসক নিজেকে ধর্মীয় ও নৈতিক বিধানের অধীন বলে প্রকাশ করতেন।৭

মুঘল ভারতে আধুনিক অর্থে একক ও পূর্ণাঙ্গ আইনসংহিতা ছিল না। কাজিরা কুরআন, হাদিস, হানাফি ফিকহের গ্রন্থ, স্বীকৃত ফতোয়া, সম্রাটের ফরমান এবং স্থানীয় প্রথা ব্যবহার করতেন। জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণের পর যে বারোটি নির্দেশ জারি করেন, তা রাজকীয় ন্যায়, কর, সম্পত্তি ও প্রশাসনিক আচরণের নীতিগত ঘোষণা ছিল। আওরঙ্গজেবের উদ্যোগে ফতোয়া-ই-আলমগিরি সংকলিত হয়, যাতে হানাফি আইনের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে বিবাহ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি, লেনদেন, দণ্ড ও অন্যান্য বিষয়ে মত সংগৃহীত হয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় দণ্ডবিধির মতো নতুন আইনসভার কোড নয়; বরং বিচারক ও মুফতির ব্যবহারের জন্য প্রামাণ্য ফিকহি সংকলন। এর লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা মতকে সহজলভ্য করা এবং বিচারিক ব্যাখ্যায় কিছু সামঞ্জস্য আনা। তবু সম্রাটের ফরমান ও প্রশাসনিক প্রয়োজন এর পাশাপাশি বহাল ছিল।

প্রধান কাজি নির্বাচনে সম্রাটের ব্যক্তিগত পরিচয় ও বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রার্থীকে সরাসরি না চিনলে তাঁর জ্ঞান আলেমদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা এবং প্রতিবেশী ও পরিচিতদের কাছ থেকে চরিত্র সম্পর্কে অনুসন্ধান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ কেবল গ্রন্থজ্ঞান যথেষ্ট নয়; বিচারকের ব্যক্তিগত সততা, লোভ থেকে দূরত্ব এবং সামাজিক সুনামও জরুরি।৮ নিয়োগের অধিকার যাঁর, পদচ্যুতির অধিকারও তাঁর, এই নীতিতে সম্রাট কাজিকে অপসারণ করতে পারতেন। কিছু মুসলিম আইনজ্ঞ সীমিত মেয়াদে কাজি নিয়োগের পক্ষে ছিলেন; কারও মতে এক বছর পর নবায়ন করলে বিচারক অধ্যয়ন ও আত্মসমালোচনায় সচেতন থাকবেন। কিন্তু ঘনঘন বদলি বিচারিক ধারাবাহিকতা নষ্ট করতে পারে এবং বিচারককে রাজকীয় অনুগ্রহের ওপর বেশি নির্ভরশীল করে। স্থায়িত্ব ও জবাবদিহির এই টানাপোড়েন মুঘল বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

সম্রাট পৃথক সামরিক কাজি বা কাজি-ই-আসকর নিয়োগ করতে পারতেন। তাঁর এখতিয়ার নির্দিষ্ট সেনাশিবির, অভিযান বা সামরিক এলাকার মধ্যে সীমিত থাকত। সৈনিকের বিবাহ, ঋণ, সম্পত্তি, যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ভাগ, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং বাহিনীর ভেতরের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে এই পদ উপযোগী ছিল। বড় শহরে একাধিক কাজি নিয়োগ করা সম্ভব, কিন্তু তাঁদের ভৌগোলিক বা বিষয়গত দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হতো; অন্যথায় পরস্পরবিরোধী রায় ও এখতিয়ার নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিত।৯ সাম্রাজ্যের বিস্তার এই বিশেষায়নের প্রয়োজন বাড়ায়। তবে একই শহরে বহু বিচারিক কর্মকর্তা থাকার ফলে প্রভাবশালী পক্ষ সুবিধাজনক আদালত বেছে নেওয়া কিংবা এক কর্মকর্তাকে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারত। স্পষ্ট নিয়োগপত্র ও দাপ্তরিক নথি তাই বিচারিক শৃঙ্খলার জন্য জরুরি ছিল।

সম্রাটের আইনের ব্যবহারিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন বলে রাজনৈতিক চিন্তকেরা জোর দিয়েছেন। কারণ তাঁর একটি আদেশ জীবন রক্ষা করতে পারে, আবার অপরিবর্তনীয় মৃত্যুদণ্ডও ঘটাতে পারে। ভুল দণ্ডের পর ক্ষমা চাইলেও প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। সম্রাটের বিচার রাজ্যের সুনাম, প্রজার আনুগত্য এবং কর্মকর্তাদের আচরণে দীর্ঘ প্রভাব ফেলে। এজন্য ত্বরিত ক্রোধ, গুজব বা একপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। কিন্তু মুঘল ব্যক্তিগত রাজতন্ত্রে সম্রাটের সিদ্ধান্তের ওপর স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। তিনি নিজে ভুল সংশোধন করতে বা উত্তরসূরি ফরমান বদলাতে পারতেন, তবু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য নিশ্চিত সাংবিধানিক প্রতিকার ছিল না। এই কারণেই আবুল ফজল বিচারকের তদন্ত, চরিত্রপরীক্ষা, সাক্ষ্যের পুনর্মূল্যায়ন এবং আত্মসংযমের ওপর এত গুরুত্ব দিয়েছেন।

আকবরের ন্যায়চিন্তার প্রধান ব্যাখ্যাকারী আবুল ফজল। আইন-ই-আকবরিতে তিনি বিচারভ্রষ্টতার তিনটি উৎস উল্লেখ করেছেন: বিচারবুদ্ধির অক্ষমতা, বন্ধুর ছদ্মবেশে শত্রুর প্রভাব এবং ব্যক্তিস্বার্থে পরিচালিত বন্ধুর দ্বিচারিতা।১০ এই বিশ্লেষণে বিচারকের জ্ঞানগত সীমা ও দরবারি রাজনীতির বিপদ একসঙ্গে ধরা পড়ে। ভুল সিদ্ধান্ত সব সময় ইচ্ছাকৃত অন্যায় থেকে আসে না; অজ্ঞতা, অসম্পূর্ণ তথ্য ও বিশ্বস্ত বলে মনে হওয়া উপদেষ্টার স্বার্থও রায়কে বিকৃত করতে পারে। তাই সম্রাটের চারপাশে এমন পরামর্শব্যবস্থা দরকার, যেখানে তথ্য যাচাই হয় এবং ভিন্নমত বলার সুযোগ থাকে। আবুল ফজলের আদর্শ রাজা নিজের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও বিচার করতে প্রস্তুত এবং পুত্র, আত্মীয় বা প্রিয়জনকে বিশেষ অব্যাহতি দেন না।১১

আকবরের নামে সংরক্ষিত উক্তিতে প্রাণদণ্ডের অধিকার সম্পর্কে গভীর সতর্কতা দেখা যায়। যে জীবন দিতে পারে না, তার জীবন নেওয়ার ক্ষমতা ব্যবহারে সর্বোচ্চ সংযম দরকার; ন্যায়বিচারের নির্দেশে দণ্ড দিলে শাসক ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহির কথা স্মরণ করবেন।১২ উত্তরাধিকার নিয়েও তিনি যান্ত্রিক নিয়মের ন্যায্যতা প্রশ্ন করেছেন, বিশেষত কন্যা জীবিত থাকা অবস্থায় ভ্রাতুষ্পুত্রকে সম্পত্তি দেওয়ার রীতি কতটা সমতাসঙ্গত, তা বিবেচনা করেছেন। এই উক্তিগুলো আকবরকে আধুনিক সমতার প্রবক্তা প্রমাণ করে না; মুঘল সমাজ পুরুষতান্ত্রিকই ছিল। তবু প্রচলিত বিধানকে ন্যায় ও যুক্তির আলোকে পরীক্ষা করার প্রবণতা স্পষ্ট। তাঁর কাছে সম্রাটের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ সীমাহীন দণ্ড নয়, বরং আত্মীয়ের বিরুদ্ধেও ন্যায্য সিদ্ধান্ত এবং অপরিবর্তনীয় শাস্তিতে সংযম।

আবুল ফজলের রাজনৈতিক দর্শনে রাজা জনকল্যাণের প্রধান কারণ। শাসকের আচরণের ওপর প্রশাসনিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করে; ঈশ্বরের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় ন্যায়শাসন ও যোগ্যতার স্বীকৃতিতে, আর প্রজার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় আনুগত্য ও প্রশংসায়।১৪ রাজাকে “ঈশ্বরের ছায়া” বলা দরবারি মহিমার ভাষা হলেও আবুল ফজল এটিকে নিরাপত্তা ও শান্তির নৈতিক দায়ের সঙ্গে যুক্ত করেন। রাজদর্শনকে তিনি ধর্মীয় স্মরণ ও সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। আধুনিক দৃষ্টিতে এই রাজকীয় পবিত্রতা রাজনৈতিক সমালোচনাকে সীমিত করতে পারে। কিন্তু সমকালীন আদর্শে শাসকের বিশেষ মর্যাদা মানে তাঁর ওপর বিশেষ দায়ও বর্তায়। প্রজার জীবন, সম্পদ, সম্মান ও ধর্ম রক্ষা না করলে রাজমহিমার দাবি অর্থহীন।

আকবর আশা ও ভয়ের ভারসাম্যকে শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করেন। কেবল ভয়নির্ভর রাষ্ট্র বিদ্বেষ ও গোপন প্রতিরোধ সৃষ্টি করে; কেবল পুরস্কার ও কোমলতা অপরাধীকে সুযোগ দিতে পারে। শাসক নিজের ইচ্ছাকে আবেগের হাতে সমর্পণ করবেন না, প্রতিটি ক্ষেত্রে সময়, মাত্রা ও পরিণাম বিবেচনা করবেন। অত্যাচার সবার জন্য বেআইনি, কিন্তু বিশ্বের রক্ষক হিসেবে রাজার ক্ষেত্রে তা আরও গুরুতর অপরাধ।১৪ রাজাধিরাজের উপাসনা ন্যায় ও সুশাসনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, এই বক্তব্য ধর্মীয় আচারের চেয়ে জনকল্যাণকে রাজকীয় ধার্মিকতার মাপকাঠি করে। এখানে আকবরের ন্যায়চিন্তা শরিয়তের কঠোর প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; প্রশাসনিক ফল, মানবিক নিরাপত্তা এবং বিবেকের সংযমও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আবুল ফজল শাসককে কয়েকটি ব্যক্তিগত আসক্তি থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিয়েছেন: অতিরিক্ত শিকার, অবিরাম খেলাধুলা, দিনরাত মদ্যপান এবং নারীর সঙ্গেই অধিকাংশ সময় কাটানো। এসব আচরণ নিজে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; শাসককে রাষ্ট্রকার্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং চাটুকার কর্মকর্তাকে সুযোগ দেয়।১৫ মিথ্যা সাধারণ মানুষের জন্য অনুচিত, রাজাধিরাজের জন্য আরও অমর্যাদাকর; ঈশ্বরের ছায়া বাঁকা হলে প্রজার কাছে ন্যায়ের আস্থা থাকে না। রাজা হাসি-তামাশায় দরবারিদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হবেন না, যাতে বিচার ও নিয়োগে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কর্তব্যকে অতিক্রম না করে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে অনুশীলনে রাখা, প্রতিবেশী শক্তির প্রতি সতর্ক থাকা এবং প্রজার জীবন, সম্পদ, সম্মান ও ধর্মের নিরাপত্তায় পৃথক মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এই রাজকীয় আদর্শের পাশাপাশি আকবরের বাস্তব প্রশাসন সুলহ-ই-কুল বা সর্বজনীন শান্তির ধারণার সঙ্গে যুক্ত। এর অর্থ সব ধর্মের মতবাদ সমান ঘোষণা নয়; বরং রাজশক্তিকে কোনো এক ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংকীর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা। রাজপুত জোট, জিজিয়া বিলোপ, ধর্মীয় বিতর্ক, অনুবাদ প্রকল্প এবং হিন্দু কর্মকর্তার বিস্তৃত অংশগ্রহণ এই নীতির দিক। বিচারক্ষেত্রে এর তাৎপর্য ছিল অমুসলিম ব্যক্তিগত আইন ও পণ্ডিতের ভূমিকার স্বীকৃতি এবং সম্রাটের ন্যায়কে সম্প্রদায়গত সীমার ঊর্ধ্বে উপস্থাপন। তবু স্থানীয় আদালতে বৈষম্য, সামাজিক জাতিভেদ ও পিতৃতান্ত্রিক রীতি বহাল ছিল। সুলহ-ই-কুল একটি সাম্রাজ্যিক রাজনৈতিক আদর্শ, সর্বস্তরে সমান নাগরিক অধিকারের আধুনিক নীতি নয়।

সম্রাট একা বিশাল সাম্রাজ্যের বিচার পরিচালনা করতে পারেন না। আবুল ফজল লিখেছেন, সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ও অভিযোগের চূড়ান্ত প্রতিকার রাজাধিরাজের হাতে থাকলেও একজন মানুষের ক্ষমতা সমগ্র প্রশাসন তদারকের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই তাঁকে বিচক্ষণ, নিরপেক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিকে বিচারিক প্রতিনিধি করতে হবে। সেই প্রতিনিধি কেবল সাক্ষ্য ও শপথে সন্তুষ্ট হবেন না; মামলার দুই পক্ষ ঘটনা জানে, বিচারক প্রথমে জানেন না, তাই অনুসন্ধান তাঁর প্রধান কর্তব্য। মানবলোভ ও অসততার কারণে সাক্ষী বা শপথকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক। বিচারক পক্ষগুলোর চরিত্র, ঘটনার পরিবেশ এবং প্রমাণের সামঞ্জস্য যাচাই করবেন; অত্যাচারিত ও অত্যাচারীকে পৃথক করে নির্ভয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।১৬

আবুল ফজলের বর্ণিত বিচারপদ্ধতিতে ধৈর্য ও পুনঃতদন্তের ওপর বিশেষ জোর আছে। বিচারক প্রথমে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, মামলার পরিস্থিতি জানবেন এবং প্রত্যেক সাক্ষীর বক্তব্য আলাদাভাবে লিখিয়ে নেবেন। এরপর কিছু সময় অন্য কাজ করে মনকে প্রথম ধারণার প্রভাব থেকে সরিয়ে আবার মামলাটি পরীক্ষা করবেন। নতুন করে প্রশ্ন করলে সাক্ষ্যের অসামঞ্জস্য ধরা পড়তে পারে এবং তাড়াহুড়োর ভুল কমে। বিচারিক অনুসন্ধানের বুদ্ধি ও রায় কার্যকর করার শক্তি যদি একই ব্যক্তির মধ্যে না থাকে, তবে দুই কর্মকর্তা নিয়োগ করা উচিত: কাজি তদন্ত ও আইনি বিশ্লেষণ করবেন, মীর আদল সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন বা বিচারিক সহায়তা করবেন।১৭ এই বর্ণনা আধুনিক তদন্ত ও বিচার বিভাগের পূর্ণ পৃথকীকরণ নয়, কিন্তু প্রমাণ যাচাই এবং দায়িত্ব ভাগের একটি উল্লেখযোগ্য ধারণা।

কাজি শব্দটি আরবি কাদা মূল থেকে এসেছে, যার অর্থ নিষ্পত্তি করা, মীমাংসা করা বা সিদ্ধান্ত দেওয়া। ইসলামী আইনি ঐতিহ্যে কাজি হলেন এমন বিচারক, যিনি বিরোধী পক্ষের আনা মামলায় বাধ্যতামূলক রায় দেন।১৮ বিচারকার্যকে শাসকের দায়ের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হতো। সুন্নি রাজনৈতিক তত্ত্বে বৈধ শাসক বিচারক নিয়োগ করেন; শিয়া মতের প্রাচীন ব্যাখ্যায় বৈধ ইমাম বা তাঁর অনুমোদিত প্রতিনিধি এই কর্তৃত্বের উৎস। মুঘল ভারতে সম্রাটের নিয়োগপত্র কাজির প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার প্রধান ভিত্তি। তবে কাজির মর্যাদা কেবল রাজকীয় সনদে নয়; তাঁর ফিকহজ্ঞান, নৈতিক জীবন এবং সামাজিক স্বীকৃতির ওপরও নির্ভর করত।

কাজি নিয়োগের প্রচলিত যোগ্যতার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কতা, স্বাধীন অবস্থা, সুস্থ বুদ্ধি, নির্ভরযোগ্য চরিত্র, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা এবং ইসলামী আইনের জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত ছিল। হানাফি আইনের কিছু ব্যাখ্যায় নারী নির্দিষ্ট দেওয়ানি ক্ষেত্রে কাজি হতে পারেন, কিন্তু মুঘল প্রশাসনে নারীর বিচারিক ভূমিকা প্রধানত হারেমের অভ্যন্তরে সীমিত ছিল বলে ইউ. এন. ডে উল্লেখ করেন। সাধারণ রাজকীয় আদালতের কাজি মুসলমান পুরুষ হতেন এবং ব্যক্তিগত জীবনেও শরিয়তনিষ্ঠ ও সাক্ষ্য দেওয়ার যোগ্য চরিত্রের অধিকারী হওয়া প্রত্যাশিত ছিল।১৯ এসব যোগ্যতার মধ্যে নৈতিক সততার যুক্তি বোধগম্য, কিন্তু লিঙ্গ ও ধর্মের সীমাবদ্ধতা আধুনিক সমতার পরিপন্থী। অমুসলিমের আইন ব্যাখ্যায় পণ্ডিত অংশ নিলেও কাজির পদ তাঁর জন্য উন্মুক্ত ছিল না।

তত্ত্বে কাজির বিচারিক ক্ষমতায় সম্রাটের সরাসরি হস্তক্ষেপ বৈধ ছিল না। কোনো মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ করা, সম্রাটের সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুনানি স্থগিত রাখা কিংবা আইনসঙ্গত রায়ের পর অকারণে মামলা পুনরায় খোলার নির্দেশ কাজির জন্য বাধ্যতামূলক নয় বলে আইনজ্ঞেরা মত দিয়েছেন। এই আদর্শ বিচারিক স্বাধীনতার প্রাথমিক স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তবে কাজির নিয়োগ, পদোন্নতি ও অপসারণ সম্রাটের হাতে ছিল। আওরঙ্গজেবের সময় আবদুল ওয়াহাবকে প্রধান কাজি করার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মতের সম্পর্কের কথা ইউ. এন. ডে উল্লেখ করেছেন: তিনি শাহজাহানের শারীরিক অক্ষমতার যুক্তিতে আওরঙ্গজেবের সিংহাসন দখলকে শরিয়তসম্মত বলেছিলেন।২০ ঘটনাটি দেখায়, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বিচারকের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারত। তত্ত্ব ও বাস্তবতার ব্যবধান মুঘল বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সমস্যা।

নতুন কাজি দায়িত্ব নেওয়ার সময় পূর্বসূরির নথি, সম্পত্তি, বিবাহ, উত্তরাধিকার, এতিম, ওয়াক্‌ফ ও অন্যান্য বিষয়ের আলাদা ফাইল গ্রহণ করতেন। বন্দিদের অবস্থা এবং কোন আইনি দাবিতে তাঁদের আটক রাখা হয়েছে, তা পুনরায় পরীক্ষা করার দায়ও তাঁর ছিল। কেবল পূর্বসূরির আদেশ বহাল রাখা নয়, প্রয়োজনে মামলার বৈধতা নতুন করে যাচাই করতে হতো। এই নির্দেশ নথির ধারাবাহিকতা ও বেআইনি আটক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। কাজি মসজিদ বা নিজের বাড়িতে আদালত বসাতে পারতেন। আত্মীয় ছাড়া অন্য কারও উপহার বা ভোজ গ্রহণ না করা, দুই পক্ষের সঙ্গে সমান সৌজন্য দেখানো, একজনের দিকে বেশি হাসি বা সম্মান না দেখানো এবং সাক্ষীকে উত্তর শিখিয়ে না দেওয়া তাঁর আচরণবিধির অংশ। আদালতে যাওয়ার আগে নিজেকে শান্ত ও পক্ষপাতমুক্ত রাখাও প্রত্যাশিত ছিল।

কাজির দায়িত্ব মামলা শুনে রায় দেওয়ার চেয়ে বিস্তৃত। তিনি রায় কার্যকর করতেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক, মানসিকভাবে অক্ষম বা নিজ সম্পত্তি পরিচালনায় অক্ষম ব্যক্তির অভিভাবক নিয়োগ করতেন, ওয়াক্‌ফের সম্পদ তদারক করতেন, উইল বাস্তবায়ন এবং বিধবার পুনর্বিবাহের আইনি ব্যবস্থা দেখতেন। ধর্মীয় আইনে নির্ধারিত দণ্ড প্রয়োগেও তাঁর ভূমিকা ছিল। রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে অননুমোদিত ছাউনি বা ভবন নির্মাণ রোধ, নোটারি বা শাহুদ, লেখক এবং অধস্তন বিচারিক কর্মচারীর তদারকি ও নিয়োগ তাঁর কাজের মধ্যে পড়ত। সদকা সংগ্রহের আলাদা কর্মকর্তা না থাকলে সেই দায়ও কাজির ওপর আসতে পারত। এই বিস্তৃত কাজ দেখায় যে মুঘল কাজি একই সঙ্গে বিচারক, অভিভাবকত্ব আদালত, ওয়াক্‌ফ তদারককারী, পৌর নিয়ন্ত্রক এবং কখনো দাতব্য প্রশাসক ছিলেন। অতিরিক্ত দায় তাঁর প্রভাব বাড়ালেও নিয়মিত মামলার জন্য সময় কমিয়ে দিতে পারত।

মুফতি ছিলেন আইনের বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যাকারী। তাঁকে সব সময় নিয়মিত বেতনভুক্ত সরকারি কর্মকর্তা বলা যায় না; বহু মুফতি সামাজিক স্বীকৃতির ভিত্তিতে ধর্মীয় আইনজ্ঞ হিসেবে ফতোয়া দিতেন। কোনো মামলায় কাজির কাছে প্রযোজ্য আইন অস্পষ্ট হলে তিনি মুফতির মত চাইতেন। মুফতি পূর্ববর্তী ফিকহি নজির খুঁজে লিখিত মত বা ফতোয়া দিতেন, কিন্তু নিজে চূড়ান্ত রায় ঘোষণার অধিকারী ছিলেন না। বশীর আহমদ রাজকীয় সনদের উদাহরণ থেকে দেখিয়েছেন, কোনো কোনো মুফতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পেতেন এবং কখনো পরগনার মুহতাসিবের অতিরিক্ত দায়ও পালন করতেন। তাঁর কাজ ছিল আইন ব্যাখ্যা ও প্রামাণ্য নজির কাজির সামনে উপস্থাপন করা। কাজি মতটি সহজে উপেক্ষা করতেন না; গুরুতর মতভেদে উচ্চতর আদালতে প্রশ্ন পাঠানো যেতে পারত। এভাবে মুফতি বিচারকের আইনগত স্মৃতি ও গবেষণা সহায়ক হিসেবে কাজ করতেন।

মীর আদল ভারতীয় মুসলিম বিচারপ্রশাসনের একটি বিশেষ পদ, যার ঠিক একই রূপ প্রাথমিক খিলাফতি কাঠামোতে পাওয়া যায় না। সিকান্দার লোদির আমলে দাদবেকের মর্যাদা বাড়িয়ে সাধারণ আইনের মামলা পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া এবং মীর আদল উপাধির ব্যবহারের কথা জানা যায়। শের শাহের আমলেও কাজি ও মীর আদলকে আদালতে দেখা যায়। মুঘল যুগে আবুল ফজল কাজিকে অনুসন্ধানকারী এবং মীর আদলকে তাঁর সিদ্ধান্ত কার্যকরকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।২১ বেণী প্রসাদের মতে ছোট শহরেও কাজি ও মীর আদল নিয়ে বিচারিক বেঞ্চ থাকতে পারত; কাজি তদন্ত করতেন এবং মীর আদল দণ্ড ঘোষণা বা কার্যকর করতেন।২২ কোনো কোনো সময় দুটি পদ একই ব্যক্তি ধারণ করেছেন। শাহজাহানের আমলে এই সংযুক্তি সাধারণ হয়ে উঠেছিল বলে বি. পি. সাকসেনা মত দিয়েছেন।

মীর আদলের সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতভেদ আছে। বশীর আহমদের মতে তিনি স্বাধীন বিচারক ছিলেন না; মুফতির মতোই সহায়ক, তবে তাঁর কাজ আইনি মত দেওয়ার বদলে ঘটনার অনুসন্ধান ও রায় বাস্তবায়নের তদারকি। কাজি কোনো মামলা তাঁর কাছে তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠাতে পারতেন এবং রায়ের পর কার্যকর পদক্ষেপে তিনি উচ্চতর আদালতকর্মী বা প্রধান কেরানির মতো কাজ করতেন। অন্য ব্যাখ্যায় তিনি কাজির সঙ্গে যৌথ বেঞ্চে দণ্ড ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। অঞ্চলভেদেও পদটির উপস্থিতি সমান ছিল না; বাংলা ও গুজরাটের বিচারিক কাঠামোয় মীর আদলের নিয়মিত অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ দুর্বল। সম্ভবত সময়, প্রদেশ এবং ব্যক্তির মর্যাদা অনুযায়ী পদটির কাজ বদলেছে। মুঘল প্রশাসনের সব পদকে একটিমাত্র স্থির সাংগঠনিক ছকে বসানোর বিপদ এখানেই। একই উপাধি ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ক্ষমতা বহন করতে পারে।

মুঘল বিচারব্যবস্থার মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠান ও বাস্তব প্রবেশাধিকারের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। সম্রাট সর্বোচ্চ বিচারক, কাজি আইনজ্ঞ, মুফতি ব্যাখ্যাকারী এবং মীর আদল বাস্তবায়নের সহায়ক হলেও সাধারণ কৃষক বা নারী কত সহজে আদালতে পৌঁছাতেন, তা সামাজিক অবস্থান, দূরত্ব, ব্যয় ও পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভর করত। ফারসি ছিল দাপ্তরিক ভাষা; স্থানীয় ভাষাভাষী বিচারপ্রার্থীকে লেখক বা মধ্যস্থের সাহায্য নিতে হতো। সাক্ষীর মর্যাদা, ধর্ম ও লিঙ্গ রায়কে প্রভাবিত করতে পারত। গ্রাম পঞ্চায়েত, জাতিপরিষদ ও জমিদারের আদালত বহু বিরোধ স্থানীয়ভাবে মেটাত। সাম্রাজ্যিক আদালতের আদর্শ ন্যায়ের উচ্চ ভাষা দিয়েছে, কিন্তু বাস্তব ন্যায় সব অঞ্চলে সমান ছিল না। এই ব্যবধান স্বীকার না করলে মুঘল বিচারব্যবস্থার শক্তি ও সীমা কোনোটিই সঠিকভাবে বোঝা যায় না।

সব মিলিয়ে মুঘল ভারতের বিচারব্যবস্থা ছিল রাজকীয় কর্তৃত্ব, ইসলামী আইন, প্রশাসনিক ফরমান, দেশীয় প্রথা এবং স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত বহুমাত্রিক কাঠামো। সম্রাট বিচার ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ উৎস হলেও কারিগরি আইনের জন্য কাজি ও মুফতির ওপর নির্ভর করতেন। আকবরের ন্যায়চিন্তা তদন্ত, আত্মসংযম, ধর্মীয় সহনশীলতা ও জনকল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েছে; আওরঙ্গজেব ফতোয়া-ই-আলমগিরির মাধ্যমে হানাফি আইনের প্রামাণ্য মতগুলো সংগঠিত করতে চেয়েছেন। কাজির বিস্তৃত দায়িত্ব, মুফতির ব্যাখ্যামূলক ভূমিকা এবং মীর আদলের পরিবর্তনশীল কাজ বিচারিক বিশেষায়নের পরিচয় দেয়। একই সঙ্গে নিয়োগে সম্রাটের নিয়ন্ত্রণ, ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক সীমা, অসম প্রবেশাধিকার এবং স্বাধীন আপিল কাঠামোর দুর্বলতা ব্যবস্থাটির সীমাবদ্ধতা। মুঘল বিচারপ্রথার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এই দ্বৈততার মধ্যেই: এটি বৃহৎ সাম্রাজ্যে ন্যায় পরিচালনার সুসংগঠিত প্রচেষ্টা, কিন্তু আধুনিক আইনের শাসন ও সমান নাগরিকত্বের পূর্ণ রূপ নয়।

জাহাঙ্গীরের শাসনও রাজকীয় ন্যায়ের প্রতীকী উপস্থাপনের জন্য উল্লেখযোগ্য। তাঁর স্মৃতিকথায় দুর্গের কাছে ন্যায়ের শৃঙ্খল স্থাপনের কথা আছে, যাতে সাধারণ অভিযোগকারী মধ্যবর্তী কর্মকর্তা এড়িয়ে সরাসরি সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। এই শৃঙ্খল প্রতিদিন কতজন ব্যবহার করতেন বা অভিযোগের ফল কী হতো, সে বিষয়ে প্রমাণ সীমিত; তবু প্রতীকটির রাজনৈতিক অর্থ গভীর। সম্রাট জানাতে চেয়েছেন যে তাঁর কাছে পৌঁছানোর দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ নয় এবং কর্মকর্তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজকীয় দরবার শেষ আশ্রয়। একই সঙ্গে জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কঠোরতা, আবেগ ও দরবারি স্বার্থের প্রভাবও দেখা যায়। ন্যায়ের প্রতীক তাই নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের বিকল্প ছিল না। শাহজাহানের আমলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দাপ্তরিক রূপ আরও সুসংহত হলেও তাঁর পুত্রদের উত্তরাধিকারযুদ্ধ দেখায়, রাজপরিবার নিজেই স্থির উত্তরাধিকার আইনের অধীন ছিল না। সিংহাসনের প্রশ্নে সামরিক সাফল্য ও রাজনৈতিক জোট প্রায়ই ঘোষিত নৈতিক বিধানকে অতিক্রম করেছে।

মুঘল বিচারপ্রথার উত্তরাধিকার ঔপনিবেশিক যুগে নতুন অর্থ পায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলিম বিধান বজায় রাখার দাবি করে পণ্ডিত ও মৌলভিদের সহায়তা নেয়। ফতোয়া-ই-আলমগিরি ও হিদায়ার মতো গ্রন্থ অনুবাদ করে অ্যাংলো-মুহাম্মদান আইন নির্মিত হয়। কিন্তু ইংরেজ বিচারক ফিকহের নমনীয় মত, স্থানীয় রীতি ও কাজির সামাজিক ভূমিকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে লিখিত গ্রন্থকে কোডের মতো ব্যবহার করেন। ফলে মুঘল যুগের বহুমাত্রিক বিচারচর্চা ঔপনিবেশিক আদালতে অনেক বেশি কঠোর ও পাঠনির্ভর রূপ পায়। পরবর্তী ভারতীয় ব্যক্তিগত আইনে এই প্রক্রিয়ার ছাপ রয়ে গেছে, কিন্তু বর্তমান আদালত, প্রমাণ আইন, ফৌজদারি বিধি ও সাংবিধানিক অধিকারের কাঠামো মূলত ঔপনিবেশিক ও স্বাধীনোত্তর পুনর্গঠনের ফল। তাই বর্তমান বিচারব্যবস্থার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি মুঘল উৎসের বলে দাবি না করে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা, ঔপনিবেশিক রূপান্তর এবং আধুনিক সাংবিধানিক পরিবর্তনকে আলাদা করে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

এই পরিপ্রেক্ষিতে মুঘল বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে স্থায়ী শিক্ষা সম্ভবত কোনো বিশেষ দণ্ডবিধি নয়, বরং বিচারকে শাসকের নৈতিক কর্তব্য এবং প্রশাসনের স্বতন্ত্র দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। প্রমাণ যাচাই, নথি সংরক্ষণ, বিচারকের চরিত্র পরীক্ষা, পক্ষদের সমান ব্যবহার, বেআইনি আটক পুনর্বিবেচনা এবং সরকারি কর্মকর্তাকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানোর যে দাবি বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়, তা প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়ের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। এই নীতিগুলোর প্রয়োগ অসম্পূর্ণ ছিল এবং রাজকীয় ক্ষমতার সীমা দুর্বল ছিল, তবু বৃহৎ বহুধর্মীয় সাম্রাজ্যে ন্যায় পরিচালনার সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক চিন্তার পরিচয় এতে স্পষ্ট।

মুঘল ভারতের বিচারব্যবস্থাকে কেবল শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি আদালত ও কাজির সমষ্টি বলে ব্যাখ্যা করলে তার প্রকৃত চরিত্র ধরা পড়ে না। এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল ইসলামি আইনচিন্তা, তুর্কি ও পারসিক প্রশাসনিক ঐতিহ্য, সম্রাটের ফরমান, রাজস্বসংক্রান্ত রীতিনীতি, স্থানীয় প্রথা এবং গ্রামসমাজের স্বশাসিত বিচারপদ্ধতির পারস্পরিক সমন্বয়ে। ফলে একই সাম্রাজ্যে একদিকে কাজি শরিয়তের বিধান ব্যাখ্যা করতেন, অন্যদিকে ফৌজদার শান্তিশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেখতেন, আমিল রাজস্ববিরোধের নিষ্পত্তি করতেন, কোটওয়াল শহরের নিরাপত্তা ও বাজারশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন, আর গ্রামপঞ্চায়েত স্থানীয় সমাজের বিবাদ মেটাত। এই বহুমাত্রিক কাঠামোর মধ্যেই মুহতাসিব, মুফতি, মীর আদল, দারোগা ই আদালত ও উকিলের মতো পদগুলোর তাৎপর্য বুঝতে হয়। বিচার বিভাগ তখন আধুনিক অর্থে শাসন বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র ছিল না; বরং শাসন, পুলিশ, রাজস্ব এবং বিচার বহু স্থানে একই প্রশাসনিক বৃত্তের মধ্যে কাজ করত। তবু এখতিয়ারের কিছু কার্যকর বিভাজন ছিল এবং নিম্ন আদালত থেকে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আদালতে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগও একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। ইউ. এন. ডে মুঘল আদালতের এই স্তরবিন্যাসকে গ্রাম, পরগনা, সরকার, সুবা ও রাজধানীর প্রশাসনিক বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন; তাঁর বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে অঞ্চল ও সময়ভেদে নিয়মের প্রয়োগে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল।২৩

মুহতাসিবের পদটি বোঝার জন্য হিসবা ধারণার দিকে তাকাতে হয়। ইসলামি নৈতিক ও প্রশাসনিক চিন্তায় হিসবা বলতে জনপরিসরে সৎ কাজের উৎসাহ, অসৎ কাজের প্রতিরোধ, বাজারে সততা এবং নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব বোঝানো হতো। কোনো কোনো পুরোনো বিবরণে আব্বাসীয় খলিফা আল মাহদীর শাসনকাল, ৭৭৫ থেকে ৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ, এই পদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির উৎপত্তিকে কেবল একজন খলিফার এককালীন সৃষ্টি বলা যথার্থ নয়। বাজার তদারককারী সাহিব আল সুক এবং জননৈতিকতা পর্যবেক্ষণের নানা রূপ তার আগেও ছিল; আব্বাসীয় যুগে সেগুলো ধীরে ধীরে অধিক সুসংগঠিত হয়। আল মাওয়ার্দির আল আহকাম আল সুলতানিয়ায় মুহতাসিবের যে আদর্শ দায়িত্ব বর্ণিত হয়েছে, তা মূলত এক নৈতিক নগর প্রশাসকের চিত্র। তিনি জনপথের প্রতিবন্ধকতা ও বেআইনি দখল সরাবেন, অন্যের জমিতে অনধিকার কবর দেওয়া ঠেকাবেন, কর্মচারী ও পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধ করবেন, ওজন ও পরিমাপ পরীক্ষা করবেন, খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করবেন এবং প্রকাশ্য অসদাচরণে হস্তক্ষেপ করবেন। এই কর্তৃত্ব ব্যক্তির গোপন জীবনে গুপ্তচরবৃত্তির সীমাহীন অনুমতি ছিল না। অভিযোগযোগ্য কাজটি সাধারণত প্রকাশ্য, প্রত্যক্ষ এবং সন্দেহাতীত হতে হতো। যেখানে সাক্ষ্য যাচাই, শপথ গ্রহণ কিংবা পরস্পরবিরোধী দাবি বিচার করার প্রয়োজন হতো, সেখানে বিষয়টি কাজির আদালতে পাঠানোই ছিল নিয়ম।

মুঘল প্রশাসনে মুহতাসিব রাজধানী, সুবা এবং অনেক ক্ষেত্রে অধস্তন প্রশাসনিক কেন্দ্রে নিযুক্ত হতেন। বাজারে পণ্যের গুণমান, ওজন ও পরিমাপ, জনপথের ব্যবহার, প্রকাশ্য মদ্যপান, জুয়া, অশোভন আচরণ কিংবা নগরজীবনের দৃশ্যমান বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে তিনি অনুসন্ধান করতে পারতেন। রমজানে প্রকাশ্যে আহার, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গোলযোগ, ধর্মীয় স্থানে প্রকাশ্য অনিয়ম এবং কোনো কোনো সময় সামাজিক বিধি লঙ্ঘনও তাঁর নজরে আসত। তবে আল মাওয়ার্দির তাত্ত্বিক তালিকার সব দায়িত্ব মুঘল ভারতের প্রত্যেক অঞ্চলে একইভাবে কার্যকর ছিল, এমন ধারণার ভিত্তি নেই। বাস্তবে কোটওয়াল, কাজি এবং মুহতাসিবের দায়িত্ব প্রায়ই পরস্পরকে ছুঁয়ে যেত। বাজার তদারকি কখনো কোটওয়ালের হাতে বেশি সক্রিয় ছিল, আবার শরিয়তসংক্রান্ত প্রকাশ্য অভিযোগে মুহতাসিব প্রসিকিউটরের ভূমিকা নিতেন। তিনি অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা, ঘটনার প্রতিবেদন প্রস্তুত করা এবং সরকারের পক্ষে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারতেন, কিন্তু জটিল সাক্ষ্যপ্রমাণের বিচার করে চূড়ান্ত রায় দেওয়া তাঁর স্বাভাবিক ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাই তাঁকে আধুনিক পুলিশপ্রধান, সরকারি কৌঁসুলি বা নৈতিকতা পরিদর্শক, কোনো একটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না; তাঁর পদে এই তিন ধরনের কাজের সীমিত সমাবেশ ঘটেছিল।

আওরঙ্গজেবের আমলে মুহতাসিবের পদ নতুন গুরুত্ব পায়। সম্রাট জনজীবনে শরিয়তসম্মত আচরণ জোরদার করতে চেয়েছিলেন এবং ধর্মত্যাগ, ধর্মনিন্দা, বিধর্মিতা ও প্রকাশ্য অনাচারের খবর প্রশাসনের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্বও কোনো কোনো মুহতাসিবকে দেওয়া হয়। এর ফলে পদটির নৈতিক তদারকি ও অভিযোগ পরিচালনার দিকটি প্রবল হয়েছিল। কিন্তু শাহী আদেশ জারি হওয়া আর বিশাল সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার সমরূপ প্রয়োগ এক বিষয় ছিল না। স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক, কর্মকর্তার সক্রিয়তা, জনসমাজের রীতি এবং প্রাদেশিক রাজনীতির কারণে বাস্তব প্রয়োগে তারতম্য ঘটত। আওরঙ্গজেবের আমলকে তাই একটি সর্বব্যাপী ও নিখুঁত ধর্মীয় পুলিশব্যবস্থার যুগ হিসেবে দেখানো অতিরঞ্জিত। একইভাবে মুহতাসিবের পদকে নিছক নিপীড়নের যন্ত্র বললেও বাজারে প্রতারণা রোধ, পরিমাপ ঠিক রাখা, জনপথ রক্ষা এবং দুর্বল মানুষ ও প্রাণীর প্রতি প্রকাশ্য নির্যাতন ঠেকানোর নাগরিক কাজগুলো আড়ালে পড়ে যায়। পদটির মধ্যে নৈতিক অনুশাসন ও জনকল্যাণ, ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ ও নগর প্রশাসন, এই দুই প্রবণতাই পাশাপাশি ছিল।

মুঘল বিচারব্যবস্থায় পক্ষসমর্থনের জন্য উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগের প্রচলনও ছিল। অতীতে কোনো কোনো লেখক দাবি করেছিলেন যে মুঘল আদালতে আধুনিক অর্থে আইনজীবী শ্রেণি না থাকায় পক্ষগুলোকে নিজ নিজ বক্তব্য সরাসরি পেশ করতে হতো। এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও সম্পূর্ণ নয়। আজকের মতো পেশাগত সনদ, বার কাউন্সিল, নির্দিষ্ট আচরণবিধি ও স্বাধীন আইনজীবী সমিতি তখন ছিল না; কিন্তু আইনজ্ঞ প্রতিনিধি বা উকিল যে আদালতে পক্ষের হয়ে বক্তব্য রাখতেন, নথি পেশ করতেন এবং মামলা পরিচালনায় সহায়তা করতেন, তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বশির আহমদ বিভিন্ন ফরমান ও বিচারিক ঘটনার সাহায্যে উকিলের উপস্থিতি দেখিয়েছেন এবং মোরল্যান্ডের অস্বীকৃতিকে প্রশ্ন করেছেন। ইসলামি আইনচিন্তায়ও প্রতিনিধিত্ব অজ্ঞাত ছিল না; আল মাওয়ার্দি বিচার ও প্রতিনিধিত্বের জন্য আইনজ্ঞানকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। অতএব মুঘল উকিলকে আধুনিক ব্যারিস্টার মনে করা যেমন ভুল, তেমনি আদালতে কোনো পেশাগত পক্ষসমর্থন ছিল না বলা সমানভাবে বিভ্রান্তিকর।

শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের শাসনকালে রাষ্ট্রের দেওয়ানি মামলা পরিচালনা এবং দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের আইনগত পরামর্শ দেওয়ার জন্য সরকার বা শরিয়তের উকিল নিযুক্ত হওয়ার তথ্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের বলা হতো উকিল ই সরকার বা উকিল ই শরয়ি। বিভিন্ন সরকারের সদর দপ্তরে তাঁরা পূর্ণকালীন কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন এবং কোনো কোনো বিবরণে দৈনিক এক রুপি পারিশ্রমিকের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনা, রাষ্ট্রের অনুকূলে প্রাপ্ত ডিক্রি কার্যকর করানো এবং কাজির তত্ত্বাবধানে থাকা ওয়াক্‌ফ বা অর্পিত সম্পত্তি সম্পর্কে আইনগত পরামর্শ দেওয়া তাঁদের কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আওরঙ্গজেব দরিদ্র ব্যক্তিকে বিনা পারিশ্রমিকে পরামর্শ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিলেন বলে খাফি খানের বিবরণ ও ফরমানসংকলন থেকে জানা যায়।২৪ এ ব্যবস্থাকে আধুনিক রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনি সহায়তার প্রাথমিক সাদৃশ্য বলা যায়, যদিও তার বিস্তার, নিয়মিততা ও সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রবেশাধিকার সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।

উকিলকে প্রত্যেক মামলায় ওকালতনামা পেশ করতে হতো এবং মক্কেল মামলা চলাকালে তাঁর ক্ষমতা প্রত্যাহার করতে পারতেন। উকিল পক্ষের বক্তব্য ও স্বার্থ উপস্থাপন করলেও তাঁর মুখে করা স্বীকারোক্তি সব পরিস্থিতিতে মক্কেলের স্বীকারোক্তি বলে গণ্য হতো না। কারণ দায় স্বীকারের ব্যক্তিগত ও গুরুতর পরিণাম ছিল; প্রতিনিধি নিজের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে মক্কেলকে অপরাধী প্রমাণ করতে পারতেন না। এই নিয়ম মুঘল বিচারচিন্তার একটি সূক্ষ্ম দিক প্রকাশ করে। আদালত প্রতিনিধিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছিল, কিন্তু ব্যক্তি ও প্রতিনিধির আইনগত সত্তাকে পুরোপুরি এক করে দেখছিল না। একই সঙ্গে আইনজীবীর পারিশ্রমিক, যোগ্যতা ও পেশাগত নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট সর্বভারতীয় বিধান না থাকায় ব্যবস্থাটি অনেকটাই আদালত, কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রথার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই উকিলের উপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে সহায়তা করলেও ধনী ও দরিদ্রের সামর্থ্যের ব্যবধান পুরোপুরি দূর করেনি। দরিদ্রকে বিনা মূল্যে পরামর্শ দেওয়ার শাহী নির্দেশ থেকেই বরং বোঝা যায় যে ব্যয় ও জ্ঞানের অভাব ন্যায়বিচারে প্রবেশের বাস্তব বাধা ছিল।

মুঘল ন্যায়বিচার শরিয়তনির্ভর ছিল, না সম্রাটনির্ভর, এই প্রশ্নের উত্তর একক কোনো সূত্রে পাওয়া যায় না। শাসকেরা নিজেদের মুসলমান সম্রাট এবং ঈশ্বরপ্রদত্ত রাজকীয় কর্তৃত্বের ধারক বলে উপস্থাপন করতেন; কাজির আদালতে বিশেষত বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, ওয়াক্‌ফ ও মুসলমানদের ব্যক্তিগত বিষয়ে হানাফি ফিকহ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আওরঙ্গজেবের উদ্যোগে সংকলিত ফতোয়া ই আলমগিরি হানাফি মতের সুবৃহৎ বিধিসংগ্রহ। কিন্তু সাম্রাজ্যের সব আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এই গ্রন্থ বা শরিয়তের সরাসরি বিধান থেকে আসেনি। ফরমান, নিশান, পরওয়ানা, দস্তুর উল আমল, কানুন, রাজস্বপ্রথা এবং শাসকের জনকল্যাণ ও রাষ্ট্ররক্ষামূলক সিদ্ধান্ত দৈনন্দিন প্রশাসনে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অমুসলিমদের পারিবারিক ও ধর্মীয় বিষয়ে নিজস্ব প্রথা ও শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের মতামত নেওয়া হতো; বাণিজ্য, ঋণ, সম্পত্তি ও অপরাধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায় একই আদালতেও যেতে পারত। ফলে মুঘল আইন ছিল বহু উৎসের সমন্বয়ে গঠিত একটি ব্যবহারিক ব্যবস্থা, নিছক ধর্মীয় বিধির যান্ত্রিক প্রয়োগ নয়।

সম্রাটের ব্যক্তিগত জীবন বা কোনো নিষিদ্ধ দ্রব্য ব্যবহারের উদাহরণ দিয়ে রাষ্ট্রের আইনগত চরিত্র নির্ধারণ করাও যথেষ্ট নয়। কোনো সম্রাট মদ পান করেছেন কিংবা ধর্মীয় বিধানের ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন, এই তথ্য প্রমাণিত হলেও তা থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে বিচারব্যবস্থায় শরিয়তের কোনো ভূমিকা ছিল না। ব্যক্তিগত আচরণ, রাজকীয় আদর্শ এবং প্রতিষ্ঠানগত আইনপ্রয়োগ পৃথক বিশ্লেষণের বিষয়। আবার শাসক ধার্মিক হলেই রাষ্ট্র সর্বাংশে ধর্মতান্ত্রিক হয়ে যায় না। মুঘল সম্রাটদের বৈধতা তিমুরীয় বংশগৌরব, সামরিক বিজয়, পারসিক রাজত্বধারণা, ভারতীয় সম্রাটসুলভ আচার এবং ইসলামি প্রতীকের সম্মিলনে গড়ে উঠেছিল। মূল লেখায় আওরঙ্গজেব কোনো হিন্দুকে ধর্মান্তরিত না হয়ে ভালো হিন্দু থাকতে বলেছিলেন বলে যে কাহিনি উল্লিখিত হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য সমকালীন উৎস স্পষ্ট নয়; অতএব তাকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা উচিত নয়। বরং নথিভুক্ত ফরমান, আদালতের দলিল, ইতিহাসগ্রন্থ ও প্রশাসনিক বিধানের তুলনামূলক পাঠ থেকেই বোঝা যায়, আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে সমগ্র মুঘল যুগ জুড়ে দূরত্ব ছিল।

এই বিচারকাঠামোর সর্বনিম্ন সামাজিক স্তর ছিল গ্রাম। গ্রামপঞ্চায়েতকে মুঘল রাষ্ট্রের নিয়মিত বেতনভুক্ত আদালত বলা ঠিক হবে না; এটি ছিল স্থানীয় সমাজ, জাতিগোষ্ঠী, ভ্রাতৃসমাজ বা গ্রামপ্রধানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সালিশি প্রতিষ্ঠান। জমির সীমানা, সেচ, ঋণ, পারিবারিক বিরোধ, পেশাগত রীতি এবং ছোটখাটো সংঘাত সাধারণত এখানেই মীমাংসিত হতো। দ্রুত নিষ্পত্তি, কম ব্যয় এবং স্থানীয় রীতির জ্ঞান ছিল এর শক্তি। কিন্তু গ্রামসমাজের ক্ষমতার অসাম্য, জাতিভেদ, লিঙ্গবৈষম্য এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিচারকে পক্ষপাতমুক্ত রাখত, এমন নিশ্চয়তা ছিল না। মুঘল সরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থায় অযথা হস্তক্ষেপ না করে রাজস্ব আদায় ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকলেই সন্তুষ্ট হতো। গুরুতর বিরোধ কিংবা স্থানীয় নিষ্পত্তিতে অসন্তোষ দেখা দিলে বিষয়টি পরগনা বা সরকার স্তরের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কর্মকর্তার কাছে যেতে পারত। তবে আধুনিক আপিল আইনের মতো প্রতিটি পঞ্চায়েত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একরূপ ও নিশ্চিত আপিলপথ ছিল না।

পরগনা ছিল মুঘল বিচার প্রশাসনের প্রথম সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক স্তর। পরগনার কাজি শাহী সনদের মাধ্যমে নিযুক্ত হতেন এবং সংশ্লিষ্ট পরগনার গ্রামগুলোর ওপর তাঁর এখতিয়ার বিস্তৃত ছিল। দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ, দলিলের সত্যতা, ঋণ, সম্পত্তি, বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং শরিয়তসম্মত ব্যক্তিগত আইনের বিষয় তাঁর আদালতে আসতে পারত। ইউ. এন. ডে পরগনা কাজির আদালতকে মুঘল রাষ্ট্রের সর্বনিম্ন নিয়মিত আদালত বলেছেন।২৫ কাজিকে সহায়তার জন্য মুফতি, মুহতাসিব এবং দারোগা ই আদালত থাকতে পারতেন। মুফতি প্রাসঙ্গিক বিধান ও নজির ব্যাখ্যা করতেন, মুহতাসিব প্রকাশ্য অনিয়ম বা সরকারের পক্ষে অভিযোগের তথ্য দিতেন, আর দারোগা আদালতের শৃঙ্খলা ও রায় কার্যকর করার প্রশাসনিক সহায়তা দিতেন। সব পরগনায় একই সংখ্যক কর্মকর্তা ছিল না; কখনো একজন ব্যক্তি মুফতি ও মুহতাসিব উভয় পদের দায়িত্ব পালন করতেন। এটি পদ দুটির আইনগত একীভবন নয়, বরং সীমিত লোকবল ও প্রশাসনিক সুবিধার কারণে একই ব্যক্তিকে দ্বৈত দায়িত্ব দেওয়ার নজির।

পরগনায় বিচার কেবল কাজির আদালতে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমিল বা করোরির কাচারিতে রাজস্ব নির্ধারণ, বকেয়া, আদায় এবং জমিসংক্রান্ত আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তি হতো; তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকারের আমলগুজারের কাছে যাওয়া যেত। কোটওয়াল নগর বা বাজারকেন্দ্রের পুলিশি ও পৌর অপরাধ দেখতেন। রাতের নিরাপত্তা, চুরি হওয়া সম্পদের সন্ধান, সন্দেহভাজন ব্যক্তির ওপর নজর, পথঘাটের শৃঙ্খলা, অগ্নিনিরাপত্তা, বাজার এবং কখনো জন্মমৃত্যুর তথ্যও তাঁর কর্মক্ষেত্রে পড়ত। ছোটখাটো গোলযোগ ও পৌর বিধিভঙ্গের বিচার তিনি করতে পারতেন। এই বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে বোঝা যায়, মুঘল আমলে বিষয়ভিত্তিক এখতিয়ারের সূচনা থাকলেও দেওয়ানি, ফৌজদারি, পুলিশি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা বর্তমানের মতো স্পষ্ট ছিল না। একই ঘটনার সম্পত্তিগত অংশ কাজির কাছে, জনশৃঙ্খলার অংশ কোটওয়ালের কাছে এবং রাজস্বের অংশ আমিলের কাচারিতে যেতে পারত। বিচারপ্রার্থীর জন্য এই নমনীয়তা কখনো সুবিধা, কখনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করত।

পরগনার ওপরের স্তর ছিল সরকার, যা আধুনিক জেলার সঙ্গে মোটামুটি তুলনীয় হলেও সম্পূর্ণ সমার্থক নয়। এখানে প্রধান দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের সভাপতিত্ব করতেন কাজি ই সরকার। পরগনা কাজির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর কাছে আবেদন করা যেত এবং তিনি দেওয়ানি, অপরাধ ও ধর্মীয় বিধিসংক্রান্ত বিষয় শুনতেন। তাঁর আদালতের সঙ্গে পেশকার, কাতিব, আমিন, নাজির, দফতরি, মুচলকানবিশ ও পরিচারকের মতো কর্মী যুক্ত থাকতেন। পেশকার মামলার প্রাথমিক উপস্থাপনা ও দাপ্তরিক প্রবাহ দেখতেন, কাতিব লিখিত নথি প্রস্তুত করতেন, আমিন তদন্ত বা পরিমাপের দায়িত্ব পেতে পারতেন, নাজির সম্পত্তি বা রায় কার্যকরের তত্ত্বাবধান করতেন, আর মুচলকানবিশ জামিননামা ও অঙ্গীকারপত্র লিখতেন। এই কর্মিবিন্যাস দেখায় যে বিচার কেবল বিচারকের মৌখিক সিদ্ধান্ত ছিল না; আবেদন, দলিল, সাক্ষ্য, নকল, জামিন এবং রায় কার্যকরের জন্য একটি বিকাশমান দাপ্তরিক সংস্কৃতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। ফারসি ছিল শাহী প্রশাসনের প্রধান ভাষা, ফলে ভাষাজ্ঞান ও দক্ষ লেখকের সহায়তা সাধারণ বিচারপ্রার্থীর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কাজি ই সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব ছিল কারাগার পরিদর্শন। তিনি বন্দিদের অবস্থা, আটক রাখার বৈধতা এবং বিচারাধীন ব্যক্তির মামলা সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারতেন; প্রয়োজন হলে কার্যধারা পুনর্বিবেচনা এবং জামিনের প্রশ্নও দেখতে পারতেন। মিরাত ই আহমদির বিবরণে এই পরিদর্শনমূলক ক্ষমতার উল্লেখ আছে।২৬ একে আধুনিক হেবিয়াস করপাস বা স্বাধীন বিচারিক পরিদর্শনের সমতুল্য বলা যাবে না, কিন্তু নির্বিচার আটক ঠেকাতে এর নীতিগত গুরুত্ব ছিল। বাস্তবে কাজি কতটা স্বাধীনভাবে শক্তিশালী ফৌজদার বা প্রাদেশিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বন্দির অধিকার রক্ষা করতে পারতেন, তা নির্ভর করত তাঁর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর। নিয়মের উপস্থিতি তাই স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষার প্রমাণ নয়; বরং প্রশাসনের ভেতরে অন্যায় সংশোধনের একটি সম্ভাব্য পথের নির্দেশক।

সরকার স্তরে কাজির পাশাপাশি ফৌজদার, কোটওয়াল ও আমলগুজারের পৃথক বিচারিক ভূমিকা ছিল। ফৌজদার মূলত সামরিক ও নির্বাহী কর্মকর্তা; বিদ্রোহ, সশস্ত্র গোলযোগ, দস্যুতা, পথের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার মতো বিষয় তাঁর এখতিয়ারে আসত। পি. সরণ মনে করেন, প্রথম পর্যায়ে ফৌজদারের স্বতন্ত্র বিচারিক ক্ষমতা সীমিত ছিল এবং অষ্টাদশ শতকের দিকে গুরুতর প্রাণদণ্ডযোগ্য অপরাধ ছাড়া অন্যান্য মামলায় তাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।২৭ অন্যদিকে কার্যকর শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে তাঁকে সম্পূর্ণ বিচারবিচ্ছিন্ন সামরিক কর্মকর্তা ভাবাও কঠিন। কোটওয়াল ছোট পুলিশি ও পৌর মামলা দেখতেন, আর আমলগুজারের কাচারি রাজস্ববিরোধ এবং পরগনা আমিলের সিদ্ধান্তের আবেদন শুনত। ফলে সরকার স্তরে একটিমাত্র আদালতের বদলে কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী কয়েকটি বিচারকেন্দ্র পাশাপাশি সক্রিয় ছিল।

কাজি ই সরকারের সহায়ক কর্মকর্তাদের মধ্যে দারোগা ই আদালত, মুফতি, মীর আদল, পণ্ডিত, মুহতাসিব এবং উকিল ই শরয়ির ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মুসলমানের ব্যক্তিগত আইনে মুফতি হানাফি বিধান ব্যাখ্যা করতেন; হিন্দু রীতি বা ধর্মশাস্ত্রনির্ভর প্রশ্নে পণ্ডিতের মত নেওয়া যেত। তবে পক্ষের ধর্মই সব সময় আদালত নির্ধারণ করত না। লেনদেন, সম্পত্তি, দলিল বা অপরাধের প্রকৃতি অনুসারে হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই কাজির আদালতে উপস্থিত হতে পারতেন। মীর আদলের কাজ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতভেদ আছে। কোথাও তাঁকে কাজির অনুসন্ধানের ভিত্তিতে রায় ঘোষণা বা কার্যকরকারী কর্মকর্তা বলা হয়েছে, কোথাও আদালতের উচ্চপদস্থ কেরানি ও বাস্তব ঘটনা যাচাইকারী হিসেবে দেখা হয়েছে। সব প্রদেশে এই পদ ছিল না এবং সময়ের সঙ্গে তার কার্যাবলিও বদলেছে। তাই মীর আদলকে সর্বত্র সমমর্যাদার স্বাধীন বিচারক বলা নিরাপদ নয়। বরং তিনি বিচারিক অনুসন্ধান, সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধকরণ ও রায় বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী একটি সহায়ক পদ ছিলেন বলে মনে হয়।

আকবর বিচারিক নিয়োগের ওপর সদর বিভাগের একচ্ছত্র প্রভাব কমিয়ে প্রশাসনিক ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেন। কাজির নিয়োগপত্র সদর উস সুদুরের দপ্তর থেকে জারি হতে পারত, কিন্তু চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সম্রাটেরই ছিল; সরকার কাজির বাস্তব ঊর্ধ্বতন ছিলেন সাধারণত কাজি ই সুবা। এই ব্যবস্থায় ধর্মীয় অনুদান, মাদাদ ই মাশ, ওয়াক্‌ফ ও বিচারিক নিয়োগের ক্ষেত্র আংশিক পৃথক হয়। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আধুনিক সাংবিধানিক অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কাজির পদ, বদলি, পদোন্নতি ও অপসারণ রাজকীয় ক্ষমতার আওতায় থাকায় তিনি রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ছিলেন না। শরিয়তের তত্ত্ব অনুযায়ী বৈধ রায়ে সম্রাটের হস্তক্ষেপ অনুচিত হলেও বাস্তব রাজনীতিতে সম্রাট বা প্রভাবশালী কর্মকর্তা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারতেন। এই দ্বৈততা মুঘল বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য: আদর্শে কাজি আইনজ্ঞ ও ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক, বাস্তবে তিনি সম্রাটনিযুক্ত আমলা এবং স্থানীয় ক্ষমতার জালের অংশ।

সুবা ছিল সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রাদেশিক একক। সুবা স্তরে নাজিম বা সুবাদারের আদালত, কাজি ই সুবার আদালত, দেওয়ান ই সুবার রাজস্ব আদালত এবং সদর ই সুবার দপ্তর, এই চার ধরনের বিচারিক কেন্দ্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। নাজিম সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে প্রদেশের শান্তি, প্রশাসন ও ন্যায়বিচারের সার্বিক দায়িত্ব বহন করতেন। তাঁর আদালত মূল ও আপিল, উভয় এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারত। তিনি সরাসরি কোনো গুরুতর মামলা শুনতে পারতেন এবং প্রদেশের অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন গ্রহণ করতেন। বিচার বিলম্বিত করে প্রজাকে হয়রান না করা, কেবল শপথ ও সাক্ষীর ওপর নির্ভর না করে ঘটনার বাস্তব সত্য অনুসন্ধান করা এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে শোভন আচরণ করা তাঁর জন্য কাম্য ছিল। মূল মামলা শুনলে তিনি এককভাবে বসতে পারতেন; আপিল শুনলে সাধারণত কাজি ই সুবাকে সঙ্গে নিয়ে বেঞ্চ গঠন করতেন। কিন্তু আপিলটি যদি কাজি ই সুবার নিজের রায়ের বিরুদ্ধে হতো, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে সেই বেঞ্চে রাখা যেত না।

নাজিমের আদালতে মুফতি ও দারোগা ই আদালত সহায়তা করতেন। ভূমিরাজস্বের মামলা সাধারণত প্রাদেশিক দেওয়ানের আওতায় পড়লেও সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে নাজিম বিশেষ পরিস্থিতিতে সেখানেও আবেদন শুনতে পারতেন। এখানেই প্রশাসনিক ক্ষমতার ওভারল্যাপ স্পষ্ট। একদিকে তা বিচারপ্রার্থীকে অতিরিক্ত প্রতিকারের পথ দিত; অন্যদিকে একই বিষয়ে একাধিক শক্তিশালী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করত। নাজিমের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজধানীতে সম্রাটের আদালত বা কেন্দ্রীয় প্রধান আদালতে আবেদন করা যেত। কিন্তু দূরত্ব, যাত্রাব্যয়, ভাষা, নথি সংগ্রহ এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকের অভাব সাধারণ মানুষের জন্য এই উচ্চতর প্রতিকারকে কঠিন করে তুলত। কাগজে আপিলের পথ থাকা এবং বাস্তবে সকলের পক্ষে তা ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। সাম্রাজ্যিক বিচারব্যবস্থার মূল্যায়নে এই সামাজিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা স্মরণ রাখা জরুরি।

কাজি ই সুবা ছিলেন প্রাদেশিক বিচার বিভাগের প্রধান। তাঁর দেওয়ানি ও ফৌজদারি মূল এখতিয়ার ছিল এবং সরকারের কাজিদের রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল শুনতেন। তাঁর ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে নাজিমের সমান্তরাল বলে বর্ণিত হয়েছে, যদিও নাজিমের হাতে সামরিক ও নির্বাহী শক্তি বেশি ছিল। সার্বভৌমের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রশ্ন দেখা দিলে নাজিম তাঁর পরামর্শ নিতে পারতেন। সুবিস্তৃত প্রদেশে বিপুল মামলা, বিভিন্ন স্থানীয় প্রথা এবং জটিল দলিল সামলাতে তাঁকে বড় দপ্তরের সহায়তা নিতে হতো। মুফতি, মুহতাসিব, দারোগা ই আদালত, মীর আদল, পণ্ডিত, সাওয়ানেহনবিশ ও ওয়াকেয়ানিগার তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারতেন। শেষের দুই কর্মকর্তা সংবাদ ও ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করে কেন্দ্রকে জানাতেন; এতে বিচারিক অনিয়ম বা প্রাদেশিক ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে সম্রাটের দরবার কিছু তথ্য পেতে পারত। তবে সংবাদলেখকের প্রতিবেদনও পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে সর্বদা মুক্ত ছিল না।

দেওয়ান ই সুবার আদালত প্রধানত রাজস্ব ও আর্থিক বিরোধের বিচার করত। পরগনা ও সরকার স্তরের আমিল বা আমলগুজারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এখানে আবেদন আসত। এর রায়ের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় দেওয়ান ই আলার কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল; নাজিম এবং শেষ পর্যন্ত সম্রাটও সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন। সদর ই সুবার কাজ অপেক্ষাকৃত ভিন্ন প্রকৃতির। ধর্মীয় অনুদান, ওয়াক্‌ফ, মাদাদ ই মাশ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত বিরোধ তাঁর দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে সুবা স্তরের চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজি ই সুবা ছিলেন সাধারণ বিচার বিভাগের মুখ্য কর্মকর্তা, দেওয়ান ছিলেন রাজস্ববিচারের প্রধান, সদর ধর্মীয় অনুদান ও দাতব্য সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক এবং নাজিম ছিলেন সর্বময় প্রাদেশিক প্রশাসক। এই বিভাজন পুরোপুরি অনমনীয় ছিল না, কিন্তু মুঘল রাষ্ট্র যে কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী বিশেষায়িত কর্তৃত্ব গড়ে তুলেছিল, তার স্পষ্ট পরিচয় এতে পাওয়া যায়।

সাম্রাজ্যের রাজধানীতে সম্রাটের আদালত ছিল সর্বোচ্চ বিচারিক মঞ্চ। সম্রাট দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় মামলা প্রথমবার শুনতে পারতেন এবং সমগ্র সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত আপিলও গ্রহণ করতেন। আপিল শুনলে কাজি উল কুজাত ও দরবারের অন্যান্য কাজিকে সঙ্গে নিয়ে বেঞ্চ বসতে পারত; মূল মামলা শুনলে মুফতি বা মীর আদলের সহায়তা নেওয়া হতো। দারোগা ই আদালত আবেদন পেশ করতেন এবং কোনো জটিল আইনগত ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ কাজি ও মুফতিদের মত চাওয়া হতো। সম্রাটের প্রকাশ্য দরবার, ঝরোখা, দরবারে আবেদন এবং জাহাঙ্গীরের ন্যায়ের শৃঙ্খলের মতো প্রতীক রাজকীয় ন্যায়ের ধারণাকে দৃশ্যমান করেছিল। কিন্তু এসব প্রতীকের জনপ্রিয়তা থেকে প্রতিটি আবেদন সরাসরি, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি হতো বলে ধরে নেওয়া যায় না। এগুলো একই সঙ্গে ন্যায়প্রার্থনার পথ এবং সম্রাটের পিতৃতান্ত্রিক সার্বভৌমত্বের রাজনৈতিক প্রদর্শন ছিল।

সম্রাটের পর কেন্দ্রীয় বিচারিক মর্যাদায় কাজি উল কুজাত ছিলেন সর্বোচ্চ। তাঁকে সাম্রাজ্যের প্রধান কাজি বলা অধিক সঙ্গত; আধুনিক প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তাঁর তুলনা সীমিত অর্থে করা যায়। সম্রাট পাণ্ডিত্য, ধর্মীয় জ্ঞান ও চরিত্রের সুনাম বিবেচনা করে তাঁকে নিয়োগ করতেন। তাঁর আদালত মূল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা শুনতে, প্রাদেশিক আদালতের আপিল গ্রহণ করতে এবং অধস্তন কাজিদের কাজ তদারক করতে পারত। সহায়তার জন্য এক বা একাধিক কাজি থাকতেন। শাসনান্তরে সম্রাটের বৈধতা ঘোষণায় খুতবায় নতুন শাসকের নাম পাঠ, শুক্রবার ও ঈদের নামাজে নেতৃত্ব, রাজপরিবারের বিবাহ অনুষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রিক অন্ত্যেষ্টি এবং শরিয়তের প্রকাশ্য প্রয়োগ তদারক তাঁর আনুষঙ্গিক দায়িত্বের মধ্যে পড়তে পারত। নতুন কর আরোপের ধর্মীয় বৈধতা সম্পর্কে তাঁর মত নেওয়ার নজিরও ছিল। তবে তিনি সম্রাটের ঊর্ধ্বে কোনো সাংবিধানিক আদালতের প্রধান ছিলেন না; তাঁর নিয়োগ ও মর্যাদা শেষ পর্যন্ত রাজকীয় কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

রাজধানী শহরের নিজস্ব কাজিও ছিলেন, যাঁর মর্যাদা অনেকটা কাজি ই সুবার সমপর্যায়ের এবং প্রয়োজনে তিনি কাজি উল কুজাতের দায়িত্ব সাময়িকভাবে পালন করতে পারতেন। এর বাইরে সেনাবাহিনীর জন্য কাজি ই আসকর বা কাজি ই উর্দু নিযুক্ত হতেন। মুঘল দরবার ও সেনাশিবির প্রায়ই চলমান থাকত; বিপুল সৈন্য, কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও অনুগামী নিয়ে শিবির নিজেই অস্থায়ী নগরে পরিণত হতো। ফলে সৈন্যদের বিবাহ, ঋণ, সম্পত্তি, চুক্তি, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক বিবাদের জন্য চলমান বিচারিক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন ছিল। কাজি ই আসকরের এখতিয়ার নির্ধারিত সামরিক এলাকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এক পক্ষ সেনাশিবিরে এবং অন্য পক্ষ শহরে থাকলে এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত; বিশেষ শাহী ক্ষমতা না থাকলে শহরের পক্ষ সেখানে বিচার চাইলে সামরিক কাজি জোর করে মামলা রাখতে পারতেন না। আবার উভয় পক্ষ সামরিক এলাকার হলেও সম্মত হয়ে শহরের কাজির আদালতে যেতে পারত। এই বিধান স্থান ও ব্যক্তিনির্ভর এখতিয়ারের জটিল সম্পর্ক নির্দেশ করে।

কেন্দ্রীয় দেওয়ান ই আলা ছিলেন সাম্রাজ্যের প্রধান রাজস্ব ও আর্থিক কর্তৃপক্ষ এবং তাঁর আদালত প্রাদেশিক দেওয়ানদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন গ্রহণ করতে পারত। তবে বাস্তবে তিনি রাজস্বনীতি, আয়ব্যয়ের হিসাব, জায়গির, খালিসা এবং সাম্রাজ্যিক অর্থব্যবস্থার বৃহত্তর কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে ক্ষুদ্র আপিল তাঁর কাছে নিয়মিত আসত না। বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাই সাধারণত কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাত। সম্রাট চাইলে নিজের উদ্যোগে রাজস্ববিরোধ পুনর্বিবেচনা করতে পারতেন। এই চূড়ান্ত ক্ষমতার কারণে সম্রাটের আদালত, কাজি উল কুজাতের প্রধান আদালত এবং দেওয়ান ই আলার রাজস্ব আদালত পরস্পর স্বতন্ত্র হলেও তাদের সর্বশেষ রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল একই ব্যক্তি। আইন, নির্বাহী ক্ষমতা ও রাজস্বের এই সম্মিলন মুঘল শাসনকে দ্রুত সিদ্ধান্তের শক্তি দিয়েছিল, কিন্তু স্বাধীন বিচারিক নিয়ন্ত্রণের অভাবও সৃষ্টি করেছিল।

সমগ্র ব্যবস্থায় আপিলের সাধারণ প্রবাহ ছিল নিচ থেকে ওপরের দিকে, কিন্তু তা সব ক্ষেত্রে একরূপ ছিল না। গ্রামের ছোট বিরোধ স্থানীয়ভাবে মিটত; গুরুতর দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা পরগনা কাজির কাছে যেত; সেখান থেকে কাজি ই সরকার, পরে কাজি ই সুবা বা নাজিম এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় প্রধান আদালত বা সম্রাটের দরবারে আবেদন করা সম্ভব ছিল। রাজস্ব মামলায় আমিল থেকে আমলগুজার, তারপর দেওয়ান ই সুবা এবং শেষে দেওয়ান ই আলার পথ ছিল। জননিরাপত্তা ও সশস্ত্র গোলযোগে ফৌজদার ও নাজিমের নির্বাহী আদালত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত, আর পৌর ও পুলিশি ক্ষুদ্র অপরাধে কোটওয়াল সক্রিয় থাকতেন। সম্রাটের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিল ছিল না; কাজি উল কুজাত বা দেওয়ান ই আলার রায় সম্পর্কে সম্রাটের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যেত। এই রূপরেখা একটি আদর্শ প্রশাসনিক মানচিত্র, কিন্তু স্থানীয় দলিল দেখায় যে মানুষ সুবিধা, ক্ষমতা ও সম্ভাব্য ফল বিবেচনা করে কখনো একাধিক কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতো।

মুঘল বিচারব্যবস্থার শক্তি ছিল তার বিস্তৃত প্রশাসনিক জাল, স্থানীয় প্রথার সঙ্গে সমঝোতা, বিশেষায়িত রাজস্ব আদালত, আইনজ্ঞের সহায়তা এবং উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার সুযোগ। দলিল নিবন্ধন, কাজির সিল, সাক্ষ্য, জামিননামা, ওকালতনামা, ফরমান ও আদালতি নকলের ব্যবহার বিচারকে একটি লিখিত প্রশাসনিক ভিত্তি দিয়েছিল। একই সঙ্গে দুর্বলতাও ছিল প্রবল। বিচারক ও নির্বাহী কর্মকর্তার সীমারেখা অস্পষ্ট, নিয়োগে সম্রাটের প্রভাব, নির্দিষ্ট সর্বভারতীয় দণ্ডবিধির অভাব, কর্মকর্তাভেদে শাস্তির তারতম্য, দীর্ঘ দূরত্ব, ফারসি ভাষার বাধা, ব্যয়, ঘুষ এবং সামাজিক মর্যাদার অসমতা সাধারণ মানুষের ন্যায়প্রাপ্তিকে সীমিত করত। নারীরা, নিম্নবর্ণের মানুষ, দরিদ্র কৃষক ও প্রান্তিক সম্প্রদায় কাগজে আদালতে যেতে পারলেও বাস্তবে সাক্ষী, পৃষ্ঠপোষক ও অর্থ সংগ্রহে পিছিয়ে থাকত। তাই এই ব্যবস্থাকে অবিকল আধুনিক বিচারব্যবস্থার পূর্বসূরি কিংবা নিছক স্বেচ্ছাচারী শাসনের হাতিয়ার, কোনো একমাত্রিক পরিচয়ে বেঁধে ফেলা যায় না।

আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও এই বহুত্ব ধরা পড়ত। বাদীকে দাবি স্পষ্ট করতে হতো, বিবাদীকে জবাবের সুযোগ দেওয়া হতো এবং সাক্ষ্য, দলিল, দখল, স্বীকারোক্তি ও শপথের ভিত্তিতে সত্য নির্ণয়ের চেষ্টা চলত। ইসলামি আইন অনুসারে সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতা ও সাক্ষ্যের সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাজি সব সময় কেবল আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যে আবদ্ধ থাকতেন না; স্থানীয় অনুসন্ধান, আমিনের প্রতিবেদন, প্রচলিত রীতি এবং দলিলের ধারাবাহিকতাও বিবেচিত হতে পারত। আবুল ফজল বিচারককে প্রথম শুনানিতেই তাড়াহুড়ো না করে উভয় পক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ, প্রত্যেক সাক্ষীর বক্তব্য পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ এবং বিরতির পর মামলাটি নতুন করে পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে মানুষের লোভ ও সাক্ষ্যের অনির্ভরতার কথা আছে, যা দেখায় যে সমকালীন রাষ্ট্রচিন্তায়ও মিথ্যা সাক্ষ্য ও সাজানো মামলার বিপদ স্বীকৃত ছিল।২৮ অবশ্য এই আদর্শ প্রতিটি নিম্ন আদালতে অনুসৃত হতো কি না, তার প্রমাণ অসম্পূর্ণ। মামলার নথি টিকে থাকার হার কম হওয়ায় প্রশাসনিক বিধান এবং বাস্তব বিচারচর্চার ব্যবধান নির্ণয় ইতিহাসবিদদের জন্য কঠিন।

শাস্তির ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। শরিয়তি দণ্ড, প্রতিশোধমূলক কিসাস, ক্ষতিপূরণমূলক দিয়ত এবং বিচারকের বিবেচনাধীন তাজিরের পাশাপাশি রাষ্ট্ররক্ষা ও জনশৃঙ্খলার নামে সিয়াসত ধরনের শাস্তি ব্যবহৃত হতো। হত্যা, দস্যুতা, বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহের মতো অপরাধে সম্রাট, নাজিম বা ফৌজদারের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রবল হয়ে উঠত। ফলে ফিকহের গ্রন্থে নির্ধারিত কঠোর প্রমাণমান এবং শাসকের নিরাপত্তামূলক সিদ্ধান্তের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারত। প্রাণদণ্ডের মতো গুরুতর সিদ্ধান্তে আইনজ্ঞের মত নেওয়া কাম্য হলেও রাজকীয় ক্রোধ, দরবারি রাজনীতি বা সামরিক জরুরি অবস্থার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। আবার ক্ষমা, জরিমানা, মুচলকা, জামিন, সম্পত্তি ফেরত, ক্ষতিপূরণ এবং সামাজিক মীমাংসাও বহুল ব্যবহৃত ছিল। তাই মুঘল ফৌজদারি বিচারকে শুধু নিষ্ঠুর দেহদণ্ডের বিবরণে সীমাবদ্ধ করলে তার আলোচনামূলক ও পুনর্মিলনমূলক দিক হারিয়ে যায়; আর কেবল ন্যায়পরায়ণ সম্রাটের কাহিনি বললে ক্ষমতার স্বেচ্ছাচার আড়াল হয়। ইতিহাসসম্মত মূল্যায়নে এই দুই বাস্তবতাকেই একসঙ্গে দেখতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, মুঘল ভারতের বিচার প্রশাসন ছিল রাজকীয় সার্বভৌমত্বের অধীন একটি বহুস্তরীয় ও বহুবিধ আইনসংস্কৃতি। মুহতাসিব জননৈতিকতা ও বাজারশৃঙ্খলার রক্ষক হলেও পূর্ণ বিচারক ছিলেন না; উকিল ই শরয়ি ও উকিল ই সরকার পক্ষসমর্থন ও রাষ্ট্রের মামলা পরিচালনা করলেও আধুনিক স্বাধীন আইনজীবী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিলেন না; কাজি শরিয়ত ও প্রযোজ্য আইন ব্যাখ্যা করলেও নির্বাহী শক্তি থেকে পুরোপুরি স্বাধীন ছিলেন না; ফৌজদার, কোটওয়াল ও আমিল বিচারিক কাজ করলেও তাঁদের প্রধান পরিচয় ছিল যথাক্রমে নিরাপত্তা, নগর প্রশাসন ও রাজস্ব। গ্রামপঞ্চায়েত থেকে সম্রাটের দরবার পর্যন্ত প্রতিটি স্তর নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করত। এই জটিলতাই মুঘল বিচারব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয়। এর ইতিহাস আমাদের জানায় যে প্রাক আধুনিক ভারতে ন্যায়বিচার কোনো একক ধর্মগ্রন্থ, কর্মকর্তা বা আদালতের হাতে বন্দী ছিল না; বরং শাসকের নৈতিক দায়, আইনজ্ঞের ব্যাখ্যা, প্রশাসনিক প্রয়োজন, প্রজার আবেদন, স্থানীয় রীতি এবং রাষ্ট্রের শক্তির মধ্যে অবিরাম সমঝোতার মধ্য দিয়ে বিচার গড়ে উঠেছিল।

 

তথ্যসূত্র

  • ১. ওয়াহিদ হুসাইন, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব জাস্টিস ডিউরিং দ্য মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া (ইদারা-ই-আদাবিয়াত-ই-দিল্লি, প্রথম প্রকাশ ১৯৩৪; দ্বিতীয় পুনর্মুদ্রণ ১৯৭৭), পৃ. ১০৩ থেকে ১০৬।
  • ২. ওয়াহিদ হুসাইন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০।
  • ৩. ইবন হাসান, দ্য সেন্ট্রাল স্ট্রাকচার অব দ্য মুঘল এম্পায়ার অ্যান্ড ইটস প্র্যাকটিক্যাল ওয়ার্কিং আপ টু দ্য ইয়ার ১৬৫৭ (মুনশিরাম মনোহরলাল, প্রথম প্রকাশ ১৯৩৬; পুনর্মুদ্রণ ১৯৭০), পৃ. ৩০৬।
  • ৪. ইবন হাসান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৭ থেকে ৩০৮।
  • ৫. ইউ. এন. ডে, দ্য মুঘল গভর্নমেন্ট, ১৫৫৬ থেকে ১৭০৭ (মুনশিরাম মনোহরলাল, প্রথম প্রকাশ ১৯৭০), পৃ. ২০৩।
  • ৬. ইবন হাসান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১০ থেকে ৩১১।
  • ৭. আর. পি. খোসলা, মুঘল কিংশিপ অ্যান্ড নোবিলিটি, পৃ. ২২ থেকে ২৪।
  • ৮. ইবন হাসান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১১।
  • ৯. ইবন হাসান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১২।
  • ১০. আবুল ফজল আল্লামি, আইন-ই-আকবরি, অনু. এইচ. এস. জ্যারেট (লো প্রাইস পাবলিকেশন্স, ২০০৬ সংস্করণ), পৃ. ৪৩৩।
  • ১১. আবুল ফজল আল্লামি, আইন-ই-আকবরি, পৃ. ৪৩৪।
  • ১২. আবুল ফজল আল্লামি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪৩।
  • ১৩. আবুল ফজল আল্লামি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪৯ থেকে ৪৫০।
  • ১৪. আবুল ফজল আল্লামি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫০ থেকে ৪৫১।
  • ১৫. আবুল ফজল আল্লামি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫১।
  • ১৬. আবুল ফজল আল্লামি, প্রাগুক্ত, খণ্ড ২, পৃ. ৪২ থেকে ৪৩।
  • ১৭. আবুল ফজল আল্লামি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২ থেকে ৪৩।
  • ১৮. রিচার্ড সি. মার্টিন সম্পাদিত, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড, খণ্ড ২ (থমসন গেইল, ২০০৪), পৃ. ৫৫৭।
  • ১৯. ইউ. এন. ডে, দ্য মুঘল গভর্নমেন্ট, পৃ. ২১৩ থেকে ২১৪।
  • ২০. ইউ. এন. ডে, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৪।
  • ২১. আবুল ফজল আল্লামি, প্রাগুক্ত, খণ্ড ২, পৃ. ৪৩।
  • ২২. বেণী প্রসাদ, জাহাঙ্গীর, পৃ. ৯৬।
  • ২৩. ইউ. এন. ডে, প্রাগুক্ত,পৃ. ২০৪ থেকে ২১৩।
  • ২৪. খাফি খান, মুনতাখাব উল লুবাব, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৯ থেকে ২৫২; এম. বি. আহমদ, দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব জাস্টিস ইন মেডিয়েভ্যাল ইন্ডিয়া, পৃ. ১৬৩ থেকে ১৬৪।
  • ২৫. ইউ. এন. ডে, প্রাগুক্ত,পৃ. ২০৪।
  • ২৬. আলি মুহাম্মদ খান, মিরাত ই আহমদি, খণ্ড ২, পৃ. ২৮২ থেকে ২৮৩।
  • ২৭. পি. সরণ, প্রভিনশিয়াল গভর্নমেন্ট অব দ্য মুঘলস, পৃ. ৩৫৩, উদ্ধৃত ইউ. এন. ডে, পৃ. ২০৫।
  • ২৮. আবুল ফজল, প্রাগুক্ত, খণ্ড ২ ও ৩, পৃ. ৪২ থেকে ৪৩।
Post Views: 24
Tags: Indian HistoryIslamic LawJudicial SystemMedieval IndiaMughal CourtMughal EmpireMughal HistoryMughal IndiaMughal Lawআইন ও বিচারন্যায়বিচারবিচারব্যবস্থাভারতীয় ইতিহাসমুঘল আইনমুঘল আদালতমুঘল আমলমুঘল ভারতমুঘল সাম্রাজ্য
ADVERTISEMENT

Related Posts

বাংলা ভাগে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা: ইতিহাস ও বিতর্ক
ভারতবর্ষের ইতিহাস

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাংলা ভাগে ভূমিকা: ইতিহাস ও বিতর্ক

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম ২৩ জুন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি ঘিরে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
August 22, 2026
মহাভারতের যুদ্ধের সময়কাল : ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ
ভারতবর্ষের ইতিহাস

মহাভারতের যুদ্ধের সময়কাল : ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি ও ইতিহাসচর্চা এমন এক জটিল ও বিতর্কপূর্ণ ক্ষেত্র, যেখানে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আজও সহজ হয়নি।...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
August 7, 2026
রাম : ঐতিহাসিক বাস্তবতা নাকি পৌরাণিক কল্পনা?
ভারতবর্ষের ইতিহাস

রাম : ঐতিহাসিক বাস্তবতা নাকি পৌরাণিক কল্পনা?

রামসেতুকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক ভারতে ইতিহাস, ধর্মবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতকে নতুনভাবে সামনে এনে দিয়েছে। এই বিতর্কের সূত্র ধরে...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
May 24, 2026
‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের জনক কাজী নজরুল ইসলাম
ভারতবর্ষের ইতিহাস

‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের জনক কাজী নজরুল ইসলাম

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম ‘জয় বাংলা’ কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক চেতনা, ভাষাগত গৌরব এবং রাজনৈতিক...

by নবজাগরণ
May 4, 2026

Facebook Page

নবজাগরণ

ADVERTISEMENT
No Result
View All Result

Categories

  • English (9)
  • অন্যান্য (11)
  • ইসলাম (28)
  • ইসলামিক ইতিহাস (23)
  • ইহুদী (3)
  • কবিতা (37)
  • খ্রিস্টান (6)
  • ছোটগল্প (6)
  • নাস্তিকতা (20)
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (24)
  • বিশ্ব ইতিহাস (26)
  • ভারতবর্ষের ইতিহাস (204)
  • রাজনীতি (42)
  • সাহিত্য আলোচনা (74)
  • সিনেমা (18)
  • হিন্দু (19)

Pages

  • Cart
  • Checkout
    • Confirmation
    • Order History
    • Receipt
    • Transaction Failed
  • Checkout
  • Contact
  • Donation to Nobojagaran
  • Homepage
  • No Access
  • Order Confirmation
  • Order Failed
  • Privacy Policy
  • Purchases
  • Services
  • লেখা পাঠানোর নিয়ম
  • হোম

  • jasa gestun terdekat
  • https://www.harikami.id/
  • https://premiumnesia.id/
No Result
View All Result
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi

©Nobojagaran 2020 | Designed & Developed with ❤️ by Adozeal

Login to your account below

Forgotten Password?

Fill the forms bellow to register

All fields are required. Log In

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
Welcome back
Sign In
Sign in to access your downloads, manage your account, and continue where you left off.
Login Account
Enter your credentials to access your account
Forgot Password?
Don't have an account? Register Now
1
WhatsApp
Hi, how can I help you?
Open chat
Powered by Joinchat
wpDiscuz
0
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
| Reply