• মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
Friday, August 7, 2026
নবজাগরণ
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
No Result
View All Result

মহাভারতের যুদ্ধের সময়কাল : ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
August 7, 2026
in ভারতবর্ষের ইতিহাস, হিন্দু
0
মহাভারতের যুদ্ধের সময়কাল : ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

Image Source: AI

Share on FacebookShare on Twitter

প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি ও ইতিহাসচর্চা এমন এক জটিল ও বিতর্কপূর্ণ ক্ষেত্র, যেখানে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আজও সহজ হয়নি। ইতিহাসবিদদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে মনে করে এসেছেন যে, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের যথার্থ কালানুক্রম এখনও সম্পূর্ণরূপে নির্ধারিত হয়নি এবং এর প্রকৃত ধারাবাহিকতা আবিষ্কার করা বাকি রয়ে গেছে। এই অনির্দিষ্টতার প্রধান কারণ হিসেবে বহু গবেষক একটি মৌলিক ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা হল মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে গ্রিক ইতিহাসকারদের বর্ণিত সান্দ্রাকোট্টস বা সান্দ্রাসিপ্টাসের সঙ্গে অভিন্ন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণসংক্রান্ত গ্রিক বিবরণে এই নামগুলির উল্লেখ পাওয়া যায় এবং পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা দীর্ঘদিন ধরে এই দুই সত্তাকে এক করে দেখেছেন। এই সমীকরণের ভিত্তিতেই চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে।

কিন্তু এই পরিচয় নির্ধারণ আদৌ কতখানি যথার্থ, সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বহু ভারতীয় গবেষক। তাঁদের মতে, এই ভুল সনাক্তকরণ প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের সম্পূর্ণ কালানুক্রমিক কাঠামোকেই বিকৃত করেছে। কারণ, যদি এই ভিত্তি ভ্রান্ত হয়, তবে তার উপর নির্মিত সমস্ত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। এই প্রসঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতিতে ইতিহাস নির্ধারণের চেষ্টা করেছে, যেখানে প্রধান নির্ণায়ক বিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে মহাভারতের যুদ্ধ।

হিন্দু কালপঞ্জির কেন্দ্রীয় অক্ষ হিসেবে মহাভারত যুদ্ধকে ধরা হয়। এই যুদ্ধের সঠিক সময় নির্ধারণ করা গেলে প্রাচীন ভারতের বহু অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। এই কারণে প্রাচ্যবিদরা বা ওরিয়েন্টালিস্টরা এই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, তাঁরা মহাভারতের নিজস্ব বর্ণনা এবং প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থসমূহে যে সুসংগত ঐতিহ্য সংরক্ষিত রয়েছে, তা উপেক্ষা করে অন্য কিছু অনুমাননির্ভর ও দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে বিকল্প তারিখ প্রস্তাব করার চেষ্টা করেছেন। গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এই সমস্ত বিকল্প তত্ত্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কল্পনানির্ভর এবং সুসংহত প্রমাণের অভাবে দুর্বল।

এই প্রেক্ষাপটে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের নিজস্ব উৎসসমূহের ভিত্তিতে মহাভারত যুদ্ধের কাল নির্ধারণের একটি প্রচেষ্টা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ধরনের গবেষণায় কেবল সাহিত্যিক প্রমাণই নয়, বরং জ্যোতির্বিদ্যাগত উল্লেখ, আচারসংক্রান্ত প্রথা এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মহাভারতের বিভিন্ন অধ্যায়ে নক্ষত্র, তিথি, গ্রহের অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাহায্যে বিশ্লেষণ করলে একটি সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী বর্তমান কলিযুগের সূচনা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে। এই ধারণা কেবল পুরাণ বা মহাকাব্যের বর্ণনার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ধর্মীয় আচারের মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। হিন্দু সমাজে দৈনন্দিন ও বিশেষ ধর্মীয় আচার সম্পাদনের সময় যে সংকল্প উচ্চারণ করা হয়, সেখানে সময়ের সূক্ষ্মতম নির্ণয় করা হয়। মুহূর্ত, নক্ষত্র, বার, তিথি, পক্ষ, মাস, ঋতু, অয়ন, সংবৎসর, শকাব্দ, যুগ, মহাযুগ, মন্বন্তর, কাল্প এবং ব্রহ্মার পরার্ধ পর্যন্ত এই সময়বিভাজনের উল্লেখ করা হয়। এই সূক্ষ্ম কালনির্ণয় প্রথা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন নয়, বরং প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার উন্নত অবস্থারও পরিচায়ক।

বিশেষত ব্রাহ্মণ সমাজ এই সময়নির্ণয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল। দৈনন্দিন আচারের পাশাপাশি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পাদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তিথির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধতিথি উপেক্ষা করে, সে গুরুতর পাপের অধিকারী হয় এবং বহু জন্ম ধরে নীচযোনিতে জন্মগ্রহণ করে। এই বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সময়ানুবর্তিতার এক গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য প্রতিফলিত হয়।

এই সূক্ষ্ম কালপঞ্জি অনুসারে বর্তমান খ্রিস্টীয় ১৯২৯-৩০ সালকে গণনা করা হয়েছে কলিযুগের ৫০৩০তম বর্ষ হিসেবে। অর্থাৎ, এই প্রথা অনুসারে কলিযুগের সূচনা যে ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, তা ধারাবাহিকভাবে গণনা করে আজও বজায় রাখা হয়েছে। এই দীর্ঘকালীন ধারাবাহিকতা প্রাচীন ভারতীয় কালপঞ্জির একটি শক্তিশালী দিক।

পুরাণ ও অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ মত প্রকাশিত হয়েছে যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে অবস্থানরত থাকাকালীন কলিযুগের সূচনা সম্ভব ছিল না। তাঁর প্রস্থান বা মহাপ্রয়াণের পরেই কলিযুগের সূচনা ঘটে। একটি প্রাচীন শ্লোকে বলা হয়েছে, “যে বছরে শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গে গমন করেন, সেই বছরেই কলিযুগের সূচনা হয়।” অন্য একটি শ্লোকে বলা হয়েছে, যতদিন ভগবান বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছেন, ততদিন কলিযুগ পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারেনি।

এই শ্লোকগুলির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন টি. এস. নারায়ণ শাস্ত্রী। তাঁর মতে, শ্রীকৃষ্ণের স্বর্গারোহণের পরবর্তী বছরেই কলিযুগের সূচনা ঘটে এবং তাঁর উপস্থিতিকালে কলিযুগ পৃথিবীতে প্রবেশ করতে অক্ষম ছিল। এই ধারণা হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্য জুড়ে সুসংগতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

মহাভারতের বর্ণনা অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ মহাভারত যুদ্ধের ৩৬ বছর পর এই পৃথিবী ত্যাগ করেন। সুতরাং, যদি কলিযুগের সূচনা ধরা হয় ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, তবে মহাভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয় তার প্রায় ৩৬ বা ৩৭ বছর পূর্বে, অর্থাৎ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৮ বা ৩১৩৯ অব্দে। এই গণনা প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই তারিখ নির্ধারণের পক্ষে আরও কিছু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যুক্তিও উত্থাপন করা হয়েছে। মহাভারতে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান সম্পর্কে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগে একটি সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ করা যায়, যা ঐতিহ্যগত গণনার সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে এই সমস্ত যুক্তি সত্ত্বেও আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণায় মহাভারত যুদ্ধের নির্দিষ্ট সময় নিয়ে একমত হওয়া যায়নি। পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগ বা প্রথম সহস্রাব্দের প্রারম্ভিক সময়কে এই যুদ্ধের সম্ভাব্য সময় হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁদের মতে, মহাভারত একটি দীর্ঘসময়ের মধ্যে সংকলিত মহাকাব্য, যার মধ্যে বিভিন্ন যুগের উপাদান সংযোজিত হয়েছে।

এই বিতর্কের মূল কারণ হল প্রমাণের প্রকৃতি ও ব্যাখ্যার পার্থক্য। একদিকে রয়েছে সাহিত্যিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য, যা ধারাবাহিকভাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলে; অন্যদিকে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, যা ভিন্ন সময়সীমার ইঙ্গিত দেয়। এই দুই ধারার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা এখনও ইতিহাসবিদদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তবুও এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, মহাভারত যুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতিতে এক গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। এটি কেবল একটি যুদ্ধের কাহিনি নয়, বরং ধর্ম, নীতি, রাজনীতি ও মানবজীবনের জটিল প্রশ্নগুলির এক গভীর অনুসন্ধান। এই কারণে এর কাল নির্ধারণ কেবল একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক অনুসন্ধানের অংশ।

অতএব, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে মহাভারত যুদ্ধের সময় নির্ধারণ একটি কেন্দ্রীয় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এই সমস্যার সমাধান সম্ভবত একমাত্র তখনই হবে, যখন সাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক সমস্ত প্রমাণকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। ততদিন পর্যন্ত এই প্রশ্নটি উন্মুক্তই থেকে যাবে, এবং গবেষকদের নতুন নতুন ব্যাখ্যা ও তত্ত্বের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হতে থাকবে।

একাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ও ইতিহাসচর্চার অগ্রদূত আলবেরুনি ভারতীয় কালপঞ্জি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে যে মূল্যবান তথ্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন, তা আজও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে তাঁর জীবদ্দশায় প্রচলিত এক বিশেষ বর্ষপদ্ধতি অনুযায়ী গৌড় বর্ষের ৪০০তম বছর, যার নববর্ষের দিন ছিল খ্রিস্টীয় ১০৩১ সালের ৯ মার্চ, তা কলিযুগাব্দের ৪১৩২তম বর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই হিসাব অনুযায়ী কলিযুগের সূচনাকাল দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে। এই গণনা প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে কলিযুগের সূচনা এই নির্দিষ্ট সময়েই হয়েছে বলে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই তথ্যের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, এটি কেবল পুরাণ বা মহাকাব্যের বর্ণনার উপর নির্ভরশীল নয়; বরং একজন বহিরাগত, তুলনামূলক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের দলিল হিসেবে তা ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। আলবেরুনির এই সাক্ষ্য প্রমাণ করে যে, হিন্দুদের প্রাচীন কালপঞ্জি কোনও বিচ্ছিন্ন কল্পনা নয়, বরং একটি সুসংহত ও ধারাবাহিক সময়বোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। এর ফলে মহাভারত যুদ্ধের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই কালপঞ্জি একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, এবং ঐতিহ্যগতভাবে নির্ধারিত খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দের তারিখ আরও দৃঢ়তা লাভ করে।

অন্যদিকে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে স্যার উইলিয়াম জোন্স এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৭৯৩ সালে তাঁর এক ভাষণে প্রথমবারের মতো একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যেখানে তিনি প্রস্তাব করেন যে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্তই গ্রিক ইতিহাসকারদের বর্ণিত সান্দ্রাকোট্টস বা সান্দ্রাসিপ্টাস। এই তত্ত্বটি পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের মধ্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়।

তবে এই পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে উইলিয়াম জোন্স কোনও সুসংহত যুক্তি বা প্রমাণ পেশ করেননি। তিনি ভবিষ্যতে একটি প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করবেন বলে উল্লেখ করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর অকালমৃত্যুর কারণে সেই প্রবন্ধ আর প্রকাশিত হয়নি। ফলে তাঁর এই তত্ত্ব একপ্রকার অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই থেকে যায়। পরবর্তীকালে কর্নেল উইলফোর্ড এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন এবং তাঁর রচনায় চন্দ্রগুপ্তের কাহিনি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনায় বহু অসংগত ও অপ্রমাণিত তথ্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে ‘মুদ্রারাক্ষস’ নাটককে ব্যবহার করেন, অথচ নাটকটির প্রকৃত পাঠ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর অনেক বক্তব্যের কোনও ভিত্তি সেখানে নেই।

এই প্রসঙ্গে এইচ. এইচ. উইলসন যথার্থই মন্তব্য করেন যে, উইলিয়াম জোন্স তাঁর সূত্রসমূহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন না এবং উইলফোর্ডও নাটকটির যথাযথ অনুসন্ধান না করেই তা উদ্ধৃত করেছেন। উইলসনের মতে, এই ধরনের ভুল উদ্ধৃতি ও অসংগত ব্যাখ্যা গ্রিক ও ভারতীয় ইতিহাসের মধ্যে একটি অতিরঞ্জিত সাদৃশ্যের ধারণা সৃষ্টি করেছে, যা বাস্তবে বিদ্যমান নয়।

পরবর্তী সময়ে প্রফেসর লাসেন এবং ম্যাক্স মুলার এই তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাক্স মুলার এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, গ্রিকদের সান্দ্রাকোট্টস আসলে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তই। যদিও এই মতবাদ বহু ইউরোপীয় ও ভারতীয় গবেষকের সমর্থন লাভ করে, তবুও এর বিরোধিতাও কম হয়নি। সমালোচকদের মতে, এই তত্ত্বের পক্ষে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই এবং এটি বহু ক্ষেত্রে ভারতীয় ঐতিহ্য ও কালপঞ্জির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষকরা গুপ্তবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত এবং তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখতেন না। অথচ অনেক গবেষকের মতে, গ্রিক লেখকদের বর্ণিত সান্দ্রাকোট্টস আসলে গুপ্তবংশীয় কোনও চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গেও সাদৃশ্যপূর্ণ হতে পারে। এই সম্ভাবনাকে প্রথম স্পষ্টভাবে উত্থাপন করেন কুপ্পিয়া নামে এক গবেষক, যিনি তাঁর ‘Ancient History of India’ গ্রন্থে এই ভুল সনাক্তকরণের সমালোচনা করেন।

এই প্রসঙ্গে ট্রয়ার নামক এক গবেষকও বেশ কিছু আপত্তি উত্থাপন করেছিলেন, যা ম্যাক্স মুলার খণ্ডন করার চেষ্টা করলেও তা সম্পূর্ণভাবে সফল হয়নি। ফলে এই বিতর্ক আজও নিষ্পত্তিহীন রয়ে গেছে। তবুও পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই তত্ত্বকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি নির্মাণ করেছেন।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে, এবং এই বছরটিকে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের একটি স্থির সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভিনসেন্ট স্মিথ তাঁর ‘The Early History of India’ গ্রন্থে এই তারিখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজবংশের সময়কাল নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই পদ্ধতির ফলে বহু ক্ষেত্রে পুরাণ ও ইতিবৃত্তে বর্ণিত কালপঞ্জির সঙ্গে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাচীন হিন্দু সাহিত্যে কলিযুগাব্দ, যুধিষ্ঠির শক, শকাব্দ, লৌকিকাব্দ, হর্ষ শক প্রভৃতি বিভিন্ন কালগণনা পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ইতিহাস নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা এই সমস্ত পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে নিজেদের অনুমাননির্ভর কাঠামো নির্মাণ করেছেন। ফলে প্রাচীন ভারতের প্রকৃত ইতিহাস অনেকাংশেই বিকৃত বা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।

পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের একটি সাধারণ ধারণা ছিল যে, আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পূর্বে ভারতের কোনও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস ছিল না। এলফিনস্টোন এই মত প্রকাশ করেন যে, আলেকজান্ডারের আগমনের পূর্বে কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। পরবর্তীকালে কাউয়েলও একই ধরনের মন্তব্য করেন। ম্যাক্স মুলার এই ধারণাকে সমর্থন করে বলেন, হিন্দুরা মূলত দার্শনিক জাতি হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ইতিহাসচর্চার প্রবণতা কম ছিল।

ড. ম্যাকডোনেল আরও কঠোর ভাষায় বলেন যে, ভারতীয় সাহিত্যে ইতিহাসচেতনার অভাব এতটাই প্রবল যে, তা প্রায় অস্তিত্বহীন। তাঁর মতে, প্রাচীন ভারতীয়রা কখনও এমন রাজনৈতিক সংগ্রামের সম্মুখীন হয়নি, যা একটি জাতির মধ্যে ঐক্যবোধ ও ইতিহাসলেখনের প্রয়োজন সৃষ্টি করে। পাশাপাশি ব্রাহ্মণদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিও ইতিহাসচর্চার পথে অন্তরায় ছিল।

তবে এই ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে অনেক গবেষক যুক্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রাচীন ভারতে পাশ্চাত্য ধারার ইতিহাসগ্রন্থ না থাকলেও ইতিহাসচর্চার উপাদানের কোনও অভাব ছিল না। এইচ. এইচ. উইলসন তাঁর বিষ্ণুপুরাণ অনুবাদের ভূমিকায় উল্লেখ করেন যে, এই গ্রন্থে রাজবংশ ও শাসকদের একটি ধারাবাহিক তালিকা পাওয়া যায়, যা ইতিহাসচর্চার জন্য মূল্যবান উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও এতে কিছু অতিরঞ্জন বা পৌরাণিক উপাদান রয়েছে, তবুও এর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

একইভাবে কর্নেল জেমস টড তাঁর ‘Annals and Antiquities of Rajasthan’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন ভারতে ইতিহাসলেখনের ধারা একেবারেই অনুপস্থিত ছিল না। বরং রাজনৈতিক বিপর্যয়, বিদেশি আক্রমণ এবং সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে বহু ঐতিহাসিক গ্রন্থ নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর মতে, ভারতীয় সভ্যতা এতটাই উন্নত ছিল যে, তারা ইতিহাসলেখনের মতো মৌলিক শিল্প সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।

টড আরও বলেন, বহু শতাব্দীর রাজনৈতিক অস্থিরতা, আক্রমণ ও লুণ্ঠনের ফলে ভারতের সাহিত্যভাণ্ডার অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ফলে আজ আমরা যে শূন্যতা অনুভব করি, তা প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক উপাদানের অভাব নয়, বরং সংরক্ষণের অভাবের ফল।

সবশেষে বলা যায়, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নির্ধারণ একটি জটিল ও বহুস্তরীয় সমস্যা, যেখানে বিভিন্ন মতবাদ ও প্রমাণের মধ্যে সংঘাত বিদ্যমান। একদিকে রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, অন্যদিকে পাশ্চাত্য গবেষণাপদ্ধতি। এই দুই ধারার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেই একটি অধিকতর সঠিক ও সমৃদ্ধ ইতিহাস নির্মাণ সম্ভব।

যাঁরা হিন্দুদের মতো এক স্বতন্ত্র সভ্যতাধারী জাতির কাছ থেকে গ্রিস ও রোমের ইতিহাসগ্রন্থের অনুরূপ, একই প্রকৃতির ইতিহাসরচনা প্রত্যাশা করেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে এক গুরুতর ভুল করেন। কারণ তাঁরা ভারতীয় জাতির নিজস্ব মানসিকতা, ধর্মবোধ, সাহিত্যরীতি ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে যথাযথভাবে বিবেচনা করেন না। ভারতের মানুষের চিন্তাশক্তি, কাব্য, দর্শন, কৃষিজ্ঞান, শিল্পরুচি এবং সামাজিক কাঠামো পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন। সুতরাং ভারতীয় ইতিহাসচেতনার রূপও গ্রিক বা রোমান ইতিহাসরীতির অনুলিপি হবে, এমন আশা করা যুক্তিযুক্ত নয়। ভারতীয় ইতিহাসচর্চা ধর্ম, পুরাণ, বংশপরম্পরা, আচার, স্মৃতি ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। ফলে তার ভাষা ও কাঠামো পশ্চিমা অর্থে সরল রাজনৈতিক ইতিহাস না হয়ে বহুক্ষেত্রে ধর্মীয়, নৈতিক ও কাব্যিক আবরণে রক্ষিত হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে কর্নেল টড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সাহিত্যেও ক্লাসিক্যাল গ্রিক ও রোমান মডেলের প্রভাব আসার পূর্বে ইতিহাসরচনার ধারা খুব উন্নত ছিল না। ইউরোপের বহু জাতির প্রাচীন ইতিহাসবৃত্তান্তও ছিল অপরিণত, বিস্ময়কর, অতিরঞ্জিত এবং অনেক সময় শুষ্ক। অতএব রাজপুতদের প্রাচীন বংশবৃত্তান্ত বা ভারতীয় পুরাণের ঐতিহাসিক উপাদানকে একমাত্র আধুনিক ইতিহাসের মানদণ্ডে বিচার করে অগ্রাহ্য করা ন্যায়সংগত নয়। ভারতীয় ইতিহাসের উপাদানকে ভারতীয় সভ্যতার প্রকৃতি, ধর্মীয় মানসিকতা ও সাংস্কৃতিক রীতির আলোয় বিচার করাই অধিকতর সঙ্গত।

নিয়মিত ও বিশুদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থের অভাব থাকলেও ভারতীয় সাহিত্যে ইতিহাসচর্চার উপাদান যে বিপুল পরিমাণে ছড়িয়ে আছে, এ কথা বহু গবেষক স্বীকার করেছেন। কর্নেল টডের মতে, পুরাণ, রাজবংশীয় বংশতালিকা, রাজপরিবারের কাহিনি, আঞ্চলিক ঐতিহ্য, শিলালিপি, মন্দিরলিপি, লোককথা এবং প্রাচীন কাব্যের বিচ্ছিন্ন ইঙ্গিতগুলির মধ্যে এমন বহু তথ্য আছে, যা একজন ধৈর্যশীল, বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ গবেষকের হাতে মূল্যবান ইতিহাসসামগ্রী হয়ে উঠতে পারে। এগুলির মধ্যে পৌরাণিক অলংকার, ধর্মীয় রূপক, অতিরঞ্জন ও অলৌকিক উপাদান থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে সেগুলির ভিতরে কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। বরং বহু সময়ে কল্পকাহিনির আবরণের নিচে বাস্তব বংশপরম্পরা, রাজনৈতিক সংঘাত, রাজ্যবিস্তার, সামাজিক রূপান্তর ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে।

মার্ক অরেল স্টেইন কল্হণের ‘রাজতরঙ্গিণী’র ভূমিকায় ভারতীয় ইতিহাসচেতনা সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, “হিন্দু ভারতের কোনও ইতিহাস ছিল না”, এই কথাটি আংশিক সত্য হলেও সম্পূর্ণ সত্য নয়। যদি ইতিহাস বলতে গ্রিস ও রোমের ধাঁচে লিখিত সুবিন্যস্ত বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস বোঝানো হয়, তবে প্রাচীন ভারতে সেই ধরনের ইতিহাসগ্রন্থ খুব বেশি পাওয়া যায় না। কিন্তু যদি ইতিহাস বলতে ঐতিহাসিক বিকাশ, রাজবংশীয় ধারাবাহিকতা, সামাজিক স্মৃতি এবং অতীত অনুধাবনের উপকরণ বোঝানো হয়, তবে ভারতীয় সাহিত্যে তার অভাব নেই। শিলালিপি, মুদ্রা, প্রত্নাবশেষ, পুরাণ, ইতিবৃত্ত, আঞ্চলিক রাজবৃত্তান্ত এবং বংশপরম্পরাগত কাহিনি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ [স্টেইন, রাজতরঙ্গিণী, ভূমিকা, পৃ. ৩]।

ভারতীয় পাণ্ডুলিপির ধ্বংস ও লুপ্তির বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এন. চিদম্বর আয়ার তাঁর বরাহমিহিরের ‘বৃহৎসংহিতা’ অনুবাদের ভূমিকায় লুই জ্যাকোলিয়োর ‘Bible in India’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারকদের একাংশ ভারতে বহু সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ অনুসারে, যেসব প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ তাঁদের হাতে পড়ত, সেগুলির অনেকগুলিই আগুনে পোড়ানো হত, বিশেষত যেগুলি অধিক প্রাচীন ও অধিক প্রামাণ্য বলে মনে হত। যদিও এই বক্তব্যের প্রত্যেকটি বিবরণ আধুনিক গবেষণায় আলাদাভাবে যাচাইয়ের দাবি রাখে, তবু একথা সত্য যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আক্রমণ, ধর্মীয় সংঘাত, প্রাকৃতিক ক্ষয়, অনুলিপি সংরক্ষণের অভাব এবং প্রতিষ্ঠানগত অবহেলার ফলে ভারতীয় পাণ্ডুলিপিসম্পদের বিপুল অংশ হারিয়ে গেছে। ফলে আজ যে শূন্যতা আমরা দেখি, তা সবসময় প্রাচীন ভারতে ইতিহাসচেতনার অনুপস্থিতির প্রমাণ নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা সংরক্ষণব্যবস্থার ধ্বংসের ফল।

এই সমস্ত বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ইতিহাসের উপাদানশূন্য নয়। অতএব প্রাচীন হিন্দু লেখকদের দেওয়া কালগণনা ও বংশতালিকাকে একেবারে অস্পষ্ট, অবৈজ্ঞানিক বা অবিশ্বস্ত বলে বাতিল করা অত্যন্ত তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত। বরং এগুলিকে সমালোচনামূলক পদ্ধতিতে বিচার করতে হবে। যেখানেই অতিরঞ্জন আছে, সেখানে তা পৃথক করতে হবে; যেখানেই বংশপরম্পরা, রাজ্যের নাম, শাসনকাল, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভৌগোলিক ইঙ্গিত আছে, সেখানে তা শিলালিপি, মুদ্রা, প্রত্নতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

প্রাচীন হিন্দু সাহিত্য দাবি করে যে সৃষ্টির সূচনা থেকে মানবসমাজের বংশপরম্পরা ও কালচক্রের একটি ধারাবাহিক বিবরণ তার মধ্যে সংরক্ষিত আছে। হিন্দু জ্যোতির্বিদ ও পুরাণকারদের মতে বর্তমান সৃষ্টিচক্রের বয়স প্রায় ১৯৬ কোটি বছর। আধুনিক পাঠকের কাছে এই সংখ্যা প্রথমে বিস্ময়কর বা অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে। কারণ পাশ্চাত্য খ্রিস্টীয় কালপঞ্জির প্রভাবিত প্রাচীন ধারণায় পৃথিবীর বয়স দীর্ঘদিন মাত্র কয়েক হাজার বছর বলে মনে করা হত। ড. জন উইলিয়াম ড্রেপার উল্লেখ করেছেন যে খ্রিস্টের জন্মকালে ইউরোপে সাধারণভাবে পৃথিবীর বয়স প্রায় চার হাজার বছর বলে ধরা হত, এবং ৫২৭ খ্রিস্টাব্দে ডায়োনিসিয়াস এক্সিগুয়াস বর্তমান খ্রিস্টীয় কালগণনার ভিত্তি স্থাপন করেন [ড্রেপার, History of the Conflict between Religion and Science, পৃ. ১৮৩]।

কিন্তু ভূতত্ত্বের আধুনিক গবেষণা পৃথিবীর বয়সকে বহু কোটি বছরের পরিসরে স্থাপন করেছে। প্রফেসর ওয়ালকট পৃথিবীর বয়স প্রায় সাত কোটি বছর বলে উল্লেখ করেছিলেন, আর প্রফেসর এম. সি. গি আরও দীর্ঘ, প্রায় ষাট কোটি বছরের কথা বলেন। আজকের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পৃথিবীর বয়স আরও বহু গুণ বেশি বলে নির্ধারিত হলেও, এখানে মূল বিষয়টি হল, হিন্দু মহাকালচিন্তা পশ্চিমা মধ্যযুগীয় কয়েক হাজার বছরের সৃষ্টিতত্ত্বের তুলনায় অনেক বিস্তৃত ও মহাজাগতিক। যুগ, মহাযুগ, মন্বন্তর ও কল্পের ধারণা ভারতীয় চিন্তায় সময়কে ক্ষুদ্র মানবজীবনের মাপে নয়, মহাবিশ্বের বিশাল ছন্দে বোঝার চেষ্টা করেছে।

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের ভিত্তিতে ভারতের ইতিহাসকে কালানুক্রমিক আলোচনার সুবিধার জন্য দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এক, মহাভারত যুদ্ধের পূর্ববর্তী যুগ, যাকে প্রাগৈতিহাসিক বা অর্ধঐতিহাসিক পর্ব বলা যেতে পারে। দুই, মহাভারত যুদ্ধ-পরবর্তী যুগ, যাকে ঐতিহাসিক পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই বিভাজনের কারণ হল, পুরাণ ও ইতিবৃত্তসমূহ মহাভারত যুদ্ধ এবং কলিযুগের সূচনা থেকে মগধের রাজবংশগুলির ধারাবাহিক তালিকা দিতে শুরু করে। এই বংশতালিকাগুলি প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস পুনর্গঠনে একটি সুসংহত কাঠামো প্রদান করে।

অদ্ভুত বিষয় হল, যে পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদেরা পুরাণ ও ইতিবৃত্তকে দীর্ঘদিন অবজ্ঞা করেছিলেন, তাঁরাও আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পূর্ববর্তী ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত এই সাহিত্যিক ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছেন। ভিনসেন্ট এ. স্মিথ স্বীকার করেন যে আলেকজান্ডারের পূর্ববর্তী সময়, বিশেষত খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ৩২৬ অব্দ পর্যন্ত ভারতীয় ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য মূলত সাহিত্যিক ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করতেই হয় [Early History of India, পৃ. ১০]। এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।

পরবর্তী পর্যায়ে বহু গবেষক উপলব্ধি করেন যে পুরাণগুলিতে সংরক্ষিত রাজবংশীয় তালিকাগুলি কেবল কল্পকাহিনি নয়। এদের মধ্যে এমন এক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা ইতিহাসচর্চার জন্য মূল্যবান। বিচারপতি এফ. ই. পার্জিটার, যিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট গবেষক ছিলেন, তাঁর ‘Ancient Indian Genealogies and Chronology’ প্রবন্ধে বলেন, এই প্রাচীন বংশতালিকা ও সংশ্লিষ্ট কাহিনিগুলিকে ভিত্তিহীন কিংবদন্তি বা নিছক উপকথা বলে দেখা উচিত নয়। এগুলিতে প্রকৃত ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষিত আছে এবং সাধারণ বিচারবুদ্ধির আলোয় এগুলিকে বিশ্লেষণ করা উচিত [Journal of the Royal Asiatic Society, 1910]।

ভিনসেন্ট স্মিথও স্বীকার করেন যে ভারতীয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে সুসংহত রূপ পুরাণগুলির রাজবংশীয় তালিকায় সংরক্ষিত। আঠারোটি পুরাণের মধ্যে বিশেষত বায়ু, মৎস্য, বিষ্ণু, ব্রহ্মাণ্ড ও ভাগবত পুরাণে এই ধরনের বংশতালিকা আছে। তাঁর মতে, মৎস্য পুরাণের তালিকা অপেক্ষাকৃত প্রাচীন ও প্রামাণ্য [Early History of India, পৃ. ১১]। এই তালিকাগুলিতে মগধের বিভিন্ন রাজবংশ, রাজাদের নাম এবং তাঁদের শাসনকালের বিবরণ পাওয়া যায়।

পুরাণসমূহ মহাভারত যুদ্ধের পর মগধে যে রাজবংশগুলি শাসন করেছে, তাদের একটি ধারাবাহিক বিবরণ দেয়। এই বিবরণ অনুসারে, মহাভারত যুদ্ধের পর বৃহদ্রথ বংশের বাইশ জন রাজা মগধে প্রায় এক হাজার বছর শাসন করেন। পৃথক পৃথক রাজাদের শাসনকাল যোগ করলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০০৬ বছর। হাজার বছরের দীর্ঘ পরিসরে ছয় বছরের সামান্য অমিলকে খুব বড় অসঙ্গতি বলা যায় না। সম্ভবত পুরাণকাররা মোট সময়কে গোল সংখ্যায় এক হাজার বছর বলে উল্লেখ করেছেন।

বৃহদ্রথদের পরে প্রদ্যোত বংশ মগধের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়। এই বংশের পাঁচ জন রাজা ১৩৮ বছর শাসন করেন। প্রদ্যোতদের পরে শিশুনাগ বংশ ক্ষমতায় আসে। এই বংশের দশ জন রাজা ৩৬০ বছর রাজত্ব করেন। তাঁদের পর নন্দ বংশের উত্থান ঘটে। মহাপদ্ম নন্দ, যিনি নন্দ নামেও পরিচিত, এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা। পুরাণীয় বিবরণ অনুসারে, মহাপদ্ম নন্দ ও তাঁর আট পুত্র মোট একশো বছর শাসন করেন।

এই নন্দদের পতনের সঙ্গে যুক্ত হন চাণক্য, যিনি কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও প্রসিদ্ধ। তিনি নন্দদের উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্তকে মগধের সিংহাসনে বসান। এই চন্দ্রগুপ্তকে মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। আলোচ্য গ্রন্থের লেখকের মতে, চন্দ্রগুপ্ত মহাপদ্ম নন্দের এক শূদ্র স্ত্রীর পুত্র ছিলেন, যার নাম ছিল মুরা; সেই মুরার নাম থেকেই তিনি ‘মৌর্য’ উপাধি গ্রহণ করেন। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদেরা এই ব্যাখ্যা নিয়ে একমত নন এবং মৌর্য নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত আছে, তবু পুরাণীয় ঐতিহ্যে এই ধরনের ব্যাখ্যা ভারতীয় বংশপরম্পরা ও রাজনৈতিক স্মৃতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।

এই সমস্ত বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসকে একেবারে অনৈতিহাসিক বলে বাতিল করার প্রবণতা যথার্থ নয়। বরং পুরাণ, ইতিবৃত্ত, বংশতালিকা, শিলালিপি, মুদ্রা ও আঞ্চলিক ইতিহাসকে একত্রে বিচার করলে একটি বৃহৎ ঐতিহাসিক কাঠামো নির্মাণ করা যায়। সমস্যা হল, এই উপাদানগুলিকে সরলরেখায় পড়লে ভুল হতে পারে; আবার সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও ইতিহাসের মূল্যবান সূত্র হারিয়ে যাবে। সুতরাং প্রয়োজন সমালোচনামূলক শ্রদ্ধা। অর্থাৎ ঐতিহ্যকে সম্মান করতে হবে, কিন্তু যাচাইহীনভাবে গ্রহণ করা যাবে না; পাশ্চাত্য পদ্ধতির বিশ্লেষণ গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু ভারতীয় উৎসকে অবজ্ঞা করে নয়।

প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি নিয়ে বিতর্কের মূল শিক্ষা এখানেই। ভারতীয় ঐতিহাসিক স্মৃতি ধর্মীয় ভাষায় সংরক্ষিত, কিন্তু সে কারণে তা অর্থহীন নয়। পুরাণীয় বংশতালিকায় পৌরাণিকতা আছে, কিন্তু তার সঙ্গে ইতিহাসের রেখাও আছে। মহাভারত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে কালবিভাজন করা হয়েছে, তা ভারতীয় ঐতিহ্যে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই ধারাকে বিচার করতে হলে প্রয়োজন ধৈর্য, পাঠসমালোচনা, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব এবং শিলালিপি-অধ্যয়নের সম্মিলিত প্রয়োগ। একমাত্র এই সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমেই প্রাচীন ভারতের প্রকৃত ইতিহাস ও কালানুক্রম আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের একটি বড় অংশ গ্রিক ইতিহাসকারদের বর্ণিত সান্দ্রাকোট্টস, সান্দ্রাকুপ্তস বা সান্দ্রাসিপ্টাসকে মৌর্যবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে অভিন্ন বলে ধরে নিয়েছিলেন। আলেকজান্ডারের ভারতাভিযানসংক্রান্ত গ্রিক বিবরণে যে ভারতীয় রাজপুরুষের উল্লেখ আছে, তাঁকেই তাঁরা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বলে শনাক্ত করেন এবং সেই সূত্রে তাঁর মগধের সিংহাসনে আরোহণের সাল স্থির করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দ। এই তারিখকে কেন্দ্র করে তাঁরা পুরাণে উল্লিখিত বিভিন্ন রাজবংশ ও রাজাদের শাসনকাল গণনা করে প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি নির্মাণের চেষ্টা করেন [Early History of India, Appendix C]। কিন্তু আলোচ্য গ্রন্থকারের মতে, এই সনাক্তকরণ ছিল ভ্রান্ত, এবং সেই ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রাচীন ভারতের বহু কালানুক্রমিক সিদ্ধান্তও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ভারতীয় প্রাচীন উৎস অনুসারে মহাভারত যুদ্ধের পর মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের শাসন আরম্ভ হওয়ার পূর্বে মগধে চারটি রাজবংশ শাসন করেছিল। এই চারটি রাজবংশের মোট শাসনকাল দেওয়া হয়েছে ১৬০৪ বছর। প্রথমে বৃহদ্রথ বংশ ১০০৬ বছর, তারপর প্রদ্যোত বংশ ১৩৮ বছর, এরপর শিশুনাগ বংশ ৩৬০ বছর এবং শেষে নন্দ বংশ ১০০ বছর মগধ শাসন করে। এই চারটি সময়কাল যোগ করলে দাঁড়ায় ১৬০৪ বছর [পুরাণসমূহ; Kaliyuga Raja Vrittantam]।

প্রাচীন হিন্দু সাহিত্য, পুরাণ, ইতিবৃত্ত এবং ঐতিহ্যসমূহের বক্তব্য হল, কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে সংঘটিত মহাভারত যুদ্ধ বর্তমান কলিযুগের সূচনার ৩৭ বছর পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে কলিযুগের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে। অতএব এই গণনা অনুসারে মহাভারত যুদ্ধের সময় দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ। যদি এই তারিখ গ্রহণ করা হয়, তবে মহাভারত যুদ্ধের পরবর্তী চার রাজবংশের ১৬০৪ বছরের শাসনকাল বাদ দিলে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের শাসন শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩৫ অব্দে। এই হিসাবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারের সমসাময়িক হতে পারেন না। কারণ আলেকজান্ডারের ম্যাসিডোনীয় সাম্রাজ্য তখনও বহু শতাব্দী পরে ইতিহাসে আবির্ভূত হবে। এই যুক্তি থেকেই আলোচ্য গ্রন্থকার সিদ্ধান্ত করেন যে, সান্দ্রাকোট্টসকে মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত বলে চিহ্নিত করা ইতিহাসসম্মত নয়, বরং অনুমাননির্ভর ও দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়ানো এক কল্পিত সিদ্ধান্ত।

এই বিশ্লেষণ প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক সভ্যতাকে আরও বহু দূর অতীতে নিয়ে যায়। যদি পুরাণীয় গণনা গ্রহণ করা হয়, তবে ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজবংশীয় ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় কালপঞ্জি এবং সভ্যতার পরিণত রূপ খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দেরও বহু পূর্বে সুসংগঠিত ছিল বলে ধরে নিতে হয়। পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদরা পুরাণের রাজবংশীয় তালিকাকে অনেকাংশে গ্রহণ করলেও তাঁরা রাজাদের দীর্ঘ শাসনকাল সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, কোনও কোনও পুরাণীয় রাজাকে ৮০ বা ৮৫ বছর পর্যন্ত শাসনকারী বলা হয়েছে, যা তাঁদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। এই সন্দেহের পক্ষে তাঁরা ইংল্যান্ডের ১৬৪৯ থেকে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসনকারী রাজাদের গড় শাসনকাল হিসাব করে প্রাচীন ভারতীয় রাজাদের শাসনকালকে বিচার করেছেন [V. A. Smith, Early History of India, পৃ. ৪৫]।

কিন্তু এই পদ্ধতি নিজেই সমস্যাযুক্ত। এক দেশের একটি নির্দিষ্ট আধুনিক বা মধ্যযুগীয় রাজবংশের গড় শাসনকালকে বহু শতাব্দী পূর্বের ভারতীয় রাজবংশের সঙ্গে তুলনা করা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়। ভিন্ন জলবায়ু, ভিন্ন সমাজব্যবস্থা, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাস, ভিন্ন রাজনৈতিক নিয়ম এবং ভিন্ন উত্তরাধিকার প্রথার কারণে শাসনকালের গড়ও ভিন্ন হতে পারে। উপরন্তু গ্রিক লেখকরাই ভারতীয়দের দীর্ঘায়ু সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের বিবরণে বলা হয়েছে, ভারতীয়রা অনেক সময় ১২০, ১৩০, ১৫০ এমনকি ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতেন। আরিয়ান ও ক্টেসিয়াসের বিবরণে ভারতীয়দের দীর্ঘায়ুর কথা উল্লেখ আছে [Ancient India as described by Ktesias, অনুবাদ: J. W. McCrindle, পৃ. ১৮, ২৫, ৬১]। ভিনসেন্ট স্মিথও উল্লেখ করেছেন যে ম্যাসিডোনীয়রা ভারতীয়দের দীর্ঘ জীবন, সুস্বাস্থ্য ও সংযমী জীবনযাপনের প্রতি বিস্মিত হয়েছিল [Early History of India, পৃ. ১০০]।

অতএব কোনও প্রাচীন রাজা যদি ৮০ বা ৮৫ বছর শাসন করে থাকেন, তা একেবারে অসম্ভব বলে ধরে নেওয়ার যুক্তি দুর্বল। বাইবেলীয় কালপঞ্জিতেও বহু প্রাচীন ব্যক্তির দীর্ঘায়ুর উল্লেখ আছে। সুতরাং শুধু দীর্ঘ শাসনকাল দেখিয়ে পুরাণীয় তালিকাকে অবিশ্বস্ত ঘোষণা করা পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত হতে পারে। আলোচ্য গ্রন্থকারের মতে, পুরাণের রাজবংশীয় তালিকায় কিছু অসঙ্গতি থাকলেও সেগুলিকে সম্পূর্ণ বাতিল করা যায় না। বরং প্রয়োজন পাঠসমালোচনা, পাণ্ডুলিপির তুলনামূলক বিচার এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহাভারত যুদ্ধ প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জির এক কেন্দ্রীয় ও স্থায়ী সূচক। কারণ মহাভারত যুদ্ধের পর থেকেই পুরাণসমূহ মগধের রাজবংশ ও রাজাদের ধারাবাহিক তালিকা যথেষ্ট স্পষ্টতার সঙ্গে প্রদান করে। সুতরাং প্রাচীন ভারতের প্রকৃত ইতিহাস নির্মাণ করতে হলে এই কেন্দ্রবিন্দুর সময় নির্ধারণ অপরিহার্য। ভারতীয় উৎস থেকে পাওয়া কালানুক্রমিক তথ্যগুলি প্রথমে নিজস্ব যুক্তিতে বিশ্লেষণ করতে হবে, তারপর সেগুলিকে জ্যোতির্বিদ্যা, শিলালিপি, মুদ্রা, ভাষাতত্ত্ব ও বিদেশি বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে।

অনেক প্রাচ্যবিদ মহাভারত যুদ্ধের নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে ঐকমত্য নেই। কেউ যুদ্ধের তারিখ খ্রিস্টপূর্ব চব্বিশ শতকে স্থাপন করেছেন, কেউ আবার খ্রিস্টীয় প্রথম শতক পর্যন্ত নামিয়ে এনেছেন। আলোচ্য গ্রন্থকারের মতে, এই বিভ্রান্তির প্রধান কারণ হল মৌর্য চন্দ্রগুপ্তকে গ্রিক সান্দ্রাকোট্টস হিসেবে ভুল শনাক্ত করা। তাঁরা খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দকে চন্দ্রগুপ্তের শাসনসূচনা ধরে সেখান থেকে পিছনের দিকে গণনা করে মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যবহৃত পাঠ, রাজবংশীয় শাসনকাল এবং পুরাণীয় সংখ্যার ব্যাখ্যা নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ থাকায় ফলাফলও একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়েছে।

এই বিভ্রান্তির একটি প্রধান ক্ষেত্র হল পরীক্ষিতের জন্ম থেকে মহাপদ্ম নন্দের অভিষেক পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান। পুরাণসমূহে বলা হয়েছে, পরীক্ষিতের জন্ম মহাভারত যুদ্ধের সময়ের সঙ্গে সমসাময়িক। মহাভারত যুদ্ধের পর মগধে বৃহদ্রথ বংশের প্রথম রাজা সোমাধির শাসন শুরু হয়। পুরাণীয় হিসাবে পরীক্ষিতের জন্ম থেকে মহাপদ্ম নন্দের অভিষেক পর্যন্ত ব্যবধান ১৫০০ বছর। আবার পৃথকভাবে বৃহদ্রথ, প্রদ্যোত ও শিশুনাগ বংশের রাজাদের শাসনকাল যোগ করলে প্রায় ১৫০৪ বছর দাঁড়ায়। এই সামান্য পার্থক্যকে গোল সংখ্যায় ১৫০০ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়।

কিন্তু বিভিন্ন পুরাণের পাণ্ডুলিপিতে এই সংখ্যা ভিন্ন ভিন্নভাবে পাওয়া গেছে। মৎস্য পুরাণের কিছু পাণ্ডুলিপি এবং তেলুগু সংস্করণে পরীক্ষিত থেকে মহাপদ্ম নন্দ পর্যন্ত ব্যবধান ১৫০০ বছর বলা হয়েছে [মৎস্য পুরাণ, অধ্যায় ২৭১, শ্লোক ৩৮]। নাগরী সংস্করণে কোথাও এই সংখ্যা ১০৫০ হিসেবে পড়া হয়েছে [নাগরী সংস্করণ, মৎস্য পুরাণ, অধ্যায় ২১৩, শ্লোক ৩৬]। আলোচ্য গ্রন্থকারের মতে, নাগরী সংস্করণে বহু মুদ্রণপ্রমাদ এবং পাঠভেদ আছে। একই গ্রন্থে পৃথক রাজাদের শাসনকাল যোগ করলে যখন ১৫০৪ বছর পাওয়া যায়, তখন ১০৫০ পাঠটি স্পষ্টতই ভুল বলে মনে হয়।

এই ভুলের মূল সম্ভবত সংস্কৃত শব্দপাঠে। “পঞ্চশদুত্তরম্” বা “পঞ্চাশদুত্তরম্” ধরনের পাঠের বিভ্রান্তি থেকে ৫০০-এর পরিবর্তে ৫০ পড়া হয়েছে। ফলে এক হাজার পাঁচশোর জায়গায় এক হাজার পঞ্চাশ হয়ে গেছে। বায়ু পুরাণ ও ব্রহ্মাণ্ড পুরাণের কিছু সংস্করণেও একই ধরনের ভুল পাঠ দেখা যায়, কিন্তু অন্যান্য পাণ্ডুলিপিতে সঠিক পাঠ হিসেবে ১৫০০ বছরই পাওয়া যায় [বায়ু পুরাণ, অধ্যায় ৯৯, শ্লোক ৪১৫]।

এফ. ই. পার্জিটার এই পাঠভেদের দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির তুলনা করে দেখিয়েছিলেন যে “পঞ্চশতোত্তরম্” পাঠটি অধিক গ্রহণযোগ্য। বিষ্ণু পুরাণের একটি পাঠে ব্যবধান ১০১৫ বছর হিসেবে দেখা যায় [বিষ্ণু পুরাণ, চতুর্থ অংশ, অধ্যায় ২৪, শ্লোক ৩২]। ভাগবত পুরাণের এক সংস্করণে আবার ১১১৫ বছর পড়া হয়েছে [ভাগবত পুরাণ, দ্বাদশ স্কন্ধ, অধ্যায় ২, শ্লোক ২৬]। কিন্তু ভাগবত পুরাণের ভাষ্যকাররাও বুঝেছিলেন যে পাঠে সমস্যা আছে। তাঁরা ১১৫-এর স্থলে ৫০০ বোঝানো উচিত বলে সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অতএব বিভিন্ন পাঠভেদের বিচার করলে পরীক্ষিত থেকে মহাপদ্ম নন্দ পর্যন্ত ১৫০০ বছরই অধিক যুক্তিযুক্ত ও সঙ্গত পাঠ বলে প্রতীয়মান হয়।

কিছু প্রাচ্যবিদ ভুল পাঠ ১০১৫, ১০৫০ বা ১১১৫ বছর গ্রহণ করে, তার সঙ্গে নন্দ বংশের ১০০ বছর এবং খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দ যোগ করে মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ধারণ করেছেন যথাক্রমে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৩৭, ১৪৭২ বা ১৫৩৭ অব্দে। কেউ কেউ আবার নন্দ বংশের শাসনকাল ১০০ বছরের পরিবর্তে ৫০ বছর ধরে যুদ্ধের তারিখ আরও পরে নামিয়ে এনেছেন। আলোচ্য গ্রন্থকারের মতে, এই পদ্ধতি দুটি কারণে ভুল। প্রথমত, তাঁরা ভুল পাণ্ডুলিপি-পাঠকে ভিত্তি করেছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা কলিযুগের সূচনাকেই মহাভারত যুদ্ধের সময় বলে ধরে নিয়েছেন, অথচ প্রাচীন হিন্দু সাহিত্য স্পষ্টভাবে বলে যে যুদ্ধ কলিযুগের সূচনার ৩৭ বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল।

পার্জিটার তাঁর প্রবন্ধে কলিযুগের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ১৭৩৩ অব্দে স্থাপন করেছিলেন। পরে তাঁর ‘Dynasties of the Kali Age’ গ্রন্থে মহাভারত যুদ্ধের তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ১৮১০ অব্দে নির্ধারণ করেন। সেখানে তিনি যুদ্ধ বা পরীক্ষিতের জন্ম থেকে মহাপদ্ম নন্দের অভিষেক পর্যন্ত ব্যবধান ১৩৮৮ বছর ধরেন। তাঁর হিসাবে বৃহদ্রথদের জন্য ৯২০ বছর, প্রদ্যোতদের জন্য ১৩৮ বছর এবং শিশুনাগদের জন্য ৩৩০ বছর নির্ধারিত হয়েছে। এই সংখ্যা পুরাণীয় মোট হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

রায়বাহাদুর শ্রী শচন্দ্র বিদ্যার্ণব, যিনি সংস্কৃতজ্ঞ হিসেবে খ্যাত এবং মৎস্য পুরাণের ইংরেজি অনুবাদের পরিশিষ্ট লিখেছিলেন, মহাভারত যুদ্ধের তারিখ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৬৩ অব্দে স্থাপন করেন। তিনি স্পষ্টতই মৌর্য চন্দ্রগুপ্তকে গ্রিক সান্দ্রাকোট্টস হিসেবে শনাক্ত করার তত্ত্ব মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুরাণের গণনাপদ্ধতিতে নন্দ বংশকে একটি প্রধান সূচক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। শিশুনাগ বংশের শেষ রাজা মহানন্দীর শূদ্র স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন মহাপদ্ম নন্দ। তাঁর আট পুত্র পরবর্তীতে শাসন করেন। কৌটিল্য বা চাণক্য এই নন্দ বংশের অবসান ঘটিয়ে চন্দ্রগুপ্তকে সিংহাসনে বসান।

ভিনসেন্ট স্মিথের মতে, মহানন্দীর শূদ্র স্ত্রীর পুত্র মহাপদ্ম নন্দ সিংহাসন দখল করে নন্দ বংশ প্রতিষ্ঠা করেন, এবং এই ঘটনা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৭২ অব্দে স্থাপন করা যায়। স্মিথ নন্দ বংশের শাসনকাল ৫০ বছর ধরে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণের পূর্বে ৫০ বছর যোগ করেছিলেন। কিন্তু পুরাণসমূহ একবাক্যে নন্দ বংশের শাসনকাল ১০০ বছর বলে উল্লেখ করে। সেই হিসাবে মহাপদ্ম নন্দের অভিষেক খ্রিস্টপূর্ব ৩৭২ নয়, বরং খ্রিস্টপূর্ব ৪২২ অব্দে স্থাপন করা উচিত।

এই দীর্ঘ আলোচনার মূল বক্তব্য হল, প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি নির্ধারণে ব্যবহৃত সংখ্যাগুলি কেবল যান্ত্রিকভাবে যোগ-বিয়োগ করলেই চলে না। কোন পাণ্ডুলিপি-পাঠ গ্রহণযোগ্য, কোন পাঠ লিপিকরের ভুল, কোন সংখ্যা গোল করে বলা হয়েছে, কোন রাজবংশের শাসনকাল প্রকৃতপক্ষে কত, এবং কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে কোন বিদেশি নামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত, এসব বিষয়ে গভীর সতর্কতা প্রয়োজন। একবার যদি ভুল ভিত্তি গ্রহণ করা হয়, তবে তার উপর নির্মিত সম্পূর্ণ ইতিহাসই বিকৃত হয়ে পড়তে পারে।

অতএব মহাভারত যুদ্ধ, পরীক্ষিত, মহাপদ্ম নন্দ, চন্দ্রগুপ্ত, নন্দ বংশ, শিশুনাগ, প্রদ্যোত ও বৃহদ্রথদের কালনির্ণয় শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি ভারতীয় ইতিহাসচর্চার পদ্ধতিগত প্রশ্ন। ভারতীয় পুরাণীয় ঐতিহ্যকে একেবারে বাতিল করলে যেমন ভুল হবে, তেমনি তাকে যাচাইহীনভাবে গ্রহণ করাও সমীচীন নয়। কিন্তু পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নিয়ে ভারতীয় উৎসকে অবিশ্বাস্য ঘোষণা করাও সমানভাবে অন্যায়। প্রয়োজন তুলনামূলক, নিরপেক্ষ ও উৎসসমালোচনামূলক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতেই হয়তো একদিন প্রাচীন ভারতের প্রকৃত কালপঞ্জি আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

খ্রিস্টপূর্ব ৪২২ অব্দকে আলোচ্য লেখক পুরাণীয় গণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর মতে, মহাপদ্ম নন্দের অভিষেকের সাল হিসেবে এই তারিখ গ্রহণ করলে প্রাচীন ভারতের রাজবংশীয় কালপঞ্জি একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় সাজানো সম্ভব হয়। কিন্তু পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের বড় অংশ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে গ্রিক লেখকদের সান্দ্রাকোট্টস বা সান্দ্রাসিপ্টাসের সঙ্গে অভিন্ন ধরে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দকে চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণের সাল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এর ফলে তাঁরা পুরাণীয় রাজবংশতালিকাকে এই ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সঙ্গে মিলিয়ে পিছন ও সামনে উভয় দিকে হিসাব করতে শুরু করেন। আলোচ্য গ্রন্থকারের আপত্তি এখানেই। তাঁর মতে, যদি মূল সনাক্তকরণই ভুল হয়, তবে তার উপর দাঁড়ানো সমস্ত কালানুক্রমিক সিদ্ধান্তও অনিবার্যভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

রায়বাহাদুর শ্রী শচন্দ্র বিদ্যার্ণব যে হিসাব করেছিলেন, সেখানে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সিংহাসন আরোহণ ধরা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে। তার পূর্বে নন্দ বংশের শাসনকাল ধরা হয়েছে ১০০ বছর। নন্দদের আগে ছিল শিশুনাগ বংশ, যাদের শাসনকাল ৩৬০ বছর। তারও আগে প্রদ্যোত বংশ, যার জন্য তিনি ১৫২ বছর ধরে হিসাব করেছেন। বৃহদ্রথদের জন্য ধরা হয়েছে ১০০০ বছর, কিন্তু চৈদ্য উপরিচর থেকে সহদেব পর্যন্ত ১৭১ বছর বাদ দিয়ে বাকি ১৪৪১ বছর মহাভারত যুদ্ধ থেকে চন্দ্রগুপ্তের অভিষেক পর্যন্ত ব্যবধান হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এরপর সেই ১৪৪১ বছরের সঙ্গে ৩২২ যোগ করে তিনি মহাভারত যুদ্ধের সাল নির্ধারণ করেছেন খ্রিস্টপূর্ব ১৭৬৩ অব্দ। অর্থাৎ তাঁর হিসাব অনুসারে, মহাভারত যুদ্ধ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সিংহাসন আরোহণের ১৪৪১ বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল।

কিন্তু আলোচ্য গ্রন্থকার এই গণনাকে সন্তোষজনক মনে করেন না। তাঁর মতে, পুরাণের কিছু বিকৃত বা অপভ্রষ্ট পাঠে পরীক্ষিতের জন্ম থেকে মহাপদ্ম নন্দের অভিষেক পর্যন্ত ব্যবধান ১০১৫, ১০৫০ বা ১১১৫ বছর পাওয়া গেলেও শচন্দ্র বিদ্যার্ণব নিজের হিসাবের মাধ্যমে এই ব্যবধানকে ১৩৪১ বছর করে ফেলেছেন। আবার অন্যত্র তিনি মহাভারত যুদ্ধের সাল খ্রিস্টপূর্ব ১৯২২ অব্দ বলে গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বিষ্ণু পুরাণের ভিত্তিতে বৃহদ্রথ, প্রদ্যোত ও শিশুনাগ বংশের মোট শাসনকাল ১৫০০ বছর হিসেবে মেনে নেন। বিষ্ণু পুরাণে বৃহদ্রথদের জন্য ১০০০ বছর, প্রদ্যোতদের জন্য ১৩৮ বছর এবং শিশুনাগদের জন্য ৩৬২ বছর ধরা হলে মোট দাঁড়ায় ১৫০০ বছর। এর সঙ্গে নন্দ বংশের ১০০ বছর এবং চন্দ্রগুপ্তের ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ যোগ করলে যুদ্ধের সাল দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৯২২ অব্দ। তাই তিনি কখনও ১৭৬৩, কখনও ১৯২২, আবার পার্জিটারের ১৮১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করে বলেন যে ১৪৭৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ গ্রহণযোগ্য নয়।

আলোচ্য লেখকের আপত্তি হল, এই সমস্ত গবেষকই একটি মৌলিক বিষয় এড়িয়ে গেছেন। তাঁরা কেউই যথেষ্ট শক্তিশালী কারণ দেখাননি যে কেন কলিযুগের প্রচলিত সূচনা সাল খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দ এবং তার ৩৭ বছর পূর্বে মহাভারত যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার ঐতিহ্যগত তারিখ, অর্থাৎ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ, পরিত্যাগ করতে হবে। হিন্দু পুরাণ, ইতিবৃত্ত, জ্যোতিষশাস্ত্রীয় আচার ও ধর্মীয় সংকল্পপদ্ধতিতে এই কালগণনার দীর্ঘ ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। এই কারণে লেখকের মতে, কেবল গ্রিক লেখকদের সান্দ্রাকোট্টস পরিচয়কে ভিত্তি করে ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠিত তারিখ বাতিল করা যুক্তিসংগত নয়।

এরপর আলোচ্য লেখক দেখাতে চান যে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দকে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের অভিষেক ধরে নেওয়া হলে শুধু মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নয়, পরবর্তী রাজবংশগুলির কালপঞ্জিও অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। কলিযুগ রাজবৃত্তান্ত, যা ভবিষ্যোত্তর পুরাণের পাঠের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বলে বলা হয়েছে, মহাপদ্ম নন্দের অভিষেক থেকে আন্ধ্র বংশের সূচনা পর্যন্ত ব্যবধান মোটামুটি ৮০০ বছর বলে উল্লেখ করে। পৃথকভাবে রাজবংশগুলির শাসনকাল যোগ করলে দেখা যায়, নন্দরা ১০০ বছর, মৌর্যরা ৩১৬ বছর, শুঙ্গরা ৩০০ বছর এবং কাণ্বরা ৮৫ বছর শাসন করেছে। মোট দাঁড়ায় ৮০১ বছর। কিছু পুরাণে এই ব্যবধান ৮২৬ বা ৮৩৬ বছর হিসেবেও দেওয়া হয়েছে।

মৎস্য পুরাণে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে মহাপদ্ম নন্দ থেকে আন্ধ্র বংশ পর্যন্ত ব্যবধান ৮৩৬ বছর, এবং পরীক্ষিতের জন্ম থেকে আন্ধ্র বংশের শেষ পর্যন্ত ব্যবধান ২৮৩৬ বছর। টি. এস. নারায়ণ শাস্ত্রী এই শ্লোকের অনুবাদে জানান, মহাপদ্ম নন্দ ও আন্ধ্র বংশের মধ্যে ৮৩৬ বছরের ব্যবধান এবং পরীক্ষিত থেকে আন্ধ্রদের অন্ত পর্যন্ত দুই হাজারের সঙ্গে সেই ৮৩৬ বছর যোগ করে মোট ২৮৩৬ বছরের ব্যবধান উল্লেখিত হয়েছে। তবে আলোচ্য লেখক লক্ষ করেছেন যে এই শ্লোকের তৃতীয় পংক্তি সব মুদ্রিত সংস্করণ বা পাণ্ডুলিপিতে নেই। তাঁর মতে, এটি অনুলিপিকার বা মুদ্রণজনিত ভুলের ফল হতে পারে।

এখন যদি প্রাচ্যবিদদের মত মেনে নেওয়া হয় যে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে সিংহাসনে বসেন, এবং একই সঙ্গে পুরাণীয় হিসাব অনুসারে মহাপদ্ম নন্দ থেকে আন্ধ্র বংশ পর্যন্ত ব্যবধান ৮০১ বা ৮৩৬ বছর ধরা হয়, তবে আন্ধ্র বংশের সূচনা দাঁড়ায় যথাক্রমে খ্রিস্টীয় ৩৭৯ বা ৪১৪ অব্দে। আবার প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য অনুসারে আন্ধ্ররা ৫০৬ বছর শাসন করেছে। তাহলে তাদের শাসনের অন্ত হবে খ্রিস্টীয় ৮৮৫ বা ৯২০ অব্দে। আলোচ্য লেখকের মতে, এটি স্পষ্টতই অযৌক্তিক। কারণ আন্ধ্র বা সাতবাহনদের ইতিহাস সাধারণভাবে বহু পূর্ববর্তী যুগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে স্বীকৃত। এই অযৌক্তিকতা সৃষ্টি হয়েছে কেবল মৌর্য চন্দ্রগুপ্তকে গ্রিক সান্দ্রাকোট্টস বলে ধরে নেওয়ার কারণে।

এই সমস্যার সমাধানে প্রাচ্যবিদরা পুরাণের কিছু পাঠভেদকে ব্যবহার করেছেন বলে লেখক অভিযোগ করেন। তাঁরা মহাপদ্ম নন্দ থেকে আন্ধ্র বংশের সূচনা পর্যন্ত ব্যবধানকে আন্ধ্র বংশের শেষ পর্যন্ত ব্যবধান হিসেবে পড়েছেন এবং মোট ৮৩০ বছরের মতো একটি সংখ্যা গ্রহণ করেছেন। এই হিসাব তৈরির জন্য তাঁরা নন্দ বংশকে ১০০ বছর, মৌর্য বংশকে ১৩৭ বছর, শুঙ্গ বংশকে ১১২ বছর, কাণ্ব বংশকে ৪৫ বছর এবং আন্ধ্র বংশকে ৪৫০ বছর দিয়েছেন। ফলে নন্দ থেকে আন্ধ্রের পূর্ববর্তী চার বংশের জন্য তাঁদের মোট হিসাব দাঁড়ায় মাত্র ৩৯৪ বছর, যেখানে পুরাণীয় সাহিত্য এই ব্যবধান ৮০০ বছরের বেশি বলে দেয়। এই দুই হিসাবের মধ্যে চার শতাব্দীরও বেশি পার্থক্য। আলোচ্য লেখকের মতে, এত বড় পার্থক্যকে সামান্য পাঠভেদ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভিনসেন্ট এ. স্মিথ এই ব্যবধান টের পেয়েছিলেন বলেই সম্ভবত আন্ধ্রদের ইতিহাস ব্যাখ্যা করার জন্য একটি অতিরিক্ত অনুমান নির্মাণ করেন। তাঁর ধারণা ছিল, আন্ধ্ররা হয়তো চন্দ্রগুপ্ত বা বিন্দুসারের শক্তিশালী মৌর্য সাম্রাজ্যের কাছে কোনও পর্যায়ে আত্মসমর্পণ করে মগধের সর্বময় প্রভুত্ব স্বীকার করেছিল, যদিও মেগাস্থিনিস তাঁদের স্বাধীন জাতি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আবার অন্যত্র স্মিথ বলেন, অশোকের মৃত্যুর পর তাঁর দুর্বল উত্তরাধিকারীদের সময়ে আন্ধ্ররা সাম্রাজ্যিক শৃঙ্খল ঝেড়ে ফেলে সিমুক নামে এক রাজ্যের অধীনে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। তাঁর মতে, এই স্বাধীন আন্ধ্র বংশের সূচনা সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ২৪০ বা ২৩০ অব্দে, কাণ্বদের পতনের বহু পূর্বে। কাণ্ব বংশের শেষ রাজা সুশর্মাকে যিনি হত্যা করেছিলেন, তিনি সিমুক নন, বরং আন্ধ্র রাজাদের তালিকার একাদশ, দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ রাজা হতে পারেন। এইভাবে স্মিথ আন্ধ্রদের মগধশাসন খ্রিস্টপূর্ব ২৮ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় ২৩৫ অব্দ পর্যন্ত স্থাপন করেন [V. A. Smith, Early History of India, পৃ. ২০৮ থেকে ২১৮]।

কিন্তু আলোচ্য লেখক স্মিথের এই অনুমানকে দুর্বল বলে মনে করেন। কারণ অশোকের শিলালিপিতে আন্ধ্রদের সাম্রাজ্যের বাইরের বা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্মিথ বলেন, তাঁরা সম্ভবত স্থানীয় রাজাদের অধীনে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করলেও সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব মানত। কিন্তু লেখকের মতে, এই ধারণার পক্ষে স্মিথ কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ দেননি। তদুপরি পুরাণসমূহ একবাক্যে বলে যে সিমুকই কাণ্বদের শেষ রাজা সুশর্মাকে হত্যা করে আন্ধ্র বংশের মগধশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। স্মিথ নিজেও এই পুরাণীয় বক্তব্যকে জানতেন, কিন্তু নিজের কালপঞ্জি রক্ষার জন্য বিকল্প অনুমান দাঁড় করিয়েছেন। আলোচ্য লেখকের মতে, এই ধরনের অনুমান নির্ভরযোগ্য ইতিহাস রচনার ভিত্তি হতে পারে না।

পুরাণ ও প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য অনুসারে নন্দ বংশের পর মৌর্য বংশ মগধে ৩১৭ বছর শাসন করে। এরপর শুঙ্গ বংশ ৩০০ বছর, কাণ্ব বংশ ৮৫ বছর এবং তার পর আন্ধ্র বংশ ৫০৬ বছর শাসন করে। আন্ধ্র বংশের শেষ শাসক হিসেবে চন্দ্রশ্রীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচ্য গ্রন্থকারের বিবরণ অনুসারে, চন্দ্রশ্রীর স্ত্রীর বোনের স্বামী চন্দ্রগুপ্ত তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে চন্দ্রশ্রীকে হত্যা করেন। পরে রানির অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র পুলোমনের অভিভাবক বা রিজেন্ট হিসেবে সাত বছর ক্ষমতা ধরে রাখেন। পরে পুলোমনকেও হত্যা করে লিচ্ছবীদের সহায়তায় নিজেকে মগধের সম্রাট ঘোষণা করেন। তাঁর স্ত্রী এবং চন্দ্রশ্রীর স্ত্রী উভয়েই লিচ্ছবী পরিবারভুক্ত ছিলেন। এই চন্দ্রগুপ্তের নামেই একটি নতুন যুগের সূচনা হয়, যা গুপ্তাব্দ নামে পরিচিত, এবং তাঁর রাজবংশ গুপ্ত বংশ নামে প্রসিদ্ধ হয়। লেখকের মতে, প্রাচ্যবিদেরা এই গুপ্তাব্দের সূচনা ৩২০ খ্রিস্টাব্দে ধরেছেন, কিন্তু তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

এই গুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত সাত বছর শাসন করেন। তাঁর পর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত ৫১ বছর রাজত্ব করেন। সমুদ্রগুপ্তের পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ৩৬ বছর শাসন করেন। সমুদ্রগুপ্তকে আলোচ্য লেখক কলিযুগে মহাভারত যুদ্ধের পর ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিন্দু সম্রাট হিসেবে দেখান। তিনি বহু যুদ্ধজয় করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে আন্ধ্র বংশের শেষ পর্যায় এবং গুপ্ত বংশের সময়ে পারস্য, গ্রিক, হূণ ও অন্যান্য পশ্চিমা জাতির আক্রমণ ও যোগাযোগের উল্লেখ আছে বলে লেখক দাবি করেন। বিদেশি দূতদের আগমনও এই সময়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

সমুদ্রগুপ্ত সম্পর্কে ভিনসেন্ট স্মিথের মন্তব্য এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ভাগ্যের এক বিচিত্র পরিহাসে এই মহান রাজা, যিনি যোদ্ধা, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন, এবং যিনি প্রায় সমগ্র ভারত জয় করেছিলেন, অক্সাস থেকে সিলন পর্যন্ত যার প্রভাব বিস্তৃত ছিল, তিনি দীর্ঘদিন ভারতীয় ইতিহাসে নামেই অজানা ছিলেন। গত কয়েক দশকের শিলালিপি ও মুদ্রা-গবেষণার ফলে তাঁর হারানো খ্যাতি পুনরুদ্ধার হয়েছে। স্মিথের মতে, সমুদ্রগুপ্তের শাসনকাল নিয়ে দীর্ঘ বিবরণ লিখতে পারা প্রমাণ করে যে ধৈর্যশীল প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ইতিহাসের ভগ্নাংশ জোড়া লাগিয়ে প্রাচীন ভারতের বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস নির্মাণ করতে পারে [V. A. Smith, Early History of India]।

লেখক এরপর নন্দ বংশ থেকে গুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত পর্যন্ত ব্যবধান নির্ণয় করেন। তাঁর প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী মৌর্য বংশ ৩১৬ বছর, শুঙ্গ বংশ ৩০০ বছর, কাণ্ব বংশ ৮৫ বছর এবং আন্ধ্র বংশ ৫০৬ বছর শাসন করেছে। মোট দাঁড়ায় ১২০৭ বছর। পূর্বে তিনি দেখিয়েছেন, তাঁর মতে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের শাসন শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩৫ অব্দে। সুতরাং মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত থেকে গুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত পর্যন্ত ১২০৭ বছর বাদ দিলে গুপ্ত চন্দ্রগুপ্তের মগধ সিংহাসনে আরোহণের সাল দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ অব্দ। সেই অনুযায়ী গুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত শাসন করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ থেকে ৩২১ অব্দ পর্যন্ত। তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত শাসন করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ থেকে ২৭০ অব্দ পর্যন্ত। সমুদ্রগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শাসন করেন খ্রিস্টপূর্ব ২৭০ থেকে ২৩৪ অব্দ পর্যন্ত।

এই হিসাবের ভিত্তিতে লেখক দাবি করেন, আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় মগধে যে চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন, তিনি মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত নন, বরং গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত। গ্রিক লেখকদের সান্দ্রাকোট্টস, সান্দ্রাকুপ্তস বা সান্দ্রাসিপ্টাসের জীবন, সময় ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে নাকি এই গুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত এবং তাঁর উত্তরাধিকারীদের বিবরণ অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। লেখকের মতে, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে গ্রিক বিবরণে উল্লিখিত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের মিল অপেক্ষা গুপ্ত চন্দ্রগুপ্তের মিল অনেক বেশি। তাই সান্দ্রাকোট্টসকে মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত হিসেবে চিহ্নিত করা ভ্রান্ত।

এই তত্ত্ব অবশ্য প্রচলিত আধুনিক ইতিহাসচর্চার সঙ্গে মেলে না। আধুনিক একাডেমিক ইতিহাসে সাধারণত সান্দ্রাকোট্টসকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বলেই গ্রহণ করা হয় এবং গুপ্তাব্দের সূচনা ৩১৯ থেকে ৩২০ খ্রিস্টাব্দে ধরা হয়। কিন্তু আলোচ্য গ্রন্থকারের যুক্তি একটি বিকল্প ভারতীয় কালপঞ্জির উপর দাঁড়ানো, যেখানে পুরাণীয় বংশতালিকা, কলিযুগ গণনা এবং মহাভারত যুদ্ধের প্রাচীন তারিখকে কেন্দ্র করে সমস্ত ইতিহাস পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের প্রধান শক্তি হল, তিনি ভারতীয় ঐতিহ্যের অভ্যন্তরীণ ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিতে চান। আর প্রধান বিতর্কের জায়গা হল, তিনি প্রচলিত শিলালিপি, মুদ্রাতত্ত্ব ও গ্রিক-ভারতীয় সমন্বিত ইতিহাসের স্বীকৃত ব্যাখ্যা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

সুতরাং এই অংশের মূল তাৎপর্য শুধু রাজাদের সাল-তারিখের হিসাব নয়। এর মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস রচনার পদ্ধতি নিয়ে গভীর বিতর্ক নিহিত আছে। আমরা কি গ্রিক বিবরণকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ইতিহাস নির্মাণ করব, নাকি পুরাণীয় কালপঞ্জিকে ভিত্তি করে গ্রিক বিবরণকে পুনরায় ব্যাখ্যা করব? লেখক দ্বিতীয় পথটি গ্রহণ করেছেন। তিনি মনে করেন, ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠিত সময়গণনাকে বাতিল করে পাশ্চাত্য অনুমানকে একমাত্র সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়। তাঁর এই অবস্থান বিতর্কিত হলেও প্রাচীন ভারতের কালপঞ্জি নিয়ে বিকল্প চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তা বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।

প্রফেসর ম্যাক্স মুলার প্রাচীন ভারতীয় কালপঞ্জি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর মতে, ভারতীয় কালানুক্রমের প্রায় সমস্ত কিছুই চন্দ্রগুপ্তের তারিখের উপর নির্ভরশীল। তিনি চন্দ্রগুপ্তকে অশোকের পিতামহ এবং সেলিউকাস নিকেটরের সমসাময়িক বলে গ্রহণ করেন। তাঁর বক্তব্যে আরও বলা হয়, ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধ সাহিত্যে আলেকজান্ডারের ভারতজয়ের কোনও প্রত্যক্ষ উল্লেখ খুঁজে পাওয়া যায় না, এবং আলেকজান্ডারের সঙ্গীদের বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনাগুলিকে ভারতীয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি শনাক্ত করাও সম্ভব হয় না। তবু সৌভাগ্যক্রমে ক্লাসিক্যাল গ্রিক লেখকদের বিবরণে একটি নাম সংরক্ষিত আছে, যা পূর্ব ও পশ্চিমের ইতিহাসের মধ্যে একটি সংযোগসূত্র স্থাপন করে। সেই নাম হল সান্দ্রাকোট্টস বা সান্দ্রাসিপ্টাস, যাকে তিনি সংস্কৃত চন্দ্রগুপ্ত নামের গ্রিক রূপ বলে মনে করেন [Max Muller, History of Sanskrit Literature, পৃ. ১৪১ থেকে ১৪২]।

আলোচ্য গ্রন্থকারের মতে, ম্যাক্স মুলারের এই সিদ্ধান্ত একটি পূর্বনির্ধারিত তত্ত্বের উপর দাঁড়ানো। তিনি প্রথমেই ধরে নিয়েছিলেন যে গ্রিক লেখকদের সান্দ্রাকোট্টস হলেন মৌর্যবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত। এরপর সেই ধারণাকেই কেন্দ্র করে তিনি ভারতীয় উৎসসমূহ বিচার করতে চেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের সময়ের ব্রাহ্মণ্য বা বৌদ্ধ সাহিত্যে আলেকজান্ডারের অভিযানের সঙ্গে মেলে এমন কোনও ঘটনার সন্ধান তিনি পাননি। আলোচ্য লেখক বলেন, এর কারণ খুব সহজ। ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩৫ অব্দে, আর আলেকজান্ডারের ভারতাভিযান সংঘটিত হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের কাছাকাছি। এই দুই সময়ের মধ্যে যদি এক সহস্রাধিক বছরের ব্যবধান থাকে, তবে তাঁদের সমসাময়িক বলে ধরে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব।

লেখকের আপত্তি আরও গভীর। তাঁর মতে, গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত এবং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের জীবন, সময়, সাম্রাজ্যবিস্তার এবং বিদেশি যোগাযোগের বিবরণ জানার পরও পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা তাঁদের প্রিয় তত্ত্ব, অর্থাৎ সান্দ্রাকোট্টসকে মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত বলে মানার ধারণা, ছাড়তে চাননি। অথচ যদি গ্রিক লেখকদের সান্দ্রাকোট্টস বা সান্দ্রাসিপ্টাসকে গুপ্তবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে গ্রিক বিবরণ এবং পুরাণীয় ভারতীয় কালপঞ্জির মধ্যে একটি স্বাভাবিক সামঞ্জস্য দেখা যায়। গ্রিক বিবরণ অনুযায়ী সান্দ্রাকোট্টস আলেকজান্ডারের ভারতাভিযানের সময় মগধ অঞ্চলের এক প্রভাবশালী শাসক ছিলেন। আলোচ্য লেখকের হিসাব অনুসারে গুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত মগধে রাজত্ব শুরু করেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ অব্দে, অর্থাৎ আলেকজান্ডারের ভারতাভিযানের ঠিক এক বছর আগে। এই সামঞ্জস্যকে তিনি তাঁর তত্ত্বের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখেছেন।

এই যুক্তির ধারায় তিনি বলেন, পুরাণ ও প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য অনুসারে মহাভারত যুদ্ধ বা পরীক্ষিতের জন্ম থেকে গুপ্ত চন্দ্রগুপ্তের সময় পর্যন্ত ব্যবধান ২৮১১ বছর। যদি আলেকজান্ডারের ভারতাভিযানের সময়, অর্থাৎ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দ, গুপ্ত চন্দ্রগুপ্তের শাসনকাল হিসেবে ধরা হয়, তবে মহাভারত যুদ্ধের তারিখ দাঁড়ায় ২৮১১ যোগ ৩২৭, অর্থাৎ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৮ অব্দ। এটি হিন্দু ঐতিহ্যে প্রচলিত খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দের তারিখের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ মিল রেখে চলে। লেখকের মতে, এই মিল কাকতালীয় নয়; বরং এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় পুরাণীয় কালপঞ্জি ও গ্রিক ঐতিহাসিক বর্ণনাকে সঠিকভাবে মিলিয়ে পড়লে একটি সুসংগত ইতিহাস পাওয়া সম্ভব।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে গুপ্ত চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণ খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ অব্দে স্থাপিত হয়। তিনি একটি নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা গুপ্ত সাম্রাজ্য নামে পরিচিত হয়। লেখকের দাবি, আলেকজান্ডারের সঙ্গীদের বিবরণে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা আছে, তার সঙ্গে এই গুপ্ত চন্দ্রগুপ্তের সময় ও অবস্থান অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে তিনি মনে করেন, সান্দ্রাকোট্টসকে মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত হিসেবে গ্রহণ না করে গুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত হিসেবে গ্রহণ করলেই প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, হিন্দু ঐতিহ্য এবং গ্রিক বিবরণ পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। অন্যথায় প্রাচীন ভারতের প্রকৃত কালপঞ্জি নির্ণয় সর্বদাই জটিল ও বিভ্রান্তিকর থেকে যাবে।

এই বংশতালিকা ও পুরাণীয় রাজত্বকাল ছাড়াও মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ণয়ের জন্য ভারতীয় সাহিত্যে আরও কিছু পদ্ধতি বিদ্যমান। আলোচ্য লেখকের মতে, এই ক্ষেত্রেও পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদেরা শক বা যুগ-গণনার ভুল ব্যাখ্যার ফলে বিভ্রান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ড. জি. থিবো এবং মহামহোপাধ্যায় সুধাকর দ্বিবেদী মহাভারত যুদ্ধের তারিখ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৪৪৮ অব্দে স্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের যুক্তির প্রধান ভিত্তি ছিল বরাহমিহিরের ‘বৃহৎসংহিতা’য় উল্লিখিত একটি শ্লোক, যা পরে কল্হণ তাঁর ‘রাজতরঙ্গিণী’তেও উদ্ধৃত করেন।

শ্লোকটির মর্ম হল, যখন যুধিষ্ঠির পৃথিবী শাসন করছিলেন, তখন সপ্তর্ষি বা বৃহৎ ভল্লুক নক্ষত্রমণ্ডল মঘা নক্ষত্রে অবস্থান করছিল। যুধিষ্ঠিরের সময় এবং শককালের মধ্যে ব্যবধান ২৫২৬ বছর [বরাহমিহির, বৃহৎসংহিতা, অধ্যায় ১৩, শ্লোক ৩; কল্হণ, রাজতরঙ্গিণী, প্রথম তরঙ্গ, শ্লোক ৫৬]। এই শ্লোকটি অনেক প্রাচ্যবিদ অনুবাদ করেছেন এইভাবে যে যুধিষ্ঠিরের রাজত্বকাল থেকে শক যুগের সূচনা পর্যন্ত ২৫২৬ বছরের ব্যবধান ছিল।

এই শ্লোকের রচয়িতা নিয়ে একটি প্রশ্ন আছে। কেউ কেউ এটি বৃদ্ধ গর্গের নামে আরোপ করেছেন। বরাহমিহির তাঁর বৃহৎসংহিতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে সপ্তর্ষিমণ্ডলের গতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে জানান যে তিনি বৃদ্ধ গর্গের মতানুসারে সপ্তর্ষিদের গতির কথা বলবেন। তার পরই তিনি আলোচ্য শ্লোকটি দেন। এর থেকে বোঝা যায়, বৃদ্ধ গর্গ ছিলেন প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের এক ধারার প্রতিনিধি, যাঁরা সপ্তর্ষিমণ্ডলের এক বিশেষ গতি সম্পর্কে মত দিয়েছিলেন। সেই মত অনুসারে যুধিষ্ঠিরের সময় সপ্তর্ষিরা মঘায় অবস্থান করছিলেন। তবে আলোচ্য লেখকের মতে, অধ্যায়টি মনোযোগ দিয়ে পড়লে মনে হয় শ্লোকটির প্রকৃত রচয়িতা বরাহমিহির নিজেই।

সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে “শককাল” শব্দটির অর্থ নির্ধারণে। শ্লোকে বলা হয়েছে, যুধিষ্ঠিরের সময় থেকে শককাল পর্যন্ত ২৫২৬ বছর। কল্হণ তাঁর রাজতরঙ্গিণীতে এই শ্লোককে কালপঞ্জির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেও তিনি সম্ভবত “শককাল”কে শালিবাহন শক, অর্থাৎ ৭৮ খ্রিস্টাব্দে শুরু হওয়া যুগ বলে ভেবেছিলেন। কল্হণ নিজে রাজতরঙ্গিণী লিখেছিলেন শালিবাহন শকের ১০৭০ সালে, অর্থাৎ ১১৪৮ খ্রিস্টাব্দে। তিনি উল্লেখ করেন যে তখনকার শকবর্ষ ১০৭০ লৌকিকাব্দের ২৪তম বছরের সঙ্গে মিলে যায়। হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে লৌকিকাব্দের সূচনা কলিযুগের শুরু থেকে ২৫ বছর পরে, যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহণের স্মৃতিতে। যদি কলিযুগের সূচনা ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দ, তবে লৌকিকাব্দ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩০৭৭ অব্দে। সাধারণ ব্যবহারে শতক বাদ দিয়ে শুধু শেষ দুই অঙ্ক বা সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হওয়ায় কল্হণ লৌকিকাব্দের ৪২২৪তম বছরকে ২৪ বলে উল্লেখ করেছেন বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

যদি বরাহমিহিরের শ্লোকের “শককাল”কে শালিবাহন শক ধরা হয়, তবে হিসাব দাঁড়ায় এইরূপ। শালিবাহন শকের সূচনা ৭৮ খ্রিস্টাব্দ। তার ২৫২৬ বছর পূর্বে গেলে যুধিষ্ঠিরের সময় দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৪৪৮ অব্দ। এই তারিখই থিবো ও সুধাকর দ্বিবেদীর মতো পণ্ডিতেরা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আলোচ্য লেখকের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভুল, কারণ “শককাল” শব্দটি এখানে শালিবাহন শক নির্দেশ করে না। এই ভুল ব্যাখ্যার অসুবিধা দূর করতে কল্হণ আরও একটি অনুমান করেন যে কৌরব-পাণ্ডব যুদ্ধ কলিযুগের সূচনার ৬৫৩ বছর পরে সংঘটিত হয়েছিল [রাজতরঙ্গিণী, প্রথম তরঙ্গ, শ্লোক ৪৯ থেকে ৫১]। কিন্তু এটি প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে মেলে না, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে মহাভারত যুদ্ধ কলিযুগের ৩৭ বছর আগে হয়েছিল।

লেখক ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তিও দেন। “শক” অর্থ যুগ বা কাল, আর “কাল” অর্থ যুগ বা সময়। সুতরাং “শককাল” শব্দটিকে যদি আক্ষরিকভাবে “শক যুগ” অর্থে না পড়ে কেবল “যুগ-যুগ” বা “কাল-কাল” অর্থে নেওয়া হয়, তবে তা অর্থহীন হয়ে যায়। বরাহমিহিরের মতো পণ্ডিত অর্থহীন শব্দপ্রয়োগ করবেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই “শককাল” বলতে একটি নির্দিষ্ট শক বা যুগ বোঝানো হয়েছে। প্রশ্ন হল, সেটি কোন যুগ?

লেখকের মতে, ৭৮ খ্রিস্টাব্দের শালিবাহন শকের পূর্বে ভারতে আরও বহু শক বা যুগ প্রচলিত ছিল, যেমন যুধিষ্ঠির শক, হর্ষ শক, বিক্রম শক প্রভৃতি। বরাহমিহির তাঁর ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’ গ্রন্থে শককাল, শকনৃপকাল, শকভূপকাল এবং শকেন্দ্রকাল শব্দগুলি সমার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন [বরাহমিহির, পঞ্চসিদ্ধান্তিকা, অধ্যায় ১, শ্লোক ৮ থেকে ১০]। এগুলি স্পষ্টতই কোনও এক শক-রাজা বা শক-সম্রাটের প্রতিষ্ঠিত যুগকে নির্দেশ করে। শালিবাহনকে কখনও শক রাজা হিসেবে পরিচিত করা হয়নি। তাই বরাহমিহিরের “শককাল”কে সরাসরি শালিবাহন শক ধরে নেওয়া অযৌক্তিক।

এরপর লেখক “শক” শব্দটির অন্য ব্যাখ্যা দেন। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে পারস্যের জনগোষ্ঠীকে অনেক সময় শক বলা হয়েছে, আর গ্রিকরা তাঁদের সাকাই বা Sacae নামে চিনত। ইতিহাসবিদদের সাধারণ মত অনুসারে, মহান সাইরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন [Encyclopaedia Britannica, 9th edition, Vol. XVIII, পৃ. ৫৬৫]। এই সাম্রাজ্য মিডীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ছিল। হেরোডোটাসের বিবরণ অনুযায়ী, সাইরাস তাঁর পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বছর থেকে নিজের বর্ষগণনা শুরু করেন, এবং অন্যান্য জাতিও একে বিশেষ যুগ হিসেবে স্বীকার করেছিল। আলোচ্য লেখকের মতে, ভারতীয় রাজাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা সাইরাসের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল [Rollin, History of Cyrus, পৃ. ১২৯ থেকে ১৩৬; Xenophon, Cyropaedia, I.1, পৃ. ২২ থেকে ২৩]।

এই প্রেক্ষিতে লেখক বলেন, যেহেতু পারসিকদের হিন্দুরা “শক” বলে ডাকত, তাই সাইরাসের প্রতিষ্ঠিত পারস্য সাম্রাজ্যকে শক সাম্রাজ্য বা শকসাম্রাজ্য বলা যেতে পারে। সেই সাম্রাজ্যের সূচনাবর্ষই “শককাল” নামে পরিচিত হয়। বরাহমিহিরের ব্যবহৃত শককাল, শকনৃপকাল, শকভূপকাল এবং শকেন্দ্রকাল, এই সমস্ত শব্দেই “নৃপ”, “ভূপ” ও “ইন্দ্র” রাজা বা সম্রাট অর্থে ব্যবহৃত। তাই এই শব্দগুলি শক রাজা সাইরাসের প্রতিষ্ঠিত যুগ, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দকে নির্দেশ করে বলে লেখকের ধারণা।

এখন যদি বরাহমিহিরের শ্লোক অনুসারে যুধিষ্ঠিরের সময় এবং শককাল বা সাইরাসের পারস্য যুগের সূচনার মধ্যে ব্যবধান ২৫২৬ বছর ধরা হয়, তবে যুধিষ্ঠিরের সময় শেষ হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩০৭৬ বা ৩০৭৭ অব্দে। কারণ ২৫২৬ বছর যোগ ৫৫০ বছর করলে দাঁড়ায় ৩০৭৬ বা প্রচলিত পূর্ণ গণনায় ৩০৭৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। প্রাচীন হিন্দু সাহিত্য অনুযায়ী যুধিষ্ঠির কলিযুগের সূচনার পর আরও ২৫ বছর জীবিত ছিলেন এবং পরে স্বর্গারোহণ করেন। সুতরাং যুধিষ্ঠিরের অবসান যদি খ্রিস্টপূর্ব ৩০৭৭ অব্দে হয়, তবে কলিযুগের সূচনা দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে। আবার পুরাণসমূহ বলে মহাভারত যুদ্ধ কলিযুগের সূচনার ৩৭ বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। অতএব যুদ্ধের সাল দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ।

এই বিশ্লেষণের মূল লক্ষ্য হল দেখানো যে বরাহমিহিরের শ্লোক, যদি শালিবাহন শক নয় বরং সাইরাস-প্রবর্তিত শককাল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তা হিন্দু ঐতিহ্যের কলিযুগ-গণনা ও মহাভারত যুদ্ধের প্রচলিত তারিখের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে লেখকের মতে, ২৪৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাভারত যুদ্ধ স্থাপন করা ভুল ব্যাখ্যার ফল। প্রকৃত গণনা ভারতীয় ঐতিহ্যের খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দকেই সমর্থন করে।

এই সমগ্র আলোচনার ভিতরে একটি বৃহত্তর পদ্ধতিগত প্রশ্ন রয়েছে। পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদেরা প্রায়শই কোনও একটি পরিচয় বা তারিখকে নিশ্চিত ধরে নিয়ে ভারতীয় সাহিত্যের বিচিত্র তথ্যকে তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন। আলোচ্য লেখক তার বিপরীতে ভারতীয় উৎসের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যকে প্রাধান্য দিতে চান। তাঁর বক্তব্য, যদি পুরাণীয় বংশতালিকা, কলিযুগ-গণনা, লৌকিকাব্দ, বরাহমিহিরের জ্যোতির্বিদ্যাগত শ্লোক এবং গ্রিক বিবরণকে নতুনভাবে মিলিয়ে পড়া হয়, তবে মহাভারত যুদ্ধের তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দের কাছাকাছি স্থির হয়। যদিও এই তত্ত্ব আধুনিক প্রচলিত একাডেমিক ইতিহাসের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে বিরোধী, তবু এটি ভারতীয় ঐতিহ্যভিত্তিক কালপঞ্জি নির্মাণের এক সুসংবদ্ধ প্রচেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা প্রয়োজন। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের তারিখ নির্ধারণে বহু পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদ এমন একটি পদ্ধতিগত ভুল করেছেন, যার ফলে ভারতীয় কালপঞ্জি দীর্ঘদিন গভীর বিভ্রান্তির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থেকেছে। প্রাচীন গ্রন্থ, রাজবংশাবলি, শিলালিপি বা আঞ্চলিক ইতিহাসে যেখানে যেখানে “শক” বা “শকাব্দ” শব্দে তারিখ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা প্রায় সর্বত্রই সেটিকে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সূচিত শালিবাহন শক বলে ধরে নিয়েছেন। অথচ প্রাচীন ভারতে একাধিক শক, সম্বৎ, অব্দ বা যুগ প্রচলিত ছিল। যুধিষ্ঠির শক, বিক্রম সম্বৎ, হর্ষ শক, লৌকিকাব্দ, কলিযুগাব্দ, শালিবাহন শক, গুপ্তাব্দ প্রভৃতি বিভিন্ন কালগণনা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ও ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এই পার্থক্য বিবেচনা না করে সব “শক”কে একমাত্র শালিবাহন শক হিসেবে ধরে নেওয়া ইতিহাস নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এক গুরুতর বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

এই ভুল শুধু সামান্য তারিখগত অমিল সৃষ্টি করেনি; বরং প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাজবংশের ধারাবাহিকতা, মহাভারত যুদ্ধের কাল, কলিযুগের সূচনা এবং আঞ্চলিক রাজ্যগুলির ইতিহাসকেও অস্বাভাবিকভাবে স্থানচ্যুত করেছে। বহু রাজবংশাবলিতে তারিখ কলিযুগাব্দে দেওয়া আছে। কিন্তু আলোচ্য লেখকের অভিযোগ, প্রাচ্যবিদদের অনেকেই সেসব তারিখ ধৈর্যসহকারে পরীক্ষা করেননি। তাঁরা আগে থেকেই একটি অনুমান স্থির করে নিয়েছিলেন, তারপর সেই অনুমানের সঙ্গে না মিললে ভারতীয় কালগণনাকে ভুল বলে ঘোষণা করেছেন।

এই প্রসঙ্গে নেপাল রাজবংশাবলির উদাহরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পণ্ডিত ভগবানলাল ইন্দ্রজী কর্তৃক প্রকাশিত ‘নেপাল রাজবংশাবলি’তে বিভিন্ন রাজবংশের ধারাবাহিক তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং বহু তারিখ কলিযুগাব্দে উল্লেখ করা হয়েছে [Indian Antiquary, Vol. XIII, পৃ. ৪১১ প্রভৃতি]। এই রাজবংশাবলি নেপালের নানা বংশের রাজাদের নাম, বংশপরম্পরা ও শাসনকাল সংরক্ষণ করেছে। বিবরণটি মহাভারত যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় থেকে শুরু করে প্রায় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত। এর পঞ্চম রাজবংশকে সূর্যবংশ এবং ষষ্ঠ রাজবংশকে ঠাকুর বংশ বলা হয়েছে।

এই রাজবংশাবলি অনুসারে সূর্যবংশে ৩১ জন রাজা রাজত্ব করেন। প্রত্যেকের নামের সঙ্গে তাঁর শাসনকালও উল্লেখিত। এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন বিশ্বদেব বর্মা। তাঁর পর তাঁর জামাতা অংশু বর্মা সিংহাসনে বসেন এবং তিনি ঠাকুর বংশের প্রথম রাজা হিসেবে গণ্য হন। রাজবংশাবলিতে বলা হয়েছে, অংশু বর্মার অভিষেক হয় কলিযুগের ৩০০০তম বছরে। যদি কলিযুগের সূচনা ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে, তবে কলিযুগের ৩০০০তম বছর দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০১ অব্দ।

এখন সূর্যবংশের শেষ পাঁচজন রাজা সম্পর্কে রাজবংশাবলি যে তথ্য দেয়, তা বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সূর্যবংশের ২৭তম রাজা শিবদেব বর্মা ৬১ বছর শাসন করেন। তাঁর পর ২৮তম রাজা নরেন্দ্র বর্মা ৪২ বছর, ২৯তম রাজা ভীমদেব বর্মা ৩৬ বছর, ৩০তম রাজা বিষ্ণুদেব বর্মা ৪৭ বছর এবং ৩১তম রাজা বিশ্বদেব বর্মা ৫১ বছর রাজত্ব করেন। এই পাঁচজন রাজা মিলে অংশু বর্মার অভিষেকের পূর্বে মোট ২৩৭ বছর শাসন করেন। যেহেতু অংশু বর্মার অভিষেক খ্রিস্টপূর্ব ১০১ অব্দে ধরা হচ্ছে, তাই তার ২৩৭ বছর পূর্বে শিবদেব বর্মার শাসনসূচনা দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৮ অব্দে।

নেপালের এই শিবদেব বর্মার কিছু শিলালিপি পাওয়া গেছে। তাঁর পূর্ণ রাজকীয় উপাধি ছিল “পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ শিবদেব বর্মা”। তাঁর এক দানপত্রে সিংহাসনে আরোহণের তারিখ দেওয়া হয়েছে হর্ষ সম্বৎ ১১৯। যদি রাজবংশাবলির হিসাবে শিবদেব বর্মা খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৮ অব্দে সিংহাসনে বসে থাকেন, এবং সেটিই যদি হর্ষ সম্বৎ ১১৯ হয়, তবে হর্ষ সম্বতের সূচনা দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৭ অব্দে।

কিন্তু ড. ফ্লিট এবং অন্যান্য প্রাচ্যবিদ এই হর্ষ সম্বৎকে কন্যাকুব্জের রাজা হর্ষবর্ধন শিলাদিত্যের প্রতিষ্ঠিত যুগ বলে ধরে নেন। প্রচলিত মতে হর্ষবর্ধন ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব শুরু করেন। তাই তাঁরা হর্ষ সম্বৎ ১১৯ যোগ করে শিবদেব বর্মার অভিষেক স্থির করেন ৭২৫ খ্রিস্টাব্দে। এরপর তাঁরা বলেন, নেপাল রাজবংশাবলিতে দেওয়া কলিযুগাব্দের তারিখগুলি নিশ্চয়ই ভুল। আলোচ্য লেখকের মতে, এই সিদ্ধান্ত দুই কারণে ভ্রান্ত। প্রথমত, হর্ষ সম্বৎকে হর্ষবর্ধন শিলাদিত্যের প্রতিষ্ঠিত যুগ বলে ধরে নেওয়ার পক্ষে কোনও দৃঢ় প্রমাণ নেই। দ্বিতীয়ত, হর্ষবর্ধন আদৌ কোনও যুগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারও কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।

হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট তাঁর জীবনীমূলক গ্রন্থ ‘হর্ষচরিত’ রচনা করেছিলেন। যদি হর্ষবর্ধন সত্যিই নিজের নামে কোনও যুগ শুরু করতেন, তবে বাণভট্টের মতো সভাকবি সেই স্মরণীয় ঘটনার উল্লেখ না করে থাকতে পারতেন না। একইভাবে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং, যিনি হর্ষের দরবারে গিয়েছিলেন এবং ভারতভ্রমণের বিবরণ লিখেছিলেন, তিনিও কোথাও বলেননি যে হর্ষবর্ধন নিজের নামে কোনও নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। উপরন্তু ভারতীয় ঐতিহ্যেও হর্ষবর্ধন কর্তৃক কোনও যুগপ্রবর্তনের সুস্পষ্ট স্মৃতি নেই। ফলে হর্ষ সম্বৎকে সরাসরি সপ্তম শতাব্দীর হর্ষবর্ধনের সঙ্গে যুক্ত করা দুর্বল অনুমান।

তাহলে নেপালের শিলালিপির হর্ষ সম্বৎ কার? আলোচ্য লেখকের মতে, এর উত্তর পাওয়া যায় প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও কল্হণের ‘রাজতরঙ্গিণী’তে। সেখানে উজ্জয়িনীর শ্রীহর্ষ বিক্রমাদিত্যের একটি হর্ষ শকের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই শ্রীহর্ষ বিক্রমাদিত্য মালবের বিক্রমাদিত্য কর্তৃক ৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিক্রম সম্বতের প্রায় চার শতাব্দী পূর্বে অবস্থান করেন বলে বলা হয়েছে। কল্হণ উল্লেখ করেন, এই শ্রীহর্ষ বিক্রমাদিত্য পশ্চিম ভারতে সিন্ধু নদীর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থানকারী শকদের বিরুদ্ধে বিজয়াভিযান পরিচালনা করেন, তাঁদের পরাজিত বা অধীন করেন এবং সেই বিজয়ের স্মৃতিতে একটি শক বা যুগ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কারণে তিনি “শকারি” নামে পরিচিত হন। এই ঘটনার সময় স্থাপন করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৭ অব্দে [কল্হণ, রাজতরঙ্গিণী, তৃতীয় তরঙ্গ, শ্লোক ১২৪ থেকে ১২৯]।

আলবেরুনির সাক্ষ্য এই আলোচনায় বিশেষ মূল্যবান। আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবন আহমদ আলবেরুনি, যিনি একাদশ শতাব্দীর খ্যাতিমান মুসলিম পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ, ভারতীয় কালপঞ্জি সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ইয়াজদগির্দ বা গেজ বর্ষের ৪০০তম বছর শালিবাহন শকের ৯৫৩তম বছর, বিক্রম সম্বতের ১০৮৮তম বছর, শ্রীহর্ষ যুগের ১৪৮৮তম বছর এবং কলিকালের ৪১৩২তম বছরের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ওই গেজ বর্ষের নববর্ষের দিন ছিল ১০৩১ খ্রিস্টাব্দের ৯ মার্চ [Alberuni’s India, অনুবাদ: Edward C. Sachau, Vol. II, অধ্যায় XLIX, পৃ. ৫ থেকে ৭]।

এই তথ্য থেকে হিসাব করলে শ্রীহর্ষ যুগের সূচনা দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৭ অব্দে। কারণ ১৪৮৮ থেকে ১০৩১ বাদ দিলে ৪৫৭ পাওয়া যায়। একইভাবে বিক্রম সম্বতের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দ, শালিবাহন শকের সূচনা ৭৮ খ্রিস্টাব্দ এবং কলিকালের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে স্থাপিত হয়। আলবেরুনি আরও বলেন, তাঁর সময়ে শ্রীহর্ষ যুগ নেপাল ও উত্তর ভারতের নানা অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। অতএব নেপালের শিলালিপিতে ব্যবহৃত হর্ষ সম্বৎ হর্ষবর্ধন শিলাদিত্য নয়, বরং উজ্জয়িনীর শ্রীহর্ষ বিক্রমাদিত্যের যুগ নির্দেশ করে বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে নেপালের শিবদেব বর্মার অভিষেক হর্ষ সম্বৎ ১১৯ অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৮ অব্দে স্থাপিত হয়। এটি নেপাল রাজবংশাবলিতে দেওয়া কলিযুগাব্দভিত্তিক হিসাবের সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। সেই সঙ্গে কলিযুগের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে এবং মহাভারত যুদ্ধ তার ৩৭ বছর পূর্বে, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দে স্থাপিত হওয়ার ঐতিহ্যও সমর্থন লাভ করে।

এর বিপরীতে ভি. গোপাল আয়ার তাঁর ‘Chronology of Ancient India’ গ্রন্থে মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নামিয়ে আনেন খ্রিস্টপূর্ব ১১৯৩ অব্দে এবং কলিযুগের সূচনা স্থাপন করেন খ্রিস্টপূর্ব ১১৭৭ অব্দে। তিনিও বরাহমিহিরের সেই বিখ্যাত শ্লোকের উপর নির্ভর করেন, যা কল্হণের ‘রাজতরঙ্গিণী’তেও উদ্ধৃত। তিনি স্যার উইলিয়াম জোন্সের মতের অনুসারী ছিলেন। জোন্স বলেছিলেন, পরাশরের জ্যোতির্বিদ্যাগত গ্রন্থে ঋতু বিন্যাসের যে অবস্থা পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে পাণ্ডবদের যুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বে হতে পারে না [Asiatic Researches, Vol. IV, পৃ. ৬]।

কিন্তু গোপাল আয়ারের পদ্ধতি আলোচ্য লেখকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বরাহমিহিরের মূল পাঠে থাকা “শককাল” শব্দকে সংশোধন করে “শাক্যকাল” করেছেন। অর্থাৎ তিনি ধরে নিয়েছেন, এটি গৌতম বুদ্ধ বা শাক্যমুনির কাল নির্দেশ করে। আবার শ্লোকের “ষড্ দ্বিক পঞ্চ দ্বিযুতঃ” অংশ, যার অর্থ ২৫২৬, সেটিকে তিনি ২৫ গুণ ২৬, অর্থাৎ ৬৫০ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এরপর গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুকাল ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ধরে ৬৫০ বছর যোগ করে যুধিষ্ঠিরের সময় স্থাপন করেছেন খ্রিস্টপূর্ব ১১৯৩ অব্দের কাছাকাছি। তাঁর মতে কলিযুগের সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১১৭৭ অব্দে।

আলোচ্য লেখক বলেন, এই সংশোধন ও ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। “শককাল” শব্দে কোনও ছন্দগত বা ব্যাকরণগত ত্রুটি নেই, যা সংশোধন করে “শাক্যকাল” করতে হবে। বহু প্রাচীন লেখকও মূল পাঠকে গ্রহণ করেছেন। তাছাড়া “২৫২৬” সংখ্যাকে ২৫ গুণ ২৬ হিসেবে পড়ার কোনও ভাষাতাত্ত্বিক বা পাণ্ডুলিপিগত ভিত্তি নেই। যদি এমন স্বাধীন ব্যাখ্যা করা যায়, তবে একই যুক্তিতে কেউ ২ যোগ ৫ যোগ ২ যোগ ৬, অথবা ২ গুণ ৫ গুণ ২ গুণ ৬, কিংবা ২৫২ গুণ ৬ বলেও ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু শ্লোকের ভাষা স্পষ্টভাবে ২৫২৬ বছরের ব্যবধান নির্দেশ করে। তাই গোপাল আয়ারের সংশোধন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।

স্যার উইলিয়াম জোন্স পরাশরের জ্যোতির্বিদ্যাগত ঋতু বিন্যাসের ভিত্তিতে মহাভারত যুদ্ধকে খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বে স্থাপন করতে চাননি। কিন্তু তিনি সেই ঋতুবিন্যাস কী ছিল বা কী যুক্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, তা পরিষ্কার করেননি। পরে কর্নেল উইলফোর্ড বলেন, পরাশর খ্রিস্টপূর্ব ১১৮০ অব্দের কাছাকাছি বাস করতেন বলে দাবি করা হয়েছে, তবে মি. ডেভিসের মতে এই পর্যবেক্ষণ খ্রিস্টপূর্ব ১৩৯১ অব্দের কাছাকাছি হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, পরাশর সংহিতায় অগস্ত্য বা ক্যানোপাস নক্ষত্রের হেলিয়াকাল রাইজিং সম্পর্কে উল্লেখ আছে [Asiatic Researches, Vol. V, পৃ. ২৮৮]।

আলোচ্য লেখকের মতে, এই বক্তব্যগুলি অস্পষ্ট এবং আংশিকভাবে শোনা তথ্যের উপর ভিত্তি করে। পরাশর সংহিতায় মূলত গ্রীষ্মায়ন ও শীতায়নের অবস্থান সম্পর্কে উল্লেখ আছে। ক্যানোপাসের উদয় এই আলোচনার মূল বিষয় নয়। ফলে সন্দেহ হয়, উইলফোর্ড নিজে গ্রন্থটি গভীরভাবে পরীক্ষা করেছিলেন কি না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরবর্তী বহু প্রাচ্যবিদ তাঁর অস্পষ্ট মন্তব্যকেই ভিত্তি করে মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন।

আসলে এই আলোচনার কেন্দ্রীয় সূত্র বরাহমিহিরের ‘বৃহৎসংহিতা’র তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম চারটি শ্লোক। এন. চিদম্বর আয়ার এই শ্লোকগুলির অনুবাদে দেখিয়েছেন যে প্রাচীন গ্রন্থসমূহে বলা ছিল, এক কালে সূর্যের দক্ষিণায়ন শুরু হত আশ্লেষা নক্ষত্রের মধ্যভাগে পৌঁছালে এবং উত্তরায়ণ শুরু হত ধনিষ্ঠা নক্ষত্রের শুরুতে পৌঁছালে। কিন্তু বরাহমিহিরের সময়ে দক্ষিণায়ন শুরু হচ্ছিল মকর বা কর্কট সংক্রান্তির অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নভাবে, এবং প্রকৃত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই পরিবর্তন বোঝা যায়। দিগন্তে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের স্থান পর্যবেক্ষণ করে অথবা সমতল বৃত্তের কেন্দ্রে স্থাপিত দণ্ডের ছায়ার গতি দেখে সূর্যের গতিপথের পরিবর্তন নির্ণয় করা সম্ভব [বরাহমিহির, বৃহৎসংহিতা, অধ্যায় ৩, শ্লোক ১ থেকে ৪]।

এই সূত্র থেকে বোঝা যায়, বরাহমিহির প্রাচীন জ্যোতির্বিদ পরাশর ও গর্গের সময়কার অয়নচক্র এবং নিজের সময়কার অয়নচক্রের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করেছিলেন। ভট্টোৎপল তাঁর টীকায় বলেন, পরাশর ও গর্গের সময়ে গ্রীষ্মায়ন বা দক্ষিণায়ন ঘটত সূর্য আশ্লেষা নক্ষত্রের মধ্যভাগে পৌঁছালে, অর্থাৎ ক্রান্তিবৃত্তে ১১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট অবস্থানে। আর শীতায়ন বা উত্তরায়ণ ঘটত ধনিষ্ঠার শুরুতে, অর্থাৎ ২৯৩ ডিগ্রি ২০ মিনিটে। বরাহমিহিরের সময়ে দক্ষিণায়ন শুরু হত কর্কটের প্রথমভাগে বা পুনর্বসুর শেষ বিন্দুতে, অর্থাৎ ৯৩ ডিগ্রি ২০ মিনিটে। ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’য় বরাহমিহির এ কথা আরও নির্দিষ্টভাবে বলেছেন [বরাহমিহির, পঞ্চসিদ্ধান্তিকা, অধ্যায় ৩, শ্লোক ৫৯; ভট্টোৎপলের টীকা]। একইভাবে তাঁর সময়ে উত্তরায়ণ শুরু হত উত্তরাষাঢ়ার মধ্যভাগে, অর্থাৎ ২৭৩ ডিগ্রি ২০ মিনিটে।

লেখক তাঁর নিজ সময়, অর্থাৎ কলিযুগ ৫০৩০ বা ১৯২৯ থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের পঞ্জিকাগত অবস্থাও উল্লেখ করেন। সে সময়ে হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে দক্ষিণায়ন শুরু হচ্ছিল আর্দ্রা নক্ষত্রের প্রথমভাগে, অর্থাৎ ৬৭ ডিগ্রি ১৮ মিনিটে, এবং উত্তরায়ণ শুরু হচ্ছিল মূলা নক্ষত্রের তৃতীয় পদে, অর্থাৎ ২৪৭ ডিগ্রি ১৮ মিনিটে। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন দেখায় যে অয়নচলন বা প্রিসেশন ভারতীয় জ্যোতির্বিদদের অজানা ছিল না। তাঁরা নক্ষত্রস্থিতি ও অয়নবিন্দুর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং তা কালনির্ণয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

এই সমস্ত আলোচনা থেকে আলোচ্য লেখকের মূল বক্তব্য দাঁড়ায়, প্রাচীন ভারতীয় কালপঞ্জি বিচার করতে হলে “শক”, “সম্বৎ”, “অব্দ” বা “কাল” শব্দগুলিকে একরৈখিকভাবে পড়া যাবে না। কোন পাঠে কোন যুগ বোঝানো হয়েছে, তা অঞ্চল, গ্রন্থ, প্রসঙ্গ ও ঐতিহ্য মিলিয়ে বিচার করতে হবে। নেপাল রাজবংশাবলি, আলবেরুনির গণনা, কল্হণের রাজতরঙ্গিণী, বরাহমিহিরের জ্যোতির্বিদ্যা এবং পুরাণীয় কলিযুগগণনা একত্রে বিচার করলে লেখকের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ অব্দে কলিযুগের সূচনা এবং খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দে মহাভারত যুদ্ধের ঐতিহ্যগত তারিখ সুসংগত বলে প্রতীয়মান হয়।

উল্লিখিত অয়ন বা সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণের অবস্থানের যে পার্থক্য প্রাচীন ও পরবর্তী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থে দেখা যায়, তার মূল কারণ হল বিষুববিন্দুর পূর্বগমন বা অয়নগতি। ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা একে ‘অয়নগতি’ নামে অভিহিত করেছেন। পৃথিবীর অক্ষের ধীর পরিবর্তন এবং নক্ষত্রমণ্ডলের তুলনায় সূর্যের আপাত অবস্থানের দীর্ঘকালীন স্থানান্তরই এই পরিবর্তনের কারণ। যদি এই অয়নগতির বার্ষিক হার জানা থাকে, তবে পরাশর, গর্গ এবং বরাহমিহিরের সময়কাল নির্ণয়ের জন্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব করা সম্ভব হয়। বরাহমিহির নিজে অয়নগতির হার বছরে ৫০ বিকলা ২৬ লিপ্তা বলে উল্লেখ করেছেন। সূর্যসিদ্ধান্তে এই হার বছরে ৫৪ বিকলা বলা হয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সাধারণত এই হার প্রায় ৫০ বিকলা ২৬ লিপ্তার কাছাকাছি নির্ধারণ করেছেন, আর ফরাসি পণ্ডিত মঁসিয়ে ল্য ভেরিয়ের এই হার ৫০ বিকলা ২৪ লিপ্তা বলেছেন।

আগে দেখানো হয়েছে, পরাশর ও গর্গের সময়ে দক্ষিণায়ন বা গ্রীষ্মায়নের সূচনা হত সূর্য ক্রান্তিবৃত্তে ১১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট অবস্থানে পৌঁছালে। কিন্তু ১৯২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ আলোচ্য লেখকের নিজ সময়ে, দক্ষিণায়ন ঘটেছে সূর্য ক্রান্তিবৃত্তে ৬৭ ডিগ্রি ১৮ মিনিট অবস্থানে পৌঁছালে। এই দুই অবস্থানের পার্থক্য ৪৬ ডিগ্রি ২ মিনিট। যদি বরাহমিহির প্রদত্ত বছরে ৫০ বিকলা অয়নগতির হার ধরে হিসাব করা হয়, তবে এই পার্থক্যের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দাঁড়ায় আনুমানিক ৩৩১৪ বছর। অর্থাৎ লেখকের গণনা অনুসারে পরাশর ও গর্গ বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৩৩১৪ বছর পূর্বে জীবিত ছিলেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৩৩১৪ বছর পিছিয়ে গেলে তাঁদের সময় দাঁড়ায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩৮৫ অব্দ।

এই গণনার সঙ্গে কোলব্রুক ও ডেভিসের মতও মোটামুটি মিলে যায়। কোলব্রুক সূর্যের দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণের অবস্থান বিচার করে মহাভারত যুদ্ধকে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন এবং পরাশরকে সেই সময়ের জ্যোতির্বিদ হিসেবে ধরেছিলেন। ডেভিস পরাশরের সময় স্থির করেন খ্রিস্টপূর্ব ১৩৯১ অব্দের কাছাকাছি। একইভাবে বর্তমান সময় এবং বরাহমিহিরের সময়কার অয়নবিন্দুর পার্থক্য হিসাব করলে ২৬ ডিগ্রি ২ মিনিট পাওয়া যায়। বছরে ৫০ বিকলা হারে এই পার্থক্যের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দাঁড়ায় প্রায় ১৮৭৪ বছর। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭৪ বছর বাদ দিলে বরাহমিহিরের সময় দাঁড়ায় আনুমানিক ৫৫ খ্রিস্টাব্দ।

এখানে আলোচ্য লেখকের প্রধান আপত্তি একটি মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। ধরা যাক, পরাশর সত্যিই খ্রিস্টপূর্ব ১৩৯১ অব্দে বা স্যার উইলিয়াম জোন্সের অনুমান অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকে বাস করতেন। কিন্তু এর দ্বারা কীভাবে প্রমাণিত হয় যে মহাভারত যুদ্ধ তার পূর্বে সংঘটিত হতে পারে না? পরাশর সংহিতা বা পরাশর নামক কোনও জ্যোতির্বিদের অবস্থান মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অনেক প্রাচ্যবিদ পরাশরের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অবস্থান থেকে সরাসরি মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ধারণ করেছেন, যা লেখকের মতে গুরুতর পদ্ধতিগত ভুল।

সম্ভবত স্যার উইলিয়াম জোন্স এবং তাঁর অনুসারী বহু প্রাচ্যবিদ পরাশর সংহিতার জ্যোতির্বিদ পরাশরকে মহর্ষি ব্যাসের পিতা, বিষ্ণুপুরাণ ও পরাশর স্মৃতির প্রণেতা মহর্ষি পরাশরের সঙ্গে এক করে দেখেছিলেন। কিন্তু এই সনাক্তকরণের পক্ষে কোনও শক্তিশালী প্রমাণ নেই। ভারতীয় সাহিত্যে ‘পরাশর’ নামে একাধিক গ্রন্থকার ও ঋষিসত্তার উল্লেখ রয়েছে। বৃহৎ সংহিতা, পরাশর তন্ত্র, বৃদ্ধ পারাশরীয়ম প্রভৃতি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ বিভিন্ন কালে বিভিন্ন পরাশর-নামধারী পণ্ডিত রচনা করে থাকতে পারেন। এছাড়া পরাশর পুরাণ, পরাশর ধর্ম, পরাশর ভাষ্য ইত্যাদি নানা গ্রন্থও পরাশর নামে প্রচলিত। ফলে যে কোনও পরাশর-নামাঙ্কিত গ্রন্থকে মহর্ষি পরাশরের রচনা ধরে নিলে ইতিহাস নির্ণয় সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে লেখকের যুক্তি হল, একই নামে বহু ব্যক্তি থাকা ভারতীয় সাহিত্য-ঐতিহ্যে অস্বাভাবিক নয়। “ব্যাস”, “গর্গ”, “পরাশর” বা “কাত্যায়ন” প্রভৃতি নাম অনেক সময় ব্যক্তি-নাম, আবার কখনও শাখা, গোষ্ঠী, উপাধি বা শিক্ষাপরম্পরার পরিচায়ক।

এই একই আপত্তি গর্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বহু প্রাচ্যবিদ জ্যোতির্বিদ গর্গকে শ্রীকৃষ্ণের উপাধ্যায় গর্গাচার্যের সঙ্গে এক করেছেন। কিন্তু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থকার গর্গ এবং কৃষ্ণের পুরাণপ্রসিদ্ধ গুরু গর্গাচার্য এক ব্যক্তি, এমন প্রমাণ নেই। বরং গর্গ নামেও বহু পণ্ডিত বা ঋষিপরম্পরা ছিল বলে অনুমান করা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

এই জ্যোতির্বিদ গর্গ তাঁর রচনায় শালিশুক নামে এক রাজার উল্লেখ করেছেন। ভি. গোপাল আয়ার এই প্রসঙ্গ পরীক্ষা করে বলেছেন, শালিশুক ছিলেন মৌর্য সম্রাট অশোকের উত্তরাধিকারীদের একজন। প্রচলিত মতে তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশধর। গোপাল আয়ার মনে করেন, যেহেতু চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে তিনি গ্রিক সান্দ্রাকোট্টসের সমসাময়িক ধরে নিয়েছেন, তাই শালিশুক কখনও খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দের পূর্বে হতে পারেন না। কিন্তু আলোচ্য লেখকের মতে, এই সিদ্ধান্তও একই ভুল সনাক্তকরণের ফল। যদি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী গর্গ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের মানুষ হন এবং তিনি শালিশুকের উল্লেখ করেন, তবে শালিশুক অবশ্যই তাঁর সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী রাজা হতে হবে। সেক্ষেত্রে শালিশুকও খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতক বা তার পূর্ববর্তী যুগের মানুষ। শালিশুক যদি মৌর্যবংশীয় রাজা হন, তবে তাঁর পূর্বপুরুষ অশোক ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যও আরও পূর্ববর্তী শতকে অবস্থান করবেন। এই যুক্তির ভিত্তিতে লেখক বলেন, মৌর্য চন্দ্রগুপ্তকে খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের গ্রিক সান্দ্রাকোট্টসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা একেবারেই ভুল।

পুরাণীয় কালপঞ্জি অনুসারে, শালিশুক মগধে রাজত্ব করেন খ্রিস্টপূর্ব ১৩৩৪ থেকে ১৩২১ অব্দ পর্যন্ত। অশোকের রাজত্ব স্থাপন করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৪৭৩ থেকে ১৪৩৭ অব্দে, আর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনকাল ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩৫ থেকে ১৫০১ অব্দ। আলোচ্য লেখকের দাবি, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা এবং পুরাণীয় হিসাব এখানে পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অবশ্য এই সমস্ত তারিখ নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে তিনি মহাভারত যুদ্ধের সাল খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ গ্রহণ করেছেন।

আর্কডিকন প্র্যাট মহাভারত যুদ্ধের তারিখ স্থাপন করেন খ্রিস্টপূর্ব ১১৮১ অব্দে। তিনি বরাহমিহির ও পরাশরের সময়কার অয়নবিন্দুর পার্থক্য থেকে তাঁদের মধ্যে ১৬৮০ বছরের ব্যবধান হিসাব করেন। তিনি ২৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট পার্থক্য এবং বরাহমিহিরের প্রদত্ত বছরে ৫০ বিকলা অয়নগতির হার গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি ধরে নেন, বরাহমিহির প্রদত্ত সূর্যের অবস্থান কলিযুগের ৩৬৬০তম বছরে, অর্থাৎ ৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে পর্যবেক্ষিত হয়েছিল। এরপর ৪৯৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৮০ বছর পিছিয়ে গিয়ে তিনি মহাভারত যুদ্ধ স্থাপন করেন খ্রিস্টপূর্ব ১১৮১ অব্দে। লেখকের মতে, এই সিদ্ধান্ত দু’টি দুর্বল অনুমানের উপর দাঁড়ানো। প্রথমত, বরাহমিহিরের পর্যবেক্ষণ কলিযুগ ৩৬৬০ বা ৪৯৯ খ্রিস্টাব্দের, এমন প্রমাণ নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি জ্যোতির্বিদ পরাশরকে মহর্ষি পরাশর বলে ধরে নিয়েছেন। ফলে তাঁর হিসাব নির্ভরযোগ্য নয়।

দেওয়ান বাহাদুর এল. ডি. স্বামীকান্নু পিল্লাই মহাভারত যুদ্ধের তারিখ স্থাপন করেন খ্রিস্টপূর্ব ২৪০২ অব্দে [Indian Ephemeris, Vol. I, Part I, Appendix V, অনুচ্ছেদ ৬, পৃ. ৪৮২-৪৮৩]। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রে আছে বরাহমিহিরের সেই শ্লোক, যেখানে যুধিষ্ঠিরের সময় সপ্তর্ষিরা মঘা নক্ষত্রে ছিলেন এবং যুধিষ্ঠিরের সময় থেকে শককাল পর্যন্ত ২৫২৬ বছরের ব্যবধান বলা হয়েছে। স্বামীকান্নু পিল্লাইও “শককাল”কে ৭৮ খ্রিস্টাব্দের শালিবাহন শক বলে ভেবেছেন। তাঁর ধারণা, প্রাচীন হিন্দু জ্যোতির্বিদরা জানতেন যে সপ্তর্ষিমণ্ডল প্রকৃতপক্ষে গ্রহের মতো চলাচল করে না। তবুও তিনি একটি প্রচলিত নাক্ষত্রিক চক্রের ভিত্তিতে অনুমান করেন যে কলিযুগের সূচনায় সপ্তর্ষিরা কৃত্তিকা নক্ষত্রে ছিলেন। যেহেতু মঘা কৃত্তিকা থেকে অষ্টম নক্ষত্র এবং সপ্তর্ষিরা প্রতিটি নক্ষত্রে ১০০ বছর অবস্থান করেন বলে ধরা হয়, তাই কৃত্তিকা থেকে মঘায় পৌঁছতে ৭০০ বছর লাগে। কলিযুগের সূচনা ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৭০০ বছর বাদ দিলে তিনি মহাভারত যুদ্ধের সাল স্থাপন করেন খ্রিস্টপূর্ব ২৪০২ অব্দে। তিনি মনে করেন, এই সাল বরাহমিহিরের শ্লোক থেকে নির্ণীত ২৪৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি।

কিন্তু আলোচ্য লেখক এই হিসাবকেও গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। সপ্তর্ষিদের গতি সম্পর্কে প্রাচীন সাহিত্যে একাধিক মত আছে। একটি মত বলে, তাঁদের পশ্চাদগতি আছে। অন্য একটি মত বলে, তাঁদের অগ্রগতি আছে। আবার তৃতীয় একটি মত তাঁদের কোনও গতি স্বীকার করে না। এই জটিল বিতর্কে না গিয়েও একটি প্রাচীন ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়া যায়। সেটি হল, কলিযুগ শুরু হওয়ার ২৫ বছর পর, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৩০৭৭ অব্দে, যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহণের স্মৃতিতে লৌকিকাব্দ বা লৌকিক যুগ শুরু হয়। ‘কলিযুগ রাজবৃত্তান্ত’ স্পষ্টভাবে বলে, বর্তমান কলিযুগের সূচনার ২৫ বছর পর সপ্তর্ষিরা আশ্লেষা নক্ষত্রে প্রবেশ করলে এই ঘটনা ঘটে।

পুরাণ, ইতিবৃত্ত এবং অন্যান্য প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য একবাক্যে জানায়, সপ্তর্ষিরা একটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করে দ্বিতীয় চক্রে প্রবেশ করেন আন্ধ্র বংশের ২৭তম রাজার সময়ে। প্রতিটি নক্ষত্রে ১০০ বছর হিসেবে ২৭টি নক্ষত্রে পূর্ণ চক্র শেষ করতে লাগে ২৭০০ বছর। যদি লৌকিকাব্দের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ৩০৭৭ অব্দে ধরা হয়, তবে তার ২৭০০ বছর পরে দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৭৭ অব্দ। অর্থাৎ আন্ধ্র বংশের ২৭তম রাজা তখন শাসন করছিলেন। কারও মতে এই ২৭তম রাজা ছিলেন পুলোমন দ্বিতীয়, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪০৯ থেকে ৩৭৭ অব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। অন্য মতে তাঁর উত্তরসূরি শিবশ্রী সাতকর্ণি ছিলেন ২৭তম রাজা, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩৭৭ থেকে ৩৭০ অব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। যেভাবেই ধরা হোক, সপ্তর্ষির দ্বিতীয় চক্রের সূচনা পুলোমনের শেষ বা শিবশ্রীর শুরুতে মিলে যায়। লেখকের মতে, এই হিসাব প্রমাণ করে যে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তকে ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সান্দ্রাকোট্টস বলা এবং মহাভারত যুদ্ধকে ২৪০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্থাপন করা উভয়ই ভুল।

প্রফেসর ওয়েবার অভ্যন্তরীণ প্রমাণ এবং বৈদিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বেদের রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দে স্থাপন করতে চান। সেই সূত্রে তিনি মনে করেন, মহাভারত যুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের পূর্বে হতে পারে না। সম্ভবত তাঁর যুক্তির ভিত ছিল এই যে, ব্যাসদেবকে বেদের সংকলক হিসেবে গণ্য করা হয়, পুরাণসমূহ তাঁকে মহাভারত যুদ্ধের সমসাময়িক বলে বর্ণনা করে, যজুর্বেদের শুক্ল ও কৃষ্ণ সংহিতায় পরাশরের উল্লেখ আছে, এবং জ্যোতির্বিদ পরাশরকে অয়নগতির ভিত্তিতে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে তিনি এই সমস্ত পরাশর ও ব্যাস-সংক্রান্ত ঐতিহ্যকে একত্রে বিচার করে মহাভারত যুদ্ধের সময় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের কাছাকাছি নির্ধারণ করেন।

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও শক্তিশালী আপত্তি আছে। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক তাঁর ‘Orion’ গ্রন্থে নানা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যুক্তির সাহায্যে দেখিয়েছিলেন, ঋগ্বেদের অনেক স্তোত্র খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০ অব্দেরও পূর্বে রচিত হতে পারে। পরবর্তী গ্রন্থ ‘The Arctic Home in the Vedas’-এ তিনি আরও এগিয়ে বলেন, বেদের কিছু অংশ হিমযুগ ও হিমযুগোত্তর কালের স্মৃতি বহন করতে পারে। যদিও তিনি কৃত, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগের দৈর্ঘ্যকে দেববর্ষের পরিবর্তে মানববর্ষ হিসেবে ধরে একটি সীমিত কালগণনা করেন এবং আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দের কথা বলেন, তবু তাঁর কাজ ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের সংকীর্ণ বৈদিক কালধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। তাঁর ‘গীতারহস্য’ বা ‘কর্মযোগশাস্ত্র’ গ্রন্থেও তিনি মৈত্রায়ণী উপনিষদের মতো অপেক্ষাকৃত পরবর্তী উপনিষদকে খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দের কাছাকাছি স্থাপন করেছেন। অন্যদিকে বন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইয়াকোবি বৈদিক যুগের সূচনাকে অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের পূর্বে স্থাপন করেন।

এইসব মত বিবেচনায় নিলে প্রফেসর ওয়েবারের খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দকেন্দ্রিক বৈদিক কালধারণা খুব দৃঢ় বলে মনে হয় না। আলোচ্য লেখকের মতে, ওয়েবারও সম্ভবত সেই একই ভুল করেছেন। তিনি স্মৃতি, বেদ বা পুরাণে উল্লিখিত পরাশরকে জ্যোতির্বিদ পরাশরের সঙ্গে অভিন্ন ধরে নিয়েছেন। অথচ জ্যোতির্বিদ পরাশরের অয়নগতিগত অবস্থান তাঁকে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে স্থাপন করলেও, তার দ্বারা মহর্ষি পরাশর, ব্যাসদেব বা মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ধারণ করা যায় না। একই নাম, একই গোত্র বা একই ঋষিপরম্পরার ভিত্তিতে বিভিন্ন যুগের পণ্ডিতকে এক ব্যক্তি ধরে নেওয়া ইতিহাসচর্চার জন্য বিপজ্জনক।

এই দীর্ঘ আলোচনার সারকথা হল, মহাভারত যুদ্ধের তারিখ নির্ধারণে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য ব্যবহার অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু সেই তথ্যের সঙ্গে গ্রন্থকারের পরিচয়, নামের পুনরাবৃত্তি, পাণ্ডুলিপিগত প্রেক্ষাপট, যুগগণনার পদ্ধতি এবং পুরাণীয় ধারাবাহিকতা বিচার না করলে ভুল সিদ্ধান্ত আসতে বাধ্য। অয়নগতি দিয়ে পরাশর বা গর্গ নামধারী জ্যোতির্বিদদের সময় নির্ধারণ করা যায়, কিন্তু সেই পরাশরকে ব্যাসের পিতা মহর্ষি পরাশর বা সেই গর্গকে কৃষ্ণের গুরু গর্গাচার্য ধরে নিয়ে মহাভারত যুদ্ধের সাল স্থির করা যায় না। একইভাবে শালিশুক, অশোক ও চন্দ্রগুপ্তের কাল নির্ধারণেও যদি সান্দ্রাকোট্টস পরিচয়ের ভুল অনুমান বসানো হয়, তবে সমস্ত হিসাব বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

আলোচ্য লেখকের বৃহত্তর উদ্দেশ্য তাই স্পষ্ট। তিনি দেখাতে চান যে ভারতীয় ঐতিহ্যের নিজস্ব কালপঞ্জি, কলিযুগের সূচনা, লৌকিকাব্দ, সপ্তর্ষি-চক্র, পুরাণীয় বংশতালিকা এবং অয়নগতির গণনাকে একত্রে বিচার করলে মহাভারত যুদ্ধের প্রাচীন তারিখ, অর্থাৎ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ, অধিক সঙ্গত বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও আধুনিক মূলধারার ইতিহাসচর্চা এই তারিখকে সাধারণভাবে গ্রহণ করে না, তবু আলোচ্য যুক্তিরীতি প্রাচীন ভারতীয় উৎসকে কেন্দ্র করে বিকল্প কালপঞ্জি নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে মনোযোগ দাবি করে।

প্রফেসর ওয়েবারের আলোচনায় মনে হয়, তিনি এমন একটি ধারণা পোষণ করেছিলেন যে বেদের সংকলনকালে বসন্তবিষুব ঘটত কৃত্তিকা নক্ষত্রে সূর্যের অবস্থানের সময়। লোকমান্য তিলক ও ভি. গোপাল আয়ারও এই ধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন বলে মনে হয় না। গোপাল আয়ার তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যেখানে কৃত্তিকাকে নক্ষত্রগুলির মুখ বা প্রথম স্থানাধিকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বেদের বহু স্থানে, বিশেষত যজুর্বেদের অন্তর্গত তৈত্তিরীয় সংহিতা ও তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে, কৃত্তিকাকে নক্ষত্রমালার অগ্রগণ্য রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই উল্লেখের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বুঝতে না পারলে সহজেই ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়।

বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থায় অগ্নির স্থান ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনও যজ্ঞ, যাগ, হোম বা বৈদিক ধর্মীয় আচারের কেন্দ্রে ছিল অগ্নি। অগ্নির মাধ্যমেই দেবতাদের উদ্দেশে আহুতি নিবেদন করা হত। বৈদিক কল্পনায় অগ্নি কেবল প্রাকৃতিক আগুন নন; তিনি দেবতাদের দূত, যজ্ঞের বাহক এবং মানব ও দেবলোকের মধ্যে সংযোগরেখা। কৃত্তিকা নক্ষত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হিসেবে অগ্নির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই কারণেই যজ্ঞকর্মে কৃত্তিকাকে বিশেষ শুভ, পবিত্র ও অগ্রগণ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে। কৃত্তিকায় আহুতি দিলে অগ্নি যেন সরাসরি সেই নিবেদন গ্রহণ করেন, এই ধর্মীয় ধারণা থেকেই কৃত্তিকাকে যজ্ঞসংক্রান্ত আচারে প্রথম স্থান দেওয়া হয়েছিল।

অতএব কৃত্তিকাকে নক্ষত্রমালার প্রথম বলে উল্লেখ করা মানেই এই নয় যে প্রাচীন হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যার গণনায় কৃত্তিকাই সর্বদা প্রথম নক্ষত্র হিসেবে ব্যবহৃত হত। এর অর্থ এটিও নয় যে বেদের সংকলনকালে বসন্তবিষুব অবশ্যই কৃত্তিকায় ঘটত। একটি নক্ষত্র কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচারে শ্রেষ্ঠ বা প্রথম বলে গণ্য হতে পারে, কিন্তু তার দ্বারা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রথমত্ব প্রমাণিত হয় না। ধর্মীয় অগ্রাধিকার ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সূচনার মধ্যে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলেই ঐতিহাসিক কালনির্ণয়ে বিভ্রান্তি আসে।

লোকমান্য তিলক নিজেও দেখিয়েছেন, বেদের কিছু অংশে মৃগশিরা বা পুনর্বসুকেও এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যেন সেগুলি নক্ষত্রমালার প্রথম। কৃত্তিকার মতোই কোনও কোনও প্রেক্ষাপটে মৃগশিরা বা পুনর্বসুকেও অগ্রগণ্য বলা হয়েছে। গর্গ স্মৃতিতেও দেখা যায়, কৃত্তিকা, শ্রবিষ্ঠা, অনুরাধা, রোহিণী, মঘা, ভরণী প্রভৃতি নানা নক্ষত্রকে পৃথক পৃথক ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রে প্রথম বা প্রধান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ একেক ধর্মীয় কাজের জন্য একেক নক্ষত্র বিশেষ মর্যাদা পায়। কোনও নক্ষত্র বিবাহে শুভ, কোনওটি যজ্ঞে, কোনওটি যাত্রারম্ভে, কোনওটি দীক্ষায়, আবার কোনওটি পিতৃকর্মে প্রাধান্য পেতে পারে। তাই কেবল কোনও গ্রন্থে কৃত্তিকা বা অন্য কোনও নক্ষত্রকে প্রথম বলা হয়েছে বলে বসন্তবিষুবের অবস্থান নির্ণয় করা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়।

প্রামাণ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা অনুসারে বসন্তবিষুব প্রতি ৯৬০ বছরে প্রায় এক নক্ষত্র পশ্চাদপসরণ করে। সাতাশ নক্ষত্রের পূর্ণচক্রে এই সময় লাগে ২৫,৯২০ বছর। অর্থাৎ ৯৬০ গুণ ২৭। এক পূর্ণ চক্র শেষ হলে বসন্তবিষুব আবার পূর্বের একই নক্ষত্রে প্রত্যাবর্তন করে। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা ও পুরাণীয় মহাকালচিন্তায় সৃষ্টির বয়স ধরা হয়েছে প্রায় ১৯৬ কোটি বছর। সেই হিসাবে সৃষ্টির সূচনা থেকে ২৫,৯২০ বছরের অসংখ্য চক্র অতিক্রান্ত হয়েছে। অতএব কোনও প্রাচীন গ্রন্থে কৃত্তিকা, মৃগশিরা, পুনর্বসু বা অন্য কোনও নক্ষত্রে বসন্তবিষুবের ইঙ্গিত থাকলেও তা কোন ২৫,৯২০ বছরের চক্রের অন্তর্গত, সে কথা নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ না করলে শুধু সেই উল্লেখ দিয়ে কোনও যুগের তারিখ স্থির করা সম্ভব নয়।

হিন্দু সাহিত্য অনুযায়ী মহর্ষি বেদব্যাস ও পরাশর বর্তমান মহাযুগের সূচনা থেকেই বা অন্তত তার বহু প্রাচীন পর্বে অবস্থিত মহাপুরুষরূপে কল্পিত। হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যাগত কালপঞ্জি অনুসারে বর্তমান মহাযুগের সূচনা বহু লক্ষ বছর পূর্বে। সুতরাং কৃত্তিকা বা অন্য কোনও নক্ষত্রসংক্রান্ত বৈদিক উল্লেখকে সাম্প্রতিকতম বিষুবচক্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত। আলোচ্য লেখকের মতে, এই ধরনের সরলীকরণ প্রকৃত গবেষণার বদলে পূর্বনির্ধারিত মতকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা মাত্র।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, মহাভারত যুদ্ধের নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণের জন্য মহাভারত গ্রন্থের ভিতর থেকেই কি কোনও উপাদান পাওয়া যায়? এত বিরাট এক যুদ্ধ, যেখানে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে কৌরব ও পাণ্ডবদের পক্ষে সমগ্র ভারতবর্ষের রাজা, যোদ্ধা ও সেনাবাহিনী অংশগ্রহণ করেছিল, সেই ঘটনার কালনির্ণয়ের জন্য ব্যাসদেব কি কোনও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সূত্র রেখে যাননি? আলোচ্য লেখকের মতে, মহাভারতের মধ্যেই যুদ্ধের সময়, তিথি, নক্ষত্র, অয়ন এবং প্রধান ঘটনাগুলির ধারাবাহিক উল্লেখ আছে। এই অভ্যন্তরীণ তথ্যগুলি মনোযোগ দিয়ে বিচার করলে যুদ্ধের কাল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়।

মহাভারতের উদ্যোগপর্বে বর্ণিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ শান্তিদূত হিসেবে দুর্যোধনের সভায় যাওয়ার জন্য কার্তিক শুক্ল দ্বাদশীর প্রভাতে যাত্রা করেন। সে দিন ছিল শুভ রোহিণী নক্ষত্র [উদ্যোগপর্ব, অধ্যায় ৬২, শ্লোক ৬ থেকে ২৯]। তিনি কৌরবসভায় পাণ্ডবদের পক্ষে শান্তির প্রস্তাব নিয়ে যান। কিন্তু দুর্যোধন কোনও আপস মেনে নিতে রাজি হননি। কৃষ্ণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং তিনি সেই সন্ধ্যাতেই ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের কাছে ফিরে আসেন। এই ঘটনা যুদ্ধের প্রকৃত সূচনার প্রায় পনেরো দিন আগে।

এরপর উভয় পক্ষ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে প্রবৃত্ত হয়। দুর্যোধন তাঁর সেনাবাহিনীকে কুরুক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন পুষ্য নক্ষত্রে, অর্থাৎ কার্তিক কৃষ্ণ পঞ্চমীতে। যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে শুরু হয় অমাবস্যায়, কার্তিক কৃষ্ণ পঞ্চদশী বা অমাবস্যা তিথিতে, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে, যার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ইন্দ্র বা শক্র [উদ্যোগপর্ব, অধ্যায় ১৪২, শ্লোক ১৬ থেকে ১৮; অধ্যায় ১৫০, শ্লোক ৩]। এই তথ্য মহাভারতের অভ্যন্তরীণ কালপঞ্জির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কারণ তিথি, নক্ষত্র ও ঘটনাক্রম একত্রে দিলে তা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করে।

যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে কৌরবপক্ষের সেনাপতি ছিলেন ভীষ্ম, আর পাণ্ডবপক্ষের সেনাপতি ছিলেন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন। ভীষ্ম কৌরব সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দশ দিন যুদ্ধ পরিচালনা করেন। দশম দিনের সন্ধ্যায় তিনি শরবিদ্ধ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ান এবং শরশয্যায় শায়িত হন। কিন্তু তিনি তখনই প্রাণত্যাগ করেননি। তাঁর ইচ্ছামৃত্যুর বর ছিল। তিনি উত্তরায়ণের আগমন পর্যন্ত শরশয্যায় শুয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। মহাভারতের বিবরণ অনুসারে, ভীষ্ম পতনের পর আরও ৫৮ রাত্রি জীবিত ছিলেন এবং সূর্যের উত্তরগমনের সূচনার অপেক্ষায় ছিলেন।

ভীষ্মের পতনের পর যুদ্ধ আরও আট দিন চলে। ভীষ্মের পর দ্রোণ কৌরবপক্ষের সেনাপতি হন। তিনি পাঁচ দিন সেনাপতিত্ব করেন এবং যুদ্ধের পঞ্চদশ দিনে, মার্গশীর্ষ শুক্ল ত্রয়োদশীতে, তিনি নিহত হন। এরপর কর্ণ সেনাপতিত্ব গ্রহণ করেন এবং দুই দিন যুদ্ধ করেন। সপ্তদশ দিনে, মার্গশীর্ষ শুক্ল পূর্ণিমায়, মৃগশিরা নক্ষত্রে কর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পতিত হন। তার পরের দিন, অর্থাৎ অষ্টাদশ দিনে, মার্গশীর্ষ কৃষ্ণ প্রতিপদে, মদ্ররাজ শল্য সেনাপতি হন এবং বিকেলের দিকে নিহত হন। একই দিনের সন্ধ্যায় ভীম ও দুর্যোধনের গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের মৃত্যু ঘটে। এইভাবে যুদ্ধ আঠারো দিনে সমাপ্ত হয়।

যুদ্ধশেষে পাণ্ডবরা দুর্যোধনের মৃত্যুর দিন থেকে ষোলো দিন অশৌচ পালন করেন। ভীষ্মের পতনের পঁচিশতম দিনে যুদ্ধে নিহত বীরদের শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন হয়। ছাব্বিশতম দিনে শ্রীকৃষ্ণ ও ব্যাসদেবের অনুরোধে যুধিষ্ঠির সিংহাসন গ্রহণের প্রস্তুতি নেন এবং হস্তিনাপুরে গমন করেন। সাতাশতম দিনে তাঁর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়। এরপর শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে যুধিষ্ঠির, তাঁর ভ্রাতৃগণ, শ্রীকৃষ্ণ, বিদুর, কুন্তী এবং অন্যান্য আত্মীয় ও পুরোহিতসহ ভীষ্মের কাছে যান। এই সময় শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্মকে বলেন, সূর্য উত্তরায়ণে প্রবেশ করা পর্যন্ত তাঁর আর ত্রিশ দিন আয়ু আছে। তিনি ভীষ্মকে অনুরোধ করেন, যুধিষ্ঠিরের শোক দূর করার জন্য ধর্ম, নীতি, রাজনীতি ও মোক্ষসম্পর্কিত উপদেশ দিতে [শান্তিপর্ব, অধ্যায় ৫০, শ্লোক ১০ থেকে ১৮; নীলকণ্ঠের টীকা]।

এইখানে মহাভারতের বর্ণনা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ভীষ্ম শুধু এক মহাবীর নন; তিনি কৌরব ও পাণ্ডব উভয় বংশের অভিভাবক, রাজনীতি ও ধর্মনীতির জীবন্ত ভাণ্ডার। তাঁর শরশয্যা যেন পরিণত হয় মহাজ্ঞানসম্ভারের আসনে। যুধিষ্ঠিরের মনে যুদ্ধের ভয়াবহতা, আত্মীয়বধের অনুতাপ এবং রাজধর্মের সংকট জমে ছিল। ভীষ্ম সেই শোকের মধ্যে ধর্মের বৃহৎ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাই ভীষ্মের মৃত্যুকাল শুধু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তারিখ নয়; এটি মহাভারতের দার্শনিক কাঠামোরও একটি কেন্দ্রীয় মুহূর্ত।

যুধিষ্ঠির যখন লক্ষ করেন যে সূর্য দক্ষিণগমন শেষ করে উত্তরগমন শুরু করেছেন, তখন তিনি ভীষ্মের কাছে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভ্রাতৃগণ, কুন্তী, শ্রীকৃষ্ণ, বিদুর, পুরোহিত এবং আত্মীয়রা। ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে দেখে বলেন, সৌভাগ্য যে তুমি তোমার মন্ত্রী ও আত্মীয়দের নিয়ে এসেছ, কারণ সহস্ররশ্মি সূর্য উত্তরমুখী যাত্রা শুরু করেছে। তিনি আরও জানান, তিনি শরশয্যায় আটান্ন রাত্রি অতিবাহিত করেছেন, যা তাঁর কাছে এক শতাব্দীর মতো দীর্ঘ মনে হয়েছে। এরপর তিনি বলেন, “হে যুধিষ্ঠির, মাঘ মাস এসেছে; এখন শুক্লপক্ষ চলছে; আমার গণনা অনুযায়ী এই পক্ষের তিন ভাগ এখনও অবশিষ্ট আছে” [অনুশাসনপর্ব, অধ্যায় ১৬৭, শ্লোক ২৬ থেকে ২৮]। মনমথনাথ দত্তের ইংরেজি অনুবাদেও এই বক্তব্যের মর্ম একইভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, ভীষ্ম পতনের পর ৫৮ রাত্রি অতিবাহিত করেছিলেন এবং ৫৯তম দিনে দেহত্যাগ করেন। তিনি যুদ্ধের দশম দিনে পতিত হয়েছিলেন। অতএব যুদ্ধের সূচনা থেকে তাঁর মৃত্যুর দিন দাঁড়ায় অষ্টষষ্টিতম বা ৬৮তম দিন। মহাভারত জানায়, ভীষ্ম মাঘ মাসের শুক্লপক্ষে দেহত্যাগ করেন, যখন সেই পক্ষের এক-চতুর্থাংশ মাত্র অতিবাহিত হয়েছে এবং তিন-চতুর্থাংশ অবশিষ্ট আছে। এক পক্ষের দৈর্ঘ্য পনেরো তিথি। তার এক-চতুর্থাংশ প্রায় সাড়ে সাত তিথি। অর্থাৎ মাঘ শুক্ল অষ্টমী চলছিল এবং অষ্টমীর প্রায় অর্ধাংশ অবশিষ্ট ছিল। তাই বোঝা যায়, ভীষ্ম মাঘ শুক্ল অষ্টমীতে দেহত্যাগ করেন।

মহাভারতের শান্তিপর্বেও স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভীষ্ম মাঘ শুক্ল অষ্টমীতে, রোহিণী নক্ষত্রে, মধ্যাহ্নে প্রাণত্যাগ করেন [শান্তিপর্ব, অধ্যায় ৪৬, শ্লোক ১ থেকে ৪]। শান্তিপর্ব ও অনুশাসনপর্বের এই দুই বিবরণ মিলিয়ে দেখা যায়, ভীষ্ম পতনের পর ৫৮ রাত্রি অপেক্ষা করেছিলেন এবং উত্তরায়ণের সূচনার পর মাঘ শুক্ল অষ্টমীর মধ্যাহ্নে দেহত্যাগ করেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, সেই বছর উত্তরায়ণ শুরু হয়েছিল মাঘ শুক্ল সপ্তমীতে। এই তিথিই আজও হিন্দু ধর্মীয় আচার-পরম্পরায় রথসপ্তমী নামে পরিচিত। রথসপ্তমীকে সূর্যের রথ উত্তরগামী হওয়ার দিন হিসেবে মানা হয়। পরের দিন মাঘ শুক্ল অষ্টমী ভীষ্মাষ্টমী নামে পরিচিত, যা ভীষ্মের মহাপ্রয়াণের স্মৃতি বহন করে।

এই প্রাচীন স্মৃতির ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় পঞ্জিকা শুধু পৌরাণিক বিশ্বাসের ভাণ্ডার নয়; অনেক সময় তা প্রাচীন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক স্মৃতিও ধারণ করে। রথসপ্তমী ও ভীষ্মাষ্টমী এখনও পালিত হওয়া এই ধারাবাহিকতার একটি সাক্ষ্য। উত্তরায়ণ, সূর্যরথ, মাঘ শুক্ল সপ্তমী এবং ভীষ্মের অষ্টমীতে দেহত্যাগ, এই সমস্ত উপাদান একত্রে মহাভারতের যুদ্ধ-পরবর্তী কালগণনাকে দৃঢ়তা দেয়।

এখন এই তথ্য থেকে যুদ্ধের সূচনাদিন যাচাই করা যায়। ভীষ্ম যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৬৮তম দিনে দেহত্যাগ করেছেন। তাঁর মৃত্যুদিবস মাঘ শুক্ল অষ্টমী। মাঘের পূর্ববর্তী দুই চান্দ্র মাস হল পৌষ ও মার্গশীর্ষ। কোনও চান্দ্রবর্ষে এই দুই মাসের মোট দিনসংখ্যা ৫৯ দিনের বেশি হতে পারে না। মাঘ শুক্ল অষ্টমী চলছিল। অতএব ৬৮ দিন পিছিয়ে গেলে যুদ্ধের সূচনাদিন পড়ে কার্তিক মাসের শেষ তিথিতে, অর্থাৎ কার্তিক অমাবস্যায়। এই সিদ্ধান্ত পূর্বে উল্লিখিত মহাভারতের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে যুদ্ধের সূচনা কার্তিক কৃষ্ণ অমাবস্যায় বলা হয়েছে।

আরও একটি মিল পাওয়া যায় নক্ষত্রগণনায়। ভীষ্মের মৃত্যুদিবসে নক্ষত্র ছিল রোহিণী। সেখান থেকে ৬৮ নক্ষত্র পিছিয়ে গেলে পাওয়া যায় জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র, যার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ইন্দ্র বা শক্র। মহাভারতে যুদ্ধের সূচনাদিনের নক্ষত্র হিসেবেও জ্যেষ্ঠার উল্লেখ আছে। এইভাবে তিথি ও নক্ষত্র উভয় দিক থেকেই যুদ্ধের সূচনাদিন কার্তিক অমাবস্যা, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র বলে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য মহাভারতের বিবরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। যুদ্ধের আগের কৃষ্ণের শান্তিদূত-যাত্রা, দুর্যোধনের সেনা-অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ, যুদ্ধের অমাবস্যা-সূচনা, ভীষ্মের দশম দিনে পতন, দ্রোণের পঞ্চদশ দিনে মৃত্যু, কর্ণের সপ্তদশ দিনে পতন, দুর্যোধনের অষ্টাদশ দিনে মৃত্যু, যুধিষ্ঠিরের অশৌচ, রাজ্যাভিষেক, ভীষ্মের ধর্মোপদেশ, উত্তরায়ণের আগমন এবং মাঘ শুক্ল অষ্টমীতে ভীষ্মের দেহত্যাগ, সব মিলিয়ে একটি সুসংহত কালপঞ্জি নির্মিত হয়। আলোচ্য লেখকের মতে, এই কালপঞ্জি কল্পনাপ্রসূত নয়; বরং এর মধ্যে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপাদান আছে, যা যাচাইযোগ্য।

অতএব মহাভারত যুদ্ধের কাল নির্ধারণে কেবল পরবর্তী পণ্ডিতদের অনুমান, গ্রিক বিবরণ বা অনির্দিষ্ট নক্ষত্রপ্রথমত্বের উপর নির্ভর না করে মহাভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃত্তিকা কোনও যজ্ঞে প্রথম বলে উল্লেখিত হলেই তা বসন্তবিষুবের প্রমাণ নয়। পরাশর বা গর্গ নামে কোনও জ্যোতির্বিদ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে ছিলেন বলেই মহাভারত যুদ্ধ সেই সময়ের হতে হবে, এমন সিদ্ধান্তও অবৈজ্ঞানিক। বরং যুদ্ধের নিজস্ব তিথি-নক্ষত্র-অয়ন-সংক্রান্ত তথ্য আলাদা করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এই সূত্রে ভীষ্মের মৃত্যুকাল একটি প্রধান জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চাবিকাঠি হিসেবে দেখা দেয়। তিনি শরশয্যায় শায়িত হয়ে উত্তরায়ণের অপেক্ষা করেছেন। তিনি মাঘ শুক্ল অষ্টমীতে, রোহিণী নক্ষত্রে, মধ্যাহ্নে দেহত্যাগ করেছেন। তার আগের দিন মাঘ শুক্ল সপ্তমীতে উত্তরায়ণ শুরু হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হয়েছে তার ৬৮ দিন পূর্বে, কার্তিক অমাবস্যায়, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে। এই সামগ্রিক তথ্যসমষ্টি থেকে লেখক পরবর্তী আলোচনায় যুদ্ধের নির্দিষ্ট সাল নির্ণয়ের চেষ্টা করবেন। তাঁর মতে, এই অভ্যন্তরীণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ভারতীয় ঐতিহ্যে প্রচলিত খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দের তারিখকে পরীক্ষা করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রদান করে।

আমরা পূর্ববর্তী আলোচনায় দেখেছি, মহাভারতের নিজস্ব বর্ণনা অনুসারে সূর্য উত্তরগমন শুরু করার পর, মাঘ মাসের শুক্ল অষ্টমী তিথিতে, রোহিণী নক্ষত্রে, মধ্যাহ্নকালে ভীষ্ম শরশয্যায় দেহত্যাগ করেন। এই তথ্যটি মহাভারতের কালনির্ণয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে তিথি, নক্ষত্র, অয়ন এবং দিনের সময়, চারটি উপাদান একত্রে পাওয়া যায়। সেই দিনের দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্য সমান ছিল বলে ধরা হলে ভীষ্মের দেহত্যাগের সময় দাঁড়ায় সূর্যোদয়ের পনেরো ঘটিকা পরে, অর্থাৎ মধ্যাহ্নে। টি. এস. নারায়ণ শাস্ত্রী তাঁর ‘Age of Sankara’ গ্রন্থে এই প্রশ্নটি গভীরভাবে পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে গণনা অনুসারে ওই দিন রোহিণী নক্ষত্র সূর্যোদয়ের প্রায় বত্রিশ ঘটিকা পরে শেষ হওয়ার কথা। সুতরাং ভীষ্মের মৃত্যুর পরও চন্দ্র আরও প্রায় সতেরো ঘটিকা রোহিণী নক্ষত্রে অবস্থান করেছিল। অন্যভাবে বললে, ভীষ্মের মৃত্যুর তেতাল্লিশ ঘটিকা পূর্বে চন্দ্র রোহিণীতে প্রবেশ করেছিল।

এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, ভীষ্ম যখন দেহত্যাগ করেন, তখন চন্দ্র রোহিণী নক্ষত্রের তৃতীয় পাদের শেষাংশে ছিল। রোহিণীর তৃতীয় পাদ মোট পনেরো ঘটিকা স্থায়ী ধরে নেওয়া হলে তার মধ্যে তেরো ঘটিকা ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছিল। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবে রোহিণীর তৃতীয় পাদ ক্রান্তিবৃত্তে ৪৬ ডিগ্রি ৪০ মিনিটে শুরু হয়ে ৫০ ডিগ্রিতে শেষ হয়। সেই হিসাবে ভীষ্মের মৃত্যুকালে চন্দ্রের অবস্থান ছিল আনুমানিক ৪৯ ডিগ্রি ৩৩ মিনিট ২০ বিকলা। এটি শুধু একটি আনুমানিক ধর্মীয় পঞ্জিকা-গণনা নয়; এখানে নক্ষত্রপদ, ঘটিকা ও তিথির পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট আকাশীয় অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে।

যেহেতু ওই মাঘ মাসে ভীষ্মের মৃত্যুর পূর্বে শুক্লপক্ষের সাড়ে সাত তিথি অতিক্রান্ত হয়েছিল, তাই চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে কৌণিক ব্যবধান ছিল ৯০ ডিগ্রি। কারণ একটি তিথি সূর্য ও চন্দ্রের মধ্যে ১২ ডিগ্রি কৌণিক ব্যবধান সৃষ্টি করে, আর সাড়ে সাত তিথিতে সেই ব্যবধান দাঁড়ায় ১২ গুণ ৭.৫, অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি। সুতরাং চন্দ্রের অবস্থান ৪৯ ডিগ্রি ৩৩ মিনিট ২০ বিকলা হলে সূর্যের অবস্থান দাঁড়ায় ৩১৯ ডিগ্রি ৩৩ মিনিট ২০ বিকলা। উত্তরায়ণ বা শীতায়ন শুরু হয়েছিল তার আগের দিন, রথসপ্তমীর মধ্যরাত্রির কাছাকাছি। ভীষ্মের মৃত্যুকাল এবং উত্তরায়ণের প্রকৃত সূচনার মধ্যে প্রায় দেড় ডিগ্রি পার্থক্য ধরলে উত্তরায়ণ শুরুর সময়ে সূর্যের অবস্থান দাঁড়ায় ৩১৮ ডিগ্রি ৩ মিনিট ২০ বিকলা। এটি শতভিষা নক্ষত্রের চতুর্থ পাদের অন্তর্গত, কারণ শতভিষার চতুর্থ পাদ ৩০৬ ডিগ্রি ৪০ মিনিট থেকে ৩২০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিস্তৃত।

এখন এই প্রাচীন অবস্থানের সঙ্গে আধুনিক বা লেখকের নিজ সময়ের অবস্থানের তুলনা করা হয়েছে। ১৯২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী উত্তরায়ণ বা শীতায়ন ঘটেছিল সূর্য ক্রান্তিবৃত্তে ২৪৭ ডিগ্রি ১৮ মিনিটে পৌঁছালে, অর্থাৎ মূলা নক্ষত্রের তৃতীয় পাদে। অতএব ভীষ্মের মৃত্যুর অব্যবহিত পরবর্তী উত্তরায়ণের সূর্যস্থিতি ৩১৮ ডিগ্রি ৩ মিনিট ২০ বিকলা এবং ১৯২৯-৩০ সালের উত্তরায়ণের সূর্যস্থিতি ২৪৭ ডিগ্রি ১৮ মিনিটের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় ৭০ ডিগ্রি ৪৫ মিনিট ২০ বিকলা। এই পার্থক্যের কারণ হল অয়নগতি বা বিষুববিন্দুর পূর্বগমন।

অয়নগতির হার এখানে ধরা হয়েছে বছরে ৫০ বিকলা ২৬ লিপ্তা। এই হার দ্বারা ৭০ ডিগ্রি ৪৫ মিনিট ২০ বিকলার পার্থক্য ভাগ করলে মোট সময় দাঁড়ায় আনুমানিক ৫০৬৯ বছর। অর্থাৎ ১৯২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫০৬৯ বছর পিছিয়ে গেলে যে সাল পাওয়া যায়, তা খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দের কাছাকাছি। এই হিসাব অনুসারে ভীষ্মের দেহত্যাগ হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দে। যেহেতু ভীষ্ম যুদ্ধের সূচনার পর আটষট্টিতম দিনে দেহত্যাগ করেন এবং তাঁর মৃত্যু মাঘ শুক্ল অষ্টমীতে ঘটে, তাই মহাভারত যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেই একই বছরে, কার্তিক অমাবস্যায়, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে।

মহাভারত আরও জানায়, যে পক্ষের শেষে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই পক্ষটি ছিল ত্রয়োদশী-সংকুচিত, অর্থাৎ সেখানে তেরো তিথির বিশেষ বিন্যাস ছিল। এই ধরনের ক্ষেত্রে পরবর্তী পক্ষ ষোলো তিথির হতে পারে। ফলে কার্তিক অমাবস্যা থেকে মার্গশীর্ষ কৃষ্ণ প্রতিপদ পর্যন্ত যুদ্ধের আঠারো দিন পূর্ণ হওয়া জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে অস্বাভাবিক নয়। যুদ্ধ ভীষ্মের মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আট দিন পূর্বে শুরু হয়েছিল। এই সমস্ত বিবরণ একত্রে বিচার করলে লেখক মনে করেন, মহাভারত নিজেই অভ্যন্তরীণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সাহায্যে যুদ্ধের সাল খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ বলে প্রতিষ্ঠা করে।

এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। যদি মহাভারত যুদ্ধের তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে প্রাচীন ভারতের রাজবংশীয় কালপঞ্জির জন্য এটি একটি স্থির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। পুরাণ, ইতিবৃত্ত, কলিযুগ রাজবৃত্তান্ত এবং অন্যান্য প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে মগধের রাজবংশসমূহের যে শাসনকাল দেওয়া হয়েছে, তা এই তারিখ থেকে গণনা করলে একটি সুসংহত ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। লেখকের মতে, এই ধারাবাহিকতা হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ঐতিহ্যের বহু তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তকে গ্রিক লেখকদের সান্দ্রাকোট্টস বা সান্দ্রাসিপ্টাস বলে যে সনাক্তকরণ করা হয়েছে, এই কালপঞ্জি তা প্রত্যাখ্যান করে।

এই যুক্তির ভিত্তিতে লেখক মগধের রাজবংশগুলির একটি দীর্ঘ তালিকা প্রদান করেন। মহাভারত যুদ্ধের পর প্রথমে বৃহদ্রথ বংশ মগধে শাসন করে। এই বংশের প্রথম রাজা সোমাপি বা মার্জারি, যিনি যুদ্ধের পর খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ থেকে ৩০৮১ অব্দ পর্যন্ত ৫৮ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর পর শ্রুতশ্রবা ৬৪ বছর, অপ্রতিপ ৩৬ বছর, নিরমিত্র ৪০ বছর, শুকৃত ৫৮ বছর, বৃহৎকর্মা ২৩ বছর, সেনাজিৎ ৫০ বছর, শ্রুতঞ্জয় ৪০ বছর, মহাবল ৩৫ বছর, সুচি ৫৮ বছর, ক্ষেম ২৮ বছর, অনুব্রত ৬৪ বছর, ধর্মনেত্র ৩৫ বছর, নির্বৃত্ত ৫৮ বছর, সুব্রত ৩৮ বছর, দৃঢ়সেন ৫৮ বছর, সুমতি ৩৩ বছর, সুচল ২২ বছর, সুনেত্র ৪০ বছর, সত্যজিৎ ৮৩ বছর, বিরজিৎ ৩৫ বছর এবং রিপুঞ্জয় ৫০ বছর শাসন করেন। এইভাবে বৃহদ্রথ বংশের বাইশ জন রাজা মোট ১০০৬ বছর মগধ শাসন করেন, খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ থেকে ২১৩৩ অব্দ পর্যন্ত।

এরপর মগধে প্রদ্যোত বংশের উত্থান ঘটে। প্রদ্যোত ২৩ বছর, পালক ২৪ বছর, বিশাখযূপ ৫০ বছর, জনক ২১ বছর এবং নন্দিবর্ধন ২০ বছর শাসন করেন। মোট ১৩৮ বছরের এই শাসনকাল খ্রিস্টপূর্ব ২১৩৩ থেকে ১৯৯৫ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রদ্যোতদের পরে আসে শিশুনাগ বংশ। শিশুনাগ ৪০ বছর, কাকবর্ণ ৩৬ বছর, ক্ষেমধর্মা ২৬ বছর, ক্ষত্রঞ্জস ৪০ বছর, বিধিসার ৩৮ বছর, অজাতশত্রু ২৭ বছর, দর্ভক বা দর্শক ৩৫ বছর, উদয়ন ৩৩ বছর, নন্দিবর্ধন ৪২ বছর এবং মহানন্দী ৪৩ বছর শাসন করেন। শিশুনাগ বংশের মোট শাসনকাল ৩৬০ বছর, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ১৯৯৫ থেকে ১৬৩৫ অব্দ পর্যন্ত।

শিশুনাগদের পর নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন মহাপদ্ম নন্দ। তিনি ৮৮ বছর শাসন করেন, খ্রিস্টপূর্ব ১৬৩৫ থেকে ১৫৪৭ অব্দ পর্যন্ত। তাঁর পর সুমাল্য এবং তাঁর সাত ভাই মিলিয়ে আরও ১২ বছর শাসন করেন। এইভাবে নন্দ বংশের মোট শাসনকাল হয় ১০০ বছর, খ্রিস্টপূর্ব ১৬৩৫ থেকে ১৫৩৫ অব্দ পর্যন্ত। এরপর চাণক্যের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন বলে পুরাণীয় ধারায় বলা হয়।

মৌর্য বংশের প্রথম রাজা চন্দ্রগুপ্ত ৩৪ বছর শাসন করেন, খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩৫ থেকে ১৫০১ অব্দ পর্যন্ত। তাঁর পর বিন্দুসার বা বিরিসার ২৮ বছর, অশোক ৩৬ বছর, সুয়শ বা সুপার্শ্ব ৮ বছর, দশরথ বা বন্ধুপালিত ৮ বছর, ইন্দ্রপালিত ৭০ বছর, হর্ষ বা হর্ষবর্ধন ৮ বছর, সঙ্গত ৯ বছর, শালিশুক ১৩ বছর, সোমশর্মা বা দেবধর্ম ৭ বছর, শতধন্বা ৮ বছর এবং বৃহদ্রথ ৮৭ বছর শাসন করেন। মোট ৩১৬ বছরের এই মৌর্য শাসনকাল খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩৫ থেকে ১২১৯ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই হিসাব অবশ্য প্রচলিত আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে একেবারে ভিন্ন; কিন্তু লেখকের উদ্দেশ্য ভারতীয় পুরাণীয় কালপঞ্জির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ধারাবাহিকতা দেখানো।

মৌর্যদের পর শুঙ্গ বংশ ক্ষমতায় আসে। পুষ্যমিত্র ৬০ বছর, অগ্নিমিত্র ৫০ বছর, বসুমিত্র ৩৬ বছর, সুজ্যেষ্ঠ ১৭ বছর, ভদ্রক ৩০ বছর, পুলিন্দ ৩৩ বছর, ঘোষবাসু ৩ বছর, বজ্রমিত্র ২৯ বছর, ভাগবত ৩২ বছর এবং দেবভূতি ১০ বছর শাসন করেন। এই বংশের মোট শাসনকাল ৩০০ বছর, খ্রিস্টপূর্ব ১২১৯ থেকে ৯১৯ অব্দ পর্যন্ত। শুঙ্গদের পর কাণ্ব বংশের উত্থান হয়। বাসুদেব ৩৯ বছর, ভূমিমিত্র ২৪ বছর, নারায়ণ ১২ বছর এবং সুশর্মা ১০ বছর শাসন করেন। কাণ্ব বংশের মোট শাসনকাল ৮৫ বছর, খ্রিস্টপূর্ব ৯১৯ থেকে ৮৩৪ অব্দ পর্যন্ত।

এরপর শুরু হয় আন্ধ্র বা সাতকর্ণি বংশের শাসন। সিমুক বা শিপ্রক, যিনি শ্রী সাতকর্ণি নামেও পরিচিত, ২৩ বছর শাসন করেন, খ্রিস্টপূর্ব ৮৩৪ থেকে ৮১১ অব্দ পর্যন্ত। কৃষ্ণ সাতকর্ণি ১৮ বছর, শ্রীমল্ল সাতকর্ণি ১০ বছর, পূর্ণোৎসঙ্গ ১৮ বছর, শ্রী সাতকর্ণি ৫৬ বছর, স্কন্ধস্তম্ভী ১৮ বছর, লম্বোদর ১৮ বছর, আপীতক ১২ বছর, মেঘস্বাতি ১৮ বছর, শতস্বাতি ১৮ বছর, স্কন্ধস্বাতিকর্ণ ৭ বছর, মৃগেন্দ্র স্বাতিকর্ণ ৩ বছর, কুন্তল স্বাতিকর্ণ ৮ বছর, সৌম্য স্বাতিকর্ণ ১২ বছর, শত সাতকর্ণি ১ বছর, পুলোমা সাতকর্ণি ৩৬ বছর, মেঘস্বাতি বা মেঘ সাতকর্ণি ৩৮ বছর, অরিষ্ঠ সাতকর্ণি ২৫ বছর, হাল ৫ বছর, মুণ্ডলক ৫ বছর, পুরিন্দ্রসেন ২১ বছর, সুন্দর সাতকর্ণি ১ বছর, চকোর সাতকর্ণি ২৮ বছর, মহেন্দ্র সাতকর্ণি ২৫ বছর, শিব সাতকর্ণি ৩২ বছর, গৌতমীপুত্র শ্রী সাতকর্ণি ৭ বছর, পুলোমা বা বশিষ্ঠীপুত্র শ্রী সাতকর্ণি ৩২ বছর, শিবশ্রী সাতকর্ণি বা শিবশ্রী বশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণি ৭ বছর, শিবস্কন্দ সাতকর্ণি ৭ বছর, যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণি বা গৌতমীপুত্র যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণি ১৯ বছর, বিজয়শ্রী সাতকর্ণি ৬ বছর, চন্দ্রশ্রী সাতকর্ণি ৩ বছর এবং পুলোমন ৭ বছর শাসন করেন। মোট শাসনকাল ৫০৫ বা গোল হিসাবে ৫০৬ বছর, খ্রিস্টপূর্ব ৮৩৪ থেকে ৩২৮ অব্দ পর্যন্ত।

এরপর লেখকের মতে গুপ্ত বংশের সূচনা হয়। চন্দ্রগুপ্ত প্রথম ৭ বছর শাসন করেন, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ থেকে ৩২১ অব্দ পর্যন্ত। তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত ৫১ বছর, খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ থেকে ২৭০ অব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ৩৬ বছর, খ্রিস্টপূর্ব ২৭০ থেকে ২৩৪ অব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। কুমারগুপ্ত প্রথম ৪২ বছর, স্কন্দগুপ্ত ২৫ বছর, স্থিরগুপ্ত ৫ বছর, নরসিংহগুপ্ত ৩৫ বছর এবং কুমারগুপ্ত দ্বিতীয় ৪৪ বছর শাসন করেন। এই ধারায় গুপ্ত বংশের মোট শাসনকাল ২৪৫ বছর হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এই পুরাণীয় কালপঞ্জির উদ্দেশ্য স্পষ্ট। লেখক দেখাতে চান, যদি মহাভারত যুদ্ধের তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজবংশের শাসনকাল যোগ-বিয়োগ করা হয়, তবে মগধের ইতিহাস একটি অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপ লাভ করে। এই রূপে মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের সমসাময়িক নন; বরং তাঁর অবস্থান বহু পূর্বে। আর আলেকজান্ডারের সময়কার সান্দ্রাকোট্টসকে লেখক গুপ্ত চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চান। এই তত্ত্ব মূলধারার আধুনিক ইতিহাসচর্চা থেকে পৃথক, কিন্তু ভারতীয় ঐতিহ্যভিত্তিক এক বিকল্প কালপঞ্জির কাঠামো হিসেবে তা উপস্থাপিত হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত লেখকের বক্তব্য এই যে, মহাভারতের অভ্যন্তরীণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য, ভীষ্মের মৃত্যুকাল, রথসপ্তমী, ভীষ্মাষ্টমী, অয়নগতির হিসাব, কলিযুগের সূচনা এবং পুরাণীয় রাজবংশতালিকা পরস্পরকে সমর্থন করে। তাঁর মতে, এই সমন্বিত প্রমাণ মহাভারত যুদ্ধের সাল খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৯ অব্দ বলে প্রতিষ্ঠা করে। এই তারিখ গ্রহণ করলে প্রাচীন ভারতের রাজবংশীয় ইতিহাস নতুনভাবে বিন্যস্ত হয় এবং পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের প্রচলিত কালপঞ্জি প্রশ্নের মুখে পড়ে। আধুনিক গবেষণায় এই দাবি বিতর্কিত হলেও, প্রাচীন ভারতীয় উৎসের নিজস্ব যুক্তি ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ইতিহাস নির্মাণের এক সাহসী প্রয়াস হিসেবে এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

 

Post Views: 7
Tags: Ancient IndiaArchaeology of MahabharataHindu EpicsHistorical AnalysisIndian HistoryKurukshetra WarMahabharataMahabharata ResearchMahabharata WarMahabharata War DateMahabharata War TimelineVedic Civilizationঐতিহাসিক বিশ্লেষণকুরুক্ষেত্র যুদ্ধপ্রাচীন ভারতভারতীয় ইতিহাসমহাভারতমহাভারত গবেষণামহাভারতের যুদ্ধমহাভারতের যুদ্ধের সময়কাল
ADVERTISEMENT

Related Posts

ইক্ষ্বাকু রাজবংশ : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার
হিন্দু

ইক্ষ্বাকু রাজবংশ : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার

সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের পর দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, তার অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল ইক্ষ্বাকু...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
May 31, 2026
রাম : ঐতিহাসিক বাস্তবতা নাকি পৌরাণিক কল্পনা?
ভারতবর্ষের ইতিহাস

রাম : ঐতিহাসিক বাস্তবতা নাকি পৌরাণিক কল্পনা?

রামসেতুকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক ভারতে ইতিহাস, ধর্মবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতকে নতুনভাবে সামনে এনে দিয়েছে। এই বিতর্কের সূত্র ধরে...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
May 24, 2026
‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের জনক কাজী নজরুল ইসলাম
ভারতবর্ষের ইতিহাস

‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের জনক কাজী নজরুল ইসলাম

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম ‘জয় বাংলা’ কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক চেতনা, ভাষাগত গৌরব এবং রাজনৈতিক...

by নবজাগরণ
May 4, 2026
বর্গী এল দেশে: বাংলার অষ্টাদশ শতকের মারাঠা আক্রমণকারীদের সন্ত্রাস
ভারতবর্ষের ইতিহাস

বর্গী এল দেশে : বাংলার অষ্টাদশ শতকের মারাঠা আক্রমণকারীদের সন্ত্রাস

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম বাংলার গ্রামে গ্রামে বহুদিন আগেও রাতে শিশুকে ঘুম পাড়াতে মায়েরা যে ছড়াটি গাইতেন—“ছেলে ঘুমালো, পাড়া...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
August 26, 2025

Facebook Page

নবজাগরণ

ADVERTISEMENT
No Result
View All Result

Categories

  • English (9)
  • অন্যান্য (11)
  • ইসলাম (28)
  • ইসলামিক ইতিহাস (23)
  • ইহুদী (3)
  • কবিতা (37)
  • খ্রিস্টান (6)
  • ছোটগল্প (6)
  • নাস্তিকতা (20)
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (24)
  • বিশ্ব ইতিহাস (26)
  • ভারতবর্ষের ইতিহাস (202)
  • রাজনীতি (40)
  • সাহিত্য আলোচনা (74)
  • সিনেমা (18)
  • হিন্দু (19)

Pages

  • Cart
  • Checkout
    • Confirmation
    • Order History
    • Receipt
    • Transaction Failed
  • Checkout
  • Contact
  • Donation to Nobojagaran
  • Homepage
  • Order Confirmation
  • Order Failed
  • Privacy Policy
  • Purchases
  • Services
  • লেখা পাঠানোর নিয়ম
  • হোম

  • jasa gestun terdekat
  • https://www.harikami.id/
  • https://premiumnesia.id/
No Result
View All Result
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • Others Language
    • English
    • Urdu
    • Hindi

©Nobojagaran 2020 | Designed & Developed with ❤️ by Adozeal

Login to your account below

Forgotten Password?

Fill the forms bellow to register

All fields are required. Log In

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
Welcome back
Sign In
Sign in to access your downloads, manage your account, and continue where you left off.
Login Account
Enter your credentials to access your account
Forgot Password?
Don't have an account? Register Now
1
WhatsApp
Hi, how can I help you?
Open chat
Powered by Joinchat
wpDiscuz
0
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
| Reply