লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
২৩ জুন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি ঘিরে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠা করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদকে কেবল একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, এক বিশেষ ধরনের ‘বাঙালি নায়ক’ হিসেবে নির্মাণের চেষ্টা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তাঁর শিক্ষাগত সাফল্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে অধিষ্ঠান, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র হিসেবে পারিবারিক পরিচয়, ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত বাঙালি ভদ্রলোকের প্রতিমূর্তি এবং কাশ্মিরে তাঁর মৃত্যুকে এক বিশেষ আত্মত্যাগের কাহিনিতে পরিণত করার মধ্যে দিয়ে এই রাজনৈতিক নির্মাণ সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে আলোচনার সময় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনী বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিচার করলেই চলে না, দেখতে হয় তাঁর স্মৃতিকে পরবর্তী সময়ে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং কেন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি তাঁকে বাংলার ইতিহাসে বিশেষ প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এত আগ্রহী।
১৯৫৩ সালের ২৩ জুন কাশ্মিরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। পরদিন কলকাতার একটি বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে যে আবেগঘন ভাষা ব্যবহার করেছিল, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সংবাদপত্রটি লিখেছিল:
“বিদ্রোহী বাঙ্গলার ঐতিহ্যবাহক প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তর নেতার জন্মভূমি হইতে বহুদূরে কাশ্মীরে নির্বাসনকালে মৃত্যু হইয়াছে এই দুঃসহ অনুভূতি বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত জনসমুদ্রকে অধিকতর বিচলিত করিয়া তোলে।” (১. আনন্দবাজার পত্রিকা, জুন ২৪, ১৯৫৩)
এখানে সংবাদ পরিবেশনের ভাষা নিছক তথ্যজ্ঞাপক নয়। ‘বিদ্রোহী বাঙ্গলার ঐতিহ্যবাহক’, ‘প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তর নেতা’, ‘জন্মভূমি হইতে বহুদূরে’ এবং ‘নির্বাসনকালে মৃত্যু’ প্রভৃতি শব্দবন্ধ শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুকে এমন এক বেদনাবিধুর জাতীয় বা আঞ্চলিক বিপর্যয় হিসেবে উপস্থিত করছে, যেখানে সংবাদ এবং শ্রদ্ধার্ঘ্যের ব্যবধান প্রায় মুছে গেছে। সংবাদপত্রটি একই দিনে কলকাতার জনজীবনে তাঁর মৃত্যুসংবাদের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করতে আরও লিখেছিল:
“সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতার সকল কাজ যেন স্তব্ধ হইয়া যায়। কাহাকেও বলিতে হয় নাই। যাহারা সারাদিনের প্রত্যাশায় সবে বিপণি সাজাইয়াছিল, তাহারা উহা বন্ধ করিয়া দেয় এবং যাহারা বিপণি খুলিতে যাইতেছিল, তাহারা উহা অবরুদ্ধ রাখিয়া ডাক্তার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির বাসভবনের দিকে যাত্রা করে।” (২. আনন্দবাজার পত্রিকা, জুন ২৪, ১৯৫৩)
এই বর্ণনা পাঠ করলে এমন ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে সমগ্র কলকাতা কিংবা বৃহত্তর বাঙালি সমাজ যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি সংবাদপত্রের আবেগঘন বর্ণনাকে সরাসরি সামগ্রিক জনমতের প্রতিফলন হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক। সংবাদপত্র নিজেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একজন সক্রিয় নির্মাতা। সে কেবল ঘটনা জানায় না, কোন ঘটনাকে কত গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোন ভাষায় বর্ণনা করা হবে এবং কোন আবেগকে পাঠকের কাছে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করা হবে, সেই কাজও করে।
এই কারণেই একই সময়ের অন্য সংবাদপত্রের ভাষ্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর পর কলকাতার একটি প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক তাঁকে সম্মান জানালেও তার ভাষা ছিল অনেক সংযত। ‘অকাল প্রয়াণ’ প্রসঙ্গে সেই দৈনিকের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল:
“শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুসংবাদ অত্যন্ত দুঃখের এবং আমরাও এই দুঃখের অংশভাগী। পশ্চিমবাংলার জনমানসে এই মৃত্যুসংবাদ এক শোকের আবহের জন্ম দিয়েছে। যারা তাঁর মত ও পথের শরিক নন, তাঁরাও তাঁকে সুবক্তা এবং বিশিষ্ট পার্লিয়ামেন্টারিয়ান বলে সম্মান করে থাকেন। বহু মানুষই যখন কাশ্মির সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন, সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।” (3. The Statesman, Jun 24, 1953)
দুটি সংবাদপত্রের ব্যবহৃত ভাষার তফাত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি সংবাদপত্র তাঁকে প্রায় সমগ্র বাংলার ‘প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তর নেতা’ হিসেবে স্থাপন করছে, অন্যটি তাঁর রাজনৈতিক মতের সঙ্গে মতবিরোধের বিষয়টিও স্বীকার করছে এবং তাঁর প্রতি সম্মানকে প্রধানত সুবক্তা ও সংসদীয় নেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখছে। এই পার্থক্য দেখায় যে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতি নিয়ে একরৈখিক জনমত ছিল না। তাঁর সমর্থক ছিলেন, তাঁর মৃত্যুতে ব্যাপক শোকও সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু সেই শোককে সমগ্র বাঙালির সর্বসম্মত রাজনৈতিক স্বীকৃতি বলে ধরে নেওয়া ইতিহাসসম্মত নয়।
এই পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় বহু দশক পরে শ্যামাপ্রসাদকে আবারও ‘বাঙালির স্বাভাবিক নায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ২০২০ সালের কাছাকাছি সময়ে একটি বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তাঁর ব্যক্তিত্ব তুলে ধরতে লেখা হয়েছিল: “ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বাঙালি। উচ্চশিক্ষিত। মেধাবী।… স্যর আশুতোষের পুত্র স্নাতকে ইংরেজি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস। আইনে পারদর্শী। সব থেকে কম বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আসলে বাঙালি যেমন নায়ক চায়, শ্যামাপ্রসাদ ঠিক তেমনই ছিলেন।”
এই বর্ণনায় একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের মানদণ্ড লক্ষ করার মতো। তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে অবস্থান, ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক, বঙ্গভঙ্গ বা দেশভাগের সময়কার ভূমিকা, হিন্দু মহাসভার রাজনীতি, নেহেরু মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণ, সেই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ কিংবা জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে তাঁর পোশাক, শিক্ষাগত সাফল্য, পারিবারিক মর্যাদা এবং ভদ্রলোকসুলভ ব্যক্তিত্বকে সামনে আনা হয়েছে। অথচ উনিশ ও বিশ শতকের বাংলায় উচ্চশিক্ষিত, অসামান্য মেধাবী, আইনজ্ঞ, অধ্যাপক, উপাচার্য, প্রশাসক ও রাজনীতিকের কোনো অভাব ছিল না। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে এমন কী ছিল যা শ্যামাপ্রসাদকেই ‘বাঙালি যেমন নায়ক চায়’ তার একমাত্র স্বাভাবিক নমুনা করে তোলে?
এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত তাঁর শিক্ষাগত সাফল্যের চেয়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের মধ্যে বেশি নিহিত। স্বাধীন ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারায় শ্যামাপ্রসাদের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। তিনি হিন্দু মহাসভার গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন এবং পরে ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেন। বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টি নিজেকে সেই জনসঙ্ঘের রাজনৈতিক উত্তরসূরি বলে দেখে। ফলে বাংলায় এমন একজন ঐতিহাসিক বাঙালি মুখের প্রয়োজন, যাঁর মাধ্যমে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে কেবল বহিরাগত উত্তর ভারতীয় মতাদর্শ হিসেবে নয়, বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও দেখানো যায়। এই প্রেক্ষাপটে শ্যামাপ্রসাদ স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির কাছে মূল্যবান প্রতীক হয়ে ওঠেন।
কলকাতা বন্দরের নাম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামে পরিবর্তন করার ঘোষণাকেও এই বৃহত্তর স্মৃতিরাজনীতির বাইরে দেখা কঠিন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কলকাতা বন্দরের দেড়শো বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর নাম পরিবর্তনের ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্তকে নিছক একজন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা বাঙালি শিক্ষাবিদের স্মৃতিরক্ষা হিসেবে দেখলে রাজনৈতিক তাৎপর্যের বড় একটি অংশ অধরা থেকে যায়। কারণ নামকরণ কখনোই নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক কাজ নয়। রাষ্ট্র যখন কোনো বন্দর, সড়ক, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠান বা সরকারি প্রকল্পের নাম কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে করে, তখন সেই ব্যক্তিকে একটি অনুমোদিত জাতীয় স্মৃতির অংশ করে তোলে। বর্তমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে শ্যামাপ্রসাদের গুরুত্ব তাই তাঁর জীবনের বাইরেও বিস্তৃত।
এই নির্মাণের সামনে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অসুবিধাগুলোর একটি হল সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। বাংলায় সুভাষচন্দ্রের জনপ্রিয়তা দলীয় রাজনীতির বহু ঊর্ধ্বে। জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিক বিরোধিতা এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রশ্নে তাঁর অবস্থানকে শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক পথের সঙ্গে সহজে মিলিয়ে দেওয়া যায় না। বরং বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টতই পরস্পরবিরোধী ছিল।
সুভাষচন্দ্র ১৯৪০ সালের মে মাসে সাম্প্রদায়িক সংগঠন সম্পর্কে লিখেছিলেন:
“একটা সময় ছিল যখন কংগ্রেসের বিখ্যাত নেতারা হিন্দু মহাসভা কিম্বা মুসলিম লিগের মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সদস্য হতে পারতেন। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। এইসব সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো আগের চাইতে আরও বেশি বেশি করে সাম্প্রদায়িক চরিত্র অর্জন করছে। ফলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সংবিধানে এমনই ধারা প্রবর্তন করা উচিত যাতে হিন্দু মহাসভা কিম্বা মুসলিম লিগের মতো কোনও সাম্প্রদায়িক দলের কোনও সদস্য কংগ্রেসের নির্বাচিত সদস্য না হতে পারেন।” (8. Forward Block, May 4, 1940)
এই মন্তব্যে হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগ উভয়কেই সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক বিরোধিতা কোনো একক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সংগঠনের বিরুদ্ধে ছিল না; তাঁর আপত্তি ছিল ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি করে তোলার প্রবণতার বিরুদ্ধে। এই জায়গাতেই শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভাকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে তাঁর গভীর মতবিরোধ তৈরি হয়।
১৯৪০ সালের কলকাতা পৌর নির্বাচনের প্রেক্ষাপটেও এই দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। সুভাষচন্দ্র হিন্দু মহাসভার নির্বাচনী কৌশলের সমালোচনা করে লিখেছিলেন:
“হিন্দু মহাসভার নেতৃবৃন্দ এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে পথাবলম্বন করেছেন তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। তাঁরা কোন সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হননি। তাঁদের প্রার্থীদের কাজই ছিল যে করেই হোক কংগ্রেস ম্যুনিসিপ্যাল অ্যাসোসিয়েশানকে ভেঙে দেওয়া এবং ব্রিটিশ সরকারের মনোনীত গ্রুপের মনোনীত কাউন্সিলরদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে কর্পোরেশনে একটা ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলা যায় ! ব্রিটিশ আধিপত্যের নিগড় থেকে কলকাতা ম্যুনিসিপ্যালিটিকে মুক্ত করার বিপরীতে হিন্দু মহাসভার মুখ্য কাজই হয়ে উঠেছিল কংগ্রেসকে ভেঙে অবদমিত করা।” (The Logical Indian, October 22, 2018)
এই অভিযোগের ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ হিন্দু মহাসভার রাজনীতিকে কেবল মুসলিম লিগের বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের জটিলতা বোঝা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কংগ্রেস যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, হিন্দু মহাসভার রাজনীতির একটি অংশ বিভিন্ন প্রদেশে প্রশাসনিক সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছিল। এই রাজনৈতিক পটভূমি শ্যামাপ্রসাদের মূল্যায়নে অগ্রাহ্য করা যায় না।
স্বাধীনতার পরে অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক পথের আরেকটি জটিল দিক সামনে আসে। শ্যামাপ্রসাদ স্বাধীন ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন এবং শিল্প ও সরবরাহ দপ্তরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি একদিকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে হিন্দু স্বার্থ অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন, অন্যদিকে নেহেরুর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার অংশ হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৯৫০ সালে নেহেরু লিয়াকত চুক্তির প্রশ্নে মতবিরোধের জেরে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন পর্যায় শুরু করে। ফলে তাঁকে কেবল ‘কংগ্রেসবিরোধী’ বা কেবল ‘সরকারবিরোধী’ নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বাস্তব জটিলতা ধরা পড়ে না। ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই তিনি রাজনীতি করেছেন।
কাশ্মির প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা আজকের রাজনৈতিক প্রচারে আরও বেশি সরলীকৃত হয়েছে। প্রচলিত হিন্দুত্ববাদী বয়ানে তাঁকে এমনভাবে তুলে ধরা হয় যেন ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের বিরোধিতা করতে গিয়েই তিনি কাশ্মিরে জীবন দিয়েছিলেন। বাস্তব ইতিহাস অবশ্য এর চেয়ে জটিল। ১৯৪৯ সালে সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হওয়ার সময় শ্যামাপ্রসাদ নেহেরুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। এ থেকে একা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে অনুচ্ছেদের প্রতিটি শব্দের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সম্মতি ছিল, কিন্তু এটিও সত্য যে সে সময় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে এই প্রশ্নে পদত্যাগ করেননি। তাঁর প্রকাশ্য ও তীব্র বিরোধিতা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে জম্মুর প্রজা পরিষদ আন্দোলন ও জনসঙ্ঘের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তীব্র হয়।
এই বিষয়টি নিয়ে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সাংসদ হাসনাইন মাসুদি এবং অন্যান্য লেখক বহুবার উল্লেখ করেছেন যে কাশ্মিরের বিশেষ সাংবিধানিক অবস্থান গঠনের সময় শ্যামাপ্রসাদ কেন্দ্রীয় সরকারের বাইরে ছিলেন না। একইভাবে সংবিধানসভায় জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ ব্যবস্থার প্রশ্নে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আজকের রাজনৈতিক ভাষ্যে নেহেরুকে একমাত্র স্থপতি এবং প্যাটেল বা শ্যামাপ্রসাদকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে স্থাপন করা ইতিহাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না।
এ জি নুরানির কাশ্মিরের সাংবিধানিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা এই জটিলতা বুঝতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আলোচনার সূত্র ধরে সুভাষ ঘাটাদে এবং অন্যান্য গবেষক দেখিয়েছেন যে নেহেরু, শেখ আবদুল্লা, গোপালস্বামী আয়েঙ্গার, প্যাটেল এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্য সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে জম্মু ও কাশ্মিরের সাংবিধানিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এটি কোনো এক ব্যক্তির একতরফা সিদ্ধান্ত ছিল না। প্যাটেল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ আপত্তি সামলাতে এবং আয়েঙ্গারের প্রস্তাবকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফলে বর্তমান সময়ের দলীয় প্রচারে প্যাটেলকে ৩৭০ অনুচ্ছেদের মৌলিক বিরোধী হিসেবে দেখানো হলেও ঐতিহাসিক নথি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে।
শ্যামাপ্রসাদের ১৯৫৩ সালের চিঠিপত্রও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। তিনি জম্মু ও কাশ্মিরের ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় এবং সাংবিধানিকভাবে সুস্পষ্ট করার দাবি জানাচ্ছিলেন। তাঁর দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির প্রশ্নে জম্মু ও কাশ্মিরের গণপরিষদের প্রস্তাব, মৌলিক অধিকার, নাগরিকত্ব, সর্বোচ্চ আদালতের এখতিয়ার, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং আর্থিক সংযুক্তির মতো ভারতীয় সংবিধানের কয়েকটি বিষয় রাজ্যে প্রয়োগ করা। নেহেরু তাঁর উত্তরে জানান যে ভারত সরকার ও জম্মু কাশ্মির সরকারের মধ্যে পূর্ববর্তী আলোচনায় কিছু সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি একতরফাভাবে মীমাংসাযোগ্য নয়। ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারির এই পত্রালাপ থেকে স্পষ্ট যে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ ছিল গভীর, কিন্তু তা আজকের রাজনৈতিক স্লোগানের মতো সরল ‘৩৭০ পক্ষে বনাম ৩৭০ বিপক্ষে’ বিভাজন ছিল না।
অশোক চট্টোপাধ্যায় এই বিতর্ক প্রসঙ্গে লিখেছেন যে জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ অবস্থান নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ নেহেরু ও শেখ আবদুল্লার সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিষয়ে তাঁর অবস্থান বর্তমান রাজনৈতিক প্রচারে যে রূপে দেখানো হয়, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক জটিল। তিনি লিখেছেন যে ১৯৫৩ সালের ৯ জানুয়ারির চিঠিতে শ্যামাপ্রসাদ জম্মু ও কাশ্মিরের ভারতের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন এবং পরবর্তীকালে দিল্লি চুক্তির বাস্তবায়ন সম্পর্কেও মত দেন। (দ্র: অশোক চট্টোপাধ্যায় : হিন্দুত্ববাদী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রসঙ্গে। বহুবচন প্রকাশনী। হালিশহর। ২০২০ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ. ১৩-১৪)
১৭ ফেব্রুয়ারির কাছাকাছি সময়ের পত্রালাপের ব্যাখ্যায়ও চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে জম্মু কাশ্মিরের ভারতের সঙ্গে সাংবিধানিক সম্পর্কের প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানবাদী অবস্থানে ছিলেন না। বরং কীভাবে রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন এবং ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্ক নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে নেহেরুর বিরোধ ক্রমশ তীব্র হয়েছিল। (দ্ৰ: অশোক চট্টোপাধ্যায় : প্রাগুক্ত। পৃ. ১৪)
১৯৫৩ সালের ১১ মে শ্যামাপ্রসাদ অনুমতি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ অমান্য করে জম্মু ও কাশ্মিরে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাঁকে আটক করা হয়। পরবর্তীকালে তাঁকে শ্রীনগরে আটক রাখা হয় এবং ২৩ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ, চিকিৎসার প্রকৃতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল। তাঁর মা যোগমায়া দেবীও তদন্তের দাবি করেছিলেন। নেহেরু তাঁকে লেখা চিঠিতে জানান যে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে মৃত্যুর মধ্যে কোনো রহস্য আছে বলে মনে করেননি এবং বন্দিদশায় শ্যামাপ্রসাদকে যথাসম্ভব সুযোগসুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। ফলে তাঁর মৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চললেও এটিকে প্রমাণিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করার মতো ঐতিহাসিক ঐকমত্য নেই।
এখানেই ‘আত্মবলিদান দিবস’ কথাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য। মৃত্যু এবং আত্মবলিদান এক জিনিস নয়। আত্মবলিদান শব্দটি কোনো মৃত্যুকে একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ রাজনৈতিক ত্যাগের মর্যাদা দেয়। ফলে ২৩ জুনকে ‘আত্মবলিদান দিবস’ বলা মানে কাশ্মিরে শ্যামাপ্রসাদের শেষ রাজনৈতিক অভিযানকে একটি বৃহত্তর জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অনুরূপ নৈতিক উচ্চতায় স্থাপন করা। দলীয় স্মৃতির ক্ষেত্রে এটি বোধগম্য, কিন্তু ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই ভাষা যাচাই দাবি করে।
একইভাবে ৬ জুলাই তাঁর জন্মদিনকে ঘিরে যে স্মৃতিরাজনীতি তৈরি হয়, তা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিজেপির জন্য বাংলায় শ্যামাপ্রসাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মূল্য হল তিনি একাধারে বাঙালি, উচ্চশিক্ষিত, হিন্দু মহাসভার নেতা, জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা এবং কাশ্মির প্রশ্নে একটি সুপরিচিত প্রতিবাদী মুখ। অর্থাৎ তাঁর জীবনের মধ্যে এমন কয়েকটি উপাদান একত্র রয়েছে যা বর্তমান বিজেপির সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক ইতিহাসের সঙ্গে সহজেই যুক্ত করা যায়। এই কারণেই তাঁকে কেবল অতীতের একজন নেতা হিসেবে স্মরণ না করে বর্তমানের রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বিধানচন্দ্র রায়ের মতো নেতার উত্তরাধিকার দখলের চেষ্টা এ তুলনায় কঠিন। বিধানচন্দ্রের রাজনৈতিক পরিচয় কংগ্রেসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত এবং দেশভাগোত্তর পশ্চিমবঙ্গের পুনর্গঠন, শিল্পায়ন, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এবং প্রশাসনিক নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা এমন এক ঐতিহ্য বহন করে যা সরাসরি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারার অন্তর্গত নয়। ফলে তাঁকে ‘বিকাশপুরুষ’ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব হলেও মতাদর্শিক পূর্বপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রে সেই অসুবিধা নেই।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিচার করতে গেলে দেশভাগের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। শ্যামাপ্রসাদ বাংলা বিভাজনের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে যখন শরৎচন্দ্র বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে একটি স্বাধীন ও অবিভক্ত বাংলার পরিকল্পনা আলোচিত হচ্ছিল, তখন হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পশ্চিমবঙ্গকে পৃথক করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলে। শ্যামাপ্রসাদ এই রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যদি ভারত ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চলকে পাকিস্তানের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এই অবস্থানকে তাঁর সমর্থকেরা পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ঐতিহাসিক কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন; সমালোচকেরা এটিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিরই আরেক প্রকাশ বলে বিবেচনা করেন। ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠে দুটো দিকই স্বীকার করতে হয়। তিনি বাংলাভাগের সক্রিয় প্রবক্তা ছিলেন, এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির রাজনৈতিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিন্তু এই ভূমিকা থেকেই তাঁকে অবিভক্ত বাঙালি জাতিসত্তার স্বাভাবিক প্রতিনিধি বানানো যায় না। কারণ বাংলাভাগের বিরোধীরাও বাংলার ইতিহাসে গভীর প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি ছিলেন। শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ ভিন্ন পথ প্রস্তাব করেছিলেন। দেশভাগের সময়কার পরিস্থিতি ছিল সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড, পারস্পরিক ভয়, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের দ্বন্দ্ব এবং ব্রিটিশ শাসনের দ্রুত অবসানের তাগিদের সম্মিলিত ফল। এই বহুমাত্রিক সংকটকে এক ব্যক্তির বিজয়কাহিনিতে পরিণত করলে ইতিহাসের জটিলতা হারিয়ে যায়।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবনেও এই দ্বৈততা বারবার দেখা যায়। একদিকে তিনি হিন্দু স্বার্থের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, অন্যদিকে বাংলায় ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। একদিকে কংগ্রেসের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে স্বাধীনতার পরে নেহেরুর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন। একদিকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকাঠামোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন, অন্যদিকে কাশ্মিরের ক্ষেত্রে একটি পর্যায়ে আলোচনাভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। এই বৈপরীত্যগুলোকে সুবিধাবাদ বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন অতিসরলীকরণ, তেমনি এগুলো সম্পূর্ণ আড়াল করে তাঁকে অবিচল একমাত্রিক মতাদর্শিক যোদ্ধা হিসেবে নির্মাণ করাও ইতিহাসবিকৃতি।
বর্তমান রাজনৈতিক স্মৃতিনির্মাণের সমস্যা এখানেই। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কিছু নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য সামনে আনা হয় এবং অসুবিধাজনক অধ্যায়গুলো ক্রমশ পেছনে সরিয়ে দেওয়া হয়। শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষাগত সাফল্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যত্ব, কাশ্মিরে মৃত্যু, বাংলাভাগে ভূমিকা এবং জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা খুব বেশি উচ্চারিত হয়; কিন্তু হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ব্রিটিশ শাসনের সময়কার তাঁর কৌশলগত অবস্থান, ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণ, নেহেরু মন্ত্রিসভায় থাকা কিংবা কাশ্মির প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের বিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।
একই কারণে সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। সুভাষচন্দ্রকে বাংলার জাতীয়তাবাদী আবেগ থেকে সরানো সম্ভব নয়। আবার সুভাষচন্দ্রের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বক্তব্যকে হিন্দু মহাসভার মতাদর্শের সঙ্গে সহজে মিলিয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। ফলে একদিকে সুভাষকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়, অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদকেও বঙ্গীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। বর্তমান রাজনৈতিক প্রচারে তাই প্রায়শই এই দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক গভীরতা এড়িয়ে যাওয়া হয়।
বাঙালির ‘নায়ক’ নির্বাচনের প্রশ্নটিও এখানে ফিরে আসে। ধুতি পাঞ্জাবি, উচ্চশিক্ষা, আইনজ্ঞান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সাফল্য এবং সম্ভ্রান্ত পারিবারিক পরিচয় নিশ্চয়ই শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিত্বের অংশ। কিন্তু এগুলো কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক আদর্শের মূল্যায়ন নয়। বাঙালির ইতিহাসে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র, বিধানচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা থেকে শুরু করে অগণিত মানুষ শিক্ষা, বিজ্ঞান, সমাজসংস্কার ও রাজনীতিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। কাজেই ‘বাঙালি যেমন নায়ক চায়’ বলে শ্যামাপ্রসাদকেই একমাত্র স্বাভাবিক আদর্শ হিসেবে স্থাপন করা কোনো নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি রাজনৈতিক নির্বাচন।
আর সেই নির্বাচনের পেছনে বর্তমানের প্রয়োজন স্পষ্ট। একটি রাজনৈতিক দল যখন এমন একটি রাজ্যে নিজের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ভিত্তি নির্মাণ করতে চায় যেখানে তার মতাদর্শের স্থানীয় ঐতিহাসিক শিকড় তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তখন সে অতীত থেকে এমন ব্যক্তিত্ব খুঁজে আনে যার মাধ্যমে বর্তমানকে বৈধতা দেওয়া যায়। শ্যামাপ্রসাদ সেই কাজের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। তিনি বাঙালি, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্মানজনক, শিক্ষাগত সাফল্য অসামান্য, তিনি হিন্দু মহাসভার নেতা, জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা এবং কাশ্মির প্রশ্নে তাঁর মৃত্যু রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তরযোগ্য। ফলে তাঁর স্মৃতি বর্তমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কাছে কেবল শ্রদ্ধার বিষয় নয়, একটি কার্যকর রাজনৈতিক সম্পদ।
এই কারণেই তাঁর মূল্যায়ন যতটা আবেগের, তার চেয়ে বেশি ইতিহাসের বিষয় হওয়া উচিত। তাঁকে নিন্দা করার জন্য তাঁর জীবনের জটিলতা মুছে দেওয়া যেমন উচিত নয়, তেমনি তাঁকে নায়ক বানানোর জন্য তাঁর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনগুলোও গোপন করা উচিত নয়। ইতিহাসের কাজ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ নয়। ইতিহাসের কাজ মানুষের রাজনৈতিক আচরণকে তার সময়, স্বার্থ, মতাদর্শ, সামাজিক সংঘাত এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে বিচার করা।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে বিংশ শতকের বাংলার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে সাফল্য, সংসদীয় দক্ষতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ভূমিকা, বাংলাভাগের রাজনীতি, হিন্দু মহাসভায় নেতৃত্ব, জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা এবং কাশ্মির আন্দোলন তাঁকে ইতিহাসে স্থায়ী স্থান দিয়েছে। কিন্তু সেই স্থান কতটা প্রশংসার, কতটা সমালোচনার এবং কতটা রাজনৈতিক বিতর্কের, তার উত্তর একমাত্র কোনো দলীয় স্মৃতিচর্চা দিতে পারে না।
তাঁর জীবনকে বুঝতে হলে একই সঙ্গে দেখতে হবে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে মতপার্থক্য, সাম্প্রদায়িক সংগঠন সম্পর্কে তাঁর অবস্থান, ব্রিটিশ আমলে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল, ফজলুল হক সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা, নেহেরুর মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণ, নেহেরু লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা, জনসঙ্ঘের জন্ম, জম্মুর আন্দোলন এবং কাশ্মিরে তাঁর শেষ অভিযান। এর কোনো একটি অংশ আলাদা করে তুলে ধরে বাকিগুলো গোপন করলে যে মানুষটি সামনে আসেন, তিনি ইতিহাসের শ্যামাপ্রসাদ নন, তিনি বর্তমান রাজনীতির প্রয়োজনমতো নির্মিত শ্যামাপ্রসাদ।
এই পার্থক্যটি বোঝা আজ বিশেষ জরুরি। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই কেবল বর্তমান নিয়ে হয় না, অতীতের অধিকার নিয়েও হয়। কে বাংলার নায়ক, কে জাতীয়তাবাদী, কে দেশপ্রেমিক, কে আত্মবলিদানকারী, কে বিশ্বাসঘাতক, এই শব্দগুলোর অর্থ রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের মতো করে নির্ধারণ করতে চায়। সেই প্রচেষ্টার মধ্যেই সংবাদপত্রের ভাষা, বন্দর বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ, জন্ম ও মৃত্যুদিনের সরকারি অনুষ্ঠান, পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি এবং নির্বাচনী বক্তৃতা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
১৯৫৩ সালের ২৪ জুনের আবেগঘন সংবাদভাষা এবং বহু দশক পরে আবার শ্যামাপ্রসাদকে ‘বাঙালির কাঙ্ক্ষিত নায়ক’ হিসেবে হাজির করার প্রয়াসের মধ্যে তাই একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। প্রথমটি তাঁর মৃত্যুকে এক সর্বব্যাপী বাঙালি শোকে পরিণত করেছিল, দ্বিতীয়টি তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বাংলার স্বাভাবিক হিন্দু জাতীয়তাবাদী পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু ইতিহাসের কাজ এই দুই নির্মাণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা।
কোন শ্যামাপ্রসাদকে আমরা স্মরণ করছি? আশুতোষের মেধাবী পুত্রকে? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ উপাচার্যকে? বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার নেতাকে? ফজলুল হকের সহযোগী মন্ত্রীকে? নেহেরুর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যকে? জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতাকে? বাংলাভাগের প্রবক্তাকে? কাশ্মির আন্দোলনের নেতাকে? নাকি এই সব পরিচয়ের জটিল সমষ্টিকে?
