রামসেতুকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক ভারতে ইতিহাস, ধর্মবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতকে নতুনভাবে সামনে এনে দিয়েছে। এই বিতর্কের সূত্র ধরে এমন এক শ্রেণির মানুষ সক্রিয় হয়েছেন, যাঁরা শুধু রামসেতুর অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলেননি, বরং রাম নামক ব্যক্তিত্বটিরই ঐতিহাসিকতা অস্বীকার করার প্রয়াস নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাম আদৌ কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র নন; তিনি নিছকই পৌরাণিক কল্পনার সৃষ্টি। এই যুক্তির অন্তর্নিহিত কৌশলটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কারণ যদি রামের বাস্তব অস্তিত্বই অস্বীকার করা যায়, তাহলে তাঁর সঙ্গে যুক্ত সেতু বা রামায়ণের ঘটনাবলির ঐতিহাসিকতা নিয়েও আর কোনও প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে না।

এই প্রসঙ্গে তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর বহুল আলোচিত দুটি মন্তব্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, “এই রাম কে?” এবং “তিনি কোন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন?” (The Hindustan Times, Lucknow edn., September 19, 2007, p. 7.)। আধুনিক রাজনৈতিক বিদ্রূপের দৃষ্টিকোণ থেকে এই মন্তব্য হয়তো তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু ইতিহাসের দিক থেকে বিচার করলে বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ, তামিলভূমিরই এক প্রাচীন শাসক, নন্দিবর্মণের জারি করা অষ্টম শতকের বিখ্যাত “কাশাকুড়ি তাম্রলিপি”-এ রামের দুটি সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। ৭৫২-৫৩ খ্রিস্টাব্দের এই শিলালিপিতে নরসিংহবর্মণের বীরত্বকে রামের লঙ্কাবিজয়ের চেয়েও অধিক গৌরবময় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার নন্দিবর্মণকে ধনুর্বিদ্যায় রামের সদৃশ বলা হয়েছে। অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে রাম তখন কেবল ধর্মীয় চরিত্র নন, বরং আদর্শ বীরপুরুষ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত।
তবে রাম এর উপস্থিতি শুধু মধ্যযুগীয় শিলালিপিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তামিল সাহিত্যের প্রাচীনতম স্তর, অর্থাৎ সংগম সাহিত্যের মধ্যেও রামায়ণের কাহিনির ছায়া স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। Puranānūru (পুরানানূড়ু)-র এক পদ্যে বর্ণিত হয়েছে, রাবণ যখন সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সীতা তাঁর অলংকারগুলি নীচে ফেলে দিয়েছিলেন, যাতে রাম পরে সেই সূত্র ধরে তাঁকে খুঁজে পেতে পারেন। এই সাহিত্যিক মোটিফটিই খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় বা প্রথম শতকের এক টেরাকোটা শিল্পে চিত্ররূপে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে বোঝা যায়, রামকাহিনি কেবল মৌখিক ঐতিহ্য নয়; তা বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত অঙ্গ হয়ে ছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। ইতিহাসের বিচার কখনও কেবল ধর্মবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে হয় না, আবার কেবল সংশয়বাদ দিয়েও অতীতকে ব্যাখ্যা করা যায় না। ঐতিহাসিক অনুসন্ধান সবসময় বহুমাত্রিক। সাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব, লোকস্মৃতি, শিল্পকলা, শিলালিপি এবং ভৌগোলিক প্রমাণ একত্রে বিচার করেই অতীতের রূপরেখা নির্মিত হয়। রামের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উপমহাদেশে যে বিপুল সাহিত্য, শিল্প এবং লোকবিশ্বাস গড়ে উঠেছে, তা নিছক এক কল্পকাহিনির ফল কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়।
রাম এর জীবনকাহিনির মূল উৎস অবশ্যই বাল্মীকির রামায়ণ। যদিও এই গ্রন্থের রচনাকাল নিয়ে পণ্ডিতমহলে মতভেদ রয়েছে, তবুও অধিকাংশ গবেষকের মতে এর লিখিত রূপের সূচনা সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর দিকে। এর আগে হয়তো এটি মৌখিক গাথা বা গীতিকাব্যের আকারে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে যে পাঠ আমাদের হাতে রয়েছে, তাতে প্রায় ২৪,০০০ শ্লোক এবং সাতটি কাণ্ড রয়েছে। এগুলি হল বাল, অযোধ্যা, অরণ্য, কিষ্কিন্ধ্যা, সুন্দর, যুদ্ধ এবং উত্তরকাণ্ড। অনেক গবেষকের ধারণা, বালকাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ড পরবর্তীকালে সংযোজিত। মূল কাহিনি সম্ভবত পাঁচটি কাণ্ড নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সম্পূর্ণ পাঠটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যেই চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
রামায়ণের কাহিনি ভারতীয় চেতনায় এত গভীরভাবে প্রোথিত যে তার সংক্ষিপ্ত পুনরুল্লেখও আবেগের জন্ম দেয়। অযোধ্যার কোশলরাজ দশরথের তিন স্ত্রী ছিলেন কৌশল্যা, সুমিত্রা ও কৈকেয়ী। কৌশল্যার পুত্র রাম, সুমিত্রার পুত্র লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন এবং কৈকেয়ীর পুত্র ভরত। বৃদ্ধ দশরথ রামকে যুবরাজ করতে চাইলে কৈকেয়ী পূর্বপ্রাপ্ত দুই বর দাবি করে বসেন। তিনি চান ভরত সিংহাসনে বসুক এবং রাম চৌদ্দ বছরের বনবাসে যাক। পিতৃবাক্য রক্ষার জন্য রাম নির্বিকারভাবে বনবাস গ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গে যান স্ত্রী সীতা এবং অনুগত ভ্রাতা লক্ষ্মণ।
অযোধ্যা থেকে দক্ষিণাভিমুখে তাঁদের যাত্রাপথ ভারতীয় ভূগোলের সঙ্গে এক আশ্চর্য সেতুবন্ধন রচনা করেছে। শৃঙ্গবেরপুরে গঙ্গা অতিক্রম, ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে অবস্থান, তারপর চিত্রকূটে দীর্ঘবাস। চিত্রকূটেই ভরত এসে রামকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাম প্রত্যাখ্যান করে নিজের পাদুকা ভরতের হাতে তুলে দেন। এই পাদুকাই পরে অযোধ্যার প্রতীকী শাসক হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে তাঁরা পৌঁছান পঞ্চবটীতে। সেখানেই রাবণের দ্বারা সীতাহরণ ঘটে। তারপর শুরু হয় রামের অনন্ত অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধানের পথেই তাঁর সাক্ষাৎ হয় হনুমান ও সুগ্রীবের সঙ্গে। ভারতীয় সাহিত্যে বন্ধুত্ব, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের যে মহিমা, তার সর্বোৎকৃষ্ট প্রতীক সম্ভবত হনুমান। সীতার সন্ধানে সমুদ্রলঙ্ঘন, অশোকবনে তাঁর উপস্থিতি, লঙ্কাদহন—সবই পরবর্তীকালে ভারতীয় কল্পনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
লঙ্কা অভিযানের প্রসঙ্গেই আসে সেই বহুল আলোচিত সেতুর কথা। রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী নল ও নীলের নেতৃত্বে বানরসেনা সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণ করে। আধুনিক উপগ্রহচিত্রে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যবর্তী অগভীর প্রবালময় অংশটি বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ একে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন বলেন, কেউ বা রামায়ণীয় স্মৃতির বাস্তব নিদর্শন হিসেবে দেখেন। ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও এটুকু অস্বীকার করা যায় না যে ভারতীয় জনস্মৃতিতে এই অঞ্চল হাজার বছর ধরে “রামসেতু” নামেই পরিচিত।
রামায়ণের জনপ্রিয়তা কেবল সংস্কৃতভাষী সমাজে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটি ভাষাতেই রামকাহিনি নতুনভাবে রচিত হয়েছে। তামিল কবি কাম্বনের কাম্ব রামায়ণম, বাংলা ভাষায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ, উত্তর ভারতে তুলসীদাসের রামচরিতমানস, অসমে মাধব কন্দলীর রচনা, মহারাষ্ট্রে একনাথের ব্যাখ্যা—সব মিলিয়ে রামকাহিনি ভারতীয় বহুভাষিক সংস্কৃতির এক অভিন্ন বন্ধনে পরিণত হয়। প্রত্যেক ভাষা, অঞ্চল ও যুগ নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী রামকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে।
অবাক করার বিষয় হল, রামের কাহিনি ভারতবর্ষের সীমানা ছাড়িয়েও বিস্তৃত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল, এমনকি ফিলিপিন্স পর্যন্ত রামায়ণের প্রভাব পৌঁছে যায়। থাইল্যান্ডের রামাকিয়েন, কম্বোডিয়ার রিয়ামকের, জাভার কাকাবিন রামায়ণ—এসব কেবল অনুবাদ নয়; স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে নতুন শিল্পরূপ লাভ করেছে। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন্দিরভাস্কর্য ও নৃত্যনাট্যে রামায়ণের দৃশ্যাবলি আজও জীবন্ত।
রাম এর ঐতিহাসিকতা প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্বের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। “Archaeology of the Rāmāyaṇa Sites” প্রকল্পের অধীনে অযোধ্যা, শৃঙ্গবেরপুর, চিত্রকূট, নন্দীগ্রাম ও ভরদ্বাজ আশ্রমসহ কয়েকটি স্থানে খননকার্য পরিচালিত হয়েছিল। যদিও প্রত্নতত্ত্ব কোনও ব্যক্তির অস্তিত্ব সরাসরি প্রমাণ করতে পারে না, তবুও এটি সংশ্লিষ্ট যুগের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা ও বসতির ধারাবাহিকতা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেয়। এইসব স্থানে প্রাপ্ত বস্তু, মৃৎপাত্র, স্থাপত্যাবশেষ ও নগরায়ণের নিদর্শন থেকে বোঝা যায় যে রামায়ণে উল্লিখিত বহু স্থানের বাস্তব ভৌগোলিক ভিত্তি ছিল।
ভারতীয় শিল্পকলাতেও রামের উপস্থিতি বিস্ময়কর। প্রাচীন টেরাকোটা ফলক, গুপ্তযুগের মন্দিরভাস্কর্য, মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপিচিত্র, রাজস্থানি ও পাহাড়ি মিনিয়েচার, দক্ষিণ ভারতের ব্রোঞ্জমূর্তি—সবখানেই রামায়ণের দৃশ্যাবলি অঙ্কিত হয়েছে। অজন্তা থেকে শুরু করে খাজুরাহো, ভুবনেশ্বর থেকে তাঞ্জোর—ভারতের শিল্পঐতিহ্যের প্রায় সর্বত্র রামের স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে। শুধু ভারতেই নয়, অংকোর ওয়াটের প্রাচীরেও রামায়ণের যুদ্ধদৃশ্য খোদাই করা আছে।
এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। কোনও কাহিনি যদি নিছকই কাল্পনিক হত, তাহলে কি তা দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এত বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মাণ করতে পারত? অবশ্যই পৌরাণিক কাহিনিও গভীর সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু রামের ক্ষেত্রে আমরা যে ধারাবাহিক সাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, শিল্পগত এবং লোকস্মৃতির উপস্থিতি দেখি, তা তাঁকে নিছক “মিথ” বলে উড়িয়ে দেওয়াকে জটিল করে তোলে।
অবশ্য ইতিহাসের কাজ বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং উপলব্ধ তথ্যকে বিচার করা। রাম হয়তো আধুনিক অর্থে নথিবদ্ধ ঐতিহাসিক চরিত্র নন, যেমন সম্রাট অশোক বা আকবর। কিন্তু তাই বলে তাঁকে সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলাও সহজ নয়। বরং তিনি ভারতীয় সভ্যতার সেই সব মহামানবীয় প্রতীকের অন্যতম, যাঁদের জীবন ইতিহাস, কাব্য, দর্শন ও লোকবিশ্বাসের মধ্যবর্তী এক বিস্ময়কর অঞ্চলে অবস্থান করে।
রামকে বোঝার জন্য তাই শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, প্রয়োজন ইতিহাসচেতনা, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা এবং বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান। কারণ রাম কেবল এক ধর্মীয় চরিত্র নন। তিনি ভারতীয় কল্পনা, নৈতিকতা, সাহিত্য এবং শিল্পকলার এক বহমান প্রতীক। তাঁর কাহিনি ভারতীয় সভ্যতার মানসপটে এমনভাবে অঙ্কিত যে তাকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ইতিহাস হয়তো তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনার নির্ভুল প্রমাণ দিতে পারবে না, কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির দীর্ঘ স্মৃতি তাঁকে বারবার জীবন্ত করে তুলেছে। সেই কারণেই রামায়ণ আজও কেবল একটি প্রাচীন কাব্য নয়; এটি ভারতীয় সভ্যতার আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে রামায়ণচর্চা
পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে রামায়ণচর্চা এবং ব্রাহ্মণ্য বহির্ভূত সাহিত্যে রামকাহিনির উপস্থিতি
ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে এমন খুব কম কাহিনি আছে, যা সহস্রাব্দ অতিক্রম করেও মানুষের কল্পনা, সাহিত্য, শিল্প এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে সমানভাবে আলোড়িত করে চলেছে। রামায়ণ সেই বিরল ব্যতিক্রমগুলির অন্যতম। এটি কেবল একটি মহাকাব্য নয়; বরং ভারতীয় সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক দীর্ঘস্থায়ী স্রোতধারা। উত্তর ভারতের অযোধ্যা থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের তামিলভূমি, পূর্ব ভারতের বাংলা থেকে পশ্চিম ভারতের গুজরাট, এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরেও রামের কাহিনি অসংখ্য ভাষা, শিল্পমাধ্যম ও লোকঐতিহ্যের মধ্যে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতা নিছক ধর্মবিশ্বাসের ফল নয়; বরং এটি ভারতীয় সমাজের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সাক্ষ্য।
রাম এর কাহিনির প্রাচীনতা বোঝার জন্য প্রথমেই যে বিষয়টি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হল প্রাচীন শিলালিপি ও প্রত্ননিদর্শনে তাঁর উপস্থিতি। অষ্টম শতকের ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসন-এ রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। একই শতকের পাহাড়পুর মন্দিরের ভাস্কর্যেও রামায়ণচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। অর্থাৎ, পালযুগীয় বাংলাতেও রামকাহিনি সুপরিচিত ছিল। এই তথ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে রামায়ণের প্রবেশ কোনও মধ্যযুগীয় আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং বহু শতাব্দী ধরে এর প্রভাব গড়ে উঠেছিল।
বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ রামায়ণ হিসেবে সাধারণভাবে কৃত্তিবাসী রামায়ণকেই ধরা হয়। অধিকাংশ গবেষকের মতে, কবি কৃত্তিবাসের জন্ম ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে। যদিও তিনি বাল্মীকির রামায়ণকে মূল অবলম্বন করেছিলেন, তবুও তাঁর রচনায় বহু নতুন উপাদান সংযোজিত হয়। এই সংযোজনই কৃত্তিবাসী রামায়ণকে নিছক অনুবাদ থেকে পৃথক করেছে। কৃত্তিবাস রামকে বাংলার লোকজ আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, সুরেলা এবং গ্রামীণ সমাজের উপযোগী। ফলে রামায়ণ কেবল রাজসভা বা পণ্ডিতমহলের কাব্য হয়ে থাকেনি; তা পৌঁছে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের উঠোনে, পাঠসভায়, গৃহস্থের সন্ধ্যাপাঠে।
আজও বাংলার বহু পরিবারে কৃত্তিবাসী রামায়ণ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পাঠ করা হয়। বিশেষত গ্রামবাংলায় রামায়ণপাঠ একসময় সামাজিক আচার হিসেবেই বিবেচিত হত। সন্ধ্যার পর প্রদীপের আলোয় বয়স্করা রামায়ণ পাঠ করতেন, আর ছোটরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। বাংলা সমাজে রামের নৈতিক আদর্শ, সীতার ত্যাগ, লক্ষ্মণের ভ্রাতৃভক্তি এবং হনুমানের আনুগত্য এইভাবেই লোকস্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলা ভাষায় রামায়ণের আরও বহু রূপ রচিত হয়েছে। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে কৈলাস বসুর অদ্ভুত রামায়ণ এবং সপ্তদশ শতকে অদ্ভুতাচার্যের একই নামে রচিত আরেকটি কাব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এইসব রচনায় কল্পনা, অলৌকিকতা এবং ভক্তিভাব আরও প্রবল হয়ে ওঠে। তবে বাংলা রামায়ণচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য নাম চন্দ্রাবতী। তিনি ছিলেন সপ্তদশ শতকের এক কবি নারী, যিনি নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণকে পুনর্লিখন করেছিলেন। তাঁর রচনায় রামের বীরত্বের তুলনায় সীতার বেদনা ও নিঃসঙ্গতা অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলার লোকগাথা ও পালাগানের সুরে তিনি রামকাহিনিকে এমন মানবিক আবেগে রাঙিয়েছিলেন, যা আজও সাহিত্যসমালোচকদের বিস্মিত করে।
গুজরাটেও রামায়ণের এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেখানে রামকাহিনির প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে সাধারণত ষষ্ঠ শতকের ভট্টিকাব্য-এর উল্লেখ করা হয়। এই কাব্যের রচয়িতা ভর্তৃহরি বলে মনে করা হয়। তিনি রামায়ণের ঘটনাবলিকে ব্যবহার করেছিলেন সংস্কৃত ব্যাকরণের উদাহরণ হিসেবে। সাহিত্য ও ব্যাকরণকে এমন অভিনব পদ্ধতিতে একত্রিত করার দৃষ্টান্ত ভারতীয় সাহিত্যে বিরল। এখানেই বোঝা যায়, রামায়ণ কেবল ধর্মীয় পাঠ ছিল না; এটি জ্ঞানচর্চারও একটি প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
ত্রয়োদশ শতকে সুবট রচিত দূতাঙ্গদ নাটকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে অঙ্গদের দূতরূপে লঙ্কায় যাওয়ার পর্ব নাট্যরূপ পেয়েছিল। বসন্তোৎসব উপলক্ষে এই নাটক মঞ্চস্থ হত। একই শতকের সোমেশ্বর রচিত উল্লাঘরাঘব বাল্মীকির কাহিনিক্রম অনুসরণ করেই রচিত হয়েছিল। পরে চতুর্দশ শতকে অসাইতের রামারলীলা-না-পদো গুজরাটি ভাষায় রামকাহিনিকে জনপ্রিয় করে তোলে। এর পরবর্তী যুগে ভালনার রামবিবাহ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। ধীরে ধীরে গুজরাটি ভাষায় রামায়ণভিত্তিক রচনার সংখ্যা পঞ্চাশেরও বেশি হয়ে ওঠে। উনিশ শতকে গিরধরদাসের রামায়ণ বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে রামের সম্পর্ক আরও প্রত্যক্ষ। কারণ ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী রামের জন্ম অযোধ্যায়। ফলে উত্তরপ্রদেশে রামকাহিনির উপস্থিতি কেবল সাহিত্যিক নয়; তা গভীর সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা। এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি হিন্দু পরিবারে তুলসীদাসের রামচরিতমানস শ্রদ্ধার সঙ্গে সংরক্ষিত থাকে। অবিরাম পাঠ বা “অখণ্ড পাঠ” উত্তর ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার। কখনও কখনও একটানা এক দিনেরও বেশি সময় ধরে এই পাঠ চলতে থাকে।
তুলসীদাস রামকাহিনিকে সংস্কৃত থেকে লোকভাষা অবধিতে এনে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তাঁর ভাষা ছিল অবধি, যা সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য। বাল্মীকির তুলনায় তুলসীদাসের রাম আরও ভক্তিময়, আরও দেবতুল্য। মধ্যযুগীয় উত্তর ভারতের সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে তিনি রামকে নৈতিক আদর্শ ও ধর্মীয় আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
মুঘল সম্রাট আকবরের উদার নীতিও এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয়। হিন্দুধর্মের প্রতি তাঁর আগ্রহের ফলেই তিনি বদাউনিকে রামায়ণ ফারসিতে অনুবাদের নির্দেশ দেন। বদাউনি লিখেছিলেন, “হিজরি ৯৯৭ সালের জামাদাল আউয়াল মাসে আমি রামায়ণের অনুবাদ সমাপ্ত করি, যা সম্পন্ন করতে আমার চার বছর সময় লেগেছিল। আমি সমগ্র গ্রন্থটি দ্বিপদী ছন্দে রচনা করি এবং তা সম্রাটের নিকট পেশ করি।”
আকবরের উদারতার আরও এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন তাঁর জারি করা সোনা ও রুপোর মুদ্রা, যাতে রাম ও সীতার প্রতিকৃতি এবং “রাম-সিয়া” উৎকীর্ণ ছিল। এক মুসলিম সম্রাটের শাসনামলে এই ধরনের মুদ্রা প্রচলন ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উনিশ ও বিংশ শতকেও উত্তরপ্রদেশে রামায়ণচর্চা থেমে থাকেনি। রাধেশ্যামের রামায়ণ কিংবা মৈথিলীশরণ গুপ্তের সাকেত আধুনিক হিন্দি সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশেষত সাকেত-এ উর্মিলার চরিত্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, যা নারীচরিত্রের এক অভিনব সাহিত্যিক পুনর্মূল্যায়ন।
কর্ণাটকের রামায়ণচর্চাও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রাম ও লক্ষ্মণ সীতার সন্ধানে দক্ষিণে এসে কিষ্কিন্ধ্যায় পৌঁছেছিলেন বলে কাহিনিতে উল্লেখ আছে। এই অঞ্চল বর্তমান কর্ণাটকের তুঙ্গভদ্রা নদীর আশপাশে অবস্থিত বলে মনে করা হয়। নাগচন্দ্র তাঁর রামচন্দ্রচরিত-এ উল্লেখ করেছেন যে কিষ্কিন্ধ্যার অধিবাসীরা প্রকৃতপক্ষে বানর ছিল না; বরং এমন এক উপজাতি, যাদের পতাকায় বানরের প্রতীক ব্যবহৃত হত। এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পৌরাণিক কাহিনিকে নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।
কন্নড় ভাষায় রামকাহিনির প্রাচীনতম নিদর্শন সম্ভবত চাভুণ্ডরায় পুরাণ, যার রচনাকাল আনুমানিক ৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ। একাদশ শতকের নাগচন্দ্র রচিত পম্পা রামায়ণ কন্নড় সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। ষোড়শ শতকের শেষভাগে নারাহরির রামকথা বাল্মীকির রামায়ণের প্রায় সরাসরি রূপান্তর হওয়ায় তাঁকে “কুমার বাল্মীকি” বলা হত। উনিশ শতকে মুদ্দানা অদ্ভুত রামায়ণ, রামাশ্বমেধ এবং রামপট্টাভিষেক রচনা করেন। আজও কর্ণাটকে রামায়ণভিত্তিক লোকগাথা গাওয়া হয়।
তামিলনাড়ুর রামায়ণচর্চা আরও প্রাচীন। “কাশাকুড়ি তাম্রলিপি”-এ নন্দিবর্মণের ধনুর্বিদ্যাকে রামের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে নরসিংহবর্মণের লঙ্কাবিজয়কে রামের বীরত্বের চেয়েও গৌরবময় বলা হয়েছে। সংগম সাহিত্যের পুরানানূরু-তেও সীতার অলংকার ফেলে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে। এই সাহিত্যিক স্মৃতি যে নিছক কল্পনা ছিল না, তা দ্বিতীয় বা প্রথম শতক খ্রিস্টপূর্বাব্দের কৌশাম্বীর টেরাকোটা শিল্পেও প্রতিফলিত হয়েছে।
তামিল সাহিত্যে কাম্বনের নাম বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর কাম্ব রামায়ণম তামিল ভাষার এক অনবদ্য মহাকাব্য। কেউ তাঁকে নবম শতকের কবি বলেন, কেউ বা দ্বাদশ শতকের। কিন্তু কালনির্ধারণের বিতর্কের চেয়েও বড় হল তাঁর সাহিত্যিক মাহাত্ম্য। এস. মহারাজনের ভাষায়, “যে কবি সহস্রাধিক বছর ধরে মানুষের মনোযোগকে আবিষ্ট করে রেখেছেন, তাঁর মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কিছু রয়েছে যা কালোত্তীর্ণ।” (1972: 8)। কাম্বনের রামায়ণে ভাষার সঙ্গীতময়তা, উপমার ঐশ্বর্য এবং আবেগের গভীরতা এমন এক শিল্পরূপ সৃষ্টি করেছে, যা আজও পাঠককে মোহিত করে।
রামকাহিনির প্রাচীনতা কেবল ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যের মধ্যেও এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। বৌদ্ধ জাতককথার মধ্যে তিনটি জাতকে রামের কাহিনি পাওয়া যায়। এগুলি খুদ্দকনিকায়-এর অন্তর্গত এবং খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে দশরথ জাতক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রামের নাম “রামপণ্ডিত”, লক্ষ্মণের নাম “লক্ষ্মণকুমার” এবং ভরতের নাম “ভরতকুমার”। যদিও কাহিনির কিছু অংশ বাল্মীকির রামায়ণ থেকে ভিন্ন, তবুও এটি প্রমাণ করে যে রামের কাহিনি বৌদ্ধ ধর্মীয় জগৎেও সুপরিচিত ছিল।
এইসব তথ্য একত্রে বিচার করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রামায়ণ কোনও একক ধর্মীয় গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধ কাহিনি নয়। এটি ভারতীয় সভ্যতার এক বহুস্বরিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা ভাষা, অঞ্চল, ধর্ম ও যুগের সীমানা অতিক্রম করে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করেছে। বাংলার লোকগীতি থেকে তামিল মহাকাব্য, গুজরাটের ব্যাকরণকাব্য থেকে উত্তর ভারতের ভক্তিকাব্য, বৌদ্ধ জাতক থেকে কর্ণাটকের লোকগাথা—সবখানেই রাম এক নতুন রূপে উপস্থিত হয়েছেন। এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রাই প্রমাণ করে যে রাম কেবল পৌরাণিক চরিত্র নন; তিনি ভারতীয় মানসের এক গভীর ও স্থায়ী প্রতীক।
বৌদ্ধ, জৈন ও পারসিক সাহিত্যে রামকাহিনি এবং ভারতসীমার বাইরে রামের বিস্ময়কর যাত্রা
রামায়ণকে যদি কেবল একটি ধর্মীয় মহাকাব্য হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার প্রকৃত ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিস্তারকে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ রামের কাহিনি বহু শতাব্দী ধরে কেবল ব্রাহ্মণ্যধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা প্রবেশ করেছে বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক এমনকি দূর প্রাচ্যের সাহিত্যেও। এই বিস্তৃত উপস্থিতি আমাদের সামনে এক গভীর সত্য উন্মোচন করে। রাম কেবল কোনও একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাস্য নন; তিনি এশীয় সভ্যতার এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতীক।
বৌদ্ধ সাহিত্যে রামকাহিনির উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বৌদ্ধধর্মের আদর্শিক জগৎ ব্রাহ্মণ্যধর্ম থেকে বহু ক্ষেত্রে পৃথক হলেও, রামের জীবনকাহিনিকে তারা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। বরং জাতককাহিনির মধ্যে রামকে নতুন অর্থে পুনর্নির্মাণ করেছে। দশরথ জাতক-এ আমরা দেখি, বাল্মীকির রামায়ণের বহু উপাদান বজায় থাকলেও কাহিনির কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। এখানে ঘটনাস্থল অযোধ্যা নয়, বারাণসী। রামের নাম “রামপণ্ডিত”, লক্ষ্মণের নাম “লক্ষ্মণকুমার” এবং ভরতের নাম “ভরতকুমার”। এই পরিবর্তন নিছক নামান্তর নয়; বরং বৌদ্ধ নৈতিকতার আলোকে চরিত্রগুলিকে পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা।
জাতককথার এক অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যে দেখা যায়, বনবাসে থাকা রামপণ্ডিতের কাছে ভরতকুমার এসে তাঁদের পিতার মৃত্যুসংবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু রামপণ্ডিত আশ্চর্য ধীরতায় উত্তর দেন, “কোনো পরিমাণ বিলাপই মৃতকে পুনরায় জীবিত করতে পারে না; তাই জ্ঞানীরা কারও মৃত্যুর জন্য শোকবিহ্বল হন না….”
এই বাক্যে বৌদ্ধ দর্শনের অনিত্যতাবাদ ও সংযমবোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে রাম কেবল বীরপুরুষ নন; তিনি এক জ্ঞানী, যিনি শোককে অতিক্রম করে স্থিতপ্রজ্ঞ অবস্থায় পৌঁছেছেন। তবুও মূল কাহিনির কেন্দ্রীয় আবেগ অটুট থাকে। রাম নিজে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন না করে ভরতকে তাঁর পাদুকা দিয়ে রাজ্য শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এই প্রতীকী দৃশ্য ভারতীয় সংস্কৃতির বহু ধারায় সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
বৌদ্ধ সাহিত্যের আরও দুটি রামকেন্দ্রিক জাতকের কথা জানা যায়। একটি “দশ ঐশ্বর্যের অধিকারী রাজার নিদান” অন্যটি “অজ্ঞাতনামা রাজার জাতককথা”। দুর্ভাগ্যবশত মূল সংস্করণগুলি আজ আর পাওয়া যায় না, কিন্তু সেগুলির চীনা অনুবাদ সংরক্ষিত আছে। প্রথমটি ৪৭২ খ্রিস্টাব্দে “কৈকেয়” নামক এক অনুবাদক চীনা ভাষায় রূপান্তর করেন। দ্বিতীয়টি ২৫১ খ্রিস্টাব্দে সোগ্দীয় ভাষা বৌদ্ধ ভিক্ষু কান-সেং-হুই অনুবাদ করেছিলেন। এই তথ্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি প্রমাণ করে যে রামকাহিনি বৌদ্ধধর্মের মাধ্যমে ভারত থেকে বহু দূর পূর্ব এশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
চীনা রূপান্তরগুলিতে নানা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ‘অজ্ঞাতনামা রাজার জাতককথা’-এ রামকে এক “বোধিসত্ত্ব” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে বনবাসের কারণ কৈকেয়ীর বর নয়, বরং “তাঁর দুষ্ট কাকার সঙ্গে একটি বিরোধ”। আবার সীতাহরণের ঘটনাতেও পরিবর্তন এসেছে। রাক্ষসের বদলে এক নাগ ঋষির ছদ্মবেশে এসে বোধিসত্ত্বের স্ত্রীকে অপহরণ করে। তবুও মূল কাহিনির অন্তর্নিহিত কাঠামো রয়ে গেছে। বনবাস, দশরথের মৃত্যু, ভরতের অনুরোধ, রামের প্রত্যাখ্যান এবং অবশেষে বনবাস শেষে প্রত্যাবর্তন—সবই বজায় আছে। এই অভিযোজনগুলি দেখায় যে কাহিনি নতুন সংস্কৃতিতে প্রবেশ করার সময় স্থানীয় কল্পনা ও ধর্মীয় ভাবনার সঙ্গে মিশে নতুন রূপ গ্রহণ করেছিল।
জৈন সাহিত্যে রামায়ণের উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জৈন রামায়ণগুলি শুধু সংস্কৃতে নয়, প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং কন্নড় ভাষাতেও রচিত হয়েছিল। অনুয়োগদ্বার নামক দ্বিতীয় শতকের একটি জৈন ধর্মগ্রন্থে বহু রামায়ণভিত্তিক রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে রামের জীবনের প্রথম সুসংহত জৈন বর্ণনা হিসেবে সাধারণত বিমল সূরির পউমচরিয়ম-কেই ধরা হয়, যার রচনাকাল পঞ্চম শতক।
জৈন রামায়ণ বাল্মীকির কাহিনি থেকে বহু ক্ষেত্রে ভিন্ন। এখানে রাম অহিংস নায়কসুলভ চরিত্রে আবির্ভূত হন। জৈন ধর্মের নৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য অনেক যুদ্ধ বা সহিংসতার উপাদান নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বসুদেবহিন্দি নামক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জৈন রামায়ণও পঞ্চম শতকের। এরপর অপভ্রংশ ভাষায় স্বয়ম্ভূর রামায়ণ, দশম শতকের পুষ্পদন্তের মহাপুরাণ, একাদশ শতকের নাগচন্দ্রের পম্পা রামায়ণ এবং উনিশ শতকের চন্দ্রসাগর বর্ণীর জিন রামায়ণ এই ধারাকে দীর্ঘকাল জীবিত রেখেছিল।
জৈন ঐতিহ্যের একটি আকর্ষণীয় দিক হল বানর ও বিদ্যাধরদের ব্যাখ্যা। জৈন মতে, বিদ্যাধররা প্রকৃতপক্ষে মানুষ ছিল এবং তারা ঋষভদেবের পুত্র নমি ও বিনমির বংশধর। বানররাও বিদ্যাধরদেরই একটি শাখা, যারা নিজেদের পতাকায় বানরের প্রতীক ব্যবহার করত। এই ব্যাখ্যা পৌরাণিক উপাদানকে ঐতিহাসিক ও মানবিক রূপ দেওয়ার এক অভিনব প্রয়াস।
পারসিক সাহিত্যে রামায়ণের প্রবেশ ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদী চরিত্রকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। মুঘল সম্রাট আকবর রামের জীবনকাহিনিতে এতটাই আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে তিনি কাদির বাদায়ুনিকে ফারসিতে রামায়ণ অনুবাদের নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছিলেন, কাজটি চার বছরের মধ্যে শেষ করতে হবে। বদাউনি সেই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। আকবরের এই উদ্যোগ নিছক সাহিত্যরুচির প্রকাশ ছিল না; এটি ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠার এক প্রচেষ্টা।
জাহাঙ্গীরও তাঁর পিতার এই নীতি অনুসরণ করেন। তাঁর আমলে সা’দুল্লা মাসিহি পানিপতি ফারসি ভাষায় রামায়ণের এক চমৎকার অনুবাদ রচনা করেন। সংস্কৃত ভাষা শেখার জন্য তিনি বারো বছর বারাণসীতে অবস্থান করেছিলেন। তাঁর রচনায় সীতার পবিত্রতা নিয়ে একটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি রয়েছে, “এমনকি তাঁর বস্ত্রও তাঁর নগ্ন দেহকে দেখেনি; যেমন দেহের অন্তর্নিহিত আত্মাকে দেহ দেখতে পায় না।”
এই তুলনার মধ্যে পারসিক কাব্যরীতির সূক্ষ্মতা ও ভারতীয় ভাবধারার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। শুধু মুসলিম কবিরাই নন, বহু হিন্দু কবিও ফারসি ভাষায় রামায়ণ রচনা করেছিলেন। আমানত রায় লায়ালপুরী ও গিরধরদাস তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
রাম কাহিনির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত তার ভৌগোলিক বিস্তার। ভারতীয় উপমহাদেশের সীমানা অতিক্রম করে এই কাহিনি মঙ্গোলিয়া থেকে জাপান, কম্বোডিয়া থেকে ফিলিপিন্স পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এই সাংস্কৃতিক যাত্রা কোনও রাজনৈতিক সাম্রাজ্যের জোরে হয়নি; বরং সাহিত্য, ধর্মপ্রচার, বাণিজ্য এবং শিল্পকলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে।
শ্রীলঙ্কা তো রামায়ণের কাহিনির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে রামায়ণের সঙ্গে যুক্ত বহু স্থান আজও জনপ্রিয়। সপ্তম শতকের কবি কুমারদাসের জানকীহরণ শ্রীলঙ্কার সাহিত্যিক ঐতিহ্যে বিশেষ মর্যাদা পায়। একইসঙ্গে লোকমুখেও রামকাহিনির নানা সংস্করণ প্রচলিত রয়েছে।
তিব্বতে আবিষ্কৃত রামায়ণপাণ্ডুলিপিগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অরেল স্টাইন এবং পল পেলিও এই পাণ্ডুলিপিগুলি উদ্ধার করেছিলেন। বর্তমানে সেগুলি প্যারিস-এর ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারএবং লণ্ডন-এর India Office Library-তে সংরক্ষিত আছে। এগুলি সপ্তম থেকে নবম শতকের মধ্যে রচিত বলে মনে করা হয়। তিব্বতি সংস্করণে দশরথের তিন স্ত্রীর বদলে দুই স্ত্রী এবং চার পুত্রের বদলে দুই পুত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। রামের নাম “রামনা” এবং লক্ষ্মণের নাম “লাকসানে”। এই পরিবর্তনগুলি স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবের ফল।
চীনে রামকাহিনি পৌঁছায় বৌদ্ধধর্মের মাধ্যমে। সেখানকার জাতকগুলিতে ভারতীয় মূল কাহিনির সঙ্গে বহু পরিবর্তন এলেও রামের নৈতিক আদর্শ বজায় থাকে। জাপানেও “নামহীন জাতককাহিনি” প্রবেশ করে এবং দ্বাদশ শতকের “হোবুৎসুশূ”-তে স্থান পায়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রামায়ণের প্রভাব ছিল সবচেয়ে গভীর। থাইল্যান্ডের এক প্রাচীন রাজধানীর নামই ছিল “অযোধ্যা”। ১৩৫০ থেকে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহু রাজবংশ সেখান থেকে শাসন করেছিল। ১২৯২ খ্রিস্টাব্দের রাজা রাম খামহেং-এর শিলালিপিতেও রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। আজও থাইল্যান্ডের ছায়ানাট্যে রামকাহিনি জীবন্ত।
মালয়েশিয়া আজ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও সেখানে “হিকায়াত সেরি রাম” অত্যন্ত জনপ্রিয়। ‘সেরি’ শব্দটি সংস্কৃত “শ্রী”-র সমতুল্য। পুতুলনাচ ও গীতিকাব্যের মাধ্যমে রামকাহিনি এখনও লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
কম্বোডিয়ার অংকোর ওয়াট মন্দিরে রামায়ণের অসাধারণ ভাস্কর্য রয়েছে। সাহিত্যিক দিক থেকে রামকের্তি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ইন্দোনেশিয়ার জাভায় রামায়ণ কাকাবিন রামায়ণের প্রাচীনতম সংস্করণগুলির একটি। নবম শতকের প্রাম্বানান মন্দিরে রামায়ণের দৃশ্যাবলি এমন শৈল্পিক মহিমায় খোদাই করা হয়েছে, যা দর্শককে আজও বিস্মিত করে।
ফিলিপিন্সেও রামকাহিনির উপস্থিতি সত্যিই আশ্চর্যজনক। মহারাদিয়া লাওয়ানা নামক এক সংক্ষিপ্ত রামায়ণে রাবণকে এক মহৎ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। “মহারাদিয়া” শব্দটি সংস্কৃত “মহারাজ”-এর সমতুল্য।
এই বিপুল বিস্তারকে সামনে রেখে যখন আমরা প্রথম প্রশ্নটিতে ফিরে যাই—রাম কি বাস্তব চরিত্র, না নিছক পৌরাণিক কল্পনা—তখন বিষয়টি নতুন আলোয় ধরা দেয়। সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ ধরে, হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে, অসংখ্য ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে যদি একটি চরিত্র বেঁচে থাকে, তবে তাকে নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ নয়। এই প্রসঙ্গে পুরনো সেই কথাটিই মনে পড়ে, “কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য প্রতারিত করা যায়, কিছু মানুষকে সারাজীবনের জন্যও বিভ্রান্ত রাখা যায়, কিন্তু সকল মানুষকে চিরকাল প্রতারিত করে রাখা যায় না।”
ধর্মনিরপেক্ষ গ্রন্থে রামপ্রসঙ্গ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে রামায়ণ-স্থানের তাৎপর্য
রামের জীবনকাহিনি সাধারণত ধর্মীয় সাহিত্য, পুরাণ, মহাকাব্য, ভক্তিকাব্য বা লোকঐতিহ্যের মধ্যে আলোচিত হয়। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হল, প্রাচীন ভারতের কিছু সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ গ্রন্থেও রামায়ণ-প্রসঙ্গের পরোক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধরনের উল্লেখ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এগুলি কোনও ভক্তিভাবনাপ্রসূত ধর্মীয় রচনা নয়; বরং রাষ্ট্রনীতি, প্রশাসন, অর্থব্যবস্থা ও শাসনকৌশল নিয়ে রচিত গ্রন্থ। এই প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। এটি ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার এক অমূল্য দলিল, যেখানে রাজনীতি, গুপ্তচরব্যবস্থা, করনীতি, প্রশাসন, সামরিক সংগঠন, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের নানা দিক বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। ধর্মীয় আখ্যান বা পুরাণকথা এর মূল বিষয় নয়।
কৌটিল্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হল, তিনি নন্দবংশের শেষ রাজাকে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে বসানোর ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেই সূত্রে অর্থশাস্ত্র-এর রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষভাগে স্থাপন করা যায়। এই কালনির্ধারণ গ্রহণ করলে গ্রন্থটি বাল্মীকির লিখিত রামায়ণ-এর প্রাথমিক রূপেরও সামান্য পূর্ববর্তী বলে বিবেচিত হতে পারে। ফলে অর্থশাস্ত্র-এ রাবণ ও সীতাহরণের ইঙ্গিত নিছক সাহিত্যিক অলঙ্কার নয়; বরং তা প্রমাণ করে যে কৌটিল্যের যুগে রামায়ণ-সম্পর্কিত কাহিনি ইতিমধ্যেই সমাজে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ছিল।
অর্থশাস্ত্র পনেরোটি অধিকরণে বিভক্ত। প্রতিটি অধিকরণের অন্তর্গত রয়েছে একাধিক অধ্যায়। প্রথম অধিকরণের নাম বিনয়াধিকরণ, যেখানে শাসকের শৃঙ্খলা, চরিত্রগঠন ও আত্মসংযমের আলোচনা করা হয়েছে। এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের শিরোনাম ইন্দ্রিয়জয়, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের উপর জয়লাভ। এই অধ্যায়ের উপশিরোনাম হল “ছয় শত্রুর সমষ্টিকে দূরীকরণ”। কৌটিল্য এখানে রাজাকে ছয়টি প্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকার উপদেশ দেন। এগুলি হল কাম, ক্রোধ, লোভ, মান, মদ ও হর্ষ। তাঁর মতে, রাজা যদি এই ছয় প্রবৃত্তির দাস হয়ে পড়ে, তবে তার ব্যক্তিজীবন, রাজ্যশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতি সবই বিপন্ন হয়।
এই নীতিবাক্যকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কৌটিল্য প্রাচীন রাজা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি প্রথমে দাণ্ডক্য নামে পরিচিত ভোজের কথা উল্লেখ করেন, যিনি এক ব্রাহ্মণকন্যার প্রতি লালসাপ্রসূত আচরণের কারণে নিজের রাজ্য ও আত্মীয়পরিজনসহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হন। এরপর তিনি আরও কিছু উদাহরণ দেন। সেই সূত্রেই আসে রাবণ ও দুর্যোধনের প্রসঙ্গ। কৌটিল্যের বক্তব্য, “(সে) অহংকারে উন্মত্ত হয়ে পরস্ত্রীদের অপহরণ করত; আর দুর্যোধন রাজ্যের অংশও (দিতে অস্বীকার করেছিল)….”
ইংরেজি অনুবাদে এর অর্থ দাঁড়ায়, “অহংকারের বশবর্তী হয়ে রাবণ যেমন অপরের স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তেমনই দুর্যোধনও তার রাজ্যের একটি অংশ ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক ছিল।”
অর্থাৎ, অহংকারের বশে রাবণ পরস্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছিলেন এবং দুর্যোধন নিজের রাজ্যের সামান্য অংশও ছাড়তে রাজি হননি। কৌটিল্যের মতে, এই দুই চরিত্রের পতনের মূল কারণ ছিল অহংকার ও অধিকারবোধের অন্ধতা। দুর্যোধনের উদাহরণ যে মহাভারত-এর কাহিনির দিকে ইঙ্গিত করে, তা স্পষ্ট। একইভাবে রাবণের প্রসঙ্গও নিঃসন্দেহে রামায়ণ-এর সীতাহরণ ঘটনার দিকে নির্দেশ করে। “পরদারা” অর্থাৎ অন্যের স্ত্রী, যাকে রাবণ ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছিলেন, তিনি সীতা ছাড়া আর কেউ নন।
এই উল্লেখের তাৎপর্য এখানেই। কৌটিল্য কোনও ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। তিনি কোনও ভক্তিমূলক রামকথা বলছেন না। তিনি রাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গে রাবণকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন, যেন তাঁর পাঠক বা শ্রোতারা এই ঘটনাটি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত। অর্থাৎ রাবণ, সীতা ও রামায়ণ-কাহিনি তখন রাজনৈতিক নৈতিকতার উদাহরণ হিসেবেও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। যদি কৌটিল্যের কাছে রাবণ অতীতের এক সুপরিচিত চরিত্র হন, তবে রামের ঐতিহাসিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন আরও গভীর হয়ে ওঠে। কারণ রাবণ ও সীতাহরণের কাহিনি রামের অনুপস্থিতিতে অর্থহীন। রাবণ যদি কাহিনির কেন্দ্রে থাকেন, তবে রামের উপস্থিতিও সেই ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এবার প্রত্নতত্ত্বের প্রশ্নে আসা যাক। সাহিত্যের সঙ্গে প্রত্নতত্ত্বের সম্পর্ক সবসময় সরল নয়। কোনও মহাকাব্যের প্রতিটি ঘটনা মাটি খুঁড়ে প্রমাণ করা যায় না। আবার প্রত্নতত্ত্ব কখনও একক ব্যক্তির সমস্ত জীবনীও উদ্ধার করতে পারে না। কিন্তু কোনও কাহিনির ভৌগোলিক পরিসর, জনবসতির ধারাবাহিকতা, বস্তুসংস্কৃতি, নগরজীবন, প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিস্থিতি যাচাই করার ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্বের গুরুত্ব অপরিসীম।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সময় প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে একটি বড় শূন্যতা ছিল। একদিকে ছিল হরপ্পা সভ্যতার পরিণত পর্যায়, যার সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ২০০০ অব্দ। অন্যদিকে ছিল ষোড়শ মহাজনপদের যুগ, যা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এই দুই পর্যায়ের মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময় সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান ছিল অত্যন্ত সীমিত। তাই একে অনেকেই “অন্ধকার যুগ” বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই যুগ অন্ধকার ছিল না; অন্ধকার ছিল আমাদের জ্ঞানের পরিসর।
ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে তখন এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। উত্তর ভারতের গঙ্গা-যমুনা উপত্যকায় প্রাচীন বসতি, মৃৎপাত্র, ধাতুপ্রযুক্তি, নগরজীবন এবং মহাকাব্যীয় স্মৃতির সম্পর্ক অনুসন্ধান করা প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল। Archaeological Survey of India-র Excavations Branch-এর দায়িত্বে থাকাকালীন লেখক পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বহু প্রাচীন স্থানে অনুসন্ধান শুরু করেন। এইসব স্থানে এক বিশেষ ধরনের মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। এগুলি ধূসর রঙের, উপরিভাগে কালো রঞ্জকে জ্যামিতিক, সরলরেখা ও বক্ররেখার নকশা আঁকা। এই মৃৎপাত্রের নাম দেওয়া হয় Painted Grey Ware বা PGW।
প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত ঢিবির উল্লম্ব স্তরে দেখা যায়, এই Painted Grey Ware সাধারণত নিম্নস্তরে পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ বা পঞ্চম শতকের পরিচিত উপকরণের অনেক নীচে। ১৯৫০ সালে লেখক “উচ্চ গাঙ্গেয় অববাহিকার চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতি : অন্ধকার যুগের সমস্যাবলির প্রতি একটি অনুসন্ধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে তিনি দেখাতে চান যে তথাকথিত অন্ধকার যুগ আসলে একটি সুনির্দিষ্ট বস্তুসংস্কৃতির যুগ, যার প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন পাওয়া সম্ভব।
এই মৃৎপাত্রের সঙ্গে বহু মহাভারত-সম্পর্কিত স্থানের যোগ পাওয়ায় হস্তিনাপুরে খননকার্য পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হস্তিনাপুর কৌরবদের রাজধানী হিসেবে সুপরিচিত। উত্তরপ্রদেশের মীরাট জেলার গঙ্গার ডান তীরে অবস্থিত এই বৃহৎ ঢিবি খননের পর দেখা যায়, Painted Grey Ware সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য বসতি গঙ্গার প্রবল বন্যায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পাশের নদীখাতের প্রায় পনেরো মিটার গভীর বোরহোলেও ধুয়ে যাওয়া বসতির উপকরণ, এমনকি PGW-র টুকরো পাওয়া যায়। এই প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের সঙ্গে সাহিত্যিক সূত্রের মিল বিস্ময়কর।
প্রাচীন পাঠে বলা হয়েছে, “যখন নাগসাহ্বয় নামক সেই নগরী গঙ্গার দ্বারা ভেসে যাবে, তখন নীচক্ষু সেই নগর ত্যাগ করে কৌশাম্বীতে গিয়ে বসবাস করবে।”
অর্থাৎ, গঙ্গার জলে হস্তিনাপুর ধুয়ে গেলে তৎকালীন শাসক নিচক্ষু সেই নগর ত্যাগ করে কৌশাম্বীতে রাজধানী স্থাপন করবেন। প্রত্নতত্ত্বেও দেখা গেল, কৌশাম্বীর নিম্নতম স্তরে সেই ধরনের বস্তুসংস্কৃতির উপস্থিতি রয়েছে, যা হস্তিনাপুরে বন্যা-ধ্বংসের সময়কার সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে যায়। এই মিল সাহিত্য ও প্রত্নতত্ত্বের পারস্পরিক সংলাপকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
পাঠসূত্রে আরও জানা যায়, নিচক্ষু থেকে পঁচিশতম শাসক ছিলেন উদয়ন। উদয়ন বুদ্ধের সমসাময়িক বলে পরিচিত। বুদ্ধের প্রচলিত সময়কাল ৫৬৫ থেকে ৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। সে অনুযায়ী উদয়ন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের কাছাকাছি রাজত্ব করেছিলেন বলে ধরে নেওয়া যায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় রাজবংশের পরিচিত তথ্য থেকে প্রতি শাসকের গড় রাজত্বকাল প্রায় ১৪ বছর ধরে হিসাব করলে নিচক্ষুর সময় দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮৫০ অব্দ। আবার একই সূত্র অনুযায়ী নিচক্ষু ছিলেন মহাভারত যুদ্ধের পর হস্তিনাপুরের পঞ্চম শাসক। অতএব মহাভারত যুদ্ধকে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দশম শতকের দিকে স্থাপন করার একটি যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এখানে সতর্কতা জরুরি। এর অর্থ এই নয় যে মহাভারত-এর প্রতিটি ঘটনা প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মহাকাব্য সর্বদাই কল্পনা, স্মৃতি, ইতিহাস ও নৈতিক কাহিনির মিশ্রণ। মহাভারত একটি প্রবন্ধকাব্য, যেখানে কবির কল্পনার স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু তবু সাহিত্যের কিছু কেন্দ্রীয় স্মৃতি ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের মিল ইতিহাসচর্চায় অমূল্য।
এই পটভূমিই রামায়ণ-স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়। হস্তিনাপুর খননের অভিজ্ঞতা লেখককে উৎসাহিত করে “রামায়ণ-সম্পর্কিত স্থানসমূহের প্রত্নতত্ত্ব” প্রকল্প গ্রহণ করতে। “ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ”-তে কর্মরত অবস্থায় প্রকল্পটি পরিকল্পিত হলেও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে তখন তা বাস্তবায়িত করা যায়নি। ১৯৭২ সালে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণের পর প্রথমে গোয়ালিয়র-এর জিওয়াজি বিশ্ববিদ্যালয়তে এবং পরে শিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিতে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে এই কাজ শুরু হয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের কাজ চলে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের প্রত্নখনন বিভাগ এই কাজে সহায়তা করে। অধিকাংশ সময় এই শাখার নেতৃত্বে ছিলেন শ্রী কে. এন. দীক্ষিত।
এই প্রকল্পে পাঁচটি রামায়ণ-সম্পর্কিত স্থান অনুসন্ধানের জন্য নির্বাচিত হয়। প্রথমত, অযোধ্যা, যা কোশলরাজ্যের রাজধানী এবং রামের জন্মস্থান হিসেবে ঐতিহ্যে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, শৃঙ্গবেরপুর, যেখানে বনবাসের প্রথম পর্যায়ে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ গঙ্গা অতিক্রম করেছিলেন। তৃতীয়ত, ভরদ্বাজ আশ্রম, যেখানে তাঁরা ঋষি ভরদ্বাজকে প্রণাম করে একরাত্রি অবস্থান করেছিলেন। চতুর্থত, চিত্রকূট, যেখানে তাঁরা দীর্ঘকাল অবস্থান করেন। পঞ্চমত, নন্দীগ্রাম, যেখান থেকে ভরত রামের অনুপস্থিতিতে রাজকার্য পরিচালনা করেছিলেন।
অযোধ্যা উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ জেলায় সরযূ নদীর ডান তীরে অবস্থিত। প্রাচীন কালে এটি কোশলরাজ্যের রাজধানী ছিল। এখানকার ঢিবি যথেষ্ট বিস্তৃত, প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে এবং কোথাও কোথাও দশ মিটার পর্যন্ত উঁচু। খননের সময় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয় যে প্রাচীনতম স্তর যেন বাদ না পড়ে। তাই সাইটের বিভিন্ন অংশে মোট চৌদ্দটি স্থানে খনন চালানো হয়। এর মধ্যে জন্মভূমি এলাকা, হনুমানগড়ি, কৌশল্যা ঘাট, নলটীলা প্রভৃতি সুপরিচিত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খননে দেখা যায়, অযোধ্যার বসতি শুরু হয়েছিল এমন এক পর্যায়ে, যখন উত্তরাঞ্চলীয় কৃষ্ণ পালিশিত মৃৎপাত্র (Northern Black Polished Ware বা NBPW) নামে পরিচিত এক বিশেষ উন্নত মৃৎপাত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এটি অত্যন্ত চকচকে, কখনও গভীর কালো, কখনও নীলাভ, কখনও রুপালি বা সোনালি আভাযুক্ত। এর আকৃতির মধ্যেও প্রাচীন পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন উত্তল পার্শ্ববিশিষ্ট থালা এবং ঢেউখেলানো প্রোফাইলের বাটি।
NBPW স্তরে তামার পাশাপাশি লোহার যন্ত্রও পাওয়া যায়। এগুলি গৃহস্থালি কাজ, কৃষি এবং প্রয়োজনে যুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারত। ক্রমে সূক্ষ্ম দানাদার পাথরের ওজন ব্যবস্থার প্রচলন দেখা যায়। মুদ্রার ব্যবহারও শুরু হয়। এই সময়কার ওজনগুলি নলাকার, যা হরপ্পা সভ্যতার ঘনকাকার ওজন থেকে আলাদা। মুদ্রাগুলি ছিল ভারতের প্রাচীনতম মুদ্রার মধ্যে অন্যতম। এগুলি রুপো বা তামা দিয়ে তৈরি এবং পৃষ্ঠে পাঞ্চ-মার্ক বা চিহ্ন আঘাত করে বসানো হত। পরবর্তী যুগের মতো রাজাদের নাম উৎকীর্ণ করা হত না। উল্লেখযোগ্য যে হরপ্পা সভ্যতায় মুদ্রা ছিল না; তারা নিশ্চয়ই অন্য পদ্ধতিতে বাণিজ্য পরিচালনা করত।
প্রাথমিক পর্যায়ে অযোধ্যার স্থাপত্য ছিল কাদামাটি বা কাঁচা ইটের। পরে পোড়ামাটির ইট ব্যবহৃত হতে থাকে। NBPW পর্যায়েই লেখার প্রমাণও দেখা যায়। এরপর কোনও বিরতি ছাড়াই অযোধ্যার বসতি শুঙ্গ, কুষাণ ও গুপ্ত যুগ অতিক্রম করে এগিয়ে চলে। বর্তমান আলোচনার ক্ষেত্রে এই পরবর্তী যুগগুলির বিশদ বিবরণ প্রয়োজন নেই, তবে একটি শিলালিপির উল্লেখ জরুরি। অযোধ্যার শহরতলি রণোপালিতে পাওয়া প্রথম শতক খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি পাথরলিপিতে ধনদেব নামে এক শাসকের কথা আছে, যিনি নিজেকে কোশলাধীপ অর্থাৎ কোশলের রাজা বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি পুষ্যমিত্রের ষষ্ঠ উত্তরসূরি ছিলেন। এই পুষ্যমিত্রকে শিলালিপিতে সেনাপতি এবং দুই অশ্বমেধযজ্ঞকারী বলা হয়েছে। তিনি সম্ভবত সেই পুষ্যমিত্রই, যিনি শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে শুঙ্গবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই তথ্যের গুরুত্ব হল, খ্রিস্টীয় যুগের সূচনালগ্ন পর্যন্ত অযোধ্যা কোশলরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবে টিকে ছিল। ফলে রামায়ণীয় ঐতিহ্যে অযোধ্যার যে কেন্দ্রীয় অবস্থান, তা একেবারে শূন্যে নির্মিত নয়। সাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব ও শিলালিপির মিলিত আলোয় অযোধ্যা এক দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক নগররূপে আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়।
অযোধ্যা, শৃঙ্গবেরপুর, ভরদ্বাজ আশ্রম, চিত্রকূট ও নন্দীগ্রাম: প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে রামায়ণ-স্মৃতির সন্ধান
গুপ্তযুগের পর অযোধ্যার কিছু অংশ ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়লেও শহরের সমস্ত অঞ্চল একযোগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। বিশেষত হনুমানগড়ি এবং জন্মভূমি এলাকা আবার একাদশ ও দ্বাদশ শতকের দিকে পুনরায় বসতিপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই পুনর্বাসনের চিহ্ন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। বাবরি মসজিদের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত একটি খনন-খাতের সর্বোচ্চ স্তরে আবিষ্কৃত হয় ইট ও পাথরের সংমিশ্রণে নির্মিত একাধিক ভিত্তি। এই ভিত্তিগুলির গঠন দেখে অনুমান করা হয়, এগুলির উপর একসময় পাথরের স্তম্ভ স্থাপিত ছিল। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এই কারণে যে, বাবরি মসজিদের অভ্যন্তরের পিলার বা স্তম্ভগুলিতে হিন্দু শিল্পরীতির নকশা ও ভাস্কর্যচিহ্ন বিদ্যমান ছিল। এইসব অলংকরণ নিছক স্থাপত্যিক পুনর্ব্যবহার, না কি তার পেছনে পূর্ববর্তী কোনও মন্দির-স্থাপত্যের উপস্থিতি ছিল, সেই বিতর্ক বহুদিন ধরেই ইতিহাসচর্চার কেন্দ্রে রয়েছে।
অযোধ্যার পরে যে স্থানটির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচিত হয়, তা হল শৃঙ্গবেরপুর। উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ জেলার গঙ্গার বাঁ তীরে অবস্থিত এই বিশাল ঢিবি রামায়ণীয় কাহিনিতে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। বনবাসের প্রথম পর্যায়ে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ এখানেই গঙ্গা অতিক্রম করেছিলেন বলে ঐতিহ্যে বর্ণিত হয়েছে। গঙ্গা নদী এখানে ঢিবিটিকে প্রায় আলিঙ্গন করে বয়ে গেছে। ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নদীর ক্ষয়ে ঢিবির একটি বড় অংশ বিলীন হয়ে গেছে। তবুও অবশিষ্ট অংশ এতটাই সমৃদ্ধ যে, সেখানকার বিভিন্ন বসতিস্তরের একটি সুস্পষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্র পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে।
অযোধ্যার তুলনায় শৃঙ্গবেরপুরের প্রাচীনত্ব আরও গভীর। এখানকার সর্বনিম্ন স্তরে পাওয়া যায় Ochre Colour Ware বা OCP নামে পরিচিত এক বিশেষ ধরনের মৃৎপাত্র। এগুলি লালচে বর্ণের, কখনও পালিশযুক্ত, কখনও কালো রঞ্জকে আঁকা নকশাবিশিষ্ট। উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চলে এই মৃৎপাত্রের সঙ্গে পাওয়া গেছে হারপুন, অ্যান্টেনা-তলোয়ার, মানবাকৃতির ধাতব প্রতিমা প্রভৃতি, যেগুলিকে সামগ্রিকভাবে “Copper Hoards” নামে চিহ্নিত করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে এই সংস্কৃতির সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মধ্যভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
তবে শৃঙ্গবেরপুরে OCP-সংস্কৃতির উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। মৃৎপাত্রের টুকরোগুলিও খুব বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া গেছে। এই পর্যায়ের পর বসতিতে একটি বিরতি দেখা যায়। তারপর যে নতুন স্তর গড়ে ওঠে, তার নিম্নভাগে Black-slipped Ware এবং Black-and-red Ware পাওয়া যায়। এর পরপরই আবির্ভূত হয় সুপরিচিত Northern Black Polished Ware বা NBPW সংস্কৃতি। এই NBPW স্তরে যে বস্তুসংস্কৃতি পাওয়া গেছে, তা অযোধ্যার সমসাময়িক স্তরের সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। পরবর্তী পর্যায়ে শুঙ্গ, কুষাণ ও গুপ্ত যুগের ধারাবাহিক বসতির প্রমাণ মেলে।
গুপ্তযুগের পর আবারও কিছু সময়ের জন্য বসতি শূন্য হয়ে পড়ে। কিন্তু দ্বাদশ শতকে পুনরায় এখানে জনবসতি গড়ে ওঠে। এই সময়ের প্রমাণ হিসেবে গাহড়াবাল শাসক গোবিন্দচন্দ্রের বিপুল সংখ্যক মুদ্রা পাওয়া গেছে। এরপরও মধ্যযুগের শেষপর্যায় এবং এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যুগেও এখানে মানুষের বসবাস ছিল। যদিও বর্তমান আলোচনায় সেই পরবর্তী স্তরগুলির বিশদ বিবরণ প্রাসঙ্গিক নয়।
শৃঙ্গবেরপুরের খননে এমন একটি আবিষ্কার হয়েছিল, যা রামায়ণ প্রসঙ্গের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও প্রাচীন ভারতীয় প্রকৌশলবিদ্যার অসামান্য নিদর্শন হিসেবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এটি হল এক অনন্য জলসংরক্ষণ ব্যবস্থা। খ্রিস্টীয় যুগের সূচনালগ্নে এই অঞ্চলের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে নদীতীর থেকে দূরে বসবাসকারী মানুষের জন্য সহজলভ্য পানীয় জলের প্রয়োজন দেখা দেয়। ঢিবির উত্তরে একটি নালা ছিল, যা উঁচু অঞ্চল থেকে বর্ষার জল গঙ্গায় বয়ে নিয়ে যেত। কিন্তু গঙ্গায় বড় বন্যা এলে নদীর জল উল্টো স্রোতে সেই নালার অনেক দূর পর্যন্ত প্রবেশ করত।
স্থানীয় প্রকৌশলীরা এই প্রাকৃতিক ঘটনাকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ এক বিশাল ট্যাঙ্ক-কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। নালার সঙ্গে একটি বিশেষ চ্যানেল যুক্ত করে বন্যার জলকে জলাধারের দিকে প্রবাহিত করা হত। এই ট্যাঙ্ক-ব্যবস্থায় আধুনিক প্রকৌশলের প্রায় সব উপাদানই উপস্থিত ছিল। সেখানে ছিল সিল্টিং চেম্বার, সিল্টিং ট্যাঙ্ক, মূল জলাধার, আচারিক ব্যবহারের জন্য পৃথক ট্যাঙ্ক এবং অতিরিক্ত জল নিষ্কাশনের জন্য নিষ্কাশন বাঁধ। অতিরিক্ত জল একটি বহির্গমন চ্যানেলের মাধ্যমে পুনরায় গঙ্গায় ফিরে যেত।
প্রত্নতাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, এই জলাধারের ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় সাড়ে সাত বিলিয়ন লিটার। সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত এই জল সরবরাহ যথেষ্ট ছিল। জুলাই মাসে আবার নতুন বন্যার জল এসে ভরাট করত জলাধারকে। কিন্তু শৃঙ্গবেরপুরের প্রকৌশলীরা এখানেই থেমে থাকেননি। অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য তাঁরা মূল ট্যাঙ্কের তলদেশে একাধিক কূপ খনন করেছিলেন, যা ভূগর্ভস্থ জলের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতেও জলসংকটের সম্ভাবনা প্রায় ছিল না। এই সমগ্র ব্যবস্থা প্রাচীন ভারতের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনশক্তির এক বিরল নিদর্শন।
এরপর আসে ভরদ্বাজ আশ্রমের প্রসঙ্গ। উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে, নেহরু পরিবারের ঐতিহাসিক বাসভবন আনন্দ ভবনের বিপরীত দিকে অবস্থিত একটি অঞ্চল আজও “ভরদ্বাজ আশ্রম” নামে পরিচিত। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, সেখানে অযোধ্যা বা শৃঙ্গবেরপুরের মতো কোনও দৃশ্যমান ঢিবি নেই। বরং সমতল ভূমির উপর স্থানীয় পৌরসভা একটি পার্ক নির্মাণ করেছে। কেবল একটি মধ্যযুগীয় মন্দিরই স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই স্থানটি কখনও ঋষি ভরদ্বাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত হত।
প্রথম দর্শনে স্থানটির প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে হয়েছিল। তবুও যুক্তি ছিল, যদি ঐতিহ্যের মধ্যে কোনও সত্যের উপাদান থাকে, তবে মাটির নীচে তার কিছু না কিছু চিহ্ন অবশ্যই রয়ে যাবে। এই সংশয় ও কৌতূহল নিয়েই সমতল ভূমিতে খনন শুরু হয়। একটি দীর্ঘ এবং দুটি ছোট ট্রেঞ্চ কেটে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, ভূমিপৃষ্ঠ থেকে মাত্র পঁচিশ থেকে তিরিশ সেন্টিমিটার নীচেই পোড়ামাটির ইটের স্থাপত্যাবশেষ পাওয়া যায়। দুটি পৃথক নির্মাণস্তর আবিষ্কৃত হয়, একটি আরেকটির নীচে।
এই স্তরগুলির সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রচুর মৃৎপাত্র, টেরাকোটা মূর্তি, উৎকীর্ণ সিলমোহর প্রভৃতি, যেগুলি গুপ্তযুগীয় অর্থাৎ চতুর্থ-পঞ্চম শতকের। কিন্তু আরও গভীরে খনন করে আর কোনও স্থাপত্য পাওয়া যায়নি। তার বদলে পাওয়া যায় দুই থেকে তিন মিটার পুরু বেলে দোআঁশ মাটির স্তর, যার মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে Northern Black Polished Ware এবং Black-slipped Ware-এর টুকরো পাওয়া যায়। সেখানে কোনও নিয়মিত বসতির মেঝে বা স্থায়ী নির্মাণ ছিল না। তবে নলখাগড়ার ছাপযুক্ত কাদামাটির দলা পাওয়া যায়। এইসব প্রমাণ একত্রে বিচার করলে মনে হয়, সেখানে স্থায়ী নগরজীবনের বদলে অস্থায়ী কুটিরভিত্তিক এক অনিয়মিত বসতি ছিল। সম্ভবত বেত ও কাদামাটির সাহায্যে নির্মিত বেত ও কাদামাটির গাঁথুনি ঘরবাড়ি সেখানে বিদ্যমান ছিল।
এই প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্র ভরদ্বাজ আশ্রমের ঐতিহ্যগত ধারণার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। কারণ আশ্রম মানেই তো নগরসভ্যতার স্থায়ী স্থাপত্য নয়; বরং নির্জন প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা সরল কুটিরসমষ্টি।
চিত্রকূটের প্রত্নতাত্ত্বিক পরিস্থিতি ছিল আরও জটিল। বর্তমানে শহরটির একটি অংশ উত্তরপ্রদেশে এবং অন্য অংশ মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত। মন্দাকিনী নদীর দুই তীরে বিস্তৃত এই অঞ্চল রামায়ণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ বনবাসকালে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ দীর্ঘদিন এখানে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য মন্দির নির্মিত হওয়ায় প্রাচীন ঢিবিগুলি প্রায় সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত হয়ে গেছে। ফলে বড় আকারে খনন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের তাই স্তর-কর্তন (section-scraping) পদ্ধতিতে সীমিত অনুসন্ধান চালাতে হয়। এই সীমিত অনুসন্ধান থেকেও Black-slipped Ware এবং NBPW-এর টুকরো পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে চিত্রকূটের প্রাচীনত্ব যথেষ্ট গভীর।
নন্দীগ্রামের ঐতিহ্যও রামায়ণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বনবাসকালে ভরত অযোধ্যা থেকে নয়, নন্দীগ্রাম থেকেই প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করেছিলেন বলে কাহিনিতে উল্লেখ আছে। তবে তিনি শহরের মধ্যে না থেকে অপেক্ষাকৃত নির্জন এক স্থানে বাস করতেন, যা বর্তমানে “ভরতকুণ্ড” নামে পরিচিত। এখানে দৃশ্যমান কোনও ঢিবি নেই। তবে কিছু দূরে একটি প্রাচীন ঢিবির অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যেটিকেই সম্ভবত প্রাচীন নন্দীগ্রামের অবশেষ বলে ধরা হয়। সীমিত আকারের খননে এখানকার নিম্নস্তরে অযোধ্যার অনুরূপ বস্তুসংস্কৃতির প্রমাণ মেলে।
এই পাঁচটি স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক ফলাফল একত্রে বিচার করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়। সবকটি স্থানের প্রাচীনতম সুসংহত বসতিস্তরে Northern Black Polished Ware সংস্কৃতির উপস্থিতি রয়েছে। একমাত্র শৃঙ্গবেরপুরে এরও পূর্ববর্তী Ochre Colour Ware-এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ NBPW-ই এই রামায়ণ-সম্পর্কিত স্থানগুলিকে এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক বন্ধনে যুক্ত করছে।
এখন প্রশ্ন হল, এই NBPW স্তরগুলির সময়কাল কতটা প্রাচীন? এর উত্তর খোঁজার জন্য ব্যবহার করা হয় Carbon-14 পদ্ধতি। কোনও নির্দিষ্ট স্তর থেকে পাওয়া কাঠকয়লার নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, সেই কাঠ কতকাল আগে দগ্ধ হয়েছিল। এই ফলাফল পরবর্তীকালে ক্যালিব্রেট করে একটি আনুমানিক তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
অযোধ্যার উপরের NBPW স্তর থেকে সংগৃহীত কাঠকয়লার নমুনা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে তৃতীয় শতকের সময়কাল নির্দেশ করেছিল। কিন্তু নিম্নস্তরের তারিখ দীর্ঘদিন অজানা ছিল। পরবর্তীকালে ২০০২-০৩ সালে Archaeological Survey of India পুনরায় জন্মভূমি এলাকায় খনন চালালে সেই ঘাটতি পূরণ হয়। Birbal Sahni Institute of Palaeobotany-এর পরীক্ষাগারে নমুনাগুলির পরীক্ষা করা হয়। সারণির ফলাফল অনুযায়ী, কিছু স্তরের তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ১১৯০-৮৪০, ১২১০-৯০০ এমনকি ১৯৮০-১৩২০ অব্দ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। অর্থাৎ অযোধ্যার নিম্নস্তরের বসতি খ্রিস্টপূর্ব এক সহস্রাব্দেরও আগে বিদ্যমান ছিল।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। এই প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানগুলি প্রমাণ করে যে রামায়ণে উল্লিখিত স্থানগুলি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে সক্রিয় বসতিপূর্ণ অঞ্চল ছিল এবং তাদের বস্তুসংস্কৃতির মধ্যে স্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এমন কোনও শিলালিপি বা সরাসরি প্রত্নপ্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে এই স্থানগুলি রামায়ণের কাহিনির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবুও ভরদ্বাজ আশ্রমের মতো কিছু সাইটে প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা ও প্রাচীন ঐতিহ্যের আশ্চর্য মিল ইতিহাসচর্চাকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
এই কারণেই রামায়ণের প্রত্নতত্ত্ব নিছক বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়; এটি ভারতীয় সভ্যতার স্মৃতি, ভূগোল ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার এক গভীর অনুসন্ধান।
ভরদ্বাজ আশ্রম, মৌখিক গাথা এবং বাল্মীকি রামায়ণের প্রাচীন কাহিনিকেন্দ্র
তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় যে রামায়ণের কাহিনি সম্পূর্ণভাবে বাল্মীকি নামক এক কবির কল্পনার সৃষ্টি, তবুও কয়েকটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সাধারণভাবে পণ্ডিতসমাজে মেনে নেওয়া হয় যে বাল্মীকি রামায়ণ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যে কোনও এক সময়ে লিখিত রূপ লাভ করে। এই সময়সীমার মধ্যে রামায়ণ-সম্পর্কিত অধিকাংশ স্থান প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে জীবন্ত বসতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অযোধ্যা, শৃঙ্গবেরপুর, চিত্রকূট বা নন্দীগ্রামের মতো স্থানগুলিতে বসতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু ভরদ্বাজ আশ্রমের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আলাদা। বাল্মীকি রামায়ণের লিখিত রূপ যখন গঠিত হচ্ছে বলে ধরা হয়, সেই সময়ে ভরদ্বাজ আশ্রম কোনও সক্রিয় নগর বা স্থায়ী বসতি ছিল না।
এখানেই প্রশ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি বাল্মীকি নিজের কল্পনায় রামকাহিনি নির্মাণ করে থাকেন, তবে তিনি এমন একটি স্থানকে কাহিনির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলেন কীভাবে, যা তাঁর সময়ে দৃশ্যমান জনবসতি হিসেবে পরিচিত ছিল না? একজন কবি কাহিনি রচনা করতে গিয়ে নিজের সময়ের পরিচিত স্থান, প্রচলিত তীর্থ, জনপদ বা পুরনো খ্যাতিসম্পন্ন নগরের নাম ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু এমন কোনও স্থানকে তিনি কেন অন্তর্ভুক্ত করবেন, যার অস্তিত্ব তাঁর সমকালীন সমাজে প্রায় অদৃশ্য? এই প্রশ্নের একমাত্র যুক্তিসঙ্গত উত্তর হতে পারে, ভরদ্বাজ আশ্রমের স্মৃতি বাল্মীকিরও পূর্ববর্তী কোনও মৌখিক কাহিনি বা গাথার মধ্যে সংরক্ষিত ছিল। অর্থাৎ রামকাহিনির একটি প্রাচীন মূলরূপ বহু আগে থেকেই লোকমুখে প্রচলিত ছিল, এবং সেই প্রচলিত কাহিনিই খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতকে লিখিত মহাকাব্যের রূপ পেতে শুরু করে।
ভরদ্বাজ আশ্রম থেকে পাওয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। প্রথমটি হল স্থানটির ভূপ্রকৃতি। আগেই বলা হয়েছে, এটি অযোধ্যা বা শৃঙ্গবেরপুরের মতো উঁচু ঢিবিবিশিষ্ট প্রত্নস্থান নয়। বরং একেবারে সমতল ভূমি। কিন্তু এর পাশের ভূমি হঠাৎ পাঁচ থেকে ছয় মিটার নেমে গেছে এবং সেই ঢাল ক্রমে গঙ্গার দিকে চলে গেছে। স্থানীয় মানুষের মুখে জানা যায়, খুব বেশি দিন আগেও বর্ষাকালে গঙ্গার বন্যার জল অনেকটা ভিতর পর্যন্ত উঠে আসত। পরে বাঁধ নির্মাণের ফলে সেই জলপ্রবেশ বন্ধ হয়েছে। এই ভূপ্রকৃতি ইঙ্গিত করে যে প্রাচীনকালে গঙ্গা সম্ভবত ভরদ্বাজ আশ্রমের পাশ দিয়েই প্রবাহিত হত।
এই তথ্য রামায়ণীয় বর্ণনার সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণভাবে মিলে যায়। কারণ আশ্রমের ধারণা সাধারণত নদীতীরবর্তী নির্জন পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীন ভারতে ঋষি-আশ্রমগুলি নগরের কোলাহল থেকে দূরে, কিন্তু জল, বৃক্ষ, ফলমূল ও প্রাকৃতিক সম্পদের কাছে গড়ে উঠত। ভরদ্বাজ আশ্রমের অবস্থানও যেন সেই ধরনেরই একটি পরিবেশ নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় খননের নিম্নস্তর থেকে। উপরের স্তরে গুপ্তযুগীয় ইটের স্থাপত্য পাওয়া গেলেও নিচের স্তরে কোনও পোড়ামাটির ইটের স্থায়ী নির্মাণ পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে Northern Black Polished Ware বা NBPW-এর কিছু বিচ্ছিন্ন টুকরো পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে পাওয়া গেছে নলখাগড়া বা বেতের ছাপযুক্ত কাদামাটির দলা। এই চিহ্নগুলি ইঙ্গিত করে যে সেখানে স্থায়ী পাকা ঘর ছিল না; বরং বেত, কাঠ ও কাদামাটি দিয়ে তৈরি কুটির ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় একে বেত ও কাদামাটির গাঁথুনি নির্মাণ বলা যায়।
এই চিত্র একটি আশ্রমের ধারণার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আশ্রম তো কোনও প্রাসাদ, নগর বা দুর্গ নয়। সেখানে সাধারণত স্থায়ী ইট-পাথরের নির্মাণ প্রত্যাশিত নয়। বরং প্রাকৃতিক উপকরণে নির্মিত সরল কুটিরই তার স্বাভাবিক রূপ। প্রত্নতত্ত্ব অবশ্য সরাসরি বলতে পারে না যে এটি ঋষি ভরদ্বাজেরই আশ্রম ছিল। কারণ সেই স্তর থেকে কোনও শিলালিপি পাওয়া যায়নি। তাছাড়া সেই প্রাচীন পর্যায়ে লেখার প্রচলন আদৌ ছিল কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভারতের প্রাচীনতম নিশ্চিত শিলালিপি সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের অশোকীয় যুগে স্থাপন করা হয়। অতএব লিখিত প্রমাণের অভাব এখানে অস্বাভাবিক নয়।
তৃতীয় সূত্রটি গুপ্তযুগের সঙ্গে যুক্ত। দেখা যায়, ভরদ্বাজ আশ্রম অঞ্চলটি দীর্ঘ বিরতির পর গুপ্তযুগে পুনরায় বসতিপূর্ণ হয়। ইতিহাসে সুপরিচিত যে গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মের এক নবজাগরণ ঘটে। বৈদিক ও পুরাণীয় ঐতিহ্য, দেবমন্দির, আচারব্যবস্থা, সংস্কৃত সাহিত্য এবং প্রাচীন তীর্থস্মৃতির পুনরুজ্জীবন এই সময়ে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সম্ভবত লোকমুখে প্রচলিত গাথা, স্মৃতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে ভরদ্বাজ আশ্রমের সঙ্গে রামকাহিনির সংযোগ বহু শতাব্দী ধরে টিকে ছিল। গুপ্তযুগে সেই স্মৃতিকে নতুন ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হয় এবং স্থানটি পুনরায় জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসরে ফিরে আসে।
এখানে মৌখিক গাথার ভূমিকা বুঝতে আধুনিক উদাহরণ বিশেষ সহায়ক। আজকের যুগে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ডিজিটাল মাধ্যম সবই সক্রিয়। তবুও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে অনেক সময় তা লোকগাথা, বিরহা বা পালাগানের রূপ পায়। লেখক ১৯৫৪ সালের কুম্ভমেলার এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন। সে বছর শীতের এক সকালে তিনি কলকাতা থেকে দিল্লিগামী কালকা মেলে ভ্রমণ করছিলেন। ট্রেন এলাহাবাদে থামতেই তিনি দেখেন হাজার হাজার মানুষ প্ল্যাটফর্মে ছুটোছুটি করছেন। কেউ কাঁদছেন, কেউ স্থানীয় প্রশাসনকে অভিশাপ দিচ্ছেন, কেউ মরিয়া হয়ে ট্রেনে উঠতে চাইছেন। হঠাৎ তাঁর কামরাতেও বহু মানুষ ঢুকে পড়েন। তখনও তিনি পুরো ঘটনার অর্থ বুঝতে পারেননি।
পরের দিন সংবাদপত্রে তিনি জানতে পারেন, এলাহাবাদের কুম্ভমেলায় ভয়াবহ পদদলনের ঘটনা ঘটেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গঙ্গাস্নানের জন্য সমবেত হয়েছিল। সেই সময় নাগা সাধুদের একটি শোভাযাত্রা হঠাৎ উপস্থিত হয়। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাজানো হাতির পিঠে ছিল। কোনও অজ্ঞাত কারণে হাতিগুলি নিয়ন্ত্রণ হারায়। তারপর ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। অসংখ্য মানুষ পদদলিত হয়ে মারা যায়। প্রশাসন উদ্ধারকাজ করলেও ততক্ষণে অগণিত পরিবার শোকে ভেঙে পড়েছিল।
সংবাদপত্র ও সরকারি তদন্ত এই ঘটনার বিবরণ দিয়েছে। কিন্তু লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অন্য একটি বিষয়। কয়েক মাসের মধ্যেই এই ঘটনাটি লোকগাথার রূপ পেয়ে যায়। এলাহাবাদের ঝুঁসি, দরিয়াগঞ্জ এবং শৃঙ্গবেরপুরের গাথাকাররা নিজ নিজ সংস্করণ রচনা করেন। ঘটনাবলির বিবরণে পার্থক্য থাকলেও মূল দুর্ঘটনা, জনসমাবেশ, বিশৃঙ্খলা, মৃত্যু এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের সারাংশ সব সংস্করণেই উপস্থিত ছিল। লেখক শৃঙ্গবেরপুরে খননকাজের সময় এমন একটি বিরহা গান নিজে শুনেছিলেন এবং টেপে রেকর্ড করেছিলেন (Lal 2002: 402-08)।
শৃঙ্গবেরপুরের সেই গাথায় প্রথমে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর বন্দনা করা হয়, তারপর পবিত্র গঙ্গার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়। এরপর গাথাকার নিজের এলাকার পরিচয় দেন এবং ধীরে ধীরে ঘটনাটির বিবরণ শুরু করেন। তিনি বলেন, ১৯৫৪ সালে ঘোষণা হয়েছিল যে মেলা অত্যন্ত বড় হবে। পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল, নতুন ট্রেন চালু হয়েছিল, এমনকি বিমান ওঠানামার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। ৩ ফেব্রুয়ারি, বুধবার, বিপুল মানুষ স্নানের জন্য আসে। একদিক থেকে তীর্থযাত্রীদের চাপ, অন্যদিক থেকে সাধুদের শোভাযাত্রা। বাঁধের কাছে তৈরি হয় ভীষণ বিভ্রান্তি। পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ, শিশু, অন্ধ, খোঁড়া, ভিখারি কেউ রক্ষা পায়নি। বহু মানুষ মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুলোকগামী হয়। সামরিক লরি আসে, মৃত ও আহতদের তুলে নিয়ে যায়, মৃতদেহের ছবি তোলা হয়, আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়, নিখোঁজদের নাম ঘোষণা করা হয়। শেষে গাথাকার নিজের নাম জানান রাম আধার।
এই বিবরণ সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের সঙ্গে মোটামুটি মিলে যায়। কিন্তু এর গুরুত্ব অন্যত্র। যে যুগে মুদ্রিত সংবাদ এবং সরকারি নথি ছিল, সেই যুগেও লোকস্মৃতি ঘটনাকে গান, ছন্দ ও কণ্ঠের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছে। এর অর্থ, লিখিত ইতিহাসের পাশাপাশি মৌখিক ইতিহাসও সমাজে সক্রিয় থাকে।
লেখক শৃঙ্গবেরপুরে আরেকটি বিরহা গানও রেকর্ড করেছিলেন। সেটি ছিল এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কাহিনি। এক ব্যক্তি দূর শহরে কাজ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে নিজের গ্রামে ফিরছিলেন। পথে তিনি বোনের বাড়িতে রাত্রিবাস করেন। বোন জানতে পারে তাঁর কাছে অনেক টাকা আছে। অর্থের লোভে সে নিজের ভাইকেই হত্যা করে। পরে সে ধরা পড়ে। প্রতাপগড়ের আদালতে বিচার হয় এবং বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এই কাহিনিটিও আদালতের নথি দ্বারা যাচাইযোগ্য। তবুও তা লোকগানে রূপান্তরিত হয়েছিল।
এই দুটি উদাহরণ একটি বড় সত্য শেখায়। মানুষ শুধু কাগজে ইতিহাস রাখে না, কণ্ঠেও রাখে। সংবাদপত্র, আদালত, সরকারি রিপোর্ট থাকলেও লোকসমাজ নিজের ভাষায়, নিজের সুরে, নিজের আবেগে ঘটনাকে ধারণ করে। যদি আধুনিক যুগেও এমন ঘটে, তবে প্রাচীন যুগে, যখন লেখার প্রচলন সীমিত ছিল এবং মুদ্রিত নথির অস্তিত্বই ছিল না, তখন কোনও বৃহৎ ঘটনা বা স্মরণীয় চরিত্রের জীবনকাহিনি গাথা, পালা, কীর্তন বা মৌখিক বর্ণনায় সংরক্ষিত হওয়াই স্বাভাবিক।
এই সূত্রেই রামকাহিনির প্রাচীন রূপ সম্পর্কে একটি বিশ্বাসযোগ্য ধারণা তৈরি হয়। রামের জীবন যদি সমাজকে গভীরভাবে আলোড়িত করে থাকে, তবে সেই কাহিনি নিশ্চয়ই প্রথমে মৌখিক গাথা হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল। কোনও স্থানীয় কবি, গায়ক বা কথক সেই কাহিনি রচনা করেছিলেন। তারপর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে তা প্রবাহিত হয়েছে। প্রত্যেক নতুন গায়ক হয়তো নিজের ভাষা, আবেগ, উপমা, অলংকার, স্থানীয় রং এবং কিছু “mirch-masālā” যোগ করেছেন। এই যোগ-বিয়োগের মধ্য দিয়েই কাহিনি ক্রমে বিস্তৃত, নাটকীয় ও মহাকাব্যিক হয়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে যখন লেখার ব্যবহার সুসংহত হতে শুরু করে, বিশেষত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের দিকে, তখন সেই দীর্ঘ মৌখিক ঐতিহ্য এক মহাকাব্যিক লিখিত রূপ পায়। সেই রূপই বাল্মীকি রামায়ণ নামে পরিচিত। ফলে বাল্মীকি হয়তো শূন্য থেকে কাহিনি সৃষ্টি করেননি; বরং বহু পুরনো লোকস্মৃতি, গাথা, আঞ্চলিক উপাখ্যান এবং নৈতিক কাহিনিকে সাহিত্যিক মহিমায় সুসংহত করেছিলেন।
ভরদ্বাজ আশ্রমের প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এই তত্ত্বকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করে। কারণ বাল্মীকির সময়ে স্থানটি দৃশ্যমান সক্রিয় বসতি না হলেও রামায়ণের কাহিনিতে তার অন্তর্ভুক্তি বোঝায় যে সেই স্মৃতি আরও প্রাচীন। প্রত্নতত্ত্ব এখানে সরাসরি রামের উপস্থিতি প্রমাণ করে না, কিন্তু একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতির গভীরতা নির্দেশ করে। নদীতীরবর্তী আশ্রমসুলভ ভূপ্রকৃতি, প্রাচীন কুটিরধর্মী বসতির চিহ্ন, গুপ্তযুগে পুনরুজ্জীবন এবং লোকস্মৃতির স্থায়িত্ব, সব মিলিয়ে ভরদ্বাজ আশ্রম রামায়ণ গবেষণায় এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
অতএব রামায়ণকে নিছক কল্পনা বলে অস্বীকার করা যেমন তাড়াহুড়োর কাজ, তেমনি তার প্রতিটি ঘটনাকে সরল ঐতিহাসিক সত্য বলে গ্রহণ করাও অনুচিত। ইতিহাসচর্চার দায়িত্ব হল মধ্যবর্তী জটিল অঞ্চলটি অনুধাবন করা। সেখানে সাহিত্য আছে, লোকস্মৃতি আছে, প্রত্নতত্ত্ব আছে, ধর্মীয় চেতনা আছে, আবার মানুষের কল্পনার সৃজনশীলতাও আছে। রামায়ণ সেই সব উপাদানের মিলিত ফল। আর ভরদ্বাজ আশ্রমের মতো স্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাকাব্যের পেছনে কখনও কখনও এমন প্রাচীন স্মৃতির স্তর লুকিয়ে থাকে, যা শুধু লিখিত পাঠে নয়, মাটির স্তরেও তার মৃদু চিহ্ন রেখে যায়।
শিল্পকলায় রামের জীবনের উপস্থাপন
ভারতীয় শিল্পঐতিহ্যের ইতিহাসে রামায়ণের প্রভাব এতটাই গভীর যে, রামের জীবনকাহিনি কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা মূর্ত হয়ে উঠেছে মাটির ফলকে, পাথরের ভাস্কর্যে, ব্রোঞ্জমূর্তিতে, মন্দিরের অলংকরণে এবং চিত্রকলার বিস্তীর্ণ জগতে। এই শিল্পরূপগুলির সময়সীমা যেমন বিস্ময়করভাবে দীর্ঘ, তেমনি তাদের ভৌগোলিক বিস্তারও অসাধারণ। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত, উত্তর ভারতের কৌশাম্বী থেকে দক্ষিণ ভারতের পট্টদাকাল, আবার ভারতবর্ষ পেরিয়ে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত রামকাহিনি শিল্পের মাধ্যমে নতুন নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই দীর্ঘ শিল্প-ঐতিহ্য কেবল ধর্মীয় আবেগের পরিচয় নয়; এটি প্রমাণ করে যে রামায়ণ ভারতীয় ও এশীয় সভ্যতার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে কত গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।
টেরাকোটায় রামায়ণের প্রাচীনতম চিত্র
রামায়ণ-সম্পর্কিত যে প্রাচীনতম টেরাকোটা দৃশ্যটি আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটি উত্তরপ্রদেশের কৌশাম্বী থেকে প্রাপ্ত। যদিও এর উপর কোনও শিলালিপি নেই, তবুও শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এটিকে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় বা প্রথম শতকের বলে ধরা হয়। এই টেরাকোটা ফলকে রাবণকে দেখা যায় সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে। রাবণের মুখাবয়বে এক হিংস্র তীব্রতা ফুটে উঠেছে। তার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ সীতা আতঙ্ক ও উদ্বেগে নিজের অলংকারগুলি নীচে ফেলে দিচ্ছেন। তাঁর আশা, হয়তো কোনও পথিক বা বনচারী সেই অলংকার দেখে তাঁর অবস্থানের সূত্র পাবে এবং রামকে খবর দিতে পারবে।
এই দৃশ্য সরাসরি বাল্মীকির রামায়ণ-এর অরণ্যকাণ্ডের চতুর্পঞ্চাশতম সর্গের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্লোকের স্মৃতি জাগায়, “তাদের মধ্যে বিশালনয়না সেই রমণী সোনালি আভাযুক্ত রেশমের উত্তরীয় এবং অন্যান্য শুভ অলংকার খুলে ফেললেন, এই আশায় যে এগুলি রামের কাছে তাঁর সংবাদ পৌঁছে দেবে। তিনি বস্ত্রখণ্ডের মধ্যে অলংকারগুলি বেঁধে তা নিক্ষেপ করলেন।”
অর্থাৎ, বিশালনয়না সীতা সোনালি রেশমবস্ত্র ও অলংকারগুলি নীচে ফেলছিলেন এই আশায় যে কেউ হয়তো সেগুলি দেখে রামকে তাঁর অবস্থানের সংবাদ দেবে। সাহিত্যিক বর্ণনা এবং টেরাকোটার দৃশ্যের এই আশ্চর্য মিল দেখায়, খ্রিস্টপূর্ব যুগেই রামকাহিনি শিল্পের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল।
এরপর আমরা পাই রামের নিজস্ব একটি টেরাকোটা প্রতিমা। বর্তমানে এটি আমেরিকার Los Angeles County Museum-এ সংরক্ষিত, যদিও এর উৎসস্থান হিসেবে হরিয়ানার নচাড়া খেরার নাম উল্লেখ করা হয়। এই প্রতিমাটি কুষাণ যুগের শিল্পরীতিতে নির্মিত। ডান হাত অভয়মুদ্রায় উত্তোলিত। পেছনে তূণীরভর্তি বাণের অংশও দৃশ্যমান। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মূর্তিটির নিম্নবস্ত্রে উৎকীর্ণ একটি ব্রাহ্মী লিপি, যেখানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে “রাম”। তৃতীয় শতকের এই লিপি কোনও সংশয়ের অবকাশ রাখে না যে এটি সত্যিই রামের প্রতিমূর্তি।
হরিয়ানার নচাড়া খেরা থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ টেরাকোটা ফলক পাওয়া গেছে। যদিও এর বাম অংশ ভগ্ন, তবুও উপরিভাগে উৎকীর্ণ লিপির কারণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। পাঠযোগ্য অংশটি হল, “… সেই সময় রঘুনন্দন (রাম) মহাগৃধ্রদের নিকটে উপস্থিত হলেন…”
এই পঙ্ক্তি বাল্মীকির রামায়ণ-এর অরণ্যকাণ্ডের চতুর্দশ সর্গের প্রথম শ্লোকটির কথা মনে করিয়ে দেয়, “এরপর রঘুনন্দন রাম পঞ্চবটির দিকে যাত্রা করতে করতে পথে এক বিশালদেহী ও ভয়ংকর পরাক্রমশালী গৃধ্রের সাক্ষাৎ পেলেন।”
অর্থাৎ, পঞ্চবটীর পথে রঘুনন্দন রামের সাক্ষাৎ হয়েছিল এক বিশাল ও পরাক্রান্ত গৃধ্রের সঙ্গে, যিনি ছিলেন জটায়ু। টেরাকোটার অবশিষ্ট অংশে সীতা ও লক্ষ্মণকে দেখা যায়। অনুমান করা হয়, ভগ্ন অংশে রাম ও জটায়ুর মূর্তি ছিল। সীতা ও লক্ষ্মণের ভঙ্গি ও মুখাবয়বের চিত্রায়ণ অত্যন্ত নিপুণ। চতুর্থ শতকের এই ফলক দেখায়, রামায়ণের নির্দিষ্ট দৃশ্যগুলি তখনকার শিল্পীরা কত যত্ন সহকারে রূপায়িত করছিলেন।
মারীচের স্বর্ণমৃগরূপ ধারণের ঘটনাটিও শিল্পীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। রাবণের পরিকল্পনা অনুযায়ী মারীচ স্বর্ণহরিণের রূপ নিয়ে পঞ্চবটীর কুটিরের সামনে উপস্থিত হয়েছিল। সীতা মুগ্ধ হয়ে রামকে হরিণটি ধরতে অনুরোধ করেন। রাম শিকারে গেলে পরে রামের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে সাহায্যের আর্তনাদ শোনা যায়। লক্ষ্মণও কুটির ত্যাগ করেন। সেই সুযোগে রাবণ সন্ন্যাসীর বেশে এসে সীতাকে অপহরণ করে।
নচাড়া খেরার আরেকটি ক্ষতিগ্রস্ত টেরাকোটা ফলকে রাম, সীতা ও স্বর্ণমৃগকে দেখা যায়। হরিণটিকে এমন ভঙ্গিতে নির্মাণ করা হয়েছে, যেন সেটি ছুটে পালাচ্ছে। যদিও লক্ষ্মণের অংশটি ভেঙে গেছে, তবুও পুরো দৃশ্যটি গতিময় নাটকীয়তায় ভরপুর। শৈল্পিক দিক থেকে এটি পূর্ববর্তী ফলকের সমসাময়িক বলে মনে করা হয় এবং চতুর্থ শতকে স্থাপন করা যায়।
হরিয়ানার জিন্দ অঞ্চল থেকে পাওয়া আরেকটি টেরাকোটা ফলকে অশোকবাটিকার ধ্বংসদৃশ্য অঙ্কিত হয়েছে। সীতার সঙ্গে সাক্ষাতের পর হনুমান অশোকবাটিকার একাংশ ধ্বংস করেছিলেন। ফলকটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হনুমানের ধ্বংসযজ্ঞ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। নিচে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা রয়েছে: “হনুমান অশোকবাটিকার ধ্বংসকারী”। এই শিলালিপি দৃশ্যটির পরিচয় সম্পর্কে কোনও সংশয় রাখে না।
পাথরের ভাস্কর্যে রামকাহিনি
ভারতবর্ষের অসংখ্য মন্দিরে রামায়ণের দৃশ্য খোদাই করা হয়েছে। এই ভাস্কর্যগুলির সময়কাল তৃতীয় শতক থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের নাগার্জুনকোণ্ডা থেকে প্রাপ্ত একটি ভাস্কর্যে চিত্রকূটে ভরত ও রাম এর সাক্ষাৎ অঙ্কিত হয়েছে। এখানে রাম আসীন, আর ভরত তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ করছেন। পেছনে ভরতের অনুচরবর্গও দৃশ্যমান। এই ভাস্কর্য ইক্ষ্বাকু শিল্পধারার অন্তর্গত এবং তৃতীয় শতকের বলে মনে করা হয়।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই দৃশ্যটি দশরথ জাতক-এর অংশ। অর্থাৎ রামকাহিনি কেবল ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বৌদ্ধ শিল্পও তাকে গ্রহণ করেছিল। এই আন্তঃধর্মীয় সাংস্কৃতিক বিনিময় ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
মধ্যপ্রদেশের নাচনা-কুঠারার পঞ্চম শতকের এক মন্দিরে সীতাহরণের দৃশ্য উৎকীর্ণ আছে। সেখানে রাবণ সন্ন্যাসীর বেশে সীতার কুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা চাইছে। সীতা কুটির থেকে বেরিয়ে এলে সে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ভাস্কর্যের নাটকীয়তা এতটাই জীবন্ত যে মনে হয়, দৃশ্যটি যেন পাথরের মধ্যে থেমে থাকা এক চলমান মুহূর্ত।
পট্টদাকালের পাপনাথ মন্দিরে রামসেতু নির্মাণের অসাধারণ চিত্র পাওয়া যায়। বানরসেনারা মাথায় পাথর বহন করে সমুদ্রে ফেলছে। তরঙ্গরেখার মাধ্যমে সমুদ্রকে বোঝানো হয়েছে এবং জলের মধ্যে মাছও দৃশ্যমান। জলপৃষ্ঠে সারিবদ্ধ পাথরগুলি সেতুর ইঙ্গিত দেয়। সপ্তম-অষ্টম শতকের এই ভাস্কর্য শুধু ধর্মীয় কাহিনির চিত্রায়ণ নয়; এটি এক মহাকাব্যিক শ্রমযজ্ঞের শিল্পরূপ।
চিত্রকলায় রামজীবনের রূপায়ণ
মধ্যযুগীয় ভারতীয় চিত্রকলায় রামায়ণের দৃশ্যাবলি বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আঞ্চলিক শিল্পধারা রামকাহিনিকে নিজেদের নান্দনিক রীতিতে রূপ দিয়েছে। মালওয়া শৈলীর সপ্তদশ শতকের একটি চিত্রে শৃঙ্গবেরপুরে রামের গঙ্গাপার হওয়ার দৃশ্য অঙ্কিত হয়েছে। এখানে কেওট বা মাঝি “হাত জোড় করে’ রামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লোককথা অনুযায়ী, সে রামের পদধূলির অলৌকিক শক্তির কথা শুনেছিল। অহল্যার পাথরদেহ যে রামের পদস্পর্শে মানবদেহে রূপান্তরিত হয়েছিল, সেই স্মৃতি থেকে মাঝির ভয় ছিল—যদি তাঁর নৌকাও মানুষে পরিণত হয়, তবে জীবিকার উপায় থাকবে না। তাই সে প্রথমে রামের পা ধুতে চেয়েছিল। চিত্রটিতে সেই ভক্তি, বিনয় ও লোকরস এক অপূর্ব মানবিক আবহ সৃষ্টি করেছে।
আরেকটি বিরল চিত্রে সীতার অগ্নিপরীক্ষা দেখানো হয়েছে। এটি জনপ্রিয় মুঘল শৈলীর এবং আনুমানিক ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের। মুঘল শিল্পধারার প্রভাব সত্ত্বেও এতে ভারতীয় আবেগ ও পৌরাণিক নাটকীয়তা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। অগ্নিশিখার মধ্যে সীতার স্থির অবয়ব এবং চারপাশের উত্তেজিত মুখাবয়ব পুরো দৃশ্যটিকে গভীর নাটকীয়তায় পূর্ণ করেছে।
ভারতসীমার বাইরে রামায়ণের ভাস্কর্য
রামায়ণের প্রভাব ভারতবর্ষ অতিক্রম করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গভীরভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। কম্বোডিয়ার অংকোর ওয়াট মন্দিরে রামায়ণের বহু দৃশ্য সূক্ষ্ম ভাস্কর্যে খোদিত আছে। একাদশ শতকের এই মন্দিরের এক প্যানেলে রাবণকে সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ভাস্কর্যের সূক্ষ্মতা ও ঘন অলংকরণ দর্শককে অভিভূত করে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রাম্বানান মন্দিরেও রামায়ণের বহু দৃশ্য উৎকীর্ণ আছে। নবম শতকের এক প্যানেলে দেখা যায়, রাম সমুদ্রকে শান্ত করার প্রয়াস করছেন। তাঁর বাম হাতে প্রসারিত ধনুক। সমুদ্রকে তরঙ্গরেখায় চিত্রিত করা হয়েছে, আর জলের মধ্য থেকে কুমিরেরা মুখ উঁচু করে আছে। দৃশ্যটির নাটকীয়তা ও গতিশীলতা এমন যে মনে হয়, পাথরের মধ্যেই সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে।
এই দীর্ঘ শিল্পঐতিহ্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে। রামায়ণ কোনও একক ধর্মীয় গ্রন্থের সীমাবদ্ধ সম্পদ নয়। এটি এক বহুস্বরিক সাংস্কৃতিক মহাকাব্য, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিল্পীদের কল্পনাকে আলোড়িত করেছে। কৌশাম্বীর টেরাকোটা থেকে অংকোর ওয়াটের ভাস্কর্য, নচাড়া খেরার ফলক থেকে মালওয়া চিত্রধারা—সবখানেই রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, হনুমান ও রাবণ নতুন নতুন রূপে জীবন্ত হয়ে উঠেছেন।
শিল্পের এই ধারাবাহিকতা আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে। কোনও কাহিনি যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এত বৈচিত্র্যময় শিল্পমাধ্যমে রূপ পায়, তবে তা নিছক সাহিত্যিক কল্পনা হয়ে থাকে না; বরং তা এক সভ্যতার গভীর সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিণত হয়। রামায়ণ সেই অর্থে কেবল একটি মহাকাব্য নয়; এটি ভারতীয় ও এশীয় শিল্পকলার ইতিহাসে এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।
সামগ্রিক প্রমাণসমূহের পর্যালোচনা
আসুন, তর্কের সুবিধার্থে প্রথমেই একটি অনুমান গ্রহণ করা যাক। ধরা যাক, রাম কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তি নন; তিনি কেবল বাল্মীকি নামক এক কবির কল্পনার সৃষ্টি। এই অনুমানকে সামনে রেখে এখন আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্ন করতে হবে। সাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব এবং শিল্পকলার যে বিপুল তথ্য ও প্রমাণ এতক্ষণ আলোচিত হল, সেগুলি কি এই অনুমানকে সমর্থন করে, না কি তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আবেগ নয়, বরং বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের কাজ বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং বিভিন্ন সূত্রকে মিলিয়ে অতীতের একটি সম্ভাব্য রূপরেখা নির্মাণ করা। রামায়ণ-সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ বিচার করতে গেলে অন্তত তিনটি বড় ক্ষেত্র আমাদের সামনে আসে। প্রথমত সাহিত্যিক সাক্ষ্য, দ্বিতীয়ত প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, এবং তৃতীয়ত শিল্পকলায় রামকাহিনির প্রতিফলন। এই তিন ধারার প্রমাণ যখন একত্রে বিচার করা হয়, তখন বিষয়টি নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক আলোচনায় পরিণত হয়।
সাহিত্যিক প্রমাণ: ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যের বাইরেও রাম
প্রথমেই সাহিত্যিক তথ্যের দিকে তাকানো যাক। যেহেতু আলোচনার সূচনাতেই বাল্মীকিকে সন্দেহের আসনে বসানো হয়েছে, তাই আপাতত তাঁর রামায়ণ সম্পূর্ণভাবে পাশে সরিয়ে রাখা যাক। একইভাবে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে রচিত অসংখ্য রামায়ণ সংস্করণকেও আপাতত গুরুত্ব না দিলেও চলে, কারণ তাদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাল্মীকি রামায়ণ থেকেই অনুপ্রাণিত।
কিন্তু প্রশ্ন হল, বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
বৌদ্ধ জাতককথা তো ব্রাহ্মণ্যধর্মীয় রামায়ণের অধীনস্থ নয়। তাদের উপর বাল্মীকির কাহিনি গ্রহণ করার কোনও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাও ছিল না। তবুও বৌদ্ধ সাহিত্য, বিশেষত জাতকগুলিতে, রামের জীবনকাহিনির বিস্তৃত উপস্থিতি দেখা যায়। দশরথ জাতক-এ রাম, লক্ষ্মণ ও ভরতের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। শুধু নাম নয়, ঘটনাবলির মধ্যেও রামায়ণীয় কাঠামো বজায় আছে। বনবাসে থাকা রামের কাছে ভরতের আগমন, পিতা দশরথের মৃত্যুসংবাদ প্রদান, রামকে অযোধ্যায় ফিরে গিয়ে রাজ্যভার গ্রহণের অনুরোধ, এবং রামের প্রত্যাখ্যান করে নিজের পাদুকা ভরতের হাতে তুলে দেওয়া—এসবই সেখানে বর্ণিত হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে। বৌদ্ধ সাহিত্য কেন এত বিস্তারিতভাবে রামের জীবনকাহিনি গ্রহণ করবে, যদি সেই কাহিনি সম্পূর্ণ কাল্পনিক হত? নিছক একটি ব্রাহ্মণ্য পৌরাণিক চরিত্রকে বৌদ্ধ ঐতিহ্য এত গভীরভাবে আত্মস্থ করার প্রয়োজন ছিল না। বরং মনে হয়, রামের কাহিনি ইতিমধ্যেই ভারতীয় সমাজে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে বৌদ্ধ সাহিত্যও তাকে উপেক্ষা করতে পারেনি।
আরও দুটি জাতক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: “অজ্ঞাতনামা রাজার জাতককাহিনি” এবং “দশ ঐশ্বর্যের অধিকারী রাজার নিদান”। যদিও মূল সংস্করণগুলি হারিয়ে গেছে, তবুও তাদের চীনা অনুবাদ সংরক্ষিত আছে। প্রথমটি ২৫১ খ্রিস্টাব্দে এবং দ্বিতীয়টি ৪৭২ খ্রিস্টাব্দে অনূদিত হয়েছিল। এই তথ্য দেখায় যে রামকাহিনি শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে বহু দূর পূর্ব এশিয়াতেও পৌঁছে গিয়েছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জাতকগুলির রচনাকাল প্রায় বাল্মীকি রামায়ণের সমসাময়িক। ফলে যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যায়, বাল্মীকি এবং বৌদ্ধ জাতক উভয়ই সম্ভবত আরও প্রাচীন কোনও মৌখিক কাহিনি বা লোকগাথা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছিল। সেই গাথা হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুখে মুখে প্রচারিত হয়েছিল।
জৈন সাহিত্যও একইরকম তাৎপর্য বহন করে। জৈন রামায়ণগুলি সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও কন্নড় ভাষায় রচিত হয়েছে। বিমল সূরির পউমচরিয়ম থেকে শুরু করে নাগচন্দ্রের পম্পা রামায়ণ পর্যন্ত অসংখ্য জৈন রচনায় রামের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যদিও এইসব কাহিনিতে বাল্মীকির বর্ণনা থেকে কিছু পার্থক্য আছে, তবুও মূল চরিত্র, ঘটনাক্রম এবং নৈতিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রমাণ আসে এক সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ গ্রন্থ থেকে। সেটি হল কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। এটি কোনও ধর্মীয় কাব্য নয়, কোনও পুরাণও নয়। রাষ্ট্রনীতি, প্রশাসন, নৈতিকতা ও শাসনকৌশল নিয়ে রচিত এই গ্রন্থ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ এটি বাল্মীকির লিখিত রামায়ণেরও পূর্ববর্তী হতে পারে।
কৌটিল্য যখন ছয়টি মানবিক দুর্বলতার আলোচনা করছেন—কাম, ক্রোধ, লোভ, মান, মদ ও হর্ষ—তখন তিনি উদাহরণ হিসেবে কয়েকজন অতীত শাসকের পতনের কথা উল্লেখ করেন। সেই সূত্রেই তিনি লিখেছেন, “অহংকারে উন্মত্ত হয়ে (সে) পরস্ত্রীদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল; আর দুর্যোধনও রাজ্যের অংশ প্রদান করতে রাজি হয়নি।”
অর্থাৎ, অহংকারের বশে রাবণ অন্যের স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছিলেন, আর দুর্যোধন নিজের রাজ্যের অংশ ছাড়তে চাননি। ফলে উভয়েরই পতন হয়েছিল।
দ্বিতীয় অংশটি নিঃসন্দেহে মহাভারতের প্রসঙ্গ। প্রথম অংশে “অন্যের স্ত্রী” বলতে সীতাকেই বোঝানো হয়েছে। কৌটিল্য এখানে রাম এর নাম উল্লেখ করেননি, কারণ প্রসঙ্গের জন্য তা প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু রাবণ ও সীতাহরণের উল্লেখ নিজেই রামায়ণের কাহিনিকে স্বীকার করে নেয়। অর্থাৎ কৌটিল্যের যুগে রাবণ ও সীতাহরণের ঘটনা সুপরিচিত ঐতিহাসিক-নৈতিক উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান: রামায়ণ-স্থানের সাংস্কৃতিক সাযুজ্য
১৯৭০-এর শেষভাগ ও ১৯৮০-এর গোড়ার দিকে পরিচালিত “Archaeology of the Rāmāyaṇa Sites” প্রকল্পে পাঁচটি স্থান খনন করা হয়। এগুলি হল অযোধ্যা, শৃঙ্গবেরপুর, ভরদ্বাজ আশ্রম, চিত্রকূট এবং নন্দীগ্রাম। এই পাঁচটি স্থানই রামায়ণের কাহিনির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই পাঁচটি স্থানেই নিম্নস্তরে Northern Black Polished Ware বা NBPW সংস্কৃতির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। Birbal Sahni Institute of Palaeobotany-এর Carbon-14 পরীক্ষার ভিত্তিতে অযোধ্যার NBPW স্তরের সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতক থেকে চতুর্থ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত।
অবশ্য কেবল একই ধরনের মৃৎপাত্র পাওয়া গেলেই রামায়ণের ঐতিহাসিকতা প্রমাণিত হয় না। কিন্তু এটি দেখায় যে এই অঞ্চলগুলি একই সাংস্কৃতিক জগতের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতেই সক্রিয় জনবসতি হিসেবে বিদ্যমান ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ভরদ্বাজ আশ্রমের প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে কোনও দৃশ্যমান ঢিবি ছিল না। সম্পূর্ণ সমতল ভূমির নীচে যে প্রাচীন স্তর লুকিয়ে আছে, তা কল্পনাও করা যায়নি। স্থানীয় লোকঐতিহ্যে যদিও স্থানটি ঋষি ভরদ্বাজের আশ্রম বলে পরিচিত ছিল, তবুও দৃশ্যমান প্রত্নচিহ্নের অভাব বিষয়টিকে সন্দেহজনক করে তুলেছিল।
খননকার্যে দেখা গেল, পৃষ্ঠের নীচেই গুপ্তযুগীয় স্থাপত্যাবশেষ রয়েছে। তারও নীচে পাওয়া গেল NBPW স্তর। কিন্তু অযোধ্যার মতো ধারাবাহিক মেঝে বা নিয়মিত বসতি সেখানে নেই। বরং বেলে দোআঁশ মাটির মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে মৃৎপাত্রের টুকরো ও নলখাগড়ার ছাপযুক্ত কাদামাটির দলা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এখানে স্থায়ী নগরজীবন ছিল না; বরং অস্থায়ী কুটিরভিত্তিক বসতি ছিল।
এটি একটি আশ্রমের ধারণার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাল্মীকি রামায়ণের রচনাকাল হিসেবে যে সময়সীমা ধরা হয়, সেই সময় ভরদ্বাজ আশ্রম সক্রিয় বসতি ছিল না। তাহলে বাল্মীকি এমন একটি স্থানকে কাহিনিতে অন্তর্ভুক্ত করলেন কীভাবে? এর একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল, ভরদ্বাজ আশ্রমের স্মৃতি ইতিমধ্যেই লোকগাথা বা মৌখিক কাহিনির মধ্যে জীবিত ছিল।
এখানেই মৌখিক ঐতিহ্যের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মৌখিক গাথা থেকে মহাকাব্য
লেখক দুটি আধুনিক উদাহরণ দিয়েছেন। ১৯৫৪ সালের কুম্ভমেলার ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং অর্থের লোভে এক বোনের হাতে ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনাগুলি সংবাদপত্র ও সরকারি নথিতে সংরক্ষিত ছিল। তবুও সেগুলি নিয়ে লোকগাথা রচিত হয়েছিল এবং আজও সেগুলি গাওয়া হয়।
অর্থাৎ আধুনিক যুগেও মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে গান, পালা বা বিরহা আকারে সংরক্ষণ করে।
যদি আজকের যুগে এমন হয়, তবে প্রাচীন যুগে কেন হবে না?
রামের জীবন যদি সমাজকে গভীরভাবে আলোড়িত করে থাকে, তবে তা নিশ্চয়ই গাথা, কীর্তন, পালা বা লোককবিতার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান ছিল। পরবর্তী কালে যখন লিখনপদ্ধতির বিস্তার ঘটে, তখন সেই মৌখিক কাহিনি এক সুসংহত মহাকাব্যের রূপ নেয়। বাল্মীকি সম্ভবত সেই দীর্ঘ লোকঐতিহ্যকেই সাহিত্যিক রূপ দিয়েছিলেন।
শিল্পকলার সাক্ষ্য: শতাব্দী অতিক্রমী স্মৃতি
রামায়ণের শিল্পরূপ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। টেরাকোটা, পাথরের ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় রামের জীবনচিত্র ভারতবর্ষজুড়ে বিস্তৃত।
কৌশাম্বীর খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয়-প্রথম শতকের টেরাকোটায় সীতাহরণের দৃশ্য, নচাড়া খেরার রামমূর্তি, জিন্দের হনুমান-অশোকবাটিকা ফলক, নাগার্জুনকোণ্ডার ভরত-রাম সাক্ষাৎ, নাচনা-কুঠারার সীতাহরণ, পট্টদাকালের রামসেতু নির্মাণ—সবই দেখায় যে রামায়ণ বহু শতাব্দী ধরে শিল্পীদের কল্পনাকে প্রভাবিত করেছে।
আরও বিস্ময়কর হল ভারতসীমার বাইরে এর প্রভাব। ইন্দোনেশিয়ার প্রাম্বানান মন্দির এবং কম্বোডিয়ার অংকোর ওয়াটে রামায়ণের দৃশ্যাবলি খোদিত হয়েছে। অর্থাৎ রামকাহিনি ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়িয়ে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছিল।
এই সমস্ত প্রমাণ একত্রে বিচার করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। রামকে আধুনিক অর্থে নথিবদ্ধ ঐতিহাসিক সম্রাটের মতো প্রমাণ করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁকে নিছক কবিকল্পিত পৌরাণিক চরিত্র বলাও অত্যন্ত সরলীকৃত সিদ্ধান্ত হবে।
বৌদ্ধ, জৈন ও ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য, প্রত্নতাত্ত্বিক সাযুজ্য, লোকঐতিহ্য, মৌখিক গাথা এবং শতাব্দীব্যাপী শিল্পরূপ—সব মিলিয়ে রাম এমন এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন, যার শিকড় ভারতীয় সভ্যতার বহু গভীরে প্রোথিত।
অতএব রামায়ণকে শুধু ধর্মীয় কাব্য হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক দীর্ঘ ও জটিল ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
টেরাকোটা শিল্পে রামকাহিনি: প্রাচীন শিল্পস্মৃতির আলোকে রামের ঐতিহাসিকতার প্রশ্ন
বর্তমান আলোচনার ক্ষেত্রে রামের জীবনচিত্রের যে শিল্পরূপগুলি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দাবি করে, তার মধ্যে টেরাকোটা নিদর্শন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ পাথরের ভাস্কর্য, মধ্যযুগীয় মন্দিরশিল্প বা চিত্রকলার তুলনায় টেরাকোটা শিল্পের কিছু নমুনা আমাদের অনেক প্রাচীন স্তরে নিয়ে যায়। এই মাটির ফলকগুলি শুধু শিল্পবস্তু নয়; এগুলি প্রাচীন জনসমাজের স্মৃতি, বিশ্বাস, কাহিনি ও সাংস্কৃতিক চেতনার দৃশ্যমান দলিল।
এই প্রসঙ্গে প্রথমে হরিয়ানার নচাড়া খেরা থেকে পাওয়া একটি টেরাকোটা ফলকের কথা স্মরণ করা যায়। এতে রাম ও সীতার পঞ্চবটীতে গমন বা পঞ্চবটী-পর্বের সঙ্গে যুক্ত একটি দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। ফলকটির একটি অংশ ভগ্ন হলেও তার উপর উৎকীর্ণ ব্রাহ্মী লিপির সাহায্যে দৃশ্যটির পরিচয় নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। লিপির অক্ষররীতি আনুমানিক চতুর্থ শতকের। এই ফলকে রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের সেই স্মৃতি ধরা আছে, যেখানে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ বনবাসের পথে পঞ্চবটীতে পৌঁছান এবং পরবর্তী ঘটনাবলির সূত্রপাত ঘটে।
হরিয়ানার জিন্দ থেকে পাওয়া আরেকটি টেরাকোটা ফলকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এতে লঙ্কার অশোকবাটিকায় হনুমানের তাণ্ডবের দৃশ্য অঙ্কিত হয়েছে। সীতার সঙ্গে সাক্ষাতের পর হনুমান রাবণের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে অশোকবাটিকার একাংশ ধ্বংস করেন। ফলকটির নিম্নাংশে ব্রাহ্মী লিপিতে এই দৃশ্যের পরিচয়ও উৎকীর্ণ আছে। এই লিপিও আনুমানিক চতুর্থ শতকের। ফলে এই দুটি ফলক শুধু শিল্পরূপ হিসেবে নয়, শিলালিপিযুক্ত প্রমাণ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলি দেখায় যে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে উত্তর ভারতের শিল্পীসমাজ রামায়ণের নির্দিষ্ট পর্বগুলিকে চিহ্নিত ও রূপায়িত করছিল।
আরও পেছনে গেলে আমরা রামের নিজস্ব একটি টেরাকোটা প্রতিমূর্তির সন্ধান পাই। কুষাণ যুগের শিল্পরীতিতে নির্মিত এই প্রতিমূর্তিতে রামের নামই ব্রাহ্মী অক্ষরে উৎকীর্ণ রয়েছে। লিপির ধরন আনুমানিক তৃতীয় শতকের। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের LA County Museum of Art-এ সংরক্ষিত, যদিও এর উৎসস্থান হিসেবে হরিয়ানার নচাড়া খেরার উল্লেখ করা হয়। মূর্তিটির ডান হাত অভয়মুদ্রায়, পিঠের দিকে তূণীরভর্তি বাণের আভাস, আর নিম্নবস্ত্রে স্পষ্টভাবে “Rāma” নামের উৎকীর্ণতা, সব মিলিয়ে এটি রাম-পরিচয়ের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রমাণ। নচাড়া খেরায় একটি বড় ঢিবির অস্তিত্ব আছে। অনুমান করা হয়, তার অন্তর্গত স্তরে হয়তো রাম-উৎসর্গীকৃত কোনও ইটনির্মিত মন্দির বা উপাসনাস্থলের অবশেষ লুকিয়ে থাকতে পারে।
সবশেষে উত্তরপ্রদেশের কৌশাম্বী থেকে পাওয়া টেরাকোটা ফলকটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের এই ফলকে রাবণের হাতে অপহৃত সীতাকে দেখা যায়। রাবণ তাঁকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, আর সীতা নিজের অলংকারগুলি নীচে ফেলে দিচ্ছেন, এই আশায় যে কেউ সেগুলি দেখে তাঁর অবস্থানের সন্ধান পাবে এবং রামের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেবে। এই দৃশ্য বাল্মীকির রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের বর্ণনার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়।
এই কৌশাম্বী টেরাকোটার গুরুত্ব এখানেই যে এটি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের শিল্পপ্রমাণ। অর্থাৎ বাল্মীকির রামায়ণ যখন লিখিত রূপ নিচ্ছে বলে অনুমান করা হয়, প্রায় সেই সময়েই রামকাহিনির নির্দিষ্ট দৃশ্য শিল্পে রূপায়িত হচ্ছে। এই সময়কালেই বুদ্ধের জীবনচরিতও সাঁচি ও ভারহুতের শিল্পে দৃশ্যরূপ পেতে শুরু করে। আমরা যেমন সাঁচি ও ভারহুতের শিল্পচিত্রের ভিত্তিতে বুদ্ধের জীবনের নানা ঘটনাকে ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করি, তেমনি একই সময়ের রামায়ণচিত্রগুলিকেও উপেক্ষা করা যায় না।
অবশ্য শিল্পপ্রমাণ এককভাবে কোনও চরিত্রের সম্পূর্ণ জীবনবৃত্তান্ত প্রমাণ করে না। কিন্তু তা প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট কাহিনি, চরিত্র ও ঘটনা সেই যুগের জনমানসে সুপরিচিত ছিল। কৌশাম্বীর ফলক, নচাড়া খেরার রামমূর্তি এবং জিন্দের অশোকবাটিকা ফলক একত্রে দেখায় যে রামায়ণ কেবল পরবর্তী ভক্তিকালীন কল্পনা নয়; বরং প্রাচীন ভারতীয় সমাজে তা বহু আগে থেকেই শিল্পের ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছিল।
সুতরাং প্রশ্নটি চিন্তার দাবি রাখে। সাঁচি ও ভারহুতের বৌদ্ধ শিল্পকে যদি আমরা বুদ্ধজীবনের ঐতিহাসিক স্মৃতির বাহক হিসেবে গ্রহণ করি, তবে একই কালপর্বের রামায়ণ-টেরাকোটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার যুক্তি কোথায়? বিচার যদি একই মানদণ্ডে হয়, তবে রামকাহিনির প্রাচীন শিল্পপ্রমাণও যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
রামের ঐতিহাসিকতা বিচার করার একমাত্র প্রমাণ কি সমসাময়িক শিলালিপি?
রামের ঐতিহাসিকতার একমাত্র বিচারক কি সমকালীন শিলালিপি?
এর আগে আমরা রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ টেরাকোটা প্রতিমূর্তির কথা আলোচনা করেছি, যার উপর তৃতীয় শতকের ব্রাহ্মী লিপিতে স্পষ্টভাবে “রাম” নাম উৎকীর্ণ রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান নিদর্শন। কারণ এটি প্রমাণ করে যে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যেই রাম এমন এক সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন, যাঁর পরিচয় লিপিবদ্ধ শিল্পরূপে প্রকাশিত হচ্ছিল। কিন্তু তবুও এক বিশেষ শ্রেণির মানুষের কাছে এই প্রমাণ যথেষ্ট বলে মনে হয় না। তাঁদের দাবি, রামের ঐতিহাসিকতা স্বীকার করতে হলে অবশ্যই তাঁর জীবদ্দশার সমসাময়িক কোনও শিলালিপি বা লিখিত দলিল দেখাতে হবে। সেই ধরনের প্রত্যক্ষ “সমকালীন” প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা রামকে ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি নন।
প্রথম দর্শনে এই দাবি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হতে পারে। ইতিহাসচর্চায় সমকালীন নথির গুরুত্ব যে অপরিসীম, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যাটি হল, এই দাবি বাস্তব ঐতিহাসিক পদ্ধতির সঙ্গে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি খুব কম মানুষই ভেবে দেখেন। কারণ যদি এই যুক্তিকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে প্রাচীন বিশ্বের অসংখ্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকেই আমাদের “অঐতিহাসিক” বলে ঘোষণা করতে হবে।
প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ভারতীয় উপমহাদেশে এখনও পর্যন্ত যে প্রাচীনতম নিশ্চিত শিলালিপিগুলি পাওয়া গেছে, সেগুলি মূলত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের অশোকীয় যুগের। অশোকের পূর্ববর্তী সময়ের লিখিত লিপিপ্রমাণ অত্যন্ত দুর্লভ এবং অনিশ্চিত। অর্থাৎ তার আগে ভারতীয় সমাজে লিখনপদ্ধতির প্রচলন হয়তো সীমিত ছিল, অথবা এমন উপাদানে লেখা হত যা সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে যদি রামের সম্ভাব্য সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় এক সহস্রাব্দের দিকে স্থাপন করা হয়, যেমন অযোধ্যার Carbon-14 পরীক্ষার ফলাফল ইঙ্গিত করে, তাহলে তাঁর জীবদ্দশার কোনও শিলালিপি আবিষ্কারের প্রত্যাশা নিজেই এক ধরনের কালবৈষম্যমূলক দাবি হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ যে যুগে শিলালিপির প্রচলনই সুসংহত ছিল না, সেই যুগের একজন ব্যক্তির জন্য “সমকালীন শিলালিপি” দাবি করা ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক নিয়ম নয়; বরং প্রায় অসম্ভব এক শর্ত আরোপ করা। এটি অনেকটা এমন, যেন কেউ মহাভারতের যুগের মানুষের কাছ থেকে মুদ্রিত সংবাদপত্র দাবি করছেন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। যদি আমরা ধরে নিই যে সমকালীন শিলালিপিই কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অস্তিত্বের একমাত্র মানদণ্ড, তাহলে সেই একই মানদণ্ড কি আমরা অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করব না? উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক প্রাচীন ভারতের দুই মহাপুরুষ—গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীর।
গৌতম বুদ্ধের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি কী?
সম্রাট অশোক তাঁর ধর্মযাত্রার সময় লুম্বিনী পরিদর্শন করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন যে বুদ্ধের মাতা তাঁর পিতৃগৃহে যাওয়ার পথে সেখানেই সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। এই লোকঐতিহ্যের ভিত্তিতেই অশোক একটি স্তম্ভলিপি জারি করেন, যেখানে লেখা ছিল: “hida budhe jate”, অর্থাৎ “এখানেই বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন”। সেই সঙ্গে অঞ্চলটির করও হ্রাস করা হয়েছিল।
কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সত্য উপেক্ষা করা যায় না। বুদ্ধের জন্ম এবং অশোকের লুম্বিনী পরিদর্শনের মধ্যে প্রায় তিন শতাব্দীর ব্যবধান রয়েছে। অর্থাৎ লুম্বিনী স্তম্ভলিপি কোনওভাবেই বুদ্ধের জীবদ্দশার সমকালীন দলিল নয়। এটি পরবর্তী যুগের একটি স্মারক, যা স্থানীয় ঐতিহ্য ও লোকস্মৃতির উপর ভিত্তি করে নির্মিত।
তাহলে কি আমরা বলব, বুদ্ধের ঐতিহাসিকতা সন্দেহজনক?
ইতিহাসচর্চা কখনও এমন সরল সিদ্ধান্ত নেয় না। কারণ বুদ্ধের ক্ষেত্রে সাহিত্য, বৌদ্ধ সংঘের ধারাবাহিক স্মৃতি, প্রত্নতত্ত্ব, বিদেশি ভ্রমণকারীর বিবরণ এবং পরবর্তী শিলালিপি—সব মিলিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ এখানে সমকালীন শিলালিপির অনুপস্থিতি বুদ্ধের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার কারণ হয়ে ওঠেনি।
মহাবীরের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। তাঁর জন্ম বা জীবনের সঙ্গে যুক্ত কোনও অশোকীয় স্তম্ভলিপি নেই। কোনও সমসাময়িক “জন্মসনদ”ও পাওয়া যায় না। মহাবীর-সম্পর্কিত অধিকাংশ শিলালিপি ও প্রত্নপ্রমাণ অনেক পরবর্তী যুগের। তবুও জৈন সাহিত্য, সংঘ-ঐতিহ্য, আঞ্চলিক স্মৃতি এবং ধারাবাহিক ধর্মীয় চর্চার ভিত্তিতে মহাবীরকে নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
অতএব প্রশ্ন হল, রামের ক্ষেত্রে কেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে?
ইতিহাসচর্চার মূলনীতি হল, কোনও একটি মাত্র প্রমাণের উপর নির্ভর না করে সমস্ত উপলব্ধ তথ্যকে সমন্বিতভাবে বিচার করা। বিশেষত প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহু প্রাচীন সভ্যতার নথিপত্র সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। জলবায়ু, যুদ্ধ, রাজনৈতিক বিপর্যয়, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং উপকরণের ভঙ্গুরতা অসংখ্য দলিলকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
ভারতের আবহাওয়াও এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন ভারতে লেখার জন্য তালপাতা, ভোজপত্র, কাপড় বা কাঠের ফলক ব্যবহৃত হত। এই উপাদানগুলি হাজার হাজার বছর টিকে থাকার উপযোগী নয়। মিশরের শুষ্ক মরুভূমিতে যেমন প্যাপিরাস সংরক্ষিত থাকতে পারে, ভারতের আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় তা প্রায় অসম্ভব। ফলে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসে শিলালিপির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়াই স্বাভাবিক।
এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে যদি কেউ বলেন যে সমকালীন শিলালিপি ছাড়া কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে মানা যাবে না, তাহলে শুধু রাম নন, প্রাচীন বিশ্বের অসংখ্য চরিত্রই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবেন। এমনকি ট্রয়ের যুদ্ধ, হোমারের বর্ণিত বহু গ্রিক বীর, কিংবা চীনের প্রাচীন কিংবদন্তি শাসকদের সম্পর্কেও একই ধরনের সংশয় তৈরি হবে।
রামের ক্ষেত্রে আমাদের সামনে কী আছে?
প্রথমত, রয়েছে সাহিত্যিক ঐতিহ্য। শুধু বাল্মীকি নন, বৌদ্ধ জাতক, জৈন রামায়ণ, আঞ্চলিক কাব্য, পারসিক অনুবাদ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাহিত্যেও রামের উপস্থিতি দৃশ্যমান। এই বিস্তৃত সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিছক একক কবিকল্পনার ফল বলে মনে হয় না।
দ্বিতীয়ত, রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য। অযোধ্যা, শৃঙ্গবেরপুর, ভরদ্বাজ আশ্রম, চিত্রকূট ও নন্দীগ্রামের মতো স্থানগুলিতে একই সাংস্কৃতিক স্তরের উপস্থিতি এবং তাদের প্রাচীনত্ব রামায়ণীয় ভূগোলের সঙ্গে একটি লক্ষণীয় সাযুজ্য তৈরি করে।
তৃতীয়ত, রয়েছে শিল্পকলার প্রমাণ। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের কৌশাম্বী টেরাকোটা থেকে শুরু করে কুষাণ যুগের রামমূর্তি, নাগার্জুনকোণ্ডার ভাস্কর্য, পট্টদাকালের রামসেতু, অংকোর ওয়াট ও প্রাম্বানানের রামায়ণচিত্র—সবই দেখায় যে রামকাহিনি বহু শতাব্দী ধরে বিস্তৃত সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ ছিল।
চতুর্থত, রয়েছে লোকঐতিহ্য ও মৌখিক গাথা। ইতিহাসের বহু কাহিনি প্রথমে লিখিত দলিল নয়, লোকমুখে টিকে থাকে। পরে সেগুলি লিখিত রূপ পায়। রামায়ণের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেই ঘটনাই ঘটেছে।
এই সমস্ত প্রমাণকে একত্রে বিচার করাই ইতিহাসচর্চার দায়িত্ব। কোনও একক দলিলকে “চূড়ান্ত বিচারক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়। বিশেষত যখন সেই দলিলের অস্তিত্ব ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণেই অসম্ভব হয়ে ওঠে।
এখানে পুরনো একটি ইংরেজি প্রবাদ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক:
“Absence of evidence is no evidence of absence.”
অর্থাৎ, কোনও প্রমাণের অনুপস্থিতি নিজেই অস্থিত্বের প্রমাণ নয়। কোনও কিছুর প্রত্যক্ষ দলিল না পাওয়া মানেই তা ঘটেনি—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাস কখনও নেয় না। বরং ইতিহাস সম্ভাবনা, সাযুজ্য, বহুসূত্রীয় প্রমাণ এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার উপর দাঁড়িয়ে অতীতকে বোঝার চেষ্টা করে।
রামের ক্ষেত্রেও তাই। হয়তো তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। হয়তো তাঁর নামে কোনও সমকালীন শিলালিপিও আজ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু সাহিত্য, শিল্প, লোকঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের সম্মিলিত আলোয় তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন, যাঁকে নিছক কবিকল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ নয়।
এই কারণেই রামের ঐতিহাসিকতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে আবেগ বা অন্ধ সংশয় নয়, প্রয়োজন সুস্থ ঐতিহাসিক বোধ, তুলনামূলক বিচার এবং সমগ্র তথ্যপ্রমাণকে একত্রে দেখার মানসিকতা।
নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা





নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা