• মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
Monday, January 12, 2026
নবজাগরণ
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
No Result
View All Result

নজরুলের ধুমকেতু : ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক অগ্নিমশাল

নবজাগরণ by নবজাগরণ
January 8, 2026
in সাহিত্য আলোচনা
0
নজরুলের ধুমকেতু : ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক অগ্নিমশাল

চিত্রঃ কাজী নজরুল ইসলাম

Share on FacebookShare on Twitter

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম

নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক চেতনা ও স্বাধীনতাকামী মনোভঙ্গি তার সাহিত্যকর্মে যেভাবে প্রবাহিত হয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। ধূমকেতুর পাতায় প্রকাশিত তাঁর সম্পাদকীয় লেখাগুলো কেবল পত্রিকায় প্রকাশিত নীতিবিবৃতিই ছিল না, ছিল যেন এক বিদ্রোহের মহাসংগীত, ছিল দাসত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলার আহ্বান।

নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ সাহিত্য: বিশ্লেষণ ও সাহিত্যিক অবদান
চিত্রঃ নজরুল ইসলাম, Image Source: Google Image

তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে স্বাধীনতার জন্য আপসহীন অবস্থান। তিনি কোনো রকম সাংবিধানিক বা ধাপে ধাপে স্বাধীনতার ধারণাকে মানেননি। তাঁর ভাষায়, “স্বরাজ টরাজ বুঝি না।” এই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল এক রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি, যা যুগের অনেক রাজনীতিকের চেয়ে অনেক পরিপক্ব ও সাহসী। তিনি চাইছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা—একটি পরিপূর্ণ আত্মনির্ভর ভারতবর্ষ, যেখানে বিদেশী কোনো শক্তির প্রভাব থাকবে না, মোড়লির সুযোগ থাকবে না, বরং ভারতবর্ষের শাসনভার থাকবে কেবলমাত্র ভারতীয়দের হাতে।

তিনি বুঝেছিলেন, ব্রিটিশ শাসকরা আবেদন, নিবেদন বা শান্তিপূর্ণ প্রার্থনায় কানে দেবে না। এদের কাছে স্বাধীনতা ভিক্ষা করে পাওয়া যাবে না, তা ছিনিয়ে আনতে হবে। তিনি সেই সাহসী জাতিসত্তার প্রতীক হয়ে লিখলেন, “পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাকে বিদ্রোহ করতে হবে, সকল কিছু নিয়মকানুন, বাঁধন শৃঙ্খল, মানা-নিষেধের বিরুদ্ধে।”

নজরুল সময়ের অন্যতম রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ভেতরে ছিল একরকম ভীরুতা এবং সুবিধাবাদ। অনেক নেতাই যেখানে কৌশলের নামে আপসের পথ নিচ্ছিলেন, সেখানে নজরুল লিখলেন,

‘বুকের ভিতর ছ’পাই, ন’পাই, মুখে বলিস স্বরাজ চাই,
স্বরাজ কথার মানে তোদের ক্রমেই হচ্ছে দরাজ তাই।
ভারত হবে ভারতবাসীর—এই কথাটাও বলতে ভয়!
সেই বুড়োদের বলিস নেতা—তাদের কথায় চলতে হয়।
বলরে তোরা বল নবীন, চাইনে এসব জ্ঞান প্রবীণ।’

(বিদ্রোহীর বাণী : বিষের বাঁশী)

এই কবিতায় নজরুল তরুণদের উৎসাহিত করতে চাইছিলেন সেই গোঁড়া রাজনৈতিক ধারার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, যারা পেছনে টেনে রাখে, ভয় দেখিয়ে দুর্বল রাখে। তিনি জানতেন, স্বরাজ মানে যদি হয় কেবল একরাশ মুখের বুলি, তবে তা আসলে কিছুই নয়। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি স্বাধীনতা, যা শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারতবাসীকে প্রকৃত মুক্তি দেবে।

নজরুল বিশ্বাস করতেন, “সূতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুনি”—এমন ধৈর্য নয়, বরং দরকার ছিল তীব্র ঘূর্ণিবেগের মত এক সশস্ত্র আন্দোলন। “জাগোরে জোয়ান! বাত ধরে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি” (সব্যসাচী : ফণিমনসা) —এই পংক্তিতে তিনি সমগ্র জাতিকে হুঁশিয়ার করলেন, যারা দিনরাত কেবলই চাতুর্য ও চাতুর্যবান রাজনীতির বুননে স্বপ্ন দেখাতে ব্যস্ত, তারা জাতিকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে।

নজরুল সময়ের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে অন্তর্নিহিত মতভেদ, চরমপন্থী ও নরমপন্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তিকর দ্বন্দ্বকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, এসব বিভাজনের ফলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। এ সকল দোদুল্যমানতার বিপরীতে তিনি সুস্পষ্ট এবং কার্যকরী পথ নির্দেশ করেন। তিনি লিখলেন, করেন—

“কোথায় ভীমের জন্মদাতা পবন? ফুঁ দাও, ফুঁ দাও এ নিবন্ত অগ্নিসিন্ধুতে, আবার এক তরঙ্গে তরঙ্গে নিযুত নাগ-নাগিনীর নাগহিন্দোলা উলসিয়া উঠুক, আঘাত হানো, হিংসা আনো, যুদ্ধ আনো, এদের জাগাও, কান্নাকাতর আত্মাকে আর কাঁদিয়ো না। আমরা যে আশা করে আছি কখন সে মহাসেনাপতি আসবে যাঁর ইঙ্গিতে আমাদের মত শত শত কোটি সৈনিক বহ্নিমুখ পতঙ্গের মত তাঁর ছত্রতলে হাজির হাজির বলে হাজির হবে।” (আমি সৈনিক / সম্পাদকীয় / ধূমকেতু)

তাঁর বিশ্বাস ছিল, একজন মহাসেনাপতির ইঙ্গিতেই কোটি কোটি নিঃস্ব, নির্যাতিত, যুবা ও শ্রমিক একজোট হয়ে বিপ্লবের পতাকা তুলে ধরবে। এই আহ্বান কেবল রাজনৈতিক ছিল না, ছিল এক গভীর আত্মিক জাগরণের। তাই তিনি লিখলেন,

“বল, কারুর অধীনতা মানি না, স্বদেশীরও না, বিদেশীরও না।” (মোরা সবাই স্বাধীন / সম্পাদকীয় / ধূমকেতু)

এই কথার মধ্যে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল ব্রিটিশ বিদায়ে আসবে না, বরং সমাজের সকল প্রকার শোষণের অবসান ঘটিয়ে যে জাতির আত্মস্মিতা প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটিই হবে প্রকৃত স্বাধীনতা।

ধূমকেতুর পাতায় লেখা তাঁর আরেক সম্পাদকীয়তে তিনি চরম প্রতীক ব্যবহার করে জাতিকে জাগাতে চাইলেন, “যে নরমুণ্ড-মালিনী চণ্ডী নিদ্রিত শিবের তাণ্ডব নৃত্য করে প্রলয় করতালি বাজিয়ে জাগিয়ে তোলে…” এই চিত্রকল্পে তিনি শিব ও চণ্ডীর পৌরাণিক শক্তিকে আহ্বান করলেন, যেন জাতিকে জাগিয়ে তোলে, যেন কল্যাণ আর ধ্বংস একসঙ্গে মিলেমিশে পরাধীনতাকে মুছে দেয়।

নজরুল কেবল রাজনীতিকদের ব্যঙ্গ করে থেমে যাননি, তিনি অর্থনৈতিক শোষণ ও শ্রেণিবৈষম্যকেও আঘাত করেছিলেন। তিনি জানতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেবল একটি ধাপে উন্নীত করবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি ক্ষুধার জ্বালায় দগ্ধ লক্ষ লক্ষ মানুষকে উপশম দিতে না পারে, তাহলে সেই স্বাধীনতা পরিহাস। তিনি লেখেন—

“আমরা তো জানি, স্বরাজ আনিতে
পোড়া বার্তাকুএনেছি খাস!
কত শত কোটী ক্ষুধিত শিশুর
ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস!
এল কোটী টাকা এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারী সমাজ!
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়!
মোরা বলি, বাঘ খাও হে ঘাস।” (আমার কৈফিয়ৎ)

এই কবিতায় তিনি শ্রেণিসংগ্রামের মর্মবাণী উচ্চারণ করলেন। এখানে স্পষ্টতই ধরা পড়ে যে, নজরুলের স্বাধীনতা মানে কেবল ইংরেজ তাড়ানো নয়, বরং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য ও আত্মবিক্রয়ের অবসান। তাঁর ভাবনায় জাতীয়তাবাদ সামাজিক ন্যায়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই গভীর রাজনৈতিক বোধ থেকেই তিনি ‘যুগবাণী’ নামে প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ করেন ১৯২২ সালের অক্টোবরে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে, কারণ এটি ছিল তাদের চোখে এক সশস্ত্র মতবাদের প্রতীক। কিন্তু নজরুল থেমে যাননি। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় তিনি আবারো সাহসের সঙ্গে লিখলেন—

“আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলা মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল।
দেবশিশুদের মারছে চাবুক বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসী,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, –আসবি কখন সর্বনাশী।
দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দ্বীপান্তরে,
রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?”

(আনন্দময়ীর আগমনেঃ অগ্নিবীণা)

এই কবিতাটি ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’তে ছাপানোর সাহস কেউ দেখায়নি। পরবর্তীতে এটি প্রকাশিত হয় নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে। নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয় ২২ নভেম্বর, ১৯২২। তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনা হয় এবং ১২৪-ক ধারায় তাঁকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এই ঘটনার অভিঘাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত আলোড়িত হন। ১৯২৩ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি তাঁর নাট্যকাব্য ‘বসন্ত’ উৎসর্গ করেন নজরুল ইসলামকে। এটা ছিল এক কবির প্রতি আরেক কবির সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নজরুলের ধুমকেতু : ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক অগ্নিমশাল
চিত্রঃ রবীন্দ্রনাথ টাকুর (এআই জেনারেটেড)

কারাগারে বন্দি থেকেও নজরুল তাঁর বিদ্রোহী সত্তাকে বিসর্জন দেননি। তিনি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রবন্ধে বলেন, “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি হইয়া রাজদ্বারে অভিযুক্ত।” এই এক বাক্যেই তিনি চিহ্নিত করেন তাঁর অবস্থান—তিনি ব্রিটিশ রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়ানো একজন যোদ্ধা, যিনি কলমকে করেছেন অস্ত্র, কণ্ঠকে করেছেন যুদ্ধঘণ্টা।

এইসব লেখা, প্রবন্ধ, কবিতা ও সম্পাদকীয়তে নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন স্বদেশের মুক্তিসংগ্রামে নিঃশর্ত নিয়োজিত এক চিন্তানায়ক, যাঁর প্রতিটি শব্দ ছিল আগুন, প্রতিটি বাক্য ছিল এক একটি বিপ্লবের স্লোগান। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে যে সংগ্রামের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ তা কেবল ইতিহাস নয়—মানবমুক্তির এক চিরন্তন আহ্বান।

নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক সাহিত্য ও তাঁর বিপ্লবী আত্মপরিচয় কেবল বাংলা ভাষার জন্য নয়, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। তাঁর কলম যেমন কবিতায় দ্রোহের আগুন ছড়িয়েছে, তেমনি গদ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে প্রতিরোধের যুক্তিনির্ভর ভিত। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ তাঁর এই প্রতিরোধচেতনার অন্যতম প্রামাণ্য দলিল, যা নিছক একটি আত্মপক্ষ সমর্থনের বিবৃতি নয়, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসিক ভাষিক যুদ্ধ।

তিনি লিখেছিলেন, “একধারে রাজার মুকুট; আর এক ধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড, আর জন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।” এই বাক্য শুধু কাব্যিক সৌন্দর্য নয়, এক গভীর রাজনৈতিক চেতনাকেও বহন করে। এখানে রাজা মানে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, যার হাতে আছে বন্দুক, আদালত, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইনকানুন, শাস্তিসূত্র এবং তার লেজুড়বৃত্তিতে থাকা কতক পোষ্য রাজনীতিক। আর ন্যায়দণ্ডধারী সত্য মানেই হলেন বিদ্রোহী কবি নিজে, যার পক্ষে রয়েছে মানুষ, ইতিহাস এবং ঈশ্বরতুল্য ন্যায়বোধ। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমার পক্ষে সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য জাগ্রত ভগবান।”

এই বাক্যগুলি নিছক আত্মরক্ষার প্রয়াস নয়, বরং এক অন্তর্দাহে পোড়া জনমানসের কণ্ঠস্বর। তিনি সজোরে লিখেছিলেন, “আজ ভারত পরাধীন, তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য।” এটি এমন এক সত্য যা উচ্চারণ করাটাই সেই সময়ের ভারতবর্ষে ছিল একটি অপরাধ। কারণ, ইংরেজ শাসনের বৈধতা তখন মিথ্যার স্তম্ভে দাঁড়িয়ে, সেখানে ‘দাসত্ব’ কথাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে মনে করা হতো। অথচ নজরুল সেই মিথ্যার রাজত্বে সত্যের জোয়ার আনার সাহস দেখালেন। তিনি প্রশ্ন তুললেন, “এই শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে?” এবং উত্তরও দিলেন, “এতদিন হয়েছিল, হয়ত সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে।”

এই সত্যজাগরণের কণ্ঠস্বর শুধু নজরুলের ছিল না। তিনি বুঝেছিলেন, তাঁর কণ্ঠে যে আগ্নেয় হুঙ্কার উঠেছে, তা আসলে গোটা জাতির হৃদয়ফাটা আর্তনাদের একটি কেন্দ্রীভূত প্রকাশ। তিনি লিখলেন, “এই অন্যায় শাসন ক্লিষ্ট বন্দি সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই কি আমি রাজদ্রোহী?… আমি জানি, আমার কণ্ঠের ঐ প্রলয় হুঙ্কার একা আমার নয়, সে যে নিখিল আর্ত পীড়িত আত্মার যন্ত্রণা চিৎকার।”

নজরুল নিজেকে কেবল একজন কবি হিসেবে দেখেননি। তিনি ছিলেন সময়ের প্রতিনিধি, ইতিহাসের মুখপাত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবির দায় শুধুই রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, হতে পারে আন্দোলনের অনুঘটক। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে সেই প্রত্যয়। তাই তিনি বারবার তরুণদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন, রক্ত দিয়ে, আত্মত্যাগ দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। তাঁর দৃপ্ত উচ্চারণ—

“আমরা জানি সোজা কথা, পূর্ণ স্বাধীন করব দেশ
এই দুলালুম বিজয় নিশান, মরতে আছি মরব শেষ।”
(বিদ্রোহীর বাণী : বিষের বাঁশী)

এই কবিতা, এই কাব্যগ্রন্থ, এবং এর প্রতিটি পঙক্তি তখনকার ব্রিটিশ প্রশাসনের শিরায় শিরায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় সরকার নজরুলের কাব্যগ্রন্থ ‘বিষের বাঁশী’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই কাব্যগ্রন্থটি কেবল একটি কাব্য সংকলন নয়, ছিল এক তীব্র রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র। এর প্রকাশের ফলে বাংলার নবীন প্রজন্মের মনে জেগে উঠেছিল বিদ্রোহের আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদার অনুভব।

‘বিষের বাঁশী’-কে নিষিদ্ধ করার পিছনে পুলিশি তদন্তের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়। বেঙ্গল লাইব্রেরির তৎকালীন লাইব্রেরিয়ান অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত তাঁর চিঠিতে লেখেন, বইটি “revolutionary sentiments and inciting young men to rebellion and to law breaking”-এর মাধ্যমে যুবসমাজকে বিপথগামী করছে। তিনি আরও বলেন, “The ideas, though often extremely vague, have clearly a dangerous intent,” এবং তিনি যে উদ্ধৃতিপত্র প্রেরণ করেন, তাতে ছিল নজরুলের ব্যবহৃত শব্দাবলীর বিশ্লেষণ—যেমন “blood”, “tyranny”, “death”, “fire”, “hell”, “demon”, “thunder”—এসব শব্দ যেন ছিল এক একটিভ বিপ্লবের গর্জন।

এই রিপোর্টের ভিত্তিতে কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট ১৮ অক্টোবর চিফ সেক্রেটারিকে এক নির্দেশনামা পাঠান, যেখানে তিনি লেখেন, “The writer was convicted last year under section 124A and 153A… the content of the book… are dangerously objectionable and recommend the immediate proscription of the same.” তাঁর সুপারিশে বঙ্গীয় সরকার ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করে।

চিফ সেক্রেটারি এ এন মাবারলি ‘Criminal Procedure Code’-এর ৯৯A ধারা অনুযায়ী ঘোষণা করেন, গ্রন্থটি এমন বক্তব্য ধারণ করে যা “excite disaffection towards the Government established by law in British India”। এর ফলে, গ্রন্থের সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়। পুলিশ কলকাতা শহরের বিভিন্ন বই বিপণি, প্রেস, পত্রিকা অফিস ও কবির হুগলির বাড়ি পর্যন্ত খুঁজে দেখে। সেদিন কলকাতায় পাওয়া যায় ৪৪টি কপি, যদিও কবির নিজ গৃহে কোন কপি পাওয়া যায়নি।

এ এক নজিরবিহীন দমননীতি, যা এক কবির কলমের ক্ষমতাকে ভয় পেয়ে রাষ্ট্র তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দমন করতে চেয়েছে। অথচ কবির স্বর থামেনি। বরং সে আরও বেশি উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল বলেন—

“আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়মকানুন শৃঙ্খল!
আমি মানিনাকো কোন আইন
আমি ভরাতরী করি ভরাডুবি
আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!”
(বিদ্রোহী)

এই পঙক্তির মধ্যে কবি আত্মপরিচয়ের এক বৈপ্লবিক রূপ নির্মাণ করেন। তিনি নিজেকে কেবলমাত্র কবি নন, বরং এক ‘টর্পেডো’, ‘ভাসমান মাইন’ হিসেবে চিত্রিত করেন—যিনি দুঃশাসনের জাহাজে আঘাত হানবেন, অন্যায়ের সিংহাসন ধ্বংস করবেন। নজরুল তাঁর সময়ে যে ন্যায়বোধ, প্রগতি, সমানাধিকারের কথা বলেছিলেন, তা তাঁর কণ্ঠস্বরকেই নয়, গোটা জাতিকে রূপান্তরিত করেছিল।

আজ যখন আমরা নজরুলকে স্মরণ করি, তখন তাঁকে কেবল একজন কবি বা সংগীতকার হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী আত্মার প্রতীক, একাধারে কবি, রাজবন্দি, ভাষ্যকার, বিদ্রোহী এবং মুক্তির পথপ্রদর্শক। তাঁর কণ্ঠে যে প্রলয় হুঙ্কার উঠেছিল, তা সময়কে ভেদ করে আজও আমাদের অন্তরে প্রবলভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। কারণ নজরুলের সাহিত্য কেবল অতীতের নথি নয়, তা বর্তমানের অঙ্গার ও ভবিষ্যতের দীপ্ত শপথ।

নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন অকুতোভয় বিপ্লবী, যিনি সাহিত্যকে কেবল শিল্পকলার বাহন হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং তা রূপ দিয়েছিলেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্রে। তাঁর কলম ছিল এক অর্থে তরবারির চেয়েও ধারালো, যা পরাধীনতার শিকল কেটে ফেলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত ছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, জাতিকে প্রকৃত স্বাধীনতা এনে দিতে হলে কেবল বক্তব্য ও আন্দোলনের নামে আত্মপ্রবঞ্চনা করে চলা যাবে না; প্রয়োজন সশস্ত্র বিপ্লব, প্রয়োজন আত্মবলিদান, প্রয়োজন আপসহীন সংগ্রাম। এটাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল মন্ত্র।

তাঁর মতে, স্বাধীনতা মানে কেবল শাসনের পরিবর্তন নয়, বরং শোষণ ও দাসত্বের সমাপ্তি। আর এই শোষণ শুধু বিদেশী শক্তির দ্বারাই হয় না, অনেক সময় স্বদেশীয়দের হাতেও মানুষ পরাধীন ও নিপীড়িত হয়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “বিদেশী শোষকদের ন্যায় স্বদেশী শোষকরাও মানুষের শত্রু।” তাঁর চোখে মুক্তি মানে সামগ্রিক মুক্তি—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সকল প্রকার শোষণের অবসান।

তাঁর এই চেতনার বহিঃপ্রকাশ আমরা পাই তাঁর কাব্য, প্রবন্ধ ও সম্পাদকীয় লেখায়। ব্রিটিশ সরকার যখন ভারতের বুকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নির্মমভাবে দমন করতে শুরু করে, তখন নজরুল সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা হাতে তুলে নেন। কারাগার, ফাঁসির দড়ি, গুলির আওয়াজ—এই সবকিছুই ছিল ব্রিটিশ কৌশলের অঙ্গ। কিন্তু নজরুল এই নিপীড়নের সামনে কখনো মাথা নত করেননি, বরং শিকলকেও পরিণত করেছেন প্রতিবাদের প্রতীকে। তিনি লিখলেন—

“এই শিকল পরা ছল, মোদের এ শিকল পরা ছল
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।।
তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়
ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন ভয়…”
(শিকল পরার গান : বিষের বাঁশী)

এই কবিতার প্রতিটি পঙক্তি যেন বিদ্রোহের বজ্রধ্বনি। শিকল, কারাগার, ফাঁসি—এসব ছিল নজরুলের কাছে ভয়ের প্রতীক নয়, বরং তা হয়ে ওঠে সাহসের, আত্মবিসর্জনের এবং বিজয়ের প্রতীক। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—“তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়”।

স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে যারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে নজরুল ছিলেন এক উৎসাহদাতা, এক আশার বাতিঘর। তিনি ‘ভাঙার গান’-এ লিখলেন—

“কারার ঐ লৌহকপাট
ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট
রক্তজমাট শিকল পূজার পাষাণবেদী।”
(ভাঙার গান : ভাঙার গান)

এই কবিতায় কারাগার রূপ নেয় পবিত্র বেদীতে, যেখানে বিপ্লবীরা যেন পূজার বলি হয়ে উঠছেন। নজরুলের দৃষ্টিতে তাঁরা বন্দি নন, তাঁরা জাতির পুনর্জন্মের কারিগর।

তিনি বারবার বলেছেন, স্বাধীনতা শুধু আইন মেনে, আবেদন জানিয়ে, শান্তিপূর্ণভাবে আসবে না। প্রয়োজন হলে সব রকম নিয়মকানুন, আইনের বেড়াজাল ভেঙে ফেলে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করতে হবে। সেই সংগ্রামে রক্ত যেমন ঝরবে, তেমনি জন্ম হবে নতুন দিনের। এজন্য দরকার লক্ষ লক্ষ তরুণ যাঁরা ভয় না পেয়ে এগিয়ে আসবেন। তিনি লিখেছিলেন,

“ক্ষুদিরাম গেছে, কিন্তু সে ঘরে ঘরে জন্ম নিয়ে এসেছে কোটি কোটি ক্ষুদিরাম হয়ে… ওরা হাসির নয়, ফাঁসির… ওরা বলিদানের, ওরা পূজার।” (ক্ষুদিরামের মা : রুদ্রমঙ্গল)

ক্ষুদিরামের আত্মবলিদান নজরুলের কাছে ছিল না কোনো দুঃখের উপাখ্যান, বরং ছিল এক শুদ্ধ চেতনার প্রকাশ, ছিল এক জীবন্ত মন্ত্র—যা প্রতিটি ভারতীয় যুবকের রক্তে বিপ্লবের আগুন জ্বালাতে সক্ষম। তবে নজরুল শুধু ব্যক্তিসাহসের কথা বলেননি। তিনি জাতীয় চেতনার এক বৃহত্তর রূপে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি চাইতেন এমন একজন মানুষ যিনি শুধু দেশকে ভালোবাসবেন তাই নয়, দেশের জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে পারবেন। তাই তিনি লিখলেন— “কিন্তু দেশ এখন চায়, মহাপুরুষ নয়। দেশ চায়, সেই পুরুষ যার ভালোবাসায় আঘাত আছে, বিদ্রোহ আছে… সে দরকার হলে আঘাতও করবে, প্রতিঘাতও বুক পেতে নেবে, বিদ্রোহ করবে।” (আমি সৈনিক : দুর্দিনের যাত্রী)

নজরুলের কাছে দেশপ্রেম মানে আবেগ নয়, ছিল কর্ম। এই কর্ম ছিল নিপীড়কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সমাজে অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, এবং স্বজাতির মধ্যে বিভেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

এই বিভেদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল ধর্মভিত্তিক জাতিগত ঘৃণা। ব্রিটিশ শাসকরা ‘Divide and Rule’ নীতির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা করে দেয়ার মাধ্যমে ভারতবর্ষের ঐক্য ধ্বংস করতে চেয়েছিল। এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প নজরুলকে ব্যথিত করে তুলেছিল। তাঁর চোখে হিন্দু-মুসলমান ছিল একই মাতৃভূমির সন্তান, যারা একে অপরের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

১৯২৬ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, তা নজরুলকে গভীরভাবে বিচলিত করে। সেই সময় তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের অধিবেশনে রচনা করেন কালজয়ী গান—

“দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার…
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ
কাণ্ডারী, আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।”

এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপরে উঠে গিয়ে তিনি ঘোষণা করেন মানুষের পরিচয়। ধর্ম নয়, জাতীয়তাই আসল; হিন্দু-মুসলমান নয়, মানুষই মুখ্য। এই ছিল তাঁর বৈপ্লবিক মানবতাবাদ।

এই চিন্তা তাঁর গদ্যেও উঠে এসেছে। ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে তিনি লিখলেন—

“দেখিলাম, আল্লার মসজিদ আল্লা আসিয়া রক্ষা করিলেন না, মা কালীর মন্দির মা কালী আসিয়া আগলাইলেন না… মানুষের পশু-প্রবৃত্তির সুবিধা লইয়া ধর্মান্ধদের নাচাইয়া কত কাপুরুষই না আজ মহাপুরুষ হইয়া গেল।” (মন্দির ও মসজিদ : রুদ্রমঙ্গল)

এই ভাষায় তিনি প্রতিরোধ করেছেন সেই ধর্মান্ধতা, যার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ আছে, মানুষের কল্যাণ নেই। নজরুলের কাছে ধর্ম ছিল অন্তরের সাধনা, কিন্তু বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ধর্ম তাঁকে পীড়িত করত। নজরুল ইসলামের ভাবনা, সংগ্রাম এবং সাহিত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাম নয়, তা একটি মানসিক অবস্থা—যেখানে মানুষ শৃঙ্খল ভাঙে, সাহসী হয়, আত্মত্যাগে বিশ্বাস করে, বিভেদ ভুলে ঐক্যের দিকে এগোয়। নজরুল সেই শৃঙ্খলভাঙা কণ্ঠস্বর, যিনি বলেন, “আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়মকানুন শৃঙ্খল!” এবং সত্যিই, তিনি সেসব ভেঙেই গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন দিনের স্বপ্ন, যা এখনও আমাদেরকে আলো দেখায়, দিশা দেয়, শক্তি জোগায়। তাঁর কলম আজও সময়ের প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে।

কাজী নজরুল ইসলাম, বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় নাম, যিনি তাঁর কাব্য, গদ্য, সংগীত ও সাংবাদিকতায় কেবল সাহিত্যিক বিপ্লব ঘটাননি, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক আপসহীন রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি রচনা করেন। তাঁর চিন্তা, বোধ, ও বিবেক সর্বদা এক বৃহত্তর মানবিক মুক্তির পক্ষে, সাম্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং সকল প্রকার শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে। তিনি ছিলেন এমন এক বিপ্লবী কণ্ঠ, যিনি তাঁর সমগ্র সৃষ্টিশীলতাকে সময়ের অস্ত্র করে তুলেছিলেন।

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক কঠিন সন্ধিক্ষণে নজরুলের আবির্ভাব। দেশ একদিকে ছিল ঔপনিবেশিক পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে ছিন্নভিন্ন হচ্ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ধারায়। হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ, ধর্মান্ধ রাজনীতি, রাজনৈতিক চাতুর্যের মুখোশ পরা সুবিধাবাদীরা দেশকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এক অন্ধগলির দিকে। এই সময় নজরুলের লেখা ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে উঠে আসে এক বিপ্লবী ভাষ্য। তিনি কেবল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কথা বলেননি, বরং ধর্মকে কেন্দ্র করে যারা জাতিকে ভাগ করে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এক যোদ্ধার মতো। তাঁর আহ্বান ছিল—

“সকল কালে সকল দেশে লাভ লোভকে জয় করিয়াছে তরুণ। ওগো বাংলার তরুণের দল ওগো আমার আগুন খেলার নির্ভীক ভাইরা, ঐ দশলক্ষ অকালমৃতের লাশ তোমাদের দুয়ারে দাঁড়াইয়া। তারা প্রতিকার চায়। তোমরা ঐ শকুনির দলের নও, তোমরা আগুনের শিখা, তোমাদের জাতি নাই। তোমরা আলোর, তোমরা পানের, তোমরা কল্যাণের। তোমরা বাহিরে এস, এই দুর্দিনে তাড়াও ঐ গো-ভাগাড়ে পড়া শকুনির দলকে।” (মন্দির ও মসজিদ : রুদ্রমঙ্গল)

এই আহ্বান নিছক আবেগের প্রকাশ নয়, এটি ছিল এক দুঃসময়ের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে দায়িত্ব অর্পণের ঘোষণা। যখন গোটা ভারতবর্ষ দাঙ্গা ও বিভেদের বিভীষিকায় জর্জরিত, যখন ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ মানুষকে আর চিনতে পারছে না, তখন নজরুল তাঁর লেখায় উচ্চারণ করেন মানবতার শ্রেষ্ঠত্বের কথা।

তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, তিনি কখনোই রাজনীতিকে ক্ষমতা দখলের একটি পন্থা হিসেবে দেখেননি। বরং রাজনীতি ছিল তাঁর কাছে নিপীড়িত, বঞ্চিত ও নিঃস্ব মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। এ কারণেই তিনি বারবার আপসহীন, দুর্বার আন্দোলনের কথা বলেছেন। মুজফ্ফর আহমদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, কীভাবে সেই সময় ‘তন্জীম’ বা হিন্দু-মুসলিম সংগঠনগুলোও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরোক্ষ অনুঘটকে পরিণত হয়েছিল। তিনি লিখেছেন, “এই জঘন্য আবহাওয়াকে ও সত্যকার দাঙ্গাকে সামনে রেখেই নজরুল ইসলাম তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনা করেছিল।” সেই কবিতার অন্তিম পঙক্তিতে নজরুল সমগ্র ভারতবর্ষের অন্তর কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন—

“‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।”

এই ‘মানুষ’—এই একটি শব্দে নজরুল জয়ের সূচনা করেছিলেন। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ নয়—তাঁর কাছে সর্বাগ্রে ছিল ‘মানুষ’ পরিচয়। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার উগ্রতায় যেখানে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের হারিয়ে ফেলছিল, সেখানে নজরুল স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন—ধর্মের আগে মানুষ হওয়াটাই মুখ্য, ধর্মের নামে বিভেদ নয়।

স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান ধারাটি যেখানে হয়ে উঠছিল আপসহীন এক ধরণের রাজনৈতিক সমঝোতার মঞ্চ, সেখানে নজরুল ছিলেন এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কণ্ঠ। তিনি বিশ্বাস করতেন না কেবল কূটনীতির আলোচনায় ব্রিটিশকে ভারতে ত্যাগে বাধ্য করা যাবে। তিনি জানতেন, সত্যিকারের স্বাধীনতা আসবে কেবলমাত্র আত্মবলিদান, ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও বিপ্লবী চেতনার মাধ্যমে। তাঁর লেখনীতে তাই উঠে এসেছে এক ভয়হীনতার ডাক, উঠে এসেছে সেই আত্মশক্তির ভাষ্য যা বলেছিল— “বিপ্লবের উন্মত্ততা, প্রতিবাদের স্পৃহাকে অস্ত্রবলে শান্ত করা যায়, কিন্তু আত্মশক্তিতে শক্তিমান জাতিকে চিরকাল অধীন করে রাখা বা তাকে জয় করা অত্যন্ত কঠিন।”

তাঁর কণ্ঠ ছিল সেই অবদমিত কণ্ঠস্বরের প্রকাশ, যাদের কখনোই কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন কৃষক, শ্রমিক, দলিত, দরিদ্র, অনাহারক্লিষ্ট সেই অসংখ্য মানুষের প্রতিনিধি, যাঁরা রাজনৈতিক বক্তৃতায় নেই, কিন্তু সংগ্রামের মূল শক্তি। তাঁর রচনাসমগ্র তাই হয়ে উঠেছিল এক জাতীয় অভ্যুত্থানের অনুরণন, এক সর্বজনীন বিপ্লবের ভাষা।

তাঁর ‘স্বরাজ’ ছিল নিছক স্বাধীনতা অর্জনের দাবি নয়। এটি ছিল এক নতুন সমাজ নির্মাণের প্রস্তাব। যেখানে থাকবে না শ্রেণির শোষণ, থাকবে না ধর্মের নামে বিদ্বেষ, থাকবে না জাতপাতের গোঁড়ামি, থাকবে না লিঙ্গ বৈষম্যের খাঁচা। নজরুল বারবার বলেছেন, রাজনীতি যদি কেবল একদল শাসককে তাড়িয়ে আরেক দলকে বসানোর চক্রে আবদ্ধ থাকে, তবে তার ফল কখনোই প্রকৃত মুক্তি নয়। সেই শাসক দেশি হোক বা বিদেশি—যদি সে শোষক হয়, তবে তার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করতে হবে। এটাই নজরুলের রাজনৈতিক দর্শনের হৃদয়।

আজ, স্বাধীনতার সাত দশক পরে, আমরা যখন দেখি শোষণ এখনও বিদ্যমান—রূপ পাল্টে, পরিধি বাড়িয়ে; যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা আবার নতুন মোড়কে আবির্ভূত হয়; যখন রাজনীতি হয়ে দাঁড়ায় কেবল ক্ষমতার খেলা এবং গণতন্ত্রের নামে চলে গণবঞ্চনা, তখন নজরুলের চিন্তা, তাঁর উচ্চারণ আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।

তিনি চেয়েছিলেন সেই সমাজ, যেখানে থাকবে “সাম্যের গান”—

“গাহি সাম্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান।”

এই সাম্য, এই সহাবস্থান, এই মানবিক আদর্শের জন্য আজও আমরা তাঁর দিকে ফিরে তাকাই। নজরুল শুধুই কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন সময়ের সাক্ষ্যবাহক, ছিলেন বিপ্লবের অনুরাগী, ছিলেন এক জাতির অভ্যন্তরীণ আত্মসন্ধানের আলোকবর্তিকা। তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের আগ্নেয়গর্জন, তাঁর দৃষ্টিতে ছিল এক শোষণহীন আগামী দিনের স্বপ্ন।

সেই স্বপ্ন আজও পূর্ণ হয়নি। কিন্তু নজরুলের লেখা, তাঁর ভাবনা, তাঁর দ্রোহ আর ভালোবাসা—তারা আজও আমাদের পথ দেখায়। সেই কারণেই আজও আমাদের উচ্চারণ করতে হয় তাঁরই কণ্ঠে—
“আমার ধর্ম, আমার দেশ, আমার সমাজ—সাম্য, সাম্য, সাম্য!”

এটাই নজরুল। আমাদের ইতিহাসের অন্তর্জ্বলন্ত দীপ্তি। এক সত্যচেতন বিপ্লবীর নির্মম সুন্দর ভাষা। একজন কবি, যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন শুধু নয়, স্বপ্নকে লালন করতে চেয়েছিলেন রক্ত দিয়ে, অগ্নিবীণা হাতে। আমরা সেই আগুনের উত্তরসূরি।

‘ধূমকেতু’র ইতিহাস

ভারতের জাতীয় ইতিহাসের যে অধ্যায়ে কবিতা, বিপ্লব ও সাংবাদিকতা একে অপরের সহযাত্রী হয়ে উঠেছিল, সেই সময়ের অন্যতম প্রতীক কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জীবন, রচনা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—এই তিনটি স্তম্ভেই প্রবাহিত হয়েছে এক মহাবিদ্রোহের অগ্নিশিখা। সাম্রাজ্যবাদ, ধর্মান্ধতা, সামাজিক বৈষম্য ও আত্মজ্ঞানহীন অনুকরণের বিরুদ্ধে তাঁর জাগরণ ছিল সময়ের অন্যতম প্রগতিশীল প্রতিক্রিয়া। এই পরিপ্রেক্ষিতে চিত্তরঞ্জন দাশ, বাসন্তী দেবী, মুজফ্ফর আহমদ ও মওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখদের সঙ্গে তাঁর আন্তঃসম্পর্ক ও সাহিত্যিক অবদান নিঃসন্দেহে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতা। ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি আইন অমান্য করে গ্রেপ্তার হন। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের সামাজিক ও সাংবিধানিক কাঠামোকে অস্বীকার করে ভারতীয় জনগণের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। ১০ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে বিচার সম্পন্ন হয় এবং ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এই সময়েই তাঁর সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বাঙ্গলার কথা’–এর সম্পাদনার দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর সহধর্মিণী বাসন্তী দেবীর উপর। বাসন্তী দেবী নিজেও ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক, যাঁর রাজনৈতিক প্রত্যয় ও সাংস্কৃতিক বোধ ছিল একবিংশ শতাব্দীর বহু নারী সমাজের চেয়েও অগ্রসর।

এই সংকটময় সময়ে বাসন্তী দেবী তাঁর পত্রিকার জন্য নজরুল ইসলামের সহযোগিতা কামনা করেন। তাঁর পক্ষে চিত্তরঞ্জন দাশের ভাই সুকুমার রঞ্জন দাশ নজরুলের কাছে যান এবং কবিতা চেয়ে বসেন। তখন নজরুল অবস্থান করছিলেন তালতলার ৩/৪ বি লেনের বাড়িতে, মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে। সেখানে তাঁদের প্রতিদিনের জীবনে ছিল আলোচনা, লেখালেখি, রাজনৈতিক ভাবনার আদান-প্রদান। ‘উপাসনা’ পত্রিকার অফিসে সুকুমার রঞ্জন নজরুলের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে বাসন্তী দেবীর নিমন্ত্রণও জানান।

এই পরিস্থিতিতে বসেই নজরুল সৃষ্টি করেন তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কবিতা ‘ভাঙার গান’। মুজফ্ফর আহমদ তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, নজরুল বসে বসে লিখছিলেন আর সুকুমার রঞ্জনের সঙ্গে তিনি গল্পে মগ্ন ছিলেন। কবিতা রচনার কাজ শেষ করে নজরুল কবিতাটি হাতে তুলে দেন, যা পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় ‘বাঙ্গলার কথা’ পত্রিকার ১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারির সংখ্যায়।

ভাঙার গান কবিতাটি ছিল নিছক এক বিপ্লবাত্মক কবিতা নয়, এটি ছিল কারা-অন্তরীণ বিপ্লবীদের মুক্তির জন্য এক কাব্যিক ঘোষণা। এর প্রতিটি পঙ্‌ক্তি যেন কারাগারের দেয়াল কাঁপিয়ে দেওয়ার মত জোরালো, ভাষার চেয়ে তার ধ্বনি ছিল অধিক কার্যকর। এটি নিছক সাহস বা রোমাঞ্চের কবিতা নয়, এটি ছিল রক্ত-জমাট, আক্রোশ-ভরা সময়ের মুখপাত্র।

এই কবিতা প্রকাশের সময় নজরুল ছিলেন জীবনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে। ১৯২০ সাল থেকে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে তালতলার বাড়িতে ছিলেন। তবে এর মধ্যে কুমিল্লা গমন, নার্গিসের সঙ্গে বিবাহ, ও হাওয়া পরিবর্তনের মতো কারণে কিছু সময়ের ব্যবধান রয়েছে। প্রায় দেড় বছর তাঁরা একত্রে ছিলেন—যা শুধু একটি বাসস্থান ভাগাভাগি নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক সহযাত্রার এক সজীব কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ নজরুল কুমিল্লায় চলে যান। সেখানে তিনি ছিলেন প্রায় চার মাস। এ সময়ের মধ্যে তাঁর পরিবার ও দাম্পত্য জীবনে নানা টানাপোড়েন চলছিল, আবার মনের গভীরে একটি ব্যাকুল সাহিত্যিক বিস্ফোরণও তৈরি হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে কলকাতা থেকে তাঁর কাছে বার্তা আসে। এই বার্তাটি কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ নয়, বরং ছিল এক আকুল আহ্বান। ‘সেবক’ পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁকে ফিরতে অনুরোধ জানানো হয়।

এই ‘সেবক’ পত্রিকার পেছনে ছিলেন বাংলার একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিক মওলানা আকরাম খাঁ। তিনি ছিলেন বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের নবজাগরণের পথিকৃৎ, যিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়তে চেয়েছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় ‘সেবক’ পত্রিকার জন্ম হয় ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে। পত্রিকাটি জাতীয়তাবাদী চেতনার বাহক হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তার নামকরণ ছিল ইংরেজি ‘The Servant’–এর ভাবানুবর্তী। এটি ছিল রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রতিবাদ ও সংবাদ বিশ্লেষণের একটি সাপ্তাহিক নয়, দৈনিক মুখপত্র, যা সত্যিকারের এক বিপ্লবী সাংবাদিকতার ধারা রচনা করেছিল।

তবে ১৯২২ সালের মাঝামাঝি এসে যখন অসহযোগ আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে, তখন ‘সেবক’ পত্রিকাও তার গতি হারাতে থাকে। গণ-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পত্রপত্রিকার প্রাণশক্তি ছিল জনতার অংশগ্রহণ। আন্দোলন স্তিমিত হওয়ায় এর প্রতিফলন পড়ে পত্রিকার চাহিদাতেও।

নজরুলের এই কুমিল্লা ত্যাগ ও কলকাতায় প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়, এটি ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তিনি যে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ভূমিকায় নিজের পথ তৈরি করছিলেন, তার পরবর্তী বিস্ফোরণ ছিল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা।

এই ধূমকেতুর মাধ্যমে নজরুল কেবল কবিতা বা রম্যরচনা লিখেননি, বরং সেখানে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অনমনীয় রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মনোভাব, শোষণের বিরুদ্ধে অবিচল প্রতিবাদ। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদকীয় রচনার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এমন এক ভাষা, যা তৎকালীন ভারতীয় সংবাদপত্র জগতে বিরল ছিল।

চেতনায় চিত্তরঞ্জন দাশ, সাহসে বাসন্তী দেবী, বুদ্ধিতে আকরাম খাঁ, নির্ভরতায় মুজফ্ফর আহমদ—এই মানুষদের সাহচর্যে থেকে নজরুল গড়েছিলেন নিজের সেই ব্যক্তিত্ব, যার ভাষা হয় গর্জন, যার লেখা হয় জাগরণ। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতো বাংলার সকল বন্দী হৃদয়ের আর্তি, তাঁর কলমে ফুটে উঠত জাতির অবদমিত চেতনার মুক্তি।

এইসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে নজরুল হয়ে উঠেছিলেন জাতির প্রহরী, ইতিহাসের বর্ণময় বিপ্লবী। ‘ভাঙার গান’ যেন তারই প্রতিধ্বনি—
একটি কবিতা নয়,
একটি কাঁপন
একটি মহাকাল।

তাই নজরুল যখন লিখেন—

“লাথি মার, ভাঙ্ রে তালা।
যত সব বন্দি-শালায়—
আগুন জ্বালা,
আগুন জ্বালা, ফেল্ উপাড়ি।”

তখন তা কেবল কবিতার ভাষা নয়, তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের ভাষ্য। তাঁর কবিতা, সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক দর্শন সবকিছু মিলেই গড়ে তুলেছিল এক অপ্রতিরোধ্য বিদ্রোহী, যে আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে।

নজরুল ইসলামের জীবনের এক অনন্য সময়চিত্র ধরা পড়ে ১৯২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যখন তিনি ‘সেবক’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। এটি নিছক একটি চাকরি গ্রহণের ঘটনা ছিল না; বরং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে তা ছিল এক বিশেষ অভিঘাতময় অধ্যায়। তখন ভারতব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ধারা ক্রমেই ম্রিয়মাণ, নেতৃত্বগণ জেলবন্দি কিংবা গৃহবন্দি, এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার স্থানে এক ধরণের সংশয় ও নিঃসঙ্গতা গ্রাস করছিল জনমানসকে। এই সংকটকালে সংবাদপত্রগুলির ভূমিকাও অনেকাংশে সীমিত হয়ে পড়ছিল।

মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, যিনি ছিলেন ‘সেবক’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও মূল প্রেরণাসূত্র, ১৯২২ সালের প্রথম দিকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪(এ) ধারায় রাজদ্রোহের অভিযোগে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তাঁর এই গ্রেপ্তার সংবাদপত্রটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। সে সময়ে সম্পাদনার দায় এসে পড়ে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলির কাঁধে, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দীপনার মন্দায় এবং আকরাম খাঁ-র অনুপস্থিতিতে ‘সেবক’-এর প্রভাব ক্রমেই ক্ষীণ হতে থাকে। পত্রিকার বিক্রি কমে যায়, পাঠক আগ্রহ হারাতে থাকে।

ঠিক এই সময়েই ওয়াজেদ আলি নজরুল ইসলামের কথা ভাবেন। নজরুল তখন কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের আতিথ্যে। তাঁর কবি-খ্যাতি তখন তুঙ্গে, এবং তাঁর লেখার জ্বালাময় ভঙ্গি জনসচেতনায় আগুন ধরিয়ে দিতে পারত। এই বিশ্বাসে ওয়াজেদ আলি নজরুলের কাছে এক আন্তরিক পত্র পাঠান। সেই চিঠিতে তাঁকে কলকাতায় ফিরে এসে পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয় এবং বেতনের পরিমাণও নির্ধারিত হয় মাসিক একশত টাকা। এই তথ্য মেলে মুজাফফর আহমদের ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে।

নজরুল সেই ডাকে সাড়া দেন। মে মাসের শেষ কিংবা জুনের গোড়ার দিকে তিনি কলকাতায় ফিরে এসে ‘সেবক’-এ যোগ দেন। তাঁর আগমনে যেন অফিসে প্রাণের জোয়ার বইতে থাকে। তাঁর উপস্থিতি, প্রাণচাঞ্চল্য, গানে-আবৃত্তিতে ও কথোপকথনে অফিস ঘরটি হয়ে ওঠে এক প্রকার সৃজনশীল চৌম্বকক্ষেত্র। পত্রিকা অফিস হয়ে ওঠে যেন একটি সাহিত্যিক আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। দুপুরের আহার, লেখালেখির আলোচনা কিংবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রসঙ্গ—সব কিছুতেই নজরুলের ছিল প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ।

এই প্রেক্ষিতে আবুল কালাম শামসুদ্দীন স্মরণ করেছেন, “নজরুল ইসলামের প্রতিভার ছোঁয়ায় ‘সেবক’-এর চেহারার নবরূপ দৈনিক কাগজের পাঠকদের আগ্রহ দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। বিশেষ করে সংবাদসমূহের হেডিং-এর কবিতাময় রূপটাই সংবাদপত্র পাঠকদের মনকে আকর্ষণ করলো বেশী।” তাঁর কবিত্বপূর্ণ শিরোনাম এবং ক্ষুরধার ভাষায় রচিত সম্পাদকীয় অনেক পাঠকের কাছে এক নবধারা হয়ে দেখা দেয়।

তবে, এই আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। নজরুলের স্বভাবজাত স্বাধীনচেতা মন বাঁধাধরা নিয়মকানুনে বেশিদিন আটকে থাকেনি। প্রথম কয়েকদিন নিয়মিত অফিসে আসা-যাওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। কখনও অনুপস্থিত, আবার কখনও হঠাৎ এসে অল্প সময় কাটিয়ে চলে যান। তাঁর স্বভাবই ছিল মুক্তপাখির মতো, নিয়ম-শৃঙ্খলার কারাগারে তাঁকে আটকে রাখা সম্ভব ছিল না। নজরুল গবেষক আব্দুল আযীয আল আমান লিখেছেন, ‘সেবকে’ যোগ দিয়ে তিনি অফিস-ডিসিপ্লিন বা নিয়ম-কানুনের বাধানিষেধের দিকে বরাবরই প্রশ্ন তুলেছিলেন। সুতরাং বলা চলে, ‘সেবক’ তাঁকে মানসিকভাবে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

ঠিক এমন এক সময় ঘটে যায় এক শোকাবহ ঘটনা—২৫ জুন, ১৯২২ সালের রাত। বাংলা কাব্যজগতের অন্যতম প্রতিভাধর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন রাত আড়াইটায়। এ খবর নজরুলকে আঘাত করে গভীরভাবে। তাঁদের মধ্যে ছিল হৃদ্যতার সম্পর্ক, সাহিত্যিক সহমর্মিতা। নজরুল পরদিন সকালে নির্ধারিত সময়েই ‘সেবক’ অফিসে পৌঁছান এবং ঘোষণা দেন যে, সেদিনের সম্পাদকীয় নিবন্ধটি তিনি নিজেই লিখবেন। তাঁর আবেগ ও আন্তরিকতায় সহকর্মীরা আপ্লুত হন।

নজরুল লিখে ফেলেন এক সুদীর্ঘ, অন্তর্দীপ্ত, শোকপ্রবণ সম্পাদকীয়। এটি ছিল নিছক প্রথাগত শোকবার্তা নয়—বরং একজন বিদগ্ধ কবির প্রতি এক উন্মোচনপ্রবণ শ্রদ্ধার্ঘ্য। ঠিক এই সময়ে নজরুল সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘খাঁচার পাখী’ কবিতার প্রতিক্রিয়ায় রচনা করেন কবিতা ‘দিল-দরদী’, যেখানে তিনি লেখেন—

“কে ভাই তুমি সজল গলায়
গাইলে গজল আফসোসের?”

এছাড়াও সেদিন সন্ধ্যায় কলকাতার স্টুডেন্টস হলে নজরুল গান গেয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন—‘চল চঞ্চল বাণীর দুলাল’। ‘ভারতী’ পত্রিকার সত্যেন্দ্রনাথ স্মরণ সংখ্যায় তিনি লেখেন—

“আজ আষাঢ়-মেঘের কালো কাফনের আড়ালে মু’খানি ঢাকি
আহা কে তুমি জননী কার নাম ধরে বারে বারে যাও ডাকি?”

এই কবিতা পরে ‘বিজলী’ পত্রিকাতেও পুনর্মুদ্রিত হয়। উপরন্তু তিনি লেখেন আরও দুটি কবিতা—‘সত্য-কবি’ ও ‘সত্যেন্দ্র প্রয়াণ গীতি’। তন্মধ্যে একটিতে তিনি বলেন—

“অসত্য যত রহিল পড়িয়া, সত্য সে গেল চলে
বীরের মতন মরণ-কারারে চরণের তলে দলে।”

এবং

“চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসেছিল পথ ভুলে,
ওগো এই গঙ্গার কূলে।
দিশাহারা মাতা দিশা পেয়ে তাই নিয়ে গেছে কোলে তুলে
ওগো এই গঙ্গার কূলে।”

কিন্তু সমস্যা দেখা দিল সম্পাদকীয় প্রকাশের প্রক্রিয়ায়। নজরুল যে ভাবপ্রবণ লেখা জমা দিয়েছিলেন, তা ছাপানোর আগে কিছুটা সংশোধন করা হয়। সম্পাদকীয় কর্তৃপক্ষ মনে করেছিলেন, লেখায় কিছু অত্যুক্তি রয়েছে, যা ‘সেবক’-এর মতো গাম্ভীর্যপূর্ণ পত্রিকায় প্রকাশ অনুচিত। তাঁরা তাই শব্দ পরিবর্তন করে কম্পোজ করতে দেন, এমনকি প্রুফ দেখার সময়ও আরও কিছু সংশোধন করা হয়।

নজরুল এই হস্তক্ষেপকে মর্মান্তিকভাবে গ্রহণ করেন। লেখার অন্তরস্থ আত্মা যে রূপে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন, সেই ভাষ্য যখন পরিবর্তিত হয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছাল, তখন তিনি এক গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন হন। তাঁর সাহিত্যসত্তার কাছে এটি ছিল একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা।

এই দুঃখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন পত্রিকার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখবেন না। পরদিন তিনি আর অফিসে যাননি। সহযোগী সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন লিখেছেন, “পরদিন আমাদের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হল। সেই যে নজরুল ডুব দিলেন, আর আমাদের আপিস-মুখো কখনো হলেন না।” এবং মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলি লিখেছেন, “পরের দিন ডাকে নজরুলের পদত্যাগ পত্র পাওয়া গেল।”

এইভাবে শেষ হয় নজরুলের ‘সেবক’ অধ্যায়—একটি ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক সময়ের সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যময় অধ্যায়। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ় করেছিল নিজের স্বর ও অবস্থানে। পরবর্তীতে তিনি গড়ে তোলেন ধূমকেতু পত্রিকা—যেখানে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতায় প্রকাশ করতে পারেন নিজের বিদ্রোহ, ভালোবাসা, এবং গণমুখী চেতনা। ‘সেবক’ ছিল সেই অনির্বাণ অগ্নিশিখার প্রথম অস্বস্তিকর স্পর্শ, যার উষ্ণতা তাঁকে নিজস্ব পথ খুঁজে নিতে সহায়তা করেছিল।

 সেবক পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পর কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে শুরু হয় এক অনিশ্চিত অধ্যায়। কবি, সংগীতস্রষ্টা, বিপ্লবী—এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী একজন মানুষ, যিনি সদ্যই বাংলা সাংবাদিকতার এক প্রবল রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করেছিলেন, তিনি হঠাৎ করেই হয়ে পড়েন পত্রিকা-সম্পাদনার কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। ‘সেবক’ পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে নিজের ভাবনাকে প্রকাশের যে সুযোগ ছিল, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর সৃজনশীল মন যেন একটা নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। কিছুদিন যেন এক অন্তর্লীন দোলাচলে কাটে—নিয়মিত কোনো রোজগার নেই, নেই কোনো নিশ্চিত কর্মসূত্র। অথচ বিপ্লবী চেতনা, ভেতরে জমে থাকা প্রতিবাদের আগুন, শব্দ ও সুরে দগ্ধ হয়ে ওঠা কবিসত্তা—সব মিলিয়ে তিনি যেন এক অস্থির নদীর মতো।

এই সময়ে নজরুলের জীবনযাপন ছিল মূলত আড্ডা, গান, কবিতা ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোয় সীমাবদ্ধ। তাঁর চারপাশে ছিল কিছু আত্মীয়স্বজন ও সহযোদ্ধা, যারা বুঝতেন নজরুল কী খুঁজছেন, কী চান। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবন মানেই ছিল প্রতিনিয়ত অভ্যুত্থান—ভাবনার, সুরের, শব্দের, প্রতিবাদের। তাই এই কাজহীন সময় তাঁর জন্য ছিল এক ধরনের অভ্যন্তরীণ রুদ্ধশ্বাস অবস্থান, যেখানে তিনি নিরন্তর খুঁজে যাচ্ছিলেন একটি মাধ্যম—একটি মুক্ত প্ল্যাটফর্ম—যেখানে তিনি নির্ভয়ে, অকপটে, নিরবিচারে তাঁর মত, মনন ও দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরতে পারেন।

ঠিক এমন সময়ই নজরুলের জীবনে হাজির হন মাসউদ আহমদ। তিনি একজন উৎসাহী, স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি, যিনি সমাজে একটি সাহসী ও নতুন কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। মাসউদ আহমদের পূর্বপরিচয় ছিল মুজাফফর আহমদের সঙ্গে। সেখানেই তিনি তাঁর প্রথম প্রস্তাব দেন—একটি নতুন সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা। কিন্তু মুজাফফর আহমদ, যিনি বাস্তবতাকে বড় বেশি গুরুত্ব দিতেন, সে প্রস্তাবে সাড়া দেননি। হয়তো তাঁর মনে হয়েছিল এই রকম একটি বিপ্লবাত্মক পরিকল্পনা তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে টিকবে না, কিংবা হয়তো আর্থিক সঙ্গতির অভাবেই প্রস্তাবটি অবাস্তব ঠেকেছিল।

তবে মাসউদ আহমদ ছিলেন জেদি মানুষ। তিনি বুঝেছিলেন, তাঁর প্রস্তাবের যথার্থতা বোঝার জন্য প্রয়োজন এমন একজন সাহসী ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের, যিনি নিজের বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করতে পারেন। তাই তিনি যান কাজী নজরুল ইসলামের কাছে। এবং অবাক করার মতো ঘটনা ঘটে—নজরুল কোনো চিন্তা, জিজ্ঞাসা কিংবা প্রশ্ন না করেই সেই প্রস্তাবে সাড়া দেন। কেননা এ প্রস্তাব তাঁর কাছে ছিল এক আত্মার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিলেন এমন একটি পত্রিকা, যার মালিকানা থাকবে তাঁর নিজের হাতে, যার প্রতিটি পাতায় তিনি রাখতে পারবেন নিজের দ্রোহী ভাবনার প্রতিফলন।

নজরুল জানতেন, এই নতুন পত্রিকাটি কেবল আরেকটি সাময়িকপত্র নয়, বরং হবে একটি জনপদের নিঃশব্দ কণ্ঠস্বরের সশব্দ ভাষ্য। তিনি বুঝেছিলেন, উপমহাদেশের মুসলমান ও হিন্দুদের অন্তরের ব্যথা, শোষণের ইতিহাস, রাজনৈতিক অবিচার—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য চাই একটি সুনির্দিষ্ট মাধ্যমে, আর তা কেবল সংবাদপত্রই হতে পারে। সেই পত্রিকাই তাঁকে এনে দেবে সেই ভাষা, যাকে তিনি বারুদের মতো ব্যবহার করতে পারবেন। এই বোধই তাঁকে মুহূর্তে অনুপ্রাণিত করে তোলে।

এই পত্রিকা হবে নতুন, অনন্য এবং সাহসী। এখানে থাকবে না কোনো সংযম বা আত্ম censuring। পত্রিকাটি হবে দ্রোহের প্রতীক, বিদ্রোহের ভাষ্য, নিপীড়িতের মুখপত্র। নজরুল এই পত্রিকার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ, মৌলবাদ, সমাজের কুসংস্কার, ধনীদের শ্রেণিবিভাজন—সব কিছুর বিরুদ্ধে কলম ধরবেন। এই পরিকল্পনার কথা শুনে তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁর নিজের জীবনের যে অর্ধেক স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল ‘সেবক’-এর পাতায়, সেটি এবার সম্পূর্ণ করা যাবে।

তাঁর মনের ভিতরে জমে থাকা অভিমান, ক্ষোভ, ভালোবাসা ও আদর্শ এবার কলমে বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। আর এই প্রস্তাব ছিল তার উপযুক্ত সুযোগ। পত্রিকাটির কোনো সরকারি অনুদান ছিল না, কোনো বড় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের ছায়া ছিল না, কোনো বড় রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়াও ছিল না। তবু নজরুল রাজি হয়ে যান, কারণ এই পত্রিকা তাঁর মনে সাহস জুগিয়েছিল। মাসউদ আহমদের চিন্তার সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের স্পন্দন যেন একাত্ম হয়ে উঠেছিল। এখানে ছিল অন্তর থেকে উচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা, ছিল বিশ্বাস—একটি সত্য, স্বাধীন, দ্রোহী কণ্ঠস্বরের।

এরপর নজরুল উঠে পড়ে লাগলেন পত্রিকার প্রস্তুতির কাজে। তিনি নিজেই ঠিক করলেন নাম, রচনার ধরন, কাগজের ধরন, কাভার পেজ, এমনকি মুদ্রণের টাইপ পর্যন্ত। তাঁর জীবনের এই পর্বে তিনি বুঝেছিলেন, স্বাধীনতাই সবচেয়ে বড় সাহিত্য। এবং এই উপলব্ধিই তাঁকে নতুন করে তৈরি করল সেই দৈত্যাত্মা কবিতে, যাঁর একেকটি বাক্য, একেকটি ছত্র, একেকটি গদ্য প্রবন্ধ হয়ে উঠবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বুকে তীব্র ধ্বনিত বিদ্রোহের ঝড়।

এইভাবেই গড়ে উঠেছিল ‘ধূমকেতু’—কাজী নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিস্ফোরণ। যার জন্ম কিন্তু হয়েছিল ঠিক এইখানেই, ‘সেবক’ পত্রিকার ব্যর্থতা, একটি প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাব, এবং এক জেদি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক বিদ্রোহী কবির চেতনার মিলনে।

‘ধুমকেতু’র নামকরণ

ধূমকেতু প্রকাশের পেছনে যে তীব্র এক ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক অভিঘাত কাজ করেছিল, তা নজরুল ইসলাম নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন তাঁর কলমে, তাঁর কণ্ঠে, এবং ধূমকেতুর প্রতিটি সংখ্যায়। এই পত্রিকা ছিল কেবল একটি সাহিত্যিক বা সাংবাদিক প্রয়াস নয়, বরং ছিল উপনিবেশিক শৃঙ্খল ছিন্ন করার এক আত্মিক উচ্চারণ, এক দুঃসাহসিক বিপ্লবী প্রচেষ্টা। পত্রিকাটি প্রকাশের আগমুহূর্ত পর্যন্ত নজরুল তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এই পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা করেননি। এমনকি তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ মিত্র, সংগ্রামী সহচর এবং সাহিত্যসঙ্গী মুজাফফর আহমদের সঙ্গেও এ নিয়ে পরামর্শ করেননি। এর পেছনে ছিল এক অতল বিশ্বাস ও সমান দুঃসাহস। তিনি জানতেন, মুজাফফর আহমদ যদি আগে থেকে জেনে ফেলেন, তবে পত্রিকার সম্ভাব্য দুর্বল দিক, আর্থিক জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক ঝুঁকি ইত্যাদি বিবেচনায় তাকে নিরুৎসাহিত করতে পারেন। ফলে নজরুল নিজেই একাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, পরিকল্পনা করেন এবং বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর একমাত্র ভরসা ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের কলমের শক্তি।

পত্রিকার নামকরণ নিয়েও ছিল এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। মাসউদ আহমদ প্রাথমিকভাবে ‘সাপ্তাহিক’ আকারে প্রকাশের প্রস্তাব দিলেও নজরুল সিদ্ধান্ত নেন এটি ‘অর্ধ-সাপ্তাহিক’ হবে, অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে দুই বার প্রকাশিত হবে। এই নাম তিনি নিজেই স্থির করেন— ‘ধূমকেতু’। নামটি ছিল চরম প্রতীকী, যেমনি জ্বলন্ত এক মহাজাগতিক উল্কাপিণ্ড, তেমনি এক সাংকেতিক বিপ্লবের আহ্বায়ক। তাঁর কল্পনায় ধূমকেতু ছিল এক অগ্নিসেতু, যা অন্ধকার ভেদ করে আসবে এবং সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নের সকল প্রাচীর ধ্বংস করে দেবে।

প্রথম সংখ্যার প্রস্তুতিপর্বে সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হলেন কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই— নিজের ভাষায় ‘সারথি’। ম্যানেজারের দায়িত্বে এলেন শান্তিপদ সিংহ এবং প্রকাশক হিসেবে নাম নথিভুক্ত হলেন আফজালুল হক। প্রেস ছিল কলকাতার বিখ্যাত মণি ঘোষের মালিকানাধীন মেটকাফ প্রেস। পত্রিকাটি ছাপা হত সেখানেই। কাগজ সরবরাহ করতেন উত্তরপাড়ার সুবোধ মুখোপাধ্যায়, যাঁর সঙ্গে চুক্তি হয় এই মর্মে যে, প্রতিটি সংখ্যার কাগজের মূল্য পরবর্তী সংখ্যার সময় পরিশোধ করা হবে। অফিসের ঠিকানা নির্ধারিত হয় ৩২, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা। পত্রিকার মালিকানা ও প্রকাশকের নাম ছিল নজরুল ইসলাম।

ধূমকেতুর আত্মপ্রকাশের আগমুহূর্তে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় নজরুল এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন—

শীঘ্রই প্রলয়ঙ্কর
ধূমকেতু
দেখা দিবে।
হুঁশিয়ার হউন।

এই একরত্তি বিজ্ঞাপনেই ছিল এক ঝাঁঝালো ঘোষণা— এটি কোনো সাধারণ সাহিত্যপত্র নয়, বরং আসন্ন প্রলয়ের বার্তাবাহী। এরপর শুরু হয় প্রচ্ছদ পরিকল্পনা। পত্রিকার প্রচ্ছদে অঙ্কিত হল এক জ্বলন্ত ধূমকেতুর ছবি— এক তীব্র শিখার মতো ধাবমান মহাজাগতিক বস্তু, যেটি যেন ছুটে যাচ্ছে সমস্ত স্থিতধী গ্রহের ভারসাম্য ধ্বংস করতে। এই ছবি এঁকেছিলেন চারু রায়।

ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যায় আশীর্বাদবাণী পাঠাতে নজরুল নিজ হাতে চিঠি লিখে প্রেরণ করেন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে। যাঁদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, সরোজিনী ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিসুন্দরী ঘোষ, বিরজাসুন্দরী দেবী, কালিদাস রায়, সত্যানন্দ, অতীন্দ্র রায়, প্রসন্নকুমার সমাদ্দার, নারায়ণদাস চট্টোপাধ্যায়, বিদ্যাভূষণ ভাগবতরত্ন, শক্তিপদ ভট্টাচার্য, শরৎচন্দ্র পণ্ডিত এবং ফজলুল হক সেলবর্মী। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আশীর্বাদবাণীটি এসেছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে। এই বাণী নজরুলীয় শৈলীতেই লেখা—

কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,
আয় চলে আয় রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন৷
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।
২৪ শ্রাবণ, ১৩২৯
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই বাণী আসার সময় একটি নমুনা সংখ্যা ইতিমধ্যেই ছাপা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাণীটি এতই অনন্য ও মহিমান্বিত ছিল যে পুনরায় ছাপা ছাড়া উপায় রইল না। পত্রিকার মূল সম্পাদকীয় স্তম্ভের ঠিক উপরে এই বাণীটি ছাপা হল, যেন সম্রাটের মুকুটে বসানো হল কোহিনূর রত্ন।

পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট, শুক্রবার। বাংলা তারিখ অনুযায়ী তা ছিল ২৬ শ্রাবণ ১৩২৯। কাগজটি ছিল ১৫ বাই ২০ ইঞ্চি মাপের, মোট ১৬ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট। প্রতিটি পৃষ্ঠা চারটি করে কলামে বিভক্ত ছিল। প্রথম সংখ্যার রাতটি ছিল উত্তেজনা ও উদ্দীপনায় ভরা। আবদুল আযীয আল আমান লিখেছেন, “সে দিনের রাতটি এক অবিস্মরণীয় রাত। হক সাহেবের মুখে জানা গেল, কবির সে কী আনন্দ, সে কী উন্মাদনা। কবির সঙ্গে হক সাহেবও সারারাত মেটকাফ প্রেসে জেগে কাটিয়ে দিলেন। কবি ও হক সাহেব মাঝে মাঝে প্রুফ দেখছেন। প্রুফ না থাকলে গান গেয়ে প্রেসের কর্মীবৃন্দের আনন্দ দেন, হৈ-হুল্লোড় করে কম্পোজিটারদের নিদ্রা থেকে দূরে রাখেন। ….সে রাতে মেটকাফ প্রেসের মধ্যে একটা আনন্দ ও উদ্মাদনার ঝড় বয়ে গেল।” (ধুমকেতুর নজরুল, আব্দুল আযীয আল আমান, হরফ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৩০)

প্রথম সংখ্যাতেই নজরুল লিখলেন তাঁর যুগান্তকারী পরিচয়ধর্মী কবিতা—

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
ঐ স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত সাতশ নরক জ্বালা জ্বলে মম ললাটে,
মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রি নয়ন ঘন ঘোলাটে!
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ
আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার
আর মর্ত্যে সাহারা-গোবী-ছাপ
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ।

সঙ্গে ছিল অনলবর্ষী সম্পাদকীয়, যার শিরোনাম ‘সারথির পথের খবর’। তাতে তিনি ঘোষণা করেন,

“মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে জয় জয় প্রলয়ঙ্কর বলে ধূমকেতু’কে রথ ক’রে আবার আজ নতুন পথে যাত্রা শুরু হল। আমার কর্ণধার আমি। আমার পথ দেখাবে আমার সত্য। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি— নমস্কার করছি আমার সত্যকে।”

এইভাবে ‘ধূমকেতু’ হয়ে উঠেছিল কেবল একটি পত্রিকার নাম নয়, বরং একটি চেতনা, এক মহাসময়ের কাব্যিক ও বিপ্লবী উচ্চারণ। যা ইতিহাসের অক্ষরে অক্ষরে চিহ্নিত হয়ে আছে আজও।

‘ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যায় ‘শানাই-এর পো’ বিভাগে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। এই পুনর্মুদ্রণের সঙ্গে একটি কৈফিয়ত সংযুক্ত করা হয়, যা সহকারী সম্পাদকের নামে ছাপা হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল: “এই কবিতাটি প্রথমে ‘মোসলেম ভারতে’ বের হয়। পরে এটা ‘বিজলী’, ‘প্রবাসী’ প্রভৃতি পত্রিকায় উদ্ধৃত হয়। অনেক পাঠক কবিতাটি সম্পূর্ণরূপে পাবার জন্যে ঐ সংখ্যার ‘মোসলেম ভারত’ কিনতে গিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন; কেননা ঐ সংখ্যার পত্রিকা এত বেশী নগদ বিক্ৰী হ’য়ে গেছে যে ‘মোসলেম ভারত’-এর গ্রাহকগণ ছাড়া এখন আর কাকেও দেওয়া যাচ্ছে না। সেইজন্য অনেকের অনুরোধে আবার কবিতাটি ‘ধুমকেতু’তে উদ্ধৃত করে দিলাম। প্রার্থনা, কেউ যেন এটা আমাদের ধৃষ্টতা বলে মনে না করেন।”

১৯২২ সালের ১১ আগস্ট, শুক্রবারের সকাল। এক নতুন সূর্য উঠল বাংলার সাহিত্যজগতে, নাম তার ‘ধূমকেতু’। এটি কেবল একটি পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ছিল না, ছিল এক যুগান্তকারী আবির্ভাব। সম্পাদক ছিলেন নজরুল ইসলাম, যিনি আগেই বিদ্রোহের ভাষা তৈরি করে ফেলেছেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে, এবং প্রকাশক ছিলেন আফজালুল হক। ধূমকেতুর প্রথম হকার ছিলেন আবদুল্লা নামে এক তরুণ, যিনি এক গুচ্ছ পত্রিকা নিয়ে ছুটে যান হাওড়া স্টেশনের দিকে। প্রত্যাবর্তনের সময় তাঁর মুখে ছিল পরম সাফল্যের চিহ্ন। অফিসে ফিরে এসে তিনি জানালেন, সব কাগজ বিক্রি হয়ে গেছে, আরও কাগজ চাই। এমন আকস্মিক চাহিদা যেন প্রকাশক-সম্পাদক সকলকেই আশ্চর্য করে তোলে।

এই অভাবনীয় চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যার বিক্রির অভিজ্ঞতা স্বয়ং ম্যানেজার শান্তিপদ সিংহ তাঁর স্মৃতিকথা ‘নজরুল কথা’য় বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। পাঁচ হাজার কপি ছাপানো হলেও নগদ বিক্রির ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ধূমকেতু অফিসে কাগজের স্তূপ জমে উঠেছিল, যেন কাগজের পাহাড়ে ঢেকে গেছে পুরো ঘর। পাওনাদার ছাপাখানার সুবোধবাবু অফিসে এসে বসে পড়েছেন টাকা তুলতে, আর সম্পাদক কবি গিরিজা বসুর বাড়িতে নিমন্ত্রণে। এমন অবস্থায় মুজাফফর আহমদের পরামর্শে শান্তিপদ নিজেই একশো কপি কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বৌবাজার, কলেজস্ট্রিট ও শিয়ালদহে ঘুরে তিনি সব কপি বিক্রি করে ফিরে আসেন চার টাকা এগারো আনা নিয়ে, যেন এক বিজয়ী সৈনিকের মতো। সুবোধবাবু এই দৃশ্য দেখে হাল ছেড়ে দিতে চাইলেও শান্তিপদের আশ্বাসে তিনি নিশ্চিন্ত হন।

এই প্রথম সংখ্যার আত্মপ্রকাশ ও বিস্ময়কর বিক্রি নিয়ে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ১৪ আগস্টের সংখ্যায় প্রশংসাপত্র প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়—“সম্পাদক কবি, কবিতার মধ্য দিয়া তিনি এক বীরত্বব্যঞ্জক অভিনব ভাবধারা আনিয়াছেন। বর্তমানে আসার নিস্পন্দ বাঙালি জীবনে তাঁহার কবিতা উৎসাহ চাঞ্চল্যভরা জাগরণ আনিবে।” তারা আশা প্রকাশ করে, ধূমকেতু বাংলা জাতিকে নবজাগরণে উদ্বুদ্ধ করবে এবং এই পত্রিকার প্রয়াসে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটবে।

তৎকালীন দেশের রাজনৈতিক আবহ ছিল যেন নিস্তরঙ্গ এক জলাশয়। স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার ক্ষীণ হয়ে পড়েছে, বাঙালির মনে এক ধরণের আত্মসমর্পণের ভাব। ঠিক এই সময়েই ধূমকেতুর আবির্ভাব যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো সেই নিস্পন্দ জলে ঢেলে দেয় বিদ্রোহের ঝড়। পাঠক বুঝতে পারেন, এক নতুন স্বর, এক নতুন সুর, এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে বাংলা সাংবাদিকতায়। নজরুল তাঁর সম্পাদনা ও সাহিত্যপ্রতিভার মাধ্যমে একদিক দিয়ে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যই জানাননি, অন্যদিকে পাঠকদের মনোজগতে সৃষ্টি করেছেন নাড়া দেওয়া এক সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা।

ধূমকেতুর অন্যতম আকর্ষণ ছিল এর সম্পাদকীয়। নজরুল এই মাধ্যমে নিছক মত প্রকাশ করেননি, বরং যেন তীক্ষ্ণ ধ্বনির মতো, বিদ্রোহী সূর্যের তাপে লিখতেন তাঁর বক্তব্য। ধূমকেতুর প্রতিটি সংখ্যার প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠত সেই সম্পাদকীয়, যেটি পাঠকের হৃদয় বিদীর্ণ করে তুলত, সচেতন করত, বিদ্রোহে আহ্বান জানাত।

নজরুলের আগুনঝরা কবিতা ধূমকেতুর দ্বিতীয় স্তম্ভ। প্রতিটি কবিতা যেন এক একটি মন্ত্র, এক একটি সংগ্রামী চেতনার অনুপ্রবেশ পাঠকের অন্তরে। পাশাপাশি তৃতীয় আকর্ষণ ছিল নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ত্রিশূল’ ছদ্মনামে লেখা রাজনৈতিক প্রবন্ধ। এতে জাতীয় নেতাদের জীবন ও আন্দোলনের অনুপুঙ্খ চিত্র তুলে ধরা হতো, যার ঐতিহাসিক ও শিক্ষামূলক মূল্য ছিল অপরিসীম। ম্যাটসিনি, গ্যারিবল্ডি, কভুর মতো বিপ্লবীদের জীবনকথাও স্থান পেত।

‘মুড়ো খ্যাংড়া’ বিভাগে প্রকাশিত হতো অত্যন্ত রসালো অথচ তীক্ষ্ণ সমালোচনামূলক রচনা, সমাজের নানা অন্যায় ও ব্যঙ্গাত্মক চিত্র। ‘নিক্তি-নিকষ’ শিরোনামে থাকত পুস্তক সমালোচনা। যদিও এসব আলোচনা খুব তীব্র না হলেও, পাঠকদের মাঝে পাঠ্যবিষয়ে আগ্রহ জন্মাত। ‘অগ্নি সম্মার্জনী’ বিভাগে ছাপা হতো রাজনৈতিক পর্যালোচনা, যেগুলির অনেকগুলোই ছিল দ্বৈপায়ন ছদ্মনামে মুজাফফর আহমদের লেখা।

নারী পাঠকদের জন্য ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’ নামক স্বতন্ত্র বিভাগটি ছিল এক বিশেষ উদ্যোগ। এখানে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মিসেস এম. রহমান, মহামায়া দেবী, শৈলবালা ঘোষ প্রমুখদের রচনায় নারীর জীবন, অধিকার ও সমাজের নানা প্রশ্ন স্থান পেত।

এর পাশাপাশি ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ ছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক ও কৌতুকময় বিভাগ, যেখানে হালকা অথচ চিন্তনশীল রচনাগুলি প্রকাশিত হতো। ‘শনিরদৃষ্টি’ বিভাগে ছাপা হতো চিঠিপত্র। ‘হংস-দূত’ ছিল পাঠকদের অভিনন্দন ও মতামত প্রকাশের স্থান।

সংবাদ পরিবেশনের দিক থেকেও ধূমকেতু ছিল ব্যতিক্রমী। ‘দেশের খবর’, ‘মুসলিম জাহান’ ও ‘পরদেশী পঞ্জী’ বিভাগে যথাক্রমে দেশীয়, মুসলিম বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সংবাদ ছাপা হতো। সংবাদ উপস্থাপনার ভঙ্গি ছিল সরল, সরস এবং প্রাঞ্জল— পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তুলতে প্রতিটি শিরোনামকে রাখা হতো আকর্ষণীয়ভাবে।

শুরুর দিক থেকেই কিছু নির্দিষ্ট বিভাগ নিয়মিত প্রকাশিত হতো। পরে বিভিন্ন সংখ্যায় বিভিন্ন বিভাগ যোগ হতো, তবে সবগুলি বিভাগ একসঙ্গে প্রতিটি সংখ্যায় থাকত না। বিষয়ভিত্তিক প্রাসঙ্গিকতা অনুযায়ীই এগুলোর স্থান নির্ধারিত হতো।

(সূত্রঃ নজরুলের ধুমকেতু ধুমকেতুর নজরুল, কামরুজ্জামান, পৃষ্ঠা ২১/২২)

ধূমকেতু’র সম্পূর্ণ বিভাগ

ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিটি বিভাগ ছিল এক একটি স্বাধীন ব্যঞ্জনাপূর্ণ শক্তির বিস্ফোরণ। নামকরণেও ছিল অভিনবতা, দৃষ্টান্তমূলক সৃজনশীলতা ও কৌতুকপ্রবণ ব্যঙ্গবোধ। ‘খাট্টা মিঠা টিপ্পনি’ বিভাগে সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম নিজস্ব ভাষায়, কখনো রসের মোড়কে, কখনো ক্ষুরধার ব্যঙ্গের ছলে দেশের সমাজ ও রাজনীতির নানা অসংগতিকে তুলে ধরতেন। এই বিভাগটি ছিল পাঠকের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

‘আগুনের ফুলকি’ বিভাগে প্রকাশিত হতো বিদ্রুপ-প্রধান সংক্ষিপ্ত সংবাদের বিন্যাস, যা ছিল ছটফটে চুটকির মতো কিন্তু তীক্ষ্ণতার দিক থেকে ধাতব অস্ত্রের মতো ধারালো। দেশ বা সমাজের কোথাও অনাচার দেখলেই নজরুল সেই আগুনের ফুলকির মাধ্যমে জ্বালিয়ে দিতেন প্রতিবাদের মশাল।

‘অগ্নি সম্মার্জনী’ বিভাগ ছিল দেশের এবং বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনার স্থান। এই বিভাগে নজরুল অনেক সময় যুগোত্তীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন এবং নিপীড়ক শক্তির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানকে নির্ভীক কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন।

‘মুড়ো খ্যাংড়া’ বিভাগ ছিল কিছুটা বাউণ্ডুলে মেজাজের, কিন্তু তা যেন শ্লীল রসবোধ ও বিদ্রুপের মাধ্যমে ছুঁয়ে যেত সমাজের গভীর স্তরে গোঁজামিল ও ভণ্ডামির আস্তরণ। এতে ছিল গালিগালাজপূর্ণ আলোচনা, কিন্তু কুশলী ব্যঙ্গ ও তীক্ষ্ণ শ্লেষের মাধ্যমে।

‘শানাই-এর পোঁ’ বিভাগে অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ কবিতা, প্রবন্ধ কিংবা লেখার পুনর্মুদ্রণ হতো। এর মধ্য দিয়ে নজরুল অন্য লেখকের মূল্যবান রচনা ধূমকেতুর পাঠকদের সামনে তুলে ধরতেন।

‘নিক্তি-নিষ’ ছিল মূলত সাহিত্য-নির্ভর, যেখানে প্রকাশ পেত বইয়ের আলোচনা, সাহিত্য সমালোচনা ও প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ।

‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’ বিভাগে স্থান পেত নারীর সামাজিক অবস্থান, নারী সমস্যা ও নারী মুক্তির নানা দিক। এই বিভাগ ছিল নারীবাদী চেতনার সূচনালগ্ন এক স্পষ্ট পদচিহ্ন, যেখানে নারীর অধিকারের পক্ষে নজরুলের অবস্থান সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ ছিল বৈচিত্র্যময় তথ্যভান্ডার। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিচিত্র ঘটনা ও খবর এই বিভাগে স্থান পেত। এটি ছিল পাঠকদের জন্য এক বিস্ময়কর জানালার মতো, যা খুলে দিত বহির্বিশ্বের রঙিন ও বৈচিত্র্যময় চিত্রপট।

‘শনির পত্র’ বিভাগে ধূমকেতুর সম্পাদক বা সারথিকে লেখা পাঠকদের পত্র ছাপা হতো। এসব চিঠি শুধু পাঠক প্রতিক্রিয়াই নয়, অনেক সময় নতুন লেখকদের উদ্দীপনা, জনসাধারণের মতপ্রকাশ এবং সামাজিক উত্তাল আবেগেরও প্রকাশ হয়ে উঠত।

‘হংসদূত’ বিভাগে পাঠানো হতো ধূমকেতু ও নজরুলকে উদ্দেশ করে লেখা অভিনন্দনবার্তা ও আশীর্বাদবাণী। এই বিভাগে অনেক গুণীজনের শুভেচ্ছাবাণী স্থান পেয়েছিল, যা ধূমকেতুর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার পরিসরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

‘দেশের খবর’ বিভাগে থাকত স্বদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট, বিশ্লেষণ ও মতামত। আর ‘মুসলিম জাহান’ বিভাগ ছিল মুসলিম বিশ্বের সংবাদ পরিবেশনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেখানে ইসলামী জাহানের নানা ঘটনাবলি ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির বিশ্লেষণ থাকত।

‘পরদেশী পঞ্জী’ বিভাগে স্থান পেত ইউরোপসহ অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক সংবাদ। এতে ধূমকেতু আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম হিসেবে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল।

এইসব বিষয়বস্তুর কারণে ধূমকেতু পত্রিকার জনপ্রিয়তা মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়তে থাকে। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন যে পত্রিকা প্রকাশের দিন শহরের মোড়ে মোড়ে তরুণেরা জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকত। কখন হকার এসে ধূমকেতুর বান্ডিল নামাবে, সেই প্রতীক্ষা ছিল উত্তাল উত্তেজনার মতো। যেই কাগজ আসতো, অমনি হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। চায়ের দোকানে একটি কপি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলত। তিনি লিখেছেন, “জাতির অচলায়তন মনকে অহর্নিশি এমন করে ধাক্কা মেরে চলে ধূমকেতু যে রাজশক্তি প্রমাদ গনে।”

চায়ের দোকান, কলেজ হোস্টেল, পাড়ার রোয়া বা গৃহস্থ বাড়ির বৈঠকখানা—সর্বত্র ধূমকেতুকে কেন্দ্র করে গুঞ্জন, আলোচনা, বিতর্ক, উত্তেজনা আর নতুন চেতনার আবেশ। বহু মানুষ নজরুলের কাছে আসতে লাগল, কেউ লেখা দিতে, কেউ মতপ্রকাশ করতে, কেউ বা কেবলমাত্র কবির সাহচর্যে কিছু সময় কাটাতে।

কিন্তু অফিস হিসেবে ব্যবহৃত ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের সেই ছোট এককক্ষের ঘর এতসব কর্মব্যস্ততা ও মানুষের ভিড় সামলাতে পারছিল না। সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল ধূমকেতুর সেই ছোট্ট কার্যালয়টি। ফলে নতুন, প্রশস্ত ও সুপরিকল্পিত অফিসের প্রয়োজনে নজরুল চিন্তিত হয়ে পড়েন।

ঠিক সেই সময়েই ঘটে এক অনভিপ্রেত ঘটনা। ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের বাড়ির মালিক ছিলেন শীল পরিবার। আফজালুল হক সরাসরি তাঁদের ভাড়াটে ছিলেন না, তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কাছ থেকে, যারা মূলত ঐ অংশটি শীল পরিবারের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিল। সেই সূত্রে আফজালুল হক ছিলেন ‘ভাড়াটের ভাড়াটে’।

ধূমকেতু পত্রিকায় একের পর এক প্রতিবাদী ও সাহসী লেখা প্রকাশিত হচ্ছিল, যেগুলো তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর জন্য ছিল অত্যন্ত অস্বস্তিকর। পুলিশের নজরদারি বাড়ছিল, রাজনৈতিক উত্তেজনাও তীব্র হয়ে উঠছিল। এই পরিস্থিতিতে শীল পরিবার পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে চাননি। ফলে তারা চুপিসারে একটি কৌশলের আশ্রয় নেয়।

মুজাফফর আহমদ উল্লেখ করেছেন, “এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শীলেদের এক ভাই (ভাইটি আবার উকিল) রাগে গর গর করতে করতে একদিন এসে বললেন যে, এখন হ’তে আমরা ধূমকেতু বার করতে দেব না।”

এই হঠাৎ পরিস্থিতিতে নজরুল ও তাঁর সহযোগীদের পত্রিকার জন্য একটি নতুন ও স্থিতিশীল ঠিকানা খুঁজে পাওয়া একান্ত জরুরি হয়ে ওঠে। মূল অফিস পরিবর্তনের জন্য তৎপরতা শুরু হয়। সেই সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন ধূমকেতুর প্রধান হকার দুবে। তাঁর বাড়ি ছিল বালিয়া জেলায়, তিনি নবযুগ পত্রিকারও হকার ছিলেন। তাঁর সূত্রেই জানা যায় ৭ নম্বর প্রতাপ চাটুজ্যে লেনের একটি বাড়ির কথা। সেখানে দোতলায় ছিল তিনটি বড় ঘর, একটি রান্নাঘরসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

ঘরটি নজরুলের পছন্দ হয় এবং ধূমকেতুর অফিস স্থানান্তরিত হয় নতুন ঠিকানায়। ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট থেকে সরিয়ে এনে ধূমকেতুর নতুন কেন্দ্র হয় ৭ নম্বর প্রতাপ চাটুজ্যে লেন।

এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার কারণে ধূমকেতুর সপ্তম সংখ্যার (২ সেপ্টেম্বর ১৯২২) পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশে কিছু বিলম্ব ঘটে। দশ দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২২ তারিখে প্রকাশিত অষ্টম সংখ্যায় নতুন ঠিকানার কথা অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে ঘোষণা করা হয়েছিলঃ ‘ধূমকেতু’র কেন্দ্রচ্যুতি’।

ঘোষণাপত্রে লেখা হয়, “ধূমকেতু’র কেন্দ্র ৭ নং প্রতাপ চাটুজ্যে লেনে উঠে এসেছে। অতঃপর চিঠিপত্র, টাকাকড়ি, বিনিময়ের কাগজ সবই এই ঠিকানায় ধূমকেতুর একমাত্র সত্ত্বাধিকারী কাজী নজরুল ইসলামের নামে পাঠাতে হবে।” সঙ্গে ছিল একটি বিনীত অনুরোধ, “ধূমকেতু’র কেন্দ্রচ্যুতির গোলমালে গত শুক্রবার কাগজ বার করা সম্ভব হয়নি, পাঠকবর্গ মার্জনা করবেন আশা করি।”

এই অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। নানা পত্রিকা যেমন আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, মোহাম্মদী, বসুমতী, আত্মশক্তি, বিজলী, হিতবাদী, সত্যবাদী, বাসন্তী, প্রসূন, পরিদর্শক ইত্যাদি ধূমকেতুর প্রশংসা করে লেখালেখি করছিল। সেই সঙ্গে সমালোচনার ঝড়ও উঠেছিল, অনেক ক্ষেত্রে তা সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। নজরুলের জাত, বংশ নিয়ে কুৎসা রটানো হয়, অপমানজনক গালিগালাজে আক্রমণ করা হয় সম্পাদককে।

এই প্রেক্ষিতে মাসিক ‘ইসলাম দর্শন’-এর আশ্বিন ১৩২৯ সংখ্যায় সায়েফুল ইসলাম একটি কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য লেখেনঃ “ধূমকেতু বাঙ্গালার কুলিখিত তরুণ-তরুণীর চির-চঞ্চল চিত্তাকাশ-বিচরণকারী একখানি অর্ধ-সাপ্তাহিক ব্যঙ্গপত্র। অর্থাৎ শ্লেষ-বিদ্রূপ, ঠাট্টা-তামাশা, স্বেচ্ছাচারীর ও অনাচারের একটি জীবন্ত অপগ্রহ। তবে নাম মাহাত্ম্যে ধূমকেতু’র এই নব অবতার ধর্ম ও নীতিদ্রোহিতায় এবং দেশ সমাজের অনিষ্টকারিতায় প্রকৃত ধূমকেতু হইতেও অধিক ভয়ঙ্কর… ইহার সারথি বা সম্পাদকের নাম কাজী নজরুল ইসলাম অর্থাৎ একজন মুসলমান।”

এই মন্তব্যে যেমন তীব্র সমালোচনার সুর ছিল, তেমনি পরোক্ষে ধূমকেতুর জনমনে সৃষ্টি করা আলোড়নের স্বীকৃতিও নিহিত ছিল। নজরুলের সম্পাদিত ধূমকেতু শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, তা ছিল এক প্রবল আন্দোলনের ভাষা, বিদ্রোহের মশাল, এক নবজাত জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ।

ধর্ম এবং সমাজের পরিসরে বহুবার ‘ধূমকেতু’র আবির্ভাব ঘটেছে, যারা প্রথমে বিদ্রোহ ও অস্থিরতার আবহ ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত ধুয়ে-মুছে গেছে সময়ের বুকে। তারা হয় আত্মপ্রতারণার শিকার হয়েছে, নয়তো জনসাধারণের হৃদয় থেকে নির্বাসিত হয়ে ইতিহাসের অন্ধকার গহ্বরে বিলীন হয়েছে। সমাজের স্থিতিশীল কাঠামো এবং ধর্মীয় অনুশাসনের মুখোমুখি হয়ে এইসব তথাকথিত ‘ধূমকেতু’রা নিজেদের ললাটে কলঙ্কের কালিমা ধারণ করে, মুখে অভিশাপের ধ্বনি নিয়ে অবশেষে অন্তরালে হারিয়ে গেছে। সেই একই ভবিষ্যৎ একে একে অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রতিও— এমনই ধারণা পোষণ করেছিল তৎকালীন রক্ষণশীল ও ধর্মীয় ভাবধারার অনুসারীরা। তারা বিশ্বাস করত, “তা তিনি ‘শয়তানের মিতা’ই হোন কিংবা স্বয়ং ‘শয়তান’-ই হোন— আমাদের ভ্রূক্ষেপ করিবার কিছু নাই। কারণ অমুসলমানের কথা বলিতে পারি না — কিন্তু দুষ্টাত্মা অভিশপ্ত শয়তানকে কেমন করিয়া বিতাড়িত ও দূরীভূত করিতে হয়, তাহা মুসলমানেরা ভাল মতই অবগত আছেন।”

‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকা এ নিয়ে একাধিক কটাক্ষ প্রকাশ করে। পত্রিকাটির তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘মিঠেকড়া’ নামের সম্পাদকীয়তে নজরুলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় আক্রমণ চালানো হয়। সেখানে বলা হয়, “ইসলাম দর্শনের গত (আশ্বিন) সংখ্যায় আমরা অমঙ্গলের অগ্রদূত ‘ধূমকেতু’ ও উহার স্বেচ্ছাচারী ‘সারথি’র সম্বন্ধে একটু আলোচনা করিয়াছিলাম…” সম্পাদকীয় ভাষায় বোঝা যায়, পত্রিকাটি ‘ধূমকেতু’র ভাবনাচিন্তাকে ধর্ম ও নীতিবিবর্জিত বলে মনে করেছিল। আরও অভিযোগ ওঠে, ‘ধূমকেতু’ নিয়মিতভাবে এমন সব ভাষা ও চিন্তা প্রকাশ করছে, যা ইসলামের প্রতি বিদ্রূপ এবং মুসলিম সমাজের প্রতি অবজ্ঞা বলে গণ্য। বিশেষত নজরুলের ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’, ‘ভৃগুবন্দনা’, ‘মাভৈ বোম কেদার’, ‘বোম ভোলানাথ’ কিংবা ‘বোল হরি হরি বোল’ জাতীয় উচ্চারণগুলো তাদের চোখে ছিল ‘কোফরী কালাম’। পত্রিকার ভাষায়, এইসব শব্দ ও কবিতার মাধ্যমে ধূমকেতু “ধর্মোদ্রোহীতা এবং সারথির স্বেচ্ছাচারিতা” আরও তীব্র করেছে।

এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইসলাম দর্শন পত্রিকায় মুনশী মোহাম্মদ রিয়াজুদ্দিন আহমদ একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ছিল “লোকটা মুসলমান না শয়তান”। প্রবন্ধটিতে নজরুলের বিরুদ্ধে বিস্তৃত ধর্মীয় ও নৈতিক অভিযোগ তোলা হয়। লেখকের দাবি ছিল, নজরুল ইসলামের চিন্তাভাবনা এবং ধূমকেতু পত্রিকার প্রকাশনাগুলো ইসলামের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ ও ধ্বংসাত্মক। তাঁর মতে, নজরুল “হিন্দুয়ানী মজ্জায় পরিপূর্ণ”, “ধর্মজ্ঞানশূন্য”, এমনকি তিনি বিশ্বাস করতেন নজরুলের পূর্বপুরুষও আদর্শ মুসলমান ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, “মুসলমানের ঔরসে ও অনেক নাস্তিক শয়তান জন্মগ্রহণ করিয়াছে; মুসলমান সমাজ তাহাদিগকে আস্তাকুঁড়ের আবর্জনার ন্যায় বর্জন করিয়াছেন।”

এইরকম এক রূঢ় ধর্মীয় প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ধূমকেতুর দ্বাদশ সংখ্যায় (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২/৯ আশ্বিন ১৩২৯) নজরুল দুটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা প্রকাশ করেন— ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ এবং ‘আগমনী’। প্রথম কবিতাটি মূলত আনন্দবাজার পত্রিকার শারদ সংখ্যা ১৩২৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশের জন্য লেখা হয়েছিল। তবে শেষপর্যন্ত ‘আনন্দবাজার’ কবিতাটি ছাপাতে সাহস দেখায়নি। নজরুল তখন সিদ্ধান্ত নেন, এই সাহসী কবিতা তিনি নিজেই নিজের কাগজে ছাপাবেন। এই কবিতার শেষ চার লাইনে মাতৃপ্রতিমা দুর্গার আহ্বানের ছলে তিনি ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক বার্তা উচ্চারণ করেন—

“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাড়াল।
দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, –আসবি কখন সর্বনাশী?”

‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ছিল একটি প্রতীকধর্মী রচনা। এখানে দেবী দুর্গার রূপে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন স্বাধীনতার দেবীকে, যিনি এসে ভারতের উপরতলার দুর্বৃত্ত শক্তিকে ধ্বংস করবেন। পাশাপাশি ‘আগমনী’ কবিতাটিও সেই সংখ্যা প্রকাশিত হয়, যেখানে হিন্দু ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের চিরচেনা প্রতিচ্ছবির আড়ালে ছিল এক দৃঢ় রাজনৈতিক আহ্বান।

“হিমালয়! জাগো! ওঠো আজি
তব সীমা লয় হোক
ভুলে যাও শোক-চোখে জল ব’ক
শান্তির—আজি শান্তি-নিলয় এ আলোয় হোক
ঘরে ঘরে আজি দীপ জ্বলুক!
মা’র আবাহন-গীত চলুক!”

এই দুটি কবিতাই রক্ষণশীল ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কেননা এগুলোর মাধ্যমে নজরুল ধর্ম ও রাজনীতিকে একত্রিত করে এক নতুন বিপ্লবের বার্তা দিয়েছেন, যা তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের পাশাপাশি সমাজের গোঁড়ামিকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।

এই ধূমকেতু সংখ্যাটির প্রকাশের পর পত্রিকাটি একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা করে, শারদীয় পুজোর অবসরে পত্রিকার অধিকাংশ লেখক ও সম্পাদক স্বগৃহে চলে যাবেন বলে ১২, ১৬ ও ১৯ আশ্বিন তারিখে কোনো সংখ্যা প্রকাশিত হবে না। পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশ হবে ২৩ আশ্বিন (১৩ অক্টোবর ১৯২২) তারিখে। এই ‘ত্রয়োদশ’ সংখ্যাতেই রাণীগঞ্জে নজরুলের সম্মানে অনুষ্ঠিত অভিনন্দনের বিবরণ ও মানপত্র মুদ্রিত হয়। এই সম্মাননা একদিকে যেমন নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধাশীলদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ, তেমনই ছিল তাঁর বিরুদ্ধ শক্তির প্রতি প্রত্যুত্তরের ঘোষণা।

ত্রয়োদশ সংখ্যার প্রকাশ নির্ধারিত ছিল ১০ অক্টোবর, ১৯২২। কিন্তু নানা প্রশাসনিক ও কারিগরি বিলম্বে তা প্রকাশিত হয় ১৩ অক্টোবর। এই সংখ্যার সম্পাদকীয় ‘ধূমকেতুর পথ’-এ নজরুল সাহসিকতার সঙ্গে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভারতের ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, “প্রথম সংখ্যায় ধূমকেতুতে ‘সারথির পথের খবর’ প্রবন্ধে একটু আভাস দিবার চেষ্টা করেছিলাম৷ যা বলতে চাই, তা বেশ ফুটে ওঠেনি মনের চপলতার জন্য। ….সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ টরাজ বুঝি না। কেননা, ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না।” এ ভাষ্য ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কৌশলী ও আপসনির্ভর ‘স্বরাজ’ চেতনার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় সাহিত্যিক বিদ্রোহ। নজরুল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন,

“প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদেরও এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কু-বুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।”

২০ অক্টোবর প্রকাশিত পঞ্চদশ সংখ্যায় নজরুল এক ব্যতিক্রমী সাহসিকতা দেখান মাত্র ১১ বছর বয়সী লীলা মিত্রের একটি বিদ্রোহাত্মক প্রবন্ধ প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’। এই সংখ্যাটি কিশোর কণ্ঠে ব্রিটিশ বিরোধিতার উচ্চারণে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করে। আর ৩ নভেম্বর প্রকাশিত উনবিংশ সংখ্যার সম্পাদকীয় নিয়ে এক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কারণ এটি নজরুলের নিজ হাতে লেখা ছিল না। কাজী নজরুল তখন বাইরে ছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সময়মতো লেখা পাঠাতে পারেননি। ফলে ম্যানেজার শান্তি সিংহ নিজের হাতে ‘নিশানবরদার’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লিখে দেন এবং পরবর্তীতে নিজেই এই বিষয়টি তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘নজরুল কথা’-তে অকপটে স্বীকার করেন। তিনি লেখেন, “আমি কাগজ নিয়ে বসলাম। কবির গরম লেখার এখান থেকে ওখান থেকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ খাড়া করলাম।” এই অকপট স্বীকারোক্তি নজরুলের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধারও নিদর্শন।

একবিংশ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১০ নভেম্বর, এবং সেই সংখ্যার ছাপার সময়েই প্রথমবারের মতো পুলিশি তল্লাশি শুরু হয়। যদিও দ্বাদশ সংখ্যার (২৬ সেপ্টেম্বর) ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা এবং পঞ্চদশ সংখ্যার (২০ অক্টোবর) লীলা মিত্রের ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ প্রবন্ধ তখনো স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত ছিল, তবু সরকার উভয় রচনাকেই রাষ্ট্রদ্রোহের উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত করে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। মুজাফফর আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “এই বাড়ীতে গিয়েই অধ্যাপক সাতকড়ি মিত্রের সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় হয়…তার একটি ছোট বোন ছিল…তার ছোট ছোট লেখা ধূমকেতুতে ছাপা হয়েছে।” যদিও তিনি লেখিকার নাম ‘মমতা মিত্র’ উল্লেখ করেন, প্রকৃতপক্ষে তাঁর নাম ছিল লীলা মিত্র। পাশাপাশি তিনি ভুল করে লেখেন যে, ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ ও ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ একই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল, অথচ বাস্তবে তা নয়। এই দুটি লেখা দুটি পৃথক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

৮ নভেম্বর ১৯২২, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় নজরুলকে ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন, যা নজরুল দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। একই দিন পুলিশের আরেকটি দল প্রকাশক আফজালুল হককে কলেজ স্ট্রিট থেকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পান। নজরুল তখন সমস্তিপুর থেকে কুমিল্লা গিয়েছিলেন। পুলিশ তাঁকে কুমিল্লা থেকেই ২৩ নভেম্বর গ্রেফতার করে এবং ২৫ নভেম্বর তাঁকে দড়ি বেঁধে কলকাতায় নিয়ে আসে।

১৭ নভেম্বর প্রকাশিত দ্বাবিংশ সংখ্যায় প্রকাশক হিসেবে দেখা যায় অমরেশ কাঞ্জিলালের নাম। এই সংখ্যার ‘ধূমকেতুর গ্রহণ’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ২৬ অগ্রহায়ণ প্রকাশিত ১২ ডিসেম্বর সংখ্যায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে জিতেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর নাম যুক্ত হয়। ২৯ অগ্রহায়ণ বা ১৫ ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের নাম পুনরায় ছাপা হয় এবং ঘোষণা করা হয় ধূমকেতু ভবিষ্যতে প্রতি বুধবার ও শনিবার প্রকাশিত হবে।

আটকের পর নজরুলকে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়। বহু প্রখ্যাত আইনজীবী বিনা পারিশ্রমিকে নজরুলের পক্ষে দাঁড়ান। প্রধান উকিল ছিলেন মলিন মুখোপাধ্যায়। তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ হয় এবং ১৬ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইন হো তাঁকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

এরপর ২৭ জানুয়ারি ১৯২৩, ধূমকেতুর দ্বাত্রিংশ বা শেষ সংখ্যা ‘নজরুল সংখ্যা’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এই সংখ্যার মুখ্য আকর্ষণ ছিল নজরুলের সেই বিখ্যাত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ যা তিনি ৭ জানুয়ারি আদালতে দাঁড়িয়ে পাঠ করেছিলেন। এই ভাষণটি শুধু এক প্রত্যুত্তর নয়, বরং একটি অসাধারণ সাহিত্যিক দলিল। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর অন্তরের মমতা, ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের মহিমা। তিনি বলেন, “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী! তাই আমি রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।…” এ ভাষণে তিনি রাজশক্তির বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কবির কণ্ঠস্বর তুলে ধরেন। তিনি নিজেকে অভিহিত করেন “আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।”

এই বিশেষ সংখ্যায় আরও ছাপা হয়েছিল ‘কাজী নজরুল’ শীর্ষক এক সংক্ষিপ্ত জীবনভিত্তিক নিবন্ধ, ‘স্বদেশপ্রেম’ নামক একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ, এবং নজরুলের নিজস্ব কবিতা ‘কারাবরণ’। ছাপা হয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের পূর্বপ্রকাশিত শুভেচ্ছা-বার্তা, বিরজাসুন্দরী দেবী ও অমিয়বালা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদমূলক কবিতা।

ধূমকেতুর এ এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যেখানে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবিতা, সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক বিদ্রোহ একত্রে মিলিত হয়েছে। নজরুলের এই বীরোচিত ভূমিকা ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাহিত্যমূলক উচ্চারণে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করে।

সত্য এমন এক অনন্ত শক্তি, যা নিজেকে প্রকাশ করেই ছাড়ে। কোনো সিংহাসনের রক্তচক্ষু কিংবা কোনো জল্লাদের রাজদণ্ড, চিরন্তন সত্যকে থামাতে পারে না। আমি সেই স্বয়ংপ্রকাশ সত্যেরই বাণীবাহক—আমি সেই বীণা, যার তারে যুগে যুগে ধ্বনিত হয়েছে অপ্রতিরোধ্য সত্যের সুর। আমি কোনো সাধারণ মানুষ নই, আমি সেই ভগবানের হাতে ধৃত বীণা, যিনি সৃষ্টি করেছেন চরাচর। কেউ চাইলে হয়তো বীণার কাঠামোকে ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু যিনি সুর তোলেন, সেই চিরসত্যকে কেউ ভাঙতে পারবে না। কেননা, তাঁর অস্তিত্ব চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং সর্বত্র বিরাজমান।

যে ব্যক্তি আজ সত্যকে গলা টিপে হত্যা করতে চাইছে, যিনি আজ সত্যের ধারককে কারাগারে আবদ্ধ করছেন, তিনি নিজেও সেই ভগবানের সৃষ্টি। যাঁর ইচ্ছাতেই সে আজ ক্ষমতাসীন, কাল হয়তো ধূলায় লুটিয়ে থাকবে। মানুষের অহংকারের কোনো সীমানা নেই—সে তার স্রষ্টাকেই কারাবন্দি করতে চায়, তাঁকেই যেন বিচার করতে উদ্যত হয়। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিটি অহংকারের অন্তিম গন্তব্য হয়েছে অপমানের অন্ধকার। অহংকার যে একদিন নিজেই নিজের চোখের জলে ডুবে যায়, এ কথা পৃথিবীর প্রতিটি যুগে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

আমি আবার বলি—আমি সত্যের একমাত্র বাহক নই, আমি কেবলমাত্র একটি যন্ত্র, যার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর তাঁর বাণী উচ্চারিত করেন। এই যন্ত্রকে কেউ নিশ্চিহ্ন করলেও, যিনি যন্ত্রে প্রাণ সঞ্চার করেন, তাঁকে কেউ থামাতে পারে না। আমি মরে যেতে পারি, আমায় হত্যা করা যেতে পারে, কিন্তু যে চেতনা আমায় উদ্বুদ্ধ করেছে, যে মহান আত্মা আমার কণ্ঠে ভাষা দিয়েছেন, তিনি অমর। যুগে যুগে হাজারো বিদ্রোহী এসেছে, যাঁদের দেহ নিশ্চিহ্ন হয়েছে, কিন্তু তাঁদের চিন্তা, তাঁদের সত্যবাণী আজও পৃথিবীর প্রতিটি কোণে বেঁচে আছে। আমি নশ্বর, আমার দেহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমার ভেতর দিয়ে যে অমর আত্মার গর্জন প্রতিধ্বনিত হয়, তার মৃত্যু নেই।

আমার মুখের বাঁশি কেড়ে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বাঁশির সুর থেমে যাবে না। বাঁশি শুধু একটি মাধ্যম, তার সুর সৃষ্টি হয় অন্তরের অনুভব থেকে। আমি জানি, আমার সৃষ্টি কৌশলে আমি আবার নতুন বাঁশি তৈরি করব, তাতে আবারও বেজে উঠবে সেই প্রলয়ধ্বনি। অতএব দোষ বাঁশির নয়, দোষ সুরেরও নয়। যারা মনে করে সত্যকে দমন করা যায়, তারা বোঝে না যে, এই সত্য তো ঈশ্বরের বাণী। কাজেই দোষ আমার নয়, দোষ সেই সৃষ্টিকর্তারও নয়, যিনি আমার মধ্যে দিয়ে তাঁর বাণী প্রচার করেন। যদি এই সত্য প্রচার রাজদ্রোহ হয়, তবে রাজবিদ্রোহী সেই ভগবান, যাঁর বিরুদ্ধে কেউ কোনোদিন রুখে দাঁড়াতে পারেনি, পারবেও না। এমন কোনো আইন এখনও সৃষ্টি হয়নি, যা তাঁকে আটকাতে পারে।

রাজশক্তির অনুবাদকরা শুধু আমার ভাষাকে অনুবাদ করেছেন, আমার বক্তব্যের প্রাণ, তার জ্যোতি, তার আত্মিক শক্তিকে অনুবাদ করতে পারেননি। তাঁদের অনুবাদে রাজভক্তির গন্ধ আছে, আমার লেখায় আছে আত্মার স্বাধীনতা, যন্ত্রণা আর দ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। কারণ আমি রাজার মনোরঞ্জনের জন্য লিখি না, আমি লিখি ভগবানের সেবা করতে। আমি যে কথাগুলি বলেছি, তা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, তা এক অবিচার, এক অসত্যের বিরুদ্ধে।

এই আদালতে আজ একা আমি দাঁড়িয়ে নেই। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চিরসত্য ভগবান। ইতিহাস সাক্ষী, খ্রিস্ট যখন ক্রুশে বিদ্ধ হলেন, গান্ধিজি যখন কারাবরণ করলেন, তখনও ঈশ্বর নীরবে তাঁদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তখনকার বিচারকেরা তা দেখতে পাননি, কারণ তাঁদের সামনে ছিল রাজদণ্ডের ভীতি। তাঁদের বিবেক, তাঁদের দৃষ্টি ছিল বন্দী। অন্যথা হলে তাঁরা বিচারের আসনেই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতেন।

আজকের বিচারকও জানেন, আমি যা বলেছি তা অন্যায় নয়। কিন্তু হয়তো তিনি আমায় শাস্তি দেবেন, কারণ তিনি স্বাধীন নন। তিনি কোনো ন্যায়বিচারক নন, তিনি রাজভৃত্য। তাই আমি আজ প্রশ্ন করছি—এই বিচারকের বিচার কাহার কাছে জবাবদিহি করবে? রাজার কাছে, না তাঁর অন্তরের বিবেকের কাছে? তার পুরস্কার কে দেবে? রাজা, না ঈশ্বর?

আমি শুনেছি, আমার বিচারক একজন কবি। এতে আমি আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার হোক আরেক কবির হাতে—এ তো এক পরম সমাপতন। কিন্তু সত্য বলতে কি, সময় আমাদের দুজনকে দুই দিক থেকে আহ্বান জানাচ্ছে। প্রবীণ বিচারককে ডেকে নিচ্ছে মৃত্যুর সন্ধ্যাকাল, আর আমাকে আহ্বান করছে নবজীবনের ভোর। আমি বলতে পারি না, আমাদের দুজনের এই যাত্রাপথে মিলন ঘটবে কিনা।

আজ ভারত পরাধীন। দেশের অধিবাসীরা দাস। এ এক নির্মম সত্য। অথচ এই সত্য উচ্চারণ করলেই, এই বন্দিত্বের কথা বললেই তাকে বলা হয় রাষ্ট্রদ্রোহী। এ কেমন বিচার? সত্যকে চাপা দিতে চায় যে শাসন, তা কি কখনো চিরস্থায়ী হতে পারে? হয়তো এতদিন হয়েছে, কারণ সত্য উদাসীন ছিল। কিন্তু আজ সত্য জেগে উঠেছে। আজকের দিনে চেতনা জেগেছে, আত্মা জেগে উঠেছে। আর এই জাগরণ আমি শুধু নিজের কণ্ঠে নয়, সমগ্র জনতার হাহাকারে অনুভব করেছি। আমি জানি, আমার কণ্ঠ দিয়ে যে ক্রন্দন উচ্চারিত হয়েছে, তা শুধু আমার নয়, তা নিপীড়িত জনতার সমষ্টিগত আর্তনাদ। আমাকে হত্যা করে এই ধ্বনি থামানো যাবে না। আমার মৃত্যুর পরে অন্য একজন, কিংবা আরও অনেক জন এই একই সুরে গেয়ে উঠবে। সত্যের বাণী কখনো দমে না, থেমে যায় না—সে জেগে থাকে, নতুন রক্তে, নতুন কণ্ঠে, নতুন অস্ত্রে।

আজ যদি ইতিহাস অন্যভাবে রচিত হতো, যদি ভারত কোনোদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন না হয়ে উল্টে ইংল্যান্ডই হতো ভারতের উপনিবেশ, তাহলে ইতিহাসের বিচারচক্র ঘুরে ঠিক আজকের মতোই কোনো নিপীড়িত ইংরেজ যুবক হয়তো নিজের জন্মভূমি মুক্ত করতে ছুটে বেড়াতো, বিদ্রোহ করত স্বদেশি শাসকের বিরুদ্ধে। আর সে যদি আমারই মতো কোনো ‘রাজবন্দী’ হয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াত এবং তার বিচারক হতেন আমি নিজে, তাহলে নিশ্চয়ই সেই যুবকের কণ্ঠে যে উচ্চারণ প্রতিধ্বনিত হতো, আজ আমিও তেমনি করে, একই সত্যবোধে বলছি।

আমি জানি, আমি অপরাধী। তবে সেই অপরাধ রাজবন্দীর, আত্মত্যাগীর, প্রতিবাদীর। আমি বলেছি, যা অন্যায় মনে করেছি, আমি তা নির্ভয়ে বলেছি। যে অত্যাচার চোখের সামনে ঘটেছে, আমি তা ভাষায় তুলে ধরেছি। আমি কারও মুখাপেক্ষী হইনি, কুপ্রশংসার লোভে কাউকে তুষ্ট করতে যাইনি, রাষ্ট্রপ্রশাসনের লাঠিপেটা কিংবা দমননীতির ভয়ে সত্যচ্যুতি ঘটাইনি। আমি বিদ্রোহ করেছি, কিন্তু সেই বিদ্রোহ কেবল রাজার বিরুদ্ধে নয়, সমাজের প্রথাগত শোষণব্যবস্থা, জাতিভেদ, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধেও। এ জন্য অনেক ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, অবমাননা, এমনকি পারিবারিক বন্ধন থেকেও বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে আমাকে। তবুও আমি নিজের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, নিজের হৃদয়ের স্বরকে চেপে রাখিনি।

কারণ আমি জানি, আমি কেবল একজন কবি নই, আমি একজন ‘সত্যদ্রষ্টা’। আমার কবিতার পংক্তি, আমার গদ্যের প্রতিটি বাক্য যে ন্যায়ের পক্ষে, মানুষের মুক্তির পক্ষে ধ্বনিত হয়। এটা অহংকার নয়, আত্মোপলব্ধির সরল স্বীকারোক্তি। আমি জেনেছি, মিথ্যার কাছে মাথা নত করলে আমার ভগবান আমাকে ছেড়ে যাবেন। সেই দেবতা, যিনি আমার দেহ-মন্দিরে অধিষ্ঠান করেন, তিনিই আমাকে কবিতা দিয়েছেন, ভাবনার দীপ্তি দিয়েছেন, ভাষায় অগ্নি দিয়েছেন। তাই আমি যখন ধূমকেতু হাতে তুলে নেই, যখন লেখার প্রতিটি শব্দ হয়ে ওঠে আগ্নেয়গিরির অগ্নি-ছটা, তখন আমার আঙুলে ঈশ্বরের নির্দেশ থাকে।

তাই আমি লিখেছিলাম, আহ্বান জানিয়েছিলাম এক সর্বব্যাপী নবজাগরণের, এক বিপ্লবের যা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি রচনা করে। আমি জানতাম, প্রথমে আঘাত আসবে আমার দিকেই। আমিই হব প্রলয়ের প্রথম কণ্ঠস্বর। সেই আঘাত আমি মাথা পেতে নিয়েছি। কারাগারের পাথুরে দেয়ালের মধ্যে বন্দি থেকেও আমি আশার আলো দেখি, ভগবানের পরম স্পর্শ অনুভব করি। জানি, এই সংগ্রাম আমার একার নয়, আমার অনুপস্থিতিতে অন্য কেউ এসে আমার অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করবে।

আমার লেখনী যেমন ছিল ধূমকেতুর মতো দীপ্তিমান, তেমনি ছিল সমাজের অন্ধকার আকাশ চিরে ফেলার মত অপরিহার্য। আমার ‘ধূমকেতু’ কাগজের মধ্য দিয়েই এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সর্বপ্রথম বিস্ফারিত হয়েছিল। এই পত্রিকাই হয়ে উঠেছিল নিপীড়িত ভারতবাসীর মুক্তিচেতনার প্রতীক। এই কাগজের পৃষ্ঠায় গর্জে উঠেছিল সেই ভাষা, যা ছিল অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক নতুন যুগের সূচক।

‘ধূমকেতু’ পত্রিকা ছিল স্বল্পায়ু, কিন্তু তার প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। ১৯২২ সালের ১১ আগস্টে প্রথম প্রকাশিত এই পত্রিকা ছিল অর্ধ-সাপ্তাহিক। প্রথম পর্যায়ে ৯৪ দিনের মধ্যে ২১টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯২২ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে ১৯২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত হয় ১১টি সংখ্যা। দুই পর্ব মিলিয়ে ১৬৫ দিনেই বাংলার জাতীয় চেতনায় এটি অপরিসীম আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতি সংখ্যা প্রকাশিত হতো প্রথমে মঙ্গলবার ও শুক্রবার, পরে বুধবার ও শনিবার। কাগজটির মূল্যের ছিল এক আনা মাত্র। তার ব্যানারে ব্যবহৃত দুটি ব্লক তৈরি করে দিয়েছিলেন শিল্পী চারু রায়।

এই পত্রিকায় আমি একাধারে ছিলাম সম্পাদক, লেখক, কর্মী এবং সংগ্রামী সৈনিক। আমার হাতে ‘ধূমকেতু’ ছিল কেবল এক সংবাদপত্র নয়, ছিল স্বাধীনতার জন্য এক অগ্নিগর্ভ প্রস্তাবনা। এর পাতায় পাতায় আমি জাতিকে ডাক দিয়েছিলাম, ‘জাগো’, ‘বিদ্রোহ করো’, ‘মুক্ত হও’। আর এই কারণেই ব্রিটিশ সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, আমাকে কারাবন্দি করেছিল। সেই সময় আমি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে বক্তব্য রেখেছিলাম, সেটিই ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’।

এই জবানবন্দী কেবল একটি আত্মপক্ষ সমর্থনের দলিল নয়, এটি বাংলার রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ইতিহাসের এক মহামূল্যবান স্মারক। আতাউর রহমান যথার্থই বলেছেন, “নজরুলের এই জবানবন্দীতে বিদ্রোহী চেতনার সংগ্রামী মনোভাবের এবং অপরাজেয় আশাবাদের প্রকাশ প্রতিটি বাক্যে প্রতিটি শব্দে ধরা পড়েছে।” সেই জবানবন্দীর প্রতিটি শব্দ যেন একটি একটি করে হয়ে উঠেছিল বাংলা সাহিত্যের এক নতুন ধারা, যা শুধু লেখায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এক সংগ্রামী আত্মার নিঃশব্দ বিজয়গান।

আজও যখন ‘ধূমকেতু’র ইতিহাস ফিরে দেখি, মনে হয় এটি কেবল একটি পত্রিকার নাম নয়, এটি একটি যুগের ডাক, একটি জাতির আত্মজাগরণের প্রতীক। ধূমকেতুর সেই জ্বলন্ত আলো আজও আমাদের দিগন্ত চিরে পথ দেখায়।

ধূমকেতু পত্রিকায় কাজী নজরুল ইসলাম প্রচলিত সাংবাদিকতার ধারা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়ে এক অভিনব, সংবেদনশীল ও প্রতিবাদী ভাষায় সংবাদ পরিবেশনার এক নতুন ধারা নির্মাণ করেছিলেন। এই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদসমূহ কেবল তথ্য পরিবেশনের উদ্দেশ্যে নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও আদর্শিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য পরিবেশিত হয়েছে। প্রতিটি সংবাদ, মন্তব্য, বা কবিতার প্রতিটি পংক্তিতে বিদ্যমান ছিল এক অগ্নিগর্ভ স্পন্দন, এক বিদ্রোহী চেতনার জ্বলন্ত বহিঃপ্রকাশ। সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ ধারালো ভাষায় উপস্থাপিত এই সংবাদগুলো ছিল যেমন ঝাঁঝালো, তেমনি হৃদয়গ্রাহী ও উদ্দীপক।

নজরুলের সংবাদ-লেখন কেবল তথ্য জানানোর মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তিনি এই সংবাদগুলোর মাধ্যমে জনমানসে বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বিশেষত, সেই সংবাদগুলি তিনি বেছে নিয়েছিলেন, যেগুলো তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির প্রতিকূল প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্যায় ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে সক্ষম। তাঁর কলম যেন হয়ে উঠেছিল ধূমকেতুর আগুনছোঁয়া লেজ, যা সমস্ত কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও শোষণের অন্ধকারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ছাড়তে চেয়েছিল।

তিনি সমাজে চলমান মেকি ধার্মিকতা, গোঁজামিলপূর্ণ সংস্কার, জোড়াতালি দেওয়া জাতীয়তাবাদের মুখোশ, এবং নৈতিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে নির্ভীক উচ্চারণে কলম ধরেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, দেশের আপামর জনসাধারণ সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরুক। তাই তিনি সংবাদ, কবিতা ও ক্ষিপ্র মন্তব্যের সমন্বয়ে এক সাহসী শব্দরূপে গড়ে তুলেছিলেন ধূমকেতুর প্রতিটি সংখ্যা। এই দিক থেকে ধূমকেতু হয়ে ওঠে বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত এবং নজরুল হয়ে ওঠেন সাংবাদিকতার সংগ্রামী পথিকৃৎ।

ধূমকেতু কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, ছিল এক বিপ্লবী আন্দোলনের অনুষঙ্গ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত তরুণ বিপ্লবীদের কণ্ঠস্বর হিসেবে ধূমকেতু উঠে এসেছিল এক আগ্নেয়গিরির মতো। এ পত্রিকার জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তাকে বরীন্দ্রকুমার ঘোষের বিজলী কিংবা উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মশক্তি পত্রিকার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তবে ধূমকেতু ছিল অনেক বেশি ঊর্ধ্বমুখী, অনেক বেশি প্রাণময়। কারণ এটি কেবল একটি পত্রিকা নয়, ছিল এক বিদ্রোহী কবির আত্মার প্রতিধ্বনি।

যারা তখন ভারতের রাজনৈতিক সংকটে থেকেও আরামের বিছানায় দিন কাটাচ্ছিলেন, যারা চোখ-কান বন্ধ করে নিজেদের স্বার্থে নিমজ্জিত ছিলেন, নজরুল তাঁদের চেতনার দুয়ারে ধূমকেতুর অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে ঘুম ভাঙাতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঝড়ের খেয়া’ কবিতার অন্তর্নিহিত আহ্বান নজরুলকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তিনি যেন তাঁর অন্তরের ধ্বনি মিশিয়ে বলেছিলেন:

‘ঝড়ের গর্জন মাঝে
বিচ্ছেদের হাহাকার বাজে,
ঘরে ঘরে শূন্য হল আরামের শয্যাতল,
যাত্রা কর যাত্রা কর যাত্রী দল
এসেছে আদেশ, বন্দরে কাল হল শেষ।’

নজরুলের জীবন ও সাহিত্যকর্মের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সামঞ্জস্য বিরাজ করত। তাঁর বিশ্বাস, চিন্তা ও কর্মে কোনো দ্বৈততা ছিল না। স্বাধীনতা ছিল তাঁর পরম আরাধ্য স্বপ্ন, আর জাতিকে সেই স্বপ্নের পথে আহ্বান জানানোর এক কার্যকর হাতিয়ার ছিল ধূমকেতু। তাই ধূমকেতুকে আর পাঁচটা সাধারণ পত্রিকার সঙ্গে তুলনা করা চলে না। কারণ, এর পিছনে ছিলেন একজন বিদ্রোহী কবি, যাঁর কলম ছিল স্বাধীনতার তূর্য, যিনি নিপীড়িতের মুখপত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

কামরুজ্জামানের ‘নজরুলের ধূমকেতু, ধূমকেতুর নজরুল’ গ্রন্থে এই প্রসঙ্গটি যেমনভাবে ধরা পড়ে, তা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক উপলব্ধি: নজরুল ছিলেন ধূমকেতুর সারথি, এক অনমনীয় স্বাধীনতাকামী তূর্যবাদক, যিনি বাংলার অন্ধকারে দীপ্ত এক অগ্নিশিখা হয়ে জ্বলে উঠেছিলেন। তাঁর সেই জ্বালাময় কলম আজও ইতিহাসে এক প্রজ্জ্বলিত ধ্রুবতারা।

‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রেরিত আশীর্বাদবাণী, অভিনন্দন বার্তা

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন, যা কেবল একটি সাহিত্যপত্রিকা নয়, বরং উপনিবেশবিরোধী এক জাগরণ-ধ্বনি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এ পত্রিকার সূচনাকালে তিনি আশীর্বাদবাণীর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠান তাঁর সমকালীন বহু গুণীজনের নিকট, যেন তাঁদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও আশীর্বাদে পত্রিকাটি এক নৈতিক বলয়ে আবৃত হয়। এই অনুরোধের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন বিদ্বজ্জনের কাছ থেকে আশীর্বাদবাণী এসে পৌঁছালেও, তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঠানো বাণী ছিল সর্বাধিক মহিমান্বিত ও হৃদয়গ্রাহী।

রবীন্দ্রনাথের ওই আশীর্বাদবাণী শুধু একটি পত্রলেখা নয়, যেন এক যুগধ্বনি। এই আট পঙক্তির কবিতার মধ্যে ধূমকেতুর মূল আত্মা, মূল প্রেরণা ও তেজস্বী আহ্বান প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথের লেখা যখন ‘ধূমকেতু’র দপ্তরে এসে পৌঁছায়, তখন পত্রিকার একদিকের পৃষ্ঠা ছাপা হয়ে গিয়েছিল। তবু সম্পাদকমণ্ডলীর মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না এই অনবদ্য কবিতাটি ছাপা নিয়ে, কারণ এটি ছিল কেবল আশীর্বাদ নয়, এক ঐতিহাসিক সম্পদ, যা সময়ের প্রেক্ষাপটে যুগপৎ সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তে লেখা ওই বাণীটি ব্লক করে ছাপা হয় এবং স্থান পায় মূল সম্পাদকীয় স্তম্ভের ঠিক উপরে, যেন এক মূল্যবান রত্ন, পত্রিকার মুকুটে কোহিনূরের মতোই জ্বলজ্বল করে। সেই বহুল আলোচিত বাণীটি ছিল:

“আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন।
অ লক্ষণের তিলক রেখা
রাতের তালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’
আছে যারা অর্ধচেতন।”

২৪ শ্রাবণ, ১৩২৯
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ এই আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন নজরুলকে চেনার এক গভীর অন্তর্দৃষ্টির ভেতর থেকে। তাঁর সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ না হলেও, সীমিত আলাপ এবং নজরুলের প্রকাশ্য কর্মতৎপরতার মাধ্যমে তিনি তরুণ কবির অন্তরের বিপ্লবী স্পন্দন বুঝতে পেরেছিলেন। কবির ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টির মধ্যকার অন্তর্নিহিত শক্তিকে তিনি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই এই আশীর্বাণী কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নজরুলের তেজস্বী পথচলার প্রতি এক গভীর সহমর্মিতা ও সম্মানসূচক স্বীকৃতি।

রবীন্দ্রনাথের এই মানুষ চেনার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তাঁর অন্তরজ্ঞান ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর বিপুল প্রতিভার এক স্বাতন্ত্র্যসূচক দিক। অথচ এ গুণটি নজরুলের অন্য অনেক সমসাময়িক বন্ধুর মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। মোহিতলাল মজুমদারের কথাই ধরা যাক—তিনি বারবারই নজরুলকে ভুল বুঝেছেন, তাঁর কবিত্ব ও জীবনদর্শনকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে, মুজাফফর আহমদের চিন্তাশীল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেক বেশি সংবেদনশীল ও বাস্তবঘনিষ্ঠ। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় যে, নজরুল ও তিনি একসঙ্গে কমিউনিস্ট আদর্শ ও তত্ত্ব পাঠের জন্য কিছু বই সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু নজরুল গভীরভাবে সেই পাঠে মনোনিবেশ করেননি। মুজাফফর আহমদও তাতে কোনো জোর করেননি, কারণ তিনি জানতেন যে নজরুলের মতো বিস্ফোরণশীল সত্তাকে চাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাঁর নিজস্ব বোধ এবং অন্তর্চেতনার পথে যেটুকু হবে, তা আপনা-আপনিই হবে।

নজরুল যেসব ব্যক্তির নিকট আশীর্বাদ চেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে সাড়া দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক গুরুত্বের নিরিখে এই আশীর্বাদবাণীগুলির সংরক্ষণ আবশ্যক ছিল। অথচ আজ এগুলির অনেকগুলোই দুষ্প্রাপ্য। ধূমকেতুর অর্ধ-সাপ্তাহিক সংস্করণ এবং পরবর্তীকালের সাপ্তাহিক সংস্করণে নজরুল যেসব ঝঞ্ঝারাভাসী প্রবন্ধ লিখেছিলেন, সেগুলোর একটি সংকলন ‘ধূমকেতু’ নামে বইরূপে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু যিনি বা যারা এ সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন, তাঁরা আশীর্বাদবাণীগুলোর পূর্ণ সংরক্ষণ করে সেগুলিকে প্রারম্ভিক অংশে বা পরিশিষ্ট আকারে গ্রন্থে সংযুক্ত করেননি, যা করলে বইটির ঐতিহাসিক মূল্য আরও বৃদ্ধি পেত। তাঁরা কেবলমাত্র জনপ্রিয় কয়েকটি বাণীই প্রথম দিকে যুক্ত করেছেন। তবু এটিকে আংশিক পূর্ণতার দিকেই অগ্রসর পদক্ষেপ বলা চলে।

অবশ্য, আবদুল আযীয আল আমান তাঁর ‘ধূমকেতুর নজরুল’ বইতে অনেক আশীর্বাদবাণী সংযোজন করেছেন, যা গবেষণার জন্য বিশেষ সহায়ক। এ উদ্যোগ নিছক সাহিত্য সংকলনের চেয়ে বেশি—এ এক ঐতিহাসিক স্মারক সংরক্ষণের প্রয়াস। কারণ, এই বাণীগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা একাধারে নজরুলের সময়ের মননচেতনার মানচিত্র দেখতে পাই এবং সেই সঙ্গে বাংলার নবজাগরণের এক প্রেরণাদায়ক ঐতিহাসিক দলিলও লাভ করি।

প্রায় সবগুলো আশীর্বাদবাণীগুলি সংগ্রহ করতে পারা গেছে, এখানে একে একে সেগুলির উল্লেখ করা হল :

২

২৪ শ্রাবণ শিবপুর হাওড়া থেকে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখেন:

কল্যাণীয়বরেষু,

তোমাদের কাগজের দীর্ঘ জীবন কামনা করিয়া তোমাকে একটি মাত্র আশীর্বাদ করি, যেন শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্য কথা বলিতে পার। তারপর ভগবান তোমার কাগজের ভার আপনি বহন করিবেন।

তোমাদের-

শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

৩

পণ্ডিচেরি থেকে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যময় আশীর্বাদবাণীতে লেখেন:

ভাই পাগল,

তুমি ‘ধূমকেতু’ বার করেছো শুনে সুখী হলুম। ‘ধুমকেতুর’ জন্য আশীর্বাদ চেয়েছো, এ রকম নিখরচা আশীর্বাদ করার জন্য আমি হাত উচিয়েই আছি। আশীর্বাদ করি তোমার ‘ধুমকেতু’ দেশের যারা মেকী, তাদের গোঁফ ও দাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিক, আশীর্বাদ করি তোমার ‘ধূমকেতু’ দেশের যারা সাচ্চা সোনা তাদের খাদ পুড়িয়ে উজ্জ্বল করে তুলুক; আশীর্বাদ করি তোমার ‘ধূমকেতু’বাঙালী মেয়ের মুখে জহরব্রতা রাজপুতানীর সতী-স্ত্রী দেবী -গর্ব ফিরিয়ে আনুক; আশীর্বাদ করি তোমার ‘ধূমকেতু’ জতুগৃহ জ্বালিয়ে দিক, স্থির মণি হয়ে বঙ্গমাতার স্বর্ণ-সিংহাসন সাজিয়ে নিক, ভগ্নধ্যান শিবের চক্ষু দিয়ে বেরিয়ে এসে এ কামুক জাতির কামদেবতাকে পুড়িয়ে ফেলুক আর কামিনী উমাকে করুক শান্ত জ্যোতি তাপসী।

আত্মজয়ের তপস্যার মধ্য দিয়ে বাংলার মেয়েরা, বাংলার নবজাগ্রত শিবসেনাকে পূর্ণ জীবনে মুক্তির স্বর্গে ফিরে পাক।

ইতি —

তোমার বারীনদা (ঘোষ)

৫৯/এ, পুনামালি হাইরোড, তেপারী, মাদ্রাজ

23.07.1922

৪.

অরবিন্দ-বারীন্দ্রের তেজস্বিনী ভগিনী বিদূষী সরোজিনী ঘোষ ১৩২৯ সনের ২৩ শ্রাবণে যে আশীর্বাদবাণীটি পাঠান তার মূল্যও বড় কম নয়। তিনিও কবি নজরুলের অন্তরাত্মাকে সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন:

ভাই নজরুল,

তোমার ‘ধূমকেতু’ বিশ্বের সকল অমঙ্গল, সমস্ত অকল্যাণকে পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলুক—তোমার ‘ধূমকেতু’ যা কিছু অসুন্দর তা ধ্বংস করে সত্য সুন্দর ও মঙ্গল প্রতিষ্ঠার সহায়তা করুক। তোমার ‘ধূমকেতু’মানুষে মানুষে মিলনের সকল অন্তরায় চূর্ণ করে দিয়ে মহামানবের সৃষ্টি শক্তি ও সামর্থ্য এনে দিক!

তোমার সরোজিনী দিদি

২৩শে শ্রাবণ, ১৩২৯

৫.

উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ধূমকেতু’র জন্যে যে আশীর্বাদ পাঠান তা পত্রিকায় মুদ্রণের সময় নজরুল শিরোনামা লেখেন এইভাবে: “ভীষণে সুন্দর বৈরাগ্যভানকারী কাপুরুষের যম উপেনদা লিখেছিলেন—।” এরপর ছাপা হয়েছে মূল আশীর্বাদবাণীটি :

কাজী ভায়া,

রুদ্ররূপ ধরে ‘ধূমকেতু’তে চড়ে তুমি দেখা দিয়েছ—ভালই হয়েছে। আমি প্রাণ ভরে বলছি—স্বাগত।

আজ ধ্বংসের দিন, বিপ্লবের দিন, মহামারীর দিন, দুর্ভিক্ষের দিন,সর্বনাশের দিন—তাই রুদ্রের করাল রূপ ছাড়া আর চোখে কিছু লাগে না

সৃষ্টি যারা করবার তারা কোরবে, তুমি মহাকালের প্রলয়-বিষাণ এবার বাজাও, অতীতকে আজ ডোবাও, ভয়কে আজ ভাঙ্গ, মৃত্যু আজ মরণের ভয়ে কেঁপে উঠুক।

ভয়ঙ্কর যে কত সুন্দর, তা তোমার ‘ধূমকেতু’ দেখে যেন সবাই বুঝতে পারে।

অভিন্নহৃদয়-

শ্রী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

(১৩ মাঘ ১৩২৯ সংখ্যায় ছাপা)

৬.

কুমিল্লার কান্দিরপাড় থেকে বিরজাসুন্দরী দেবী যে আশীর্বাদবাণীটি পাঠান সেটিও কম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়। নিজের নামে ওয়ারেন্ট বার হবার পর এই বিরজাসুন্দরী দেবীকেই নজরুল ‘ধূমকেতু’র স্বত্ব লেখাপড়া করে দেন। আশীর্বাদবাণীটি এইরকম:

মায়ের আশীষ,

গগনে ‘ধূমকেতু’র উদয় হলে জগতে অমঙ্গল হয়; ঝড়, ঝঞ্ঝা, উল্কাপাত, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ, মহামারী অনিবার্য হ’য়ে ওঠে এটা জ্যোতিষ শাস্ত্রের কথা বলে জ্ঞান হ’য়ে অবধি শুনে আসছি। যাঁর আদেশে আজ প্রলয় ‘ধূমকেতু’র উদয় আজ তারই জন্যে অমঙ্গল-শঙ্কায় তাবৎ ভারতবাসী বিত্রস্ত, পথভ্রান্ত, লক্ষ্যভ্রষ্ট আর কেন্দ্র-চ্যুত হয়ে ঘুরে মরছে—আমার বিশ্বাস, নিশ্চয়ই এই অমঙ্গল অন্ধকারের পিছনে সেই মঙ্গলময় ভগবান তাঁর অভয় হস্তে মঙ্গল প্রদীপ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ‘ধূমকেতু’ভগবানের বিদ্রোহী ছেলে। মা বিদ্রোহী দুরন্ত ছেলেকে শান্ত করবার শক্তি রাখে। অতএব তোমার ভয় নেই প্রার্থনা করি যত দিন এই আগুনের শিখা এই ‘ধূমকেতু’র প্রয়োজন, ততদিন এ অমঙ্গল মঙ্গল মতে নিরাপদেথাক্।

আশীর্বাদিকা –

শ্রী বিরজাসুন্দরী দেবী

(১৩ মাঘ ১৩২৯ সংখ্যায় ছাপা)

৭.

‘ধূমকেতু’ প্রকাশের পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে অনেক উল্লেখযোগ্যআশীর্বাদবাণী (কবিতা) এসেছিল।

মায়ের আশীষ

(শ্রীমান কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি)

ওরে লক্ষ্মীছাড়া ছেলে-

আমার এ বেদন ভরা বুকের মাঝে

জাগিয়ে দিলি নূতন ব্যথা

‘মা’‘মা’ বলে কাছে এসে

আবার কবে কইবি কথা?

হাঁরে— এই যদি তোর ছিল মনে

পরবি শিকল নিজের পায়ে

আমায় কেন বেঁধে গেলি

কঠিন স্নেহের শিকল দিয়ে?

পথের পানে ছিলাম চেয়ে

আসবি ব’লে মায়ের কোলে

একি শুনি!! গেছিস নাকি

‘শিকল দেবীর’ পূজায় চ’লে।

অশ্রুত নয় আশীষ ধারা

অবিরত পড়বে রে তোর শিরে

শঙ্কা কিসের? যাও তবে যাও

‘অলক্ষণের বিজয় টীকা’ পরে

হেথা—বাজুক তোমার অগ্নি-বীণা

আগুন ছুটুক সুরে

জ্বলুক আগুন ছড়িয়ে পড়ুক

আঁধার কারা

উঠুক আলোয় ভরে

কাটিয়ে বাধা বিঘ্ন শত

আয় ফিরে আয় ঘরে

মায়ের আশীষ বর্ম্ম সম

রক্ষা করুক তোরে।

২৭ জানুয়ারি ১৯২৩

তোর ব্যথাতুরা-মা বিরজাসুন্দরী দেবী

৮

মায়ের আশীষ

লক্ষ্মীছাড়া ছেলে!

হঠাৎ-আসা তুফান সম প্রলয় নিয়ে এলে।

কোথায় ছিলে দুষ্টু শিশু লক্ষ্মীছাড়া ছেলে৷

তোরে— পথের নেশা ব’ল পেয়ে এই বাদলে

এই ঝড়ে এই জলে?

হতভাগা আয় ললাটে পরিয়ে দি তোর জয়ের টীকা।

লক্ষ্মীছাড়া ছেলে!

ভয় বাধাকে গাট্টা মেরে ওরে প্রগলভ ক্ষ্যাপা

উন্নতশির দাঁড়ালি আজ নির্ভয়ে তুই একা৷

ওরে ও দুশমন

তোর—এ কি ভীষণ পণ!

নিপীড়িতের লাগি

সঁবি এত সাধের জীবন কোন্ দুঃখে বিবাগী,

ওরে ভয়াল, করাল কঠোর লক্ষ্মীছাড়া ছেলে!

সৰ্ব্বনেশে! আয় দিয়ে দি অশিব-টীকা ভালে।

তোরি তরে দুর্দৈব রে দুর্বিপাক আর ঘুর্ণা,

কাল-বৈশাখী সাইক্লোন তোর চাঁচর কেশ আর ওড়না।

মায়ের স্নেহ তোর তরে নয়-

তোর তরে ঐ নিপীড়িতার, নিশ্বাস রোষের অনল,

ধর্ষিতা সব নারীর বক্ষ-মন্থন তুই

প্রতিহিংসা কাল-কেউটের গরল!

এরই মাঝে আয় চলে আয় হতভাগা

আয় অপয়া অলক্ষুণের ধূমকেতু-ধুম-শিখা,

তোর—দগ্ধভালে এঁকে দেবো ‘অলক্ষণের তিলক-রেখা’

অশিব জয়ের টীকা।

২৭ জানুয়ারি ১৯২৩

অমিয়বালা বন্দ্যোপাধ্যায়

৯.

কালিদাস রায় যে আশীর্বাদবাণীটি পাঠিয়েছিলেন তা ‘ধূমকেতু’র ১ম বর্ষের ৯ম সংখ্যায় (২৯ ভাদ্র ১৩২৯ মোতাবেক ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯২২) ছাপা হয়েছিল। বাণীটি এই :

ভাই নজরুল,

তোমার ‘ধূমকেতু’কে সাদর আহ্বান করি—

জাগ ধূমকেতু ধ্বংসের হেতু,

স্বাগত অশির মহোৎসব,

শিবের শ্মশান, জীবের মশান

স্বাগত অশুভ উপ্লব।

সত্যের জয় হোক,

চিত্তের জয় হোক,

নিত্যের জয় হোক,

অসত্যের ক্ষয় হোক,

ইতি—

তোমার কালি দাদা

পুনশ্চ— তোমার লেখা পড়ছি আর অবাক হচ্ছি—তুমি নিজেই ধূমকেতু। তোমার লেখনীতেপশুপতের শক্তি।

ইতি আশীর্বাদক –

শ্রী কালিদাস রায়

১০.

দেওঘর থেকে জনৈক সত্যানন্দ একটি ছোট্ট চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং সেটি (১ম বর্ষের ৯ম সংখ্যা)সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল। এক সময় হাওয়া পরিবর্তনের জন্য নজরুল যখন দেওঘরে গিয়েছিলেন সে সময় সত্যানন্দের সঙ্গে আলাপ হয়ে থাকবে। তিনি লিখেছেন:

ভাই নজরুল,

আজ জন্মাষ্টমীর উপোষ করে ভাঙ্গা ঘরের মধ্যে কালো কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে আছি এমন সময় ‘ধূমকেতু’ এসে উদয়। পড়ে আনন্দে আত্মহারা হ’য়ে গেলুম। ক্ষিদে তেষ্টা নাশ হ’য়ে গেল।

খোদার সকাশে প্রার্থনা–তোমার আয়ু, যশ, বল, দিন দিন বর্ধিত হউক। আজ তোমার কাগজ যে পড়েছে তারই তাক লেগে গেছে। ছেলের দলে হুটোহুটি পড়ে গেছে।

ইতি –

তোমার জনৈক ফকির ভাই

জগৎগুরু সত্যানন্দ

১১.

৩২ শ্রাবণ কুমিল্লা থেকে অতীন্দ্র রায় একটি নাতিদীর্ঘ চিঠিটি লেখেন তার বৈশিষ্ট্য এই যে তিনি লেখক নজরুলের বিভিন্ন কবিতা ও প্রবন্ধের শব্দ, পংক্তি বা অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে আপন বক্তব্য পরিস্ফুটিত করেছেন।

ভাই নজরুল,

প্রাণ খুলে আজ তোমায় আলিঙ্গন দিচ্ছি।’ধূমকেতু’র সারথি বেশে আজ যে ‘মহাবিপ্লব হেতু’“স্রষ্টার শনি’রূপে ভাঙার অগ্নি বিষাণ বাজিয়ে এ ‘শা-ঘন-তমসাবৃত’আকাশে দেখা দিয়েছ এস, সারথি, এস বিগত বিপ্লবের ধূমকেতু, আমরা তোমায় সাদরে অভিনন্দন করছি।

দিকে দিকে আজ যে রুদ্রের তাণ্ডব নৃত্য চলছে এস, ‘উল্কা অশনি বৃষ্টি’করে সর্বনাশের ঝাণ্ডা উড়িয়ে তুমিও তোমার ‘ধূমকেতু’নিয়ে এসে তাতে যোগ দাও। তোমার তুরীয়লোকের তীর্যক গতিতে সারা দুনিয়া কেঁপে উঠুক।

ধ্বংস ছাড়া সৃষ্টি নেই—ভাঙ্গা ছাড়া গড়া নেই; তাই বলি এস ক্ষ্যাপা, এস ‘ধূমকেতুরপুচ্ছ দাপটে ‘অশির ‘অনাসৃষ্টির’ অনন্ত ‘লহরী তুলিয়া’’আঘাতের’ পর ‘অফুরন্ত আঘাত কর।’’বিপ্লব’, ‘বিদ্রোহের’ অগ্নিদাহনে সবকিছু পুড়িয়ে নিখিলের ‘শোকাগ্নি’ রূপে দেখাদাও।

অগ্নি-রথের সারথি, খেলবে যদি এস, আত্মবিস্মৃত ভীত আধমরা দেশের বুকের উপর ‘উগ্রচণ্ড মুখে আমি নাগিনীর’ খেলা খেলে বেড়াও; তপ্ত অভিশাপে অভিশপ্ত দেশ ‘মৃত্যুর মুখে থুতু দিয়ে রক্ত-রুদ্র উল্লাসে’ মেতে উঠুক।

হে সারথি, দৃঢ় করে বল্গা ধরে, যে ধূমকেতু’র ‘শিখায় নিয়ত ত্রিশূল বাশুলি বজ্ৰ ছাড়’ ছড়ান, ‘পুচ্ছে কোটি নাগশিশু বিষ ফুৎকারে উদগারে’ একবার তাকে বেশ করে কশাঘাত কর; তার ‘উগ্র ক্ষিপ্ত তেজে’ সমস্ত আঁধার পুড়ে যাক। সৃষ্টিছাড়া পাগল লক্ষ উচ্চশির ‘দৃপ্ত জয়শ্রীর রাজ রাজটীকা পরে’ আগুনের সিঁড়িতে পা দিয়ে শ্মশান কোলে দাঁড়িয়ে গেয়ে উঠুক— ‘হর হর বম্ কম্।’

ইতি—

তোমারই পরিচিত ধূমকেতু

অতীন্দ্র রায়

কুমিল্ল, ৩২শে শ্রাবণ

১২.

কোচবিহার থেকে প্রসন্নকুমার সমাদ্দার এবং কৃষ্ণনগর গোয়াড়ী, নদীয়া থেকে ৫.৫.১৩২৯ তারিখে ‘বঙ্গরত্নে’র সম্পাদক পরিব্রাজক নারায়ণ দাস চট্টোপাধ্যায় একটি সুদীর্ঘ পত্র লেখেন। এ দুটি চিঠিই ‘ধূমকেতু’র নবম সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল।

বীর কবি কাজী সাহেব,

ঘন্টাখানেকের মুখোমুখি আলাপ। নামটা মনে আছে কিনা তাও জানি না। ভোরে উঠেই দেখি, টেবিলের উপর ‘ধূমকেতু’আর তার সারথি আপনি। বুকের ভিতরটা যে চন্চন্ করে উঠলো। এগারো বছর আগের সেই সুদূর কুচবিহারে আমাদের তিন পলাতক দাগীর ‘ধূমকেতু’বার করার কথা মনে পড়ে গেল। এক সংখ্যা বার করার পরই রাজপুরুষের কনিতে আমাদের কণ্ঠরোধ হয়ে এলো। ভেতরে দারুণ ইচ্ছা নিদারুণভাবে চাপা পড়ে গুমরে গুমরে ধোয়া হয়ে আকাশে বাতাসে মিশে গেল। এতদিন পর সেকি আপনার তপ্ত বুকের ভেতর রূপলাভ কল্প। কি আর বলব? আপনার ধূমকেতু যেন ভারতের শান্তি যজ্ঞ ধুমের বার্তা বহন করে আনে। বারীনদাও তাঁদের সেই মুড়ো ঝ্যাটা বের কর্বার কথা উল্লেখ করেচেন শুনে সুখী হলাম।

সারথি, আমাদের দৃপ্ত ইচ্ছা রৈল এর পেছনে এর ফুলকি যোগাবার জন্য।

ইতি আপনাদের –

শ্রী প্রসন্নকুমার সমাদ্দার

১৩.

প্রিয় ‘ধূমকেতু’স্রষ্টা সম্পাদক মহাশয়,

বিধাতা আপনাকে যে সম্পত্তির মালিক করে দুনিয়ার হাটে পাঠিয়েছেন, তার এমন অজস্র ব্যয় না করলে লাভ আছে, বিধাতার দান বড়ই জ্বালাময় ও দানে যেজন ধনী হন তাঁর লক্ষ্মীছাড়া নাম ধরাবাঁধা। আপনি অনেকের চোখে অমঙ্গলের মূর্ত প্রতীক হলেও আমি আপনাকে মঙ্গলের দূত বলেই ভাবি৷

আজ ব্রাহ্মণের বিমূঢ় দুর্ব্যবহার, শূদ্রের হাস্যকর দাস্যভাব অগ্নিস্রোতে ভেসে গেছে, জগতের মধ্যে একটা একাকার ভাব এসে পড়েছে, এখন আর কেউ কাউকে প্রভুত্বের তক্তে বসিয়ে তার পায় লুটিয়ে মনুষ্যত্বের ও ভগবানের অবমাননা করতে রাজী নয়; চণ্ডাল’ আজ রাজা হয়েছে, মহারাজার হাস্যকর আস্ফালন আর নেই এমন মধুর সমন্বয় কি ধূমকেতুর রুদ্রপুচ্ছাঘাত ব্যতীত সম্ভব হয়? আমার বড়ই আনন্দ হচ্ছে ধনীদের গরব একটু টুটে চোপ্ খেয়ে গেছে, দীনের প্রাণ আত্মগরিমায় ভরে উঠেছে, এ কি ভগবানের পরম আশীর্বাদ নয়? আসুক আজ লক্ষ লক্ষ ধূমকেতু ভাঙুক স্রষ্টার উদ্ধত পৌরুষতা, টুটে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাক দর্পিতের কদর্যদর্প, মারুন পুনঃ পুনঃ বজ্র ছড়ি; ছিঁড়েদিন অসত্যের দুষ্টব্রণ, সমাজের ক্ষতস্থানে বিদ্যত্তর বারি নৃশংস হয়ে ফুঁড়ে দিতে পারলে পরম উপকার হবে, মঙ্গল হবে, হাসুক লোকে পাগল বলে, করুক উপেক্ষা। আপন পথে অগ্নি রথে এমনি করেই ছুটতে হবে। আশীর্বাদ করি আল্লাহ শক্তির বন্যায় আপনাকে দুৰ্দ্ধৰ্ষতা দানে ক্ষেপিয়ে তুলবেন

পরিব্রাজক—

শ্রী নারায়ণ দাস চট্টোপাধ্যায়

বিদ্যাভূষণ ভাগবতরত্ন

তত্ত্ব বাচস্পতি, তর্ক চিন্তামণি, ভাব বারিধি, সাহিত্য শিরোমণি,

কাব্যালঙ্কার ভারতী, সিদ্ধান্ত বিশারদ (সম্পাদক :‘বঙ্গরত্ন’)

১৪.

দুটি অভিনন্দন। এ দুটি অভিনন্দন কবিতায় লিপিবদ্ধ হয়েছিল। প্রথমটি লিখেছিলেন শক্তিপদ ভট্টাচার্য। এই দীর্ঘ অভিনন্দন বাণীটি ‘অভিনন্দন’শিরোনামায় ‘ধূমকেতু’র ১ম বর্ষের ১৩শ সংখ্যায় (শুক্রবার, ২৬ আশ্বিন ১৩২৯ সন; ১৩ অক্টোবর, ১৯২২ সাল) মুদ্রিত হয়েছিল।

অভিনন্দন

শ্রীশক্তিপদ ভট্টাচাৰ্য

মা’ত করেছ, মা’ত করেছ মা’ত করেছ বাংলাকে

তাই জুটেছে চারপাশে আজ

শিষ্য তোমার লাখ লাখে

তুমি মা’ত করেছ মা’ত করেছ

মা’ত করেছ বাংলাকে—

তুমি মাত করেছ বাংলাকে।

বস্ত্রা হ’তে পসরা নিয়ে

গুল বাগানের গুল থেকে

খুন খারাবীর রং মেখে

তুর্কী প্রিয়ার দীপক রাগের

সংসার ছেঁকে

কি সুর তুমি আনলে কবি

বঙ্গ-বাণীর মন্দিরে’

বীণার গেল তার ছিঁড়ে

তোমার দীপক ঝঙ্কারে

তোমার ধনুর টঙ্কারে।

তাই দেখি আজ বঙ্গ-বাণীর

সেবক সকল সুর হারা

কামান যখন গৰ্জ্জাল আর

ধরল সঙ্গীন গুর্খারা

তুমিই শুধু তখন কবি

সুর মিশালে গর্জ্জনে

ধর্ষণ নীতি-তৰ্জ্জন শুনি

পোষণ করিলে বর্জ্জনে।

তোমার প্রিয়ার চুম্বনে

তোমার গীতির গুঞ্জণে

 

চারপাশে ঐ লাখ লাখে

মাত করেছ মাত করেছ মাত করেছ বাংলাকে

তুমি মাত করেছ বাংলাকে।

 

তোমার দীপ ঝঙ্কারে

নবীন বেদের ওঙ্কারে

আশার বাণীর প্রাণভরে

 

ঐ গোলার মুখে

খোলা বুকে

ভেংচে সুখে, সুখীর তনয়

বরণ করে মরণেরে

ধায় কারাগারে

গায় কারাগারে আজি শিকলে-বিকল

মরণে কবির বরণ

আজি শরণে করিব দূর

আজি শত্রু মৃত্যু জয় করে

মোরা মুক্ত করিব পুর।

মউমাছি আজ সাবধানী

শুনছে কাহার সার-বাণী

ভুলেও ভোলে না মউরাণী

তাই পাহারা ঘিরেছে মৌচাকে

হাজার হুলে দুল দিয়েছে

ফুল রাণী ঐ লাখ লাথে

মাত করেছ মাত করেছ মাত করেছ বাংলাকে।

তোমার হাতের কোরবাণী

বললে কি সে জোর বাণী

ওরে কোরবাণী, কোন দূর বাণী

বলে কোরবাণী আজ কোরবাণী

জান কোর বানে

আর চাসনেক ঘর দোর পানে

হান ভোর পানে

তোর ত্রস্ত নয়ন

নবীন তানে

সোনার স্বপন

ঐ জেগেছে জোর গানে

ঐ ছুটেছে তোর পানে

তা’র আলোর কণা

লক্ষ কণার

রিপুর বুকে ত্রাস হানে

আজ রাস্তা নেরে সহজ সরল

শত্রু ভীতি মুক্তি-পাগল

ভাঙল অগল, জাগল’ পাগল

তোর গানে তাই জোর প্রাণে।

মলয় আনিল প্রলয় ঝঞ্ঝা বৈশাখে

মাত করেছ মা’ত করেছ

মা’ত করেছ বাংলাকে

তুমি মাত করেছ বাংলাকে।

হাফিজ কবির গুলবাগে

প্রাচীর রবির ফুলরাগে ফুলের সাজি

তুমিই কাজী

ভরলে ভোরে আন মনে

হাফিজ হ’ল ধন্য তোমার গান শুনে

তার গজল-প্রিয়ার সজল আঁখির

নীরটুকু

তার                                                                    দরদী প্রিয়ার বুকের কাঁপন

ক্ষীরটুকু

নিয়ে                                                                      পূর্ণ করিলে বঙ্গবাণীর পাত্র

আভরণহীন গাত্র

হ’ল                                                                   শোভন তোমার গান শুনে

কাঁপল তারা আসমানে

তারপরে ঐ গর্জে কামান

বাজল বিষান

জাগল কৃষাণ

লাখ লাখে

‘বিদ্রোহী’ দিল অসুরের ছানা

কামান গানের তাল ফাঁকে

মাত করেছ মা’ত করেছ

মা’ত করেছ বাংলাকে।

সাবাস কবি সাবাস

মুমুর্ষু এই জাতটিকে ভাই

এমনই করেই জাগাস্

ভয়-ভীতু ঐ দাঁড়-প্রিয়দের

এমনই করেই ভাগাস

বণিক পিশাচ পশুগুলোর

এমনই করেই দাবাস

তাণ্ডবেরই তাণে

অট্টহাসির বাণে

এমনই করেই ভাগাসরে ভাই

এমনই করেই ভাগাস

সাবাস কবি সাবাস।

লক্ষণীয় বিষয় হল এই যে কবিতাটি ‘ধূমকেতু’র উদ্দেশ্যে লিখিত হ’লেও সামগ্রিকভাবে কবির কাব্য-স্বাতন্ত্র্যের কথাই এতে সোচ্চারিত হয়ে উঠেছে। কবিতাটি নিশ্চয়ই কবির মন-মানসে কিছুটা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

১৫.

দ্বিতীয় অভিনন্দন কবিতাটির লেখক হলেন বিখ্যাত দাদাঠাকুর ওরফে শরৎচন্দ্ৰ পণ্ডিত। দাদাঠাকুর তখন ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার প্রেসে (পণ্ডিত প্রেস) বসে তিনি লিখলেন একটি আশীর্বাদবাণী। শিরোনামটিও অপূর্ব—শিরোনামাসহ সম্পূর্ণ আশীর্বাদবাণীটি :

‘ধূমকেতু’র প্রতি বিষহীন ঢোঁড়ার অযাচিত আশীৰ্বাদ—

‘ধূমকেতু’তে সওয়ার হয়ে

আসরে আজ নামলো কাজী৷

আয় চলে ভাই কাজের কাজী!

তোর সাচ্চা কথার আচ্ছা দাওয়াই

পাবে যারা বেঈমান পাজি

আয় চলে ভাই কাজের কাজী!

‘হাবিলদার!’আজ আবিলতার

কলজে বিঁধে এপার ওপার

চালিয়ে বুলির গোলাগুলি

জাহির কর তোর গোলন্দাজী।

আয় চলে ভাই কাজের কাজী!

কোনটা বদি কোনটা নেকী

কোনটা খাঁটি কোনটা মেকী

দেশের লোককে দেখা দেখিরে

‘নজর উলের’তীক্ষ্ম নজর

খাক্‌ করে দিক দাগাবাজী৷

আয় চলে ভাই কাজের কাজী!

ধরিয়ে দে সব অত্যাচারী

পাকড়া যত হত্যাকারী

জোচ্চোরেদের দোকানদারী

চোখে আঙুল দিয়ে লোকের

দেখিয়ে দে সব ধাপ্‌পাবাজী

আয় চলে আয় কাজের কাজী।

জানিস কলির বামুন মোরা

কেউটে নই যে আস্ত ঢোঁড়া!

এই আশীর্বাদবাণীটি কিন্তু ‘ধূমকেতু’তে ছাপা হয়নি— আবদুল আযীয আল আমান সরাসরি দাদাঠাকুরের নিকট হতে সংগ্রহ করেছিলেন। এ সম্পর্কে ১৯৬৩ সালের ২৯ এপ্রিলে হাওড়া থেকে লেখা একটি চিঠিতে দাদাঠাকুর তাঁকে জানিয়েছিলেন: ‘নজরুল ইংরেজ সরকারের সন্দেহভাজন ছিল। আমার আশীর্বাদ ছাপাইলে তাহার এই কর্মে যথেষ্ট উৎসাহ আছে জানিয়া সরকার আমার একমাত্র মুখের গ্রাস বন্ধ করিয়া দিবে। এ কথা আমাকে এবং নলিনীকে জানাইয়াছিল। আমার অন্নের ক্ষতি যাতে না হয় তজ্জন্যই সে ওটা প্রকাশ করে নাই।’

১৬.

কল্যাণস্পদেষু

তোমার লাল কালিতে লেখা চিঠিখানি পাইলাম। তোমার কাগজও পাইয়াছি—সে-ও তোমার জীবনের রক্ত দিয়া লেখা। আমার সমুদয় অন্তরের আশীর্বাদ জানিবে।

নিজেকে ‘অমঙ্গল’ বলিতে ভালোবাস। আমি হিন্দু মেয়ে। শ্মশানের ভস্ম, মড়ারমাথার খুলি, ধুতরাফুল, কালকূট বিষ, ভূতপ্রেতের নাচ—এই সমস্ত বীভৎস অকল্যাণের মধ্যে শিবেরই লেখা দেখিতে ভারতবর্ষ আমাদিগকে শেখায়।

এই কারণে, পুনরায় আমার আশীষ জানিবে।

ইতি

শুভানুধ্যায়িনী—

হেমপ্রভা মজুমদার

১৭.

ভাই নজরুল-

তোমার প্রেরিত প্রথম সংখ্যা ধূমকেতু প’ড়ে বড় আনন্দ পেয়েছি। প্রার্থনা করি মায়ের সন্তানের উদ্দাম সহিষ্ণুতা হরি সহায় হইয়ে পূর্ণ করুন।

তোমার জনৈক হিন্দু বোন

সন্ন্যাসিনী যোগমায়া

দেবী পুরী

১৮.

স্নেহের ভাইটি আমার!

তোমার ‘ধূমকেতু’র প্রশংসা না করে কিছুতেই আমি চুপ থাকতে পারলাম না যদিও আমার কোনো মতামত তুমি জানতে চাওনি।’ধূমকেতু’পড়ে যে কি আনন্দ—কি সুখ তা যিনি এবার অন্ততঃ চোখ বুলিয়ে গ্যাছেন তিনিই বুঝতে পেরেছেন। তোমার মত এমন প্রাণখুলে কাউকে গ্রাহ্য না করে এমন মুক্ত পুরুষের মত নির্ভয়ে খাঁটি কথা বলতে কাউকে দেখিনি। তোমার জাগরণী বাঁশীর সুরেও যদি এ পতিত জাতটা একটুকু মনুষ্যত্ব শিক্ষা না করতে পারে এমন কাগজেরও আদর করতে না জানে তবে বুঝব এ মরা জাতটা সত্যই মরতে বসেছে। আশীর্ব্বাদ করি তুমি কল্যাণময় সুন্দরময়—সত্যময় হও। এ সঙ্গে তোমার কাগজেরও দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

ভালোবাসা ও আশীৰ্ব্বাদ নাও।

তোমারই বোন

চারুবালা দত্তগুপ্ত

১৯.

২৬/৮/১৯২২

কল্যাণবরেষু—

তোমার’ধূমকেতু’চমৎকার হয়েছে। ইহা অনাদি কবির উদ্ভট শ্লোকের মত সমস্ত সাহিত্য জগৎকে মোহিত করেছে। এই ব্যোমবাসী বেদুইনকে আমি নমস্কার করি। তোমার বিজয় গৌরবে আমি সর্বাপেক্ষা সুখী তাহা বলাই বাহুল্য।

আর—

ওকে এলো আলোরথে

ধূমকেতু সারথি,

অঞ্জলি আগুনের

দিয়ে করে আরতি?

তারা সে বীণার মাঝে

বাজের গমক বাজে,

অনলের মাঝে রাজে

সীতা সম ভারতী।

শ্রী কুমুদরঞ্জন মল্লিক

২০.

পরম কল্যাণীয় শ্রীমান কাজী নজরুল ইসলাম ভাই সাহেব কল্যাণবরেষু—

ভাই কাজী সাহেব,

শুনলুম তুমি সারথি হয়ে ‘ধূমকেতু’কাগজ চালাবে। যে উদ্দেশ্যে কাগজখানি বার ক’চ্ছ সে উদ্দেশ্য তোমার সফল হোক, তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হোক, আর তুমি সৰ্ব্ব বিষয়ে সিদ্ধিলাভ কর, ইহাই আমার আন্তরিক আশীর্বাদ।

ইতি—

তোমার সতত শুভানুধ্যায়িনী

বউ দিদি

পরিসুন্দরী ঘোষ

২১.

৩৩, বেনেপুকুর রোড

কলিকাতা

ভাই কাজী সাহেব,

স্বয়ং বিশ্বকবি যাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ, তাঁকে আমার মর্তলোকের ভক্তি নিবেদন করিতে যাওয়াও ধৃষ্টতা। সেই পরমপুরুষকে ধন্যবাদ; আজ মুসলমান বাঙলার একটি দৈন্য দূর হইয়াছে। আজ সাহিত্যের পুণ্য আঙ্গিনায় আপনার সমাজ দাঁড়াইবার মত যে স্থানটি পাইয়াছে, তাহা আপনারই দয়ায়। আপনি আমার ভ্রাতা, আপনাকে তোষামোদ করিব না। চির অন্ধকারের জীব আমরা, আঁধারে আলোর স্বপ্ন দেখাই আমাদের কাজ। দুর্দিনের ‘রাতের ভালে’প্রতিভার আলোক দেখিয়া প্রাণে যে আনন্দ লাভ করিয়াছি, তাহাই একটু ব্যক্ত না করিয়া পারিলাম না।

ফজলুল হক সেলবর্মী

১ম বর্ষ ৮ম সংখ্যায় (২৬শে ভাদ্র ১৩২৯), ধূমকেতু’তে প্ৰকাশিত

২২.

অগ্নি-বাণী

শ্রী প্রিয়ম্বদা দেবী

পুঁথি-পত্র ফেলে দাও, প্রদীপ তুলিয়া নাও

দাঁড়ায়ে বরণ কর আপন দেবতারে।

অমানিশা অন্ধকার ঝর ঝরে বারিধার

কোথা হ’তে বার বার পাখী যেন ডাকে কারে।

খুঁজিয়া খুঁজিয়া আঁখি সন্ধান পায় না তারে,

আজি আকাশের ভালে, তারা দীপ নাহি জ্বালে

আশঙ্কা-তিমির-জালে, রুদ্ধ নেত্র চারি ধারে;

তব পূজা-দীপখানি নষদীপ্ত অগ্নি-বাণী,

নয়নে আলোক হানি, দেখাবে খুঁজিছ যারে।

২৩.

পথ-শেষে

শ্রীসাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়

নিপীড়িত হে ভারত, যে তোমারে করিছে লাঞ্ছনা,

আপনার দৃপ্তবলে আপনারে করে সে বঞ্চনা।

নিজের সর্বস্ব দিয়া জীর্ণ বস্থা করিয়া সম্বল

অনাহারে অনিদ্রায় গৃহহীন ভিখারীর দল

রাজপথে চলিয়াছে বিপর্যয়ে জয়ধ্বনি করি’

আপনার রক্তে-রাঙা-ছিন্ন ধ্বজা শীর্ণ হস্তে ধরি’

সহিতেছে প্রাণপণে অবিরাম ঘোর নির্যাতন,

তারাই ত টলাইবে বিধাতার রাজ-সিংহাসন।

রক্ত-চক্ষুশস্ত্রপাণি অগ্রহীন দুর্বলে দলিয়া

আজি বটে দলে দলে দর্পভরে যেতেছে চলিয়া,

এক দিন অবসন্ন হবে তারা আপন আঘাতে,

মার্জনা মাগিবে জানি নতজানু অবনত মাথে।

আপনার বক্ষ পাতি’লক্ষ অস্ত্র-আঘাত যে সয়,

হে ভারত, তুমি জান পথশেষে হবে তার জয়।

২৪

৭ নং চৌধুরী লেন

শ্যামবাজার, ১৬ই ভাদ্র, ১৩২৯।

কবিবর শ্রীযুক্ত কাজী নজরুল ইসলাম চিরভাজনে কল্যাণবরেষু-

‘ধূমকেতু’যে তিন সংখ্যা (১, ২, ৩) আপনি আমার নিকট পাঠাইয়াছেন, তাহা পাঠ করিয়া বিশেষ প্রীতিলাভ করিয়াছি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ সে কথা আপনাকে জানান হয় নাই, মার্জ্জনা করিবেন। শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহোদয় অগ্রণী হইয়া যে পত্রিকার পরিচয় প্রদান এবং শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় যাহার উপর আশীর্বাদ বাণীবর্ষণ করিয়াছেন, তাহার সম্বন্ধে কোন কথা বলা আমার পক্ষে নিষ্প্রয়োজন। ইহা বিনয় নহে, সত্য কথা। তবে এই পর্যন্ত বলিতে পারি যে, যাঁহারা আপনার তেজস্বিনী, স্বভাবসুন্দরী কবিতার পক্ষপাতি, তাঁহাদের দলভুক্ত হইবার সৌভাগ্য হইতে আমিও বঞ্চিত নহি।

আমি আপনার এবং আপনার পত্রিকার দীর্ঘজীবন কামনা করি। আর একটি কথা পত্রিকা প্রকাশ করিয়া আমার মত নিভৃতবাসীকে যে আপনি বরণ করিয়াছেন, তজ্জন্য আমি আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিলাম।

নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী—

শ্রী দেবেন্দ্রনাথ বসু

২৫.

বাংলার ধূমকেতু!

দাও—দাদা—দাও। বাংলার মড়াগুলোর মরা রোদে শুকনো চিত্তার্য আগুন ধরায়ে দিচ্ছো দাও। জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাক সব –তারপর যদি জ্যান্ত মানুষ গজাবে, এই বাংলায়৷ তাই ত বলি দাদা। চিরকাল কি এমনি করে দাঁত মুখ সিঁটকেয়ই পড়ে থাকবে নাকি? মাথার উপর চন্দ্র সূৰ্য্য জ্বলছে ত। এ কি বাবা শুদ্ধ একজার পি-পু-ফু শ’য় যল্লুক পেয়েছ নাকি? দেখ ভাই সারথি! তোমার ত দু’এক হাঁড়ি ভাল খাঁটি ভৈস ঘি। (বটকৃষ্ট পালের দোকানের ঘি বাজারে উৎকৃষ্ট) মাঝে মাঝে চিতাগুলোর উপর ঢেলে দিও ত। পোড়ে ত দাউ দাউ করেই পুড়ুক –শেষে কি না আধাকাঁচা হয়ে থাকলে বাপ-পিতামহর একটা দুর্নাম রটে যাবে বাবা! এ তিলে তিলে শুকিয়ে শুকিয়ে কুঁকড়ে কুঁকড়ে তোমার ছাইয়ে ভেতরটা একেবার ঝুনো হয়ে তেতে গেছে। সাবধান গাওয়া ঘি বা বক্রী ঘৃত নিও না গভীরের পাও ত ভাল হয়, না পেলে অগত্যা৷

কি ক’রে তোমার অভিনন্দন করি—ভেবে পাই না – তোফা ছেলে কিন্তু তুমি৷

ইতি – তোমার অপরিচিত

ভাইজান

শ্রী অদ্বৈতকুমার সরকার

২৬.

অভিনন্দন

শ্রীপ্রভাময়ী মিত্র

 

ওগো, কে বিজয়ী ওই বীর,

চির-উন্নত যার শির

আজি তিমির টুটিয়া

উঠিল ফুটিয়া

নবীন প্রভাত সূৰ্য্য,

ওর কিরণে পরশি

উঠিল বিকশি’সদ্য,

বিলাস-লালসে

মুদিত জীবন-পদ্ম,

সে যে সুপ্তির ঘোর নীরবতা ভেদি

বাজালে বিজয়-তুৰ্য্য।

দুইটী প্রাচীন সুমহান জাতি

হিন্দু মুসলমান,

আজি একহ’য়ে গিয়ে নিবিড় ঐক্যে

গলাগলি করে’ বিপুল সখ্যে,

উহারি উদার বিরাট বক্ষে

মিলিত জাতির পুণ্যপ্রয়াগ

নিয়ত প্রবহমান,

নিশি ভোর না হ’তে কি তাই শুনি

ওরি পুণ্য সে আজান ধ্বনি,

নত হয় শত শির

ওগো, কে বিজয়ী ওই বীর?

ঐ বর্ম্মের পরে ওর

কত ঝরিয়া পড়িছে লোর,

সে যে অত্যাচারীর বক্ষের’ পরে

হানে অসি সুকঠোর।

হোক্‌ না দানব, হোক্‌ না দেবতা,

হোক্‌ সে স্রষ্টা, আপনি বিধাতা,

সহিবে না ভয়ে কার

খেয়ালী অত্যাচার।

দেবতা দানব কম্পিত সবে

মহা মানবের হুঙ্কার রবে

ধরণী ছাড়ায়ে উঠে নীল নভে

ওর গর্জন ঘোর,

আর ঝলে অসি সুকঠোর।

ওই আলোকে আকাশ উচ্চ,

ওর বাহন অনল-পুচ্ছ,

সে যে বিশ্বরাজারে জানায় দত্তে

মানব সে নয় তুচ্ছ।

ক্ষুদ্রের মাঝে

রুদ্র সে রাজে

অণু হ’তে অণু, মহৎ হ’তেও মহত্তর;

মৰ্ত্ত মানব মূৰ্ত্ত মহিমা,

খেয়ালে চলে না মহেশ্বর।

তীব্র বেদনা অভিমান তার

বিধাতার বুকে লাগে বুঝি ভার

কাঁপে হিয়া থর থর

মৌন নিরুত্তর,

ও সে দহিয়া বহ্নিদাহে

রুষিয়া যখন চাহে,

দেবতার চির অনিমেষ আঁখি

মুদে যায় ভয়ে বুঝি কাঁপি কাঁপি,

ঝড়ের প্রদীপ হেন

মহাপ্রলয়ের মত জ্বলে বেগে

উম্মাদ ছুটে উদ্দাম বেগে

ধূমকেতু পরে যেন

অনল-পুচ্ছ আছাড়ি’ পিছাড়ি’

অগ্নিফুল্কা উল্কা উগারি

ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোমে

বহ্নি বিথানি’ রোমে অনুরোমে,

অত্যাচারের মারণ-যজ্ঞ পূর্ণ আহুতি

বিদ্রোহ হোমে,

গগন ভুবন ভরি ধূমে ধূমে

গর্জিয়া ফিরে ধূমকেতু,

অযুত শিখায় আলোক জ্বালায়

বিজয়ী বীরের জয়কেতু।

 

২৭.

৭২ মেছুয়াবাজার স্ট্রীট

শ্রদ্ধাস্পদ‘ধূমকেতু’সারথি!

অনেকদিন আগে আমি আপনাকে খেতাব দিয়েছিলাম, ‘বাঁধন ছেঁড়া’ আজ দিলাম, ‘সত্য সাধক’সত্যের সাধনায় সিদ্ধিলাভ করুন ইহাই প্রার্থনা৷

মিসেস এম. রহমান

মাননীয়েষু

আপনার’ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যা পাইলাম। পত্রটি সুন্দর হইয়াছে। আমাদের নমস্কার গ্রহণ করিবেন আপনার কাগজ সাহিত্যিকগণের আদর পাইবে ইহা বেশী কথা নয়, দেশের উপকারে আসিবে।

ভগবান আপনার ও আপনার কাগজের দীর্ঘজীবন দান-করুন ইহাই প্রার্থনা।

ভবদীয়-

অভয় চৈতন্য

২৮.

শ্রীমান কাজী নজরুল ইসলাম

স্নেহাস্পদেষু-

তোমার ‘ধূমকেতু’তে আমায় লিখতে আহ্বান কোরেছ এটাকে ভালবাসার পক্ষপাত বোলেই মনে কোল্লুম। যাইহোক্ আমি সর্বান্তঃকরণে আশীর্ব্বাদ করি তোমার উদ্দেশ্য সার্থক হোক্;—আমি এ কথা বিশ্বাস করি যে তুমি যার সারথি তার বিজয়ই হবে।

১৫ ই শ্রাবণ, ১৩২৯

ইতি –

তোমার নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষিণী বৌদিদি

শ্রীতমালতা বসু

২৯.

ভাই নজরুল,

ধূমকেতুর আবির্ভাব বার্তা শুনে সকলে চঞ্চল ও উৎসুক হ’য়ে উঠেছে। কিজানি সে কি প্রলয় আনবে। তার লেজের স্পর্শে হয় তো পৃথিবীটাই ধ্বংস পাবে। ধূমকেতুর জীবনে বিপথে ঘোরাই কাজ—যখন তখন দেখা দেওয়াই তার নিয়ম। প্রার্থনা করি তোমার ধূমকেতু আমাদের মানস-আকাশে এই ঘোর দুর্যোগে একটা আলোকের ঝাপটা দিয়ে দেবে।

তোমার

হেমন্ত দা

(শ্রী হেমন্তকুমার সরকার)

৩০.

সোদরোপম শ্রীমান কাজী নজরুল ইসলাম প্রিয়বরেষু-

প্রলয়াত্মিকা প্রোজ্জ্বল শিখা-সর্বনাশের সাথী,

জ্বালুক, বন্ধু, ধূমকেতু তব বিশ্বদহন বাতি।

চক্ষে তাহার যে বিপুল জ্বালা বক্ষে যে কালানল,

পুচ্ছে জ্বলিছে অভিশাপরূপে যে মহা অমঙ্গল,

এক সাথে তাহা হানুক মিলায়ে ভীষণ বজ্রবেগে—

পাপ খাণ্ডব যাক জ্বলে’তারি উল্কা ফুল্কি লেগে’;

দেশভরা যত অধর্ম যতু পুড়ে’ হোক্ ছারখার,

যত অসত্য, ভস্মের মাঝে হোক সমাপ্ত তার;

তব প্রদীপ্ত সংমার্জ্জনা অত্যাচারের ভালে

শেষ লেখা তার লিখে’দিয়ে যাক্ চিতার বহ্নিজালে।

তোমার স্নেহমুগ্ধ

শ্রী যতীন্দ্রমোহন বাগচী

৩১.

ধূমকেতু দাদা,

শুনলাম নাকি—তুমি এবার স্বর্গ থেকে সত্যি থেকে নেমেছ? আজ বছর দশেক আগে একবার তুমি তোমার শূন্য মার্গের গোপন আবাস থেকে আকাশের পথে বেরিয়ে তাদের দেখা দিয়েছিলে, কিন্তু তখন তজানতে পারিনি যে সেভ্রমণ ছিল তোমার মর্ত্যবাসীকে দূর থেকে দেখে নেবার, চিনে নেবার জন্যে। এখন বুঝেছি তা হলে যে, তখন থেকেই তোমার এ মতলবটা মনে মনে ধোঁয়াচ্ছিল, ব্যথিতের কাঁদন হাওয়ায় আজ সে দপদপিয়ে জ্বলে উঠেছে।

যাক—এখন তোমায় একটা কথা বলি মন দিয়ে শোন। বলি মর্ত্যের লোকদের লাগছে কেমন?যে মতলব করে গেলে তা সফল হবার আশা ভরসা আছে কিছু?মর্ত্যের লোক-বিশেষত ভারতবাসীরা তো তোমার নাম শুনেই আঁৎকে ওঠে। আজ তাঁদের জীর্ণ কুটিরে তোমায় আশ্রয় দিয়েছে তো? দিয়েছে নিশ্চয়,—নইলে দাদাকে আমার এতদিন স্বস্থানে প্রস্থান কর্তে হতো।

হাঁ, আর এককথা। তোমার পুচ্ছ ধরে তোমার প্রিয় অনুচর বর্গও তোমার সাথে গেছেন তো? প্রলয় ঠাকুর, ধ্বংস ভায়া এঁরা সব? তারপর তোমার প্রেয়সী–আমার বৌদি ঠাকুরানী শ্রীমতী মৃত্যু দেবী? এঁদের সাহায্য নইলে ত তোমার কোন কাজই সম্পন্নহবে না দাদা!

পুরুষদের মনে সাহস সঞ্চার করা সহজ কিন্তু দাদা দুর্বল-অবলা মেয়েদের সাহসী করে তোলা, কোন কঠিন কাজে লাগতে প্রবৃত্ত করা বড় কঠিন ব্যাপার। তাই বলি, দাদা আমার গেলে— গেলে কিনা বাংলাদেশেই গেলে; যেখানে এই আশঙ্কাটাই প্রবল। কেন বল্লাম বুঝলে তো? না, এক কান দিয়ে ঢুকে আর এক দিয়ে বেরিয়ে গেল?

তুমি এগিয়ে গেছ ভালই হয়েছে; তুমি কাজ আরম্ভ করে দাও, পেছু পেছু আমিও রওনা হচ্ছি; দুচার দিন আমি ততক্ষণ যন্ত্রপাতি জোগাড় করে নিই। বলত দুচারটে উল্কা এবং বাজ একদিন মেঘাচ্ছন্ন আঁধার রাত্রে পাঠিয়ে দিতে পারি; (যদিও তোমার ওখানে এখন দিন-রাতই আঁধার বিরাজ করছে) দরকার হবে কি? হলে জানিয়ো।

কিন্তু দাদা, তোমার উদয়ে কর্তা ঠাকুর আমাদের রুষ্ট হবেন না তো? তিনি যে আবার নেহাৎ ভাল মানুষ। দ্বাপরে যখন তিনি কেষ্ট হয়ে ওখানে গেছিলেন, তখন তিনি কুরুবংশ ধ্বংস করেছিলেন বটে, আর তাতে তার ঐ সুদর্শনচক্র দিয়েই মারামারি কাটাকাটিও করেছিলেন সত্য; কিন্তু এবার যে তাঁর ‘বদলে গেল মতটা, ছেড়ে দিলাম পথটা’ গোছের হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ভেবে ভেবে মাথার কালো চুল সাদা করে শেষে আজকে তিনি সব ধর্ম ছেড়ে বৈষ্ণবধর্ম অবলম্বন করেছেন। কিন্তু ভায়া হে আমাদের তো সাত পুরুষে কখনও ওর নামও শুনিনি তা আবার সে কথা মত কাজ করি কেমন করে? যা হক ভায়া, তোমার কাজ তুমি কর, পরে যা হয় হবে। এখন তো দুর্গা বলে ঝুলে পড়, শেষে আপিলে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা যাবে। ঠাকুর বোধ হয় সে অপরাধ ক্ষমা করবে অন্ততঃ ভরসা তো হয়— আমাদের সৌভাগ্যও দাদার হাত যশ৷

বাঙলা দেশটা হচ্ছে শ্রীগৌরাঙ্গের দেশ, ওরা প্রেম জিনিসটাই বেশি বোঝে। স্নেহ, প্রীতি ভালবাসা, এইসব মোলায়েম জিনিসটাই ওরা বেশি পছন্দ করে। ধ্বংস, প্রলয়, সাইকোলন, বিদ্রোহ, উল্কাপাত, রাহু—এসব নাম শুনলে স্বভাবতই ওদের দুর্বল মনে আতঙ্ক জন্মায়, তাই তো এ আবার কি হল! এমন অকল্যাণের ভৈরবী গাইতে গাইতে ভৈরব মূর্তিতে এরা আবার কারা এল আমাদের শান্তিভরা দেশে একটা বিদ্রোহের অশান্তি সৃষ্টি করে। কিন্তু ভায়াহে তোদের এ কাঁদনে গলে গেলে চলবে না; কঠিন হয়ে তোমার কর্তব্য তোমাকে করতে হবেই। এ অমাবস্যার নিবিড় অন্ধকারে তোমায় দূর করতেই হবে—আগুন তোমাকে দিকে দিকে জ্বালাতেই হবে। মাভৈঃ! ভারতের দ্বারে দ্বারে তোমার ‘অগ্নিবীণা’ বাজিয়ে তোমার ‘জাগরণী’ গেয়ে, সুপ্ত ভারতবাসীকে জাগিয়ে তুলতেই হবে—তারজন্য আবশ্যক হয় তো সত্য সত্যই আমাদের গুরু-ঠাকুরের সঙ্গে তোমায় ‘বিদ্রোহী’, হতে হবে; তা যদি হয়তো সত্বর বিজলীকে সংবাদ দিও, আমাদের ঋষি ঠাকুরপাঠিয়ে দেবো — তিনি তোমাদের বিদ্রোহটা আরো ভাল করে জমিয়ে দেবেন।-

ডাকের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়; তাই আর বেশি কিছু বল্লাম না। শেষকথা – সত্যি এই লক্ষী ছাড়ার দলকে’ তাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোল দাদা; তোমার ‘রক্তাম্বর ধারিণী মায়ের’ রক্তাক্ত কলেবরে গাঢ় রক্ত ধুইয়ে তার ব্যথা ঘুচিয়ে তাঁকে বেদনা মুক্ত, বন্ধন মুক্ত কর্তে। আর ঐ ক্লীব প্রায় বাঙালিগুলোর কানের কাছে উচ্চ কণ্ঠে দীপক রাগিণীতে গাইতে থাক— রাতে দিনে, তন্দ্রায় জাগরণে, শ্রমে বিশ্রামে, একভাবে ভৈরবীর ছন্দে-

‘আমি আছি আমি পুরুষোত্তম,

আমি চির দুর্জ্জয়

***

বল্ মাভৈঃ মাভৈঃ জয় সত্যের জয়।’

ইতি –

তোমার ভায়া শনি

পু: তোমায় উৎসাহ দেবার জন্য রাহু দাদাও শিগগির আকাশ পথে দেখা দেবেন, তবে তাঁর শরীরী মূর্ত্তিকে ওখান থেকে দেখতে না পেলেও তার ছায়া তুমি দেখতে পাবে।

‘ধূমকেতু’সম্পর্কে পত্র–পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া

১

কলিকাতা হইতে ‘ধূমকেতু’নামধেয় একটি ‘সাড়ে তৈনিক’ সংবাদপত্র প্রকাশিত হইতেছে। ইহার সম্পাদক সাহিত্য জগতে সুপরিচিত কবি কাজী নজরুল ইসলাম । আমরা এই নবীন সহযোগীর দীর্ঘজীবন কামনা করিতেছি।

সত্যবাদী (২৬.৯.১৯২২)

২

আমরা বিদ্রোহী-কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতু উপহার পাইয়াছি। ধূমকেতু জাতিরও দেশের বাধা বিঘ্ন জড়তা ধ্বংস করিয়া দেশে নূতন প্রাণের উৎস আনয়ন করুক আমরা এই প্রার্থনা করি। কারণ কবির দেশমাতান সঙ্গীত ধূমকেতুর আড়ালে উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়া উঠুক।

বাসন্তী (২৬.৯.১৯২২)

৩.

‘বাঙ্গালা সংবাদপত্রাকাশে হঠাৎ ধূমকেতুর উদয়ে অনেকের প্লীহা চমকিয়াছিল, না জানি কি হয়। এই কিছুদিন পূর্বে এক মার্কিন পণ্ডিত ত্রিশ দিনে প্রলয়ের আভাস দিয়ে লোকের প্লীহা চমকিত করিয়াছিলেন। কিন্তু ত্রিশ দিন গত, অথচ গঙ্গার সেতুর নিচ দিয়া যেমন জল বহিয়া যাইতেছিল, তেমনই বহিতেছে। লয়েড জর্জ হানা হুঙ্কারের পরও চৌষট্টি হাজারি মিনিষ্টারি যেমন ছিল তেমনই রহিয়াছে। ডেপুটেশনের আবেদন নিবেদনের ডালির ভেটে আইন কানুনের নেপোলিয়ন লর্ডরিডিং ন্যায়ের ফাঁকির জবাব দিবার পরও কাউন্সিলাররা যথা পূর্বং তথা পরং কোমর বাঁধিয়া কাউন্সিলে বাহানা কাড়িতে যাইতেছেন। সংবাদপত্রের আস্তাকুঁড়ের বুড়া জীবটি যেমন পাশের গাদায় শুইয়া লেজ নাড়িয়া ঘেউ ঘেউ করে তেমনই করিতেছে। ‘ধূমকেতু’র আবির্ভাবেও তেমন পৃথিবী ওলোট পালোট হয় নাই। বাঙ্গালার নবীন কবি, সুলেখক, সুগায়ক স্নেহাস্পদ কাজী নজরুল ইসলাম ভায়া ‘ধূমকেতু’কে মাঙ্গলিক বেশে সাজাইয়া বাহির করিয়াছেন। ইহাতে ভয়ের কিছুই নাই, কেবল নামটাই যা কিছু অনেকে বলেন। ‘সন্দেশ’ (মাসিক পত্র); হালুয়া (সালসা); ‘মনোহরা’ (কেশতৈল) প্রভৃতির মত রসাল নাম না দিয়া কাজী এমন ভয়াল নামকরণ করিলেন কেন? কিন্তু শ্মশানে শবসাধনায় বসিলে ভূতপ্রেতের তাথেই থিয়া থিয়া নৃত্যের আর হিলি হিলি কিলিকিলির মাঝে রসে ভরা রসালরচনা সাজে না; ধ্রুপদের সঙ্গে মৃদঙ্গের গুরুগম্ভীর ‘ধা কড়ান’রব গর্জিয়া না উঠিলে সঙ্গীত শোভন হয় না। আশা করি কাজী নজরুল সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিবেন।

দৈনিক বসুমতী (১৫.০৯.২২, ৯ম সংখ্যা)

৪.

প্রথম সংখ্যা ‘ধূমকেতু’ আমরা উপহার পাইয়াছি। আমাদের বন্ধু সুকবি কাজী নজরুল ইসলাম ইহার সম্পাদক। ‘ধূমকেতু’সপ্তাহে দুইবার করিয়া বাহির হইবে। সম্পাদক কটি কবিতার মধ্য দিয়া এক বীরত্ব ব্যঞ্জক অভিনব ভাবধারা আনিয়াছেন। বর্তমানের অসাড় নিস্পন্দ বাঙ্গালি জীবনে তাঁহার কবিতা উৎসাহ চাঞ্চল্যভরা জাগরণ আনিবে। ‘ধূমকেতু’ প্রথম সংখ্যা পড়িয়া আমরা আশান্বিত হৃদয়ে নবীন সহযোগীকে সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করিতেছি। বাঙ্গালার জরাগ্রস্ত যৌবনকে নবজীবনের উদ্দাম আবেগে কর্মচঞ্চল করিয়া তুলিবার প্রত্যেক আয়োজনের সহিতই আমাদের সহানুভূতি আছে। ‘ধূমকেতু’র সাধু সঙ্কল্প জয়যুক্ত হউক।

আনন্দবাজার পত্রিকা (১২শ সংখ্যা, ৯ই আশ্বিন, ১৩২৯)

৫.

বাঙ্গালার সাহিত্য গগনে ‘ধূমকেতুর’ আবির্ভাব হইয়াছে। সাহিত্য আকাশে ইহা প্ৰথম ধূমকেতু নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অন্যূন ৪০ বছর পূর্বে ফরাসি চন্দননগরে একবার সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতুর’ উদয় হইয়াছিল এবং গগন বিহারী ধূমকেতুর মত সে ‘ধূমকেতু’ কয়েকমাস লোকচক্ষের গোচর হইয়া আবার অদৃশ্য হইয়া যায়৷ সম্প্রতি যে ধূমকেতু দেখা দিয়েছে, তাহা চন্দননগরের সেই ক্ষুদ্র ধূমকেতু নহে। ইহা সম্পূর্ণ পৃথক সুকবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ধূমকেতুর সারথি। ‘সারথির পথের খবরে’বলিতেছেন—

দেশের যা কিছু মিথ্যা ভণ্ডামি মেকি তা সব দূর করতে ‘ধূমকেতু’ হবে আগুনের সম্মার্জনী। ‘ধূমকেতু’র এখন গুরু বা বিধাতা কেউ নাই যার খাতিরে সে সত্যকে অস্বীকার করে মিথ্যা বা ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেবে।’“হিতবাদীর’ মূলমন্ত্র ‘হিতং মনোহারি চ দুৰ্ল্লভং বচ।’সুতরাং ‘ধূমকেতু’র উদ্দেশ্যের আমরাও আন্তরিক সমর্থন করিতেছি। ‘ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যা পাঠ করিয়া আমরা আনন্দিত হইলাম। আশীর্বাদ করি চন্দননগরের ধূমকেতুর ন্যায় ইহা ক্ষণস্থায়ী না হইয়া দীর্ঘ জীবন লাভ করিয়া স্বীয় কর্তব্যপালন করুন। বাঙ্গালার কলঙ্ক বাঙ্গালির কলঙ্ক দূর করুন।

হিতবাদী (১২শ সংখ্যা, ৯ই আশ্বিন ১৩২৯)

৬.

কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’বাংলার আকাশে উদিত হ’য়েছে। আমরা আমাদের আশীর্বাচন দিয়ে সহযোগীকে তার জন্মদিনে আহ্বান করেচি, আজও বাংলার পাঠক পাঠিকার কাছে তার ঠিকানার পরিচয় দিচ্ছি; ইনি সপ্তাহে দুইবার করে বাংলার আকাশে উঠেন; কেন্দ্রস্থান হচ্ছে ৩২ কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা।

আত্মশক্তি (৩০.০৮.২২)

৭.

We cordially welcome the advent of our new Bengali, contemporary the ‘Dhoomketu’ a bi-weekly edited by Habildar Kazi Nazrool Islam published from 32 College Street, Calcutta. The editor has already made his as a powerful and some of his recent poems, particularly the ‘Bidrohi’, are among the most well know in the Bengali literature. The articles from the editorial pen in the ‘Dhoomketu’ fully sustain the reputation of the soldier post and the collection he has been able to make are in tune with the fire and energy of his own writings. There is something novel something enthralling in this new venture. We hope, the ‘Dhoomketu’ or comet will not simply be an emblem of destruc- tion in the heads of the soldier poem. But will create something that is beautiful, something that is abiding and holy.

Amrita Bazar Patrika (30.8.22)

৮.

বিদ্রোহী-কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত পত্র ‘ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যা আমরা পাইয়াছি। ধূমকেতু সপ্তাহে দুইবার করিয়া বাহির হইবে। সারথীর পথের খবরে প্রকাশ ‘দেশের যারা শত্রু দেশের যা কিছু মিথ্যা ভণ্ডামী মেকী তা সব দূর করিতে ‘ধূমকেতু’ হবে আগুনের সম্মার্জ্জনী। ‘ধূমকেতুর এমন গুরু বা এমন বিধাতা কেউ নাই, যার খাতিরে সে সত্যকে অস্বীকার করে কারুর মিথ্যা বা ভণ্ডামীকে প্রশ্রয় দেবে। সহযোগীকে আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করিতেছি। বার্ষিক মূল্য পাঁচ টাকা। ৩২ কলেজ স্ট্রিট, ‘ধূমকেতু কেন্দ্র’।

প্রসূন (১৮.৮.২২)

৯.

বাংলার সাহিত্য ও রাজনৈতিক গগনে ‘ধূমকেতু’র আবির্ভাব হইয়াছে। ইহার সারথি হইতেছেন বাংলার উদীয়মান তরুণ কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী নজরুল বাংলা সাহিত্যে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছেন। তাঁহার কলমের জোর আছে— তাঁহার কবিতায় তুবড়ি ছুটে—কথায় আগুন জ্বলে—ভাবে বান্ ডাকে’—ভাষায় ঝলক দেয়৷ তাঁহার লেখনী যেন ক্যাঘাত খাইয়া বল্গাহীন উন্মত্ত শব্দের মত ছুটিয়া চলে। ধূমকেতুর পুচ্ছাঘাতে অনেকেরই চমক ভাঙ্গিবে, অনেকেরই টুটিবে। কাজেই অত্যাচারী সাবধান হউন। তোষামোদী সমবৃত হউন, পদলেহী পদলেহন পরিত্যাগ করুন। বাংলার প্রসিদ্ধ লেখকগণ ধূমকেতুতে লিখিতে স্বীকৃত হইয়াছেন। আমরা আশা করি ধূমকেতু দীর্ঘকাল বাংলার আকাশে বিরাজ করিবে।

পরিদর্শক (১০ই ভাদ্র, ১৩২৯)

১০.

ধূমকেতু—অৰ্দ্ধসাপ্তাহিক পত্র—সম্পাদক, কাজী নজরুল ইসলাম। বার্ষিক মূল্য পাঁচ টাকা। ‘ধূমকেতু’ কেন্দ্ৰ–৩২ কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা।

যদিও কবি কাজী নজরুল ইসলাম অতি অল্প দিন থেকেই সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন, কিন্তু তবু তাঁর পরিচয় নতুন করে আজ আর বাঙালীকে দিতে হবে না। প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশবাসী তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করে বসে আছে। কবিও তাঁরভাণ্ডার উন্মুক্তি করে তাঁর সম্পদ দুহাতে দান করছেন, তার মধ্যে অমূল্য সম্পদ তাঁর ‘বিদ্রোহী’; এই ‘বিদ্রোহী’র এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘আমি ধূমকেতু জ্বালা বিষধর কালফণি’ – তার পরেই এই ‘ধূমকেতু’র উদয়। আমরা ‘ধূমকেতু’র ৪র্থ সংখ্যা পর্যন্ত পেয়েছি। কবির‘ধূমকেতু’, ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’কবিতা যেন নিদ্রা-ব্যাধিগ্রস্ত জাতির অঙ্গে জাগরণীর ইঞ্জেকসন। এছাড়া প্রবন্ধগুলোও নির্ভীক ও সতেজ। দেশের ও বিদেশের খবর বেশ সুন্দর সরস করে দেওয়াতে‘ধূমকেতু’র জ্বালা বেশ উপভোগ্য হ’য়েছে। আমরা আশা করি এই জালায় জ্বলে’ দেশবাসী যত অসত্য, যত আবৰ্জ্জনা সব পুড়িয়ে দেবে। ‘ধূমকেতু’র ছাপা, কাগজও বেশ সুন্দর।

বিজলী (২৬.৯.১৯২২)

‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত বহু লেখা নজরুল ইসলামের বিপক্ষে সরকার কর্তৃক মামলা রুজু করার যথেষ্ট উপাদান জোগাতে পারত। এই পত্রিকার ভাষা, বয়ান এবং ভাবধারা ছিল এমন তীক্ষ্ণ ও বিদ্রোহী যে প্রতিটি সংখ্যাই ছিল যেন একেকটি বিপ্লবের আহ্বানপত্র। নজরুল তাঁর কলমের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় শোষণ-সচেতন সমাজের দিকে। ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর সংখ্যায় তিনি ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ দাবি করে যে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন, সেটি ছিল এইরূপ:

“সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ- টরাজ বুঝি না। কেননা, এ কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে।”

এই নির্ভীক উচ্চারণেই প্রকাশ পায় নজরুলের আদর্শিক অবস্থান। স্বাধীনতা তাঁর কাছে ছিল আপোষহীন এবং সম্পূর্ণ, কোনোরকম সংযম বা মধ্যপন্থার অবকাশ সেখানে ছিল না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের যুবসমাজকে যে জাগরণের শিখায় উন্মুখ করে তুলেছিলেন, তার ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার অলিতে-গলিতে। যাঁরা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ইংরেজ বিরোধিতায় বিশ্বাসী ছিলেন, তাঁরা এই পত্রিকায় নতুন করে জীবন ও প্রেরণা খুঁজে পান।

এই প্রসঙ্গে মুজফফর আহমদ স্মরণীয়ভাবে উল্লেখ করেন, “১৯২৩-২৪ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন আবার যে মাথা তুলল, তাতে নজরুলের অবদান ছিল, এ কথা বললে বোধহয় অন্যায় হবে না। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের দু’টি বড় বিভাগের মধ্যে ‘যুগান্তর’ বিভাগের সভ্যরা তো বলেছিলেন যে, ‘ধূমকেতু’ তাঁদেরই কাগজ।” [কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, পৃষ্ঠা ২৯১]

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন নজরুলের প্রতিবাদী লেখার পরিণতি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিল। গোপন সূত্রে খবর পাওয়া যায়, তাঁর শুভানুধ্যায়ীরা চিন্তা করেছিলেন নজরুলকে বিদেশে পাচার করে দেওয়ার, যাতে তিনি সরকারী দমননীতির কবলে না পড়েন। সেই সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিন্টার্নের ভারতীয় শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত মানবেন্দ্রনাথ রায় এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।

নজরুলের কারাবরণ শুরু হয় ধূমকেতুর অন্যতম আলোচিত নিবন্ধ ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশের পর। তাঁর গ্রেপ্তারের দুই সপ্তাহ পরে পত্রিকাটি প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। পরে পাক্ষিক রূপে দু’টি সংখ্যা প্রকাশিত হলেও সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। অনেক পরে কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ ভৌমিকের সম্পাদনায় ‘ধূমকেতু’ আবার নব পর্যায়ে প্রকাশিত হয়।

পত্রিকাটির চরিত্র বোঝার জন্য তার প্রকাশিত রচনাসমূহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট প্রকাশিত প্রথম সংখ্যায় নজরুল লিখেছিলেন এক সম্পাদকীয় এবং একটি কবিতা। সম্পাদকীয়তে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ধূমকেতু একটি অসাম্প্রদায়িক পত্রিকা। এই সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত আশীর্বাণী:

কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু
আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন।
অ লক্ষণের তিলক রেখা
রাতের তালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’
আছে যারা অর্ধচেতন।
২৪ শ্রাবণ, ১৩২৯
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবির নিজের হাতে লেখা এই বাণী ধূমকেতুর প্রথম পাতায় ব্লক করে ছাপা হয়। এর মাধ্যমেই যেন সম্পাদকের বিদ্রোহী ভাষার মধ্যে মিশে যায় এক মহাকবির পবিত্র আশীর্বচন।

পরবর্তী সংখ্যাগুলিতে একের পর এক জ্বালাময়ী রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। সপ্তম সংখ্যায় নজরুল লেখেন ‘মোহররম’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় ও একটি কবিতা। ২ সেপ্টেম্বর ১৯২২ তারিখে প্রকাশিত এই সংখ্যার পরবর্তী সংখ্যায় আসে ‘বিষবাণী’ নামের একটি মারাত্মক প্রতিবাদী প্রবন্ধ, যা যেন এক মানসিক বোমা বিস্ফোরণের মতো। একই সংখ্যায় ‘যতীন্দ্রনাথ’ ও ‘কামাল পাশা’ শিরোনামে দুটি কবিতা স্থান পায়। এরপর নজরুল লেখেন ‘মোয় ভুখা হু’ নামে একটি প্রবন্ধ।

প্রথম বর্ষের দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় সেই প্রবন্ধ ‘আনন্দময়ীর আগমনে’, যার ফলে নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনার মধ্যে ছিল ‘ধূমকেতুর পথ’ (১০ অক্টোবর ১৯২২), ‘কামাল’ (২৭ অক্টোবর ১৯২২), ‘আমি সৈনিক’ (৩১ অক্টোবর ১৯২২), ‘ভিক্ষা দাও’ (৭ নভেম্বর ১৯২২), ‘তোমার পণ কী’ (১০ ডিসেম্বর ১৯২২) এবং ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ (২৭ জানুয়ারি ১৯২৩)।

এই শেষোক্ত প্রবন্ধটি ‘ধূমকেতু’র অর্ধ-সাপ্তাহিক প্রকাশের সমাপ্তির ঘোষণার সমান। কারণ এই লেখাটি প্রকাশিত হয় নজরুলের এক বছর কারাদণ্ড ঘোষণার পর এবং এটি ছিল তাঁর কারাবাসের সূচনায় আত্মপক্ষ সমর্থনের ভাষ্য। দীর্ঘ নয় বছর পর ধূমকেতুর নব পর্যায় শুরু হলে নজরুল সেখানে আরও কিছু গান, কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন। তবে এসব লেখার জন্য আর তাঁকে প্রশাসনিক রোষের সম্মুখীন হতে হয়নি।

‘ধূমকেতু’ ছিল নজরুলের অন্তর্জগতের বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তরবারি। এ পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যাই এক একটি বিপ্লবের জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ ছিল, যা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলা তথা ভারতীয় জাতিসত্তার গভীরে।

১৯২২ সালে বাংলা সংবাদপত্র জগতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল যে অর্ধ-সাপ্তাহিক কাগজটি, তার নাম ‘ধূমকেতু’। এ কাগজটির প্রকাশনা, ভাবধারা ও সাহসী ভাষা ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই পত্রিকাটির প্রভাব যে কত গভীর ছিল, তার একটি স্পষ্ট প্রমাণ মেলে বাংলার তৎকালীন চীফ সেক্রেটারি এল বারলের একটি প্রতিবেদনে। তিনি ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগের সচিবকে ১৯২৩ সালে যে রিপোর্ট পাঠান, তাতে ধূমকেতুকে ‘উগ্রপন্থী’ সংবাদপত্র বলে চিহ্নিত করা হয়।

রিপোর্টে লেখা হয়,

“Its bristling allusions to Hindu mythology often betrayed false analogies and its blustering diction offended against all classic traditions of repose, but in spite of all these and perhaps, because of all these and the resulting correspondence of the matter to the turgid manner of expression-the whirlwind energy of the style and the inflammatory character of the languages had a great unsettling effect on premature and ill-balanced minds, with whom the paper was immensely popular. As a matter of fact the paper was prosecuted more than once.” (Annual Report on Newspaper & Periodicals, 1923)

‘ধূমকেতু’ সম্পর্কে ইতিহাসচর্চায় একাধিক ভুল তথ্য ছড়িয়ে আছে। এমনকি নজরুলের ঘনিষ্ঠরাও কোথাও কোথাও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করেছেন। যেমন, অচিন্ত্যকুমার ঘোষ তাঁর ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে’ লেখেন, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ২২শে সেপ্টেম্বর ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়, অথচ প্রকৃত প্রকাশ তারিখ ২৬শে সেপ্টেম্বর। একইভাবে মুজাফফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১২ই আগস্ট ১৯২১ সালে, যা সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ১১ই আগস্ট।

এই তারিখের পক্ষে প্রামাণ্য সূত্র হল বাংলার গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী এইচ গ্রিনফিল্ডের পাঠানো এক সরকারী রিপোর্ট, যাতে লেখা আছে, “Started from 11th August, 1922.” ওই দিনের বাংলা তারিখ ছিল ২৬শে শ্রাবণ ১৩২৯। ‘ধূমকেতুর নজরুল’ বইতেও এই তারিখটি আছে। গবেষণা সূত্রে জানা যায়, ‘ধূমকেতু’ মঙ্গলবার ও শুক্রবারে প্রকাশিত হতো, অর্থাৎ ছিল অর্ধ-সাপ্তাহিক।

‘ধূমকেতু’র মূল্য নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, পত্রিকাটির দাম ছিল এক পয়সা এবং এটি ছিল ফুলস্কেপ সাইজের চার পৃষ্ঠার পত্রিকা। প্রকৃতপক্ষে এর দাম ছিল এক আনা এবং সেটি ছিল অর্ধ-সাপ্তাহিক, নয় সাপ্তাহিক। আজহারউদ্দীন তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ গ্রন্থে একই ভুল করেছেন। এমনকি প্রেমেন্দ্র মিত্রও ‘ধূমকেতু’কে সাপ্তাহিক বলেছেন। এই ধরনের ভুল তথ্য ইতিহাসের নির্ভুল পাঠে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। স্মৃতি নির্ভর রচনার তুলনায় সরকারি রিপোর্টগুলিই এখানে বেশি নির্ভরযোগ্য।

নজরুলের বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ের নির্ভুল তারিখ নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ সুইনহো নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট দিনটি ছিল ১৭ই জানুয়ারি ১৯২৩। এই তারিখটি উদ্ধার করা হয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকার পুরাতন প্রতিবেদন ও সরকারী নথিপত্র থেকে।

আনন্দবাজারের ১৩ই জানুয়ারির সংখ্যায় লেখা আছে:
“গত শুক্রবার প্রধান প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ সুইনহোর এজলাসে ‘ধূমকেতু’ সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলামের মামলা উঠিয়াছিল… ১৬ই তারিখ পর্যন্ত মামলা মুলতুবী আছে।”

এরপর মামলার রায় ঘোষিত হয় ১৭ই জানুয়ারি। একই পত্রিকায় ১৮ জানুয়ারি তারিখে প্রকাশিত রিপোর্টে লেখা:
“গতকাল ‘ধূমকেতু’র সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ অভিযোগের মামলার শেষ হইয়াছে। ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ ও ‘আনন্দময়ীর আগমনে’—এই দুটি প্রবন্ধ লেখার জন্য বিচারক তাঁহার প্রতি এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়াছেন।”

এখানে দুটি তথ্যগত ভুল বিদ্যমান। এক, ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ নজরুলের লেখা নয়। দুই, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ একটি প্রবন্ধ নয়, কবিতা।

ব্রিটিশ প্রশাসনের গোয়েন্দা রিপোর্টে আরও লেখা আছে:

“The late editor Nazrul was convicted and sentenced under Sec. 124A & 153A I. P. C. to 1 year r.i. on the 17th January 1923. Amaresh Kanjilal was convicted and sentenced on the 13th March to 18 months’ r.i. under Sec. 124A Indian Penal Code. Ceased publication in March, 1923.”

এই রিপোর্ট অনুযায়ী ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রচারসংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার, বার্ষিক গ্রাহকচাঁদা ছিল পাঁচ টাকা। নজরুলের দণ্ডাদেশের পরে ‘ধূমকেতু’র সম্পাদনার ভার নেন অমরেশ কাঞ্জিলাল। তাকেও ব্রিটিশ সরকার ১৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে ১৯২৩ সালের ১৩ই মার্চ।

‘ধূমকেতু’ ছাড়াও নজরুল আরও বহু পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘সেবক’, ‘লাঙ্গল’, ‘বৈতালিক’, ‘মোসলেম ভারত’, ‘নবযুগ’, ‘বিজলী’।

‘নবযুগ’ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ছিলেন এ কে ফজলুল হক, সম্পাদক ছিলেন মুজফফর আহমেদ। ‘লাঙ্গল’ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ছিলেন নজরুল নিজে, আর সম্পাদক হিসেবে ছিলেন মণীভূষণ মুখার্জি। ‘মোসলেম ভারত’-এর সম্পাদক ছিলেন আবদুল কালাম মোহাম্মদ সামসুদ্দিন। ‘বৈতালিক’-এর সম্পাদক, প্রকাশক ও স্বত্বাধিকারী ছিলেন কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ ভৌমিক। ‘বিজলী’র সম্পাদক ছিলেন সাবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়।

এই সব পত্রিকায় নজরুলের লেখনী নিয়মিতই প্রকাশ পেয়েছে এবং একাধিকবার ব্রিটিশ সেন্সরের কোপে পড়েছে। ‘বৈতালিক’ পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু ভৌমিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রথম সংখ্যাতেই নজরুলের লেখা কবিতা ‘বৈতালিক’ প্রকাশিত হওয়ায় সেই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ১৯২১ সালে একযোগে প্রকাশিত হয় ‘মোসলেম ভারত’ ও ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এ কারণে ‘বিজলী’ পত্রিকাকে সতর্ক করে ব্রিটিশ সরকার।

‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় আপত্তিকর লেখা প্রকাশের জন্য সম্পাদক মহম্মদ মঈনুদ্দিনকে ১৯২২ সালের ১৪ই মে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। নজরুলের বিখ্যাত ‘সাম্যবাদী’ কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় ‘লাঙ্গল’ পত্রিকায়।

এ ছাড়াও নজরুলের লেখা প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলার কথা’, ‘সত্তগাত’, ‘নওরোজ’, ‘কল্লোল’, ‘গণবাণী’, ‘প্রগতি’, ‘বকুল’, ‘জয়তী’ ইত্যাদি পত্রিকায়। বলা যায়, তৎকালীন বাংলার প্রায় সব কাগজেই ছিল নজরুলের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। কোথাও একটি বিপ্লবী গল্প, কোথাও একটি আগুনঝরা কবিতা, আবার কোথাও একটি প্রবন্ধে বিদ্রোহের সূর্যোদয়—সব মিলিয়ে নজরুল হয়ে উঠেছিলেন কাগজের পাতায় আগ্নেয়গিরির মতো।

লেখা চাওয়া মানেই লেখা পাওয়া—এই ছিল নজরুলের স্বভাব। তাঁর কলম কখনও ফিরিয়ে দেয়নি সেই সকল আহ্বান, যেখানে তিনি অনুভব করেছেন মানুষের মুক্তির ইঙ্গিত, বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাণী কিংবা বিপ্লবের সম্ভাবনা।

Post Views: 21
Tags: Bangla HistoryBangla Sahityabengali literatureBidrohi KobiBritish EmpireDhumiketu NewspaperDhumketuDhumketu PatrikaFreedom of PressIndian Historykazi nazrul islamLiterary RevolutionMuslim RenaissanceNazrulNazrul DhumketuRebel PoetRevolutionary JournalismRevolutionary PoetSecularism
ADVERTISEMENT

Related Posts

নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ সাহিত্য: বিশ্লেষণ ও সাহিত্যিক অবদান
সাহিত্য আলোচনা

নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ সাহিত্য: বিশ্লেষণ ও সাহিত্যিক অবদান

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম নজরুল ইসলামকে মূলত কবি, গীতিকার ও সংগীতস্রষ্টা হিসেবেই আমরা চিনি ও শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তাঁর...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
July 29, 2025
আশাপূর্ণা দেবীর ছোটগল্প: শিল্পরূপের শৈল্পিক নির্মাণ
সাহিত্য আলোচনা

আশাপূর্ণা দেবীর ছোটগল্প: শিল্পরূপের শৈল্পিক নির্মাণ

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম আশাপূর্ণা দেবী বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর রচনায় যে রচনাশৈলী এবং শিল্পরূপ ব্যবহার করা...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
July 23, 2025
ম্যাজিক রিয়ালিজম থেকে সাহিত্য আন্দোলন: এক সাহিত্যিক অভিযাত্রা
সাহিত্য আলোচনা

ম্যাজিক রিয়ালিজম থেকে সাহিত্য আন্দোলন: এক সাহিত্যিক অভিযাত্রা

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম সাহিত্যের ইতিহাসে আধুনিকতার উদ্ভব যেমন বাস্তবতার নিরন্তর অভিযাত্রার ফল, তেমনই সাহিত্যের নান্দনিক ও দার্শনিক ধারা...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
July 10, 2025
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ : বাংলাসাহিত্যের এক অনন্য কথাশিল্পী
সাহিত্য আলোচনা

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ : বাংলাসাহিত্যের এক অনন্য কথাশিল্পী

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বাংলা সাহিত্যের এক বিশিষ্ট নাম, যাঁর সাহিত্যিক জীবনপথ রচিত হয়েছে একাধারে প্রকৃতির...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
July 9, 2025

Facebook Page

নবজাগরণ

ADVERTISEMENT
No Result
View All Result

Categories

  • English (9)
  • অন্যান্য (11)
  • ইসলাম (28)
  • ইসলামিক ইতিহাস (23)
  • ইহুদী (3)
  • কবিতা (37)
  • খ্রিস্টান (6)
  • ছোটগল্প (6)
  • নাস্তিকতা (20)
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (24)
  • বিশ্ব ইতিহাস (26)
  • ভারতবর্ষের ইতিহাস (199)
  • রাজনীতি (39)
  • সাহিত্য আলোচনা (73)
  • সিনেমা (18)
  • হিন্দু (16)

Pages

  • Cart
  • Checkout
    • Confirmation
    • Order History
    • Receipt
    • Transaction Failed
  • Checkout
  • Contact
  • Donation to Nobojagaran
  • Homepage
  • Order Confirmation
  • Order Failed
  • Privacy Policy
  • Purchases
  • Services
  • লেখা পাঠানোর নিয়ম
  • হোম

No Result
View All Result
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi

©Nobojagaran 2020 | Designed & Developed with ❤️ by Adozeal

Login to your account below

Forgotten Password?

Fill the forms bellow to register

All fields are required. Log In

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Don't have an account yet? Register Now
1
Powered by Joinchat
Hi, how can I help you?
Open chat
wpDiscuz
0
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
| Reply