শেষের মানুষটিই ইতিহাসের মানুষ। তাঁকে বোঝার জন্য মহিমাকীর্তন যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি কেবল নিন্দাও নয়। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের সাম্প্রদায়িক চরিত্রের সমালোচনা করতে হলে সেই সমালোচনাকে শক্তিশালী করতে হবে নির্ভুল দলিল, সমকালীন সাক্ষ্য এবং তাঁর নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাহায্যে। তাহলেই বোঝা যাবে কেন বর্তমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কাছে তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন বাংলার রাজনৈতিক স্মৃতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁকে বারবার সামনে আনা হয়।
তখন আরও পরিষ্কার হবে, শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে বর্তমানের এই আবেগ আসলে শুধু অতীতের একজন মৃত নেতাকে স্মরণ করার আবেগ নয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলার রাজনৈতিক পরিচয়কে পুনর্লিখনের চেষ্টা, হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি স্থানীয় বংশপরম্পরা নির্মাণের চেষ্টা এবং বাঙালির ঐতিহাসিক স্মৃতির ভেতরে এমন একটি ধারাকে কেন্দ্রীয় করে তোলার প্রয়াস যা একসময় বহু প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ধারার মধ্যে কেবল একটি ছিল। ইতিহাসের বিচারে তাই প্রশ্নটি শ্যামাপ্রসাদ কত বড় নেতা ছিলেন, শুধু তা নয়। আরও জরুরি প্রশ্ন হল, আজ তাঁকে কেন এত বড় করে দেখানো হচ্ছে, কোন অংশগুলো দেখানো হচ্ছে, কোন অংশগুলো আড়াল করা হচ্ছে এবং এই নির্বাচিত স্মৃতির রাজনৈতিক উপকারভোগী কারা।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে কেবল তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন, হিন্দু মহাসভার নেতৃত্ব, জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা কিংবা কাশ্মির প্রশ্নে তাঁর শেষ আন্দোলনের ভিত্তিতে বিচার করলে তাঁর রাজনৈতিক মানসগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বপর্ব আড়ালে থেকে যায়। একটু পিছিয়ে, তাঁর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকার সময়ে ফিরে গেলে এমন কয়েকটি ঘটনা চোখে পড়ে, যা তাঁর জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শিক্ষাগত দক্ষতা, প্রশাসনিক কর্মক্ষমতা এবং উচ্চশিক্ষা বিস্তারে আগ্রহ নিয়ে প্রচুর প্রশংসা হয়েছে এবং হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রের মূল্যায়নে তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি ক্ষমতা ব্যবহারের প্রকৃতিও বিচার করতে হয়। সেই বিচার করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সামরিক প্রশিক্ষণ, কুচকাওয়াজ এবং ঔপনিবেশিক পতাকাকে কুর্নিশ করা নিয়ে সংঘটিত বিতর্কটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সামরিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজের ব্যবস্থাও চালু হয়। এই কুচকাওয়াজের এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতাকা য়ুনিঅন জ্যাককে কুর্নিশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ক্রমে তীব্রতর হচ্ছে, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের স্মৃতি যখন এখনও অত্যন্ত জীবন্ত, বিপ্লবী আন্দোলনের উত্তরাধিকার যখন বাংলার তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে, তখন একটি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের শাসক সাম্রাজ্যের পতাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কুর্নিশ করতে বলা নিছক একটি প্রশাসনিক আচার ছিল না। এর স্পষ্ট রাজনৈতিক ও প্রতীকী তাৎপর্য ছিল। ছাত্রদের একাংশ সেই কারণেই এর প্রতিবাদ করে।
গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্রদের মধ্যেও এই নির্দেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা দেয়। একজন ছাত্র ব্রিটিশ পতাকাকে কুর্নিশ করতে অস্বীকার করলে তাকে শারীরিকভাবে প্রহার করা হয় এবং পরবর্তী প্রতিবাদে ধরিত্রী মুখোপাধ্যায় ও উমাপদ মজুমদারকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্রদের মধ্যে ধর্মঘট ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর ছাত্রসমাজের প্রতিবাদের বিষয় হয়ে ওঠে। (গৌতম চট্টোপাধ্যায় : স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার ছাত্রসমাজ। চারপ্রকাশ। কলকাতা। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ. ৩৭) অন্যান্য বিবরণেও ১৯৩৬ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবসের কুচকাওয়াজে ঔপনিবেশিক পতাকাকে কুর্নিশের প্রশ্ন থেকে ছাত্রবিক্ষোভ এবং বিদ্যাসাগর কলেজের শিক্ষার্থীদের শাস্তির ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই ঘটনা শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক চরিত্রের একটি দিক উন্মোচন করে। তাঁর সমর্থকেরা বলতে পারেন, উপাচার্য হিসেবে তিনি তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম, শৃঙ্খলা ও সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করছিলেন; ব্রিটিশ ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সাম্রাজ্যিক প্রতীক ব্যবহারের দায় সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া সঙ্গত নয়। কিন্তু পাল্টা প্রশ্নও থেকে যায়। একজন ভারতীয় উপাচার্য, যিনি পরবর্তী জীবনে নিজেকে প্রবল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেন, তিনি কি ছাত্রদের ঔপনিবেশিক পতাকা প্রত্যাখ্যানের অধিকারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন? উপলব্ধ বিবরণ থেকে তার উত্তর ইতিবাচক নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলার পক্ষে তাঁর অবস্থান ছাত্রদের ঔপনিবেশিক বিরোধী আবেগের সঙ্গে সংঘাতে গিয়েছিল। সেই কারণে এই ঘটনাকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি অস্বস্তিকর অথচ গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নারীর অধিকার ও হিন্দু ব্যক্তিগত আইন সংস্কারের প্রশ্নেও শ্যামাপ্রসাদের অবস্থান ঘিরে তীব্র বিরোধ ছিল। স্বাধীনতার পরে হিন্দু সমাজের বিবাহ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, বিবাহবিচ্ছেদ ও দত্তক গ্রহণের মতো বিষয়গুলিকে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠনের উদ্যোগ থেকেই হিন্দু আইনসংহিতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম হয়। এই আইনি সংস্কারের পক্ষে নারী আন্দোলনের নেত্রী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী ও সমাজসংস্কারকেরা সভা, আলোচনা ও প্রচার চালিয়েছিলেন। মণিকুন্তলা সেনের স্মৃতিকথায় এমন একটি সভার বিবরণ রয়েছে, যেখানে হিন্দু আইনসংহিতার পক্ষে প্রচারের উদ্দেশ্যে য়ুনিভার্সিটি ইনস্টিট্যুট হলে একটি সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছিল এবং প্রধান বক্তা ছিলেন সরোজিনী নাইডু। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী শ্যামাপ্রসাদের সমর্থকেরা সেখানে প্রবেশ করে সভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করেছিলেন এবং এক পর্যায়ে সভামঞ্চ দখল করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলেন। (দ্র: মণিকুন্তলা সেন : সেদিনের কথা। নবপত্র প্রকাশন। কলকাতা। ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ সংস্করণ। পৃ. ২৩৭-২৪০)
এই ঘটনাটির তাৎপর্য শুধু একটি সভা ভণ্ডুল হওয়া বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সমাজ কোন পথে এগোবে, বিশেষত পরিবার ও সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারীর অধিকার কতটা সম্প্রসারিত হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। হিন্দু আইনসংহিতা নিয়ে তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবল মতবিরোধ ছিল। কংগ্রেসের মধ্যেও আপত্তি ছিল, ধর্মীয় রক্ষণশীলদের বিরোধিতা ছিল আরও তীব্র। ফলে শ্যামাপ্রসাদের অবস্থানকে তাঁর বৃহত্তর সামাজিক রক্ষণশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে হয়। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শুধু জাতীয় সংহতি বা কাশ্মির প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সামাজিক সংস্কারের এই গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কগুলি বিস্মৃত হয়ে যায়।
বর্তমান হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার পেছনে ঐতিহাসিক ও সাংগঠনিক কারণ রয়েছে। ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক পূর্বসূরি। বাংলায় বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন একজন বাঙালি নেতার প্রয়োজন, যাঁকে একই সঙ্গে শিক্ষিত ভদ্রলোক, জাতীয়তাবাদী, হিন্দু স্বার্থের প্রবক্তা এবং সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। শ্যামাপ্রসাদের জীবন সেই রাজনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে অনেকাংশেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই কারণেই তাঁকে কেন্দ্র করে স্মারক বক্তৃতা, জন্মদিন পালন, প্রয়াণ দিবস, প্রতিষ্ঠান ও বন্দরের নামকরণ এবং পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ইতিহাসে তাঁর ভূমিকার পুনঃপ্রচার ক্রমে রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করেছে।
তবে শ্যামাপ্রসাদকে ‘বাঙালির স্বাভাবিক নায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তাঁর জীবন থেকে কয়েকটি বেছে নেওয়া অংশ সামনে আনতে হয় এবং কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আড়াল করতে হয়। তাঁর পোশাক, উচ্চশিক্ষা, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র হওয়া, অল্প বয়সে উপাচার্য হওয়া, সংসদীয় দক্ষতা এবং কাশ্মিরে মৃত্যু সহজেই জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রতিমা নির্মাণে কাজে লাগে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব, হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক, ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সংঘাত, হিন্দু আইনসংহিতার মতো সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নে তাঁর রক্ষণশীলতা এবং বাংলাভাগে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা একই সঙ্গে আলোচিত হলে সেই প্রতিমা অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে।
এই স্মৃতিরাজনীতির মোকাবিলায় আবেগের বদলে ইতিহাসের দলিল জরুরি। কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা যদি শ্যামাপ্রসাদকে জাতীয়তাবাদী নায়ক হিসেবে স্মরণ করতে চান, তা তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার। একইভাবে তাঁর সমালোচকেরাও তাঁর জীবনের এমন দিকগুলি সামনে আনতে পারেন যেগুলি এই নায়কোচিত নির্মাণকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি তথ্যভিত্তিক হয়, তবে তা রাজনৈতিক গালিগালাজের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ তখন বিরোধিতার কেন্দ্রে ব্যক্তি নয়, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, সিদ্ধান্ত ও ঐতিহাসিক পরিণাম উপস্থিত থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই ইতিহাসচর্চা আরও জটিল হয়েছে বিভিন্ন বিরোধী দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে। একসময় যারা পরস্পরের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনী সমঝোতা করেছে। আবার একই দলের অতীত ও বর্তমানের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব মূল্যায়নের ভাষাতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। বিধানচন্দ্র রায়ের ক্ষেত্রে তার একটি উদাহরণ দেখা যায়। বামপন্থী আন্দোলনের এক পর্যায়ে তাঁর প্রশাসনকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা হয়েছিল। খাদ্য আন্দোলন, শ্রমিক বিক্ষোভ ও পুলিশি দমন ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহৃত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই ভাষা অনেকটাই নরম হয়েছে। বর্তমানে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিনে উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং আধুনিক পশ্চিমবঙ্গ নির্মাণে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি দিতে বামপন্থী নেতাদেরও দেখা যায়। এই পরিবর্তন নিজে অপরাধ নয়। ইতিহাসের মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে পরিণত হতে পারে। কিন্তু অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান বিস্মৃত করে নতুন প্রতিমা নির্মাণ করলে প্রশ্ন উঠবেই।
একইভাবে শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি স্থাপন, তাঁর নামে প্রতিষ্ঠান নামকরণ কিংবা স্মরণসভা নিয়ে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তার পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর স্মৃতির সরকারি স্বীকৃতি কেবল বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরের ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক সরকার তাঁর ভূমিকার নির্দিষ্ট দিক স্বীকার করেছে। ফলে বর্তমান বিজেপির শ্যামাপ্রসাদ চর্চাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু ‘কে প্রথম মূর্তি বসিয়েছিল’ ধরনের প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, কোন রাজনৈতিক শক্তি তাঁকে কোন পরিচয়ে স্মরণ করছে। শিক্ষাবিদ হিসেবে, বিরোধী সংসদীয় নেতা হিসেবে, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির প্রবক্তা হিসেবে, না হিন্দু জাতীয়তাবাদের এক ঐতিহাসিক পূর্বসূরি হিসেবে?
১৯৪৭ সালের বঙ্গভাগের ইতিহাস এই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বহন করে। ২০ জুন ১৯৪৭ বঙ্গীয় আইনসভার সদস্যরা ব্রিটিশ সরকারের ৩ জুনের ক্ষমতা হস্তান্তর পরিকল্পনার নির্দেশ অনুসারে পৃথকভাবে সভায় বসে বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে ভোট দেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যদের অধিকাংশ বঙ্গভাগের বিরুদ্ধে ভোট দেন এবং পাকিস্তানের জন্য পৃথক গণপরিষদে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন। অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যরা বঙ্গভাগের পক্ষে এবং ভারতের বিদ্যমান গণপরিষদে যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দেন। এই প্রক্রিয়ার ফলেই বাংলা বিভক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের জন্ম হয়। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণেও এই প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে।
শ্যামাপ্রসাদ এই বঙ্গভাগের অন্যতম প্রধান ও প্রকাশ্য প্রবক্তা ছিলেন। দেশভাগের পরিকল্পনা যখন কার্যত অনিবার্য হয়ে উঠছিল, তখন তাঁর যুক্তি ছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যদি পাকিস্তান গঠিত হয়, তবে বাংলার অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করা যায় না। ১৯৪৭ সালের মে মাসে মাউন্টব্যাটেনকে লেখা তাঁর চিঠিতেও এই যুক্তি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর অনুসারীরা এই অবস্থানকে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের মধ্যে রাখার সংগ্রাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সমালোচকেরা বলেন, এটি ধর্মীয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে বঙ্গভাগকে নীতিগত বৈধতা দেওয়ার রাজনীতি ছিল। ঐতিহাসিকভাবে দুই সত্যই পাশাপাশি রয়েছে। তিনি বঙ্গভাগের শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন এবং তাঁর লক্ষ্য ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চলকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখা।
কিন্তু এই ঐতিহাসিক সত্য থেকে আরেকটি অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়, যেন শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এককভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্ম হয়েছিল। বঙ্গভাগের প্রশ্নে কংগ্রেসের বৃহৎ অংশও শেষ পর্যন্ত সমর্থন জানায়। আইনসভার ভোট ছিল একটি সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও প্রবক্তা, কিন্তু একমাত্র স্থপতি নন। একই সময়ে শরৎচন্দ্র বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই প্রস্তাব ব্যর্থ হয়। ফলে ২০ জুনকে বুঝতে হলে শুধু ‘পশ্চিমবঙ্গ জন্মের আনন্দদিন’ কিংবা শুধু ‘বাঙালি জাতির বিভাজনের শোকদিন’ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল এক গভীর সংকটের দিনে গৃহীত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, পাকিস্তানের দাবি, কংগ্রেসের অবস্থান, হিন্দু মহাসভার প্রচার, উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা এবং ব্রিটিশদের দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা সবকিছু জড়িত।
বিজেপি দীর্ঘদিন ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করেছে এবং শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণ করেছে। এই দিনের তাৎপর্য নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক মতবিরোধও হয়েছে। বিজেপির দৃষ্টিতে এটি পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ হিসেবে রক্ষার ঐতিহাসিক দিন; অন্য একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি বাংলার বিভাজনের স্মৃতি, যে বিভাজনের ফল ছিল সীমান্ত, গণউদ্বাস্তুতা, সম্পদহানি এবং দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক ক্ষত। ফলে দিবসটির অর্থ নিজেই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। ২০ জুন ১৯৪৭-এর আইনসভা ভোট যে বঙ্গভাগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্ণায়ক ছিল, সেটি ঐতিহাসিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
এই দিনটিকে শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে দেখানোর প্রচেষ্টায় একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের জন্মকে একটি বিশেষ ধরনের হিন্দু রাজনৈতিক আত্মরক্ষার ইতিহাসে রূপান্তর করা সহজ হয়। তখন অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস, হিন্দু মুসলমানের যৌথ সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভাষাভিত্তিক বাঙালিত্ব কিংবা বঙ্গভাগবিরোধী বিকল্প রাজনৈতিক প্রকল্পগুলি পেছনে সরে যায়। তার জায়গায় আসে একটি সরল বয়ান: পাকিস্তানের হাত থেকে হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গকে শ্যামাপ্রসাদ রক্ষা করেছিলেন। এই বয়ানের জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে, কিন্তু ইতিহাস এর চেয়ে অনেক বেশি বহুমাত্রিক।
সঙ্ঘ পরিবারের রাজনৈতিক স্মৃতিতে শ্যামাপ্রসাদকে ‘জাতীয়তাবাদী’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘জাতীয় ঐক্যের সাধক’ এবং ‘অখণ্ডতার জন্য আত্মত্যাগী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মারক রচনায় তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাধীনতা ও জাতীয় সংহতির লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন। (১০. Organiser, July 6, 2020) এই মূল্যায়নের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। ‘নিয়মতান্ত্রিক’ স্বাধীনতার পথ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? ব্রিটিশ শাসনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থেকে রাজনৈতিক দরকষাকষি ও প্রশাসনিক অংশগ্রহণ? যদি তাই হয়, তবে শ্যামাপ্রসাদের জাতীয়তাবাদকে সুভাষচন্দ্র, ভগত সিং, সূর্য সেন, মাস্টারদা আন্দোলনের বিপ্লবীরা, কিংবা ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সংগ্রামীদের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একই মাপকাঠিতে বিচার করা যাবে না।
এখানে পার্থক্য করা জরুরি। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ না করলেই কাউকে দেশদ্রোহী বলা ইতিহাসসম্মত নয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে উদারপন্থী সাংবিধানিক রাজনীতি, অসহযোগ, অহিংস গণআন্দোলন, বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং নানা প্রাদেশিক রাজনৈতিক কৌশল পাশাপাশি ছিল। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের মূল্যায়নে বৈধ প্রশ্ন হল, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের সবচেয়ে তীব্র পর্বগুলিতে তাঁর রাজনৈতিক অগ্রাধিকার কী ছিল। বিশেষত ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তিনি বাংলার প্রাদেশিক সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন এবং আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেননি। তাঁর রাজনৈতিক মনোযোগ ছিল প্রশাসন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং হিন্দু মহাসভার সংগঠনগত লক্ষ্যকে ঘিরে। এই অবস্থানকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রণী নেতৃত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করলে তা ইতিহাসের সঙ্গে খাপ খায় না।
তাই ‘নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক’ অভিধাটি ইতিহাসের বিচারে ব্যাখ্যা দাবি করে। দেশপ্রেমের একাধিক রাজনৈতিক অর্থ থাকতে পারে। শ্যামাপ্রসাদ যে ভারতকে স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে তা অস্বীকার করা কঠিন। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানমূলক স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারায় তিনি কোনো কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন না এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ পর্বে সেই আন্দোলনের বাইরে ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক শক্তির প্রধান ভিত্তি ছিল হিন্দু মহাসভা এবং পরে জনসঙ্ঘ। ফলে তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘অগ্রণী সৈনিক’ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্পূর্ণ ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা, দুই অবস্থানই অতিরিক্ত সরলীকৃত। অধিকতর নির্ভুল ভাষায় বলা যায়, তাঁর জাতীয়তাবাদ ছিল হিন্দু রাজনৈতিক পরিচয়, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র এবং সাংবিধানিক রাজনীতির একটি বিশেষ সমন্বয়, যা কংগ্রেসের গণআন্দোলনবাদী জাতীয়তাবাদ বা বামপন্থী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতি থেকে স্পষ্টত পৃথক।
এই পার্থক্যটিই বর্তমান স্মৃতিরাজনীতিতে প্রায়শই মুছে দেওয়া হয়। শ্যামাপ্রসাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল একটানা ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস। বাস্তবে তাঁর জীবন ছিল অনেক বেশি জটিল। তিনি ব্রিটিশ ভারতের আইনসভা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছেন, প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় থেকেছেন, হিন্দু মহাসভা পরিচালনা করেছেন, দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে আন্দোলন করেছেন, স্বাধীনতার পরে নেহেরুর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন, আবার মতবিরোধের কারণে সেখান থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং শেষে জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই রাজনৈতিক পরিক্রমাকে একমাত্র ‘দেশপ্রেমিক আত্মবলিদান’-এর কাহিনিতে রূপান্তর করলে তাঁর আসল ঐতিহাসিক গুরুত্বও খাটো হয়ে যায়।
এই প্রসঙ্গে তাঁর সমালোচকদের ভাষাও পরিশীলিত হওয়া দরকার। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ‘দুর্বৃত্ত’, ‘দাঙ্গাবাজ’ কিংবা অনুরূপ বিশেষণে চিহ্নিত করলে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশ করা যায়, কিন্তু ইতিহাসের তর্ক শক্তিশালী হয় না। বরং তাঁর নিজের বক্তব্য, সংগঠনগত ভূমিকা, সমকালীন সংবাদপত্র, সরকারি নথি, ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, আইনসভার কার্যবিবরণী এবং সহযাত্রীদের স্মৃতিকথা সামনে আনলে পাঠক নিজেই তাঁর চরিত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। শ্যামাপ্রসাদের সমালোচনার জন্য যথেষ্ট ঐতিহাসিক উপাদান রয়েছে; অতিরিক্ত বিশেষণের প্রয়োজন নেই।
একই কথা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ঘিরে বর্তমান বিজেপির প্রচারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো দল তার প্রতিষ্ঠাতাকে স্মরণ করবে, তাঁর নামে অনুষ্ঠান করবে, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করবে, এতে অসংগত কিছু নেই। কিন্তু যখন তাঁকে ‘সমগ্র বাঙালির একমাত্র গ্রহণযোগ্য নায়ক’ বা ‘এককভাবে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়, তখন ঐতিহাসিক আপত্তি ওঠে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস কোনো এক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, কমিউনিস্ট, তফসিলি জাতির সংগঠন, মুসলিম লিগ, অবিভক্ত বাংলার সমর্থক, উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত, ভয়, সংঘর্ষ ও বাস্তুচ্যুতির সম্মিলিত ইতিহাস থেকে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের জন্ম।
শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা সেই ইতিহাসে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর গুরুত্ব স্বীকার করা আর তাঁকে ইতিহাসের একমাত্র নির্মাতা ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। বরং তাঁর অবস্থান যত গভীরভাবে বিচার করা হবে, তত স্পষ্ট হবে যে তিনি বাংলার ইতিহাসে একই সঙ্গে শিক্ষাবিদ, হিন্দু মহাসভার নেতা, প্রাদেশিক মন্ত্রী, বঙ্গভাগের প্রবক্তা, স্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা এবং কাশ্মির আন্দোলনের নেতা। এই পরিচয়গুলির কোনো একটি বেছে নিয়ে বাকিগুলি বাদ দিলে আমরা ইতিহাসের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি।
আজকের পশ্চিমবঙ্গে তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তাই মূলত অতীতের অর্থ নির্ধারণের লড়াই। কে বাংলার আসল নায়ক, কে দেশপ্রেমিক, কোন ঘটনাকে ‘জন্মদিন’ হিসেবে পালন করা হবে, বঙ্গভাগকে মুক্তি না ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা হবে, কাশ্মির আন্দোলনকে আত্মবলিদান না রাজনৈতিক সংঘর্ষ হিসেবে বোঝা হবে, এই সব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক দলগুলি তাদের বর্তমান প্রয়োজন অনুসারে গড়ে তুলতে চায়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হল দলীয় স্মৃতি এবং ইতিহাসের মধ্যে ব্যবধান বজায় রাখা।
শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে বিতর্ক চলবে, কারণ তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিজেই বিরোধে পূর্ণ। তিনি ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে কাজ করেছেন, আবার স্বাধীন ভারতের শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক সংগঠনকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আবার মুসলিম নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায়ও কাজ করেছেন। তিনি কংগ্রেসের সমালোচক ছিলেন, আবার নেহেরুর মন্ত্রিসভার সদস্যও হয়েছিলেন। তিনি বাংলার বিভাজনের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু তাঁর অনুসারীরা তাঁকে বাঙালির রক্ষক হিসেবে স্মরণ করেন। এই বিরোধগুলি তাঁর জীবনকে কম গুরুত্বপূর্ণ করে না; বরং আরও বেশি ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের যোগ্য করে তোলে।
সুতরাং তাঁর উত্তরাধিকারকে মোকাবিলার সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি আবেগ দিয়ে আরেক আবেগকে প্রতিহত করা নয়। প্রয়োজন দলিল, যুক্তি এবং স্মৃতির রাজনৈতিক ব্যবহারের বিশ্লেষণ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ঔপনিবেশিক পতাকাকে কুর্নিশের নির্দেশ, ছাত্রনেতাদের শাস্তি, হিন্দু আইনসংহিতা ঘিরে সংঘাত, হিন্দু মহাসভার নেতৃত্ব, বাংলাভাগের প্রচার, স্বাধীনতা আন্দোলনের গণপর্বগুলির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব এবং স্বাধীনতার পরে জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা, এই সবকিছু একসঙ্গে সামনে রাখলেই বোঝা সম্ভব কেন আজ তাঁকে ঘিরে এত তীব্র রাজনৈতিক পুনর্নির্মাণ চলছে।
এই ইতিহাসের বিচার শেষ পর্যন্ত কোনো দলের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হল, আমরা ইতিহাসকে কি তার জটিলতা নিয়ে গ্রহণ করব, না বর্তমান রাজনীতির সুবিধার জন্য তাকে সরল নায়ক ও খলনায়কের কাহিনিতে পরিণত করব। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন সেই পরীক্ষার একটি উৎকৃষ্ট ক্ষেত্র। তাঁকে সম্মান করতে হলে তাঁর সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে হবে; তাঁকে সমালোচনা করতে হলেও একই শর্ত প্রযোজ্য। ইতিহাসের কাছে কোনো প্রতিমাই প্রশ্নাতীত নয়।
১৯৪৭ সালের আগের শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বুঝতে হলে স্বাধীনতা-উত্তর জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা কাশ্মীর আন্দোলনের নেতা হিসেবে তাঁর পরবর্তী পরিচয় থেকে কিছুটা সরে এসে ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের বাংলার জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়। কারণ সেই সময়েই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার মৌল কাঠামো অনেকখানি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বিনায়ক দামোদর সাভারকরের নেতৃত্বাধীন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা, হিন্দু রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নে তাঁর দৃঢ় অবস্থান, কংগ্রেসের গণআন্দোলনের প্রতি তাঁর সংশয় এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের বদলে প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা তাঁর প্রাক-স্বাধীনতা রাজনৈতিক জীবনের কয়েকটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। সেই কারণে পরবর্তীকালে তাঁকে কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামের এক আপসহীন জাতীয়তাবাদী যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়।
চল্লিশের দশকের গোড়ায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দু মহাসভার এমন এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন, যাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর সাভারকরের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। সাভারকরের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনে ভারতীয় জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা একটি মৌল উপাদান হিসেবে উপস্থিত ছিল। তাঁর কাছে হিন্দু সমাজকে রাজনৈতিক জাতিসত্তা হিসেবে সংগঠিত করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। শ্যামাপ্রসাদ এই রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন এমন সময়ে, যখন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ক্রমে আরও ব্যাপক গণভিত্তি অর্জন করছিল। কংগ্রেস, বামপন্থী শক্তি, বিপ্লবী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং অসংখ্য শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র সংগঠন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বিস্তৃত করে তুলছিল। অন্যদিকে মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভা ধর্মীয় পরিচয়নির্ভর রাজনীতির ভিন্ন দুই ধারাকে শক্তিশালী করছিল। বাংলার রাজনীতিতে এই সংঘাত আরও জটিল ছিল, কারণ এখানে জমিদারি, কৃষক স্বার্থ, সাম্প্রদায়িক পরিচয়, ভাষাভিত্তিক বাঙালিত্ব এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন এই সমস্ত রাজনৈতিক শক্তির চরিত্রকে নতুন করে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে কংগ্রেস ব্রিটিশ শাসনের অবসান দাবি করে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দিলে আন্দোলন দ্রুত এক বৃহৎ গণবিক্ষোভের রূপ নেয়। মহাত্মা গান্ধীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়, সংগঠনটির কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ করা হয় এবং দেশের বহু স্থানে স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ, ধর্মঘট, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা, থানা ও সরকারি দপ্তর ঘেরাও এবং সমান্তরাল প্রশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেখা দেয়। বাংলার মেদিনীপুরের তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্রের সাতারা পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ব্রিটিশ প্রশাসন কঠোর সামরিক ও পুলিশি দমননীতির আশ্রয় নেয়। হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হন, বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ ও নিহত হন এবং অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী দীর্ঘ কারাবাসের শিকার হন।
এই সময়ে হিন্দু মহাসভার অবস্থান কংগ্রেসের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। সংগঠনটির নেতৃত্ব মনে করেছিল যে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক গণআন্দোলন দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সাভারকর বিশেষভাবে হিন্দুদের ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং যুদ্ধকালীন প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে হিন্দু রাজনৈতিক স্বার্থ সুদৃঢ় করার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ফলে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সঙ্গে হিন্দু মহাসভার বিরোধ কেবল কৌশলগত ছিল না, এর পেছনে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে দুটি ভিন্ন ধারণা কাজ করছিল। কংগ্রেসের কাছে তখন ব্রিটিশ শাসনের প্রত্যক্ষ অবসান ছিল প্রধান দাবি, হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বের কাছে যুদ্ধকালীন প্রশাসনে অংশগ্রহণ এবং সংগঠনগত শক্তি বৃদ্ধি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছিল।
এই রাজনৈতিক অবস্থানের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায় কানপুরে অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসভার চব্বিশতম অধিবেশনে সাভারকরের বক্তব্যে। সেখানে তিনি মুসলিম লিগের সঙ্গে বিভিন্ন প্রদেশে হিন্দু মহাসভার যৌথ সরকার পরিচালনার বিষয়টি গোপন না করে বরং বাস্তব রাজনীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল: “প্রায়োগিক রাজনীতির ক্ষেত্রে যৌক্তিক আপসনামাকে মান্যতা দিতে তাঁরা (অর্থাৎ হিন্দু মহাসভার নেতৃবর্গ) পিছপা নন। সমকালীন সিন্ধুপ্রদেশে তাঁদের সেখানকার হিন্দু মহাসভার নেতৃত্ব মুসলিম লিগের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কোয়ালিশান সরকার গঠন করেছে। বাংলার ক্ষেত্রে কী হয়েছে তা তো সবারই জানা। সেখানে কংগ্রেসের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে মুসলিম লিগের প্রাগ্রসর নেতৃবর্গ হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেছে। এই কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল ফজলুল হকের নেতৃত্বে এবং এই মন্ত্রিসভায় তাঁর সঙ্গে যোগ্য সংগত করেছিলেন আমাদের হিন্দু মহাসভার প্রাজ্ঞ নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্বয়ং। এর ফলে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা উপকৃত হয়েছেন।”
এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রচারে হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগকে প্রায়শই পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও প্রাদেশিক ক্ষমতার রাজনীতিতে দুই সংগঠনের মধ্যে সহযোগিতার নজির ছিল। সিন্ধু ও বাংলার অভিজ্ঞতা দেখায় যে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ধারাও প্রয়োজনে প্রশাসনিক ক্ষমতা ভাগ করে নিতে পারত। বাংলায় এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের সহযোগিতা এই বাস্তবতারই প্রকাশ। অবশ্য ফজলুল হকের রাজনৈতিক অবস্থানকে সরলভাবে মুসলিম লিগের সমার্থক হিসেবে দেখা যায় না। বাংলার কৃষক রাজনীতি, কৃষক প্রজা পার্টির ইতিহাস এবং লিগ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব এই প্রশ্নকে অনেক বেশি জটিল করে তোলে। তবু এটুকু স্পষ্ট যে কংগ্রেস যখন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছিল, শ্যামাপ্রসাদ তখন প্রাদেশিক প্রশাসনের ভেতরে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগের পথেই ছিলেন।
১৯৪২ সালের ৬ জুলাই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে লেখা তাঁর একটি চিঠি এই অবস্থান বুঝতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তিনি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছিলেন: “কংগ্রেস এখন তাদের (বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো) আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সারা দেশে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনাকার পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। বিশ্বযুদ্ধের এই আবহে যারাই প্রবল গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে চলেছে তাদের বিরুদ্ধেই সরকারের উচিত প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা।”
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করা যায় না। একজন ঔপনিবেশিক দেশের রাজনৈতিক নেতা যখন বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে সংগঠিত জাতীয় আন্দোলনকে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা’র সমস্যা হিসেবে দেখেন, তখন তাঁর স্বাধীনতার ধারণা কংগ্রেসের গণআন্দোলনমূলক ধারণা থেকে কতটা পৃথক ছিল তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর যুক্তি ছিল যুদ্ধ চলাকালীন প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে এবং এমন কোনো আন্দোলনকে বাড়তে দেওয়া উচিত নয় যা শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। এই অবস্থানের পেছনে জাপানি অগ্রযাত্রা, বাংলায় সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণ, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা এবং যুদ্ধকালীন খাদ্য ও প্রতিরক্ষা সমস্যাও ছিল। কিন্তু তবু প্রশ্ন থেকে যায়, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দমন করার দায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রেরই ছিল, না ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও সেই দমননীতিকে সমর্থন করা উচিত ছিল?
শ্যামাপ্রসাদ আরও স্পষ্ট ভাষায় বাংলায় আন্দোলন প্রতিরোধের একটি প্রশাসনিক কৌশলের কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল: “প্রশ্নটা হচ্ছে কীভাবে বাংলায় এই ভারত ছাড়ো আন্দোলন দমন করতে হবে তাই তো? বাংলাদেশের সরকারি (ব্রিটিশ) প্রশাসনকে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করে তার প্রায়োগিক অনুশীলন করতে হবে যাতে করে কংগ্রেসের আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে। দেশের মানুষকে একথা বোঝাতে হবে যে তাঁরা কংগ্রেসের মদতে যে স্বাধীনতার কথা বলতে চাইছেন দেশের জনসাধারণের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার গঠন করে ব্রিটিশ সরকার তো সেই কাজটিই করে চলেছে। একথা ঠিক যে কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা খুব একটা সফল হয়নি। ভারতীয়দের উচিত দেশকে রক্ষা করার জন্যে ব্রিটিশ সরকারের ওপর আস্থা রাখা। বাংলার গভার্নর তো সাংবিধানিক প্রধান হিসেবেই বাংলা প্রাদেশিক সরকারকে সুপরামর্শ দান করেন।”
এই কথাগুলির মধ্যে তাঁর তৎকালীন রাজনৈতিক চিন্তার দুটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, তিনি ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে সমর্থন করেননি, বরং বাংলায় সেটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ করে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ঔপনিবেশিক সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যেই ভারতীয় প্রতিনিধিত্বকে আপাতত ব্যবহারযোগ্য রাজনৈতিক পথ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার চেয়ে প্রাদেশিক শাসনে ভারতীয় অংশগ্রহণ এবং সেই কাঠামোর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার অধিক কার্যকর বলে মনে হয়েছিল।
রমেশচন্দ্র মজুমদারও তাঁর আলোচনায় স্বীকার করেছেন যে শ্যামাপ্রসাদ ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন। তাঁর মতে, কংগ্রেসের আন্দোলন দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টার পাশাপাশি ভারতের নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করতে পারে। রমেশচন্দ্র নিজে কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার বহু প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যার সমালোচক ছিলেন এবং বিপ্লবী আন্দোলন ও অন্যান্য রাজনৈতিক ধারার গুরুত্ব আলাদাভাবে তুলে ধরেছিলেন। ফলে তাঁর লেখায় শ্যামাপ্রসাদের প্রতি ব্যক্তিগত সহানুভূতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার এই কারণেই তাঁর স্মৃতিকথায় শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত চরিত্র সম্পর্কিত কিছু বিবরণ বিশেষ আগ্রহের দাবি রাখে, কারণ সেগুলি কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লেখা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন রমেশচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ঢাকায় এক সাম্প্রদায়িক অশান্তির সময় শ্যামাপ্রসাদের আকস্মিক আগমনের বিবরণ তাঁর স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়। ঘটনার তিন বা চার দিনের মধ্যেই শ্যামাপ্রসাদ ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ঢাকা পৌঁছান এবং রমেশচন্দ্রের বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। একটি উত্তেজনাপূর্ণ সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে হিন্দু মহাসভার এমন একজন সর্বভারতীয় নেতার উপস্থিতি যে মুসলিম জনসমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করবে, তা অনুমান করা কঠিন ছিল না। রমেশচন্দ্রের বিবরণ অনুযায়ী, মুসলিম সমাজের একটি অংশ শ্যামাপ্রসাদের আগমনের বিরুদ্ধে গভর্নরের কাছে অভিযোগ জানানোর কথাও ভেবেছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁকে পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কথা জানানো হয়।
ঢাকার কমিশনার তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে তাঁর উপস্থিতি উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং সম্ভব হলে তাঁর কলকাতায় ফিরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ ফিরে যেতে সম্মত হননি। এই অবস্থানের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা একাধিক হতে পারে। তাঁর সমর্থকেরা বলতে পারেন, দাঙ্গাপীড়িত হিন্দুদের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এবং বিপদের সময় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা তাঁর কর্তব্য বলে তিনি মনে করেছিলেন। তাঁর সমালোচকেরা পাল্টা প্রশ্ন তুলতে পারেন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যে এমন এক নেতার উপস্থিতি পরিস্থিতিকে শান্ত করার বদলে আরও ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি করেছিল কি না। এই দ্বিতীয় আশঙ্কাটিই তৎকালীন প্রশাসনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল।
এখানে হিন্দু মহাসভার পূর্ববর্তী রাজনীতির কিছু দৃষ্টান্ত স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক। বিশ ও ত্রিশের দশকে কোনো এলাকায় হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষের পর সংগঠনের নেতারা সেখানে গিয়ে হিন্দু সমাজকে ‘সংগঠন’ ও ‘শুদ্ধি’র মাধ্যমে সংহত করার আহ্বান জানাতেন। ১৯২৭ সালে বরিশাল জেলার পোনাবালিয়ার সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর হিন্দু মহাসভার নেতা ড. বি এস মুঞ্জে সেখানে গিয়েছিলেন এবং স্থানীয় হিন্দু নেতাদের সঙ্গে হিন্দু সংগঠন ও শুদ্ধি আন্দোলনের প্রসার নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। (অমলেন্দু দে : বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ। ঢাকা। বাংলাদেশ। ২০১১ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ. ২১২) এই রাজনৈতিক আচরণের পেছনে মহাসভার ধারণা ছিল, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হিন্দুদের অসংগঠিত অবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং শক্তিশালী হিন্দু সামাজিক সংগঠন তৈরি করাই তার প্রতিকার। কিন্তু এর বিরোধীরা মনে করতেন, এই ধরনের হস্তক্ষেপ সংঘর্ষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলিকে উপেক্ষা করে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে স্থায়ী রাজনৈতিক মেরুকরণ সৃষ্টি করে।
ঢাকায় শ্যামাপ্রসাদের আগমনকেও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐতিহ্যের মধ্যে দেখলে ঘটনাটি অন্য মাত্রা পায়। তিনি কেবল ব্যক্তিগতভাবে বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাননি; তিনি সেখানে স্থানীয় হিন্দু নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন। পরদিন তিনি ঢাকার কমিশনারকে সেই ইচ্ছার কথা জানান। ফলে তাঁর সফর নিছক মানবিক সহমর্মিতার ব্যক্তিগত সফর ছিল বলে ধরে নেওয়া কঠিন। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। প্রশ্নটি বরং এই যে সেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কতটা শান্তি প্রতিষ্ঠার, আর কতটা হিন্দু মহাসভার সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর ছিল। উপলব্ধ বিবরণ এই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দেয় না, কিন্তু সন্দেহ উত্থাপনের যথেষ্ট কারণ দেয়।
এই সফরের আরেকটি ঘটনা রমেশচন্দ্র মজুমদারের স্মৃতিকথায় আরও অস্বস্তিকর ছবি তুলে ধরে। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকার এক ধনী হিন্দু ব্যক্তি আশঙ্কা করেন যে তাঁর বাড়িতে হামলা ও লুট হতে পারে। তিনি পঞ্চাশ হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে রমেশচন্দ্রের বাড়িতে আশ্রয় চান, কারণ সেখানে সামরিক পাহারা ছিল এবং তুলনামূলকভাবে নিরাপত্তা বেশি ছিল। রমেশচন্দ্র তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হবে কি না সে বিষয়ে শ্যামাপ্রসাদের মতামত জানতে চান। আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত হয়, ওই ব্যক্তি রাতটি সেখানে থাকবেন এবং পরদিন সামরিক পাহারায় তাঁকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হবে।
এরপর যে ঘটনা ঘটেছিল বলে রমেশচন্দ্র লিখেছেন তা শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক চরিত্রের মূল্যায়নে প্রায়ই উদ্ধৃত হয়। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, বিপন্ন ওই ধনী ব্যক্তির কাছে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার জন্য উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থসাহায্য চেয়েছিলেন। বিপদের মুখে থাকা মানুষটি প্রথমে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরদিন বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সময় কোনো অর্থ দেননি। (১৭. রমেশচন্দ্র মজুমদার : জীবনের স্মৃতিদীপে। পারুল প্রকাশনী। কলকাতা। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ. ১০৪-১০৭)
এই বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি সতর্কতা জরুরি। এটি একটি স্মৃতিকথামূলক উৎস। স্মৃতিকথা ইতিহাসচর্চায় মূল্যবান হলেও ঘটনার বহু বছর পরে লেখা ব্যক্তিগত স্মৃতির সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে ঘটনাটিকে আদালতের নথির মতো নিরঙ্কুশ দলিল হিসেবে ব্যবহার না করে রমেশচন্দ্রের প্রত্যক্ষ স্মৃতিবিবরণ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু যদি তাঁর বিবরণ যথার্থ হয়, তাহলে ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের আতঙ্কে নিরাপত্তার আশ্রয় নেওয়া এক ব্যক্তির কাছে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য অর্থ চাওয়া, বিশেষত এমন মুহূর্তে যখন তিনি নিজের সম্পদ ও প্রাণ নিয়ে আতঙ্কিত, রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। শ্যামাপ্রসাদ রমেশচন্দ্রের বাড়িতে আছেন, এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পরে সেখানে হুমকিমূলক টেলিফোন আসতে থাকে বলে স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে। এমন কথাও শোনা যায় যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। রমেশচন্দ্রের বাড়ির রাঁধুনি মুসলমান হওয়ায় তাঁর রান্না করা খাবারে বিষ মেশানোর আশঙ্কাও কেউ কেউ প্রকাশ করেন। এই ভয়ের বাস্তব ভিত্তি ছিল কি না জানা যায় না, কিন্তু সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে গুজব যে কত দ্রুত আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, ঘটনাটি তার একটি পরিচিত উদাহরণ। শেষ পর্যন্ত শ্যামাপ্রসাদকে সেই রাঁধুনির তৈরি খাবার না দিয়ে রমেশচন্দ্রের স্ত্রীর হাতে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়েছিল বলে রমেশচন্দ্র লিখেছেন। পরদিন শ্যামাপ্রসাদ কমিশনারকে জানান যে তিনি ঢাকার হিন্দু নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। (রমেশচন্দ্র মজুমদার : প্রাগুক্ত। পৃ. ১০৭-১০৮)
এই ঘটনাগুলি একত্রে পড়লে শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক মানসিকতার একটি বিশেষ রূপ ধরা পড়ে। তিনি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরিস্থিতিকে কেবল প্রশাসনিক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখতেন না; হিন্দু সমাজকে পৃথক রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গেও যুক্ত করতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দু মহাসভার মৌলিক রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে দাঙ্গাপীড়িত অঞ্চলে তাঁর উপস্থিতি তাঁর সমর্থকদের কাছে হিন্দুদের রক্ষাকর্তার আগমন হিসেবে প্রতিভাত হতে পারত, আবার মুসলমানদের একটি অংশের কাছে সেটি একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হওয়াও অস্বাভাবিক ছিল না।
এই প্রসঙ্গে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রশ্ন উঠে আসে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার নামে রাজনৈতিক সংগঠন যদি সেই সম্প্রদায়কে পৃথক ও অবরুদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে সংগঠিত করে, তবে তা কি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা বাড়ায়, না পারস্পরিক ভয়কে আরও গভীর করে? বিশ শতকের প্রথমার্ধের ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগ উভয়ের রাজনৈতিক বিস্তার দেখায় যে এক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার ভাষা খুব সহজেই অন্য সম্প্রদায়ের কাছে হুমকির ভাষায় পরিণত হয়। এক পক্ষ হিন্দু সংগঠনের আহ্বান জানালে অন্য পক্ষ মুসলিম সংহতির দাবি তোলে, আবার সেই প্রতিক্রিয়া প্রথম পক্ষের কাছে নিজের রাজনৈতিক সংগঠনের আরও শক্তিশালী যুক্তি হয়ে ওঠে। এইভাবে পারস্পরিক ভয়ের এক বৃত্ত গড়ে ওঠে, যার পরিণতিতে যৌথ নাগরিক পরিচয় ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতিকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট ছাড়া বোঝা অসম্পূর্ণ। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুধু কোনো এক দিনের বক্তব্য, কোনো এক মন্ত্রিসভা, কিংবা কোনো দাঙ্গাপীড়িত অঞ্চলে সফরের সমষ্টি নয়। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে একটি নির্দিষ্ট ধারণা ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দুদের পৃথক রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে এবং সেই স্বার্থকে সংগঠিতভাবে রক্ষা না করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই ধারণা থেকেই হিন্দু মহাসভার রাজনীতি, মুসলিম লিগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কখনও প্রশাসনিক সহযোগিতা, আবার কখনও তীব্র সাম্প্রদায়িক মুখোমুখি অবস্থানের জটিল ধারাটি তৈরি হয়েছিল।
১৯৪২ সালের ঘটনাপ্রবাহ এই চরিত্রটিকে বিশেষভাবে উন্মোচিত করে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন আন্দোলন যখন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করছিল, তখন শ্যামাপ্রসাদের অগ্রাধিকার ছিল বাংলার প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং তাঁর মতে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা রক্ষা। তাঁর সমর্থকেরা যুক্তি দিতে পারেন, জাপানি বাহিনী তখন পূর্ব ভারতের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এবং বাংলার ওপর আক্রমণের আশঙ্কা ছিল বাস্তব। বার্মার পতন, বঙ্গোপসাগরে জাপানি তৎপরতা এবং পূর্বাঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার সম্পূর্ণ ভাঙন দেশের জন্য বিপজ্জনক হতে পারত। এই যুক্তি ইতিহাসের আলোচনায় স্থান পাওয়ার যোগ্য।
কিন্তু সেই যুক্তি গ্রহণ করলেও আরেকটি সত্য অস্বীকার করা যায় না। ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবি নিয়ে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। ব্রিটিশ প্রশাসন সেই আন্দোলন দমন করতে ব্যাপক গ্রেপ্তার, গুলি, লাঠিচার্জ, সামরিক শক্তি এবং বিশেষ আইন ব্যবহার করেছিল। একজন ভারতীয় রাজনৈতিক নেতা যখন সেই আন্দোলন ঠেকানোর উপায় নিয়ে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেন, তখন তাঁকে একই সঙ্গে ‘ব্রিটিশবিরোধী গণআন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক’ হিসেবেও উপস্থাপন করা যায় না। তাঁর স্বাধীনতাবোধের ধরন আলাদা ছিল এবং ইতিহাসের নির্ভুলতার জন্য এই পার্থক্য স্বীকার করা জরুরি।
শ্যামাপ্রসাদের সেই সময়কার অবস্থানকে সরাসরি ‘ব্রিটিশ প্রভুর আনুগত্য’ বলে ব্যাখ্যা করা রাজনৈতিক ভাষায় বোধগম্য হলেও ঐতিহাসিক আলোচনায় আরও নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার করা ভালো। তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের স্থায়িত্বকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এমন প্রমাণ নেই। স্বাধীন ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি কংগ্রেসের গণঅভ্যুত্থানমূলক পথের বিরোধী ছিলেন এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর রাজনীতি ছিল ঔপনিবেশিক বিরোধিতার চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তব ব্যবহারে বেশি মনোযোগী। এই অবস্থান তাঁর জাতীয়তাবাদকে বাতিল করে না, কিন্তু তার প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন বর্তমান সময়ে শ্যামাপ্রসাদকে এমন এক নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তুলে ধরা হয়, যেন তাঁর সারাজীবনের প্রধান কাজই ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই। বাস্তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রাক-সাতচল্লিশ পর্যায়ে আমরা অন্য ছবি দেখি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক ছিলেন, প্রাদেশিক রাজনীতির সক্রিয় অংশ ছিলেন, ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন, হিন্দু মহাসভার সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে কাজ করেছিলেন এবং কংগ্রেসের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। এই সমস্ত ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখানে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের স্মৃতি ভারতের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে এক উচ্চ নৈতিক মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু ১৯৪২ সালে সব রাজনৈতিক শক্তি সেই আন্দোলনের পাশে ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টিও ১৯৪১ সালের পরে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে নাৎসি জার্মানির আক্রমণের পর, যুদ্ধকে ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে কংগ্রেসের আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। মুসলিম লিগও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেয়নি। হিন্দু মহাসভাও একইভাবে আন্দোলনের বাইরে ছিল। ফলে শুধু শ্যামাপ্রসাদকেই বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল, তিনি আন্দোলনের বাইরে থাকার পাশাপাশি বাংলায় সেটি কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সেই বিষয়ে প্রশাসনিক পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই সক্রিয়তার কারণেই তাঁর ভূমিকা আলাদা গুরুত্ব পায়।
ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর মন্ত্রিসভাগত সহযোগিতাও একইভাবে দ্ব্যর্থক। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়নির্ভর রাজনীতির নেতা হয়েও তিনি মুসলমান নেতৃত্বাধীন একটি প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছিলেন। এটিকে কেউ রাজনৈতিক বাস্তববাদ বলবেন, কেউ ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুবিধাবাদ বলবেন। কিন্তু এই ঘটনাটি অন্তত একটি প্রচলিত সরলীকরণ ভেঙে দেয়, হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম রাজনীতির সমস্ত ধারা সর্বদা পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজনে সমঝোতা সম্ভব ছিল। আবার সেই একই সংগঠনগুলি জনসমক্ষে নিজ নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও স্বার্থকে কেন্দ্র করে বিপরীতমুখী রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করত। এই দ্বৈততা ঔপনিবেশিক ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শ্যামাপ্রসাদের ঢাকা সফরের ঘটনাও এই দ্বৈততার আরেকটি ক্ষুদ্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। তিনি নিজেকে হিন্দুদের রক্ষাকারী নেতা হিসেবে দেখাতে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি মুসলমানদের একাংশে ভয় ও সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল। আবার তাঁর আশ্রয়দাতা রমেশচন্দ্র মজুমদারের বাড়ির মুসলমান বাবুর্চিকে সন্দেহ করা হচ্ছিল কেবল তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। বাস্তব ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ ছাড়াই বিষপ্রয়োগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এই ছোট ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক পরিবেশের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মূল্যবান। দাঙ্গা শুধু রাস্তায় সংঘর্ষ নয়; দাঙ্গা মানুষের দৈনন্দিন বিশ্বাসের ভেতরও প্রবেশ করে। যে মানুষটি প্রতিদিন বাড়িতে রান্না করেন, তিনিও হঠাৎ ‘সম্ভাব্য শত্রু’ হয়ে ওঠেন, কারণ তিনি অন্য ধর্মের।
সেই ভয়ের রাজনীতিই হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগ উভয়ের বিকাশের অনুকূল মাটি তৈরি করেছিল। প্রতিটি সংঘর্ষ পরবর্তী সংঘর্ষের জন্য নতুন স্মৃতি তৈরি করত। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের কাহিনি অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নতুন প্রচারের উপাদান হয়ে উঠত। রাজনৈতিক সংগঠনগুলি এই স্মৃতিকে ব্যবহার করে নিজেদের সম্প্রদায়কে সংগঠিত করত। ফলত দাঙ্গার পরে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শক্তি অনেক সময় আরও বেড়ে যেত।
শ্যামাপ্রসাদের সমগ্র প্রাক-স্বাধীনতা রাজনৈতিক জীবন তাই এক গভীর বৈপরীত্যের ইতিহাস। তিনি উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ প্রশাসক এবং প্রখর বক্তা ছিলেন। বাংলার রাজনীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন, যা ভারতীয় জাতীয় পরিচয়ের চেয়ে হিন্দু রাজনৈতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিতে ক্রমে বেশি আগ্রহী হয়েছিল। তিনি ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে তার সঙ্গে সহযোগিতাও করেছেন। তিনি মুসলিম রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে হিন্দু সংগঠনের ডাক দিয়েছেন, আবার মুসলমান নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায়ও কাজ করেছেন। তিনি স্বাধীন ভারতের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত ১৯৪২ সালের বৃহত্তম গণআন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন।
এই সবকিছুকে একসঙ্গে না দেখলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে ইতিহাসচর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাঁকে একদিকে সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক জাতীয়তাবাদী নায়ক বানানো যেমন ইতিহাসের জটিলতাকে অস্বীকার করে, তেমনই কোনো তথ্য ও প্রেক্ষাপট ছাড়া কেবল বিশেষণ দিয়ে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করাও ইতিহাসচর্চাকে দুর্বল করে। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, চিঠিপত্র, মন্ত্রিসভার ভূমিকা, সংগঠনগত আনুগত্য, সমকালীন সহকর্মীদের স্মৃতিকথা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে তাঁর আচরণ একত্রে বিচার করলেই তাঁর আসল রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে অধিক নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিশেষত ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তাঁর ভূমিকা কোনোভাবেই প্রান্তিক তথ্য নয়। এটি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি মৌল সূত্র প্রকাশ করে। বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে অবিলম্বে গণআন্দোলনের বদলে তিনি সাংবিধানিক প্রশাসন, রাজনৈতিক সংগঠন এবং ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে থেকেই নিজের মতাদর্শগত লক্ষ্য এগিয়ে নিতে আগ্রহী ছিলেন। সেই লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজের পৃথক রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করা। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের তৎকালীন প্রধান স্রোতের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব কেবল কৌশলগত মতভেদ ছিল না; জাতীয় রাজনীতির অগ্রাধিকার নিয়েও ছিল গভীর পার্থক্য।
বর্তমান রাজনৈতিক স্মৃতিতে এই ইতিহাসের অনেকখানিই চাপা পড়ে যায়। শ্যামাপ্রসাদকে যদি কেবল কাশ্মীর, জনসঙ্ঘ কিংবা বঙ্গভাগের আলোয় দেখা হয়, তবে ১৯৪২ সালের শ্যামাপ্রসাদকে দেখা হয় না। আবার তাঁকে যদি কেবল সাভারকরের শিষ্য হিসেবেই দেখা হয়, তাহলেও তাঁর রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও বাস্তববাদী ক্ষমতার কৌশল বোঝা যায় না। ইতিহাসের কাজ হল এই সমস্ত স্তর পাশাপাশি রাখা।
সেই কারণেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে বর্তমানের রাজনৈতিক প্রতিমা নির্মাণের সামনে প্রাক-সাতচল্লিশের এই দলিলগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলি মনে করিয়ে দেয় যে কোনো নেতার পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাঁর পূর্ববর্তী জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অতীতকে মুছে দিতে পারে না। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তাঁর অবস্থান, বাংলার ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় তাঁর ভূমিকা, হিন্দু মহাসভার সঙ্গে তাঁর আদর্শগত সম্পর্ক এবং সাম্প্রদায়িক সংকটের মুহূর্তে তাঁর আচরণ সবই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ। তাঁকে মূল্যায়ন করতে হলে এই ইতিহাস থেকে কোনো অংশ সুবিধামতো বাদ দেওয়া চলে না।
ইতিহাসের কঠিন সত্য এখানেই। একজন মানুষ একই সঙ্গে মেধাবী শিক্ষাবিদ, দক্ষ প্রশাসক, সংসদীয় নেতা এবং গভীরভাবে বিতর্কিত রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রবক্তা হতে পারেন। ব্যক্তিগত যোগ্যতা রাজনৈতিক অবস্থানের নৈতিক প্রশ্ন মুছে দেয় না। আবার রাজনৈতিক মতভেদ ব্যক্তিগত প্রতিভাকেও বাতিল করে না। শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রেও এই দ্বৈত সত্য মেনে নিয়েই বিচার করতে হবে। কিন্তু তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নির্ভেজাল, আপসহীন এবং সর্বদা ব্রিটিশবিরোধী নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা যে তাঁর ১৯৪২ সালের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, উপলব্ধ দলিলগুলি সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
রমেশচন্দ্র মজুমদারের স্মৃতিকথায় সংরক্ষিত বিবরণ মনোযোগ দিয়ে পড়লে ঢাকার সাম্প্রদায়িক অশান্তির সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। ঘটনাটি এমন নয় যে আকস্মিকভাবে কোনো ব্যক্তিগত কাজে তিনি ঢাকা গিয়েছিলেন এবং ঘটনাচক্রে দাঙ্গাপীড়িত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যান। বরং রমেশচন্দ্রের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে উত্তেজনা যখন ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে, সেই সময়ই হিন্দু মহাসভার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঢাকা পৌঁছে তিনি সেখানকার হিন্দু নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন। তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে যে উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, প্রশাসনও সে বিষয়ে অবগত ছিল। সেই কারণেই কমিশনার তাঁকে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ সেই প্রস্তাব নিঃসঙ্কোচে প্রত্যাখ্যান করেন। ঘটনাটির এই দিকটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের মুহূর্তে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনের সর্বভারতীয় নেতার উপস্থিতি স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, সে প্রশ্ন প্রশাসনের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তা ততটা গুরুত্ব পেয়েছিল বলে মনে হয় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় রমেশচন্দ্রের স্মৃতিতে সংরক্ষিত আরেকটি অস্বস্তিকর ঘটনা। কথিত মুসলিম আক্রমণের আশঙ্কায় বিপুল অর্থ সঙ্গে নিয়ে একজন বিত্তবান হিন্দু তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থাতেই তাঁর কাছ থেকে হিন্দু মহাসভার জন্য ‘মোটা টাকা’ দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল বলে রমেশচন্দ্র লিখেছেন। এই তথ্যটি যদি স্মৃতিকথার সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেও গ্রহণ করা হয়, তবে এটি শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক আচরণকে অন্য আলোয় দেখতে বাধ্য করে। দাঙ্গার আশঙ্কায় আতঙ্কিত, সম্পদ ও প্রাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন এক ব্যক্তির কাছ থেকে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য অর্থসাহায্য চাওয়া নিছক সাংগঠনিক অর্থসংগ্রহের ঘটনা নয়; এর মধ্যে সংকটমুহূর্তকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠতেই পারে। রমেশচন্দ্রের বিবরণ এই কারণেই মূল্যবান যে তিনি শ্যামাপ্রসাদের কোনো ঘোষিত রাজনৈতিক শত্রু ছিলেন না। বরং তাঁদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ফলে তাঁর কলমে এমন বিবরণ উঠে আসা শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নে উপেক্ষণীয় নয়।
এই শ্যামাপ্রসাদকেই পরবর্তী কালে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এক আদর্শ বাঙালি নেতা, উচ্চ নৈতিকতার প্রতীক, নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক এবং জাতীয় সংহতির রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। রাজনৈতিক স্মৃতি নির্মাণের ক্ষেত্রে এ এক পরিচিত প্রক্রিয়া। কোনো নেতার জীবনের জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত অথবা বিতর্কিত অধ্যায়গুলি ধীরে ধীরে আড়ালে সরিয়ে রেখে কয়েকটি নির্বাচিত ঘটনা, ব্যক্তিগত গুণ, শিক্ষাগত সাফল্য এবং প্রতীকী আত্মত্যাগকে সামনে আনা হয়। ফলে ঐতিহাসিক মানুষটি ক্রমে রাজনৈতিক মূর্তিতে পরিণত হন। শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রেও সেই প্রক্রিয়া লক্ষণীয়। তাঁর হিন্দু মহাসভাকেন্দ্রিক রাজনীতি, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়কার অবস্থান, ঔপনিবেশিক সরকারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক, সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে তাঁর ধারাবাহিক বক্তব্য এবং বঙ্গবিভাগের পক্ষে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার পাশাপাশি যদি তাঁকে বিচার করা হয়, তবে তাঁকে একমাত্রিক জাতীয়তাবাদী প্রতিমায় রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিশ শতকের গোড়ার বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্ত বাংলার রাজনৈতিক জীবনে এক প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। এই আন্দোলন শুধু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের বিরোধিতা ছিল না; তা ক্রমে স্বদেশি, বয়কট, জাতীয় শিক্ষা এবং রাজনৈতিক আত্মমর্যাদার আন্দোলনে পরিণত হয়। সেই সময় বিপিনচন্দ্র পাল ইংরেজ শাসনের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, আগ্রা, অযোধ্যা ও অন্যান্য অঞ্চলে ব্রিটিশ নীতি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে যে “বিদ্বেষবহ্নি প্রজ্জ্বলিত” করেছে, ভবিষ্যতে বাংলাতেও সেই নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটানো হবে। তাঁর ভাষায় ইংরেজ শাসকদের ‘কুটিল রাজনীতি’ ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ ভেদরেখাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী করতে সচেষ্ট ছিল।
বিপিনচন্দ্র পালের সেই আশঙ্কা পরবর্তী কয়েক দশকের ইতিহাসে বহুবার সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে ঔপনিবেশিক সরকারের ‘ভাগ করে শাসন’ নীতিকেই সমস্ত সাম্প্রদায়িকতার একমাত্র উৎস বললে ইতিহাস সরলীকৃত হয়ে যায়। ব্রিটিশ প্রশাসন ধর্মীয় প্রতিনিধিত্ব, পৃথক নির্বাচনব্যবস্থা, জনগণনা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নানা কাঠামোর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে প্রতিষ্ঠানগত শক্তি দিয়েছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির অভ্যন্তরেও এমন শক্তি জন্ম নিয়েছিল যারা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আলাদা রাজনৈতিক জাতিসত্তা হিসেবে সংগঠিত করতে আগ্রহী ছিল। হিন্দু মহাসভা সেই ধারার একটি প্রধান সংগঠন হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মুসলিম লিগও মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিকে ক্রমশ বৃহত্তর রূপ দেয়। ফলে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিভাজননীতি এবং ভারতীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক স্বার্থ একে অপরকে শক্তিশালী করেছিল।
হিন্দু মহাসভার জন্মও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। বিশ শতকের প্রথম দশকে বিভিন্ন প্রদেশে হিন্দু স্বার্থরক্ষার নামে পৃথক সংগঠন গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯০৯ সালে পাঞ্জাবে হিন্দু সভা প্রতিষ্ঠিত হয় লালচাঁদ ও ইউ এন উপাধ্যায় প্রমুখের উদ্যোগে। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। সেই বছরের ২১ ও ২২ অক্টোবর পাঞ্জাব প্রাদেশিক হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্ব থেকেই জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ ক্রমে জোরালো হয়ে ওঠে, কংগ্রেস সর্বভারতীয় জাতীয়তার কথা বলতে গিয়ে হিন্দুদের স্বতন্ত্র স্বার্থ যথেষ্টভাবে রক্ষা করছে না। এই অভিযোগ পরবর্তী কালে হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক ভাষ্যের কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে ওঠে।
১৯১০ সালের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এলাহাবাদ অধিবেশনের সময় সর্বভারতীয় হিন্দু সংগঠন প্রতিষ্ঠার দাবি আরও স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়। ১৯১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হরিদ্বার, ১৭ ফেব্রুয়ারি লখনউ এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে প্রস্তুতিমূলক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং একই বছরের এপ্রিল মাসে হরিদ্বারের কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার সাংগঠনিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই প্রাথমিক পর্যায়ে সংগঠনটির চরিত্র পরবর্তী কালের মতো সুস্পষ্ট হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক রূপ অর্জন করেনি। গান্ধি ও স্বামী শ্রদ্ধানন্দের মতো ব্যক্তিও তার প্রাথমিক উদ্যোগের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন। তৎকালীন হিন্দু সমাজসংস্কার, গোরক্ষা, শিক্ষা, সামাজিক সংগঠন এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নগুলি তখনও একে অপরের সঙ্গে মিশে ছিল। কিন্তু বিশের দশকের শেষভাগ থেকে সংগঠনটি ক্রমে অন্য পথে অগ্রসর হয়।
বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে এবং পরে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু মহাসভার ভাষা আরও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক হিন্দুত্বের দিকে মোড় নেয়। সাভারকর ‘হিন্দুত্ব’কে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিচয় হিসেবে দেখেননি; তিনি তাকে ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক জাতিসত্তার একটি যৌথ ধারণা হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর চিন্তায় ভারত ছিল প্রধানত হিন্দু জাতির পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি। এই ধারণা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভূখণ্ডনির্ভর নাগরিক জাতীয়তার সঙ্গে মৌলিকভাবে পৃথক ছিল। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে হিন্দু মহাসভার অভিযোগ ছিল, মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় অতিরিক্ত আপস করতে গিয়ে কংগ্রেস হিন্দুদের রাজনৈতিক অধিকার বিসর্জন দিচ্ছে। ক্রমে এই অভিযোগই সংগঠনের রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৩৯ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দু মহাসভার সক্রিয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। তিনি শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসক ও প্রভাবশালী বক্তা হিসেবে ইতিমধ্যেই পরিচিত ছিলেন। ফলে তাঁর যোগদান হিন্দু মহাসভাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়, বিশেষ করে বাংলায়। সাভারকরের কঠোর হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ এবং বাংলার বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর রাজনীতি কেবল বিমূর্ত হিন্দু ঐক্যের আহ্বানে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব, সরকারি চাকরি, শিক্ষা, পৌরনীতি, প্রাদেশিক ক্ষমতা এবং পরে ভূখণ্ডবিভাগের প্রশ্নকেও সরাসরি হিন্দু স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে শুরু করেন।
এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ওপরই পরবর্তী কালের জনসঙ্ঘ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি নিজেদের ঐতিহাসিক বংশপরম্পরা নির্মাণ করেছে। ২০১৬ সালের ২৯ জুন শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অমিত শাহ যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে তাঁকে ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা এবং আজকের ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক পূর্বপুরুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সেখানে শ্যামাপ্রসাদকে উচ্চ আদর্শ, নৈতিকতা ও আত্মত্যাগে দীপ্ত ‘নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। একই সঙ্গে দেশভাগের প্রাক্কালে তাঁর ভূমিকাকে ভারতের ভূখণ্ড রক্ষার এক ঐতিহাসিক অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অমিত শাহের উপস্থাপনায় ১৯৪৬ সালে ব্রিটেনে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ক্রমে স্পষ্ট হয়, কিন্তু শুরুতে দেশভাগকে অনিবার্য হিসেবে দেখা হয়নি। পরবর্তীকালের পরিস্থিতি, বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে অঞ্চল ভাগের প্রশ্ন, ভারতবিভাগের পথ তৈরি করে। তাঁর যুক্তিতে কংগ্রেস চাইলে দেশভাগ প্রতিরোধ করতে পারত, কিন্তু তা করেনি।
এরপর তিনি বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভাজনের প্রশ্নকে সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ হিসেবে গোটা বাংলা পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংগঠিত করে বাংলাভাগের দাবিকে শক্তিশালী করেন। তিন দিনের একটি সম্মেলনের কথাও তিনি উল্লেখ করেন এবং অমৃতবাজার পত্রিকার এক জনমত সমীক্ষায় ৯৮.৯৯ শতাংশ মানুষের বাংলাভাগের পক্ষে মত দেওয়ার দাবি সামনে আনেন। এই বর্ণনায় শ্যামাপ্রসাদকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থিত করা হয় যিনি নাকি এককভাবে বাংলার একটি অংশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। (২০. Dr. Syama Prasad Mookerjee: a Selfless Patriot (Amit Shah : Dr. Syama Prasad Mookerjee’s Three Historic Interventions that Saved India). Dr. Syama Prasad Mookerjee Research Foundation. New Delhi. 2016 edn. P-37-41)
এই উপস্থাপনার অন্তর্নিহিত রাজনীতি স্পষ্ট। এখানে পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি একটি জটিল ঐতিহাসিক সমঝোতা, সামাজিক ভয়, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, কংগ্রেসের কৌশল, হিন্দু মহাসভার আন্দোলন, মুসলিম লিগের পাকিস্তান দাবি, ব্রিটিশ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং অখণ্ড বাংলা পরিকল্পনার ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল হিসেবে নয়, মূলত একজন ব্যক্তির দৃঢ়তার ফল হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে রাজনৈতিক স্মৃতিতে সংকুচিত করার এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু বাংলাভাগ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংঘটিত হয়েছিল বলা হলে শরৎচন্দ্র বসু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কংগ্রেসের প্রাদেশিক নেতৃত্ব, মুসলিম লিগ, বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত, পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকসমাজ, ব্রিটিশ প্রশাসন এবং সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা আড়ালে চলে যায়।
বিশেষত অখণ্ড ও সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনাটি এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। শরৎচন্দ্র বসু ও সোহরাওয়ার্দী এমন একটি স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত যুক্তবাংলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন যা ভারত ও পাকিস্তানের কোনোটির মধ্যেই অবিলম্বে অন্তর্ভুক্ত হবে না। এই পরিকল্পনার নিজস্ব বিরোধ, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবসম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে ১৯৪৭ সালের বাংলায় কেবল দুটি পথ ছিল না। তৃতীয় একটি রাজনৈতিক কল্পনাও উপস্থিত ছিল। সেই পরিকল্পনার বিরোধিতায় হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের একটি শক্তিশালী অংশ একই অবস্থানে দাঁড়ায়। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলও বাংলাভাগের পক্ষে ছিলেন। সর্দার প্যাটেলের এক জীবনীকারের বর্ণনা অনুযায়ী, সোহরাওয়ার্দি ও শরৎচন্দ্র বসুর অখণ্ড বাংলার ধারণার বিরোধিতা করে হিন্দু মহাসভার পক্ষে শ্যামাপ্রসাদ যেভাবে বাংলাভাগের দাবিকে সংগঠিত করেছিলেন, তা প্যাটেলের প্রশংসা লাভ করেছিল। (Ibid. p-18-19)
অতএব পশ্চিমবঙ্গের জন্মকে শুধু ‘বাংলাকে রক্ষা করা’র নিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ঘটনা হিসেবে দেখা কঠিন। এর সঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে রাখার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য যুক্ত ছিল। শ্যামাপ্রসাদের কাছে মূল প্রশ্ন ছিল গোটা বাংলা নয়, হিন্দুপ্রধান বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। সেই কারণেই বাংলাভাগের দাবির মধ্যে হিন্দু রাজনৈতিক সুরক্ষার ধারণা কেন্দ্রীয় স্থান পেয়েছিল। পরবর্তী কালে জনসঙ্ঘ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি এই ইতিহাসকে নিজেদের রাজনৈতিক উৎসকাহিনির অংশ করে নিয়েছে। অমিত শাহের ভাষণেও সেই সূত্র অক্ষুণ্ণ থাকে। সেখানে বলা হয়, শ্যামাপ্রসাদ সমস্ত ভয় ও আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে লক্ষ্যপথে এগিয়েছিলেন এবং তথাকথিত ‘ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষ’ শক্তিকে গুরুত্ব দেননি। (Dr. Syama Prasad Mookerjee: A Selfless Patriot. Ibid, p-49)
এই বিশেষ শব্দবন্ধটিও তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান রাজনৈতিক পরিভাষা অতীতের নেতার ওপর আরোপ করে তাঁর জীবনকে নতুন আদর্শিক ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদের সময় ‘ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি আজকের রাজনৈতিক অর্থে প্রচলিত ছিল না। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীরা তাঁর রাজনীতিকে বর্তমানের মতাদর্শিক সংঘর্ষের ভাষায় পুনর্বিন্যাস করেছে। এর ফলে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সরাসরি ধারাবাহিকতা তৈরি করা সম্ভব হয়। জনসঙ্ঘ থেকে বিজেপির সংগঠনগত বিবর্তন যেমন ঐতিহাসিকভাবে বাস্তব, তেমনই সেই ইতিহাসকে বর্তমান রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষভাবে সাজানোও বাস্তব।
শ্যামাপ্রসাদের ১৯৩৯ সালের বক্তব্যগুলি তাঁর হিন্দু স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট দলিল। ৩০ ডিসেম্বর হিন্দু মহাসভার এক অধিবেশনে তিনি বাংলার প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দুদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ আনেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলমান নেতৃত্বাধীন প্রশাসন হিন্দুদের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত অধিকার সংকুচিত করছে। তিনি পৌর আইনের পরিবর্তন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি এবং শিক্ষা দপ্তরের নীতিকে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। বিশেষভাবে তাঁর অভিযোগ ছিল, শিক্ষা প্রশাসনের ‘মুসলিমিকরণ’ ঘটছে এবং সরকারি সুযোগসুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে হিন্দুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। (২৩. দীনেশচন্দ্র সিংহ : শ্যামাপ্রসাদ বঙ্গবিভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ। গ্রন্থরশ্মি। কলকাতা। ১৪০৭ বঙ্গাব্দ সংস্করণ। পৃ-৫৩)
এই অভিযোগগুলি যে সময়ে করা হয়েছিল, সে সময়ের বাংলার সামাজিক গঠনটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক বাংলায় দীর্ঘদিন প্রশাসন, শিক্ষা, আইনপেশা ও শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনে হিন্দু ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বে পিছিয়ে থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিল। ফলে মুসলিম মধ্যবিত্তের বিস্তার ও সরকারি চাকরিতে তাঁদের প্রবেশকে হিন্দু মধ্যবিত্তের একটি অংশ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছিল। অপরদিকে মুসলমান সমাজের চোখে সংরক্ষণ, প্রতিনিধিত্ব বা প্রশাসনিক পুনর্বণ্টন ছিল দীর্ঘ বৈষম্য সংশোধনের উপায়। এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি না বুঝলে শ্যামাপ্রসাদের অভিযোগের সামাজিক ভিত্তি স্পষ্ট হয় না।
তিনি যে প্রতিটি অভিযোগই কল্পনা থেকে তৈরি করেছিলেন এমন বলা ইতিহাসসম্মত হবে না। প্রাদেশিক প্রশাসনের নীতি নিয়ে বাস্তব বিতর্ক ছিল। কিন্তু সমস্যা হল, তিনি এই প্রতিযোগিতাকে সামগ্রিক সামাজিক বৈষম্যের পরিবর্তে প্রধানত হিন্দু বনাম মুসলমান দ্বন্দ্বের কাঠামোয় উপস্থাপন করতেন। ফলে শ্রেণি, শিক্ষা, গ্রাম ও শহরের বৈষম্য, জমির প্রশ্ন, ঔপনিবেশিক চাকরির সীমিত পরিসর এবং শতাব্দীব্যাপী সামাজিক পশ্চাৎপদতার মতো বিষয়গুলি ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে চলে যেত। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শক্তি এখানেই। একটি জটিল সামাজিক প্রশ্নকে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শূন্য-সম প্রতিযোগিতায় রূপান্তর করলে উভয় পক্ষই নিজেদের বঞ্চিত বলে মনে করতে শুরু করে।
বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের একাংশের কাছে এই ভাষা দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। কারণ তাদের সামনে একদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রাদেশিক রাজনীতি, অন্যদিকে সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় প্রতিযোগিতা, আবার তৃতীয়দিকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর অনিশ্চয়তা উপস্থিত ছিল। শ্যামাপ্রসাদ এই উদ্বেগকে সংগঠিত রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তৃতায় ‘হিন্দু স্বার্থ’ কেবল ধর্মীয় অধিকারের বিষয় ছিল না; চাকরি, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, পৌরসভা, জমি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং শেষ পর্যন্ত ভূখণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে। এখান থেকেই ১৯৪৭ সালে বাংলাভাগের পক্ষে তাঁর আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি প্রস্তুত হয়।
এই রাজনৈতিক পথের একটি বিপরীতধর্মী দিকও ছিল। যে হিন্দু মহাসভা মুসলিম লিগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে হিন্দুদের রক্ষার দাবি করত, সেই সংগঠন প্রাদেশিক ক্ষমতার স্বার্থে মুসলিম নেতৃত্বের সঙ্গে সহযোগিতা করতেও দ্বিধা করেনি। শ্যামাপ্রসাদ নিজেও ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। ফলে তাঁর রাজনীতিকে নিছক মুসলিমবিদ্বেষের সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করলে তার ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাস্তববাদ ধরা পড়ে না। তিনি যেখানে রাজনৈতিক সুবিধা দেখেছেন, সেখানে মুসলমান নেতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করেছেন; আবার যেখানে হিন্দু সমাজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন তাঁর শক্তি বাড়াতে পারে বলে মনে করেছেন, সেখানে সাম্প্রদায়িক অভিযোগকে জোরদার করেছেন। এই বৈপরীত্যকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বলা হবে, না বাস্তববাদ, তা মূল্যায়নের প্রশ্ন। কিন্তু ঘটনাটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও এই দ্বৈততা বহন করে। একদিকে তাঁকে সর্বভারতীয় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, অন্যদিকে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয় ধর্মীয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলার বিভাজন। একদিকে তাঁকে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে একজন দেশপ্রেমিক বলা হয়, অন্যদিকে তাঁর হিন্দু স্বার্থরক্ষার রাজনীতিকেই বর্তমান হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি নিজেদের ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে উদ্যাপন করে। এই দুটি বক্তব্যের মধ্যে একটি মৌল টানাপোড়েন রয়েছে। জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক ভূখণ্ডবিভাগের প্রবক্তা, দুই পরিচয়কে একই সঙ্গে ধারণ করতে গেলে ইতিহাসের কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে হয়।
এই কারণেই শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে প্রশংসা বা নিন্দার পূর্বনির্ধারিত ভাষার বদলে দলিলের দিকে ফিরে যাওয়া জরুরি। রমেশচন্দ্র মজুমদারের স্মৃতিকথা, তাঁর নিজের চিঠিপত্র, হিন্দু মহাসভার অধিবেশনের বক্তৃতা, বাংলাভাগ নিয়ে তাঁর প্রচার, সমকালীন সংবাদপত্র, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের নথি এবং পরবর্তী স্মৃতিচর্চা একসঙ্গে বিচার করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন জটিল ও অত্যন্ত সচেতন এক রাজনৈতিক নেতা। তাঁর লক্ষ্য সুস্পষ্ট ছিল। হিন্দু সমাজকে পৃথক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত করা, প্রশাসনে তার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে ভূখণ্ডের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমেও সেই স্বার্থ রক্ষা করা তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল।
এখানেই বিপিনচন্দ্র পালের শতাব্দীর গোড়ার সতর্কবাণী নতুন তাৎপর্য লাভ করে। ব্রিটিশ শাসনের বিভাজননীতি যে আগুন জ্বালিয়েছিল, তা শুধু বিদেশি প্রশাসনের দপ্তরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ সেই আগুনকে নিজেদের সংগঠন নির্মাণের উপাদান বানিয়েছিল। মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়ের দাবির মুখে হিন্দুদের পৃথক সংগঠনের দাবি, আবার হিন্দু সংগঠনের বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম রাজনৈতিক সংহতি, এই পারস্পরিক ক্রিয়া সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ক্রমে আত্মপুষ্ট এক ব্যবস্থায় পরিণত করেছিল। প্রতিটি পক্ষ অন্য পক্ষের অস্তিত্বকে নিজের অপরিহার্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলার চল্লিশের দশকের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, হিন্দু মধ্যবিত্তের উদ্বেগ, বঙ্গবিভাগের আন্দোলন অথবা স্বাধীনতার পরে জনসঙ্ঘের জন্ম বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু একই কারণে তাঁকে কেবল ‘বাংলার রক্ষাকর্তা’ বা ‘নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক’ বলে পূজার আসনে বসালে ইতিহাস বোঝা আরও কঠিন হয়ে যায়। তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য ছিল, কিন্তু সেই সাফল্যের মূল্যও ছিল। পশ্চিমবঙ্গের জন্ম যেমন বহু বাঙালি হিন্দুর কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বলে বিবেচিত হয়েছিল, তেমনই বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে এমন এক সীমারেখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যার মানবিক মূল্য পরবর্তী দশকগুলিতে উদ্বাস্তুপ্রবাহ, সম্পত্তিহানি, ভয়, বিচ্ছেদ ও স্মৃতির ক্ষত হিসেবে বহন করতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে।
অতএব শ্যামাপ্রসাদের উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রশ্নটি কেবল তিনি কত বড় নেতা ছিলেন তা নয়। প্রশ্ন হল, তিনি কোন রাজনৈতিক উদ্বেগকে সংগঠিত করেছিলেন, কোন সামাজিক ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছিল, কোন ধরনের রাষ্ট্রকল্পনা তিনি সামনে এনেছিলেন এবং তাঁর রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি ফল কী ছিল। এই প্রশ্নগুলি এড়িয়ে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত সাহস, সংসদীয় দক্ষতা কিংবা মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত আত্মত্যাগের কাহিনি সামনে আনলে একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের বদলে রাজনৈতিক স্মারক তৈরি হয়।
এই কারণেই অমিত শাহের ২০১৬ সালের ভাষণ বা পরবর্তী হিন্দুত্ববাদী স্মৃতিচর্চাকে নিছক শ্রদ্ধার ভাষণ হিসেবে দেখা যায় না। এগুলি বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের অংশ। শ্যামাপ্রসাদকে জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা থেকে সরাসরি বিজেপির আদর্শিক পূর্বপুরুষ হিসেবে তুলে ধরে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নির্মিত হয়। বঙ্গবিভাগকে তাঁর ‘ভারতরক্ষা’র কীর্তি বলা হলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জন্য একটি আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে মুসলিম লিগ, পাকিস্তান ও বঙ্গভাগের স্মৃতি ব্যবহার করে বর্তমানের হিন্দু রাজনৈতিক সংহতিকে অতীতের নিরাপত্তাসংকটের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এই স্মৃতির রাজনীতি তাই শুধু অতীতের ব্যাখ্যা নয়, বর্তমানের ভোট, পরিচয় ও মতাদর্শেরও একটি সক্রিয় উপাদান।
কিন্তু ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা চাইলে এই নির্মাণের পাশে বিপরীত দলিলগুলিও রাখতে হয়। রমেশচন্দ্র মজুমদারের ঢাকা-স্মৃতি, শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভাকেন্দ্রিক বক্তব্য, মুসলমান নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং হিন্দু স্বার্থকে কেন্দ্র করে বাংলার প্রশাসনিক প্রশ্নগুলির ব্যাখ্যা দেখায় যে তাঁর রাজনীতি কোনো সরল জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি ছিল না। তা ছিল সম্প্রদায়নির্ভর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি সুসংবদ্ধ প্রকল্প।
তাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বিচার করার সবচেয়ে সঙ্গত উপায় তাঁকে দেবতা বা দানব কোনোটিতেই পরিণত না করা। তাঁর কাজের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হবে তাঁর নিজের সময়ের দ্বন্দ্ব, ভয়, ক্ষমতার কাঠামো এবং সাম্প্রদায়িক সংগঠনের বিকাশের মধ্যে। তিনি নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান, কর্মক্ষম ও দৃঢ়চেতা ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিভা কোনো মতাদর্শকে নৈতিকভাবে নিষ্কলঙ্ক করে না। তাঁর সংগঠনক্ষমতা এবং কৌশলী নেতৃত্ব হিন্দু মহাসভাকে বাংলায় শক্তি দিয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান ভিত্তি করে তুলেছিল। এই উত্তরাধিকারই পরবর্তী জনসঙ্ঘ এবং ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে তাঁকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ইতিহাসের এই জটিলতাটুকু স্বীকার করাই জরুরি। কারণ একটি সমাজ যখন তার অতীত থেকে শুধু পছন্দসই নায়ক বেছে নিয়ে তাঁদের জীবনকে মসৃণ রাজনৈতিক কাহিনিতে পরিণত করে, তখন ইতিহাস স্মৃতি হারায় এবং প্রচার হয়ে ওঠে। শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন সেই বিপদের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সাফল্যের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, তাঁর দেশপ্রেমের দাবির সঙ্গে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর বাস্তববাদী সহযোগিতা, তাঁর পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ভূমিকার সঙ্গে বঙ্গবিভাগের মানবিক মূল্য এবং তাঁর জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দু স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বকে পাশাপাশি রাখতে হবে। তাহলেই তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থান পরিষ্কার হয়ে উঠবে এবং রাজনৈতিক পূজার আবরণ সরিয়ে মানুষ ও নেতাকে তাঁর সময়ের প্রকৃত আলোছায়ায় দেখা সম্ভব হবে।
বাংলার তৎকালীন রাজনীতির জটিল সমীকরণটি না বুঝলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর হিন্দু মহাসভায় উত্থান এবং পরে ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগদানের তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়। বিশেষত ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বাংলার রাজনীতি এমন এক অস্থির ও পরিবর্তনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, যখন দলীয় আনুগত্য, শ্রেণিস্বার্থ, সাম্প্রদায়িক পরিচয়, কৃষক আন্দোলন, জমিদারি স্বার্থ এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কৌশল পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। আজকের রাজনৈতিক ভাষায় সেই সময়কে বিচার করলে অনেক ঘটনাই স্ববিরোধী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ক্ষমতা রক্ষা, সরকার গঠন এবং প্রতিপক্ষকে বিচ্ছিন্ন করার তাগিদে এমন সব জোট তৈরি হয়েছিল, যেগুলিকে কেবল মতাদর্শগত সামঞ্জস্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এই সময় অবিভক্ত বাংলার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘শেরেবাংলা’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি অভিজাত মুসলিম নেতৃত্বের প্রচলিত বৃত্ত থেকে উঠে আসেননি। তাঁর রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল বাংলার কৃষকসমাজ, বিশেষত পূর্ববঙ্গের ঋণগ্রস্ত, প্রজাস্বত্ববঞ্চিত এবং জমিদারি শোষণে বিপর্যস্ত মুসলমান ও নিম্নবর্গীয় কৃষিজীবী মানুষ। সেই সামাজিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়েই কৃষক প্রজা পার্টির উত্থান ঘটে। দলটির রাজনৈতিক ভাষা ছিল জমিদারি ও মহাজনি শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের অর্থনৈতিক অধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠা করা। ফলে কৃষক প্রজা পার্টির রাজনীতির সঙ্গে মুসলিম লিগের রাজনীতির একটি মৌল পার্থক্য ছিল। মুসলিম লিগ ক্রমশ মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের সংগঠিত করতে চাইছিল, আর কৃষক প্রজা পার্টি অন্তত তার প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষক ও প্রজার আর্থসামাজিক প্রশ্নকে রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে সচেষ্ট হয়েছিল।
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ছিল এই পরিবর্তনের প্রথম বড় পরীক্ষা। ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে পটুয়াখালি আসনে মুসলিম লিগের প্রভাবশালী নেতা খাজা নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এটি নিছক দুই ব্যক্তির নির্বাচনী লড়াই ছিল না। এর মধ্যে বাংলার মুসলমান রাজনীতির দুই পৃথক প্রবণতার সংঘর্ষও প্রতিফলিত হয়েছিল। নাজিমুদ্দিন ছিলেন জমিদার ও অভিজাত মুসলিম নেতৃত্বের প্রতিনিধি, অন্যদিকে ফজলুল হক নিজেকে কৃষক ও সাধারণ মুসলমানের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরছিলেন। নাজিমুদ্দিনের নির্বাচনী প্রতীক ছিল হারিকেন, আর ফজলুল হকের প্রতীক ছিল লাঙল। কৃষক প্রজা পার্টির জনপ্রিয় আহ্বান ছিল:
“লাঙল যার জমি তার
ঘাম যার দাম তার।”
এই দুটি পঙ্ক্তির মধ্যে দলটির রাজনৈতিক আবেদন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। জমিতে যার শ্রম, জমির অধিকারও তার হওয়া উচিত এবং যে ঘাম ঝরায়, উৎপাদিত সম্পদের ন্যায্য অংশ তারই প্রাপ্য। বাংলার প্রজাস্বত্ব, কৃষিঋণ, জমিদারি শোষণ এবং মহাজনি ঋণের ভারে ন্যুব্জ গ্রামের মানুষের কাছে এই আহ্বানের আকর্ষণ সহজেই অনুমেয়। পটুয়াখালির নির্বাচনে ফজলুল হক প্রায় আট হাজার ভোটের ব্যবধানে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পরাজিত করেন। মুসলিম লিগের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত নেতার বিরুদ্ধে এই বিজয় ফজলুল হকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বাংলার মুসলমান কৃষকসমাজের অভ্যন্তরে পরিবর্তিত রাজনৈতিক মনোভাবেরও পরিচায়ক ছিল।
শীলা সেনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি প্রায় ৩৬টি এবং মুসলিম লিগ ৩৯টি আসন পায়। (২৮. Shila Sen : Muslim politics in Bengal 1937-1947. Impex India. New Delhi. 1976 edn. P-88) অন্য কিছু নির্বাচনী তালিকায় এই সংখ্যা যথাক্রমে ৩৫ ও ৪০ হিসেবেও দেওয়া হয়েছে; স্বতন্ত্র মুসলিম সদস্যের সংখ্যাতেও সূত্রভেদে একটির হেরফের দেখা যায়। কিন্তু এই সামান্য সংখ্যাগত পার্থক্য নির্বাচনের মূল রাজনৈতিক তাৎপর্য বদলে দেয় না। কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনের জন্য জোট ছিল অনিবার্য।
এই নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও নির্দল প্রার্থী হিসেবে আইনসভায় নির্বাচিত হন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তখনও পরবর্তী হিন্দু মহাসভাকেন্দ্রিক রূপ পুরোপুরি অর্জন করেনি, যদিও হিন্দু সমাজের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। অন্যদিকে কংগ্রেস নির্বাচনে বাংলার বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন তাদের ছিল না। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠল, কার নেতৃত্বে জোট সরকার তৈরি হবে।
ফজলুল হক প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সরকার গঠনের চেষ্টা করেন। বাংলার কংগ্রেস রাজনীতিতে তখন শরৎচন্দ্র বসুর মতো নেতারা জোটের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। কৃষক প্রজা পার্টি ও কংগ্রেসের মধ্যে কিছু আর্থসামাজিক প্রশ্নে মিলও ছিল, বিশেষত জমিদারি সংস্কার, কৃষকের ঋণমুক্তি এবং প্রজাস্বত্বের প্রশ্নে। যদি এই জোট গঠিত হত, বাংলার রাজনীতির পরবর্তী ইতিহাস সম্ভবত অন্য ধারায় প্রবাহিত হতে পারত। কিন্তু বন্দি বিপ্লবীদের মুক্তি, রাজনৈতিক বন্দিদের প্রশ্ন, মন্ত্রিত্বের নীতি এবং সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের অনিচ্ছার মতো বিভিন্ন কারণে সেই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে ফজলুল হক শেষ পর্যন্ত মুসলিম লিগের সঙ্গে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যান।
এই রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণটির গুরুত্ব অসামান্য। বাংলায় মুসলিম লিগ তখনও পরবর্তী দশকের মতো অপরাজেয় শক্তি হয়ে ওঠেনি। বাংলার মুসলমান ভোটের একটি বড় অংশ কৃষক প্রজা পার্টি, স্বতন্ত্র মুসলিম প্রার্থী এবং অন্য আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যে বিভক্ত ছিল। কংগ্রেস যদি ফজলুল হকের সঙ্গে সরকারে যোগ দিত, মুসলিম লিগের পক্ষে বাংলার মুসলমান সমাজের একচ্ছত্র প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা অনেক কঠিন হতে পারত। পরবর্তী কালের ইতিহাসের আলো থেকে ফিরে তাকালে এই ব্যর্থ জোট আলোচনাকে বাংলার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা যায়।
শেষ পর্যন্ত দ্রুত রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ফজলুল হক মুসলিম লিগের নেতাদের সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠন করেন। খাজা নাজিমুদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, খাজা হাবিবুল্লাহ প্রমুখ এই ব্যবস্থার অংশ হন। মুহাম্মদ ইনাম উল হকের ভাষায়:
“লীগ প্রজা-কংগ্রেস কোয়ালিশনের আশঙ্কায় তাড়াতাড়ি সুরাবর্দি, আজুপদ, এ আপোষ করেন এবং খাজা নাজিমুদ্দিন, শহীদ সুরাবর্দি, খাজা হাবিবুল্লাহ প্রমুখকে নিয়ে ফজলুল হক প্রজা-লীগ মন্ত্রীসভা গঠন করেন। এটিই প্রথম হক-মন্ত্রীসভা। মোট ১১ জন সদস্যের মধ্যে ৫ জন মুসলমান, ৫ জন হিন্দু এবং তিনি নিজে মুখ্যমন্ত্রী হন।” (২৫. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক : ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। বাংলাদেশ। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ- ২০৬-২০৭)
সরকারটির গঠন দেখলে একে নিছক মুসলিম লিগের সরকার বলা যায় না। ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব ছিল। কিন্তু মন্ত্রিসভার ভেতরের রাজনৈতিক শক্তিগুলি একই লক্ষ্য বা একই সামাজিক স্বার্থের প্রতিনিধি ছিল না। কৃষক প্রজা পার্টির একটি শক্তিশালী অংশ কৃষকের স্বার্থে ভূমিসংস্কার, ঋণসালিশ, প্রজাস্বত্ব এবং জমিদারি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষে ছিল। মুসলিম লিগের নেতৃত্বের একটি অংশ আবার জমিদার, ব্যবসায়ী ও অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। ফলে একই মন্ত্রিসভার ভেতরেই কৃষকস্বার্থ ও জমিদারস্বার্থ, আঞ্চলিক রাজনীতি ও সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতি এবং অসাম্প্রদায়িক কৃষকভিত্তিক রাজনীতি ও সম্প্রদায়কেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্যে সংঘাত তৈরি হওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা।
কংগ্রেসও সরকারটির বিরুদ্ধে বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে ফজলুল হক এক অদ্ভুত রাজনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েন। একদিকে সরকার টিকিয়ে রাখতে তাঁকে মুসলিম লিগের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল, অন্যদিকে নিজের কৃষক প্রজা পার্টির সামাজিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি বিসর্জন দিলে তাঁর দলীয় ভিত্তি ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এই দ্বিধাই ক্রমে তাঁকে মুসলিম লিগের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তোলে। মুসলিম লিগও পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। সরকারের অভ্যন্তরে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে তারা বাংলার মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।
এখানে ফজলুল হকের রাজনৈতিক চরিত্রের একটি বিরোধও প্রকাশ পায়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কট্টর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতিনিধি ছিলেন না এবং কৃষক প্রজা পার্টির প্রাথমিক ঘোষণাগুলিও মূলত কৃষকস্বার্থকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু সরকার রক্ষার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় তাঁকে এমন বহু সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল যা তাঁর দলের ঘোষিত সামাজিক লক্ষ্যকে দুর্বল করেছিল। মুসলিম লিগের প্রভাবে তিনি ক্রমে মুসলমান রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে টেনে নেওয়া হন এবং ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপনও করেন। এই পরিবর্তনের পথটি সরল ছিল না। তার পেছনে বাংলার আইনসভার অঙ্ক, জোট রক্ষার বাধ্যবাধকতা এবং সর্বভারতীয় রাজনীতিতে জিন্নাহর ক্রমবর্ধমান প্রভাব কাজ করেছিল।
মন্ত্রীসভায় নিজের দলের সদস্যদের নিয়েও ফজলুল হক সংকটে পড়েন। কৃষক প্রজা পার্টির একাংশ মনে করছিল, সরকার কৃষকস্বার্থের কর্মসূচি থেকে সরে যাচ্ছে। জমিদার ও রক্ষণশীল স্বার্থের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আপসের অভিযোগ উঠছিল। দলের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দিলে ফজলুল হক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং বিরোধীদের বহিষ্কার করেন। এর ফলে তাঁর নিজস্ব দল দুর্বল হয় এবং জোটের অভ্যন্তরে মুসলিম লিগের আপেক্ষিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। যে দল তাঁকে ক্ষমতায় পৌঁছে দিয়েছিল, সেই কৃষক প্রজা পার্টিই ক্রমে বিভক্ত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে।
মুহাম্মদ ইনাম উল হক এই সংকটের বিবরণ দিতে গিয়ে দেখিয়েছেন, মুসলিম লিগের চাপ, কৃষক প্রজা পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্ব, কংগ্রেসের বিরোধিতা এবং বহিষ্কৃত সদস্যদের সমালোচনা মিলিয়ে ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। (২৬. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক : প্রাগুক্ত। পৃ- ২০৭) কিন্তু প্রথম হক মন্ত্রিসভার পতনকে শুধু একটি দলের ষড়যন্ত্র বা ব্যক্তিগত বিরোধের ফল হিসেবে দেখা যায় না। এর গভীরে ছিল বাংলার সমাজেরই বিরোধ। সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক জনতার সামাজিক দাবি এবং আইনসভায় প্রভাবশালী জমিদার, ব্যবসায়ী ও অভিজাত গোষ্ঠীর স্বার্থের মধ্যে সংঘাত ছিল মৌলিক।
ফজলুল হক প্রথমবার বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল। তাঁর প্রথম দফার সরকার ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের গোড়া পর্যন্ত টিকে ছিল। এ সময়ের মধ্যে তাঁর সঙ্গে জিন্নাহ ও সর্বভারতীয় মুসলিম লিগের সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে ওঠে। প্রধান বিরোধের একটি কারণ ছিল ১৯৪১ সালে ভাইসরয়ের প্রতিরক্ষা পরিষদে ফজলুল হকের যোগদান। জিন্নাহর নির্দেশ অমান্য করেই তিনি সেই পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন ভারতীয় রাজনীতির সমস্ত হিসাব বদলে দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার ভারতের নির্বাচিত নেতৃত্বের সম্মতি ছাড়াই দেশকে যুদ্ধে যুক্ত করেছে। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ নিজেদের স্বতন্ত্র কৌশল অনুসরণ করছিল। এই পরিস্থিতিতে ফজলুল হকের স্বাধীন পদক্ষেপ জিন্নাহর পক্ষে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
ক্রমে মুসলিম লিগ ফজলুল হকের সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং তাঁর সঙ্গে লিগের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে যায়। ১৯৪১ সালের ২ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন তখনও শেষ হয়নি। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলার আইনসভায় নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ তৈরি করে তিনি আবার সরকার গঠনের উদ্যোগ নেন। এবার তাঁর সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হলেন এমন একজন নেতা, যিনি কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলার হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সবচেয়ে পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর ফজলুল হক দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করেন। এই নতুন জোটে ছিলেন কৃষক প্রজা পার্টির বিভিন্ন অংশ, শরৎচন্দ্র বসুর অনুসারী কংগ্রেসপন্থীরা, নির্দলীয় সদস্য, তফসিলি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং হিন্দু মহাসভার সদস্যরা। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই মন্ত্রিসভার অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন এবং অর্থ দপ্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে এই সরকারই ‘শ্যামা হক মন্ত্রিসভা’ নামে পরিচিত।
আবুল হাশিম লিখেছেন:
“১৯৪২ সালে ফজলুল হক মুসলিম লীগ পরিত্যাগ করেন এবং হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সঙ্গে একত্রিত হয়ে তার নেতৃত্বে গঠন করেন এক নতুন মন্ত্রীপরিষদ। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে মন্ত্রিত্বে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এই মন্ত্রিপরিষদ ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রীপরিষদ নামে পরিচিত হয়।” (আবুল হাশিম : আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি। চিরায়ত প্রকাশন। কলকাতা। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-৩৫)
এখানে তারিখের সামান্য সংশোধন প্রয়োজন। নতুন মন্ত্রিসভা ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরেই গঠিত হয়েছিল; ১৯৪২ সালে তার কার্যকাল পূর্ণমাত্রায় চলছিল। আবুল হাশিমের স্মৃতিবিবরণে ঘটনাটিকে ১৯৪২ সালের রাজনৈতিক পর্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটির মূল তাৎপর্য তারিখের এই সামান্য পার্থক্যে নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, মুসলিম লিগের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পর ফজলুল হক তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় একেবারে বিপরীত মেরুর শক্তিকেও জোটের মধ্যে আনতে দ্বিধা করেননি। একইভাবে হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদও মুসলমান প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের অধীনে সরকারে যোগ দিতে কোনো আদর্শগত বাধা অনুভব করেননি।
এই ঘটনা শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে তাঁকে হিন্দু স্বার্থরক্ষার আপসহীন সৈনিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে তিনি ছিলেন অনেক বেশি কৌশলী। মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একজন মুসলমান নেতার সঙ্গে তিনি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ছিলেন, যদি সেই সহযোগিতা হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়। অর্থাৎ তাঁর রাজনীতির মধ্যে মতাদর্শ যেমন ছিল, তেমনি ক্ষমতার বাস্তব অঙ্কও ছিল।
ফজলুল হক মুসলিম লিগের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ, প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তোষকুমার বসু, শামসুদ্দিন আহমেদ, আবদুল করিম এবং উপেন্দ্রনাথ বর্মন প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সরকার গঠন করেন। এই জোট ছিল রাজনৈতিকভাবে বিচিত্র। এখানে হিন্দু মহাসভার নেতা যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন মুসলমান নেতা, কৃষক প্রজা পার্টির অংশ, কংগ্রেসপন্থী এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। অর্থাৎ একে সরলভাবে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সরকার বললে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। এটি ছিল মুসলিম লিগবিরোধী একটি বিস্তৃত আইনসভা জোট, যার প্রধান ঐক্যসূত্র ছিল জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগকে ক্ষমতার বাইরে রাখা।
ফজলুল হকের এই সিদ্ধান্ত সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ ভালোভাবে নেয়নি। তাঁকে এবং তাঁর সহযোগী মুসলমান নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচার শুরু হয়। আবুল হাশিমের বিবরণ অনুযায়ী, ফজলুল হক এবং তাঁর মুসলমান সহকর্মীদের মুসলিম লিগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। (আবুল হাশিম : আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি। চিরায়ত প্রকাশন। কলকাতা। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-৩৫) বাংলার মুসলমান সমাজে মুসলিম লিগ এই জোটকে এমনভাবে প্রচার করতে থাকে যেন ফজলুল হক হিন্দু মহাসভার কাছে মুসলমান স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন। অন্যদিকে হিন্দু মহাসভার কাছে শ্যামাপ্রসাদের মন্ত্রিত্ব ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতার ভেতরে প্রবেশ করে হিন্দু সমাজের স্বার্থ রক্ষার সুযোগ।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতা শ্যামাপ্রসাদের পরবর্তী হিন্দুত্ববাদী প্রতিমূর্তির সঙ্গে তুলনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য চোখে পড়ে। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যেগুলির সঙ্গে তাঁর পরবর্তী মতাদর্শগত অবস্থান পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ক্ষমতার প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রেখে আন্দোলনকারী নেতা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে ওঠেনি। বরং আইনসভা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাদেশিক সরকার, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এবং পরে বিরোধী রাজনীতির মধ্য দিয়েই তাঁর উত্থান।
১৯২৯ সালে তাঁর আইনসভায় প্রবেশের ঘটনাটিই তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সে বছর তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে বঙ্গীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর রাজনীতির সূচনাপর্ব তাই হিন্দু মহাসভা দিয়ে হয়নি। কিন্তু কংগ্রেস আইনসভা বয়কটের নীতি গ্রহণ করলে তিনি সেই নির্দেশ মেনে পদত্যাগ করেন, পরে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থরক্ষার যুক্তি দেখিয়ে নির্দল সদস্য হিসেবে পরিষদে ফিরে আসেন। অর্থাৎ দলীয় নির্দেশের তুলনায় আইনসভায় নিজের উপস্থিতিকে তিনি অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন।
এই ঘটনাকে কেউ বাস্তববাদ বলতেই পারেন, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য এখানে স্পষ্ট। তিনি রাজনীতিতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, আইনসভা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার গুরুত্ব অত্যন্ত ভালোভাবে বুঝতেন। ব্রিটিশবিরোধী গণআন্দোলন বা আইন অমান্যের পথে রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার চেয়ে প্রশাসনিক কাঠামোর অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তারের পথ তাঁর কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য ছিল। এ কারণেই পরবর্তী সময়েও দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক গণসংগ্রামের চেয়ে আইনসভা ও মন্ত্রিসভার রাজনীতির মধ্যেই তিনি নিজের ভূমিকা খুঁজেছেন।
১৯৩৭ সালে তিনি আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনী এলাকা থেকে আইনসভায় নির্বাচিত হন। এই সময় থেকেই বাংলার রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। শিক্ষানীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্ব এবং মুসলমান নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে তিনি ক্রমশ সক্রিয় হন। ১৯৩৯ সালে হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে যোগ দেওয়ার পরে তাঁর রাজনীতি আরও সুস্পষ্ট হিন্দু স্বার্থকেন্দ্রিক রূপ পায়। কিন্তু তার পরেও তিনি নিছক বহিরাগত আন্দোলনের নেতা হয়ে থাকেননি। মাত্র দু বছরের মধ্যে তিনি ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রবেশ করেন।
এখানেই শ্যামা হক জোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। একদিকে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার নেতা, অন্যদিকে ফজলুল হক ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনকারী ব্যক্তি। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তাঁরা একই মন্ত্রিসভার দুই প্রধান মুখ। এই ঘটনাই দেখায়, তৎকালীন বাংলার রাজনীতি কেবল হিন্দু বনাম মুসলমান এই সরল বিভাজনে পরিচালিত হয়নি। দলীয় প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিগত নেতৃত্ব, প্রাদেশিক স্বার্থ এবং সর্বভারতীয় সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন অনেক সময় ধর্মীয় পরিচয়ের সীমারেখাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল।
শ্যামা হক মন্ত্রিসভাকে ঘিরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক আশাও তৈরি হয়েছিল। এমন ধারণা দেখা দিয়েছিল যে বাংলায় মুসলিম লিগ এবং হিন্দু মহাসভার পরস্পরবিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাইরে ফজলুল হক ও শ্যামাপ্রসাদের প্রশাসনিক সহযোগিতা হয়তো কোনো ধরনের হিন্দু মুসলমান রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খুলতে পারে। বাস্তবে অবশ্য সেই সম্ভাবনা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরীণ বিরোধ, মুসলিম লিগের প্রবল বিরোধিতা, গভর্নরের হস্তক্ষেপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি, জাপানি আক্রমণের আশঙ্কা, খাদ্যসংকট এবং সর্বোপরি ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন বাংলার প্রশাসনিক পরিবেশকে দ্রুত অস্থির করে তোলে।
এই পর্যায়েই শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়। কংগ্রেস যখন ১৯৪২ সালে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেয়, তখন শ্যামাপ্রসাদ সেই আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দেননি। বরং বাংলার মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন। এই অবস্থান তাঁর সাংবিধানিক রাজনীতির দীর্ঘ অভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর কাছে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেয়ে প্রাদেশিক প্রশাসন রক্ষা এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর এই অবস্থান পরবর্তী সময়ে গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং তাঁকে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল ধারার বিরোধী বলে চিহ্নিত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে এই সরকারকে নিছক ব্রিটিশ সরকারের অনুগত মন্ত্রিসভা বললেও ঘটনাটির সমস্ত দিক ধরা পড়ে না। ফজলুল হকের সঙ্গে বাংলার গভর্নর জন হারবার্টের সম্পর্ক ক্রমেই সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং শ্যামাপ্রসাদ নিজেও পরবর্তী পর্যায়ে গভর্নরের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে শ্যামা হক মন্ত্রিসভা একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ এবং সেই কাঠামোর অন্তর্গত ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র ছিল।
১৯৪৩ সালের ২৯ মার্চের কাছাকাছি সময়ে ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার পতন ঘটে এবং পরবর্তী মাসে খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম লিগ সরকার গঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনীতির ভারসাম্য আরও স্পষ্টভাবে মুসলিম লিগের দিকে সরে যায়। কৃষক প্রজা পার্টির যে বিকল্প মুসলমান রাজনীতি ১৯৩৭ সালে জিন্নাহর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এত শক্তিশালী বলে মনে হয়েছিল, ছয় বছরের মধ্যে তা প্রায় ভেঙে পড়ে। মুসলিম লিগ বাংলার মুসলমান সমাজে ক্রমেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হতে থাকে এবং ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তার পূর্ণ রাজনৈতিক ফল প্রকাশ পায়।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক যাত্রাও থেমে থাকেনি। প্রাদেশিক মন্ত্রী হিসেবে তাঁর ভূমিকার পরে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতির দিকে আরও বেশি মনোনিবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি গণপরিষদের সদস্য হন। এই সময় তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে ওঠে বাংলার ভবিষ্যৎ এবং সম্ভাব্য পাকিস্তানের মধ্যে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলির অবস্থান। ১৯৩৭ সালে যে নেতা মুসলমান কৃষকনেতা ফজলুল হকের সরকারের বিরুদ্ধে রাজনীতি করেছিলেন, ১৯৪১ সালে তাঁরই সঙ্গে মন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই নেতা ১৯৪৭ সালে বাংলাকে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভাগ করার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এই বাঁকগুলি একত্রে না দেখলে তাঁর প্রকৃত চরিত্র বোঝা অসম্ভব।
এখানে ‘ক্ষমতার বৃত্তেই সবসময় স্বচ্ছন্দ থেকেছেন শ্যামাপ্রসাদ’ এই মন্তব্যটির একটি নির্দিষ্ট অর্থ আছে, যদিও এটিকে আরও সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। তাঁর রাজনীতি ছিল ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের রাজনীতি। তিনি কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে আইনসভায় প্রবেশ করেছেন, দলীয় বয়কটনীতির সঙ্গে দ্বিমত হলে নির্দল সদস্য হিসেবে ফিরে এসেছেন, হিন্দু মহাসভার নেতা হয়েও মুসলমান প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হয়েছেন, স্বাধীনতার পরে কংগ্রেস পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারেও মন্ত্রী হয়েছেন এবং পরে মতানৈক্য হলে মন্ত্রিসভা ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়েছেন। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ক্ষমতালিপ্সা কতখানি এবং রাজনৈতিক কৌশল কতখানি, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনের রাজনীতি বিশ্বাস করতেন না। ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্যে ব্যবহার করাই ছিল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ পথ।
সেই কারণে তাঁকে শুধু আপসহীন হিন্দুত্ববাদী যোদ্ধা হিসেবে দেখাও অসম্পূর্ণ, আবার কেবল সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ বলে উড়িয়ে দেওয়াও যথেষ্ট নয়। তিনি ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক যিনি মতাদর্শ ও বাস্তব ক্ষমতার সমীকরণকে একই সঙ্গে ব্যবহার করতে জানতেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্র ক্রমে হিন্দু স্বার্থে এসে স্থির হলেও সেই স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা, আইনসভা, জোট এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।
ফজলুল হকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা দেখা যায়। ১৯৩৭ সালে তিনি কৃষকের নেতা হিসেবে মুসলিম লিগের নাজিমুদ্দিনকে পরাজিত করেন; পরে সরকার গঠনের প্রয়োজনে সেই মুসলিম লিগের সঙ্গেই জোট করেন। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন; পরের বছর জিন্নাহর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে সরকার গড়েন। পরবর্তী জীবনে আবার পাকিস্তানের রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। সুতরাং এই সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যক্তিদের অপরিবর্তনীয় মতাদর্শিক খোপে বন্দি করা বিপজ্জনক।
কিন্তু এই জোটবদলের মধ্যেই বাংলার রাজনীতির একটি ক্রমবর্ধমান দুর্যোগ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কৃষক প্রজা পার্টি যে শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল, তা ক্রমে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাপে দুর্বল হয়ে যায়। ‘লাঙল যার জমি তার, ঘাম যার দাম তার’ এই শ্রেণিভিত্তিক দাবির জায়গা ক্রমে দখল করে ‘হিন্দুর স্বার্থ’ ও ‘মুসলমানের স্বার্থ’ নামক পৃথক রাজনৈতিক ভাষা। কৃষকের জমি, ঋণ, খাজনা, মহাজনি শোষণ এবং প্রজাস্বত্বের প্রশ্ন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকার বদলে হিন্দু ও মুসলমানের প্রতিনিধিত্বের হিসাব প্রধান হয়ে উঠতে থাকে।
এই রূপান্তরই পরবর্তী বঙ্গবিভাগের সামাজিক ভিত্তি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে যে বাংলায় মুসলমান কৃষক খাজা নাজিমুদ্দিনের মতো মুসলিম লিগ নেতাকে প্রত্যাখ্যান করে ফজলুল হকের লাঙলে ভোট দিয়েছিলেন, সেই বাংলাতেই ১৯৪৬ সালের মধ্যে মুসলিম লিগ মুসলমান সমাজের প্রায় একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রতিনিধি হয়ে উঠল। একইভাবে হিন্দু সমাজের মধ্যেও হিন্দু মহাসভার ভাষ্য, বিশেষত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে হিন্দুদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন, ক্রমশ শক্তি অর্জন করল। এই দুই প্রক্রিয়া পরস্পরকে পুষ্ট করেছিল।
তাই শ্যামা হক মন্ত্রিসভা ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী পরিহাসের মতো উপস্থিত হয়। একদিকে এটি দেখায়, সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাজনৈতিক সমঝোতা তখনও অসম্ভব হয়ে যায়নি। হিন্দু মহাসভার নেতা এবং মুসলমান কৃষকনেতা একই মন্ত্রিসভায় কাজ করতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে এই জোটের ব্যর্থতা প্রমাণ করে, সমাজের গভীরে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ যখন দ্রুত বাড়ছিল, তখন কেবল আইনসভার অঙ্ক দিয়ে সেই বিভাজন দীর্ঘদিন রোধ করা সম্ভব ছিল না।
এই পর্বের ইতিহাস বর্তমানেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে যে স্মৃতিনির্মাণ করা হয়, সেখানে শ্যামা হক মন্ত্রিসভার এই জটিলতাকে সচরাচর সামনে আনা হয় না। তাঁকে যদি মুসলিম লিগের আপসহীন প্রতিপক্ষ এবং চিরকালীন হিন্দু রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়, তবে ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় প্রশাসনিক সহযোগিতা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার এই সহযোগিতাকে দেখিয়ে তাঁকে অসাম্প্রদায়িক বলে প্রতিষ্ঠা করাও সমানভাবে ভুল, কারণ তাঁর পরবর্তী বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে হিন্দু স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট।
ঐতিহাসিক মানুষকে বুঝতে হলে এই স্ববিরোধগুলিকেই গুরুত্ব দিতে হয়। ১৯২৯ সালের কংগ্রেস সদস্য শ্যামাপ্রসাদ, ১৯৩৭ সালের নির্দল আইনসভার সদস্য শ্যামাপ্রসাদ, ১৯৩৯ সালের হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামাপ্রসাদ, ১৯৪১ সালের ফজলুল হকের অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ এবং ১৯৪৭ সালের বঙ্গবিভাগের প্রবক্তা শ্যামাপ্রসাদ একই মানুষ। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কোনো একটি পর্বকে আলাদা করে মহিমান্বিত কিংবা নিন্দিত করলে ইতিহাসের প্রকৃত রূপ আড়াল হয়ে যায়।
এই বৃহত্তর পটভূমিতে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের ঘটনাগুলি আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়। বাংলার রাজনীতি একসময় কৃষকের জমি ও শ্রমের প্রশ্নকে সামনে রেখে এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, যা ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে অতিক্রম করতে পারত। কৃষক প্রজা পার্টির সেই স্লোগান, “লাঙল যার জমি তার / ঘাম যার দাম তার”, ছিল সেই সম্ভাবনার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত প্রকাশ। কিন্তু দলীয় বিভাজন, ক্ষমতার টানাপোড়েন, জমিদার ও অভিজাত স্বার্থ, কংগ্রেসের ভুল রাজনৈতিক হিসাব, মুসলিম লিগের সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন এবং হিন্দু মহাসভার পাল্টা হিন্দু সংহতির রাজনীতি মিলিয়ে সেই সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কে কতদিন ক্ষমতায় ছিলেন, কোন নেতা কোন জোটে যোগ দিয়েছিলেন বা কে কাকে পরাজিত করেছিলেন তা নয়। প্রশ্ন হল, এই জোট ও বিচ্ছেদের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনৈতিক ভাষা কীভাবে বদলে গেল। ১৯৩৭ সালে কৃষক বনাম জমিদারের যে দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে উঠেছিল, ১৯৪৭ নাগাদ তার ওপর হিন্দু বনাম মুসলমানের বিভাজন এমনভাবে চেপে বসে যে বাংলা নিজেই দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। ফজলুল হক ও শ্যামাপ্রসাদের সম্পর্কের ইতিহাস সেই পরিবর্তনের এক আশ্চর্য দলিল। একসময় তাঁরা পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, পরে একই সরকারের সহকর্মী, আবার পরবর্তী ইতিহাসে তাঁদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার চলে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ধারায়। বাংলার চল্লিশের দশকের ইতিহাসের ট্র্যাজেডি বুঝতে এই বৈপরীত্যকে বিস্মৃত হওয়া চলে না।
ফজলুল হক পরিচালিত মন্ত্রিসভার একজন দায়িত্বশীল সদস্য এবং একই সঙ্গে হিন্দু মহাসভার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যে দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার মধ্যে তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক সংকটের এক গভীর বৈপরীত্য প্রতিফলিত হয়। তিনি যখন প্রাদেশিক প্রশাসনের অংশ, তখন তাঁকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, আবার একই সময়ে তিনি হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক স্বার্থ বিস্তারের প্রশ্নেও ছিলেন সক্রিয়। এই দুই ভূমিকা সব সময় পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বরং একাধিক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রশাসনিক পদে থেকেও তিনি তাঁর দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। কংগ্রেসে থাকার সময় যেমন তিনি ক্রমশ হিন্দু স্বার্থের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তেমনই ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হয়েও হিন্দু মহাসভার সংগঠনগত ও রাজনৈতিক স্বার্থকে বিস্মৃত হননি। ফলে শ্যামা হক মন্ত্রিসভাকে কেবল হিন্দু মুসলমান সহযোগিতার এক উদার রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা ইতিহাসের একাংশকে আড়াল করা হবে। এর মধ্যে ছিল সহযোগিতা, সন্দেহ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা এবং দুই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাংলার পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছিল। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় জাপানের দ্রুত সামরিক অগ্রগতি ব্রিটিশ শাসকদের আতঙ্কিত করেছিল। বার্মা পতনের পর বাংলার উপকূল এবং বিশেষত চট্টগ্রাম, সুন্দরবন ও মেদিনীপুর অঞ্চলকে সম্ভাব্য জাপানি আক্রমণের প্রবেশদ্বার বলে মনে করা হচ্ছিল। এই আশঙ্কা থেকেই ব্রিটিশ সরকার বাংলায় তথাকথিত ‘ডিনায়াল’ নীতি গ্রহণ করে। এর লক্ষ্য ছিল শত্রুপক্ষ যাতে আক্রমণ করলে খাদ্য, নৌযান, যানবাহন ও স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করতে না পারে, তা আগেভাগেই নষ্ট বা অপসারণ করা। কিন্তু সামরিক বিচারে এই পরিকল্পনার যুক্তি থাকলেও গ্রামীণ বাংলার অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ। নৌকা অপসারণ, চাল ও ধান সংগ্রহ, পরিবহণে বাধা এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের ফলে বহু মানুষের জীবিকা বিপর্যস্ত হয়। শ্যামা হক মন্ত্রিসভা এই নীতির বিরোধিতা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, জাপানি আক্রমণের আশঙ্কাকে সামনে রেখে ব্রিটিশ প্রশাসন এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে যার আসল বোঝা বইতে হচ্ছে বাংলার সাধারণ মানুষকে। বাংলার মানুষ ‘ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত’ হবেন, এই যুক্তিতেই মন্ত্রিসভা ব্রিটিশ সরকারের নীতির বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয় ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত গণবিদ্রোহের রূপ নেয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলেও তার প্রভাব পড়ে, বিশেষত মেদিনীপুর, তমলুক, কাঁথি এবং দক্ষিণবঙ্গের বহু এলাকায় প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ ঘটে। ব্রিটিশ সরকার আন্দোলন দমনে ব্যাপক গ্রেপ্তার, গুলি, লাঠিচার্জ, জরুরি আইন, সেনা ও পুলিশ মোতায়েন এবং রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। শ্যামাপ্রসাদ নিজে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন না। ফজলুল হকও আন্দোলনের রাজনৈতিক পদ্ধতির সমর্থন করেননি। কিন্তু এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য ছিল। আন্দোলনের বিরোধিতা করা আর নির্বিচারে সরকারি দমননীতি সমর্থন করা এক বিষয় নয়। ফজলুল হক এবং তাঁর কৃষক প্রজা পার্টির একটি অংশ ব্রিটিশ সরকারের মাত্রাতিরিক্ত দমনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে আপত্তি জানায়। এই আপত্তি শুধু নৈতিক ছিল না, প্রশাসনিকও ছিল। নির্বাচিত প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাকে পাশ কাটিয়ে গভর্নর ও আমলাতন্ত্র যখন সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছিল, তখন প্রাদেশিক সরকারের কর্তৃত্বও প্রশ্নের মুখে পড়ছিল।
বাংলার গভর্নর স্যার জন হার্বার্টের সঙ্গে শ্যামা হক মন্ত্রিসভার সম্পর্ক এই সময় দ্রুত অবনতির দিকে যায়। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কাঠামো কাগজে যতই বিস্তৃত বলে মনে হোক, যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতিতে গভর্নর ও ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের হাতে বাস্তব ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। মন্ত্রিসভার সঙ্গে পরামর্শ না করেই বহু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল। ভারত ছাড়ো আন্দোলন দমন, খাদ্যনীতির ব্যর্থতা, জাপানি আক্রমণের আশঙ্কা, নৌকা ধ্বংস ও খাদ্য অপসারণের নীতি এবং মেদিনীপুরের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা মন্ত্রিসভা ও গভর্নরের সংঘাতকে তীব্র করে তোলে।
১৯৪২ সালে মেদিনীপুরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়। কিন্তু এই দুর্যোগ মোকাবিলায় নির্বাচিত প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। যুদ্ধকালীন তথ্যনিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক গোপনীয়তা এবং রাজনৈতিক সন্দেহের কারণে দুর্গত অঞ্চলে যথাযথ ত্রাণ পৌঁছানোও বাধাগ্রস্ত হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই ঘটনাকে বাংলার নির্বাচিত সরকারের মর্যাদার ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছিলেন। গভর্নরের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ক্রমশ তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৪২ সালের ১৬ নভেম্বর, কিছু সূত্রে ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বর পর্বের উল্লেখসহ, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। আপনার উদ্ধৃত সূত্রে ১৬ ডিসেম্বরের কথা উল্লেখ আছে, এবং সেই সূত্র অনুসারে ঘটনাটি উপস্থাপিত হলে বলা যায়, সরকারের ভূমিকার প্রতিবাদে তিনি মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন। এর মাত্র কয়েক মাস পর ফজলুল হকের মন্ত্রিসভাও ক্ষমতা হারায় এবং গভর্নর হার্বার্ট প্রশাসনের মূল নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। (৩১. অমলেন্দু দে : বাংলায় ভারত ছাড় আন্দোলন। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। কলকাতা। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-২৪১-২৪২)
১৯৪১ সালে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যে জোট সরকার গঠিত হয়েছিল, তার ঘোষিত লক্ষ্যগুলির একটি ছিল হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষা। মুসলিম লিগের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পরে হক এমন একটি রাজনৈতিক সমন্বয় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যেখানে কংগ্রেসপন্থী, হিন্দু মহাসভা, কৃষক প্রজা পার্টি, তফসিলি প্রতিনিধি এবং স্বাধীন সদস্যরা একসঙ্গে সরকার পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিক কাগজে এই সমন্বয় যত সহজ মনে হয়, সমাজের ভিতরে জমে থাকা সন্দেহ ও অবিশ্বাস তত সহজে দূর করা যায়নি। পূর্ববঙ্গের বহু মুসলমানের কাছে হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদের উপস্থিতি আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা মনে করতেন, মুসলিম লিগের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে ফজলুল হক এমন এক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যার ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্যই ছিল পৃথক হিন্দু স্বার্থের সংগঠন। আবুল মনসুর আহমেদের সেই বিখ্যাত মন্তব্য এই সংশয়েরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি শরৎচন্দ্র বসুকে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদকে নয়। (অমলেশ ত্রিপাঠী : স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫-১৯৪৭)। আনন্দ পাবলিশার্স। কলকাতা। ১৪১৭ বঙ্গাব্দ সংস্করণ। পৃ- ৪৩৮)
এই অবিশ্বাসকে নিছক সাম্প্রদায়িক পক্ষপাত বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ শ্যামাপ্রসাদ নিজেই তখন হিন্দু মহাসভার উচ্চ নেতৃত্বে এবং তাঁর রাজনৈতিক ভাষণে বাংলার হিন্দুদের নিরাপত্তা, চাকরি, শিক্ষা, প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক সংখ্যার প্রশ্ন ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। ফলে মন্ত্রিসভায় তাঁর উপস্থিতি শুধু একজন দক্ষ অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতি ছিল না, হিন্দু মহাসভার সাংগঠনিক শক্তিরও এক ধরনের সরকারি স্বীকৃতি ছিল। আবার শ্যামাপ্রসাদের দিক থেকে দেখলে, ফজলুল হকের মুসলিম লিগবিরোধী অবস্থান তাঁকে একটি মূল্যবান রাজনৈতিক সুযোগ করে দিয়েছিল। মুসলিম লিগকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে তিনি এমন এক প্রাদেশিক সরকারের অংশ হতে পারলেন যেখানে হিন্দু মহাসভার প্রভাব আইনসভার বাইরে থেকে সরাসরি প্রশাসনের ভেতরে পৌঁছে গেল।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতার প্রশ্নে ফজলুল হক এবং শ্যামাপ্রসাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য ছিল। ফলে কংগ্রেসের আন্দোলনের বিরোধিতা করে প্রশাসনিক স্থিতি বজায় রাখার প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদের পক্ষে মন্ত্রিসভাকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে ওঠে। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে তিনি বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কংগ্রেসের সম্ভাব্য আন্দোলন নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশে যে পত্র লিখেছিলেন, তাতে আন্দোলনকে কীভাবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রতিরোধ করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে জনপ্রিয়তা অর্জনের সুযোগ না দেওয়া হয়। এ কারণে তাঁর সমালোচকেরা মনে করেন, তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রিত্বকে তাঁর হিন্দু মহাসভাপন্থী এবং কংগ্রেসবিরোধী রাজনীতির কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
তবে এই বিষয়টির আরেক দিকও আছে। তিনি একই সময়ে ব্রিটিশ গভর্নরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন, মেদিনীপুরের দুর্যোগে প্রশাসনের ভূমিকার প্রতিবাদ করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিত্বও ত্যাগ করেছেন। তাই তাঁকে সরলভাবে ব্রিটিশ সরকারের অনুগত প্রতিনিধি বললে ইতিহাসের জটিলতা আড়াল হয়। বরং বলা যায়, তাঁর রাজনীতি ছিল ঔপনিবেশিক কাঠামোর ভেতরে থেকে সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করার রাজনীতি। তিনি ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার অংশ হিসেবে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু সেই কাঠামোর মধ্যেই নিজের দলীয় স্বার্থ ও প্রাদেশিক দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। কংগ্রেসের গণআন্দোলন তাঁর কাছে ছিল বিপজ্জনক, কিন্তু একই সঙ্গে গভর্নরের সর্বময় কর্তৃত্বও তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে বারবার দেখা যায়।
২০২১ সালের ৫ মার্চ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় শ্যামা হক মন্ত্রিসভার এই বিরোধপূর্ণ চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখা হয়েছিল:
“বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কেমন ভাবে হাত মিলিয়েছিলেন মুসলিম লীগের সঙ্গে। বিজেপি আরএসএস-এর নয়নের মণি, বাংলার ‘বিস্মৃত নায়ক’, এ বারের ভোটে বিজেপির তুরুপের তাস শ্যামাপ্রসাদ কিন্তু প্রথম বার রাষ্ট্রিক ক্ষমতায় এসেছিলেন মুসলিম লীগের হাত ধরেই। ১৯৪১ থেকে ‘৪৩- অবিভক্ত বাংলা প্রদেশে এই দুই বিরুদ্ধ মেরুর মন্ত্রিসভায় ফজলুল হক হন প্রধানমন্ত্রী— জিন্নার কলকাঠিতে কৃষক প্রজা পার্টি ভেঙে যিনি তখন বাধ্য হয়ে যোগ দিয়েছেন লীগে। আর ফজলুল হকের ডেপুটি ও অর্থমন্ত্রী হন শ্যামাপ্রসাদ। এই সময়েই বাংলায়ম মুসলিম লীগের সমর্থন বাড়ে অনেকখানি, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তা আটকাতে পারেননি, সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়ে নিয়েছিলেন মহাসভার প্রভাবও। ‘শ্যামাহক’ মন্ত্রিসভা বলে পরিচিত সেই আমলে পাকিস্তান প্রচারও যেমন নিয়মিত হয়ে উঠেছিল, মহাসভার ‘পাকিস্তানবিরোধী দিবস’ পালনও ছিল নিয়মিত। শ্যামাপ্রসাদ ও তাঁর দলনেতারা সরকারি ভাবে পাকিস্তানপন্থী নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে করতেই তাঁদের মুণ্ডপাত করতেন জনসভায়।” (আনন্দবাজার পত্রিকা, মার্চ ৫, ২০২১)
এই উদ্ধৃতির কিছু রাজনৈতিক সরলীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, বিশেষত ফজলুল হককে সে সময় সরাসরি মুসলিম লিগের অংশ হিসেবে চিত্রিত করা যথাযথ নয়, কারণ ১৯৪১ সালের পর তাঁর সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্কই ভেঙে যায়। তবু উদ্ধৃতির মূল পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার রাজনীতিতে তখন সহযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা একই সঙ্গে চলছিল। সরকারে হিন্দু মহাসভা ও মুসলমান নেতৃত্বের সহাবস্থান ছিল, আবার বাইরে উভয় পক্ষই নিজেদের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ভিত্তিকে দৃঢ় করছিল। ফলে প্রশাসনিক জোট সামাজিক সম্প্রীতির নিশ্চয়তা হয়ে উঠতে পারেনি।
এই জটিল বাস্তবতা বাংলার পরবর্তী বিভাজনের ইতিহাস বুঝতে বিশেষভাবে জরুরি। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে যে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল বাংলার শিক্ষিত হিন্দু সমাজ। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন জাতীয়তাবাদী আবেগে পরিণত হয়েছিল এবং ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ একটি সর্বভারতীয় প্রতীকে রূপ নেয়। অথচ চার দশক পর পরিস্থিতি এতটাই বদলে গেল যে সেই হিন্দু সমাজেরই একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলার নতুন বিভাজনের দাবিতে সক্রিয় হয়ে উঠল। এই পরিবর্তন আকস্মিক ছিল না। এর পেছনে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, নির্বাচনব্যবস্থায় পৃথক প্রতিনিধিত্ব, চাকরি ও শিক্ষায় প্রতিযোগিতা, জমিদারি ও কৃষকস্বার্থের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক দলের ধর্মীয় সংগঠন এবং ব্রিটিশ সরকারের বিভাজনমূলক নীতি কাজ করেছিল।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে প্রশাসনিক অস্ত্র হিসেবে আরও সচেতনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে, এই যুক্তি বহু জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকের লেখায় পাওয়া যায়। তবে এই প্রক্রিয়াকে একমাত্র ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ভারতীয় সমাজের নিজস্ব দ্বন্দ্ব, অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ, ধর্মীয় সংগঠনের স্বাধীন উদ্যোগ এবং নির্বাচনী রাজনীতির বাস্তব প্রতিযোগিতাকে অস্বীকার করা হবে। ব্রিটিশ নীতি বিভাজনকে উৎসাহিত করেছিল, কিন্তু সেই বিভাজনের সামাজিক মাটি ভারতীয় সমাজের মধ্যেও ছিল। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্ব এবং ১৯৩২ সালের ‘কম্যুনাল অ্যাওয়ার্ড’ সেই মেরুকরণকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। আইনসভায় আসনবণ্টনের প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিমাপক হয়ে ওঠে।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লিগের জোট সরকার মুসলমান কৃষক, শিক্ষা, চাকরি এবং প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের একটি অংশে উদ্বেগ বাড়ে। শ্যামাপ্রসাদ এই উদ্বেগকে রাজনৈতিক ভাষা দিতে শুরু করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি চাকরি, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনসভায় হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব কমছে, এই অভিযোগ হিন্দু মহাসভার প্রচারে ক্রমশ কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিদ্যুৎ চক্রবর্তীও দেখিয়েছেন, মুসলিম নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতিকে হিন্দু স্বার্থবিরোধী বলে উপস্থাপনের মাধ্যমে শ্যামাপ্রসাদ বাংলায় হিন্দু রাজনৈতিক সংহতির প্রকল্পকে শক্তিশালী করেন। পরবর্তী সময়ে মুসলিম লিগের সঙ্গে ফজলুল হকের দূরত্ব সৃষ্টি হলে শ্যামাপ্রসাদ সেই সুযোগকে ব্যবহার করে হক সরকারের অংশ হন এবং হিন্দু স্বার্থরক্ষার দাবিকে প্রশাসনিক পরিসরেও নিয়ে আসেন।
কিন্তু এই পর্বের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৪৬ সালে। কলকাতার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, এরপর নোয়াখালিতে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ এবং পাল্টা বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের ওপর হত্যাকাণ্ড বাংলার রাজনীতিকে এমনভাবে মেরুকৃত করে যে অখণ্ড বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়। শ্যামাপ্রসাদ এই সময় ক্রমশ বাংলাভাগের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তান সৃষ্টি যদি অনিবার্য হয় এবং গোটা বাংলা যদি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাকিস্তানে চলে যায়, তবে পশ্চিম ও মধ্য বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিকে ভারতের অংশ হিসেবে পৃথক করতে হবে। তাঁর সমর্থকেরা এটিকে বাংলার হিন্দুদের আত্মরক্ষার প্রকল্প হিসেবে দেখেছে। তাঁর সমালোচকেরা দেখেছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চূড়ান্ত রাজনৈতিক রূপ হিসেবে।
১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালে এই প্রশ্নেই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন মোড় নেয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, আবুল হাশিম প্রমুখ এক বিকল্প পরিকল্পনা সামনে আনেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, বাংলা ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রের অংশ না হয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম এবং অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই পরিকল্পনার ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ ছিল। শরৎচন্দ্র বসু একটি সমাজতান্ত্রিক যুক্তবাংলার স্বপ্ন দেখতেন, সোহরাওয়ার্দি বাংলার অর্থনৈতিক একতা রক্ষার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতেন, আবুল হাশিম মুসলিম লিগের বঙ্গীয় নেতৃত্বের একটি অংশকে অখণ্ডতার পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
সোহরাওয়ার্দির অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার পূর্বাংশ ছিল পাট উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র, কিন্তু পাটশিল্প, বন্দর, বাণিজ্য, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অধিকাংশ বড় শিল্প ছিল কলকাতা ও হুগলি অঞ্চলে। বাংলা ভাগ হলে পূর্ববঙ্গ উৎপাদন করলেও শিল্প ও রপ্তানির প্রধান কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, আর পশ্চিমবঙ্গ শিল্পকেন্দ্র ধরে রাখলেও কাঁচামালের প্রধান উৎস হারাবে। ফলে উভয় অংশই অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। (The Indian Express, March 09, 2021) এই যুক্তির বিপরীতে শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক। তাঁর মতে স্বাধীন অখণ্ড বাংলা গঠিত হলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে হিন্দুরা স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক অধীনতার মধ্যে পড়বে।
এই অবস্থান থেকেই শ্যামাপ্রসাদ অখণ্ড বাংলা পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রবল প্রচার শুরু করেন। তাঁর বক্তব্যে ক্রমশ একটি বিষয় কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের অধীন বাংলায় হিন্দুদের নিরাপত্তা নেই। কলকাতা, শিল্পাঞ্চল, বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম, নদিয়া ও অন্যান্য হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করাই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক লক্ষ্য। এভাবে বঙ্গভঙ্গ কেবল ভূগোলের প্রশ্ন থাকেনি, হয়ে উঠেছিল ধর্মীয় সংখ্যার ভিত্তিতে রাজনৈতিক নিরাপত্তা নির্ধারণের প্রকল্প।
অখণ্ড বাংলার প্রবক্তাদের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদ যে তীব্র আক্রমণ চালান, তার মধ্যে তাঁর আগের কয়েক বছরের রাজনৈতিক ভাষার ধারাবাহিকতা ছিল। ১৯৩৯ সাল থেকেই তিনি বাংলায় হিন্দুদের প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার কথা বলে আসছিলেন। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পর সেই ভাষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং ১৯৪৭ সালে তার চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় বঙ্গবিভাগ। এই কারণে শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবনকে ১৯৪৭ সালের একটি মাত্র সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত এক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, হিন্দু মহাসভায় তাঁর উত্থান, মুসলিম লিগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার, ফজলুল হকের সঙ্গে প্রশাসনিক সহযোগিতা, যুদ্ধকালীন রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ তাঁর বঙ্গভাগপন্থী অবস্থানের পটভূমি তৈরি করেছিল।
এখানে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে ১৯৪৮ সালের জুনের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো হবে। পরবর্তীকালে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় হয়ে ভারতে আসেন এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পাঞ্জাব ও বাংলার বিভাজন ক্রমে এই পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে ওঠে। আবুল হাশিমের বিবরণে দাবি করা হয়েছে, মাউন্টব্যাটেন শ্যামাপ্রসাদ, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং কংগ্রেসের অন্যান্য নেতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করার পরিকল্পনার পক্ষে সমর্থন সংগঠিত করেছিলেন। (৩৬. আবুল হাশিম : প্রাগুক্ত। পৃ-১২১)
এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও জটিল। বঙ্গভাগের দাবি মাউন্টব্যাটেনের আগমনের আগেই শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভার রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। আবার কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও ১৯৪৭ সালের বসন্তে এসে মনে করতে শুরু করে যে পাকিস্তান এড়ানো না গেলে পাঞ্জাব ও বাংলার অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারতেই রাখা উচিত। অর্থাৎ ব্রিটিশ কূটনীতি বিভাজনকে দ্রুত বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু বঙ্গভাগের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তার আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন, কিন্তু তিনি একমাত্র ব্যক্তি নন। বাংলার হিন্দু জমিদার, মধ্যবিত্ত পেশাজীবী, শিল্পপতি, সংবাদপত্র, কংগ্রেসের প্রাদেশিক নেতৃত্বের একাংশ এবং হিন্দু মহাসভার সংগঠনও ক্রমশ বিভাজনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
একইভাবে স্বাধীন অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনাও কেবল সোহরাওয়ার্দির ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল না। শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, কিরণশঙ্কর রায়সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু পরিকল্পনাটি শুরু থেকেই বহুমুখী বিরোধিতার মুখে পড়ে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আশঙ্কা করেছিল স্বাধীন বাংলা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রভাববলয়ে চলে যেতে পারে। হিন্দু মহাসভা এটিকে মুসলমান আধিপত্যের ছদ্মরূপ বলে প্রচার করেছিল। মুসলিম লিগের সর্বভারতীয় নেতৃত্বও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার ধারণাকে শেষ পর্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেনি। ফলে পরিকল্পনাটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এই পটভূমিতে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা বিচার করলে দেখা যায়, তাঁর রাজনীতি একদিকে সাংবিধানিক, অন্যদিকে অত্যন্ত স্পষ্ট সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বকেন্দ্রিক। তিনি বিপ্লবী পদ্ধতিতে ব্রিটিশ শাসন উৎখাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু হিন্দু স্বার্থের প্রশ্নে তিনি আইনসভা, সংবাদপত্র, মন্ত্রিত্ব, জনসভা এবং দলীয় সংগঠন সবকিছুকেই ব্যবহার করেছিলেন। ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় তাঁর যোগদান তারই উদাহরণ। মুসলিম লিগবিরোধী মুসলমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করা তাঁর কাছে মতাদর্শগত আত্মসমর্পণ ছিল না; বরং তা ছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হিন্দু মহাসভার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ।
এই কারণেই শ্যামা হক মন্ত্রিসভার ইতিহাস বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এটি একদিকে দেখায়, চল্লিশের দশকের গোড়াতেও হিন্দু ও মুসলমান নেতৃত্বের মধ্যে প্রশাসনিক সহযোগিতা সম্ভব ছিল। অন্যদিকে দেখায়, সেই সহযোগিতা সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ভাষাকে নির্মূল করতে পারেনি। বরং একই মন্ত্রিসভার ভেতর থেকেও হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম রাজনীতির পৃথক সংগঠনগুলি নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে চলেছিল। পাকিস্তানবিরোধী প্রচার, মুসলিম স্বার্থরক্ষার প্রচার, হিন্দু নিরাপত্তা, চাকরির ভাগ, শিক্ষায় প্রতিনিধিত্ব এবং নির্বাচনের অঙ্ক একই সঙ্গে চলছিল।
ফলে ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গকে শুধুমাত্র শেষ মুহূর্তের সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার ফল বলা যায় না। এর পেছনে অন্তত এক দশক ধরে রাজনৈতিক পরিচয়ের রূপান্তর কাজ করেছে। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির রাজনীতি যেখানে জমি, কৃষিঋণ ও কৃষকের অধিকারকে সামনে এনেছিল, ১৯৪৭ সালে এসে বাংলার মূল রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কোথায় এবং মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কোথায়। এই দশ বছরে শ্রেণির ভাষাকে ধর্মীয় সংখ্যার ভাষা অনেকখানি প্রতিস্থাপিত করেছিল।
এই রূপান্তরে ব্রিটিশ শাসকদের নীতি অবশ্যই ভূমিকা রেখেছে। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, সাম্প্রদায়িক আসনবণ্টন, সরকারি চাকরিতে সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে পৃথক দরকষাকষি ভারতীয় রাজনীতিকে ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু কেবল ব্রিটিশদের ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দিলে হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লিগ, কংগ্রেস এবং প্রাদেশিক নেতৃত্বের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায়ও আড়াল হয়ে যায়। হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগ উভয়েই ধর্মীয় পরিচয়কে সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তিতে রূপান্তর করেছিল। কংগ্রেসও বহু ক্ষেত্রে এই মেরুকরণ রোধে কার্যকর বিকল্প গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিল।
শ্যামাপ্রসাদ এই ইতিহাসের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র কারণ তাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলার এই রূপান্তরকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধারণ করে। তিনি কংগ্রেসের মাধ্যমে আইনসভায় প্রবেশ করেছেন, নির্দল রাজনীতিতে থেকেছেন, হিন্দু মহাসভার নেতা হয়েছেন, মুসলমান প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন, গভর্নরের সঙ্গে সংঘর্ষে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছেন, পরে বাংলাভাগের সবচেয়ে প্রবল প্রবক্তাদের একজন হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক পথকে কোনো একক বিশেষণে আবদ্ধ করা তাই কঠিন।
তবে এটুকু স্পষ্ট যে হিন্দু স্বার্থের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছিল তাঁর পরিণত রাজনীতির কেন্দ্র। ফজলুল হকের সঙ্গে জোট তাঁর এই অবস্থানকে বিলুপ্ত করেনি। বরং মুসলিম লিগকে প্রতিরোধ করার জন্য তিনি একটি মুসলমান নেতৃত্বাধীন বিকল্প জোটকে ব্যবহার করেছিলেন। সেই জোট ভেঙে যাওয়ার পরে এবং ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর তাঁর রাজনীতি আরও কঠোর হিন্দু সংহতির দিকে অগ্রসর হয়।
এই ধারাবাহিকতা থেকেই বোঝা যায় কেন স্বাধীন অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনা তাঁর কাছে এত বিপজ্জনক বলে মনে হয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের অধীনে বাংলার হিন্দু সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি বাংলার ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও অর্থনৈতিক একতার চেয়ে ধর্মীয় সংখ্যার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সীমানাকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ করে তুললেন। এই সিদ্ধান্তের পরিণতিই ছিল বঙ্গভাগের পক্ষে তাঁর সর্বাত্মক প্রচার।
অন্যদিকে অখণ্ড বাংলার সমর্থকেরা ভাষা, অর্থনীতি, ভূগোল এবং বাঙালি জাতিসত্তাকে ধর্মের ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু ইতিহাসে তার গুরুত্ব কম নয়। কারণ এটি প্রমাণ করে, ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হওয়া একমাত্র সম্ভাব্য ফল ছিল না। অন্য একটি পথও আলোচনায় ছিল। সেই পথ ব্যর্থ হয়েছে রাজনৈতিক অবিশ্বাস, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আপত্তি, হিন্দু মহাসভার বিরোধিতা এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্রিটিশ পরিকল্পনার সম্মিলিত চাপে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা নিয়ে যে কোনও আলোচনা আবেগের বদলে দলিল ও ঘটনাক্রমের ওপর দাঁড়ানো জরুরি। তাঁকে একমাত্র ‘বাংলার রক্ষাকর্তা’ বা উল্টো দিকে একমাত্র বঙ্গভঙ্গের কারিগর বলে চিহ্নিত করলে ইতিহাসের বহুস্তরীয় বাস্তবতা হারিয়ে যায়। কিন্তু এটিও অস্বীকার করা যায় না যে বঙ্গভাগের পক্ষে হিন্দু জনমত সংগঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি নিজেই এই রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য গর্ব অনুভব করতেন।
আর এখানেই শ্যামা হক মন্ত্রিসভা থেকে বঙ্গভাগ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার একটি সুস্পষ্ট রেখা দেখা যায়। ফজলুল হকের সরকারের মধ্যে থেকে তিনি হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করেন, মুসলিম লিগের বিরোধিতা করেন, কংগ্রেসের গণআন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেন, পরে প্রাদেশিক প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে পদত্যাগ করেন এবং শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের সবচেয়ে তীব্র পর্বে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ গঠনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। এই ধারাবাহিকতাকে বাদ দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিচার করলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশই অদৃশ্য হয়ে যায়।
বাংলার তৎকালীন গভর্নর ফ্রেডারিক বারোজের সঙ্গে সাক্ষাতের পর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ রূপে প্রকাশ্যে আসে। আবুল হাশিমের বিবরণ অনুযায়ী, গভর্নরের সঙ্গে আলোচনার পর এবং তাঁর দ্বারা এক অর্থে ‘প্ররোচিত’ হয়েই শ্যামাপ্রসাদ পরের দিন সাম্প্রদায়িক সংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে একটি প্রকাশ্য বিবৃতি দেন। এই ঘটনাটি নিছক একটি ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের মুহূর্ত ছিল না। বরং ১৯৪৭ সালের দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক আবহে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রবল মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, তার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল এটি। উল্লেখযোগ্য যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি আচার্য জে বি কৃপালনিও শ্যামাপ্রসাদের এই দাবির প্রতি সমর্থন জানান। ফলে বঙ্গবিভাগের দাবি শুধু হিন্দু মহাসভার একক রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; কংগ্রেসের একাংশের মধ্যেও এর পক্ষে সমর্থন গড়ে উঠছিল। (আবুল হাশিম : প্রাগুক্ত।)
এরপর ১৯৪৭ সালের ১৫ এপ্রিল তারকেশ্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। সেখানে হিন্দুদের জন্য পৃথক প্রদেশ বা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আবাসভূমি গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং সংগঠিত আন্দোলনের দায়িত্ব শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাতে অর্পণ করা হয়। এর অর্থ ছিল, বঙ্গভাগকে আর নিছক একটি সম্ভাব্য প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হচ্ছিল না; তা ক্রমে হিন্দু মহাসভার কাছে এক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছিল।
এই সম্মেলনের ঠিক এক মাস আগে, ১৫ মার্চ কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদের আহ্বানে একটি উল্লেখযোগ্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশের বহু পরিচিত নাম। রমেশচন্দ্র মজুমদার, মাখনলাল রায়চৌধুরী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, পণ্ডিত রামশঙ্কর ত্রিপাঠি প্রমুখ সেই সভায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বঙ্গবিভাগের প্রশ্নকে শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের নৈতিক ও বৌদ্ধিক সমর্থন লাভ করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা সেখানে দেখা যায়। শ্যামাপ্রসাদ সেই সভায় ঘোষণা করেছিলেন, পাকিস্তানের অধীনে বাঙালি হিন্দুরা সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বাস করতে পারবেন না। তাঁর বক্তব্যে নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক অধিকারকে একসূত্রে গেঁথে একটি পৃথক হিন্দু আবাসভূমির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও সেই দাবির প্রতি সমর্থন জানান। ফলত সভায় উপস্থিত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থনে পৃথক ‘হোমল্যান্ড’-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়।
এই ধারাটি মে মাসে আরও বিস্তৃত হয়। ৭ মে মেঘনাদ সাহা, যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বাঙালি হিন্দুদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পৃথক আবাসভূমির দাবি উত্থাপন করেন। এর ফলে বঙ্গভাগপন্থী রাজনীতি একটি নতুন মাত্রা লাভ করে। শুধু হিন্দু মহাসভার দলীয় নেতৃত্ব নয়, বিজ্ঞানের, ইতিহাসের, ভাষাবিদ্যার এবং শিক্ষাজগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশও সেই সময় পৃথক হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে এগিয়ে আসছিলেন। মে মাসেই ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের সভাপতিত্বে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের যৌথ আহ্বানে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বঙ্গবিভাগের পক্ষে মত প্রকাশ করা হয়। (https://en.wikipedia.org/wiki/Bengali_Hindu_Homeland_Movement.)
এই প্রচারের রাজনৈতিক ভাষা কী ছিল, তার এক স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় বাঁকুড়ায় অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসভার একটি জনসভায় শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্যে। সেখানে তিনি বঙ্গভাগের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে বলেন:
“বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্য গত দশ বৎসরে পাকিস্তানী শাসনের ফলে ধ্বংস হইতে চলিয়েছে। এই জন্য হিন্দুরা বঙ্গ-ভঙ্গ দাবী তুলিয়াছে। এই স্বতন্ত্র হিন্দু বাংলার সবটাই, দার্জিলিং হইতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত, পূর্ব্ব-বঙ্গের বিপন্ন হিন্দুদের একটি আশ্রয়স্থল হইবে। … স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠনের পর যেমন কতক হিন্দু পূৰ্ব্ব-বঙ্গে থাকিয়া যাইবেন, তেমনই প্রায় সেই সংখ্যার মুসলমানও পশ্চিমবঙ্গে থাইয়ে যাইবেন। এরূপ অবস্থায় পূর্ব্ব বঙ্গে হিন্দুদের উপর কোনরূপ অত্যাচার বা নির্যাতন করিবার পূর্ব্বে লিগ গবর্ণমেন্টকে যথেষ্ট চিন্তা করিয়া কাজ করিতে হইবে।” (বদরুদ্দিন উমর : বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। চিরায়ত প্রকাশন। কলকাতা। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-৩৭)
এই বক্তব্য গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। কারণ এখানে বঙ্গভাগকে কেবল একটি ভূখণ্ডগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বরং একটি প্রতিরোধমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পূর্ববঙ্গে থেকে যাওয়া হিন্দুদের বিরুদ্ধে নির্যাতন হলে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী মুসলমানদের উপস্থিতিই নাকি এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করবে, এমন ধারণা এখানে স্পষ্ট। এই যুক্তির মধ্যে পারস্পরিক ভীতির রাজনীতি কাজ করছে। এক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা অন্য সম্প্রদায়ের উপস্থিতিকে এক ধরনের প্রতিরোধমূলক অস্ত্র হিসেবে দেখছে। ফলে একটি অভিন্ন বাঙালি রাজনৈতিক সত্তার প্রশ্ন ক্রমশই ধর্মীয় পরিচয়ের নিচে চাপা পড়ছিল।
হিন্দু মহাসভার এই প্রচারের বিরুদ্ধে সমসময়ের মুসলিম সংবাদমাধ্যমের একাংশ অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকায় হিন্দু মহাসভার জন্মলগ্ন থেকেই মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষকে তার আদর্শিক বৈশিষ্ট্য বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। সেখানে লেখা হয়েছিল:
“হিন্দু মহাসভা ভূমিষ্ট হইয়াই আঁতুড় ঘরে আওয়াজ তুলিয়াছিল, ‘হে আৰ্য্যসন্তান প্রস্তুত হও, কাঁধ হইতে নামাবলী নামাইয়া ইহাদের পাগলামি শোধরাইবার নহে। সুতরাং হিন্দু মহাসভার উক্তিকে বাতুলে প্রলাপ-উক্তি বলিয়া উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।” (৪০. মিল্লাত, এপ্রিল ১১, ১৯৪৭)
এর পরবর্তী অংশে আরও তীব্র ভাষায় বলা হয়:
“শক্ত করিয়া কোমরে বাঁধো- হানো আঘাত মুসলমানকে, আরব সাগরের তীরে দাও তাহাদের তাড়াইয়া।’ আজও তাহাদের কণ্ঠে সেই আওয়াজই শুনিতেছি। হিন্দু মহাসভা জন্ম-বাতুল।”
এই ভাষা অবশ্যই তীব্র এবং রাজনৈতিকভাবে আক্রমণাত্মক। তবে এর মধ্য দিয়ে সেই সময়কার পারস্পরিক অবিশ্বাসের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হিন্দু মহাসভার প্রচার যেখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের আশঙ্কাকে সামনে আনছিল, সেখানে মুসলিম সংবাদমাধ্যমের একাংশ হিন্দু মহাসভাকে সরাসরি মুসলিমবিরোধী আক্রমণাত্মক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছিল। অর্থাৎ দুই পক্ষের ভাষাই ক্রমশ সংঘাতমুখী হয়ে উঠছিল।
একই পত্রিকায় আরও লেখা হয়েছিল:
“পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বাকসর্বস্ব নেতা হিটলার বিশ্বাস করিতেন যে, একটা বড় মিথ্যা কথাকেও যদি পুনঃ পুনঃ বলা যায়, তাহা হইলে সেটা সত্য হইয়া দাঁড়ায়। আমার সমালোচকগণ ফ্যাসিস্টবাদে বিশ্বাস করিয়া ভুল করিতেছেন। কেননা, এ প্রকার কৌশলের যে শোচনীয় পরিণাম হইতে পারে তাঁহার দৃষ্টান্ত… ইতিহাসে আছে।” (৪১. মিল্লাত, মে ২৩, ১৯৪৭)
এই মন্তব্যে হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক কৌশলকে ফ্যাসিবাদী প্রচারপদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা হয়। রাজনৈতিক মতভেদের ভাষা এখানে কতখানি চরমে উঠেছিল, এই উদ্ধৃতি তার সাক্ষ্য দেয়। প্রতিপক্ষকে শুধু ভুল রাজনৈতিক মতের ধারক হিসেবে নয়, ইতিহাসের এক ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক মতবাদের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা সেই সময়কার প্রচারে স্পষ্ট ছিল। এতে বোঝা যায়, ১৯৪৭ সালের বাংলায় বঙ্গভাগের বিতর্ক নিছক সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক বিতর্ক ছিল না; তা ছিল রাজনৈতিক অস্তিত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্প্রদায়গত ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ।
শ্যামাপ্রসাদের বঙ্গবিভাগপন্থী অবস্থানের বিপরীতে আবুল হাশিম স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলার অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর যুক্তির ভিত্তি ছিল বাঙালি সমাজের অভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্ব। ভারত বিভাজনের সঙ্গে বাংলা বিভাজনকে তিনি এক বিষয় বলে মনে করতেন না। তাঁর মতে, ভারতবর্ষের সামগ্রিক রাজনৈতিক বিভাজনের প্রশ্ন এবং বাংলার অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভেঙে দেওয়ার প্রশ্ন এক নয়। বাংলার হিন্দু এবং মুসলমান দীর্ঘকাল ধরে একই ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও ভাষাগত অঞ্চলে বাস করেছে। ধর্মীয় পরিচয় তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও রাষ্ট্রিক কাঠামো নির্মাণের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।
আবুল হাশিম যুক্তি দিয়েছিলেন যে স্বাধীন বাংলায় মুসলমানরা তাঁদের ধর্মীয় জীবনে শরিয়ত মেনে চলবেন, হিন্দুরা তাঁদের নিজস্ব ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী আচার পালন করবেন। কিন্তু এই ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রাষ্ট্রিক বিভাজনের কারণ হতে পারে না। তাঁর মতে, শুধু ধর্ম পালনের জন্য মুসলমানের পাকিস্তান কিংবা হিন্দুর পৃথক আবাসভূমির প্রয়োজনীয়তার যুক্তি রাজনৈতিকভাবে অমূলক। সংখ্যার বিচারে বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের পরিমাণ কাছাকাছি হওয়ায় এক সম্প্রদায় অন্যটির ওপর স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে, এমন আশঙ্কাও তিনি মানতে চাননি।
তাঁর অর্থনৈতিক যুক্তিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, বঙ্গবিভাগের পক্ষে যতই স্বর্গীয় ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক, বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠী এতে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে না। বরং শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি এবং পুঁজির কাঠামোয় নতুন নির্ভরতার সৃষ্টি হবে। তাঁর ভাষায় বিভাজিত বাংলার হিন্দুরা শেষ পর্যন্ত ‘বিদেশি পুঁজিপতিদের’ অধীন ‘দিন মজুরের’ অবস্থায় নেমে যেতে পারেন। (৪২. বদরুদ্দিন উমর : বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। প্রাগুক্ত। পৃ-৪৯-৫০)
বঙ্গবিভাজনের বিরুদ্ধে তাঁর আবেদন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসের শেষদিকে। তিনি তখন চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার স্মরণ করিয়ে হিন্দু মুসলমান সমতার ভিত্তিতে বাংলার ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল:
“মিঃ সি আর দাশ আজ জীবিত নাই। তাঁহার আত্মা আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করুক। বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সুবিধাসমূহ সমভাবে ভোগ করিবার জন্য বাংলার হিন্দু-মুসলমান মিঃ সি আর দাশের ৫০:৫০ নীতি গ্রহণ করুন। আমি পুনরায় বাংলার যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি, তাহারা যেন বাংলার ঐতিহ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের খাতিরে একতাবদ্ধ হইয়া বিরুদ্ধবাদী মনোভাব ত্যাগ করিয়া বাংলাকে আসন্ন বিপদ হইতে উদ্ধার করেন।” (৪৩. বদরুদ্দিন উমর : বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। প্রাগুক্ত। পৃ-৫৩)
এই আহ্বানের তাৎপর্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আবুল হাশিম বঙ্গবিভাগকে ‘আসন্ন বিপদ’ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর কাছে বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল ধর্মীয় বিচ্ছেদ নয়, বরং যৌথ ক্ষমতার কাঠামো সৃষ্টি। চিত্তরঞ্জন দাশের পঞ্চাশ পঞ্চাশ নীতির উল্লেখ করে তিনি এমন একটি সমঝোতার কথা বলছিলেন যেখানে দুই প্রধান সম্প্রদায়ই রাষ্ট্রক্ষমতা, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং প্রশাসনিক অংশগ্রহণে সমান মর্যাদা পাবে। তাঁর দৃষ্টিতে যুবসমাজের কর্তব্য ছিল সাম্প্রদায়িক বিরোধের ভাষা ছেড়ে বাংলার ঐক্যের পক্ষে দাঁড়ানো।
এখানেই শ্যামাপ্রসাদ ও আবুল হাশিমের রাজনীতির মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়। আবুল হাশিম যেখানে বাঙালিত্ব, ভাষা, অর্থনীতি এবং যৌথ রাজনৈতিক অংশীদারিত্বকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের কল্পনা করছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ সেখানে হিন্দু নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মর্যাদা এবং মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার আশঙ্কাকে প্রধান প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনছিলেন। এক পক্ষের কাছে বিভাজন ছিল বিপদ, অন্য পক্ষের কাছে বিভাজনই ছিল নিরাপত্তার উপায়।
শ্যামাপ্রসাদ বঙ্গবিভাজনের বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতেন বলেও সমসাময়িক সূত্রে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বাংলায় হিন্দুদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে এমনও বলেছিলেন যে ‘বাংলায় হিন্দুরা নরকে বাস করিতেছে’। এই ধরনের ভাষা রাজনৈতিক প্রচারে তীব্র আবেগ সৃষ্টি করেছিল। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনকে ‘নরক’ এবং পৃথক হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গকে মুক্তির পথ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও অনিবার্য বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে পরবর্তীকালে শ্যামাপ্রসাদকে ‘বিপন্ন হিন্দুর রক্ষাকর্তা’ হিসেবে যে চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার আদর্শিক উৎস এই সময়কার ভাষণগুলির মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়।
কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের এই অবস্থান সমগ্র বাঙালি হিন্দু সমাজের অভিন্ন মত ছিল না। কংগ্রেসের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অসাম্প্রদায়িক ও অখণ্ডতাপন্থী নেতা বঙ্গবিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন এই ধারার অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর সঙ্গে সত্যরঞ্জন বকসি, কিরণশঙ্কর রায়, অখিলচন্দ্র দত্ত, দেবেন দে প্রমুখও বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। এঁদের রাজনৈতিক অবস্থান দেখায় যে বঙ্গবিভাগকে শুধুমাত্র হিন্দু বনাম মুসলমানের সরল রেখায় বোঝা যায় না। হিন্দু সমাজের মধ্যেও এ নিয়ে গভীর মতবিরোধ ছিল।
বিশেষ করে অখিলচন্দ্র দত্তের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি গান্ধিজিকে লেখা এক চিঠিতে পৃথক হিন্দু আবাসভূমির দাবিকে ‘পরাজিতের মনোভাবের উগ্র প্রকাশ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অসহায়তা ও ভীতির বশে একটি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করা ভবিষ্যতে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি বহুধর্মীয় সমাজের সমস্যার সমাধান সীমারেখা টেনে মানুষকে আলাদা করে দেওয়া নয়; বরং এমন রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করা দরকার যেখানে সকল সম্প্রদায় নিরাপত্তা ও মর্যাদা পায়।
১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরসংক্রান্ত ঘোষণার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। হিন্দু মহাসভা শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে সরাসরি বাংলাভাগের দাবিতে সংগঠিত প্রচার শুরু করে। সমসময়ের কিছু হিন্দু সংবাদপত্রও এই দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তার প্রশ্ন দ্রুত জনমতের কেন্দ্রে চলে আসে। অখিলচন্দ্র দত্ত এই প্রচারের বিরোধিতা করে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে টেলিগ্রাম পাঠান। তিনি সতর্ক করে বলেন যে বাংলা ভাগ করা হলে তার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য অত্যন্ত ভারী হবে এবং এটি মূলত ভয় ও পরাজয়ের মনোবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর অভিযোগ, বঙ্গবিভাগের দাবি বাংলার সমস্ত হিন্দুর স্বার্থের প্রতিফলন নয়; বরং কিছু ধনী ও সম্পন্ন হিন্দুর আর্থিক ও সামাজিক স্বার্থ এতে বিশেষভাবে কাজ করছে। এই অভিযোগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ কলকাতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, পেশাজীবী ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দুসমাজের একটি অংশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিল। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং পশ্চিম বাংলার শিল্পাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছিল।
অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদ প্যাটেলকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তান সৃষ্টি হোক বা না হোক, তাঁরা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার দাবিতে অনড়। এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, বঙ্গভাগের দাবি শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির প্রতিক্রিয়া ছিল না। বরং শ্যামাপ্রসাদের দৃষ্টিতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অখণ্ড বাংলা নিজেই হিন্দু স্বার্থের জন্য অনিরাপদ। পাকিস্তান প্রশ্ন নিষ্পত্তি হলেও তিনি পৃথক হিন্দুপ্রধান প্রদেশ গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখছিলেন।
এই একই মানসিকতা এন সি চ্যাটার্জির বক্তব্যেও প্রকাশিত হয়। প্রাদেশিক হিন্দু সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলা বিভাজনের প্রশ্ন ‘হিন্দুদের কাছে’ জীবন মরণের প্রশ্ন। (Shila Sen : Ibid. p-225-227) এই ভাষা রাজনৈতিক আপসের সম্ভাবনাকে কার্যত সংকুচিত করে দেয়। যখন একটি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎকে জীবন মরণের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন মধ্যপন্থী সমঝোতা বা বহুপাক্ষিক ক্ষমতা ভাগাভাগির পথ দুর্বল হয়ে পড়ে।
বঙ্গবিভাগপন্থী রাজনীতির এই প্রসারের পেছনে ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার স্মৃতি গভীরভাবে কাজ করেছিল। কলকাতার মহাদাঙ্গা, নোয়াখালির হিন্দু নির্যাতন, বিহারে মুসলমান হত্যাকাণ্ড এবং উপমহাদেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস সাধারণ মানুষের মানসিকতাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। বহু হিন্দু মনে করেছিলেন, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলায় তাঁদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়। আবার বহু মুসলমানের কাছে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের বঙ্গভাগপন্থী অংশকে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার শক্তি বলে মনে হচ্ছিল। এই পরস্পরবিরোধী ভয় ক্রমশই একে অপরকে খাদ্য জোগায়।
সেই কারণে শ্যামাপ্রসাদের বঙ্গভাগের প্রচার কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল ছিল, এমন সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। এর পেছনে বাস্তব দাঙ্গা, জনসাধারণের নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন, প্রশাসনিক ক্ষমতা, কলকাতার অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং ভারত বিভাজনের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা কাজ করছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে হিন্দু মহাসভা এই ভীতিকে একটি নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রকল্পে রূপ দিয়েছিল এবং শ্যামাপ্রসাদ সেই প্রকল্পের প্রধান মুখ ছিলেন।
অখণ্ড বাংলা পরিকল্পনার সমর্থকেরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটির সমাধান খুঁজেছিলেন। শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, সোহরাওয়ার্দি ও কিরণশঙ্কর রায়ের মতো নেতাদের মধ্যে মতের পার্থক্য ছিল, কিন্তু তাঁরা অন্তত একটি বিষয়ে একমত ছিলেন যে বাংলার ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক একতা রক্ষা করা সম্ভব হলে তা ধর্মীয় বিভাজনের চেয়ে উত্তম। তাঁদের কাছে কলকাতা ও পূর্ববঙ্গ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। পূর্ববঙ্গের কৃষি ও পাট উৎপাদন, কলকাতা ও হুগলির শিল্প, বন্দর ও আর্থিক কাঠামো এক অভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের অংশ।
এই যুক্তি বাস্তবে পরবর্তী ইতিহাসেও গুরুত্ব পেয়েছে। বঙ্গভাগের পর পূর্ববাংলা তার প্রধান শিল্পনগরী ও বন্দর কলকাতার সঙ্গে এক অর্থনৈতিক বিচ্ছেদে পড়ে, আর পশ্চিমবঙ্গ পাটশিল্পের মূল কাঁচামালের বৃহৎ অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। আবার উদ্বাস্তু প্রবাহ, সম্পত্তি ত্যাগ, জনসংখ্যা স্থানান্তর, কর্মসংস্থানের সংকট এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস উভয় বাংলাকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে ১৯৪৭ সালে অখণ্ডতাপন্থীদের অর্থনৈতিক আশঙ্কা পুরোপুরি ভিত্তিহীন ছিল না।
কিন্তু একইভাবে বঙ্গভাগপন্থীদের নিরাপত্তা উদ্বেগও কাল্পনিক ছিল না। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। ইতিহাসের বিশ্লেষণে তাই একটি পক্ষকে সম্পূর্ণ যুক্তিহীন এবং অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ নির্দোষ হিসেবে দেখলে বাস্তবতা অধরা থেকে যায়। বরং দেখতে হয়, কীভাবে বাস্তব ভয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলির হাতে সম্প্রদায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার উপাদানে পরিণত হয়েছিল।
এই জায়গায় শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল মানবিক সমস্যারূপে দেখেননি; তাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভূগোলের দাবিতে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে হিন্দু সমাজের আত্মরক্ষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষা ও রাজনৈতিক মর্যাদা একই সঙ্গে যুক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের যুক্তি নির্মাণ করেছিল। তাঁর সমর্থকদের কাছে এ ছিল আত্মরক্ষার রাজনীতি; সমালোচকদের কাছে এ ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে স্থায়ী করার প্রকল্প।
১৯৪৭ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যবর্তী সময়ে এই দ্বন্দ্বই বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মুখ্য হয়ে ওঠে। একদিকে পৃথক হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গের দাবি, অন্যদিকে স্বাধীন অখণ্ড বাংলা। দুই প্রকল্পের মধ্যে কোনও স্থায়ী সমঝোতা সম্ভব হয়নি। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব, হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লিগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের নিজস্ব হিসাব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবিভাগের পথই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। বঙ্গভাগ ১৯৪৭ সালের জুন মাসে হঠাৎ গৃহীত কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না। তার পেছনে বহু বছরের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, নির্বাচনী রাজনীতি, ভয়ের স্মৃতি, ক্ষমতার প্রশ্ন, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রচার কাজ করেছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, অখিলচন্দ্র দত্ত এবং আরও অনেকে, যাঁরা বিশ্বাস করতেন যে বাংলার ঐতিহাসিক ঐক্য রক্ষা করা সম্ভব।
ফলে ১৯৪৭ সালের বাংলা শুধু বিভাজনের ইতিহাস নয়, বিকল্প সম্ভাবনার ইতিহাসও। একদিকে ধর্মীয় সংখ্যার ভিত্তিতে রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রকল্প, অন্যদিকে যৌথ বাঙালি নাগরিকতার ধারণা। একদিকে পৃথক হিন্দু আবাসভূমির দাবি, অন্যদিকে পঞ্চাশ পঞ্চাশ ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব। শেষ পর্যন্ত প্রথম পথটি কার্যকর হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় পথটি কখনও ছিল না এমন ভাবলে ইতিহাসের প্রকৃত জটিলতা বোঝা যায় না।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিচার করতেও এই জটিলতা মনে রাখা জরুরি। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখেন, সমালোচকেরা তাঁকে সাম্প্রদায়িক বঙ্গবিভাগের প্রধান সংগঠকদের একজন বলে চিহ্নিত করেন। ইতিহাসের দায়িত্ব এই দুই বিপরীত স্মৃতির মধ্য দিয়ে দলিল, বক্তব্য, রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং সমকালীন প্রতিক্রিয়াকে বিচার করা। আর সেই বিচার যত গভীর হয়, ততই স্পষ্ট হয় যে বঙ্গবিভাগ ছিল কেবল একটি রেখা টানার সিদ্ধান্ত নয়; তা ছিল বাঙালি সমাজের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার এক যুগান্তকারী এবং বেদনাদায়ক পরিণতি।
বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে ১৯৪৭ সালের প্রথমার্ধে যে প্রবল রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অবিভক্ত বাংলাকে কোনওভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা যায় কি না, সেই প্রশ্ন। শেষপর্যন্ত বঙ্গবিভাগ বাস্তবায়িত হওয়ায় পরবর্তী ইতিহাসে অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বাংলাভাগ যেন একমাত্র সম্ভাব্য পরিণতিই ছিল। কিন্তু সমকালীন ঘটনাবলি, চিঠিপত্র, রাজনৈতিক প্রস্তাব ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাস্তবতা এত সরল ছিল না। বাংলাকে বিভক্ত না করে একটি বিকল্প রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলার চেষ্টা তখনও চলছিল। বাংলার তৎকালীন গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বারোজও সেই সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলেন। বাংলাকে অখণ্ড রাখার লক্ষ্যে তিনি কিরণশঙ্কর রায়কে সুরাবর্দির সঙ্গে একটি ‘যৌথ মন্ত্রীসভা’ গঠনের উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছিলেন। অর্থাৎ প্রশাসনিক স্তরেও এমন একটি ধারণা ছিল যে হিন্দু ও মুসলমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বাংলার ঐক্য রক্ষা করা অসম্ভব নয়। কিন্তু এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দু মহাসভা। (৪৫. অমলেশ ত্রিপাঠী : প্রাগুক্ত। পৃ-৪৬৬)
এই পর্যায়ে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক অবস্থান বহু ক্ষেত্রে কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্য নানা প্রশ্নে দুই সংগঠনের মধ্যে মতান্তর থাকলেও বঙ্গবিভাগের প্রশ্নে তাদের প্রভাবশালী অংশের অবস্থান একে অপরকে শক্তিশালী করেছিল। শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য ছিল আরও স্পষ্ট। তাঁর মতে বাংলায় সাম্প্রদায়িক সমস্যার স্থায়ী নিরসনের একমাত্র কার্যকর উপায় হচ্ছে প্রদেশটির বিভাজন। এই যুক্তির মধ্যে একটি মৌলিক রাজনৈতিক অনুমান কাজ করছিল। তা হল, হিন্দু ও মুসলমানের রাজনৈতিক সহাবস্থান আর কার্যকরভাবে সম্ভব নয় এবং সেই কারণে প্রশাসনিক সীমানাকেও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুকূলে পুনর্গঠন করতে হবে। শরৎচন্দ্র বসু এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে বাংলার অখণ্ডতা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার সংখ্যাগুরু হিন্দু নেতৃত্ব তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। (৪৬. অমলেশ ত্রিপাঠী : প্রাগুক্ত।) ফলে বাংলার সামনে যে বিকল্প পথটি কিছুদিনের জন্য খুলে গিয়েছিল, তা দ্রুত সংকুচিত হতে থাকে।
বঙ্গবিভাগের দাবি যত সংগঠিত হতে থাকে, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের অবস্থানও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বাংলাভাগের সম্ভাবনাকে নিছক অনিবার্য বিপর্যয় বলে দেখেননি; বরং তাঁর চিঠিপত্রে এক ধরনের স্বস্তি ও দৃঢ় সমর্থনের পরিচয় পাওয়া যায়। অখণ্ড বাংলার পক্ষে সক্রিয় সুরাবর্দির রাজনৈতিক উদ্বেগকে তিনি সহানুভূতির চোখে দেখেননি। বরং তাঁর ভাষায় সুরাবর্দি দিন দিন ‘বিমর্ষ’ হয়ে পড়ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে লেখা এক চিঠিতে প্যাটেল মন্তব্য করেছিলেন:
“বাংলা বিভাজনের দাবির বিরোধিতা করতে গিয়ে ব্যর্থ সুরাবর্দির কান্নার ফাঁদে পা দিতে চলেছেন কিরণশঙ্কর রায় এবং শরৎচন্দ্র বসুও। বাংলার হিন্দুদের বাঁচাবার একমাত্র বিকল্পহীন পথ হচ্ছে বাংলা বিভাজন, এর বাইরে অন্য কথা কেউ আর শুনতে রাজি নয়।” (Sardar Patel’s Correspondences, 1945-1950, Navjiban Publishing House. Ahmedabad, Volume 4. 1972 edn. p-39)
প্যাটেলের এই বক্তব্য সেই সময়কার কংগ্রেস নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক অবস্থাকে সামনে আনে। বঙ্গবিভাগকে তখন কেবল রাজনৈতিক দরকষাকষির একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে নয়, বরং হিন্দু নিরাপত্তার অনিবার্য শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল। কিন্তু এই দাবিকে সমগ্র বাংলার হিন্দুসমাজের অভিন্ন মত বলে গ্রহণ করা কতখানি সঙ্গত, তা নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল। শরৎচন্দ্র বসু, অখিলচন্দ্র দত্ত, কিরণশঙ্কর রায় এবং আরও অনেকে স্পষ্টভাবেই বলছিলেন যে বিভাজনপন্থী প্রচার যত প্রবলই হোক, বাংলার সমস্ত হিন্দু এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমর্থক নন।
অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও বাংলা বিভাজনের বিরোধীদের প্রতি খুব সহনশীল ছিলেন না। বিশেষত শরৎচন্দ্র বসু ও সুরাবর্দির মধ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টাকে তিনি সন্দেহ ও বিরক্তির চোখে দেখতেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, সুরাবর্দির সঙ্গে আপসের পথ খুঁজতে গিয়ে শরৎচন্দ্র বাংলার হিন্দু স্বার্থের ক্ষতি করছেন। তবে এই ‘ক্ষতি’ বলতে তিনি ঠিক কী বোঝাচ্ছিলেন, সে বিষয়ে সবসময় স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এই প্রেক্ষাপটে বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ মে শ্যামাপ্রসাদকে লেখা প্যাটেলের চিঠিতে তিনি তাঁকে আশ্বস্ত করে জানান যে চিন্তার কোনও কারণ নেই এবং তিনি সম্পূর্ণভাবেই ‘আমাদের’ ওপর আস্থা রাখতে পারেন। (৮. Ibid. p-41) এই ‘আমাদের’ শব্দটির রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করা কঠিন। বঙ্গবিভাগের লক্ষ্যে কংগ্রেসের প্রভাবশালী অংশ এবং হিন্দু মহাসভার মধ্যে অন্তত এই একটি প্রশ্নে বোঝাপড়া কতখানি দৃঢ় ছিল, এই চিঠি তার একটি উল্লেখযোগ্য দলিল।
এই অবস্থার প্রতিবাদে শরৎচন্দ্র বসু ১৯৪৭ সালের ২৭ মে সর্দার প্যাটেলকে চিঠি লিখে জানান যে হিন্দু সমাজের নাম করে বঙ্গবিভাগের পক্ষে যে দাবি করা হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে সমগ্র হিন্দু জনমতের প্রতিফলন নয়। তাঁর বক্তব্য ছিল:
“হিন্দু মাত্রেই এই বিভাজনের পক্ষে নন। বরং পুব বাংলার অধিকাংশ হিন্দুই এই বাংলা বিভাজনের বিরোধী। পশ্চিমবাংলায় হিন্দুদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এই বাংলা বিভাজনের পক্ষে সামিল হয়েছে কেবলমাত্র কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার প্ররোচনার জন্যেই।” (Sardar Patel’s Correspondences, 1945-1950, Ibid. p-45-46)
শরৎচন্দ্রের বক্তব্যের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। প্রথমত, তিনি বঙ্গবিভাগপন্থী প্রচারের সঙ্গে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের অবস্থানকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কারণ বিভাজনের পরে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হতো পূর্ববঙ্গে থেকে যাওয়া হিন্দু জনগোষ্ঠীকেই। পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির দাবি যে পূর্ববঙ্গের সমস্ত হিন্দুর কাছে মুক্তির সমার্থক ছিল না, শরৎচন্দ্র সেই বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
এই বিরোধিতা আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ পায় ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন গান্ধিজিকে লেখা তাঁর চিঠিতে। শরৎচন্দ্র তখন দেখছিলেন কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্রুত দেশভাগ মেনে নেওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বঙ্গবিভাগের প্রশ্নেও একই যুক্তি কার্যকর হচ্ছে। তিনি লিখেছিলেন:
“…জহরলাল নেহরু বল্লভভাই প্যাটেল উভয়ই হিন্দু এবং তফশিলি নেতৃবর্গের মধ্যে বিভাজনের কৌশল অনুশীলন করতে চাইছে। আমি স্পষ্টতই এর সঙ্গে সহমত পোষণ করছি না।… আমি আমার অবস্থানে অটল রয়েছি এবং আমি আমার মতো করে ঐক্যবদ্ধ বাংলার জন্যে শেষপর্যন্ত লড়াই করে যাবো।… আমি নিশ্চিত যদি গণভোট নেওয়া হয় তবে দেখা যাবে বাংলার হিন্দুদের মত বাংলা বিভাজনের বিরুদ্ধেই যাবে।” (৫০. The Nation, January 30, 1949)
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় শরৎচন্দ্র শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অখণ্ড বাংলার সম্ভাবনা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংগঠিত রাজনৈতিক প্রচার এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বাইরে সরাসরি জনমত যাচাই করা হলে ফল ভিন্ন হতে পারে। তাঁর সেই বিশ্বাস সঠিক ছিল কি না, তা ইতিহাসের একটি পৃথক আলোচনার বিষয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, বঙ্গভাগ কোনও সর্বসম্মত বাঙালি সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী এবং যুক্তিসম্পন্ন বিরোধিতা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় রাজনীতির শক্তির সামনে পরাস্ত হয়।
এই ১৪ জুনই নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে ভারত বিভাজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উল্লিখিত সূত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবের পক্ষে ২৯টি এবং বিপক্ষে ১৫টি ভোট পড়েছিল। দেশভাগের ইতিহাসে গান্ধির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই বিতর্ক আছে। একসময় তিনি দৃঢ় ভাষায় ভারত বিভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে তিনি কংগ্রেসকে বিভাজন প্রস্তাব মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। এই পরিবর্তন তাঁর সমালোচকদের কাছে রাজনৈতিক অসঙ্গতি এবং সমর্থকদের কাছে অনিবার্য বাস্তবতার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গ্রন্থে বলা হয়েছে যে যিনি একসময় জীবিতাবস্থায় দেশভাগ হতে দেবেন না বলেছিলেন, তিনিই শেষপর্যন্ত দেশবিভাজনের প্রস্তাব অনুমোদনের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। (৫১. সি এম ইদরিস : সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত বিভাগের নেপথ্য কাহিনী। সাহিত্যিকা। ঢাকা। বাংলাদেশ। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-৫৮-৫৯)
আরও উল্লেখ করা হয় যে ১৯৪৭ সালের ২ জুন গান্ধি মাউন্টব্যাটেনকে পাকিস্তান পরিকল্পনার প্রতি তাঁর অসম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। অথচ পরদিন, ৩ জুন, তিনি কংগ্রেস কার্যনির্বাহী কমিটির সামনে দেশভাগ মেনে নেওয়ার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। এর এগারো দিনের মাথায় নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনেও তিনি বিভাজন পরিকল্পনা অনুমোদনের আহ্বান জানান। (৫২. সুনীতি কুমার ঘোষ : বাংলা বিভাজনের অর্থনীতি-রাজনীতি। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ। ঢাকা। বাংলাদেশ। ২০১২ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-২৪১)
গান্ধির এই অবস্থান পরিবর্তন বিচার করতে গেলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মুসলিম লিগের পাকিস্তান দাবির দৃঢ়তা, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধৈর্যতা, ব্রিটিশ সরকারের দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সবই এই পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করেছিল। তাঁর সমালোচকেরা এটিকে আপস ও রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখেছেন; অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা যুক্তি দিয়েছেন যে তিনি রক্তক্ষয়ের আরও বিস্তার রোধ করতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটি বেদনাদায়ক সমাধান মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবিভাগের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে শেষপর্যন্ত গান্ধির নৈতিক কর্তৃত্বও দেশভাগ প্রতিরোধের বদলে কংগ্রেসকে তা গ্রহণের পথে নিয়ে যেতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
এই কারণে শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যতই তীব্র ভাষায় রাজনৈতিক বৈরিতা প্রকাশ করে থাকুন, বাংলাভাগের ক্ষেত্রে তাঁর কর্মসূচি কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতৃত্বের সহযোগিতা ছাড়া এত দ্রুত সাফল্য পেত কি না, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। বাংলার কংগ্রেসের একাংশ এবং হিন্দু মহাসভার মধ্যে বহু বিষয়ে তীব্র মতান্তর থাকলেও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রশ্নে তাদের রাজনৈতিক দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল। এই সম্পর্কের পূর্বসূত্রও ছিল। ১৯৪৫ সালের শেষদিকে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রার্থী না দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বল্লভভাই প্যাটেল উদ্যোগী হয়েছিলেন বলে উল্লিখিত সূত্রে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত হিন্দু মহাসভার সঙ্গে কংগ্রেসের আসন সমঝোতা সফল না হওয়ায় দুটি দলই পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয় এবং শ্যামাপ্রসাদসহ হিন্দু মহাসভার একাধিক প্রার্থী পরাজিত হন। (সুনীতি কুমার ঘোষ : প্রাগুক্ত। পৃ-২৬৪)
১৯৪৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনাটিও এই ধারায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন শ্যামাপ্রসাদ বাংলার গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বারোজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরের দিন তিনি সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে জানান, ভারত যদি সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত হয়, তবে বাংলাকেও একইভাবে ভাগ করতে হবে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে গঠিত নতুন প্রদেশকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। (Amrita Bazar Patrika, February 24, 1947)
এই বিবৃতির তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। কারণ এখান থেকেই বঙ্গবিভাগের দাবি দ্রুত একটি সংগঠিত রাজনৈতিক প্রচারের রূপ নিতে শুরু করে। এবং আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, কংগ্রেস সভাপতি আচার্য জে বি কৃপালনি শ্যামাপ্রসাদের এই বক্তব্য সমর্থন করেছিলেন। ফলে বাংলাভাগ আর হিন্দু মহাসভার একার দাবি থাকল না; সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের একটি অংশও কার্যত এর বৈধতা স্বীকার করল।
অথচ ঠিক এই সময় বাংলার অপর প্রান্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক আলাপ চলছিল। গবেষকদের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের প্রথমদিকে মুসলিম লিগের প্রাদেশিক সম্পাদক আবুল হাশিম এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের শরৎচন্দ্র বসু বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। সেখানে স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলার সম্ভাবনাও আলোচিত হয়। সুরাবর্দি সরাসরি সেই আলোচনায় উপস্থিত না থাকলেও আবুল হাশিম তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হওয়ায় ধরে নেওয়া হয় যে আলোচনার কথা তাঁর অজানা ছিল না। কিন্তু এই স্বাধীন বাংলা পরিকল্পনা মুসলিম লিগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও অস্বস্তিকর ছিল। ‘আজাদ’ পত্রিকা আবুল হাশিমকে তাঁর অবস্থান নিয়ে সতর্ক করেছিল। একইভাবে শরৎচন্দ্র বসুও কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। ফলে এক আশ্চর্য পরিস্থিতির জন্ম হয়। একদিকে কংগ্রেসের প্যাটেল এবং হিন্দু মহাসভা বাংলাভাগ চাইছিল, অন্যদিকে জিন্না ও লিয়াকত আলিও শেষপর্যন্ত বাংলা বিভক্তির ব্যাপারে আপত্তি করেননি। ফলে অখণ্ড বাংলার পক্ষে দাঁড়ানো সুরাবর্দি, আবুল হাশিম ও শরৎচন্দ্র বসু ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। (মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক : প্রাগুক্ত। পৃ-২১৮)
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৪৭ সালের জুনে ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোয়। বিভাজনের বিরোধীদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভারত ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়, ভারত ও পাকিস্তান। একই সঙ্গে বাংলা এবং পাঞ্জাবও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত হয়। বাংলার পূর্বাংশ পূর্ববঙ্গ নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পশ্চিমাংশ পশ্চিমবঙ্গ নামে ভারতের অংশ হয়। পাঞ্জাবও অনুরূপভাবে ভাগ হয়ে যায়।
জনসংখ্যার পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় কেন বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভাজন এত জটিল এবং রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল। এই দুই প্রদেশে ধর্মীয় জনবিন্যাস কোনও পরিষ্কার ভৌগোলিক রেখা অনুসরণ করত না। পাঞ্জাবে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ মুসলমানের বিপরীতে হিন্দু ও শিখদের সম্মিলিত সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ। অন্যদিকে বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ, আর হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৭০ লক্ষ। (৫৬. Leonard Mosley: The Last Days of the British Raj. Jaico Publishing House. Bombay. 1960 edn. p-219)
এই সংখ্যাগুলি শুধু পরিসংখ্যান নয়। এগুলির ভেতরেই বিভাজনের গভীর মানবিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস লুকিয়ে ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাসকারী মানুষের গ্রাম, শহর, জমি, বাজার, উপাসনালয়, পেশা ও পারিবারিক স্মৃতি কোনও সরল সীমারেখায় আলাদা করা সম্ভব ছিল না। অথচ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সেই কাজটিই করতে চেয়েছিল। ফলত সীমান্ত আঁকার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিচয় রাতারাতি বদলে যায়। যে মানুষটি গতকাল নিজের জন্মভূমিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা স্বাভাবিক নাগরিক ছিল, সে পরদিন একটি নতুন রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু হয়ে দাঁড়াল।
দেশভাগের অব্যবহিত পরেই শুরু হয় ইতিহাসের বৃহত্তম জনস্থানান্তরগুলির একটি। উল্লিখিত সূত্র অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের আগস্টে প্রায় এক কোটি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন এবং তাঁদের মধ্যে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ জীবিত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। (মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক : প্রাগুক্ত। পৃ-২৪২) নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে, কিন্তু সংখ্যাটি যতই হোক, মানবিক বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। পাঞ্জাবের পথে শরণার্থীবাহী ট্রেন মৃতদেহে পূর্ণ হয়ে পৌঁছেছে, কাফেলার ওপর আক্রমণ হয়েছে, গ্রাম উজাড় হয়েছে, নারী অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে। বাংলায় সহিংসতার প্রকৃতি ও মাত্রা পাঞ্জাবের তুলনায় ভিন্ন হলেও উদ্বাস্তুপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে এবং কয়েক দশক ধরে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত বহন করতে হয়েছে দুই বাংলাকেই।
বঙ্গভাগের এই ভয়াবহ পরিণতি আরও মর্মান্তিক বলে মনে হয় যখন মনে রাখা হয় যে মাত্র কয়েক বছর আগে বাংলার মানুষ আরেকটি বিরাট মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, বাংলার স্মৃতিতে যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। যুদ্ধকালীন ব্রিটিশ নীতি, খাদ্যসংগ্রহ, পরিবহণব্যবস্থার সংকট, বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার জটিল সমন্বয়ে এই দুর্ভিক্ষ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী সরকারি অনুমানে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ মারা যান, আর বেসরকারি অনেক হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫ লক্ষের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলার প্রায় ৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষ কোনও না কোনওভাবে দুর্ভিক্ষের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে প্রায় ১২ থেকে ১৫ লক্ষ ভূমিহীন শ্রমিক, ১৫ লক্ষ দরিদ্র কৃষক, ১৫ লক্ষ শিল্পশ্রমিক এবং প্রায় ২৫ হাজার দরিদ্র স্কুলশিক্ষকসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ জীবিকার শেষ অবলম্বন হারিয়ে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। (Shila Sen : Ibid. p-173-174)
মন্বন্তরের দৃশ্য ছিল বাঙালির সমকালীন স্মৃতিতে তখনও তাজা। কলকাতার ফুটপাতে অনাহারে মৃত মানুষের দেহ, গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে খাদ্যের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো পরিবার, সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া মা, জমি ও গৃহপালিত পশু হারানো কৃষক, একমুঠো চালের জন্য মানুষের মরিয়া লড়াই, এসব ছিল সাম্প্রতিক বাস্তবতা। এর মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাংলাকে আবার রক্তাক্ত করে। কলকাতার হত্যাকাণ্ড, নোয়াখালির হিংসা, বিহারের প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞ এবং পরবর্তী নানা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতাকে গভীর করে তোলে। সেই আতঙ্কের আবহেই ১৯৪৭ সালের বিভাজন রাজনীতি তার সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র পায়।
এই ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে প্রশ্ন ওঠে, মন্বন্তর ও দাঙ্গার মতো বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা কি বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও সতর্ক, আরও মানবিক এবং বিভাজনের প্রতি আরও সংশয়ী করতে পারত না? অখণ্ডতাপন্থীরা ঠিক এই যুক্তিই তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার উত্তর নতুন সাম্প্রদায়িক ভূগোল হতে পারে না। অথচ বিভাজনপন্থীরা উল্টো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। তাঁদের মতে সহাবস্থানের ব্যর্থতাই প্রমাণ করে যে পৃথক রাজনৈতিক আবাসভূমি ছাড়া নিরাপত্তার অন্য কোনও পথ নেই। এই দুই ব্যাখ্যার দ্বন্দ্বই ১৯৪৭ সালের বঙ্গরাজনীতির কেন্দ্রে ছিল।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতিকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যে বিচার করাই তাই প্রয়োজন। তাঁকে শুধু বঙ্গবিভাগের একমাত্র রূপকার বলে দেখলে যেমন ইতিহাসের জটিলতা হারিয়ে যায়, তেমনই বঙ্গবিভাগে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা খাটো করলেও ঘটনাপ্রবাহ বিকৃত হয়। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষত প্যাটেল, বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভা, হিন্দু মধ্যবিত্তের একটি প্রভাবশালী অংশ, কিছু সংবাদপত্র এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের একাংশ মিলেই পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবিকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। অন্যদিকে মুসলিম লিগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও স্বাধীন অখণ্ড বাংলার প্রস্তাবকে শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ বিভাজনের চূড়ান্ত পরিণতি একাধিক শক্তির সম্মিলিত অবস্থান থেকে তৈরি হয়েছিল।
তবুও শ্যামাপ্রসাদের বিশেষ ভূমিকা ছিল এই যে তিনি হিন্দু নিরাপত্তার প্রশ্নকে একটি সুস্পষ্ট ভূখণ্ডগত দাবিতে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রচারে হিন্দু পরিচয়, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎকে এক সূত্রে গেঁথে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির যুক্তি দাঁড় করানো হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীরা এই ভূমিকাকেই ‘পশ্চিমবঙ্গ রক্ষা’র কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এই কৃতিত্বের বিপরীত পিঠে রয়েছে বাংলার বিভাজন, পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের দীর্ঘ উদ্বাস্তুজীবন, পশ্চিমবঙ্গের ওপর উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের অসীম চাপ, দুই বাংলার অর্থনৈতিক বিচ্ছেদ এবং দুই পাশে থেকে যাওয়া সংখ্যালঘুদের বহু দশকের নিরাপত্তাহীনতা।
একই সঙ্গে কংগ্রেস নেতৃত্বের ভূমিকাও বিচারের বাইরে রাখা যায় না। শরৎচন্দ্র বসু যখন অখণ্ড বাংলার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ছিলেন, তখন তাঁর নিজের দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি। প্যাটেলের চিঠিপত্র থেকে স্পষ্ট যে তিনি বঙ্গবিভাগকে হিন্দু স্বার্থরক্ষার উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নেহরুও শেষপর্যন্ত দেশভাগ মেনে নেন। গান্ধি তাঁর দীর্ঘদিনের আপত্তি সত্ত্বেও কংগ্রেসকে বিভাজন পরিকল্পনা অনুমোদনের পরামর্শ দেন। অন্যদিকে জিন্না এবং মুসলিম লিগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও স্বাধীন বাংলা পরিকল্পনার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়নি। এর ফলে বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা সর্বভারতীয় ক্ষমতার সমীকরণের নিচে চাপা পড়ে যায়।
এইখানেই স্বাধীন অখণ্ড বাংলা পরিকল্পনার ঐতিহাসিক তাৎপর্য। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তা সফল হতো কি না, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি কার্যকর থাকত কি না, ভারত ও পাকিস্তানের মাঝখানে একটি স্বাধীন বাংলা কতদিন টিকে থাকতে পারত, এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বিকল্পটি যে বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনার অংশ ছিল, তা অস্বীকার করা যায় না। শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, সুরাবর্দি, কিরণশঙ্কর রায় প্রমুখ নেতারা অন্তত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এমন একটি পথ খুঁজছিলেন যেখানে বাংলার ভাষাগত, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক একতা ধর্মীয় বিভাজনের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।
বঙ্গবিভাগের সমর্থকেরা অবশ্য যুক্তি দিয়েছিলেন, ১৯৪৬ সালের পর সেই আস্থা পুনর্গঠন আর বাস্তবসম্মত ছিল না। কলকাতা ও নোয়াখালির স্মৃতি, মুসলিম লিগের পাকিস্তান দাবি, প্রশাসনে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার আশঙ্কা এবং পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে তাঁরা পৃথক পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এই উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে ইতিহাসের আরেকটি দিক অদৃশ্য হয়ে যায়। বহু সাধারণ হিন্দু সত্যিই ভীত ছিলেন। একইভাবে বহু মুসলমানও হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের বিভাজনপন্থী প্রচারকে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে হুমকি বলে দেখছিলেন। দুই সম্প্রদায়ের ভয় একে অপরকে বাড়িয়ে তুলেছিল এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলি সেই ভয়কে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবহার করেছিল।
অতএব বঙ্গবিভাগের ইতিহাস শুধু ষড়যন্ত্রের ইতিহাস নয়, আবার শুধু অনিবার্যতার ইতিহাসও নয়। এটি পরস্পরবিরোধী স্বার্থ, সাম্প্রদায়িক আতঙ্ক, ঔপনিবেশিক তাড়াহুড়ো, সর্বভারতীয় নেতৃত্বের ক্ষমতার হিসাব, প্রাদেশিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, জমিদার ও ব্যবসায়ী স্বার্থ, উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার সম্মিলিত পরিণতি। এই জটিলতার মধ্যেই শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা বিচার করতে হয়।
তাঁর সমর্থকেরা বলতে পারেন, তিনি এমন সময়ে হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গের দাবি তুলেছিলেন যখন পাকিস্তানের সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হচ্ছিল এবং পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ ছিল। তাঁর সমালোচকেরা পাল্টা বলবেন, এই সংকটের সমাধান হিসেবে তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন তা বাংলার সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে স্থায়ী রাজনৈতিক সীমানায় রূপান্তরিত করেছিল। দুটি ব্যাখ্যাই ইতিহাসে বিদ্যমান। কিন্তু তাঁর ভূমিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি বিভাজনের দাবিকে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেছিলেন এবং কংগ্রেসের প্রভাবশালী অংশের সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিভাজনের পরিণাম অবশ্য কোনও দলীয় প্রচারের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানচিত্রে আঁকা রেখা মানুষের জীবনে রক্তমাংসের বাস্তবতায় নেমে আসে। পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু প্রবাহ বহু বছর ধরে চলতে থাকে। অনেক পরিবার একবার নয়, একাধিকবার ভিটেমাটি বদলাতে বাধ্য হয়। পশ্চিমবঙ্গের শহর ও শহরতলিতে উদ্বাস্তু কলোনি গড়ে ওঠে, জমি দখল করে নতুন বসতি তৈরি হয়, শিক্ষা ও চাকরির ওপর চাপ বাড়ে, নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে পূর্ববাংলা এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানেও হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে থেকে যাওয়া মুসলমানদের মধ্যেও নিরাপত্তা ও নাগরিকতার প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ তৈরি হয়। যে বঙ্গভাগকে নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধান হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, বাস্তবে তা দুই পাশে নতুন ধরনের সংখ্যালঘু সমস্যার জন্ম দেয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিভাজনের মূল্য ছিল বিপুল। পূর্ববঙ্গে উৎপন্ন পাট এবং পশ্চিমবঙ্গের পাটকল এক রাষ্ট্রসীমায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কলকাতা তার ঐতিহ্যগত পূর্বাঞ্চলীয় পশ্চাৎভূমির একটি বড় অংশ হারায়। রেলপথ, নদীপথ, বাজার, বন্দর, কৃষি উৎপাদন এবং শিল্পের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। যে অর্থনৈতিক অঞ্চল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তা রাজনৈতিক সীমারেখায় আলাদা হয়ে যায়। অখণ্ডতাপন্থীরা যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেছিলেন, তার অন্তত একটি অংশ বাস্তবে সত্য হয়ে ওঠে।
এ কারণেই ১৯৪৭ সালের বঙ্গবিভাগকে কেবল পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির বিজয়গাথা হিসেবে দেখা যেমন একপেশে, তেমনি কেবল একটি পক্ষের ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের ফল বলাও অসম্পূর্ণ। কিন্তু এতে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকার গুরুত্ব কমে না। তিনি ছিলেন সেই প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের একজন যিনি প্রকাশ্যে, ধারাবাহিকভাবে এবং সাংগঠনিক শক্তি ব্যবহার করে বাংলাভাগকে হিন্দু নিরাপত্তার একমাত্র কার্যকর সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টা কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি শক্তিশালী অংশের সমর্থন পেয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক সমীকরণই বিজয়ী হয়।
তবে ইতিহাসের আরেকটি সত্যও পাশাপাশি মনে রাখা দরকার। শ্যামাপ্রসাদের দাবি যতই প্রবল হয়ে উঠুক, বাংলার বিভাজন কোনও সর্বসম্মত বাঙালি আকাঙ্ক্ষা ছিল না। শরৎচন্দ্র বসু শেষদিন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। আবুল হাশিম অখণ্ড বাংলার পক্ষে যুবসমাজকে আহ্বান করেছিলেন। সুরাবর্দি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ ও হিসাব থেকে হলেও স্বাধীন বাংলা পরিকল্পনায় আগ্রহী হয়েছিলেন। কিরণশঙ্কর রায়, অখিলচন্দ্র দত্ত প্রমুখও বিভাজনকে অনিবার্য বলে মানেননি। এমনকি হিন্দু সমাজের মধ্যেও বঙ্গভাগ নিয়ে প্রবল মতভেদ ছিল। এই বিরোধী কণ্ঠগুলি ইতিহাসের পরাজিত কণ্ঠ হতে পারে, কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক নয়।
শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের বিভাজন সেই সমস্ত বিকল্প সম্ভাবনাকে বন্ধ করে দেয়। ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়, সঙ্গে জন্ম নেয় পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের নতুন রাজনৈতিক ভূগোল। সেই নতুন মানচিত্রের জন্মের সঙ্গে যুক্ত ছিল উল্লাস, ভয়, মৃত্যু, উদ্বাস্তুতা এবং অগণিত মানুষের অনিরাময় স্মৃতি। তাই বঙ্গবিভাগকে বিচার করতে গেলে শুধু কোন নেতা কতখানি ‘কৃতিত্ব’ দাবি করেছিলেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা চলে না। দেখতে হয় কোন সামাজিক মূল্য দিয়ে সেই কৃতিত্ব অর্জিত হয়েছিল, কোন সম্ভাবনাগুলি পরিত্যক্ত হয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্তের বোঝা শেষ পর্যন্ত কারা বহন করেছিল।
১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের কঙ্কালসার মানুষের স্মৃতি তখনও বাংলার পথঘাট থেকে মুছে যায়নি। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক হত্যার রক্ত তখনও শুকোয়নি। তার মধ্যেই মাত্র কয়েক মাসের রাজনৈতিক আলোচনায় এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভৌগোলিক, সামাজিক ও মানসিক অস্তিত্বকে চিরদিনের জন্য বদলে দিল। ইতিহাসের এই মুহূর্তে শ্যামাপ্রসাদ, প্যাটেল, নেহরু, গান্ধি, জিন্না, সুরাবর্দি, শরৎচন্দ্র, আবুল হাশিম প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক যুক্তি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। কারও ভূমিকা এককভাবে পুরো ইতিহাস ব্যাখ্যা করে না। তবু প্রত্যেকের সিদ্ধান্তের নৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন ইতিহাসের অংশ এবং সেই মূল্যায়ন দলীয় পূজা বা নিন্দার ঊর্ধ্বে উঠে করা প্রয়োজন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্যামাপ্রসাদের বঙ্গবিভাগপন্থী রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাসবিরোধী নয়, বরং ইতিহাসচর্চারই স্বাভাবিক দাবি। কারণ তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আজও রাজনৈতিক দাবি করা হয়। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র স্রষ্টা বা হিন্দুসমাজের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরলে সমকালীন বাস্তবতার বহু স্তর মুছে যায়। একইভাবে তাঁর সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে একমাত্র বিদ্বেষের ফল বললেও ইতিহাসের জটিলতা ধরা পড়ে না। যথার্থ বিচার করতে হলে তাঁর বক্তব্য, তাঁর চিঠিপত্র, তাঁর সমর্থকদের প্রচার, কংগ্রেস নেতৃত্বের সহযোগিতা, অখণ্ডতাপন্থীদের বিরোধিতা এবং বিভাজনের মানবিক পরিণাম সবকিছুকে একই সঙ্গে সামনে রাখতে হবে।
তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ১৯৪৭ সালের বাংলার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শুধু এই নয় যে বাংলা ভাগ হয়েছিল। আরও বড় ট্র্যাজেডি হল, বহু শতকের অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, নদী, বাজার ও সামাজিক স্মৃতির অধিকারী একটি ভূখণ্ডের মানুষকে শেষ পর্যন্ত বোঝানো হয়েছিল যে নিরাপত্তার জন্য প্রতিবেশীকে আলাদা রাষ্ট্রে পাঠানোই একমাত্র পথ। সেই ধারণার বিজয়ই ছিল বঙ্গবিভাগের প্রকৃত রাজনৈতিক সাফল্য এবং একই সঙ্গে তার সবচেয়ে গভীর মানবিক পরাজয়।
১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতায় যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার অভিঘাত এত গভীর ছিল যে পরবর্তী ইতিহাসে সেটি কেবল একটি নগরদাঙ্গা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সমগ্র বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক এবং অবশেষে দেশভাগের প্রশ্নকে আরও অনিশ্চিত ও রক্তাক্ত করে তুলেছিল। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হন, আরও বহু হাজার আহত হন, অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং কলকাতার বহু অঞ্চল কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও সমকালীন বিবরণে নিহতের সংখ্যা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হলেও পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজারের মধ্যে মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় পনেরো হাজার মানুষের আহত হওয়ার যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা এই সহিংসতার ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। (৬০. সুনীতি কুমার ঘোষ : প্রাগুক্ত। পৃ-২৪৯)
এই দাঙ্গার বিশেষ তাৎপর্য ছিল এর দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বিস্তার। কলকাতার ঘটনাবলি বিচ্ছিন্ন থাকেনি। কিছুদিনের মধ্যেই নোয়াখালি, ত্রিপুরা এবং বিহারে প্রতিশোধমূলক ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিস্তার লাভ করে। ফলে একটি শহরের সংঘর্ষ ক্রমশ বৃহত্তর ভৌগোলিক অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং অবিশ্বাসকে তীব্রতর করে তোলে। এই ধারাবাহিক সহিংসতা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, সংবাদপত্রের ভাষা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে বিতর্ককে আরও কঠোর ও আপসহীন করে দেয়। উল্লিখিত গবেষণায় আরও বলা হয়েছে যে কলকাতার দাঙ্গায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল অবাঙালি, এবং এই সংঘর্ষের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। (৬০. সুনীতি কুমার ঘোষ : প্রাগুক্ত। পৃ-২৪৯) তবে এই দাবিকে মূল্যায়নের সময় এটাও মনে রাখা দরকার যে ১৯৪৬ সালের কলকাতার সহিংসতা ছিল বহুস্তরীয়। সংগঠিত রাজনৈতিক মিছিল, দলীয় প্রস্তুতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, গুজব, স্থানীয় প্রতিশোধ, অপরাধী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং হঠাৎ বিস্ফোরিত জনরোষ সবকিছু একসঙ্গে কাজ করেছিল। ফলে এই দাঙ্গাকে একক কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের পরিকল্পনার ফল বলে ব্যাখ্যা করলে ঘটনাটির জটিলতা সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না।
জওহরলাল নেহরুর প্রতিক্রিয়াও এই সময়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। কলকাতার দাঙ্গা তাঁর মনে কী প্রভাব ফেলেছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন যে কলকাতায় কিছু মানুষের ‘অন্যায় আচরণ’-এর জন্য তাঁদের সামগ্রিক ‘কর্মসূচি’ পরিবর্তন করা যাবে না। (The Statesman, August 18, 1946) এই বক্তব্যে একদিকে যেমন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে স্থির থাকার প্রবণতা প্রতিফলিত হয়, অন্যদিকে তেমনই দাঙ্গার গভীর মানবিক অভিঘাতের তুলনায় সর্বভারতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ার মনোভাবও ধরা পড়ে। নেহরুর দৃষ্টিতে কয়েক দিনের ভয়াবহ সহিংসতা বৃহত্তর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা পরিবর্তনের যথেষ্ট কারণ ছিল না। কিন্তু যাঁরা সেই দাঙ্গায় পরিবার হারিয়েছিলেন, গৃহহীন হয়েছিলেন কিংবা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেশীকে শত্রুতে পরিণত হতে দেখেছিলেন, তাঁদের কাছে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে অনেক বেশি নির্মম বলে মনে হতে পারে।
আরও তীব্র ভাষা ব্যবহার করেছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল। স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে লেখা এক চিঠিতে তিনি কলকাতার দাঙ্গার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন যে সেখানে ‘হিন্দুরাই জয়ী’ হয়েছে। (৬২. সুনীতি কুমার ঘোষ : প্রাগুক্ত। পৃ-২৫২) দাঙ্গার মতো মানবিক বিপর্যয়কে জয়-পরাজয়ের ভাষায় বিচার করার মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটতে পারে, তা উপেক্ষা করা কঠিন। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, প্রতিবেশী পাড়া ধ্বংস, নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা, সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং বহু প্রজন্মের সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ঘটনাকে যদি রাজনৈতিক শক্তির সাফল্য বা ব্যর্থতার মাপকাঠিতে দেখা হয়, তবে সহিংসতার মানবিক মাত্রা অনিবার্যভাবেই আড়ালে চলে যায়। প্যাটেলের এই মন্তব্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও সেখানেই।
এই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যেও অনুরূপ কঠোরতা দেখা যায়। মুসলিম লিগের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন যে ১৯৪৬ সালের এই সংঘর্ষে কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা যেন তাঁরা ভুলে না যান। উল্লিখিত সূত্রের ব্যাখ্যায় এর অর্থ দাঁড়ায়, তাঁর ধারণা ছিল কলকাতার দাঙ্গায় মুসলমানদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিন্দুদের তুলনায় বেশি। (৬৩. দ্র: অশোক চট্টোপাধ্যায় : প্রাগুক্ত। পৃ-৩০) এই বক্তব্যকে প্যাটেলের ‘হিন্দুরাই জয়ী’ মন্তব্যের পাশে রাখলে দুই নেতার রাজনৈতিক ভাষায় একটি লক্ষণীয় সাদৃশ্য দেখা যায়। তবে এই সাদৃশ্য থেকেই তাঁদের দাঙ্গা সংঘটনে প্রত্যক্ষ পরিকল্পিত ভূমিকা প্রমাণিত হয় না। বরং যা বলা যায় তা হল, সহিংসতার পরে তাঁরা এমন ভাষা ব্যবহার করেছিলেন যা দাঙ্গাকে নিছক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে না দেখে সাম্প্রদায়িক শক্তির তুলনামূলক সাফল্য বা ব্যর্থতার আলোকে বিচার করেছিল। ইতিহাসের বিচারে এই মনোভাব নিজেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এখানে ফজলুল হকের অবস্থান একটি আলাদা মাত্রা যোগ করে। উল্লিখিত গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময় তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ প্রতিরোধ করতে এবং মুসলমান গুণ্ডাদের হাত থেকে প্রতিবেশী হিন্দুদের রক্ষা করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রচেষ্টায় তিনি পুলিশ ও প্রশাসনের যথেষ্ট সহযোগিতা পাননি। (অমলেন্দু দে : পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক। পারুল প্রকাশনী। কলকাতা। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-১৬৮) এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা দেখায় যে সমকালীন মুসলিম নেতৃত্বের সকলকে একই রাজনৈতিক ছকে বিচার করা যায় না। ফজলুল হক দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা অবস্থান নিয়েছিলেন, মুসলিম লিগের সঙ্গে থেকেছেন, তার বিরোধিতাও করেছেন, হিন্দু মহাসভার সঙ্গে মন্ত্রিসভা গড়েছেন, আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থানও নিয়েছেন। তাঁর ভূমিকা তাই একরৈখিক নয়।
১৯৪৬ সালের সহিংসতা এবং ১৯৪৭ সালের বিভাজনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গভীর। কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার এবং অন্যত্র ধারাবাহিক দাঙ্গা মানুষের মনে এই ধারণা শক্তিশালী করে যে হিন্দু ও মুসলমানের সহাবস্থান সম্ভবত আর নিরাপদ নয়। এই ভয়কে দুই সম্প্রদায়ের বিভাজনপন্থী নেতৃত্ব নিজেদের রাজনৈতিক যুক্তির পক্ষে ব্যবহার করেছিল। হিন্দু মহাসভা বলেছিল হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য পৃথক পশ্চিমবঙ্গ প্রয়োজন; মুসলিম লিগ পাকিস্তানের দাবিকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছিল; কংগ্রেসের প্রভাবশালী অংশও ক্রমশ বিভাজনকে অবশ্যম্ভাবী বলে গ্রহণ করেছিল। এই পরিবেশে শরৎচন্দ্র বসুর মতো অখণ্ডতাপন্থী নেতাদের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সাতচল্লিশের বিভাজন যখন বাস্তবায়িত হতে শুরু করে এবং সীমান্তের উভয় পাশে উদ্বাস্তু মানুষের ঢল নামে, শরৎচন্দ্র বসু বঙ্গবিভাগের সমর্থকদের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন। (৬৫. অমলেন্দু দে : স্বাধীন বঙ্গভূমি গঠনে পরিকল্পনা : প্রয়াস ও পরিণতি। পারুল প্রকাশনী। কলকাতা। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ-৮৩) তাঁর ক্ষোভের কারণ বোঝা কঠিন নয়। যে বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি শেষপর্যন্ত লড়েছিলেন, তার বাস্তব ফল তিনি নিজের চোখের সামনে দেখছিলেন মানুষের স্থানচ্যুতি, উদ্বাস্তু শিবির, সম্পত্তি হারানো, ভাঙা পরিবার এবং বহু প্রজন্মের সামাজিক সম্পর্কের ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে।
দেশভাগকে পরবর্তী রাষ্ট্রগুলির সরকারি ইতিহাসে সাধারণত স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ রাজনৈতিক স্বাধীনতার দিন, কিন্তু একই সময়ে বাংলা ও পাঞ্জাবের বিপুল মানুষের কাছে সেই দিনটি ছিল গৃহহারা হওয়ার, পরিবার হারানোর এবং চিরপরিচিত ভূগোল হারিয়ে ফেলার দিনও। এই দ্বৈততা না বুঝলে দেশভাগের ইতিহাস বোঝা যায় না। স্বাধীনতা এসেছিল, কিন্তু তার সঙ্গে এসেছিল সীমান্ত, শরণার্থী, দাঙ্গা, প্রতিশোধ, গণহত্যা এবং নাগরিকত্বের নতুন সংকট। যে মানুষ রাতারাতি এক রাষ্ট্রের নাগরিক থেকে অন্য রাষ্ট্রের ‘সংখ্যালঘু’ হয়ে গেল, তার কাছে স্বাধীনতার ভাষা অনেক সময় বিমূর্ত শোনাতেই পারে।
এই কারণেই শ্যামাপ্রসাদের বঙ্গবিভাগে ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী রাজনৈতিক স্মৃতিচর্চা এত বিতর্কিত। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁদের যুক্তি, যদি তিনি হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবি না তুলতেন, তবে সম্পূর্ণ বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারত এবং বাংলার হিন্দুদের ভবিষ্যৎ আরও বিপন্ন হতো। তাঁর সমালোচকেরা পাল্টা যুক্তি দেন, বিভাজনকে একমাত্র সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই বাংলার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে স্থায়ী ভূগোলের রূপ দিয়েছিল। উভয় অবস্থানের বাইরে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিকভাবে যা বলা যায় তা হল, শ্যামাপ্রসাদ বঙ্গবিভাগের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও প্রচারক ছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীরা আজও এই ভূমিকাকে গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করেন।
কিন্তু কোনও ঐতিহাসিক ঘটনাকে গৌরবের স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত করার আগে তার মানবিক মূল্যও বিবেচনা করা দরকার। বঙ্গবিভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ অবশ্যই একটি পৃথক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু পরবর্তী কয়েক দশকে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসেন; বহু মুসলমান পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান; আবার বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজ নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘু হিসেবে থেকে গিয়ে নতুন নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও পাট উৎপাদনের অঞ্চল এক রাষ্ট্রে এবং প্রধান পাটকল অন্য রাষ্ট্রে চলে যায়, নদীবন্দর ও বাজারের ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়, কলকাতার পশ্চাৎভূমি সঙ্কুচিত হয়। ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্ম একদিকে রাজনৈতিক সাফল্য হলেও অন্যদিকে তা ছিল গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছেদের সূচনা।
আজকের রাজনৈতিক ভাষায় শ্যামাপ্রসাদকে ‘হিন্দুস্বার্থের রক্ষাকর্তা’ বা পশ্চিমবঙ্গের ‘স্রষ্টা’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা সেই জটিলতাগুলিকে প্রায়ই আড়াল করে। একইভাবে তাঁকে কেবল সমস্ত বিপর্যয়ের একক নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে দেখাও ইতিহাসকে অতিসরল করে। ১৯৪৭ সালের বাংলা বিভাজনের পেছনে হিন্দু মহাসভা, কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতৃত্ব, মুসলিম লিগ, ব্রিটিশ প্রশাসন, ব্যবসায়িক স্বার্থ, জমিদারি শক্তি, সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তাহীনতা এবং সর্বভারতীয় ক্ষমতার সমীকরণ একসঙ্গে কাজ করেছিল। শ্যামাপ্রসাদ এই বৃহত্তর জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন।
তবে তাঁর ভাষা ও রাজনীতি যে হিন্দু সম্প্রদায়কেন্দ্রিক ছিল, তা অস্বীকার করা কঠিন। বঙ্গবিভাগের পক্ষে তাঁর যুক্তির কেন্দ্রেই ছিল হিন্দু নিরাপত্তা, হিন্দু মর্যাদা এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ডের প্রয়োজন। এই রাজনীতি বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক একতাকে ধর্মীয় পরিচয়ের নিচে স্থান দিয়েছিল। আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে তাঁর উত্তরাধিকার এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার একটি কারণও এখানেই। তিনি এমন এক রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন যেখানে জাতীয়তার ধারণা ক্রমশ ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
এই উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে সরল তুলনা টানা অবশ্য ঐতিহাসিকভাবে সতর্কতার দাবি রাখে। হিটলারের ইহুদি-বিদ্বেষ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণহত্যার নীতিতে পরিণত হয়েছিল; ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের ইতিহাস ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত হয়েছে। তবু রাজনৈতিক ভাষায় কোনও ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে স্থায়ী সন্দেহ, আনুগত্যের পরীক্ষা বা জাতীয়তার বাইরের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা যে বিপজ্জনক, ইতিহাস সে বিষয়ে যথেষ্ট শিক্ষা দেয়। অতএব শ্যামাপ্রসাদের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত তাঁর সময়ের দলিল, বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত, অতিরঞ্জিত উপমা নয়।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গার স্মৃতি সেই কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দাঙ্গা কখনোই কোনও সম্প্রদায়ের ‘জয়’ নয়। যদি এক পক্ষ বেশি নিহত হয়, তবু অন্য পক্ষ বিজয়ী হয় না; যদি এক পাড়া পুড়ে যায়, পাশের পাড়ার নিরাপত্তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সবসময় সামাজিক আস্থাকে ধ্বংস করে এবং পরবর্তী প্রতিশোধের ক্ষেত্র তৈরি করে। কলকাতার আগস্টের রক্তপাতের পরে নোয়াখালি, বিহার এবং অন্যান্য অঞ্চলে যা ঘটেছিল, তা এই নিয়মেরই নির্মম প্রমাণ।
এই দাঙ্গার পরেও যদি রাজনৈতিক নেতারা সংখ্যার হিসাব কষে বলেন কোন সম্প্রদায় ‘জয়ী’ হয়েছে বা কার ক্ষতি বেশি হয়েছে, তবে সেই ভাষাই ভবিষ্যতের সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার উপাদান হয়ে উঠতে পারে। প্যাটেল বা শ্যামাপ্রসাদের উল্লিখিত মন্তব্য সেই কারণে শুধু ব্যক্তিগত উক্তি নয়; এগুলি একটি বৃহত্তর সময়ের রাজনৈতিক মানসিকতার দলিল। সেই মানসিকতায় মৃত মানুষ অনেক সময় মানুষ হিসেবে নয়, সম্প্রদায়ের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা হিসেবে দেখা হতে থাকে।
বঙ্গবিভাগের আগের মাসগুলিতে এই সাম্প্রদায়িক গণনা ক্রমেই রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কতজন হিন্দু কোন জেলায়, কতজন মুসলমান কোন মহকুমায়, কোন অঞ্চল কার সংখ্যাগরিষ্ঠ, কোন শহরের শিল্প কার দখলে, কোন বন্দর কোন রাষ্ট্রে যাবে, এসব হিসাব মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয়কে ক্রমে শুধু ধর্মীয় সংখ্যায় রূপান্তর করেছিল। মানুষ বাঙালি, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, কারিগর, প্রতিবেশী, বন্ধু বা সহনাগরিক হিসেবে নয়, প্রথমত হিন্দু অথবা মুসলমান হিসেবে গণনা হতে শুরু করেছিল। এটাই ছিল বিভাজনের গভীরতম সামাজিক বিপর্যয়।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গার মর্মান্তিক শিক্ষা যদি কোনও কিছু হওয়ার কথা ছিল, তা ছিল সহাবস্থানের ভঙ্গুরতা উপলব্ধি করে তাকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করা। কিন্তু বাস্তবে সেই শিক্ষা রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ অন্যভাবে গ্রহণ করেছিল। সহাবস্থান কঠিন হয়ে উঠেছে, অতএব বিভাজনই সমাধান। এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। এর ফলেই অখণ্ড বাংলা প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয় এবং বাংলা ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার রেখায় দ্বিখণ্ডিত হয়।
এই ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে শরৎচন্দ্র বসুর হতাশা আরও বোধগম্য হয়। তিনি দেখেছিলেন যে একদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সেই দাঙ্গার আতঙ্ককেই ব্যবহার করে নতুন রাষ্ট্রসীমা নির্মাণ করা হচ্ছে। তাঁর চোখে বিভাজন ছিল সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যার স্থায়ীকরণ। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁর পথ অনুসরণ করেনি। কিন্তু পরাজিত রাজনৈতিক প্রস্তাব বলেই তা গুরুত্বহীন নয়।
১৯৪৭ সালের পরবর্তী দশকগুলি প্রমাণ করেছে যে সীমান্ত টেনে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন মুছে ফেলা যায় না। পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু সংখ্যালঘু সমস্যা রয়ে গেছে, ভারতে মুসলমান সংখ্যালঘু সমস্যা রয়ে গেছে, উদ্বাস্তুপ্রবাহ বন্ধ হয়নি, সীমান্তসংকট থামেনি এবং পারস্পরিক সন্দেহ বহুবার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে দেশভাগ নিরাপত্তার একটি সমস্যার উত্তর দিতে গিয়ে অন্য এক দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার কাঠামো তৈরি করেছে।
এই কারণেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁকে পূজা করারও দরকার নেই, দানবায়িত করারও দরকার নেই। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য, হিন্দু মহাসভার কর্মসূচি, বঙ্গবিভাগে তাঁর ভূমিকা, মুসলিম লিগের প্রতি তাঁর মনোভাব এবং স্বাধীনতার আগে ও পরে তাঁর অবস্থান সবকিছুকে দলিলের আলোয় বিচার করতে হবে। একইভাবে নেহরু, প্যাটেল, জিন্না, সুরাবর্দি, ফজলুল হক ও শরৎচন্দ্র বসুর ভূমিকারও একই কঠোর ঐতিহাসিক বিচার প্রয়োজন।
কোনও একটি পক্ষকে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং অন্য পক্ষকে সমস্ত বিপর্যয়ের একমাত্র নির্মাতা হিসেবে দেখলে ইতিহাস রাজনৈতিক প্রচারে পরিণত হয়। কিন্তু এটাও সমান সত্য যে সকল পক্ষের দায় সমান ছিল না এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক মূল্যও সমান নয়। যে নেতা দাঙ্গার পরে ‘জয়ী’ সম্প্রদায়ের কথা বলেন, তাঁর ভাষা এক ধরনের রাজনীতি নির্দেশ করে; যে নেতা দাঙ্গার মধ্যে প্রতিবেশী সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে উদ্যোগী হন, তাঁর ভাষা ও কর্ম অন্য ধরনের রাজনীতির সাক্ষ্য দেয়। ইতিহাসের কাজ এই পার্থক্যগুলি স্পষ্ট করা।
এই আলোয় ১৯৪৬ এবং ১৯৪৭ সালের ঘটনাবলি পড়লে একটি গভীর বৈপরীত্য সামনে আসে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার দ্বার খুলছিল, অথচ সমাজের ভিতরে মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল। বিদেশি শাসন শেষ হচ্ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি নতুন রাষ্ট্রগুলির ভিতরেও বেঁচে থাকছিল। স্বাধীনতা তাই একদিকে মুক্তি, অন্যদিকে অসমাপ্ত ক্ষত।
যে রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে দেশভাগের পথ তৈরি হয়েছিল, তাকে কোনও সম্প্রদায়ের বিজয় হিসেবে স্মরণ করা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়। কলকাতার মৃত হিন্দু, মুসলমান, শিখ বা অন্য কোনও পরিচয়ের মানুষেরা কোনও রাজনৈতিক দাবির ফুটনোট ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন বাস্তব মানুষ, যাঁদের জীবন রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের মৃত্যু যদি কোনও শিক্ষা দেয়, তবে তা হল ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান হাতিয়ার বানানোর পরিণতি সব সম্প্রদায়কেই শেষ পর্যন্ত গ্রাস করে।
সুতরাং বঙ্গবিভাগের ইতিহাসের এই অধ্যায়কে বুঝতে হলে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা, প্যাটেল ও শ্যামাপ্রসাদের মন্তব্য, নেহরুর রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, ফজলুল হকের প্রতিরোধের চেষ্টা, শরৎচন্দ্রের অখণ্ড বাংলার আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তী উদ্বাস্তু বিপর্যয়কে একই ধারায় দেখতে হবে। তখনই বোঝা যায়, ১৯৪৭ কেবল মানচিত্রের রেখা বদলের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মানুষের পরিচয়, স্মৃতি, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি মৌলিক পরিবর্তন।
এবং সেই কারণেই শ্যামাপ্রসাদের বঙ্গবিভাগে ভূমিকা নিয়ে আজও বিতর্ক থামে না। তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে সমকালীন রাজনৈতিক গৌরবচর্চা যতই শক্তিশালী হোক, ইতিহাসের দলিল বারবার মনে করিয়ে দেয় যে পশ্চিমবঙ্গের জন্মের সঙ্গে একইসঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলার ভাঙন, উদ্বাস্তু হওয়া, সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস এবং বহু মানুষের জীবনের অপরিমেয় ক্ষতি। কোনও একক রাজনৈতিক স্মারক সেই জটিল সত্যকে ঢেকে রাখতে পারে না।
নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা





নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা