লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
জীবনানন্দ দাশের ছোটগল্প পড়তে গেলে প্রথমেই মনে হয়, তাঁর কাহিনির ঘটনা যতটা সামনে আসে, তার চেয়েও বেশি কিছু ঘটে চরিত্রের ভাবনায়। চিঠি, কারও আগমন, কোনো পুরোনো সম্পর্কের স্মরণ কিংবা আসন্ন বিয়ের কথা বাহ্যিক ঘটনার সামান্য উপাদান। অথচ সেই সূত্র ধরেই গল্পের মানুষ নিজের অতীত, আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় প্রবেশ করেন। এই প্রবণতাকে কবির গদ্যলেখার স্বাভাবিক ফল বলে শেষ করলে গল্পের নির্মাণটি বোঝা যায় না। কবিতার সঙ্গে তাঁর গদ্যের চিত্রকল্প ও ছন্দের সম্পর্ক আছে, কিন্তু গদ্যে চরিত্রের সময়, দৃষ্টিকোণ এবং বক্তব্যের পরিসর পৃথক নিয়মে গড়ে ওঠে। যে অভিজ্ঞতা নাটকীয় সংঘর্ষে শেষ হওয়ার কথা, তা জীবনানন্দের হাতে আত্মসমীক্ষার একাধিক পথে ছড়িয়ে পড়ে। গল্প তাই ঘটনার সারাংশ জানানোর চেয়ে মানুষ সেই ঘটনা কীভাবে অনুভব করেন, কীভাবে ভুল বোঝেন এবং মনে মনে পুনর্গঠন করেন, তার শিল্প। এখানে শৈলী কেবল বাক্য সাজানোর পদ্ধতি নয়; জীবনকে জানার একটি বিশেষ অভ্যাস।
‘আত্মজৈবনিক’ শব্দটি তাঁর গল্পের আলোচনায় প্রায়ই আসে। শব্দটির উপযোগিতা আছে, কারণ দৈনন্দিন অসুবিধা, পেশার অস্থিরতা, দাম্পত্যের দূরত্ব এবং নিঃসঙ্গ চিন্তার সঙ্গে রচনার নানা চরিত্রের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু সাদৃশ্য মানেই লেখক নিজের জীবনের যথাযথ দলিল দিচ্ছেন, এমন নয়। অভিজ্ঞতা গল্পে ঢুকলে তা চরিত্র, কল্পিত সংলাপ, ভিন্ন সময় এবং নির্মিত পরিণতির ভিতর বদলে যায়। লেখকের আত্মবীক্ষণ গল্পের উপকরণ হতে পারে, গল্পের সব কণ্ঠ তার নিজের স্বীকারোক্তি হয়ে ওঠে না। ফলে জীবনানন্দের গদ্যের ব্যক্তিগত তীব্রতা স্বীকার করেও তার শিল্পিত মধ্যস্থতাকে দেখতে হবে। একজন কথক যে তথ্য জানেন না, লেখকও তা জানাতে চান না; একটি চরিত্র নিজের সম্পর্ক সম্পর্কে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, পাঠক তার সীমাও দেখতে পান। এই ব্যবধান গল্পকে ব্যক্তিগত নোটের সীমা থেকে বের করে সাহিত্যিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
শৈলী বোঝার আরেক পথ হল জীবনানন্দের গল্পের পাঠককে কোথায় দাঁড়াতে হয়, তা দেখা। প্রচলিত ঘটনার গল্পে প্রথমে পরিস্থিতি জানা যায়, তারপর সংঘাত বাড়ে, শেষে কোনো সিদ্ধান্ত বা চমক দেখা দেয়। তাঁর অনেক গল্পে শুরুতেই আমরা এমন এক মনের কাছে চলে আসি, যে আগে থেকে বহুদিন ভেবেছে, কিন্তু নিশ্চিত উত্তর পায়নি। পাঠককে সেই চিন্তার অসমাপ্ত পথে অংশ নিতে হয়। কোথাও বাক্য চলতে চলতে স্মৃতিতে ঢুকে পড়ে; কোথাও চরিত্র অন্যের কথার মধ্যে নিজের পুরোনো আঘাত শুনতে পায়। এই গতি সব সময় সহজ নয়, তবে দুর্বোধ্য করে তোলাই তার উদ্দেশ্য নয়। মানুষ নিজের জীবনকে একটানা, সম্পূর্ণ অবগত কাহিনি হিসেবে জানেন না। গল্প সেই অভিজ্ঞতার কাছে বিশ্বস্ত থাকতে চায়। শৈলীর স্বাতন্ত্র্য তাই শুধু জটিল ভাষায় নয়; কোথায় তথ্য দেওয়া হবে, কোথায় নীরবতা থাকবে, আর কোন প্রশ্নের উত্তর পাঠককে নিজে খুঁজতে হবে, সেই সিদ্ধান্তে।
বাংলা ছোটগল্পের বিকাশের পটভূমি ছাড়া এই স্বাতন্ত্র্যের মানে স্পষ্ট হয় না। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটগল্পকে গভীর শিল্পরূপ দিয়েছিলেন। তাঁর গল্পের পরিধিও একরকম ছিল না: সামাজিক সম্পর্ক, অন্তর্মুখী অনুভব, ব্যঙ্গ, স্মৃতি ও অপ্রত্যাশিত পরিণতি বহু রকম পথে এসেছে। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কাহিনিনির্ভর নির্মাণ এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মানবসম্পর্কের আবেগময় পাঠ বাংলা গদ্যের পাঠাভ্যাসে আলাদা ভূমিকা রাখে। ফলে রবীন্দ্রনাথকে একমাত্র নিটোল কাহিনির প্রতিনিধি বানিয়ে তাঁর বিপরীতে পরের সব লেখককে বসানো ইতিহাসের পক্ষে যথার্থ নয়। জীবনানন্দ এমন একটি ক্ষেত্র পান, যেখানে পাঠকের কাছে গল্প বলতে কী বোঝায়, তার একাধিক দৃষ্টান্ত আগেই উপস্থিত। তিনি সেগুলির সঙ্গে কথোপকথনে নিজস্ব পথ তৈরি করেন। পূর্বসূরিকে অস্বীকার না করে গল্পের ভিতরে ভাবনার অন্য ধরনের সময় প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর বড় কাজ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলা সাহিত্য ও সমাজে পরিবর্তনের প্রভাব তীব্রতর হয়। আয় ও পেশার অনিশ্চয়তা, মধ্যবিত্ত মর্যাদার ভঙ্গুরতা, নগরের প্রসার এবং পুরোনো পারিবারিক বিধির সঙ্গে ব্যক্তির ইচ্ছার দ্বন্দ্ব কথাসাহিত্যের বিষয় বদলায়। নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, জগদীশ গুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও বুদ্ধদেব বসুর রচনা একই ধরনে পড়ে না; তাদের সামাজিক পরিসর, ভাষা এবং ঘটনার বাছাই পৃথক। তবু প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে গল্পের প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাশাকে প্রশ্ন করেন। দেহ, শ্রম, অভাব, অবচেতনের ইঙ্গিত, শ্রেণিগত দূরত্ব অথবা ব্যক্তি সম্পর্কের নিষ্ঠুরতা নতুন গুরুত্ব পায়। এই বহুস্বরের পরিবেশেই জীবনানন্দের গদ্যরচনা ভাবতে হয়। তাঁর গল্প একা হঠাৎ প্রচল রূপ ভেঙে দেয়নি; সমকালীন অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র বিষণ্নতা, স্মৃতিবোধ এবং চিন্তার ছন্দ খুঁজেছেন।
কল্লোল, কালি কলম এবং প্রগতি পত্রিকাকে ঘিরে যে সাহিত্যিক আবহ তৈরি হয়েছিল, তাকে শুধু রবীন্দ্রবিরোধিতার একটি ঘোষণায় সীমিত রাখা যায় না। নতুন লেখকদের মধ্যে পরস্পরের মত ও রুচিতে পার্থক্য ছিল; একই পত্রিকার পাতায়ও ভিন্ন প্রকরণের লেখা বেরিয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আগের চেয়ে প্রত্যক্ষভাবে সাহিত্যে আনা, সামাজিক ভদ্রতার আড়ালে থাকা বিষয়গুলি নিয়ে লেখা এবং গদ্যের কথনরীতি পরীক্ষা করার প্রবণতা তাদের অনেকের মধ্যে ছিল। জীবনানন্দ সেই সময়ের সন্তান, কিন্তু কোনো গোষ্ঠীর ঘোষণাপত্র দিয়ে তাঁর প্রতিটি গল্পের অর্থ নির্ধারিত হয় না। তিনি সাহিত্যের নতুন প্রশ্নগুলিকে নিজের দৃষ্টিতে গ্রহণ করেন। বিশেষত যে মানুষ বাইরের ঘটনায় কিছু বলেন না, কিন্তু ভিতরে ক্রমাগত নিজেকে বিচার করেন, তিনি তাঁর গল্পে কেন্দ্রীয় স্থান পান। এই আত্মসমীক্ষা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; সমাজের চাপই অনেক সময় ভিতরের সেই কণ্ঠকে এত সক্রিয় করে তোলে।
বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসকে সরল অগ্রগতির রেখায় সাজিয়ে বলা যায় না যে পুরোনো গল্পে ঘটনা ছিল আর নতুন গল্পে কেবল চেতনা এল। আগে লেখা গল্পেও জটিল মনস্তত্ত্ব ছিল, নতুন গল্পেও ঘটনাবহুল কাহিনি চলেছে। পরিবর্তনটি অনেকটা গুরুত্বের ভারসাম্যে। কোথাও বাহ্যিক ঘটনার পরিণতি মুখ্য, কোথাও সেই ঘটনা চরিত্রের মনে যে দীর্ঘ তরঙ্গ তোলে, তা মুখ্য হয়ে ওঠে। জীবনানন্দের রচনায় দ্বিতীয় প্রবণতা প্রবল। তবে এই প্রবণতাকে কাহিনির অনুপস্থিতি বলা ভুল। একটি বিয়ের প্রস্তুতি, পুরোনো প্রেমিকার আগমন অথবা কোনো চিঠির অর্থ নিয়ে সংশয় না থাকলে অন্তর্মুখী আলোচনাও একই রকম হত না। ঘটনার পরিমাণ কম হতে পারে; ঘটনার সঙ্গে অনুভূতির সম্পর্ক কিন্তু ঘনীভূত। গল্পের কাঠামো ভাঙার পাশাপাশি তিনি মনোযোগের নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করেন। কী ঘটল, সেই প্রশ্নের সঙ্গে কীভাবে ঘটাটি মনে রইল, এই প্রশ্ন জড়িয়ে যায়।
জীবনানন্দের কথাসাহিত্য জীবদ্দশায় পাঠকের কাছে পৌঁছায়নি বলে সমকালীন গ্রহণের ইতিহাসও আলাদা। প্রকাশিত গল্প নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পাঠক ও সমালোচকের তর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ তাঁর ছিল না। মৃত্যুর পরে রচনা প্রকাশিত হলে কবি হিসেবে আগে প্রতিষ্ঠিত পরিচয় গদ্যপাঠকে প্রভাবিত করে। কেউ কবিতার গীতলতা প্রত্যাশা করেন, কেউ গল্পের পরিচিত কাহিনিসংস্থান খুঁজে না পেয়ে সংশয়ে পড়েন। এই গ্রহণ পরিস্থিতি রচনার গুণ বিচার থেকে পৃথক করে রাখা দরকার। জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত হওয়া শিল্পগুণের অভাবের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়; আবার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে বলেই প্রত্যেকটি রচনা সমান শিল্পসমাপ্ত, এমনও নয়। পাণ্ডুলিপির পাঠ, সম্পাদনার প্রক্রিয়া এবং অসমাপ্ত রচনার অবস্থা বুঝে বিচার করা প্রয়োজন। পাঠকের কাজ পুরো রচনাবলিকে এক রায়ে মাপা নয়; ভিন্ন গল্পে ভিন্ন সাফল্য এবং ভিন্ন অসম্পূর্ণতা শনাক্ত করা।
‘ছায়ানট’ নিয়ে প্রেমেন্দ্র মিত্রের আলোচনায় কবির গদ্যলেখক পরিচয় সম্পর্কে বিস্ময় গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা দিয়ে গড়া লেখকের জনপরিচয় কত শক্তিশালী হলে তাঁর গদ্যের স্বতন্ত্র সাধনা নজরের বাইরে থাকে, সেই বিস্ময় তা জানায়। কিন্তু কবি ও গল্পকারকে দুই বিচ্ছিন্ন মানুষ ভাবলে তাদের অভিজ্ঞতার গভীর মিলও আড়াল হয়। শব্দের সুর, প্রকৃতির দৃশ্য এবং অস্বস্তিকর আবেগ উভয় রচনাক্ষেত্রে আসে, যদিও তাদের শিল্পগত কাজ আলাদা। গল্পে একই চিত্রকল্প চরিত্রের দৃষ্টিকোণ, ঘটনাস্থল ও সময়ের সঙ্গে বাঁধা; কবিতায় তার চলন অন্য রকম। প্রেমেন্দ্র মিত্রের পাঠকে তাই ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে মূল্য দিতে হয়, শেষ কথা হিসেবে নয়। কবির পরিচয় নিয়ে বিস্ময় গদ্যের দুর্বলতার প্রমাণও নয়। উল্টো, কবিতা পড়ে যাকে চেনা হয়েছে, গল্পে তার অন্য ধরনের মানুষ দেখার অভ্যাস আবিষ্কারের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পগুলি পড়তে ভালো লাগা অথচ প্রচল অর্থে গল্প বলে মনে না হওয়ার মন্তব্যও এই গ্রহণ সমস্যার চিহ্ন। কথার এলোমেলো গতি তাঁর কাছে আপাতদৃষ্টিতে কাহিনির অভাব, কিন্তু পাঠের আনন্দের কথা তিনি একই সঙ্গে বলেছেন। মন্তব্যের দুই অংশই গুরুত্বের দাবিদার। একদিকে গল্পের প্রবাহ কিছু পাঠকের কাছে সত্যিই কঠিন হতে পারে; অপরদিকে সেই প্রবাহের মধ্যে এমন ভাষা ও অনুভব আছে যা পড়া শেষ হলেও মনে থাকে। মন্তব্যটিকে সমালোচকের অসহায়তার প্রমাণ বলে উড়িয়ে দেওয়ার বদলে প্রশ্ন করা ভালো, যে শিল্পরূপ সুস্পষ্ট ঘটনার বদলে বিচ্ছিন্ন চিন্তা ধরে, তাকে পড়ার অভ্যাস কীভাবে তৈরি হয়? গল্পের শুরু, মধ্যভাগ ও শেষ কোথায়, তা শনাক্ত করার পদ্ধতি বদলাতে হতে পারে। জীবনানন্দের গদ্যে একটি প্রশ্ন ফিরে আসে, একটি স্মৃতি অন্য স্মৃতিকে টানে, একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বর্তমানকে অস্থির করে। এই পুনরাবর্তন ও স্থানান্তরই অনেক সময় তার বুনন।
অশোক মিত্রের কঠোর আপত্তি অন্য দিক থেকে ভাবায়। প্রকাশের উদ্দেশ্য, গদ্যলেখার দক্ষতা, অন্য সমকালীন লেখকের সঙ্গে সাদৃশ্য এবং ব্যক্তিগত নথি প্রকাশের নৈতিকতা তাঁর উদ্বেগের অংশ। আপত্তি সবটা মেনে নেওয়া যায় না, কিন্তু মৃত লেখকের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ছাপার প্রশ্নটি অবহেলাও করা উচিত নয়। রচনা অপ্রকাশিত থাকলে লেখক তা আর কখনো প্রকাশ করতে চাননি, এমন প্রমাণ হয় না। একইভাবে তিনি শেষ পর্যন্ত কেমন পাঠ চাইতেন, তাও সব সময় জানা যায় না। তাই মৃত্যুর পর প্রকাশে পাঠ নির্ধারণ, খসড়া ও সম্পূর্ণ রচনার পার্থক্য এবং সম্পাদকের দায় স্পষ্ট থাকা দরকার। শিল্পমূল্য বিচার করতে হবে প্রকাশিত পাঠের উপর, কল্পিত লেখকইচ্ছার উপর নয়; আবার পাণ্ডুলিপির অজানা অবস্থা গোপন করেও বিচার চলতে পারে না। অশোক মিত্রের বিরূপ মূল্যায়নের বাইরে এই পদ্ধতিগত প্রশ্নটি আজও জরুরি।
কল্লোল যুগের রচনাকে অনুকরণ করেছেন, এমন অভিযোগ পরীক্ষা করতে গেলে নির্দিষ্ট সাদৃশ্য দেখাতে হবে। শুধু সমকালীন গল্পে বেকারত্ব, দাম্পত্য বা যৌনতার প্রসঙ্গ এসেছে বলে কোনো রচনাকে অনুলিখন বলা যায় না। ভাষার বাঁক, ঘটনা সাজানোর পদ্ধতি, চরিত্রের দৃষ্টি এবং রচনার শেষে পাঠকের কাছে কী প্রশ্ন থাকে, এসব তুলতে হয়। জীবনানন্দের গল্পে দৈনন্দিন দাম্পত্যসংকট থাকলেও স্বগতকথনের দীর্ঘ মগ্নতা, স্মৃতির বহুস্তর এবং প্রকৃতিচিত্রের ভিন্ন কাজ তাকে আলাদা করে। সব গল্প সমান সফল না হলেও একাধিক গল্পে এই দৃষ্টির নিজস্বতা ধরা পড়ে। নির্দিষ্ট তুলনার বদলে এক গোষ্ঠীর নাম উচ্চারণ করে প্রভাব প্রমাণ করা সমালোচনার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সাহিত্যিকেরা এক যুগের ভাষা ও সমস্যা ভাগ করে নিতে পারেন; তাতেই তাদের ব্যক্তিগত নির্মাণ শেষ হয়ে যায় না। জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে গদ্যের পার্থক্য মানার মতোই, সহসময়ের গদ্যের সঙ্গে তাঁর যোগ ও দূরত্ব দুটোই মানা দরকার।
কোনো লেখক নিজের রচনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলে সেই কথাকেও প্রসঙ্গসহ পড়তে হয়। শ্রমের পরিশ্রম, প্রকাশের বাধা, পাঠকের অনীহা অথবা নিজের উচ্চ প্রত্যাশা থেকে মুহূর্তের হতাশা আসতে পারে। জীবনানন্দের দিনলিপির আত্মসমালোচনাকে শিল্পমূল্যের চূড়ান্ত রায় মানলে পরের লেখালেখি এবং আগের রচনার বৈচিত্র্য উভয়ই অগ্রাহ্য হয়। আবার তিনি লিখতে থাকলেন বলেই প্রতিটি লেখা সম্পর্কে নির্ভর আস্থা ছিল, সে কথাও নিশ্চিত নয়। একই মানুষের মধ্যে সৃষ্টির তাগিদ এবং সৃষ্টির ফল নিয়ে সংশয় পাশাপাশি থাকতে পারে। ব্যক্তিগত নথির সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ থেকে কাকে কোন রচনা পাঠিয়েছিলেন, কেন প্রকাশিত হয়নি অথবা তিনি ভবিষ্যৎ পাঠক সম্পর্কে কী স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার পূর্ণ ইতিহাস পুনর্গঠন করা যায় না। নথিকে ইঙ্গিত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, অনুপস্থিত ঘটনার প্রমাণ হিসেবে নয়।
গল্পে প্লট নেই বলে অভিযোগের জবাবে জীবনকে প্লটহীন ভাবার যে দিনলিপিগত ইঙ্গিত উদ্ধৃত হয়, তা একটি শক্তিশালী লেখকীয় আত্মপক্ষসমর্থন। দৈনন্দিন জীবন কোনো পূর্বনির্ধারিত পরিণতির দিকে নিখুঁতভাবে সাজানো থাকে না। মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তার কারণ খোঁজেন; অনেক ঘটনার অর্থ দীর্ঘ সময় পরেও অমীমাংসিত থাকে। এই উপলব্ধি ছোটগল্পের নির্মাণে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু জীবনের প্লটহীনতা থেকে শিল্পেও কোনো পরিকল্পনা নেই, এমন সিদ্ধান্ত বের হয় না। জীবনানন্দ তাঁর গল্পে কোন দৃশ্য আগে দেবেন, কোন স্মৃতি পরে আনবেন, কী তথ্য গোপন রাখবেন, তা বেছে নেন। প্রকাশ্য ঘটনার পরিকল্পনা কম হলেও নির্বাচনের শৃঙ্খলা থাকতে পারে। তাই ‘প্লটহীন’ অভিযোগকে আলোচনার শুরু বলা ভালো, শেষ নয়। কোন সূত্রে গল্পের অংশগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তা খুঁজলেই তার নিজস্ব গঠন দেখা যায়।
এই গঠনের কথা বলতে গেলে ‘চেতনাপ্রবাহ’ শব্দটিও সতর্কভাবে ব্যবহার করা দরকার। চরিত্রের মনে হঠাৎ স্মৃতি আসছে, বাক্য দীর্ঘ হচ্ছে বা ভাবনা এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে যাচ্ছে বলেই তা নির্দিষ্ট পাশ্চাত্য কৌশলের পূর্ণ অনুকরণ নয়। কিছু গল্পে চরিত্র নিজের চিন্তা সাজিয়ে বলেন; কোথাও কথক তার অনুভবকে পরে ব্যাখ্যা করেন; কোথাও বর্তমান এবং স্মৃতির মধ্যে দ্রুত যাতায়াত ঘটে। সব ক্ষেত্রের নাম এক করলে বর্ণনার পদ্ধতির পার্থক্য হারায়। জীবনানন্দের নিজস্ব কৌশল বুঝতে প্রশ্ন করতে হবে, কোন অংশে চরিত্র এখন ভাবছেন, কোন অংশে পরে ফিরে দেখছেন এবং কোথায় গল্পকার চরিত্রের ধারণা থেকে দূরত্ব রাখছেন। এই ভেদগুলি চিহ্নিত করলে অন্তর্জগতের অস্থিরতার মাঝেও গল্পের নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়। মনের গতি লিখতে গিয়ে লেখক যে শিল্পিত ক্রম তৈরি করেন, তাকে এলোমেলো ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস ভাবা যথার্থ নয়।
ইউরোপীয় আধুনিক কথাসাহিত্যের পাঠ জীবনানন্দের চিন্তাকে বিস্তৃত করে থাকতে পারে। হার্ডি, হেনরি জেমস, জয়েস অথবা উল্ফের নাম তাঁর পাঠক্ষেত্রে এলে সাহিত্যিক তুলনার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু নামের উপস্থিতি থেকে সরাসরি রচনাগত ঋণ নির্ধারণ করা যায় না। হেনরি জেমসের দৃষ্টিকোণ নির্মাণ, জয়েসের নগরজীবনের ক্ষণিক উন্মেষ কিংবা উল্ফের মানসিক সময় সম্পর্কে পাঠক তুলনা তুলতে পারেন, তবে প্রত্যেক তুলনায় মিলের পাশাপাশি পার্থক্যও পরীক্ষা করতে হবে। জীবনানন্দের বাংলা ভাষা, নদী ও মফস্বলের দৃশ্য, মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাঙন এবং ঔপনিবেশিক বাস্তবতা স্বতন্ত্র উপাদান। আধুনিকতার সাহিত্যিক রূপ নানা ভাষায় একভাবে প্রকাশ পায় না। বাক্যগত কৌশলের সাদৃশ্য থাকলেও তার কাজ ভিন্ন সামাজিক পরিবেশে বদলে যেতে পারে। দৃশ্য ও চিন্তার সম্পর্কই ফলপ্রসূ।
হেনরি জেমসের সঙ্গে তুলনায় বিশেষ করে সর্বজ্ঞ কথকের প্রশ্ন ওঠে। কোনো গল্পে লেখক সব চরিত্রের মনের খবর সমানভাবে দেন না; একটি চেতনার মধ্য দিয়ে অন্যদের দেখা যায়। এই নির্বাচনে পাঠকের জ্ঞান সীমিত হয়, কিন্তু চরিত্রের অনিশ্চয়তার কাছে পৌঁছানো সহজ হয়। জীবনানন্দের কিছু গল্পে কথকের বক্তব্য খুব নিবিড়; সেই কারণেই তাকে অবিশ্বাস্য বলে ঘোষণা করা প্রয়োজন হয় না, তবে তার উপলব্ধি পূর্ণ জ্ঞান নয় বলে বুঝতে হয়। যে ব্যক্তি প্রেমিকার আচরণে উদাসীনতা দেখছেন, তার নিজের প্রত্যাশা সেই দৃষ্টিকে কতটা প্রভাবিত করছে, পাঠকের কাছে প্রশ্নটি খোলা থাকে। সর্বজ্ঞতার এই সঙ্কোচ গল্পে নৈতিক জটিলতাও আনে। অন্য মানুষ কী ভাবছেন, নিশ্চিত না জেনেই চরিত্র সিদ্ধান্তে পৌঁছান। পাঠকও সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বা সংশোধন করতে স্বাধীন থাকেন।

‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’ গল্পটি এই সমস্ত প্রশ্ন পরীক্ষা করার একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র। বাইরের ঘটনার সূত্র খুব বিস্তৃত নয়: বিয়ের প্রস্তুতি চলছে, পুরোনো প্রেমিকা অরুণা আসবেন, সরোজিনীর সঙ্গে নতুন সংসার শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এই পরিস্থিতির মধ্যে বিনোদ ও হিমাংশুর সম্পর্ক, স্মৃতির বর্ণনা এবং আত্মসমীক্ষার স্তর যুক্ত হয়ে গল্পটি জটিল হয়ে ওঠে। বিনোদ নিজের অভিজ্ঞতাকে গল্পে রূপ দিতে গিয়ে হিমাংশু নামের মানুষটিকে সামনে আনেন। এতে নাম বদলানোর একটি সহজ ঘটনা ঘটলেও বর্ণনার দূরত্ব বদলে যায়। নিজের জীবনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে সেই জীবনকে তৃতীয় ব্যক্তির চোখে দেখতে চেষ্টা করার সুযোগ তৈরি হয়। অথচ দূরত্ব সম্পূর্ণ নয়; হিমাংশুর কষ্টের সঙ্গে বিনোদের বর্তমান বোধের যোগ থেকে যায়। এই দ্বৈততায় গল্পের লেখকচরিত্র এবং গল্পের মানুষ পরস্পরের ছায়া, কিন্তু একেবারে অভিন্ন প্রতিলিপি নন।
বিনোদের অবস্থান কেবল শুরুতে এসে পরে হারিয়ে যাওয়া পরিচয় নয়। তিনি যা লিখছেন, তার নির্বাচনের ক্ষমতা তার হাতে; কোন মুহূর্ত দীর্ঘ হবে, কোন ঘটনার পরে কোন চিন্তা আসবে, সে সিদ্ধান্ত তার। হিমাংশু আবার গল্পের মধ্যভাগে নিজের সম্পূর্ণ আবেগ নিয়ে উপস্থিত হয়ে এই নির্মাণকে কেবল কৃত্রিম লেখার খেলা থাকতে দেন না। পাঠকের মনে দুটি প্রশ্ন একসঙ্গে থাকে: হিমাংশু এই মুহূর্তে কী অনুভব করছেন, আর বিনোদ অতীতের সেই অনুভবকে এখন কেন এমনভাবে সাজাচ্ছেন? এভাবেই আত্মপ্রক্ষেপ সরল আত্মকথনের চেয়ে বেশি কাজ করে। বর্ণনাকারী নিজের কাছ থেকে দূরে গিয়ে অভিজ্ঞতাকে পুনর্দেখেন। পুনর্দর্শনের মধ্যে আত্মসমর্থন, অনুশোচনা ও পরিবর্তিত বয়সের বিচার মিশে থাকতে পারে। ফলে গল্পের বর্ণিত অতীত কখনো বর্তমানের মতো কাছে আসে, আবার বর্তমানের জানার সীমা অতীতকে দূরেও ঠেলে দেয়।
অরুণার আসার সংবাদ বয়ে আনা চিঠিটি ঘটনার সূচনা হলেও তার কাজ একটি দরজা খোলা। চিঠির কয়েকটি কথাকে হিমাংশু বারবার পড়েন, কারণ কাগজে লেখা শব্দের চেয়ে তিনি জানতে চান অরুণা কতটা ব্যথা পেয়েছেন। যে স্বাভাবিকতা অরুণার নিজের ভদ্রতা বা আনন্দ হতে পারে, তা হিমাংশুর মনে উদাসীনতার প্রমাণ হয়ে ওঠে। এই পাঠে অরুণার চিঠি এবং হিমাংশুর ব্যাখ্যা একই বস্তু নয়। গল্পকার এই ব্যবধান থেকেই মানসিক গতি নির্মাণ করেন। কথাগুলি যত কম, হিমাংশুর অনুমান তত বেশি ছড়ায়। সরোজিনীর সঙ্গে বিয়ের ভবিষ্যৎ এখনও শুরু হয়নি, অথচ তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও তিনি আগে থেকে হিসাব করছেন। বর্তমানের চিঠি, অতীতের প্রেম এবং ভবিষ্যতের দাম্পত্য একসঙ্গে মনে আসায় ঘড়ির সরল সময় ভেঙে যায়। পাঠক বাইরে অল্প কিছু ঘটতে দেখেন, ভিতরে বহু সম্ভাবনার সংঘাত শুনতে পান।
হিমাংশু ভাবেন, নতুন সম্পর্ক শুরু হলে অরুণার স্মৃতি হয়তো গুরুত্ব হারাবে। পরমুহূর্তেই অরুণার বর্তমান আচরণ তাকে এত আঘাত করে যে ভবিষ্যতের সেই শান্তি অবিশ্বাস্য মনে হয়। এই দুই বিপরীত ভাবনা গল্পের অসংলগ্নতা নয়; সিদ্ধান্তহীন মনের যথার্থ গতি। মানুষ কোনো বড় জীবনবদলের আগে সম্ভাব্য একাধিক ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন। কল্পনার একটি দৃশ্যে পুরোনো প্রেম নিভে যায়, অন্য দৃশ্যে তা অপ্রতিরোধ্য থাকে। এই ভবিষ্যৎগুলি বাস্তব ঘটনা নয়, তবু বর্তমানের অনুভবকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ছোটগল্পের সময় তিন স্তরে সীমাবদ্ধ নয়; স্মৃতির মধ্যে আরেক স্মৃতি, বর্তমানের মধ্যে কল্পিত ভবিষ্যৎ, এবং অতীতকে বর্তমানের বয়সে ফিরে বিচার করার প্রবণতা কাজ করে। জীবনানন্দ এই সব অবস্থাকে পৃথক অধ্যায়ের নিয়মে সাজান না; ভাবনার স্রোতে তাদের কাছাকাছি আনেন। কাছাকাছি থাকলেও প্রতিটি অবস্থার সত্য আলাদা।
অরুণা বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হলে প্রচল রোমান্টিক গল্পের প্রত্যাশায় বড় সংঘাত আসতে পারত। প্রকাশ্য অভিযোগ, অন্তরঙ্গ স্বীকারোক্তি কিংবা নতুন সিদ্ধান্ত কাহিনিকে অন্য পথে নিয়ে যেত। জীবনানন্দ সেখানে আগমনের সাধারণ তথ্যটিকেই গুরুত্ব দেন। যে ঘটনা নিয়ে এত ভাবনা চলছিল, সে ঘটনা ঘটলে বাইরের পৃথিবী অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে ওঠে না। মানুষের আগমন সামান্য, তার আগে ও পরে হিমাংশুর মনেই আসল প্রবলতা। এই অনুপাত গল্পের শৈলী বোঝায়। প্রত্যাশার দীর্ঘ সময় এবং ঘটনার সংক্ষিপ্ত বাস্তবতা পাশাপাশি রেখে লেখক দেখান, ভিতরের নাটক সব সময় বাইরের নাটকের সমান দৃশ্যমান নয়। পাঠক অরুণাকে হিমাংশুর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে পারেন; তবু তিনি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খলচরিত্র হয়ে ওঠেন না। তার নিজস্ব সামাজিক আচরণ আছে, যা হিমাংশুর অতীত অনুভবের সঙ্গে মেলে না। এই অমিলই গল্পের ক্ষত।
অরুণার অবস্থান সম্পর্কে হিমাংশুর ধারণাকে পুরো গল্পের সত্য ভাবলে বর্ণনার সূক্ষ্মতা হারায়। তিনি অরুণার স্বাভাবিকতা দেখে সিদ্ধান্ত নেন, সম্পর্কটির অর্থ তাদের কাছে এক ছিল না। কিন্তু কেউ কোনো সামাজিক উপলক্ষে হাসিমুখে এলে তার ভিতরে স্মৃতি নেই, এমন প্রমাণ হয় না। একইভাবে হিমাংশুর তীব্র ব্যথা আছে বলেই অরুণার আচরণ নিষ্ঠুর, তাও নিশ্চিত নয়। বিনোদের লিখিত হিমাংশু এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পাঠকের সহানুভূতি পান। আত্মসমীক্ষার সার্থকতা এখানেই যে নিজের ভাবনার অতিরঞ্জনও কখনো প্রকাশ পায়। চরিত্রের কথায় যতখানি তথ্য, তার চেয়ে বেশি থাকে অনুভূতির চাপ। লেখক এই চাপ কমিয়ে বহির্জগতের নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দেন না; বরং পাঠককে মনে করিয়ে দেন, অন্যকে দেখা সব সময় নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার ভিতর দিয়ে ঘটে। চরিত্রের প্রতি সহানুভূতি এবং তার বিচারের প্রতি সংশয় তাই একসঙ্গে সম্ভব।
গল্পটির শুরু ও শেষে বিনোদের অবস্থানে ফিরে আসা এক ধরনের বেষ্টনী তৈরি করে। বেষ্টনী আছে বলেই মাঝের অংশ খণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ শিথিল নয়। যে ব্যক্তি নিজের অভিজ্ঞতা লিখছেন, শেষ পর্যন্ত তার বর্তমান অবস্থাই গল্পের অর্থকে আবার বদলায়। অতীতের হিমাংশু নিজের ভবিষ্যৎ জানেন না; বর্তমানের বিনোদ সেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেশি জানলেও অতীতের আবেগ অবিকল ফিরিয়ে আনতে পারেন না। এই দুই জ্ঞানের পার্থক্য গল্পের কাঠামোয় কাজ করে। মাঝের দীর্ঘ আত্মবিশ্লেষণ শুধু চরিত্রের চিন্তার নথি নয়, বর্তমান থেকে অতীতকে পুনরায় সাজানোর এক শিল্পিত চেষ্টা। স্মৃতি যে ঘটনাকে বেছে রাখে, বর্তমানের প্রয়োজন সেই বাছাইয়ে অংশ নেয়। ফলে কাঠামোর প্রথম ও শেষ অংশকে অলংকার ভাবার বদলে স্মৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের জায়গা হিসেবে পড়া যায়।
এই গল্পের গঠনকে একাধিক সময়স্তর দিয়ে বোঝানো যায়, তবে অতিরিক্ত তালিকা করলে পাঠের জীবন্ত গতি হারায়। বর্তমানের বিনোদ নিজের অভিজ্ঞতার দিকে তাকান; তার লেখায় হিমাংশুর অতীত পুনর্গঠিত হয়; সেই অতীতের ভিতর হিমাংশু আরও আগের প্রেম স্মরণ করেন এবং বিয়ের পরে কী হবে কল্পনা করেন। এই চার ধরনের সময় পরস্পরের পাশে এসে বর্ণনার গভীরতা বাড়ায়। পাঠক এক সময় থেকে আরেক সময়ে যান, তবু সব সময়ে অরুণাকে নিয়ে একই প্রশ্ন ফিরে আসে: অন্যের কাছে তার গুরুত্ব কতখানি? প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি গল্পের সুতো। বাহ্যিক ঘটনার পরপর সাজানো ক্রম না থাকলেও এই সুতো চিন্তা, স্মৃতি এবং আশঙ্কাকে যুক্ত রাখে। তাই প্লটের বদলে বোধের ঐক্য বলা যায়, কিন্তু সেই বোধ ঘটনামুক্ত নয়। চিঠি, বিয়ের আয়োজন, আগমন এবং পরে ফিরে দেখা, প্রতিটির ভূমিকা আছে।
ভাষাতেও এই পুনরাগমন দেখা যায়। চরিত্র একটি সম্ভাবনা উচ্চারণ করে, আবার তাকে সংশোধন করে, পরে নতুন সন্দেহে ফিরে যায়। একই শব্দ বা ভাবের পুনরাবৃত্তি পাঠের গতি থামিয়ে দেয় বলে মনে হতে পারে; আসলে ভাবনার অনিশ্চয়তার তাল তৈরি করে। সংগীতের সরল পুনরাবৃত্তির সঙ্গে এর মিল নেই, কারণ ফিরে আসার পরে কথাটি আগের অবস্থায় থাকে না। প্রথমে যা আশ্বাস, পরে তা আত্মবিদ্রূপ; প্রথমে যা অভিযোগ, পরে নিজের প্রতি সন্দেহ। জীবনানন্দের দীর্ঘ বাক্য এই পরিবর্তনকে এক শ্বাসে ধরে রাখতে চায়। সংক্ষিপ্ত বাক্য কখনো দৃশ্যের স্পষ্টতা আনে, দীর্ঘ বাক্য চরিত্রের মন কোথায় যেতে যেতে ফিরে এল, তার পথ দেখায়। ফলে গদ্যের ছন্দ কথার সৌন্দর্যের জন্যই নয়; চরিত্রের চিন্তার রূপ বোঝানোরও উপায়।
প্রকৃতির উল্লেখ থাকলেও এই গল্পকে কবিতার দৃশ্যাবলির গদ্যসংস্করণ ভাবা যায় না। কুয়াশা শিরোনামে যেমন দৃষ্টির অস্পষ্টতা জানায়, তেমনি সময়ের ব্যবধান এবং মৃত্যুর ভাবনাকেও ডেকে আনে। কিন্তু প্রতিটি কুয়াশার মানে নির্দিষ্ট একটি প্রতীকে আটকে থাকে না। হিমাংশু যখন অরুণার অনুভব জানতে পারেন না, অন্য মানুষের মনের উপরও যেন এমন আচ্ছাদন পড়ে। আবার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার নিশ্চয়তা না থাকায় কুয়াশা আত্মজিজ্ঞাসারও পরিবেশ। এই সম্ভাবনাগুলিকে এক চূড়ান্ত প্রতীকতালিকায় বন্দি না করাই ভালো। জীবনানন্দ দৃশ্য দিয়ে অনুভবের অবস্থা তৈরি করেন; পাঠক দৃশ্য থেকে নানা ইঙ্গিত পান। কাহিনির সম্পর্ক বুঝে সেই ইঙ্গিত গ্রহণ করতে হয়। শিরোনামের ‘মৃত্যুর সময়’কেও কেবল প্রত্যক্ষ মৃত্যুঘটনার সংকেত ধরে নেওয়ার দরকার নেই; কোনো সম্পর্কের সম্ভাবনা নিভে যাওয়াও চরিত্রের কাছে মৃত্যুর মতো তীব্র হতে পারে।
‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’ গল্পের বিশেষত্ব উপলব্ধি করতে হলে ছোটগল্পে সংঘাত বলতে কী বোঝায়, তা প্রসারিত করতে হয়। অরুণার সঙ্গে হিমাংশুর প্রকাশ্য তর্ক না থাকলেও তার কল্পিত অরুণা আর সামনে থাকা অরুণার মধ্যে সংঘাত আছে। সরোজিনীকে ঘিরে সম্ভাব্য নতুন জীবনের সঙ্গে পুরোনো প্রেমস্মৃতির সংঘাত আছে। বিনোদের স্মরণকারী বয়স এবং হিমাংশুর ব্যথিত মুহূর্তও একই অভিজ্ঞতাকে ভিন্নভাবে বোঝে। এই সব সংঘাত দৃশ্যমান ঝগড়া ছাড়াই গভীর। গল্পটির ঘটনাহীনতার অভিযোগ তাই একটি বিশেষ ধরনের ঘটনাকে মাত্র ঘটনা গণ্য করার উপর দাঁড়ায়। চরিত্রের সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে কি না, দৃষ্টির অর্থ বদলাচ্ছে কি না, চিঠির ভাষা কতবার নতুন ব্যাখ্যা পাচ্ছে, এগুলোও কাহিনির গতি। এক সময় মন জানত প্রেম তাকে স্থির রাখবে; পরে সেই বিশ্বাসের ভিত ফাটতে থাকে। এই বদলেই আখ্যানের গতিময়তা।
তবু গল্পকে কেবল অন্তর্জগতের স্বয়ংসম্পূর্ণ দলিল বললে সামাজিক পরিসর হারায়। বিয়ের আয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান; অরুণার আগমনও সেই অনুষ্ঠানের ভিতরে ঘটে। হিমাংশুর ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে প্রকাশ্য আচারকে পাশাপাশি থাকতে হয়। সরোজিনী নতুন জীবনের সম্ভাবনা হলেও তার নিজের অনুভূতি গল্পে সমান জায়গা পায় না; এই অসম উপস্থিতি পাঠের অংশ। সামাজিক প্রত্যাশা চরিত্রকে সিদ্ধান্তে বাধ্য করে, আবার সেই সিদ্ধান্তের কাছে মনের অপ্রস্তুতি স্পষ্ট হয়। অন্তর্মুখী গল্প বাহ্যিক বিশ্ব ছাড়িয়ে কোথাও ভেসে নেই। তার ভাষায় পেশাগত অনিশ্চয়তা, বিবাহের সামাজিক ব্যবস্থা এবং নারীপুরুষের আলাদা গতিসম্ভাবনা কাজ করে। আত্মসমীক্ষা গভীর হওয়ার কারণও অনেকাংশে এই বাইরের চাপ। নিজেকে বুঝতে গিয়ে মানুষ যে প্রতিষ্ঠানের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছেন, তা ভুলতে পারেন না।
এখানে লেখক ও পাঠকের সম্পর্কও নতুনভাবে গড়ে। গল্পটি হিমাংশুর কষ্টকে পাঠকের জন্য প্রস্তুত ব্যাখ্যায় শেষ করে না। তিনি ভুল বুঝেছেন কি না, বিয়ের পরে স্মৃতি সত্যিই মুছে যাবে কি না, অরুণা কী অনুভব করেছিলেন, সব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় না। এই অসম্পূর্ণতা পাঠকের কাজ বাড়ায়। পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করবেন, কিন্তু গল্পে নেই এমন নির্দিষ্ট তথ্য বানিয়ে নেওয়ার অধিকার পাবেন না। পাঠপ্রক্রিয়ার এই সতর্ক স্বাধীনতা জীবনানন্দের প্রকরণের অংশ। গল্পটি পাঠককে আকৃষ্ট করতে চায় না, এমন বলা অতিরঞ্জন; বরং সহজ চমকের বদলে গভীর অংশগ্রহণ দাবি করে। স্বচ্ছতা এখানে সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়ে দেওয়া নয়, চিন্তার পথটি যথেষ্ট স্পষ্ট রাখা যাতে পাঠক জটিলতার ভিতরে চলতে পারেন। জীবনানন্দ দাশ, ‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, সপ্তম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২।
গল্পটির বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণকে সংক্ষেপে আত্মকথনের আড়ালে তৃতীয় পুরুষের ব্যবহার বলা যায়, কিন্তু তাতে পুরো রূপ ধরা পড়ে না। নাম পাল্টালে মানুষ কতখানি নিজের কাছে অপরিচিত হতে পারেন, এটিও গল্পের প্রশ্ন। বিনোদ হিমাংশুকে নির্মাণ করে নিজেকে বিশ্লেষণ করতে চাইলে নিজের পক্ষে সওয়াল করার প্রলোভনও থাকে। আবার অন্য নাম ব্যবহারে নিজের সীমা দেখতে সুবিধা হয়। এই দ্বৈত সম্ভাবনা পাঠককে সতর্ক রাখে। বিনোদের হাতেই লেখা, তবু হিমাংশুর অনুভূতি তার বর্তমান বয়সের বিচারকে কখনো অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। গল্পে গল্প লেখার প্রক্রিয়া উপস্থিত থাকায় নিজের জীবনের কাহিনি কে লিখছেন, তার দায় সামনে আসে। জীবনানন্দের প্রকরণে আত্মজৈবনিকতা তখন কেবল উপাদান নয়; জীবনের ঘটনা লিখতে গিয়ে তা কীভাবে বদলে যায়, সেই সচেতন অনুসন্ধান।
এই অনুসন্ধানের সঙ্গে জীবনানন্দের বৃহত্তর গল্পভুবনের যোগ আছে। অন্য অনেক গল্পেও পুরোনো প্রেম বর্তমানকে প্রশ্ন করে, দাম্পত্য ঘরের মধ্যে থেকেও দুজনের দূরত্ব বাড়ে, কিংবা প্রকৃতি এক চরিত্রের কাছে আশ্রয় হয়ে উঠলেও অন্য চরিত্র সেখানে একই অর্থ খুঁজে পান না। কিন্তু একই বিষয় ফিরে এসেছে বলে প্রকরণ একই নয়। কোথাও প্রথম পুরুষ কথকের স্বীকারোক্তি, কোথাও আত্মলিখনের ফ্রেম, কোথাও পরস্পরবিরোধী সংলাপ, কোথাও চিত্রকল্পের ভিতরে স্মৃতির বিস্তার। প্রতিটি রচনায় অন্তর্জগত প্রকাশের নির্দিষ্ট পদ্ধতি আলাদা করে দেখতে হয়। ‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’কে প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হিসেবে পড়া তাই সুবিধাজনক, তবে এটিকে সব গল্পের একমাত্র ছাঁচ ভাবা যাবে না। শিল্পীর অভ্যাস আছে, সেই অভ্যাসের মধ্যে নানা নতুন সিদ্ধান্তও আছে। শৈলীর পরিচয় পুনরাবৃত্ত বিষয় এবং ভিন্ন রচনাপদ্ধতির পারস্পরিক সম্পর্কেই পাওয়া যায়।
পরিশেষে জীবনানন্দের গল্পের গঠনকে বিশৃঙ্খলা ও নিখুঁত পরিকল্পনার দুই প্রান্তের মাঝখানে দেখতে হয়। তাঁর চরিত্রেরা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে পিছনে ফেরেন, মনে মনে অন্যের কথা সাজান, নিজের বর্তমানকে ভবিষ্যতের কল্পনায় বদলে ফেলেন। জীবনের এমন অভিজ্ঞতার জন্য সরল ঘটনার পরপর পাতা ক্রম সব সময় যথেষ্ট নয়। তবু লেখক দৃশ্য বাছেন, কণ্ঠ নির্ধারণ করেন, ফ্রেমে ফিরে আসেন এবং কিছু কথা অনুক্ত রাখেন। এই কাজগুলিই শিল্পের সংযম। কবিতার সংগীত থেকে গদ্যে আসা তাঁর ভাষাকে শক্তি দিয়েছে, কিন্তু গল্পের গড়ন নির্ধারিত হয়েছে মানুষের অসম্পূর্ণ জানার অবস্থাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টায়। বিনোদ ও হিমাংশুর দূরত্ব, অরুণার চিঠি এবং বিয়ের আগমুহূর্তে অনির্ধারিত ভবিষ্যৎ সেই প্রচেষ্টার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। ছোটগল্প এখানে জীবনের সম্পূর্ণ হিসাব নয়; এমন এক সীমিত মুহূর্তের গভীর পাঠ, যার প্রশ্ন শেষ পৃষ্ঠার পরেও থেকে যায়।
শৈলীর বিচারে জীবনানন্দের শব্দ ব্যবহারের আরেকটি দিক হল দৃশ্যমান জিনিসকে সম্পূর্ণ বিমূর্ত ভাবনার অধীন না করা। আলো, পথ, ঘর অথবা মানুষের মুখ কোনো ধারণার প্রস্তুত চিহ্ন হয়ে আসে না। চরিত্র একটি মুখ দেখে অতীত মনে করেন; সেই মুখের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিও রয়ে যায়, স্মৃতিও জাগে। ফলে পাঠক একই সময়ে দৃশ্য এবং চিন্তার দুটি স্তরে থাকতে পারেন। এই দ্বৈততা ভাষাকে ঘন করে। প্রতীক নির্ধারণের তাড়ায় যে কোনো ঘরকে বন্দিত্ব আর যে কোনো খোলা পথকে মুক্তি বলে ফেললে গল্পের বিশেষ পরিস্থিতি হারায়। কোন চরিত্র কোথা থেকে দেখছেন, কোন সময়ে তার মনে কী উঠছে, সেই সম্পর্ক ধরে দৃশ্যের মানে বিচার করতে হয়। ‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’ নামেও কুয়াশাকে শুধু রহস্যের সাজ মনে করলে হবে না; পরিচিত মানুষকে সম্পূর্ণ জানা যায় না বলে যে অস্বস্তি জন্মে, দৃশ্যটির সঙ্গেও তার যোগ আছে। আবার আবহের নিজের স্পর্শযোগ্য অস্তিত্বও আছে। গল্পের গদ্য এই দুই স্তর একসঙ্গে ধরে রাখে।
ছোটগল্পে সমাপ্তি নিয়ে জীবনানন্দের পরীক্ষাও এই গল্প বুঝতে সাহায্য করে। সাধারণভাবে সমাপ্তির কাছে পাঠক কিছু নিষ্পত্তি আশা করেন। চরিত্র কী করলেন, তার সিদ্ধান্তের ফল কী হল, কে জয়ী হল, এমন প্রশ্ন তার অংশ। কিন্তু মানুষ কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েও তার অর্থ নিয়ে পরে বহুদিন ভাবেন। জীবনানন্দ এই পরবর্তী ভাবনার জন্য জায়গা রাখেন। সমাপ্তি তখন ঘটনার সম্পূর্ণ অবসান নয়; পাঠকের কাছে প্রশ্নের নতুন বিন্যাস। বিনোদের ফ্রেমে ফিরে আসা গল্প শেষ করে, কিন্তু হিমাংশুর অতীতের সব ব্যথা অবলুপ্ত হয় না। গল্প লেখা হয়ে গেলেও জীবনের একটি সংস্করণমাত্র লেখা হল; অন্য সংস্করণ সম্ভব। এই বোধ পাঠককে বিমূঢ় করতে পারে, আবার সাহিত্যিক বিশ্বাসও জন্মায়। কারণ জীবনের অনির্ণীত অংশকে লেখক নাটকীয় সমাধানের জন্য জোর করে বদলাননি। সীমিত আখ্যানের ভিতর অনিশ্চয়তাকে জায়গা দেওয়াই শৈলীর সচেতন সিদ্ধান্ত।
একই কারণে গল্পের চরিত্রের বক্তব্যকে সর্বদা লেখকের মত ধরে পড়া উচিত নয়। হিমাংশু অরুণাকে নিয়ে যে কঠোর ধারণায় পৌঁছান, তা তার আহত বর্তমানের অংশ। বিনোদের পরবর্তী স্মরণ সেই ধারণাকে নতুনভাবে সাজায়; পাঠকের কাছে আরও এক দূরত্ব তৈরি হয়। এই ব্যবধান রচনাকে একক উপদেশের বদলে বহুস্বরের পাঠে নিয়ে যায়। যদিও অরুণার নিজস্ব কণ্ঠ তুলনামূলক কম শোনা যায়, তার আচরণ হিমাংশুর প্রত্যাশাকে প্রশ্ন করে। সরোজিনীর উপস্থিতি আবার একটি সম্পর্ক শেষ হওয়ার কাহিনির পাশে আরেকটি সম্পর্কের অনিশ্চিত সূচনা রাখে। মানুষের পরস্পরবিরোধী সম্ভাবনা এইভাবে গল্পে একসঙ্গে আসে। লেখক যদি সব কণ্ঠের উপর দাঁড়িয়ে একজনের বিচারকে চূড়ান্ত বলে দিতেন, পাঠকের বিবেচনার ক্ষেত্র কমে যেত। তিনি অনেক জায়গায় সেই ক্ষেত্র অক্ষুণ্ণ রাখেন। এই রীতিতে চরিত্রের প্রতি মমতা আর চরিত্রের বক্তব্য থেকে সমালোচনামূলক দূরত্ব একই সঙ্গে বজায় রাখা যায়।
তবে জীবনানন্দের গদ্যের সব শিথিলতাকে শিল্পের অমোঘ প্রয়োজনে ব্যাখ্যা করাও সতর্কতার দাবি রাখে। অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিতে অসমাপ্ত বাক্য, পাঠের পুনরাবৃত্তি বা অপরিমার্জিত অংশ থাকতে পারে। কোন গল্পে ছেদ অনুভবের যথার্থ রূপ, আর কোথায় সম্পাদনার সুযোগ ছিল, তা আলাদা করে দেখতে হবে। রচনার ইতিহাস জানা গেলে এই বিচার আরও নির্ভরযোগ্য হয়। কবির খ্যাতি গল্পের প্রতিটি অসংগতিকে অলৌকিক কৌশল বানায় না; সমালোচকের বিরাগও প্রতিটি পরীক্ষাকে লেখার ত্রুটি প্রমাণ করে না। পাণ্ডুলিপির পাঠ, রচনার সময় এবং পুনর্লিখনের সম্ভাবনা বিচার করে গল্পের নির্দিষ্ট অর্জনের কথা বলা যায়। এই সংযম লেখকের প্রতি অসম্মান নয়। জীবনানন্দের ছোটগল্পের মূল্য তাঁর সব লেখাকে নিখুঁত বলা নয়; কিছু গল্পে বাংলা গদ্য অভিজ্ঞতার নতুন আকার পেয়েছে, সেটি নির্দিষ্টভাবে দেখানো।
সমকালীন আধুনিকতাবাদের আলোচনাতেও একই সংযম প্রয়োজন। প্রকাশবাদ, প্রতীকবাদ বা পরাবাস্তবতার মতো পরিভাষা দিয়ে একটি যুগের পরীক্ষা শনাক্ত করা যায়, কিন্তু প্রতিটি চিত্রকল্পকে কোনো ইউরোপীয় আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল বলা যায় না। একই রকম শিল্পসমস্যা ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসরে ভিন্ন পথে জন্মাতে পারে। জীবনানন্দের কাছে মফস্বলের শীত, বাংলার গাছপালা অথবা কলকাতার চাকরির অনিশ্চয়তা নির্দিষ্ট জীবনজগতের অংশ। সেগুলি চিত্রকল্পে ঢুকলে বিদেশি কৌশলের অভিধা দিয়ে তার স্থানীয় অভিজ্ঞতা সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তুলনামূলক সাহিত্যপাঠের লাভ বরং অন্যখানে: কোন ধরনের বর্ণনায় চরিত্রের অজানা মন দৃশ্যমান হয়, কোথায় শহর মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, আর কোথায় স্মৃতি বর্তমানের ক্রম নষ্ট করে, তা আরও সূক্ষ্মভাবে দেখা যায়। যোগসূত্র খুঁজতে গিয়ে প্রমাণহীন প্রভাবের তালিকা না বানালে জীবনানন্দের শিল্পের নিজস্ব গতি বোঝা সহজ হয়।
জীবনানন্দের গদ্যের সুর কেবল বিশেষণের সমাবেশ নয়। বাক্য এগোনোর সময়ে থেমে যাওয়া, কোনো কথা সামান্য পরিবর্তনে ফিরে আসা, বাইরের দৃশ্য থেকে মনে ঢোকা এবং আবার দৃশ্যে ফেরার মধ্যে ছন্দ জন্মায়। গল্পে এই ছন্দ চরিত্রের সময়বোধের সঙ্গে বাঁধা। হিমাংশুর কাছে চিঠির একটি শব্দ দীর্ঘ হয়ে ওঠে, অথচ অরুণার বাস্তব আগমন সংক্ষেপে সেরে যায়। ঘটনাপ্রবাহের এই অসম গতি কাব্যিক ইচ্ছার পাশাপাশি গল্পের মানসিক নির্মাণও। এক মুহূর্তের অনুভব বহু পৃষ্ঠা ধরে চলতে পারে, কারণ সে মুহূর্তে চরিত্র অতীত ও ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে বহন করছেন। গীতলতার ভূমিকা এই জটিল অনুভবকে পাঠযোগ্য ছন্দ দেওয়া। ফলে কবি পরিচয় গল্পে অনুপ্রবেশ করলেও গল্প কবিতার ব্যাখ্যা হয়ে থাকে না। গদ্যের নিজস্ব সময় ও কণ্ঠ তৈরি হয়।
পাঠকের সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে এই শৈলী কঠিন হলেও বন্ধ নয়। চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকও চিঠি পড়েন, আগমনের অপেক্ষা করেন, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ভাবেন। তিনি পুরো ঘটনা জানেন না বলেই নিজের বিচারকে বারবার বদলাতে হয়। সাধারণ পাঠক কেবল সম্পূর্ণ কাহিনি চান, আর পরীক্ষামূলক সাহিত্য পাঠকের কথা ভাবে না, এমন বিভাজন অপ্রয়োজনীয়। জীবনানন্দ একটি ভিন্ন পাঠক্ষমতার উপর আস্থা রাখেন: পাঠক অস্পষ্টতা সত্ত্বেও আবেগের গতি ধরতে পারবেন। সেই আস্থা কখনো ফলপ্রসূ, কখনো রচনা পাঠকে বেশি পরিশ্রমে বাধ্য করে। পাঠের অসুবিধা আছে বলেই শৈলী ব্যর্থ নয়; আবার অসুবিধা থাকলেই শৈলী গভীর, তাও নয়। কোন অংশে ভাষা ভাবনাকে স্পষ্ট করছে এবং কোথায় তাকে অযথা গাঢ় করছে, বিচারটি গল্প অনুযায়ী করতে হবে। এমন বিচারে প্রশংসা ও আপত্তি দুইই যথার্থ ভূমিকা পায়।
জীবনানন্দের গল্পে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার যে প্রবণতা, তাকে নিছক ব্যক্তিগত আত্মমগ্নতা বলা সহজ। কিন্তু নিজের জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে চরিত্র যখন বিবাহ, কাজ, শ্রেণি কিংবা সামাজিক মুখরক্ষার সঙ্গে সংঘাতে পড়েন, তখন আত্মসমীক্ষায় বাইরের পৃথিবীও উপস্থিত থাকে। একা ভাবা মানুষের মনে অন্যদের কণ্ঠ ফিরে আসে; নিজের সিদ্ধান্তের হিসাব সামাজিক নিয়মের ভিতরেই করতে হয়। বিনোদের লিখিত হিমাংশু যতই নিজের প্রেম নিয়ে ভাবুন, বিয়ের প্রস্তুতি এবং অরুণার সামাজিকভাবে স্বাভাবিক আচরণ তার ভাবনার উৎস। মনোজগত ও বহির্জগত তাই একে অন্যের বিকল্প নয়। জীবনানন্দের প্রকরণে বাইরে সামান্য ঘটনা ভিতরে বড় হয়ে ওঠে, আবার ভিতরের ভাবনা বাইরের ঘটনার অর্থ বদলায়। এই যাতায়াত দেখলে তাঁর গল্প সমাজছিন্ন কল্পনার বদলে সময়ের অভিজ্ঞতার একটি তীক্ষ্ণ পাঠ হয়ে ওঠে।
এই দৃষ্টিতে ছোটগল্পের শিল্পমূল্য সম্পর্কে দুটো চরম সিদ্ধান্তই এড়ানো যায়। ঘটনাক্রম প্রচল ছকে বাঁধা নয় বলে তাকে অসম্পূর্ণ বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না; আবার লেখকের কবিখ্যাতি আছে বলে প্রতিটি অস্পষ্টতাকে যুগান্তকারী ঘোষণা করারও দরকার নেই। নির্দিষ্ট গল্পে কী নির্বাচিত হয়েছে, কোন অংশ দীর্ঘ হয়েছে, কী তথ্য অনুক্ত থেকেছে, এ প্রশ্নগুলি থেকেই মূল্যায়ন শুরু করা উচিত। বিনোদের ফ্রেমের ভিতরে হিমাংশুর স্মৃতি স্থান পাওয়ায় পাঠক কেবল একটি প্রেমব্যর্থতা দেখেন না; মানুষ নিজের জীবনের কাহিনি লেখার সময় কীভাবে নিজের কাছেও বদলে যান, তা দেখেন। অরুণার আগমন বাহ্যিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না করেও হিমাংশুর ধারণাকে নাড়া দেয়। সরোজিনী এখনও অনেকখানি অজানা বলেই আসন্ন সংসার নিশ্চিত সমাধানের ছবি হয় না। গল্পের নানা সময় প্রশ্নে মিলিত হয়, অথচ সেই প্রশ্নের শেষ উত্তর নির্ধারিত হয় না। সংযম ও উন্মুক্ততার এমন মেলবন্ধনেই প্রকরণের স্বাতন্ত্র্য।
বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে জীবনানন্দকে তাই কেবল পূর্বসূরির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অথবা একাকী ব্যতিক্রম হিসেবে দেখলে যথেষ্ট হয় না। তিনি সমকালীন রূপান্তরের অংশ, আবার নিজের অভিজ্ঞতার ভাষা খুঁজতে গিয়ে আলাদা পথ নিয়েছেন। তাঁর গল্পে কাহিনির ঘটনাকে ছোট করে মানুষের ভাবনার পথ বড় করা হয়েছে; সময় সরল ক্রম হারিয়ে স্মৃতি ও সম্ভাবনার সঙ্গে মিশেছে; কথকের সীমিত জ্ঞান পাঠককে সতর্ক রেখেছে। কোথাও এই চেষ্টা শিল্পে সিদ্ধ, কোথাও পাঠের প্রশ্ন থেকে যায়। কিন্তু এই অসম অর্জনের মধ্যেই গল্পকারের সত্যিকার পরিচয়। তাঁর গদ্য পাঠককে মানুষ সম্পর্কে প্রস্তুত সিদ্ধান্ত দেয় না; ভাবতে শেখায়, একই ঘটনা নিজের কাছে আর অন্যের কাছে কত আলাদা অর্থ নিতে পারে। সেই পার্থক্যের ভাষা নির্মাণই জীবনানন্দের ছোটগল্পের স্থায়ী এবং স্বতন্ত্র শৈল্পিক অবদান।
জীবনানন্দ দাশের ছোটগল্পে হাসি অনেক সময় উচ্চকণ্ঠ নয়। মানুষ যে কথাটি সহজ আনন্দে বলেন, অন্য কারও কাছে সেটিই হয়ে ওঠে বেদনার কারণ। বাইরে স্বাভাবিক কথোপকথন চলতে থাকে; ভিতরে তার ভিন্ন অর্থ জমে। এই দুই স্তরের ফারাক থেকে যে শ্লেষ জন্মায়, তাকে সরাসরি উপহাস বলা যায় না। পাঠক প্রায়ই একই সঙ্গে দুজনের অবস্থান বুঝতে পারেন। একজন জানেন না তার কথায় অন্যজনের কতটা আঘাত লাগছে; অন্যজন নিজের ক্ষত এমনভাবে অনুভব করেন যে সামান্য উল্লাসও তার কাছে নিষ্ঠুর মনে হয়। ‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’ গল্পে হিমাংশু ও অরুণার সাক্ষাৎ এই সূক্ষ্ম ব্যবধানের একটি দৃষ্টান্ত। আসন্ন বিবাহের আয়োজনে অরুণা আনন্দের সঙ্গে অংশ নিতে চান। হিমাংশু সেই মুহূর্তে পুরোনো প্রেম ও নতুন জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে অস্থির। দৃশ্যের কৌতুক এই দুই অনুভবের পাশাপাশি অবস্থানে, কাউকে সহজে অপরাধী প্রমাণ করায় নয়।
অরুণা তাস খেলা, সঙ্গীদের নিয়ে রাত জাগা এবং জ্যোৎস্না দেখানোর পরিকল্পনায় ব্যস্ত। তার কথায় কয়েকটি ইংরেজি শব্দ আসে, যা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণীদের সামাজিক কথাবার্তার একটি রং তৈরি করে। এই শব্দগুলিকে তার অনুভূতির গভীরতা নেই, এমন সিদ্ধান্তের একমাত্র প্রমাণ করলে চরিত্রটির প্রতি অবিচার হয়। সামাজিক পরিসরে মানুষ আনন্দের ভাষায় কথা বলতে পারেন, অথচ তাদের অন্য অনুভব অপ্রকাশিত থাকতে পারে। তবে হিমাংশুর শ্রবণে শব্দগুলির কাজ আলাদা। তিনি খুঁজছেন অতীত প্রেমের কোনো চিহ্ন, আঘাতের সামান্য প্রকাশ অথবা দ্বিধার আভাস; অরুণার উচ্ছল কথায় সে সব পান না। ফলে একই সংলাপ অরুণার কাছে আনন্দ ভাগ করার উপায়, হিমাংশুর কাছে তাদের দূরত্ব বোঝার যন্ত্র। গল্পের শৈল্পিক শক্তি এই যে লেখক দুই চরিত্র সম্পর্কে দীর্ঘ ব্যাখ্যা বসিয়ে না দিয়ে কথাবার্তার পরিমাণ ও স্বরেই ব্যবধানটি শুনিয়ে দেন। সংলাপ সামাজিক দৃশ্য তৈরি করে, আর সেই দৃশ্যের নীরব অংশে হিমাংশুর একাকিত্ব প্রকাশ পায়।
জ্যোৎস্নার প্রসঙ্গ এই ব্যবধানকে আরও তীক্ষ্ণ করে। বিয়েবাড়ির অতিথির কাছে রাতের আলো আনন্দের উপকরণ; সঙ্গীদের নিয়ে মাঠঘাট দেখার একটি সুযোগ। হিমাংশুর মনে একই আলো অতীত ভালোবাসার হারিয়ে যাওয়া অর্থ, বিয়ের দিনক্ষণ এবং নিজের অস্তিত্বের অনিশ্চয়তার সঙ্গে জড়ায়। কৃষ্ণপক্ষের রাতকে তিনি নিজের নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখতে পারেন, কিন্তু অরুণার কথায় সে ইঙ্গিত নেই। তাই প্রকৃতিকে এই দৃশ্যে একটি নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়া যায় না। চাঁদ একই, দেখার মানুষ দুটি আলাদা সময়ে বাস করছেন। হিমাংশুর বিয়ে সামনে, কিন্তু তার মন এখনও পূর্বপ্রেমের শেষ কথাটি শুনতে চায়। অরুণা বিয়ের সময়সূচিকে আনন্দের পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। এই অমিলকে অরুণার হৃদয়হীনতার নিশ্চিত ঘোষণা বানালে দৃশ্যের জটিলতা কমে যায়; হিমাংশুর আহত দৃষ্টির সত্যটিও তাতে আর যথাযথভাবে বোঝা যায় না। পাঠক একই সঙ্গে তার ব্যথা এবং অরুণার আলাদা জীবন অনুভব করতে পারেন।
চায়ে চুমুক দেওয়ার ক্ষুদ্র ভঙ্গিটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। নাটকীয় দৃশ্যে মানুষ প্রতিবাদ করতে পারতেন, বিয়েবাড়ির আনন্দ ভেঙে নিজের দুঃখ প্রকাশ করতে পারতেন। হিমাংশু তা করেন না। কথার ফাঁকে চা পান করার বাহ্যিক স্বাভাবিকতা তার ভিতরের অস্থিরতাকে আড়াল করে। কোনো একটি সাধারণ শরীরী কাজ এত গভীর ব্যবধানের সংকেত হতে পারে, কারণ সামাজিক নিয়ম মানুষকে নিজের অনুভব ঢাকতে শেখায়। তিনি অরুণার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, সময় জানাচ্ছেন, আলাপ এগোতে দিচ্ছেন; নিজের মনে আবার অন্য প্রশ্ন তুলছেন। এই দ্বৈত ভূমিকা গল্পটির কথনকৌশলের মূল। সংলাপ চলার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক আরেকটি অশ্রুত সংলাপ শুনতে পান। সেখানে হিমাংশু অরুণার উচ্ছ্বাসের অর্থ বিচার করছেন এবং নিজেকেও জিজ্ঞেস করছেন, এমন স্বাভাবিক আচরণ তিনি কেন মেনে নিতে পারছেন না। একটি বিয়েবাড়ির দৃশ্য এইভাবে আত্মসমীক্ষার পরিসরে রূপান্তরিত হয়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, সপ্তম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৫–৭।)
হিমাংশুর ভাবনাকে সরাসরি চেতনাপ্রবাহ নামে চিহ্নিত করার আগে তার নির্মাণটি দেখা দরকার। তিনি আকস্মিকভাবে যা মনে আসে তা শুধু বলে যাচ্ছেন না; অন্যের মুখ, পুরোনো চিঠি এবং বর্তমান আলাপকে বারবার তুলনা করছেন। প্রশ্নের পরে প্রশ্ন আসে, কোনো উত্তর স্থির থাকে না। অরুণার মুখে তিনি যে স্বাভাবিক হাসি দেখেন, সেই হাসি সত্যিই তার অতীতের প্রতি উদাসীনতার প্রমাণ কি না, তা জানতে চান। আবার বাহ্যিক রূপের আকর্ষণ তাকে সম্পর্কের আরও গভীর অর্থ খুঁজতে বাধ্য করে। ভাবনাগুলি ব্যক্তিগত হলেও সম্পূর্ণ অসংলগ্ন নয়। প্রতিটি স্তরে তার একটি কেন্দ্রীয় উদ্বেগ ফিরে আসে: অরুণার কাছে তিনি কতখানি ছিলেন? এই উদ্বেগ কথোপকথনের দৃশ্য থেকে জন্মায়, স্মৃতি তাকে প্রসারিত করে এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংশয় নতুন তাৎপর্য দেয়। মনোজগতের চলনকে গল্পে জায়গা দেওয়ার জন্য লেখক যে নির্বাচন করেছেন, তার রেখা এই পুনরাবৃত্ত প্রশ্নে ধরা পড়ে।
অরুণার সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়া সম্ভব বলেও হিমাংশু মনে করেন। বহুদিনের চিঠিপত্রে যা অস্পষ্ট রয়ে গেছে, সামনে বসে তা স্পষ্ট করা যেতে পারে। কিন্তু গল্প দেখায়, কাছে আসা মানেই দুই মানুষের ভাষা এক হয়ে যাওয়া নয়। অরুণা অন্য প্রসঙ্গে কথা বলছেন; হিমাংশু তার কথার তলায় গোপন অর্থ খুঁজছেন। প্রশ্ন করলেও প্রশ্নটি যে আসল ব্যথার জায়গা ছুঁবে, তার নিশ্চয়তা নেই। নিজের মনে তিনি যে কথোপকথন সাজিয়েছেন, অরুণা সেই কথোপকথনের অংশীদার হতে রাজি কি না, তাও অজানা। এই অজানাই বাস্তব সংলাপ ও অন্তর্কথনের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। বাহ্যিক দৃশ্যে দুটি কণ্ঠ, অন্তর্লোকে একটি কণ্ঠের বহু প্রতিধ্বনি। লেখক তাদের কোনো জোরপূর্বক নিষ্পত্তিতে আনেন না। ফলে পাঠক বোঝেন, মানুষকে সামনে পাওয়া আর তার অনুভূতিতে পৌঁছানো পৃথক অভিজ্ঞতা। হিমাংশুর প্রশ্ন যত বাড়ে, উত্তর পাওয়ার কঠিনতাও তত প্রকট হয়।
এখানে লেখকের শ্লেষ ব্যক্তি অরুণাকে লক্ষ্য করে একরৈখিক আক্রমণ নয়। বরং দৃশ্যের বিন্যাসে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির ফারাক পাঠক অনুভব করেন। হিমাংশু হয়তো চান অরুণা তার বিয়ের দিনেও তাদের পূর্বসম্পর্কের অন্তত কিছু মর্যাদা দেবেন। অরুণা হয়তো সামাজিক সৌজন্যে আগ্রহী, অথবা নিজের মনের জটিলতা প্রকাশ করতে চান না। পাঠক তার অন্তরের পূর্ণ বিবরণ পান না। এই সীমার মধ্যে দাঁড়িয়ে তার ইংরেজি শব্দ কিংবা খেলার আনন্দকে অসংবেদনশীলতার অব্যর্থ দলিল বানানো যায় না। অন্য দিকে হিমাংশুর প্রত্যাশাকে আত্মকরুণার হাস্যকর প্রকাশ বলে সরিয়ে দিলেও গল্পের আঘাত বোঝা যাবে না। শিল্পিত বিদ্রূপটি সেই দুই অসম্পূর্ণ জ্ঞানের মাঝখানে কাজ করে। একজন নিজের উপলক্ষের আনন্দে কথা বলেন, অন্যজন কথাগুলির ভিতর নিজের অনুপস্থিতি শুনতে পান। জীবনানন্দের সংলাপে তাই বহুস্বর আছে; তবে সব কণ্ঠের মনের দরজা পাঠকের জন্য সমানভাবে খোলা নেই।
সংলাপের ভিতরে ভাবনার অন্তর্লীন চলন জীবনানন্দের একাধিক গল্পে ফিরে আসে। মানুষ চায়ের কাপ, খেলার খবর অথবা কাজের তালিকা নিয়ে কথা বলেন; শুনতে থাকা অন্য মানুষটি সেই সামান্য কথার সঙ্গে দীর্ঘ অতীত মিলিয়ে দেখেন। এই পদ্ধতিতে বহির্বাস্তবতা বাদ পড়ে না। বরং তার ছোট অংশগুলি মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব পায়। মনের জগতের সব কথা সরাসরি উচ্চারণ করা হলে দৃশ্যের সংযম ভেঙে যেত; বাইরের ঘটনাই শুধু জানালে অনুভবের বুনন অদৃশ্য থাকত। দুই প্রবাহ পাশাপাশি রাখা মানে তথ্য গোপন করে রহস্য তৈরি করা নয়; বাস্তব সম্পর্কের অসম প্রকাশকে ভাষা দেওয়া। মানুষের মুখে বলা কথা এবং নিজের কাছে স্বীকার করা কথার দূরত্ব গল্পের চরিত্র গঠন করে। কোথাও চরিত্র এই দূরত্ব পেরিয়ে প্রশ্ন করেন, কোথাও কেবল তার ভিতর নীরবে বাস করেন। হিমাংশুর আলাপে দ্বিতীয় প্রবণতাই প্রধান।
গল্পটির পরবর্তী ফ্রেমে বিনোদের প্রত্যাবর্তন এই মুহূর্তগুলিকে আরেক সময়ের আলোয় রাখে। বিয়েবাড়ির হিমাংশুর মনে যে দুঃখ ছিল, সাত বছর পরে বিনোদ তা হুবহু বহন করেন না। বিয়ে হয়েছে, অরুণারও জীবন বদলেছে, পুরোনো প্রেমের আবেগ আগের তীব্রতায় নেই। অথচ অভিজ্ঞতাটি লেখার কারণ শেষ হয়নি। স্মৃতি সরাসরি অতীতকে সংরক্ষণ করে না; বর্তমানের মানুষ তাকে নতুন ভাষায় ফিরে পড়েন। লেখার ভিতরে হিমাংশুর অস্থিরতা জীবন্ত থাকে, লেখার বাইরে বিনোদ বুঝতে চান সেই অস্থিরতার সময়টি তার জীবনে কী অর্থ রেখেছিল। এই দুই স্তর মিলিয়ে গল্পের সমাপ্তি তৈরি। কেবল অরুণার সঙ্গে কথোপকথনের জায়গায় থামলে একটি ব্যর্থপ্রেমের দৃশ্য পাওয়া যেত; বিনোদের ফিরে আসায় সেই দৃশ্য জীবনজুড়ে পরিবর্তনের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। আত্মলিখন গল্পের একটি ঘটনা, একই সঙ্গে গল্পের রূপও।
সাত বছর পরের বিনোদকে সম্পূর্ণ অবিশ্বস্ত কথক বলে ঘোষণা করার আগে দেখতে হয়, তার মনে রাখার সীমা কীভাবে কাজ করছে। তিনি নিজের পুরোনো অবস্থাকে গল্পে সাজিয়েছেন, তাই নির্বাচন ও পরবর্তী বয়সের বিচার জড়াবে। কিন্তু নির্বাচনের উপস্থিতি মিথ্যা বলার প্রমাণ নয়। মানুষ অনেক সত্য মনে রাখেন, তবু সব ঘটনার অর্থ একইভাবে জানেন না। বিনোদের লেখা অতীতের হিমাংশুকে একটি স্বর দেয়; অরুণা কিংবা সরোজিনীর দিক সম্পূর্ণ জানায় না। পাঠক এই অসমতাটি মনে রাখতে পারেন, গল্পকারকে অস্বীকার না করেও। আত্মলিপি ও স্মৃতির গল্পে বিশ্বাসযোগ্যতা সাদা কালোর প্রশ্ন নয়। কোন ঘটনার প্রত্যক্ষ স্মৃতি আছে, কোনখানে অপরের উদ্দেশ্য অনুমান করা হয়েছে এবং বর্তমানের দুঃখ কোথায় অতীতের দৃশ্য বদলে দিয়েছে, এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বিচার্য। বিনোদের দ্বৈত পরিচয় পাঠককে সেই বিচার করতে আহ্বান করে।
শীতের মাঠ ও কুয়াশার চিত্র এই পরিণামে জীবনযাপনের গতির সঙ্গে যুক্ত হয়। মাঠে ফসলের সময় শেষ হলে ভূমি এক ধরনের শান্ত নির্জনতা পায়; তাতে আগের উর্বরতার স্মৃতি থাকে, নতুন ফলনের নিশ্চয়তা থাকে না। বিনোদের প্রেমস্মৃতির অবস্থাও অনেকটা এমন। যে তীব্রতা তাকে একদিন দগ্ধ করেছিল, তা এখন মৃদু স্মরণে ফিরে আসে। এই মৃদুতা গভীরতার অভাব নয়, সময়ের কাজ। কুয়াশার মধ্যে মৃত্যু ভাবতে গেলে ভয় যেমন আছে, তেমনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়ার অনুভবও আছে। তবু উপমা দিয়ে তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যায় না; নতুন প্রেম আসবে না বলে যে অনুমান করেন, পরেই জীবন কী আনবে তা জানেন না। এই উন্মুক্ত প্রশ্ন সমাপ্তির অর্থ। বর্ণনা শেষ, মানুষের জীবনের সম্ভাবনা শেষ নয়। মুক্ত সমাপ্তি এখানে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির অজুহাত নয়; ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চরিত্রের সীমিত জ্ঞানের শিল্পিত স্বীকৃতি।

এই গল্পের সঙ্গে কাছাকাছি সময়ে লেখা ‘উপেক্ষার শীত’, ‘আকাঙ্ক্ষা কামনার বিলাস’ এবং ‘বিবাহিত জীবন’কে একসঙ্গে পড়লে একই পরিস্থিতি নতুন চরিত্রে কীভাবে বদলে যায়, তা বোঝা যায়। চার গল্পে বিয়ে, আগের ভালোবাসা এবং প্রেমিকপ্রেমিকার অসম আবেগ ফিরে আসে। কিন্তু একই প্রশ্নে ফিরে আসা মানে এক গল্পকে অন্যটির অনুলিখন নয়। সংলাপের ভূমিকা, স্মৃতির সময় এবং শেষ দৃশ্যের অর্থ প্রতিটিতে ভিন্ন। একটি গল্পে অতীতকে সাত বছর পরে লিখে দেখা হয়েছে; অন্যটিতে দীর্ঘ কথোপকথন বরফশীতল দূরত্বের কাছে পৌঁছায়; তৃতীয়টিতে আরেক পুরুষের উপস্থিতি সামাজিক কৌতুক বাড়ায়; চতুর্থটিতে বিবাহের পরেও পুরোনো সম্পর্কের বেদনা ভিন্ন ভাবে ফিরে আসে। এদের গুচ্ছ হিসেবে পড়লে লেখকের পরীক্ষার ধারাবাহিকতা বোঝা যায়। স্বতন্ত্র গল্প হিসেবে পড়লে প্রত্যেকটির নিজস্ব সুর শোনা যায়। দুই পাঠই দরকার।
একই বিষয়কে নানা গল্পে ফেরত আনা জীবনানন্দের শিল্পসাধনার একটি বিশেষ দিক। কবিতায় তিনি শব্দ ও চিত্রের বহু পাঠ নিয়ে কাজ করেছেন; গদ্যেও সম্ভবত একটি সম্পর্কের সমস্যাকে ভিন্ন পরিস্থিতিতে রেখে দেখতে আগ্রহী ছিলেন। তবে প্রতিটি গল্পকে আগের গল্পের খসড়া বা সংশোধিত সংস্করণ বললে রচনার নিজস্বতা হারায়। যদি অরুণা অন্যভাবে কথা বলতেন, যদি শরদিন্দুর কাছে অরুর ভূমিকা বদলাত, যদি প্রমথের কাছে তৃতীয় পুরুষ এসে বসতেন, যদি অজিত বিবাহের পরে সতীকে দেখতেন, তবে কীভাবে সম্পর্কের অর্থ বদলাত, গল্পগুলি সেই সব সম্ভাবনা অনুসন্ধান করে। সাহিত্যিক পরীক্ষা এখানে পরীক্ষাগারের নিরাবেগ পুনরাবৃত্তি নয়। প্রতিবার চরিত্রের স্বর বদলায়, তাই পুরোনো প্রশ্ন নতুন ব্যথা বা কৌতুক পায়। তুলনা করতে গিয়ে এই স্বরের সূক্ষ্ম পার্থক্য শুনতে হয়।
‘উপেক্ষার শীত’ গল্পের অরু এবং শরদিন্দুর কথাবার্তা আরও প্রত্যক্ষ ভাবনার লড়াই। শরদিন্দু জানতে চান ভালোবাসায় ঈর্ষা, আঘাত, আকাঙ্ক্ষা এবং অধিকার হারানোর ভয় কতখানি থাকে। অরুর আচরণে তিনি সে উত্তাপ খুঁজে পান না। কিন্তু তাকে প্রেমে অক্ষম বলা শরদিন্দুর রায়; অরু নিজের জীবনের সামাজিক নিয়ম এবং অনুভবের প্রকাশে ভিন্ন মানুষ। একটি সম্পর্কের প্রত্যাশা আরেকজন পূরণ না করলে কষ্ট হয়, তবু সে অসম্পূর্ণতা একজনের সমস্ত অস্তিত্বের অভাবের প্রমাণ নয়। গল্পে যে দীর্ঘ তর্ক চলে, তা এই মতভেদের শব্দময় রূপ। ‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’ গল্পে হিমাংশু অনেক কথা মনে বলেন, অরুণা অন্য প্রসঙ্গে থাকেন। এখানে পুরুষ নিজের প্রেমতত্ত্ব সরাসরি প্রেমিকার সামনে রাখেন। ফলে সংলাপ বাহ্যিক বিনিময় হয়েও তার মধ্যে নিজের প্রেমের বৈধতা প্রমাণের উদ্বেগ থাকে।
শরদিন্দুর বক্তব্যের তীব্রতা পাঠককে মুগ্ধ করতে পারে, কিন্তু সেই তীব্রতাই তার সীমা প্রকাশ করে। তিনি ঈর্ষাকে প্রণয়ের গভীরতার লক্ষণ মনে করেন; অরু সেই ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করেন না। কেউ ঈর্ষা করেননি বলে তিনি ভালোবাসেননি, এমন সরল সিদ্ধান্ত চলে না। ভালোবাসার ভিন্ন অনুভব ও ভিন্ন সামাজিক বিপদের কারণে প্রকাশের মাত্রা বদলায়। শরদিন্দুর মনে হয়, অরু তাকে হারানোর আশঙ্কাও বোধ করছেন না; অরুর কাছে শরদিন্দুর বিয়ের বাস্তবতা অন্য পদ্ধতিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এই অসাম্য থেকে শীতের অনুভব। শীত কেবল অরুর অন্তরের নয়, সম্পর্কের দুই পক্ষের মধ্যে বিনিময় ব্যর্থ হওয়ার আবহ। একে প্রাকৃতিক ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে সহজ প্রতীক বানালে মানবিক দ্বিধা কমে যায়। একটি মানুষ নিজের ইচ্ছা বলতে পারেন, অন্যজন সেই ভাষায় উত্তর দিতে পারেন না; গল্প সেই দীর্ঘ নীরবতাকে কথোপকথনের ভিতরেই শোনায়।
গল্পের শেষে শরদিন্দুর মাথা অরুর কাছে আশ্রয় খোঁজে। অরু তাকে সরে যেতে বলেন। ভঙ্গিটি অন্তরঙ্গতার আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত সীমা একসঙ্গে দেখায়। এই সরে যেতে বলা অরুর নিষ্ঠুরতা বলে পড়া সহজ, কিন্তু তার অস্বস্তিকেও সম্মান করতে হবে। শরদিন্দুর জন্য যে স্পর্শ চরম অসহায়তার আশ্রয়, অরুর জন্য তা হয়তো নিজের চাওয়ার বাইরে চলে যাওয়া। সম্পর্কের ভিতরে সম্মতির এই নীরব প্রশ্ন গল্পটিকে আজও জরুরি করে। শরদিন্দুর ব্যথা সত্য, অরুর সীমারেখাও সত্য। জীবনানন্দ এই দুই সত্যকে এক অনিবার্য মীমাংসায় মিলিয়ে দেন না। শেষের শীতলতা একটি পরিণতি, কিন্তু জীবনের স্থায়ী আইন নয়। শরদিন্দু তার আগের প্রণয় অথবা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে যে চিন্তা করেন, তা গল্পের বাইরে অনির্দিষ্ট থাকে। জীবনানন্দ দাশ, ‘উপেক্ষার শীত’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, দ্বাদশ ও শেষ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ১৬৭।
‘আকাঙ্ক্ষা কামনার বিলাস’ গল্পে তৃতীয় একজন মানুষের উপস্থিতি সামাজিক মঞ্চের চেহারা বদলে দেয়। প্রমথ ও কল্যাণীর দীর্ঘ সম্পর্কের জটিলতার মধ্যে শুভেন্দু হাসি, গল্প এবং কথার চটপটিতে জায়গা করে নেন। ত্রিভুজ প্রেমের পরিচিত কাঠামোতে তৃতীয় ব্যক্তিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হয়; এখানে শুভেন্দু সেই ভূমিকায় সরলভাবে স্থির হন না। তার উপস্থিতি প্রমথের নিজের অসহায়তা আরও দৃশ্যমান করে। প্রমথ চাইলে হালকা গল্পে যোগ দিতে পারেন, সামাজিকভাবে চৌকস উত্তর দিতে পারেন। কিন্তু তার বর্তমান আকাঙ্ক্ষা অন্য রকম। তিনি চান কল্যাণী বুঝুন, সম্পর্কের পুরোনো সময় এখনও কতটা চাপ তৈরি করছে। শুভেন্দুর কথায় সেই গভীরতা আসে না, কল্যাণীও সেখানে স্বচ্ছন্দ থাকতে পারেন। ফলে প্রমথ যে কথোপকথন চান, তা শুরু হওয়ার আগেই অন্য কথার ভিড়ে হারায়। গল্পটির কৌতুক সেখানে জন্মায়।
প্রমথ শুভেন্দুকে মনে মনে যে কদর্য তুলনায় দেখেন, তাতে শুভেন্দুর নিরপেক্ষ পরিচয় কম, প্রমথের বিরক্তির তাপ বেশি। অন্যের বাচালতা ব্যথিত মানুষের কাছে অসহনীয় হতে পারে, কিন্তু শুভেন্দু ইচ্ছাকৃতভাবে তার ক্ষতি করছেন কি না, গল্প সব সময় তা জানায় না। শব্দের কর্কশতা প্রমথের অন্তর্জগতের ভাষা। তিনি কল্যাণীর সঙ্গে গভীর যোগাযোগ হারানোর ভয়ে সামাজিক কথাকে আক্রমণ করতে চান। ‘পাঁচালি’ ধরনের তুচ্ছ আলাপের বিপরীতে তিনি সম্পর্কের নির্ণায়ক মুহূর্ত খোঁজেন। কিন্তু যে গভীরতা অন্য মানুষটি একইভাবে চান না, তা কথার তেজে সৃষ্টি হয় না। প্রমথের মনে যতই জট পাকাক, বাইরে শুভেন্দু ও কল্যাণীর সহজ আলাপ চলতে পারে। এখানেও একটি দৃশ্যের ভিতরে দুটি সময়: বর্তমানের সামাজিক উল্লাস, আর বহু বছরের জমে থাকা প্রত্যাশা।
গল্পের শেষ দিকে প্রমথ নীরবে সরে যাওয়ার কথা ভাবেন। এই সরে আসা পরাজয়ের দৃশ্য হতে পারে, আবার অপূর্ণ সম্পর্কের উপর জোর না করার একটি সিদ্ধান্তও হতে পারে। কল্যাণী এবং শুভেন্দু হয়তো লক্ষ্যই করবেন না; প্রমথের ব্যথা তাতে আরও গভীর হয়। কিন্তু তাদের না দেখা থেকে সম্পর্কের সব ইতিহাসের বিচার সম্পন্ন হয় না। সামাজিক দৃশ্যে কে কার উপস্থিতি লক্ষ করেন, আর কে নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে কী ভেবেছিলেন, এই ব্যবধানই তামাশার সূক্ষ্ম স্থান। বিয়েবাড়ির কাজ, তাসের আসর এবং চলমান আলাপের মধ্যে প্রমথের ব্যথা প্রকাশের কোনো উপযুক্ত মঞ্চ নেই। ফলে তার চিন্তার ভাষাই গল্পে প্রধান হয়। এই ভাষার ক্ষোভ, কৌতুক ও আত্মবিদ্রূপ একসঙ্গে পড়তে হয়। শুধু রোমান্টিক বেদনার গল্প বললে শ্লেষ হারায়, শুধু হাস্যরস বললে প্রমথের অপ্রাপ্তির ইতিহাস মুছে যায়। জীবনানন্দ দাশ, ‘আকাঙ্ক্ষা কামনার বিলাস’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৫।
‘বিবাহিত জীবন’ গল্পে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে: বিয়ে আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা হয়ে নেই, তার পরের জীবনও দৃশ্যমান। অজিত, সতী এবং সুপ্রভাকে নিয়ে সম্পর্কের হিসাব এক দিনেই মেটে না। প্রেমে ঈর্ষার প্রত্যাশা, অন্যের বেদনা বোঝার বিলম্ব এবং নিজের নতুন সংসারের দায় আলাদা আলাদা সময়ে আসে। একটি সম্পর্কের অসম্পূর্ণতা আরেক সম্পর্ক শুরু হলেই লোপ পায় না; আবার অতীত প্রেম বর্তমান সংসারের সমস্ত সম্ভাবনা বাতিল করে দেয় না। এই দ্বৈত অবস্থায় অজিতের স্মৃতি কাজ করে। সতীও সময়ের সঙ্গে বদলান। তার জীবনে সন্তানের জন্ম ও মৃত্যু যে শোক আনে, তা পুরোনো প্রেমের মানদণ্ডে মাপা অমানবিক। অজিত বুঝতে পারেন, একসময় যে অনুভবের উত্তর চাইতেন, সতীর বর্তমান জীবন তার বাইরে বিপুল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। প্রেমিকার জীবন প্রেমিকের স্মরণ ছাড়িয়ে গেছে, গল্পের শেষ অংশে এই সত্য বিশেষ গুরুত্ব পায়।
সতীর সন্তানের তিন দিনের জীবন ও মৃত্যুর ঘটনা গল্পে কেবল অজিতকে পরিণত করার যন্ত্র হতে পারে না। এটি সতীর নিজস্ব গভীর শোক। অজিত সেই শোক অনুভব করার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু তার মাপ নিজের পুরোনো কষ্টের সঙ্গে সরল তুলনায় নির্ধারণ করা যায় না। এই উপলব্ধি ‘কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়’ গল্পের হিমাংশুর অবস্থান থেকে এক ধরনের অগ্রগতি মনে হতে পারে: পুরুষটি নারীকে নিজের প্রেমপ্রশ্নের বাইরে দেখতে শেখেন। তবু এই অগ্রগতিকে নিশ্চয়তায় রূপ দিতে সতর্ক হওয়া দরকার। অজিতের দৃষ্টি এখনও গল্পের বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ; সতীর নিজের জীবন আরও বিস্তৃত। পাঠক সেই অদেখা বিস্তার বুঝতে পারলেই গল্পের শেষের কোমলতা গভীর হয়। পুরোনো সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা মানে নতুন আঘাতের মালিকানা দাবি করা নয়। স্মৃতির ভিতরে অজিত সতীকে চিনতেন; বর্তমানের সতীর বেদনা সম্পর্কে তার জানার সীমা আছে।
অজিত ও সুপ্রভার সম্পর্ক গল্পের পরিণতিতে ভবিষ্যতের একটি কার্যকর দিক। অজিত নিজের জীবন নিয়ে এগোচ্ছেন, সতীও তার জীবনের অন্য ব্যথা ও সম্ভাবনার দিকে যাচ্ছেন। তাদের একে অন্যের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুছে যাওয়া দরকার নেই। বরং সময়ের সঙ্গে স্মৃতির দাবি বদলে যায়। একসময় যে সম্পর্কের জন্য ব্যাকুলতা ছিল, পরে তার কথা ভাবলে মমতা থাকতে পারে, কিন্তু আগের মতো প্রত্যক্ষ অধিকার থাকে না। গল্পটি এই কঠিন রূপান্তর দেখায়। চায়ের দোকানে চুরুট জ্বালিয়ে ভাবার দৃশ্য আবার দৈনন্দিনতার মধ্যে গভীর জীবনবোধকে ফিরিয়ে আনে। নাটকীয় বিদায় বা অশ্রুবন্যা নেই; মানুষ সময়ের মধ্যে ধীরে ধীরে বদলে যায়। প্রথম গল্পে চায়ে চুমুক দিয়ে হিমাংশু নিজের আঘাত ঢেকেছিলেন, শেষ গল্পে চায়ের দোকানের অজিত সম্পর্কের দূরত্ব মেনে নেওয়ার দিকে এগোন। দুই দৃশ্যের হুবহু সমতা নেই, তবু সাধারণ অভ্যাসের মধ্যে অন্তর্জগতের পরিবর্তন দেখানোর কৌশল লক্ষণীয়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিবাহিত জীবন’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, সপ্তম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৪৯–৫০।)
চারটি গল্পের শেষ একসঙ্গে পড়লে একই প্রেমতত্ত্বের একক সমাধান পাওয়া যায় না। বিনোদ অতীতকে লিখে তার তীব্রতা থেকে দূরে আসেন, কিন্তু নতুন জীবনের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা পান না। শরদিন্দু অরুর সঙ্গে কথা বলে শীতল দূরত্ব অনুভব করেন; অরুর নিজের সীমারেখা অক্ষুণ্ণ থাকে। প্রমথ ভিড়ের ভিতর নিজের ব্যথা নিয়ে সরে যান, কল্যাণী ও শুভেন্দুর সামাজিক আলাপ থামে না। অজিত সতীর জীবনের বৃহত্তর শোক দেখে নিজের প্রেমস্মৃতির দাবিকে নতুন মাপে বোঝার চেষ্টা করেন। চারটি পরিণতিতে মানুষ আগের অবস্থায় নেই, তবু কোথাও আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত মীমাংসা নেই। এই ভিন্নতা গল্পগুলিকে পৃথক মর্যাদা দেয়। তুলনার মধ্যে একটি বোধের পরিধি বড় হয়; প্রত্যেক গল্পে সেই বোধের বাস্তব আবহ এবং চরিত্রের সিদ্ধান্ত আলাদা। একটি প্রশ্নের একাধিক পাঠ নির্মাণই গুচ্ছপাঠের আসল লাভ।
গুচ্ছের সময়ক্রম নিয়েও সরল অগ্রগতির ধারণা সাবধানে নিতে হবে। পরের গল্পে নারী চরিত্র আগের তুলনায় বেশি অনুভূতিশীল, বা পুরুষ অবধারিতভাবে বেশি পরিণত, এমন রেখা টানা যায় না। শরদিন্দু প্রেমের গভীরতা নিয়ে যত কথা বলেন, অন্যের ভিন্ন অনুভূতি বুঝতে তত অসুবিধা হতে পারে। প্রমথের সামাজিক ব্যর্থতা কৌতুকমিশ্রিত হলেও তার নিজের ব্যথা অস্বীকার করা যায় না। অজিত সতীর বর্তমানের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন, কিন্তু তাতে আগের তিন গল্পের প্রশ্নগুলি বিলুপ্ত হয় না। একই যুগের লেখক একই সমস্যার ভিন্ন সম্ভাবনা পরীক্ষা করছেন, এই বোধে গল্পগুলি পড়লে পুনরাবৃত্তির মধ্যে সৃজনশীল পার্থক্য দেখা যায়। লেখকের জীবনের ক্রমানুগ মানসিক বিকাশের সরাসরি দলিল হিসেবে গল্পের ক্রম ব্যবহার করা উচিত নয়। সৃষ্ট চরিত্রের অনুভব শিল্পের বিষয়, লেখকের দিনলিপির তারিখের সরল অনুবাদ নয়।
প্রকরণেও চার গল্পের সাম্য এবং তফাত পাশাপাশি থাকে। কোথাও একটি কথকের লেখা ভিন্ন নামের জীবনকে আবৃত করে; কোথাও দুজনের দীর্ঘ সরাসরি কথা গুরুত্বপূর্ণ; কোথাও তৃতীয় চরিত্রের হালকা আলাপ প্রধান সম্পর্কের সংকট উন্মোচন করে; কোথাও সময়ের ব্যবধান ছোটগল্পের পরিণতিতে নীরবে বিরাট পরিবর্তন আনে। সূচনায় চরিত্রের পূর্ণ জীবনী দেওয়া হয় না। একটি চলমান পরিস্থিতির মধ্যে পাঠক প্রবেশ করেন, পুরোনো ঘটনা কথার প্রয়োজনে জানেন। তবু গল্পগুলি কেবল মধ্য থেকে শুরু বলেই একই নয়। কোন তথ্য কখন ফিরে আসে এবং কোন মুহূর্তে চরিত্র সেই তথ্যের নতুন অর্থ করেন, তার বাছাই স্বতন্ত্র। ঘটনাকে ছোট ছোট দৃশ্যে ভাগ করার মধ্যে কোলাজের সাদৃশ্য দেখা যেতে পারে, কিন্তু দৃশ্যগুলি কোনো যান্ত্রিক ছবির টুকরো নয়; তাদের যোগ গড়ে উঠছে আবেগ, প্রশ্ন এবং সময়ের পুনরাগমনে।
কখনো এই শিল্পকৌশল বোঝাতে চিত্রকলার বিন্দুবিন্যাসের উপমা ব্যবহার করা হয়। ছোট দৃশ্যগুলি আলাদা দাগের মতো থাকে, পাঠক দূরত্ব থেকে তাদের যোগে একটি বৃহত্তর অনুভব ধরেন। উপমাটি সহায়ক, তবে শব্দ ও সময়ের শিল্পকে ছবির সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না। একটি গল্পে পাঠক বাক্যের পর বাক্য পড়ে আগে জানা কথার মানে বদলান; ছবিতে একই সঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা অন্য ধরনের। তাই খণ্ডাংশের সমবায় বোঝাতে উপমা কাজে লাগে, কিন্তু গল্পের নিজস্ব ক্রম, সংলাপের বিলম্ব এবং স্মৃতির পুনরুদ্ধারও পৃথকভাবে দেখতে হবে। জীবনানন্দের শৈলীতে খণ্ডিত চেহারার নিচে প্রশ্নের একটি দীর্ঘ স্রোত আছে। দৃশ্যগুলি সেই স্রোতে অর্থ পায়। এক চরিত্রের ব্যথা অন্যের হাসির পাশে রাখলে যে তামাশা জন্মায়, তা ভাঙা ছবির টুকরো মাত্র নয়; সময়মতো দুটি কণ্ঠ শোনানোর গল্পকারের সচেতন সিদ্ধান্ত।
শব্দ বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও চার গল্প আলাদা। অরুণার সামাজিক ইংরেজি মেশানো উচ্ছ্বাস এবং হিমাংশুর দীর্ঘ আত্মপ্রশ্ন ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ পায়। শরদিন্দুর তর্কে প্রেমের সংজ্ঞা, অধিকার ও ঈর্ষার কথাগুলি তীক্ষ্ণভাবে ফিরে আসে। প্রমথের অন্তর্গত বিরক্তিতে শব্দের রুক্ষতা এবং অন্যের কথাকে ছোট করে দেখার ঝোঁক আছে। অজিতের শেষ পর্যবেক্ষণে আঘাতের ভাষা কমে, নিরুত্তাপ মমতা বাড়ে। এই পরিবর্তনগুলি চরিত্রকে শুধু কী বলছেন, তা দিয়ে নয়, কীভাবে বলছেন, তা দিয়েও চেনায়। কোনো নির্দিষ্ট শব্দকে লেখকের স্থায়ী মত ধরে নেওয়ার আগে বক্তা এবং মুহূর্ত চিনতে হবে। প্রমথের ব্যঙ্গ তার আহত মন থেকে আসে; শুভেন্দুর কথার স্বচ্ছন্দতা তার সামাজিক অবস্থানের অংশ। অরুণার হাসি হয়তো আনন্দ, হিমাংশুর কাছে তার অর্থ প্রত্যাখ্যান। ভাষার বহুস্বরেই গল্পগুলির বিচিত্র চরিত্র ফুটে ওঠে।
কথনের এই বহুস্বর চরিত্রের শ্রেণি ও পরিবেশ থেকেও বিচ্ছিন্ন নয়। বিয়েবাড়িতে সময় কাটানোর সুযোগ, তাসের আসর, কলেজে থাকা সঙ্গীদের সঙ্গে প্রকৃতি দেখার ইচ্ছা, ভবিষ্যতের পেশা ও বিয়ের ব্যবস্থা, এসব একটি বিশেষ মধ্যবিত্ত জগতের চিহ্ন। তার ভিতরে নারীর স্বাধীন চলাফেরার পরিসর যেমন আছে, সামাজিক প্রত্যাশার সীমাও আছে। হিমাংশু নিজের আবেগ নিয়ে দীর্ঘ ভাবতে পারেন; অরুণা আনন্দে অংশ নিতে চাইলে তাকে স্বাভাবিক বলে পড়া হয়, আবার পুরোনো প্রেমিকের ব্যথা না বুঝলে নির্দয় বলে বিচার করা হয়। শরদিন্দু অরুর ঈর্ষা চান, কিন্তু অরুর পরিস্থিতি তার কথার স্বাধীনতাকে কতখানি সীমিত করে, তা গল্পের আলোচনায় প্রশ্ন করা দরকার। প্রমথ অন্য পুরুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলে কল্যাণীর নিজের মত কতটা শোনা যায়, সেটিও জরুরি। সমাজ কেবল চরিত্রের বাইরে চাপ নয়; তাদের প্রেমের ভাষাও সে তৈরি করে।
আত্মজৈবনিক পাঠের প্রশ্নে এই সামাজিক মাত্রা বিশেষ সতর্কতা দাবি করে। কোনো লেখকের প্রেম, বিবাহ কিংবা কর্মজীবনের পরিচিত তথ্য গল্পের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখলে অনুসন্ধানের সূত্র পাওয়া যায়। কিন্তু গল্পের হিমাংশু, শরদিন্দু, প্রমথ বা অজিতকে একজন ব্যক্তির চার নামে উপস্থিতি হিসেবে ধরলে তাদের গড়নের পার্থক্য নষ্ট হয়। কল্পনার কাজে লেখক নিজের অভিজ্ঞতা বদলে অন্যের জীবন নির্মাণ করতে পারেন। তিনি স্বীকারও করতে পারেন, সংশোধনও করতে পারেন, নিজের থেকে দূরেও যেতে পারেন। বিয়েবাড়ির পরিস্থিতি চারবার ফিরে এসেছে বলে কোনো একটি গোপন ঘটনার চারটি নির্ভুল প্রতিবেদন পাওয়া গেল, এমন নয়। বরং একটি মানসিক সমস্যাকে বারবার নতুন শিল্পরূপে পরীক্ষা করার প্রমাণ মেলে। আত্মজীবনের সম্ভাব্য যোগ চিনে রেখেও গল্পের প্রত্যক্ষ ঘটনা, কথকের সীমা ও চরিত্রের স্বতন্ত্র কণ্ঠে আস্থা রাখা উচিত।
সমাপ্তির মুক্ততা সম্পর্কে আরেকটি প্রশ্ন এখানে জরুরি। গল্পের শেষে ভবিষ্যৎ অনির্দিষ্ট আছে বলেই লেখক জানতেন না কী লিখবেন, এমন ভাবা যায় না। বিনোদের পরিণামের পরও নতুন প্রেম সম্ভব কি না অজানা; তবু সাত বছরের ব্যবধান নিয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত পরিকল্পিত। শরদিন্দু অরুর কক্ষ ছাড়ার মুখে থাকেন; সেই থেমে থাকা দৃশ্য সম্পর্কে পাঠকের ভাবনা চালু থাকে। প্রমথ সরে গেলে আলাপ চলতে থাকে, ফলে ব্যক্তির ব্যথা সামাজিক আয়োজনের অবসান ঘটায় না। অজিত ও সতী একে অন্যের চোখের জল মুছবেন না জেনে নিজেদের জীবনের দিকে যান। এই চার ধরনের শেষেই নির্বাচিত মুহূর্ত আছে। লেখক যেখানে থামেন, সেখানে প্রশ্নের বিশেষ ভার জমে; অনন্ত ঘটনাপ্রবাহকে গল্পের বাইরে রাখার মধ্যেই সংক্ষিপ্ত রূপের শক্তি। মুক্ত সমাপ্তি তাই অসীম বিস্তৃত বর্ণনার নাম নয়, কোথায় থামলে জীবন অবশিষ্ট থাকবে, সেই বিচারের নাম।
এই গল্পগুলির পুরুষদের ভেতরের একটানা বিশ্লেষণ পাঠকের সহমর্মিতা সহজে টানে। অরুণা, অরু, কল্যাণী অথবা সতীর জগৎ তুলনায় অনেক সময় আংশিক। এই অসম জ্ঞান প্রকরণের অংশ হিসেবেও পড়তে হয়। যে চরিত্রকে কেন্দ্র করে বর্ণনা চলছে, তার ধারণা বেশি জানা স্বাভাবিক; কিন্তু সেই জ্ঞানের কারণে অন্যের স্বাধীন অভিজ্ঞতা নেই বলে ধরে নেওয়া ভুল। অরুণার জ্যোৎস্না দেখার আনন্দ হিমাংশুর ব্যথার বাইরেও বাস্তব। অরুর স্পর্শের সীমা শরদিন্দুর অসহায়তার বাইরেও অর্থবান। কল্যাণী ও শুভেন্দুর আলাপ প্রমথের অনিশ্চয়তার সঙ্গে একেবারে অভিন্ন নয়। সতীর মাতৃত্বের শোক অজিতের স্মরণে স্থান পেলেও তার নিজের। পাঠক এই পৃথক অবস্থানগুলি মনে রাখলে পুরুষচেতনার ভিতর দিয়ে রচিত গল্পেও মানুষের বহু জীবনের ইঙ্গিত দেখতে পান। জীবনানন্দের শৈলীকে একক আত্মমগ্নতার বদলে অসমভাবে দৃশ্যমান বহু কণ্ঠের বিন্যাস বলা তখন সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত চারটি গল্পে ‘তামাশা’ শব্দটি মানুষের দুঃখকে ছোট করার জন্য নয়, দুঃখের সঙ্গে সমাজের স্বাভাবিক চলনের অসম যোগ বোঝাতে ব্যবহার করা যায়। হিমাংশু ভাবছেন প্রেমের মৃত্যু, অরুণা ভাবছেন রাতের আনন্দ। শরদিন্দু প্রণয়ের উত্তাপ চান, অরু নিজের সীমা জানান। প্রমথ জীবনের নির্ণায়ক আলাপ খুঁজছেন, শুভেন্দু কথার আসর জমাচ্ছেন। অজিত অতীতের প্রেম মনে করেন, সতী নিজের বর্তমান শোক নিয়ে থাকেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রে পৃথক মানুষ আলাদা অভিজ্ঞতা নিয়ে একই সময়ে উপস্থিত। কেউ কারও জীবনের সম্পূর্ণ কেন্দ্র হতে পারেন না, এই সত্য বেদনাদায়ক; আবার এই কারণেই প্রত্যেকের জীবনের স্বাধীন অর্থ আছে। জীবনানন্দ সংঘাতের মঞ্চ না সাজিয়ে সেই পাশাপাশি চলার শব্দ শোনান। পাঠকের কাজ কার হৃদয় একমাত্র সত্য, তা ঘোষণা করা নয়; দুটি ভিন্ন সময় ও কণ্ঠ এক দৃশ্যে এসে কেমন নতুন অর্থ সৃষ্টি করে, তা অনুধাবন করা।
বিনোদের গল্পলেখার দৃশ্য এই গুচ্ছপাঠের শেষে আবার মনে পড়ে। একজন মানুষ নিজের অতীতকে লিখছেন, অথচ লেখা শেষ করেও বলতে পারেন আরও ঘটনা যোগ করা যেত। কোন ঘটনাটি জরুরি, তার বিচার তাই কেবল সংখ্যায় হয় না। যে কয়েকটি মুহূর্ত তার জীবনের সিদ্ধান্তকে স্পষ্ট করে, তিনি সেগুলিই বেছে রাখেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হওয়া মানে জীবন নিঃশেষ বোঝা নয়। হিমাংশু ও অরুণার জ্যোৎস্না নিয়ে আলাপ, চায়ের বিরতি এবং অন্তরের প্রশ্ন পড়ে পাঠক জানেন, অরুণার সমস্ত জীবন এখানে নেই। সাত বছর পরে বিনোদও নিজের জীবন সম্পূর্ণ বলেন না। গল্পের ফ্রেম নির্বাচিত অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে, অজানা জীবনকে বাইরে রাখে। এই বাছাইয়ে সাহিত্যিক সত্য তৈরি হয়, ইতিহাসের পূর্ণ দলিল নয়। লেখার অতিরিক্ত ঘটনাগুলি বাদ যাওয়া কখনো কাহিনির দুর্বলতা নয়; যদি বাদ দেওয়া অংশের আভাসও পাঠকে জীবনের বিস্তার অনুভব করায়, সংক্ষিপ্ততা তখন শিল্পের শক্তি।
শরদিন্দুর গল্পে লেখার এমন ফ্রেম নেই, কিন্তু নিজেকে বোঝানোর দীর্ঘ প্রচেষ্টা আছে। তিনি প্রেম কী হওয়া উচিত বলে যত কথা বলেন, তার ভিতর নিজের অনিশ্চয়তাও প্রকাশিত হয়। সংজ্ঞা নির্মাণ অনেক সময় হারাতে বসা সম্পর্ককে ধরে রাখার চেষ্টা। কথার দ্বারা তিনি অরুর মধ্যে আকাঙ্ক্ষা জাগাতে চান; এ চেষ্টা ব্যর্থ হলে শব্দগুলি তার নিজের হৃদয়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকে। এদিকে অরুর উত্তর সংক্ষিপ্ত হতে পারে, কিন্তু সংক্ষিপ্ততা অনুভবের শূন্যতা নয়। সবাই সমান দীর্ঘ ভাষায় নিজের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারেন না, করার ইচ্ছাও সবার থাকে না। গল্পের কথাবার্তায় তাই পরিমাণের অসমতা আছে। যিনি বেশি বলেন, পাঠক তার ভিতরের জগত বেশি জানেন; যিনি থামেন, তাকে সেই থামার ভিতর থেকেই পড়তে হয়। জীবনানন্দের কথনরীতির জটিলতা কথার সঙ্গে নীরবতার অনুপাতেও। দুই চরিত্রের মতভেদ তর্কের শেষে মেটেনি বলে আখ্যান ব্যর্থ হয় না; অন্যের মনের সীমানা কথার মধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রমথের গল্পে নীরবতা ভিন্ন ধরনের। তার চারপাশে কথা কম নয়, বরং অতিরিক্ত কথা। শুভেন্দু এবং কল্যাণীর সহজ আলাপ তার নিজের প্রয়োজনীয় কথার জন্য স্থান রেখে দেয় না। সামাজিক জীবনে আলাপের দখল একটি বাস্তব শক্তি। যে ব্যক্তি সঠিক সময়ে হাসতে পারেন, কথায় সবাইকে ধরে রাখতে পারেন, তিনি সভার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রমথের মনে তীব্র অনুভব থাকলেও প্রকাশের সামাজিক দক্ষতা সেই অনুভবের সমান নয়। তিনি অন্যের কথাকে ভাঁড়ামি ভাবেন, কিন্তু নিজের কথাটি শুরু করার সময় ও রূপ খুঁজে পান না। গল্পে তাই নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি নয়; শব্দপূর্ণ পরিবেশে নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলা। এই অবস্থা চরিত্রের প্রতি করুণা জাগায়, আবার তার ক্ষুব্ধ অন্যদর্শনের সীমাও দেখায়। শুভেন্দুকে ছোট করে ভাবলেই কল্যাণীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ফিরে আসে না। পুরোনো ভালোবাসার প্রতি নিজের বিশ্বস্ততা অন্যের বর্তমান ইচ্ছার নিশ্চয়তা দেয় না।
অজিতের গল্পে বয়স ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তন অনুভূতির তীব্রতা কমায়, কিন্তু নৈতিক প্রশ্ন বাড়ায়। সতী তাকে ভালোবেসেছিলেন কি না, সেই পুরোনো জিজ্ঞাসার সামনে নতুন জীবনের বড় দুঃখ এসে দাঁড়িয়েছে। একজন শিশুর স্বল্প জীবন এবং মায়ের শোককে পূর্বপ্রেমের ব্যাখ্যার উপাদান বানালে যে নিষ্ঠুরতা জন্মাত, গল্প সেই পথ থেকে সরে আসে। অজিতের স্মরণে নিজের অপূর্ণতা আছে, কিন্তু সতীর ব্যথাকে নিজের ব্যথার অনুকরণ বলে পড়েন না। এখানেই প্রথম তিনটি গল্পের সঙ্গে আলাপ তৈরি হয়। হিমাংশু অরুণার আনন্দের ভিতর নিজের অনুপস্থিতি খুঁজছিলেন; শরদিন্দু অরুর অনুভবে নিজের কাঙ্ক্ষিত জ্বালা খুঁজছিলেন; প্রমথ কল্যাণীর আলাপে নিজের অগ্রাহ্য অবস্থান দেখছিলেন। অজিতের সামনে সতীর এমন শোক আসে, যার কেন্দ্র তিনি নন। এই অস্বস্তিকর সত্য গ্রহণের সম্ভাবনা শেষ গল্পটির আবেগকে আলাদা করে।
তবু চারটি গল্পের পারস্পরিক সম্পর্ককে পুরুষের শিক্ষা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে, এমন রূপকথা বানানো উচিত নয়। বিনোদের পরের জীবনেও অসন্তোষ আছে; শরদিন্দুর কথায় কৃত্রিমতার আশঙ্কা ও সত্য আবেগ পাশাপাশি; প্রমথের আত্মজিজ্ঞাসা অন্যকে অসমভাবে বিচার করতে পারে; অজিতের মমতাতেও সতীর অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। গুচ্ছের ঐক্য পরিণতির অভিন্নতায় নয়, একটি কঠিন প্রশ্নের পুনরাগমনে: ভালোবাসা কি অন্য মানুষের জীবনকে নিজের প্রত্যাশা থেকে পৃথক করে দেখতে পারে? প্রত্যেকে ভিন্ন মাত্রায় এই প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কেউ কথায়, কেউ নীরবতায়, কেউ বহুদিনের ব্যবধানে উত্তর খোঁজেন। উত্তর অস্পষ্ট থাকলেও প্রশ্ন গভীর হয়। একই নির্মাণসমস্যার চারটি স্বতন্ত্র অনুসন্ধান হিসেবে রচনাগুলি পড়লে তুলনা যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনি একটি গল্পকে অন্যটির প্রস্তুত সিদ্ধান্তের অধীন করা লাগে না।
চিত্রকল্পের পুনরাবির্ভাবেও একই সতর্কতা। কুয়াশা ও শীত একাধিক গল্পে এলে তাদের প্রতিবার একই মানে ধরতে হবে না। বিনোদের শীতের মাঠ অতীত প্রেমের তীব্রতা স্তিমিত হওয়ার অনুভব বহন করে; শরদিন্দুর শীত জীবন্ত কথোপকথনের মাঝেও সাড়া না পাওয়ার অস্বস্তি। প্রমথের দৃশ্যে প্রকৃতি অপেক্ষাকৃত কম, সামাজিক আসরের আওয়াজ বেশি; অজিতের শেষ চায়ের দোকানও অন্য রকম দৈনন্দিনতার স্থান। দৃশ্যগুলি অভিন্ন গল্পের আলাদা পোশাক নয়। পরিবেশের সঙ্গে চরিত্রের বোধের সম্পর্ক বদলায় বলেই প্রতিটি পরিণতি আলাদা অনুভূত হয়। একটি প্রকৃতি চিত্র সব সময় মুক্তির চিহ্ন, একটি ঘর সব সময় বন্দিত্বের সংকেত, এ রকম স্থির অভিধান জীবনানন্দের গল্পের কাজে লাগে না। তিনি দৃশ্যকে চরিত্রের উপলব্ধির সঙ্গে মিলিয়ে চলমান রাখেন; পুনরাবৃত্ত উপাদানও নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ পায়।
পাঠকের সামনে এই গল্পগুলি যে প্রশ্ন রেখে যায়, তার অংশ হল গল্প বলার ক্ষমতা। বিনোদ নিজের অতীত লিখতে পারেন; হিমাংশুর বেদনাও সেই লেখায় দীর্ঘ স্থান পায়। অরুণার পক্ষের পূর্ণ গল্প কে লিখবেন, তা অনির্ধারিত। শরদিন্দু অরুকে প্রেমের পাঠ বোঝাতে চান; অরু নিজের ভাষায় কতখানি বলতে পারেন, সেই অসমতা পাঠে ধরা পড়ে। প্রমথের ভিতরের ক্ষোভ জানি, শুভেন্দু ও কল্যাণীর আলাপের আড়ালের সম্ভাব্য অর্থ কম জানি। অজিতের স্মৃতিতে সতীর শোক আসে, কিন্তু শোকের অন্তর্গত মাতৃকণ্ঠ সীমিত। এই অসমতা কেবল যুগের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতিফলন বলে থামা যায় না; গল্পের নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ কী দেখায় ও কী দেখায় না, তা বিচার করা দরকার। লেখক পাঠককে পুরুষচেতনার কাছে নিয়ে যান, পাঠক সেখান থেকেই অন্য মানুষের অনুক্ত উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।
গল্পের সৌন্দর্য এখানে সব মানুষকে সমান পরিমাণে কথা বলানোর মধ্যে নয়; অসম শোনা কথার মধ্যে নতুন প্রশ্ন ওঠার সুযোগে। তবু যে কণ্ঠ কম শোনা যায়, তাকে প্রেমহীন বা নির্বুদ্ধি বলে দ্রুত চিহ্নিত করলে পাঠকের স্বাধীন ভাবনার পথ বন্ধ হয়। অরুণা আনন্দে কথা বলার অধিকার রাখেন, হিমাংশুও তাতে আহত হওয়ার বাস্তবতা রাখেন। অরু স্পর্শ থেকে সরে যেতে পারেন, শরদিন্দুও সেই প্রত্যাখ্যানকে গভীর দুঃখ হিসেবে অনুভব করতে পারেন। কল্যাণী অন্যের সঙ্গে আলাপে থাকতে পারেন, প্রমথও সেখানে নিজের অপ্রয়োজনীয়তা টের পান। সতী সন্তানের জন্য শোক করেন, অজিত বুঝতে পারেন তার পুরোনো প্রেম আর তার বর্তমানের একমাত্র কেন্দ্র নয়। গল্পের তামাশা এবং ট্রাজেডি দুইই এই পারস্পরিক অথচ অসম অভিজ্ঞতার ভিতর জন্ম নেয়। কাউকে সম্পূর্ণ ভুল বা ঠিক না করে ঘটনাটিকে একাধিক মানুষ কীভাবে বাঁচছেন, তা দেখা এই শিল্পরীতির যোগ্য পাঠ।
জীবনানন্দের ছোটগল্প তাই ঘটনার অভাবের জন্য দীর্ঘশ্বাস নয়। ঘটনাকে তিনি মানুষের বোধের উপযুক্ত মাপে স্থাপন করেন। কখনো একটি শব্দ, কখনো চায়ের কাপ, কখনো বিয়েবাড়ির খেলাধুলা, কখনো দীর্ঘদিন পরে একটি শোক, সবই আখ্যানকে বহন করতে পারে। বাহ্যিক ঘটনার পরিমাণ কম হলেও তার মানসিক অভিঘাত বিরাট হতে পারে; বড় ঘটনা ঘটলেও গল্প তা সংক্ষেপে জানিয়ে মানুষের ভিতরের পরিবর্তনের দিকে যায়। চারটি গল্পে বিয়ে রয়েছে, কিন্তু বিয়েই সব গল্পের চূড়ান্ত কেন্দ্র নয়। সম্পর্কের অর্থ কে কীভাবে চিনছেন, সময় সেই অর্থ বদলাচ্ছে কি না, অন্যের স্বাধীনতাকে জায়গা দেওয়া যাচ্ছে কি না, তা মুখ্য। যে গল্পে তামাশা আসে, সেখানেও মানুষের ব্যথা চাপা পড়ে না; যে গল্পে ব্যথা আসে, সেখানেও কথার কৌতুক ও দৈনন্দিন ভঙ্গি হারায় না। এই সহাবস্থানেই তাঁর শৈলীর জৈব শক্তি।
এই চার গল্পের সংযোগ তাই রচনাকালের কাছাকাছি অবস্থানের চেয়েও বড়। এদের প্রত্যেকটিতে চরিত্র নিজের অনুভবের সত্য নিয়ে দৃঢ় হতে চান, অথচ অন্য মানুষের অনুভব সম্পূর্ণভাবে তার নাগালে আসে না। লেখক এই অপূর্ণ জানাকে কথনরীতির অংশ করেন। সংলাপের ফাঁক, মনে মনে ফিরে আসা প্রশ্ন এবং শেষ দৃশ্যের পরে থেকে যাওয়া জীবন একসঙ্গে গল্পের আকার তৈরি করে। এই আকারে পাঠকের কাজ প্রস্তুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়, দুই কণ্ঠের ব্যবধান শুনে নিজের বিচার সতর্ক রাখা। সেই সতর্কতার মধ্যেই জীবনানন্দের গল্পের শ্লেষ কোমলতা পায়, স্মৃতি পায় সময়ের গভীরতা এবং অসমাপ্ত সম্পর্কও সাহিত্যিক পূর্ণতা অর্জন করে।
গল্পগুলি শেষ হয়; মানুষগুলির চিন্তা, স্মরণ এবং পৃথক ভবিষ্যৎ পাঠকের মনে আরও অনেকক্ষণ নীরবে অবিরাম চলতে থাকে।
ছোটগল্পকে একটি নির্দিষ্ট বিশুদ্ধ আঙ্গিকের মধ্যে আটকে রাখা কঠিন। তার দৈর্ঘ্য সীমিত হলেও জীবন দেখার উপায় বিচিত্র: কখনো নাটকের কথোপকথন, কখনো কবিতার সংকেত, কখনো চলচ্চিত্রের খণ্ডদৃশ্য কিংবা ব্যক্তিগত নোটের স্বগতভাষণ একই রচনায় জায়গা পায়। এদের উপস্থিতি মাত্রেই গল্প শিল্পসমৃদ্ধ হয় না; কোন উপাদান কী কাজ করছে, সেটিই প্রধান প্রশ্ন। জীবনানন্দ দাশের ‘ছায়ানট’ এবং ‘বিস্ময়’ এই প্রশ্নের দুটি আলাদা উত্তর খুঁজেছে। প্রথম গল্পে অসুস্থ এক কথকের অভিজ্ঞতা কয়েকটি অনিশ্চিত দৃশ্য, বিরতি ও সংক্ষিপ্ত কথায় গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় গল্পে ব্যর্থ ঔপন্যাসিক সুবোধের শহরভ্রমণ বাস্তব দৃশ্য থেকে স্মৃতি ও কল্পনার বিস্তারে পৌঁছায়। দুটির ভাষা কবিতার কাছাকাছি যেতে পারে; তবু চরিত্র, ঘটনা এবং জানার সীমা তাদের গল্প হিসেবেই স্বতন্ত্র রাখে। গীতলতা এখানে কাহিনির বিকল্প নয়। যে অভিজ্ঞতা সরল ঘটনার ক্রমে ধরা পড়ে না, তার জন্য ভাষাকে অন্যভাবে সাজানোর প্রয়োজন থেকেই গল্পগুলোর শৈলী জন্মেছে।
‘ছায়ানট’ পড়ার আগে সেটিকে শুধু কল্লোল যুগের দেহবিষয়ক সাহস অথবা কবির সংক্ষিপ্ত গদ্যের নিদর্শন ধরে নিলে পাঠ সংকুচিত হয়। সমকালীন সাহিত্যের রুচির সঙ্গে রচনাটির যোগ আছে, আবার কথকের অসুস্থতা, রেবার অবস্থান এবং অনির্ধারিত সম্পর্কের নিজস্ব সমস্যা আছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র গল্পের নতুনত্বের সঙ্গে তার পদক্ষেপের অনিশ্চয়তাও লক্ষ করেছিলেন। এই দ্বিধা অর্থবহ: যিনি সম্পূর্ণ কাহিনি আশা করেন, তার কাছে বিরতি ও অনুক্তির আধিক্য অসম্পূর্ণ লাগতে পারে; যিনি অসুস্থ কথকের বিচ্ছিন্ন উপলব্ধি অনুসরণ করেন, তার কাছে একই বিচ্ছিন্নতা যথাযথ রূপও পেতে পারে। সুবিনয় মুস্তাফি বলার ভঙ্গিতে গল্পের শক্তি খুঁজেছিলেন বলে তাঁর পাঠ অন্য দিকটি উন্মোচন করে। দুই মূল্যায়নকে পরস্পরের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে একটি বাতিল করা দরকার নেই। কোথায় খণ্ডিত বাক্য অনুভবকে স্পষ্ট করে আর কোথায় পাঠকের কাছে ঘটনাসূত্র অস্পষ্ট রাখে, দৃশ্য ধরে সেই বিচার করলেই মতভেদের তাৎপর্য বোঝা যায়।
প্রথম পুরুষের কথক শুরুতেই বাইরের আকাশের সঙ্গে ঘরের ভেতরের জীবনের একটি ব্যবধান টের পান। কিন্তু এই ব্যবধানের সুনির্দিষ্ট কারণ তিনি প্রথমেই জানিয়ে দেন না। পাঠক তার অনুভব শুনতে শুনতে জানতে চেষ্টা করেন, ঘরে ফেরা কেন এমন কঠিন। আকাশ ও আলো বৃহৎ পরিসরের দৃশ্য, ঘর নৈকট্যের স্থান; তবু দৃশ্যের সাধারণ অভিধান ধরে আকাশকে মুক্তি আর ঘরকে বন্দিত্ব বললে কথকের অবস্থার সূক্ষ্মতা কমে যায়। খোলা আলোও তাকে চমকে দেয়, যেন দীর্ঘ রুদ্ধতার পরে বিস্তার সহ্য করা সহজ নয়। ঘরেও তিনি স্বস্তি পান না। এই দ্বৈত অস্বস্তি গল্পের প্রথম শক্তি। মানুষ নিজের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে যেতে চাইতে পারেন, অথচ বেরোনোর সম্ভাবনাও তাকে ভয় দেখাতে পারে। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন কথায় জীবনানন্দ সেই দ্বিধার আবহ তৈরি করেন। ব্যাখ্যা পরে আসুক বা না আসুক, অনুভবটি সূচনাতেই উপস্থিত।
গল্পের ছোট বাক্য ও ছেদচিহ্ন এই সূচনায় চোখে পড়ে। বিরতির জায়গায় কথক যেন একটি অনুভব বলে থামেন, পরের কথায় আগেরটির পূর্ণ ব্যাখ্যা দেন না। ফলে পাঠককে উচ্চারিত শব্দের পাশাপাশি না বলা অংশও বুঝতে হয়। তবে প্রতিটি ড্যাশ বা বিন্দুচিহ্নকে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতীক ভাবার প্রয়োজন নেই। কথোপকথন থামা, অসুস্থ মানুষের শ্বাসের ছন্দ, অস্বস্তিতে বাক্য ভেঙে যাওয়া অথবা স্মরণে ফাঁক পড়া, সবকিছুরই সম্ভাবনা আছে। চিহ্নগুলি রচনার মধ্যে কীভাবে কাজ করছে, তা আশপাশের দৃশ্য দেখে বুঝতে হয়। এই গল্পে কথকের জানা তথ্য সীমিতভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছায়; তার ভিতরের অনিশ্চয়তা ভাষার অসম গতিতে প্রতিফলিত। তাই বাক্যসংক্ষেপকে নিছক দক্ষতা লুকোনোর চেষ্টা কিংবা বিশুদ্ধ কাব্যিক অলংকার বললে রচনার মানবিক অবস্থাটি হারায়। ভাষার রূপ কথকের দেখার ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।
আঙুর মাড়িয়ে মদ তৈরি কিংবা মাটি চিরে ফসল ফলানোর ছবি গল্পে নির্মাণ ও আঘাতের দ্বৈত অনুভব আনে। কিছু পেতে গেলে অন্য কিছুর রূপ বদলাতে হয়, কখনো তাকে ক্ষতিগ্রস্তও করতে হয়। এই ভাবনা কথকের নিজের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে মেলানো যায়। কিন্তু একটি উপমা থেকে তার চরিত্রকে নিশ্চিত কোনো মনোরোগের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। মানুষের মনে সহিংস চিন্তা আসতে পারে; সাহিত্য সেই চিন্তার নৈতিক ও মানসিক প্রশ্ন তুলতে পারে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অব্যর্থ নির্ণয় দেয় না। কথক নিজের পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অন্যের কী হারিয়ে যায়, সে প্রশ্ন নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন বলেও দৃশ্যটি পড়া যায়। যিনি আঙুর থেকে স্বাদ পান, আঙুরের দিকটি তিনি অনুভব করতে চান কি না, সেই বিরতি তাকে একরৈখিক নিষ্ঠুর মানুষ হওয়া থেকে সরায়। রেবার সঙ্গে সম্পর্কেও নিজের স্বস্তি এবং অন্যের জীবনক্ষয়ের প্রশ্ন এভাবে পাশাপাশি আসে।
রেবা কথকের মাথা টিপে দেন। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি পরিচর্যা, কিন্তু কথকের কাছে যত্ন গ্রহণও অস্বস্তিকর। মানুষ অনেক সময় অপরের সময় ও শ্রম নিতে নিতে ঋণী বোধ করেন; কখনো বুঝতে পারেন, অপরের দেওয়া যত্ন সম্পর্কের সত্যিকারের নৈকট্য নয়। কথকের মনে নিজের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা জাগে। এই শব্দ অর্থের জগত থেকে এসেছে, কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার আলাদা কাজ: এক জন নিজেকে যত খরচ করেন, অন্যজন তত বেশি নিজের অক্ষমতা টের পেতে পারেন। রেবা যত্ন করছেন বলেই তিনি নিশ্চয়ই ভালোবাসেন, এমন নিশ্চয়তা নেই; আবার যত্নে প্রেমের অভাব আছে বলেই তা অভিনয়, তাও বলা যায় না। কথক যে থামতে বলেন, রেবা কিছুক্ষণ পরে ওঠেন, দুজনের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র অসামঞ্জস্য প্রকাশ পায়। সাধারণ গৃহস্থ দৃশ্যের মধ্যে সেই অসম্পূর্ণ বোঝাপড়াই গল্পের বড় সংকটের প্রস্তুতি।
রেবার চাবির রিং ঘোরানোর ভঙ্গি দৃশ্যটিকে আরও স্পষ্ট করে। কথক রেবার মুক্তির নিশ্বাস কল্পনা করতে পারেন; নিজেরও স্বস্তি বোধ হয়। কিন্তু রেবা সত্যিই কী ভাবছিলেন, তার পুরো খবর কথকের কাছে নেই। প্রথম পুরুষের বিবরণে এই সীমা মনে রাখা জরুরি। তিনি যে ক্লান্তি পড়ছেন, তা হয়তো যথার্থ; আবার নিজের অস্বস্তি দিয়েও অন্যের শরীরের ভাষা ব্যাখ্যা করতে পারেন। জীবনানন্দ পাঠককে কথকের একান্ত কাছে নিয়ে যান, কিন্তু রেবাকে সেই কথকের ধারণার মধ্যে পুরোপুরি আটকে রাখেন না। চাবি বন্ধ ঘরের সংকেত হতে পারে, গৃহস্থ কাজের নিত্য উপকরণও হতে পারে। কোন অর্থে চিত্রটি কাজ করছে, তা পরবর্তী সম্পর্কের দ্বিধা থেকে বোঝা যায়। এখানে একটি বস্তুর উপস্থিতি দৃশ্যমান, তার প্রতীকী সম্ভাবনাও খোলা। ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ত পরিসরে এমন বস্তুর সাহায্যে চরিত্রের অনুক্ত টানাপড়েন টিকে থাকে।
মাসিমার কথায় কথক ও রেবার একসঙ্গে থাকা সম্পর্কে সামাজিক সংশয় প্রকাশ পায়। তাদের সম্পর্কের নাম কী হবে, তার উত্তর সমাজের প্রতিষ্ঠিত রীতি খোঁজে। এক ছাদের নিচে থাকা, পাশের ঘরে রাত কাটানো, অথচ আনুষ্ঠানিক বিবাহ না হওয়া, বাইরে থেকে এই ঘটনাগুলি শঙ্কা ও কৌতূহল জন্মায়। মাসিমার কথ্যভাষা সেই সামাজিক দৃষ্টি নিয়ে আসে। গল্প কেবল অসুস্থ কথকের বিমূর্ত মনের ভিতর আবদ্ধ নয়; অন্য মানুষ তার ঘর সম্পর্কে কথা বলেন, বিয়ের বিধি স্মরণ করান, সম্পর্কের নাম দাবি করেন। কথক সব কথা মনে রাখতে বা বলতে চান না। তার বর্ণনায় ফাঁক থাকে, কিন্তু ফাঁকের জন্য বাইরের চাপ অদৃশ্য হয় না। বরং সমাজের সরব ভাষা এবং কথকের স্তব্ধ প্রতিক্রিয়া পাশাপাশি এসে সংঘাত তৈরি করে। কোনো দীর্ঘ বিবাহবিতর্ক না লিখেও জীবনানন্দ পাঠককে বুঝিয়ে দেন, রেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যদের উদ্বেগ আছে এবং কথকের অনীহা তার সঙ্গে জড়িত।
এই দৃশ্যের কথ্যভঙ্গি গল্পের অন্য অংশের গীতল বাক্যের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হয়। মাসিমা যখন প্রচল রীতির ভাষায় কথা বলেন, তার বক্তব্য স্পষ্ট ও চাপসৃষ্টিকারী। কথক নিজের অভিজ্ঞতা বলার সময় অনেক বেশি থেমে যান। দুটি ভাষার মধ্যে শুধু শিক্ষার পার্থক্য নয়, সম্পর্কের ভিন্ন দাবি কাজ করে। বাইরে থেকে দেখলে সমাধান সহজ: বিয়ের ব্যবস্থা হোক, সামাজিক পরিচয় নির্ধারিত হোক। ভিতর থেকে কথকের কাছে প্রশ্নটি অন্য: যে মানুষটির সঙ্গে তিনি বাস করছেন, তাকে কি এমন বন্ধনে আনতে চান যেখানে উভয়ের আকাঙ্ক্ষা অমিল? সামাজিক সমাধান এবং ব্যক্তিগত অনিশ্চয়তার ফারাক গদ্যের দুই স্বরে ধরা পড়ে। রেবার নিজের বক্তব্য এই পর্বে সীমিত বলে তাকে কেবল দুই পক্ষের টানাটানির বস্তু ভাবার বিপদও আছে। পাঠক তাই জিজ্ঞেস করতে পারেন, সম্পর্কের নাম সম্পর্কে রেবা নিজে কী চান? গল্প প্রশ্নটি সম্পূর্ণ উত্তর না দিয়েই রেখে যায়।
কবির আগমন এবং পরে ডাক্তারের উপস্থিতি গল্পের ঘটনাকে হঠাৎ নতুন পথে ঘুরিয়ে দেয়। কেউ বিস্তৃত পরিচয়ে প্রবেশ করেন না; কথকের দৃষ্টি যতখানি জানায়, পাঠক ততখানি পান। এই অনিয়মিত প্রবেশকে দুর্বল চরিত্রায়ণ বলে চিহ্নিত করা যায়, যদি সব চরিত্রের পূর্ণ জীবনকথা আশা করা হয়। কিন্তু কথকের অসুস্থ, বিচ্ছিন্ন চেতনার কাছে মানুষগুলি এমনই আসেন: কেউ কথা বলেন, কেউ বারবার আসেন, কারও উপস্থিতিতে রেবার আচরণ বদলায়। চরিত্রের স্বল্প পরিচয় তখন কথনের নির্বাচনের অংশ। অবশ্য এই নির্বাচনের সীমাও আছে। রেবা ও ডাক্তার সম্পর্কে পাঠক কথকের দৃষ্টির বাইরে খুব কম জানেন। সেই সীমা স্বীকার করেই রেবার পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে হবে। ডাক্তারের আগমন গল্পের কেন্দ্রের দিকে পথ খুললেও তিনি অপরের জীবনে কী নিয়ে আসছেন, তার পূর্ণ নিশ্চয়তা গল্প দেয় না। এই অনির্ধারিত অবস্থায় কথকের ব্যথা এবং রেবার নতুন সম্ভাবনা একসঙ্গে থাকে।
ফাটা পেয়ালা ও পিরিচের মতো দৈনন্দিন বস্তু এই পর্বে দেখার উপযুক্ত। কাপের ফাটলকে সরাসরি ঘরের ভাঙনের একমাত্র প্রতীক ধরে নেওয়া সহজ; কিন্তু তা প্রথমে ব্যবহৃত একটি জিনিস, যার ক্ষয় চোখে পড়ছে। গল্পে সম্পর্কও ব্যবহৃত হতে হতে ক্লান্ত হয়েছে কি না, এই প্রশ্ন তার পাশে এসে দাঁড়ায়। বস্তুটি রূপক হতে পারে কারণ ঘরের ভিতরেই আছে, কথকের নজরে আসে এবং অন্য দৃশ্যের সঙ্গে ভাবগত সাদৃশ্য গড়ে। জীবনানন্দ প্রত্যেক উপকরণের অর্থ ঘোষণা করেন না। পাঠক একটি ফাটল দেখে, তারপর কথক ও রেবার অসম সান্নিধ্য মনে করেন। এই সংযোগ পাঠের কাজ। বর্ণনার সংযমে বস্তুটির স্পর্শযোগ্যতা বজায় থাকে, ইঙ্গিতের পথও খোলা থাকে। রচনার শৈল্পিক গুণ এই যে প্রতীক সম্ভাব্য হলেও দৃশ্যের বাস্তবতা নষ্ট হয় না।
ডাক্তার ও রেবার অন্তরঙ্গতার সময় কথক শব্দ শোনেন, তারপর নীরবতা অনুভব করেন। সরাসরি শারীরিক দৃশ্যের দীর্ঘ বর্ণনা নেই; শ্রবণ, অপেক্ষা এবং ঘরের ঠান্ডা হয়ে আসা দিয়ে ঘটনার উপস্থিতি তৈরি। এই নির্বাচনকে চলচ্চিত্রের সম্পাদনার সঙ্গে তুলনা করা যায়, কিন্তু রচনা আসলে ভাষাতেই কাজ করছে। কয়েকটি বাক্যের ব্যবধানে যে সময় বাদ পড়েছে, পাঠক তা অনুমান করেন। ঘরের নীরবতা ঘটনার পরে কথকের নিঃসঙ্গতার মাত্রা বাড়ায়। এখানে শব্দের মতো নিঃশব্দও বর্ণনার উপকরণ। তবে রেবা ও ডাক্তারের অভিজ্ঞতা কথক যা শুনেছেন, তার চেয়ে বিস্তৃত হতে পারে; তাকে শুধু শোনা শব্দে নামিয়ে আনা উচিত নয়। প্রথম পুরুষের দৃশ্য এই সীমা নিয়ে সত্য। শোনা ও না দেখা মিলিয়ে তার ভিতর প্রত্যাখ্যান, কৌতূহল এবং অন্যের জীবনের প্রতি বিস্ময় জন্মায়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘ছায়ানট’, সুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফি সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, ১৩৭৯, পৃ. ৩৭–৪২)
কথক ঘটনাটিকে সুন্দর বলবেন না বীভৎস, তা নিয়ে থামেন। এই প্রশ্ন তার ভিতরের নৈতিক অভ্যাস এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সংঘর্ষ। তিনি রেবাকে নিজের কাছে বেঁধে রাখতে পারছেন না; অন্য সম্পর্কের দিকে তার ঝোঁক দেখে ব্যথিতও হতে পারেন। তবু রেবার মুখে প্রাণের নতুন দীপ্তি অনুভব করেন। প্রশ্ন থেকে আশ্বাসে পৌঁছানোর এই গতি একরৈখিক বিজয় নয়। অন্যের মুক্তিতে নিজের অপ্রাপ্তি মানার কঠিন কাজ এর মধ্যে আছে। রেবা সেই মুহূর্তে নিজের জীবনে কী ভবিষ্যৎ দেখছেন, আমরা জানি না। কথক যা পান, তা তার দৃষ্টির পরিবর্তন: যে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ঘরকে সংকীর্ণ করেছিল, তার বাইরে জীবন চলতে পারে। এই উপলব্ধি আবার আকাশ ও আলোর সূচনার সঙ্গে যোগ গড়ে। শুরুতে আকাশ তার কাছে ভীতিকর বিস্তার, শেষে একই বিস্তার নতুন সাহসের সম্ভাবনা। দৃশ্য বদলেছে, কথকের দেখার ক্ষমতাও বদলেছে।
তবু গল্পের শেষে রেবা কথকের সামনে এসে আবার চলে যান। এই আসা ও যাওয়ার মধ্যে স্থায়ী সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নেই। কথকের আশ্বাসকে রেবার ভবিষ্যৎ সুখের অব্যর্থ প্রমাণ ভাবলে সমাপ্তির অনিশ্চয়তা নষ্ট হয়। তিনি আলো দেখেছেন, কিন্তু আলোয় বাস করার নিয়ম এখনও নির্ধারিত নয়। গল্প এই সীমিত উন্মেষেই থামে। পাঠক জানেন, সামাজিক প্রশ্ন রয়ে গেছে, অসুস্থ মানুষটির দৈনন্দিন জীবনও চলবে, রেবার নিজের সিদ্ধান্তও সামনে আছে। কোনো বিয়ে, বিদায় অথবা নতুন সংসারের পূর্ণ বিবরণ দিয়ে জীবনানন্দ দৃশ্যটির তীব্রতা ছড়িয়ে দেন না। নির্দিষ্ট এক মুহূর্তে কথকের নৈতিক ও অনুভূতিগত অবস্থান বদলেছে, গল্পের পরিসরে সেটুকুই যথেষ্ট। ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ততা এখানে ঘটনা বাদ দেওয়ার আরাম নয়; জীবনের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা থেকে একটি আলোকিত ক্ষণকে বেছে নেওয়ার শিল্প।
‘ছায়ানট’ নামটি সুরের প্রত্যাশা জাগায়। সংগীতের রাগের সঙ্গে নামের যোগ আছে বলে গল্পের প্রত্যেক চরিত্রকে নির্দিষ্ট স্বর কিংবা প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সুরতাত্ত্বিক পর্যায় মিলিয়ে দেওয়ার প্রমাণ নেই। তবে নামটি মনে করায়, গল্পের গতি একমাত্র বাহ্যিক ঘটনার পরপর সাজানো নয়। একই আবহ কখনো ফিরে আসে, কখনো পরিবর্তিত হয়: ঘরের অন্ধকার, জানালার আলো, রেবার উপস্থিতি, কথকের প্রশ্ন এবং শেষের উন্মুক্ত আকাশ। এই প্রতিধ্বনিগুলি রচনায় একটি অনুভূতিগত সংহতি আনে। সংগীতের উপমা সেই সংহতি বুঝতে সাহায্য করতে পারে, যদি তাকে বিশ্লেষণের চূড়ান্ত সূত্র বানানো না হয়। কথকের অসুস্থ শরীর, মাসিমার সমাজদৃষ্টি এবং রেবার অজানা আকাঙ্ক্ষা নামের মৃদু সুরের বাইরেও কঠিন বাস্তব। শিরোনামের সৌন্দর্য সেই বাস্তব মুছে দেয় না; পাঠককে ঘটনা ও আবহ দুই দিকেই মন দিতে বলে।
গল্পে সময়ের চলনও এই আবহের অংশ। রাতে চাঁদের আলো পড়ে, অন্য সময়ে অতিথিরা আসেন, আবার কথকের স্মরণে এক ঘটনার সঙ্গে আরেক ঘটনার দূরত্ব সংকুচিত হয়। কত দিন পেরিয়েছে তার নিখুঁত হিসাব নেই বলে সময় একেবারে নিশ্চল নয়। রেবার পরিচর্যা, কবির উপস্থিতি, ডাক্তারের বারবার আসা এবং পরিণামের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত একটি ক্রম সৃষ্টি করে; শুধু ঘড়ির মাপে সেই ক্রমের গুরুত্ব ধরা পড়ে না। অসুস্থ কথকের জন্য অপেক্ষার একটি সন্ধ্যা দীর্ঘ হতে পারে, একাধিক সাক্ষাৎ স্মৃতিতে পাশাপাশি এসে যেতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ সময়কে গল্প ব্যবহার করেছে। পাঠক পরিস্থিতির পরিবর্তন ধরেন, কিন্তু প্রতিটি দিনের তারিখ জানতে হয় না। সুতরাং বৃত্তের সময় ভেঙে যাওয়া মানে ঘটনার কোনো পূর্বাপর নেই, এমন নয়। মন যে ঘটনাকে কতখানি সময় দেয়, সেই অনুপাতেই গল্পের সময় প্রসারিত ও সংকুচিত হয়।
কথকের ভিতরে একটি অপরসত্তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব আছে বলে পড়া সম্ভব, তবে সেই দ্বন্দ্বকে একটি নির্দিষ্ট মনোবৈজ্ঞানিক সূত্রে বেঁধে ফেললে বর্ণনার বহুস্তর কমে যায়। তিনি রেবার যত্ন চান, আবার সেই যত্নে ঋণী হতে চান না। আকাশের আকর্ষণ আছে, বিস্তারে ভয়ও পান। ডাক্তারের কাছে রেবার যাওয়া আঘাত করতে পারে, তবু রেবার দীপ্তি তাকে আশা দেয়। এই বিরোধগুলি মানুষের অভিজ্ঞতার পরিচিত অংশ; এগুলোকে অবচেতনের একক নাট্যপাত্রে নামিয়ে আনার দরকার নেই। আত্মসংলাপের শক্তি এই যে কথক নিজের পূর্বনির্ধারিত রায়কেও প্রশ্ন করতে পারেন। এক মুহূর্তে যা বীভৎস মনে হচ্ছে, অন্য মুহূর্তে তা নতুন জীবনবোধের উৎস হতে পারে। গল্পের পরিবর্তন ঘটেছে সেই পুনর্বিচারের মধ্যে। কথকের অনুভূতি যত দ্বিধাময়, তার ভাষা তত বেশি বিরতি, প্রশ্ন ও স্বল্প ঘোষণায় গঠিত।
‘বিস্ময়’ গল্পে বাস্তব ও মনোজগতের যাতায়াত অন্য ধরনের বিস্তার পায়। এখানে সুবোধের শহরভ্রমণ, প্রকাশে ব্যর্থ উপন্যাস এবং সতী ও তারাপদের দাম্পত্যজীবন একই অনুভবের ভিন্ন দিক খুলে দেয়। দুটি কাহিনির যোগকে আগে থেকে নির্ধারিত কোনো গোপন পরিচয়ের রহস্য ভাবলে রচনার স্বভাব বোঝা যায় না। সুবোধ সতীকে কীভাবে জানেন, তাদের অতীতে কী ঘটেছিল, এমন প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর গল্প না দিলে কল্পনা দিয়ে পূরণ করা উচিত নয়। বরং আপাত দূরের জীবনগুলি একই শহরের একাকিত্ব, অসফল আকাঙ্ক্ষা এবং অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার ইচ্ছায় কীভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, তা দেখা দরকার। জীবনানন্দ এক কাহিনির ঘটনাকে অন্য কাহিনির সমাপ্তির সরঞ্জাম বানান না। পাশাপাশি চলার মধ্যে একটি অনুভূতির যোগ তৈরি হয়। এই কৌশলে কাহিনি এক সোজা পথে এগোনোর বদলে আলাদা পথের মধ্যকার দূরত্ব পাঠককে অনুভব করায়।
সুবোধের উপন্যাস প্রকাশিত না হওয়া তার আত্মবোধে আঘাত করে। সাহিত্যসাধনা কেবল অবসরের কাজ নয়; লেখক হিসেবে নিজেকে যে জগতে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, প্রকাশের ব্যর্থতায় সেই জগত অনিশ্চিত হয়। রাতের রাস্তায় হাঁটা তখন পালানোর কাজও হতে পারে, আবার নতুন করে নিজের অবস্থান ভাবার পথও। কলকাতার নগরচিত্র তার কাছে একই সঙ্গে পরিচিত ও অপরিচিত। রাস্তা, ঘড়ি, আলো এবং ভবনের দূরত্ব বাস্তব জিনিস; বিষণ্ন মানুষ সেই জিনিসের মধ্য দিয়েই নিজের ব্যর্থতা পড়েন। ফলে শহরকে নিছক অন্তর্জগতের পটভূমি বলা যায় না। কাজ, বই প্রকাশের ব্যবস্থা, রাতের নিরাপত্তা এবং মানুষে মানুষে দূরত্ব সবই শহরের বাস্তব গঠন। মনোজগত সেই গঠনের উপর কাজ করে, তাকে পুরোপুরি বাতিল করে না। সুবোধের পদচারণায় বাইরের কলকাতা ও ভিতরের অস্থিরতা একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়।
হাঁটার সময় সুবোধের পা যেন নিজে নিজে চলতে থাকে, মন যেন অন্য কোথাও ঘুমিয়ে থাকে। বর্ণনাটিকে সরাসরি অলৌকিক ঘটনা ভাবলে ভুল হবে; তা একটি বিভক্ত অনুভবের ভাষা। ব্যর্থতা ও ক্লান্তিতে মানুষ কখনো শরীরের চলন টের পান, অথচ মন তাতে পুরো অংশ নিচ্ছে বলে মনে হয় না। চলমান ট্রেনের সঙ্গে পায়ের তুলনা যান্ত্রিক গতি প্রকাশ করে, অন্ধকারের পথের শেষও অনিশ্চিত থাকে। অন্যদিকে মাকড়সার অবিরাম চলা একাকী শ্রমের অনুভূতি আনে। এই দুই ছবির যোগে সুবোধের নিজেকে চালাতে থাকা অথচ কোথায় পৌঁছাবেন না জানার মানসিক অবস্থা গড়ে ওঠে। ছবি দুটি অপরিচিত বলে পরাবাস্তবতার প্রস্তুত লেবেল দিলে তাদের স্থানীয় কাজ ঢাকা পড়ে। বিশেষণ ও উপমা পাঠককে শরীরী ক্লান্তি অনুভব করায়; একাধিক বস্তুর গুণ মিলে সুবোধের উদ্বেগের রূপ তৈরি করে। জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩০।
কোনো একটি বাড়ির উপরতলা থেকে তাকে ডাকা হচ্ছে বলে সুবোধের মনে হয়। থেমে তাকিয়ে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন না ডাকটি তার জন্য ছিল কি না। এই দৃশ্যটি গল্পের বিস্ময়ের প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে। অবাস্তব দৃশ্যের নির্ভুল সাক্ষ্য নেই; আছে একাকী মানুষের সাড়া পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং অনিশ্চিত শ্রবণ। অপরিচিত ডাক হয়তো অন্য কারও জন্য, হয়তো আদৌ কেউ ডাকেননি। তিনটি সম্ভাবনা থাকায় অভিজ্ঞতার মূল্য কমে না। মানুষের মন প্রত্যাশার কারণে শব্দকে নিজের দিকে আসতে শুনতে পারে। সেই ভুলে আকাঙ্ক্ষার সত্য প্রকাশিত হয়। সুবোধের পাশে দাঁড়িয়ে পাঠকও বাড়ির দিকে তাকান, কিন্তু তার হয়ে নিশ্চিত রায় পান না। বাস্তবের দিকটি অক্ষুণ্ণ রেখে মনোবাস্তবতার জন্ম দেওয়ার এটি সংক্ষিপ্ত কৌশল। জানালাটি বাস্তব বাড়ির অংশ, একই সঙ্গে আশ্রয় বা সম্ভাব্য সাক্ষাতের দিকে চোখ তোলার কারণ। জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩১।
জানালার সঙ্গে সুবোধের জীবনে অনেক আগের একটি অনুভব যোগ হয়। শিশু বা তরুণ বয়সে গভীর কষ্টের মুহূর্তে তিনি যেন কারও আশ্বাস শুনতেন। সেই উপস্থিতিকে নারীর রূপে কল্পনা করেছেন, যদিও তার নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। বর্তমানের রাতের ডাকটি তাই নতুন ঘটনার মতোই পুরোনো স্মৃতির প্রতিধ্বনি। কথক যদি বলতেন কোনো অদৃশ্য নারী নিশ্চয়ই তাকে ডাকছেন, গল্প অলৌকিক প্রমাণের পথে চলে যেত; যদি বলতেন সবই ভুল, সুবোধের অনুভবের গভীরতা কমে যেত। মাঝের অনির্ণীত স্থানেই বর্ণনার শক্তি। মানুষ অল্পবয়স থেকে যে সান্ত্বনার কণ্ঠ কল্পনা করেন, কঠিন সময়ে তার দিকে ফিরে যেতে পারেন। সেই কল্পিত কণ্ঠ বাস্তব মানুষের অভাব জানায়, আবার বেঁচে থাকার মানসিক শক্তিও হতে পারে। গল্প আশ্বাসটির উৎস নির্ধারণ করে না; সুবোধের জীবনে তার দীর্ঘ উপস্থিতি বোঝায়।
কলেজের দিকে তাকিয়ে সুবোধ নিজের সম্ভাবনার সময় মনে করেন। একসময় পড়াশোনার শেষে যে পৃথিবী উন্মুক্ত মনে হয়েছিল, বর্তমানের ব্যর্থতা তাকে অন্যভাবে ভাবতে শেখায়। জীবনের আগের উজ্জ্বলতার সঙ্গে এখনকার অন্ধকারের তুলনায় বিশেষণ ও দৃশ্যের ঘন সমাবেশ আসে। সমুদ্র, পাখি অথবা বাদুড়ের ছবি কেবল সুন্দরের বিপরীতে কুৎসিতকে বসায় না; গতিরও বদল দেখায়। একসময় আকাশে অবাধ চলার বিশ্বাস ছিল, পরে অস্পষ্ট ডালে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা অনুভূতি এসেছে। এই অনুভব সুবোধের বর্তমান বিচার, তার আগের জীবনের নির্ভুল নথি নয়। ব্যর্থতার মুহূর্তে মানুষ অতীতকে অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে করতে পারেন। বর্ণনার শৈলী সেই পরিবর্তিত স্মৃতির সঙ্গে চলে। ফলে রূপক বিশ্লেষণে চরিত্রের কল্পনা ও ঘটনার ইতিহাস পৃথক রাখা দরকার। সুবোধের মনে যে দিনটি সোনালি, সে দিনের বাস্তবেও দুশ্চিন্তা ছিল কি না, পাঠক জানেন না। তার বর্তমান মনই অতীতের রং বেছে নিচ্ছে।
নারীমূর্তির আবির্ভাবে সুবোধের আশ্রয়প্রার্থী মন আরও স্পষ্ট হয়। তিনি বাস্তব নারী দেখেছেন; তাদের জীবন, শরীর এবং নিত্য পরিচয় আছে। কিন্তু গভীর ব্যথায় যাকে কল্পনা করেন, তার পরিচয় অস্পষ্ট এবং সেই অস্পষ্টতাই তাকে বিপুল সম্ভাবনা দেয়। এই তুলনায় বাস্তব নারীদের স্থূল এবং কল্পনার নারীকে বিশুদ্ধ বলে স্থির করলে সুবোধের সীমা অদৃশ্য হয়। বাস্তব মানুষের শরীর আছে বলেই তাদের মনের রহস্য নেই, এমন নয়। কল্পিত নারী তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও কথা বলবেন কি না, সুবোধকে দৈনন্দিন সম্পর্কের শ্রমে অংশ নিতে বলবেন কি না, তা পরীক্ষা হয়নি। ফলে কল্পনার আশ্রয় মানবিক হলেও বাস্তব নারীদের সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত নয়। জীবনানন্দ সুবোধের মুগ্ধ দৃষ্টিকে নান্দনিক ভাষা দেন; পাঠক সেই ভাষার সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার অদেখা অংশও চিনতে পারেন। গভীর একাকিত্ব কখনো মানুষকে সুদূরের মুখ তৈরি করায়, কাছের মানুষকে দেখতে বাধা দেয়।
বাঘিনী, শঙ্খচিল, অন্ধকার এবং দূরের সমুদ্রের যে সব ছবি সুবোধের স্মৃতিতে ভেসে আসে, তাদের একাধিক ইন্দ্রিয় জড়িত। রং দেখতে পাই, গন্ধের উল্লেখ আসে, প্রাণীর চলন কল্পনা করি, সমুদ্রের দূরত্ব অনুভব করি। এই মিলনে গদ্য ঘন হয়। বস্তুর একটি গুণ অন্য বস্তুতে চলে গেলে বাক্য পরিচিত যুক্তির বাইরে নতুন অনুভব তৈরি করতে পারে। তবু ঘন ভাষাকে অর্থশূন্য রহস্য বলা চলে না। কোন মুহূর্তে সুবোধ ব্যথা পাচ্ছেন, কোথায় আশ্রয় চাইছেন, কিসের উপস্থিতিকে ভয় করছেন, সেই আবেগের রেখা ছবিগুলিকে যুক্ত করে। রূপকগুলির একটিমাত্র অভিধানগত মানে নেই, কিন্তু তারা চরিত্রের অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনও নয়। শরীরী আকর্ষণ, বিপদের আভাস এবং দূরে সরে যাওয়ার ইচ্ছা একই দৃশ্যে মিলেছে। পাঠক এই বহুস্বরে সুবোধের সংকট ধরতে পারেন, কোনো নির্দিষ্ট প্রতীকের সমীকরণ দিয়ে নয়। জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩৩।
‘বিস্ময়’ গল্পে সতী ও তারাপদের দাম্পত্যের অংশ সুবোধের স্বপ্নচিত্রকে মাটির কাছে ফিরিয়ে আনে। সম্পর্কের ইতিহাস, সংসারের ক্লান্তি এবং দুজনের পরস্পর সম্পর্কে অসম জানাশোনা সেখানে কাজ করে। সুবোধের অন্তর্জগতে যে অপরিচিত নারীর জন্য অপেক্ষা, অন্য দিকে এক বাস্তব নারী পরিচিত সংসারের ভিতরই অবসাদে আক্রান্ত। এই দুই রেখা পাশাপাশি থাকায় গল্পের তাৎপর্য বাড়ে। এক মানুষকে না পেয়ে সুবোধ রহস্যময় সম্ভাবনা নির্মাণ করছেন; অন্য মানুষ সান্নিধ্য পেয়েও তা থেকে যথেষ্ট আশ্রয় পাচ্ছেন না। দুই পরিস্থিতির মধ্যে সরল কারণগত যোগ খোঁজা জরুরি নয়। বরং একই সমাজে নৈকট্য এবং দূরত্বের বিপরীত অভিজ্ঞতা কীভাবে সহাবস্থান করে, তা দেখা দরকার। গল্পের রচনাকাঠামো সেই সহাবস্থান সম্ভব করে। পাশাপাশি দৃশ্যের মানসিক অনুরণন থেকেই পাঠক সংযোগ পান।
সুবোধ ও সতীর মধ্যে পূর্বপরিচয়ের গল্প নিজে থেকে বানিয়ে নিলে এই অনুরণনের বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়। সাহিত্য সব সময় গোপন আত্মীয়তার ধাঁধা নয়। অপরিচিত দুই জীবনে একই ধরনের নিঃসঙ্গতা কাজ করতে পারে; একজনের না পাওয়া অন্যজনের আটকে পড়ার সঙ্গে ভাবগত কথোপকথন তৈরি করতে পারে। জীবনানন্দ এই সম্পর্ককে দৃশ্যমান করতে দুই ঘটনাকে পুরোপুরি এক পথে মেলান না। অসম্পূর্ণ যোগ পাঠককে অনুভব করতে হয়। নগরে হাজার মানুষের পাশাপাশি থাকার মধ্যেও পারস্পরিক অপরিচয় স্বাভাবিক; তবু মানুষ অন্যের জানালার আলো অথবা অজানা ডাকের দিকে তাকিয়ে সঙ্গের সম্ভাবনা অনুভব করেন। সুবোধের মনোজগৎ এবং সতীর বাস্তব সংসার এই বৃহত্তর নাগরিক অনুভবের দুই দিক। কাহিনির পৃথকত্ব বজায় রেখেই তাদের প্রতিধ্বনি বোঝা যায়। এই রীতি একক নায়কের ব্যক্তিগত কল্পনার বাইরে সামাজিক নিঃসঙ্গতার পরিধি খুলে দেয়।
বাস্তব ও কল্পনার সম্পর্কেও গল্পটি সরল দুই জগতের সীমা আঁকে না। কলকাতার রাস্তা বাস্তব, কিন্তু সুবোধ সেখানে হাঁটেন নিজের অসম্পূর্ণ উপন্যাসের দুঃখ নিয়ে। কলেজের ভবন বাস্তব, অথচ তার দিকে তাকাতেই বহু বছরের স্মৃতি এবং হারানো সম্ভাবনার ছবি আসে। জানালা বাস্তব, ডাকটির লক্ষ্য অনিশ্চিত। ফলে বাস্তবের ভিতরেই কল্পনা জন্মায়। এই চলাচলকে অলৌকিকতা বললে দৃশ্যের দৈনন্দিন ভিত্তি হারায়; নিছক অসুস্থ মনের ভ্রম বললেও মানুষের অনুভবের সত্য অবমূল্যায়িত হয়। জীবনানন্দ দৃষ্টির পরিবর্তন দেখান: বাইরের জিনিস একই থেকেও চরিত্রের কাছে ভিন্ন অর্থ পায়। বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা তখন বাস্তবকে বাতিল করে না, তার ভিতরে অদৃশ্য আকাঙ্ক্ষার কাজ দেখায়। গদ্যের ছবিময়তা সেই দেখার একটি উপায়।
‘ছায়ানট’ এবং ‘বিস্ময়’ পাশাপাশি রাখলে দুটি ভিন্ন প্রথম অনুভব চোখে পড়ে। প্রথমটিতে কথকের গৃহ ও অসুস্থ শরীর থেকে পৃথিবী সংকুচিত, বাইরে আকাশের বিস্তার ভীতিকর। দ্বিতীয়টিতে সুবোধ রাস্তায় হাঁটছেন, বাইরে চলার পরিসর অনেক, কিন্তু ভিতরে নিশ্চিত আশ্রয়ের অভাব। একজন ঘরে থেকেও আকাশের দিকে ফিরতে চান, অন্যজন পথ হাঁটতে হাঁটতে একটি জানালার দিকে তাকান। খোলা আর বন্ধ স্থানের সহজ বিপরীত নয় এটি। গৃহ নিরাপদ হলেও সংকীর্ণ হতে পারে; রাস্তা উন্মুক্ত হলেও নিঃসঙ্গ হতে পারে। দুটি গল্প স্থানকে চরিত্রের আবেগের সঙ্গে বদলায়। তাই স্থানবর্ণনা দৃশ্য সাজানোর কাজেই থেমে থাকে না; কোন জীবন কোথায় আটকে গেছে, কোথায় সম্ভাবনা দেখছে, তার মানচিত্রও হয়ে ওঠে। কিন্তু স্থান নিজে সমাধান দেয় না। আকাশ পাওয়ার পরে কথকের ভবিষ্যৎ অনির্ধারিত; জানালার দিকে তাকিয়েও সুবোধ নিশ্চিত সাড়া পান না।
শব্দ ও নীরবতার ব্যবহারে পার্থক্য আরও স্পষ্ট। ‘ছায়ানট’ গল্পে পর্দার আড়ালের অন্তরঙ্গ ঘটনার কয়েকটি শব্দ শোনা যায়, তারপর নীরবতার ওজন বেড়ে যায়। ‘বিস্ময়’ গল্পে অজানা একটি ডাক আদৌ তার জন্য কি না বুঝতে না পারার মধ্যেই সুবোধের যাত্রা তীব্র হয়। একটি গল্পে শব্দ অতিরিক্ত কাছের ঘটনার সাক্ষী, অন্যটিতে শব্দ সম্ভাব্য দূরের সঙ্গ। দুই ক্ষেত্রেই শ্রবণ নিশ্চিত জ্ঞান দেয় না। কথক রেবার অনুভব জানেন না, সুবোধও ডাকার উৎস জানেন না। এই সীমা পাঠকের অভিজ্ঞতাতেও কাজ করে। শোনা যায় বলে সব দেখা যায় না; না দেখা অংশ থেকেই অন্তর্মুখী প্রশ্ন বাড়ে। ভাষার পরিমিত তথ্য আর অনুভূতির বিস্তার মিলে গল্পের গভীরতা তৈরি করে। এখানে নীরবতা শুধু অলংকার নয়; যে মানুষ অন্যের সম্পূর্ণ জীবনে প্রবেশ করতে পারেন না, সেই মানবিক অবস্থার রূপ।
দুটি গল্পের চিত্রকল্পকেও একই শিল্পমতবাদের অধীনে ফেলে বিচার করা যথেষ্ট নয়। ‘ছায়ানট’ গল্পে আকাশ ও অন্ধকার কথকের সঙ্কট ও পুনর্দর্শনের সঙ্গে বদলায়। ‘বিস্ময়’ গল্পে পা, ট্রেন, মাকড়সা এবং স্মৃতির প্রাণীচিত্র সুবোধের বিভক্ত অনুভব দেখায়। কোনো নির্দিষ্ট ইউরোপীয় শিল্পআন্দোলনের নাম এই দৃশ্যগুলির ব্যবহার ব্যাখ্যায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া প্রভাব নিশ্চিত করে না। চিত্রকলার রং, চলচ্চিত্রের সম্পাদনা বা কবিতার ব্যঞ্জনার সঙ্গে তুলনা করা ফলপ্রসূ তখনই, যখন গল্পের নিজস্ব শব্দ, ক্রম এবং কথকের সীমা স্পষ্ট থাকে। মাধ্যমান্তরের সাদৃশ্যকে হুবহু প্রযুক্তিগত ধার নেওয়া বলা চলে না। সাহিত্যে কাটা দৃশ্য মানে বাক্য ও অনুচ্ছেদের মাঝে পাঠক কী অনুমান করছেন; চলচ্চিত্রের দৃশ্যান্তর তার থেকে আলাদা বস্তুগত অভিজ্ঞতা। তুলনা নতুন দৃষ্টি দেয়, গল্পের ভাষাগত বাস্তবতা মুছে দেয় না।
এই পাঠে ছোটগল্পের ‘সঙ্কর’ পরিচয় একটি কার্যকর উপমা, চূড়ান্ত সংজ্ঞা নয়। ‘ছায়ানট’ নাটকের সংলাপকে স্বল্প রাখে, কবিতার ব্যঞ্জনা ব্যবহার করে, গৃহস্থ বাস্তবের বস্তু তুলে আনে এবং নীরবতার দ্বারা দৃশ্য সংযুক্ত করে। ‘বিস্ময়’ শহরের মানচিত্রের ভিতর স্মৃতি রাখে, অনির্ণীত শ্রবণ ও বহুমাত্রিক ছবি দিয়ে চরিত্রের সংকট লেখে, একই সঙ্গে আরেক দাম্পত্যজীবনের রেখা চালায়। এই সব বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও গল্পের কাঠামো বোধগম্য, কারণ প্রতিটি রচনায় আবেগের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ফিরে আসে। প্রথম গল্পে অন্যের জীবনকে নিজের দাবি ছেড়ে দেখতে পারা যায় কি না, দ্বিতীয় গল্পে ব্যর্থতার ভিতর অপরের কাছে পৌঁছানোর অনুভূতি কোথা থেকে আসে, সেই প্রশ্ন কাজ করে। কেন্দ্র আছে বলে দৃশ্যগুলি যে কোনো ক্রমে সরিয়ে দেওয়া যায় না। আঙ্গিকের স্বাধীনতা নির্বাচন ও সংযমের মধ্য দিয়েই অর্থ পায়।
রেবাকে শুধু কথকের মুক্তির উপলক্ষ বানালে প্রথম গল্পের নৈতিক অসাম্য চোখ এড়ায়। তার মাথা টেপার শ্রম, মাসিমার সামাজিক সংশয়ের মধ্যে তার অবস্থান এবং ডাক্তারের প্রতি আকর্ষণ, সবই তার নিজের জীবনের অংশ। কথক শেষ মুহূর্তে সৌন্দর্য দেখেছেন বলেই রেবার সব দুশ্চিন্তা শেষ, এমন জানা নেই। তেমনি সুবোধের অপরিচিত নারীমূর্তি তার আকাঙ্ক্ষার উৎস হলেও সতীর পরিচিত দাম্পত্যের অভাব তার থেকে পৃথক। নারীকে কখনো রূপক, কখনো আশ্রয়ের প্রতীক করতে গিয়ে তার বাস্তব অবস্থান অদৃশ্য হয়ে গেলে গল্পের মূল্য কমে। জীবনানন্দের রচনা পাঠককে এমন প্রশ্ন তোলার জায়গাও দেয়। কথকের উপলব্ধি গভীর হতে পারে, কিন্তু তার জানার সীমা গল্পের বাইরে থাকা নারীদের জীবন ভাবার প্রয়োজন শেষ করে না। এই বোধে ভাষার সৌন্দর্য এবং চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য একসঙ্গে রক্ষা পায়।
‘ছায়ানট’ গল্পের সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং ‘বিস্ময়’ গল্পের সাহিত্যিক ব্যর্থতা আলাদা হলেও একটি সাধারণ চাপ আছে: মানুষ নিজেকে যে পরিচয়ে চিনতেন, সেই পরিচয়ের স্থায়িত্ব হারাচ্ছেন। কথক রেবার জীবনে নিজের স্থান ঠিক জানেন না; সুবোধ প্রকাশিত লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠার আশা হারাচ্ছেন। একটি সম্পর্কের সংকট, অন্যটি পেশা ও সৃষ্টির; তবু দুই চরিত্রই নিজের অস্তিত্বের নিশ্চয়তা অন্যের সাড়া থেকে খোঁজেন। রেবা যত্ন করেন, কিন্তু প্রত্যাশিত নৈকট্য দেন না; শহরের কোনো অচেনা কণ্ঠ সুবোধকে ডেকেছে মনে হয়, কিন্তু নিশ্চয়তা নেই। এই অর্ধেক সাড়ার পরিস্থিতি গদ্যের ছেদ, অনুমান এবং দৃশ্যান্তরের সঙ্গে মেলে। চরিত্রের অনিশ্চয়তা প্রকরণে কাজ করে। তাই গল্পকে কেবল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের আখ্যান বলা যথেষ্ট নয়; ভাষা ও বিন্যাসেও মানুষ নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারার অভিজ্ঞতা লিখিত।
শেষের দিকে ‘ছায়ানট’ গল্পে কথক আশ্বাসের ভাষা খুঁজে পান, ‘বিস্ময়’ গল্পে সুবোধের অনুসন্ধান অনেক বেশি খোলা থেকে যায়। দুটি পরিণতিই সম্পূর্ণ সমাধানের বাইরে। এক মুহূর্তের আলোকপ্রাপ্তি পরদিনের সম্পর্কের নিশ্চয়তা নয়; অজানা ডাকে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছা বাস্তব সঙ্গের প্রমাণ নয়। ছোটগল্পের পরিসর এই অসম্পূর্ণতার উপযুক্ত, কারণ তা জীবনের বিস্তার থেকে একটি ঘনীভূত সময় বেছে নিতে পারে। কবিতার ব্যঞ্জনা এখানে পাঠককে প্রশ্নের ভিতর রাখে, নাটকের সংঘাত সীমিত থাকলেও পরিবর্তনের অনুভব আনে, ছবির মতো দৃশ্য মনে থাকে। যে সব ধারার তুলনা দিয়ে আমরা শৈলী বোঝার চেষ্টা করি, তাদের সম্মিলনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি গল্পের আলাদা প্রয়োজন। রেবার মুখের দিকে তাকানোর মুহূর্ত এবং সুবোধের উপরের জানালায় চোখ তোলার মুহূর্ত একই আঙ্গিকে নয়, ভিন্ন মানবিক অনিশ্চয়তায় নির্মিত।
জীবনানন্দের গদ্যপাঠ তাই অস্বচ্ছতার প্রশংসা অথবা ব্যাখ্যার একমাত্রিক দাবি, দুই পথই এড়ায়। কোথায় কথক জানেন, কোথায় অনুমান করছেন, কোথায় চিত্রকল্প অনুভবের অতিরিক্ত স্থান খুলছে এবং কোথায় সামাজিক বাস্তবতার তথ্য অনুক্ত, তা আলাদা করা যায়। সেই আলাদা করার কাজ গল্পের সৌন্দর্য কমায় না; বরং সংক্ষিপ্ত বাক্যের গোপন চাপ ও দীর্ঘ রূপকের গতি স্পষ্ট করে। কথক রেবাকে দেখেন, সুবোধ অজানা আশ্বাস শোনেন, সতীর সংসার অন্য রূপে দৃশ্যমান হয়। কোথাও পূর্ণ পরিচয় নেই। তবু ক্ষুদ্র দেখার ও শোনার মধ্যে মানুষের সান্নিধ্যপ্রয়োজন, আশঙ্কা এবং নতুন করে ভাবার ক্ষমতা আছে। এই বহুমাত্রিকতা গল্পের গীতলতা ও কাহিনির সম্পর্ককে ফলপ্রসূ করে। শিল্পের নানা মাধ্যমের স্মৃতি যেন রচনায় আসে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শব্দেই তাদের চলন; পাঠকের মনে অবশিষ্ট প্রশ্নই গল্পের স্থায়ী প্রতিধ্বনি।
রচনার ভাষায় বিরতি নিয়ে আরও একটি পার্থক্য লক্ষণীয়। ‘ছায়ানট’ গল্পের কথক অনেক ক্ষেত্রে নিজের কথাই থামিয়ে দেন। বাক্যের ছেদ যেন তার অসুস্থ শরীর, সম্পর্ক নিয়ে সংকোচ এবং ঘটনার মর্ম বুঝে ওঠার বিলম্ব একসঙ্গে বহন করে। ‘বিস্ময়’ গল্পে সুবোধের ভাবনা বরং ছবি থেকে ছবিতে সরে যায়। পায়ের চলন, কলেজ, রাতের বাড়ি ও অচেনা কণ্ঠ তাকে থামতে দেয় না; তবু এই দ্রুত পরিবর্তন তাকে কোথাও নিশ্চিতভাবে পৌঁছে দেয় না। এক গল্পে ফাঁক এবং অন্য গল্পে প্রবাহ মুখ্য মনে হলেও দুই ক্ষেত্রেই জানার অপূর্ণতা আছে। বিরতির মধ্যে পাঠক যা কল্পনা করেন, গতির মধ্যেও ছবিগুলির যোগ নিজে তৈরি করেন। এই অংশগ্রহণ ছোটগল্পের সক্রিয় পাঠ দাবি করে। লেখক অব্যক্ত সব তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করছেন কি না, তার উত্তর সব জায়গায় এক নয়; কোথাও চরিত্র নিজেই জানেন না, কোথাও কথক অস্বস্তিতে থামেন, কোথাও গল্প শুধু এই মুহূর্তের বাইরে যায় না।
সুবোধের হাঁটার ছবি পর্যালোচনায় পেশাগত ব্যর্থতার বাস্তব প্রশ্ন উপেক্ষিত হলে গদ্যের রূপক অর্থহীন অলংকার হয়ে যায়। যে উপন্যাস তিনি লিখেছেন, তা পাঠকের কাছে পৌঁছায়নি; একজন লেখকের শ্রম এবং স্বীকৃতির মধ্যে বিচ্ছেদ এতে তৈরি হয়। রাতের পথে তার শরীর চলার আরেকটি কারণ এই বিচ্ছেদ। সাহিত্যজীবনেও মানুষের আয়, মর্যাদা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সমস্যা আছে। নিঃসঙ্গতা তাই শুধু আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম নয়; বিশেষ ঘটনার পরে তা তীব্র হতে পারে। জীবনানন্দ সুবোধকে ছবির ভিতর হারিয়ে ফেলেননি। রূপকের দরজা দিয়ে তার ভিতরের হতাশা দেখিয়েছেন, আর কলকাতার বাস্তব রাস্তা সেই হতাশাকে স্থান দিয়েছে। বাস্তবের এই ভিত্তি অক্ষুণ্ণ থাকলেই গভীর ছবিগুলি বিশ্বাসযোগ্য হয়। একই কারণে কথকের অসুস্থতা ও রেবার পরিচর্যা বাদ দিয়ে ‘ছায়ানট’কে বিশুদ্ধ আকাশ ও আলোর রূপক বলা যায় না।
‘বিস্ময়’ নামটি কেবল অদৃশ্য নারীর উপস্থিতির ইঙ্গিত নয়। পরিচিত শহরে নিজের হাঁটার অভিজ্ঞতা হঠাৎ অপরিচিত হয়ে উঠতে পারে, বহুদিনের পড়াশোনার স্থান বর্তমান ব্যর্থতায় নতুন রং পেতে পারে, অচেনা শব্দকে নিজের নাম ধরে ডাকা মনে হতে পারে। এই সব ঘটনায় দৈনন্দিন উপলব্ধির সীমা খানিক খুলে যায়। সুবোধ তা নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠিত অতিপ্রাকৃত তত্ত্ব নির্মাণ করেন না; তার মনে বিস্ময় কাজ করে। এই অনুভবের নৈতিক দিকও আছে। অন্য মানুষকে পুরোপুরি চিনি বলে যে আত্মবিশ্বাস, বিস্ময় তাকে থামায়। সতী ও তারাপদের জীবন সুবোধের অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা হলেও তার সঙ্গে ভাবগত অনুরণন পায়, কারণ প্রত্যেকের কাছে অন্যের ভিতরের জগৎ অনেকখানি অদেখা। গল্পের বিস্ময় সেই অদেখাকে অবজ্ঞা না করার একটি সম্ভাবনা। সাহিত্যের কাজ সব অজানা বিষয়ের উত্তর দেওয়া নয়; কোন অজানা আমাদের জীবনবোধ বদলায়, তা অনুভবযোগ্য করা।
‘ছায়ানট’ নামেও রাগের সন্ধ্যা বা সুরের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার চেয়ে গল্পের ভিতরের পরিবর্তন বেশি মনোযোগ দাবি করে। কথকের প্রথম দিকের আকাশভীতি এবং শেষের আকাশ ফিরে পাওয়ার অনুভব একই শব্দকে বিপরীত আলোয় রাখে। ঘরের নীরবতা একসময় বন্ধন, অন্য সময়ে রেবার সঙ্গে নিজের দূরত্ব বোঝার সুযোগ। ফাটা পেয়ালা যেমন সংসারের ক্লান্তি মনে করায়, তেমনি মাথা টেপার দৃশ্য যত্নের দ্ব্যর্থতা দেখায়। এগুলিকে একটিমাত্র অর্থে স্থির না করলে সম্পর্কের গতি স্পষ্ট হয়। আঙ্গিকের বলিষ্ঠতা তখন গল্পের প্রতিটি খণ্ডদৃশ্যকে কেন্দ্রীয় উপলব্ধির কাছে নিয়ে যাওয়ায়। পদক্ষেপ অনিশ্চিত বলে যে আপত্তি উঠেছিল, সেই অনিশ্চয়তা রচনায় সচেতনভাবে কতখানি কাজে লেগেছে, পাঠের আসল প্রশ্ন সেখানে। একমাত্র শৈলীর অভিনবত্ব ঘোষণা করলেই বিশ্লেষণ শেষ হয় না; দৃশ্যগুলি কীভাবে পরস্পরের অর্থ বদলায়, তা দেখতে হয়।
ছোটগল্পের কাব্যিকতা সম্পর্কে চূড়ান্ত বিচারেও এই প্রশ্ন কাজে লাগে। দীর্ঘ চিত্রকল্প আছে বলে ‘বিস্ময়’ কবিতা নয়, ছোট বাক্য আছে বলে ‘ছায়ানট’ গল্পের কাঠামো হারায়নি। সুবোধের একটি বাস্তব রাস্তা থেকে বহু স্মৃতির দিকে যাওয়া এবং রেবার পরিচর্যা থেকে কথকের মুক্তির অনিশ্চিত অনুভব পর্যন্ত পৌঁছানো, দুটিই সময়ের ভিতর ঘটে। ঘটনাকে মন কীভাবে অর্থ দেয়, তার পরিবর্তন এই সময়ের কাহিনি। গদ্যের শব্দ পাঠককে কখনো দৃশ্যের কাছে, কখনো অদেখা অনুভবের কাছে নিয়ে যায়। সেই যাতায়াতেই গল্পের নির্মাণ। যদি কেবল ঘটনাসূত্র চাই, ভাষার অর্ধেক কাজ হারিয়ে যাবে; যদি কেবল ভাষার সৌন্দর্য দেখি, রেবা, কথক, সুবোধ ও সতীর জীবনের পৃথক প্রশ্ন চাপা পড়বে। সাহিত্যিক পূর্ণতা তাদের একত্রে ধারণ করার প্রচেষ্টায়, কোনো একটি উপাদানের নিখুঁত প্রাধান্যে নয়।
দুটি গল্প পাশাপাশি পাঠ করলে শেষ পর্যন্ত মানুষ সম্পর্কে জানার সীমাটিই সবচেয়ে গভীর হয়ে ওঠে। কথক রেবার মুখের পরিবর্তন দেখেন, কিন্তু তার সমস্ত ভবিষ্যৎ দেখতে পান না। সুবোধ একটি ডাক শোনেন, কিন্তু কে ডাকল বুঝতে পারেন না; সতীর নিজের জীবনও তার কল্পিত আশ্রয়ের সঙ্গে সরলভাবে মিলে যায় না। তবু এই অপূর্ণতা গল্পকে নিঃস্ব করে না। দৃশ্যের খানিকটা আলো, শ্রবণের অনিশ্চিত শব্দ এবং স্মৃতির হঠাৎ ফিরে আসা চরিত্রদের ভিতর এক নতুন প্রশ্ন জাগায়। জীবনানন্দ দাশ সেই প্রশ্নের চারদিকে ভাষা, ছেদ ও চিত্রকল্প সাজান। রচনার সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাই জীবন শেষ হয়ে যায় না; কিছুটা দেখা, কিছুটা না জানা এবং আবার দেখতে চাওয়ার শক্তি নিয়ে গল্প পাঠকের ভিতর চলতে থাকে। শৈলীর সার্থকতা এমনই অনুভবের ধারাবাহিকতায়। কাহিনি ক্ষুদ্র হলেও তার পরে যে ভাবনা জন্মায়, তা দীর্ঘ সময়ে বিস্তৃত হতে পারে।
সেই বিস্তারই খণ্ড অভিজ্ঞতাকে গভীর মানবিক ও শিল্পিত সমগ্রে পরিণত করে।
জীবনানন্দ দাশের ‘বিস্ময়’ গল্পে সুবোধ ও সতী পরস্পরের জীবনে কতখানি প্রবেশ করেন, সেই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাদের অনুভবের অদ্ভুত সাদৃশ্য। দুজনেই পরিচিত পৃথিবীর ভিতর আরেকটি সম্ভাবনার আভাস পান। সুবোধের ক্ষেত্রে ব্যর্থ লেখকজীবন, নিঃসঙ্গ পথচলা ও অজানা আশ্বাসের স্মৃতি সেই আভাস তৈরি করে। সতীর ক্ষেত্রে সংসারের ভিতরে নিজের রুচির অস্বীকৃতি, তারাপদের সঙ্গে কথার অমিল এবং প্রকৃতির কাছে আত্মগত শান্তি খোঁজার প্রবণতা কাজ করে। এদের জীবন একই পথে চলে না। তবু গল্পের বর্ণনা এমনভাবে দুটি রেখা পাশাপাশি রাখে যে এক জনের অভাব অন্য জনের অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষার দিকে আলো ফেলে। এই যোগকে অদৃশ্য পূর্বপরিচয়ের প্রমাণ ভাবার দরকার নেই; সাহিত্যিক সম্পর্ক সব সময় চরিত্রের মধ্যে সাক্ষাতের উপর দাঁড়ায় না। কখনো দুটি আলাদা জীবনে একই সময়ের নিঃসঙ্গতা কাজ করে, আর গল্প তার শব্দ শুনতে শেখায়। জীবনানন্দ সেই ভাবগত সান্নিধ্য তৈরি করেছেন দৃশ্য, উপমা এবং সময়ের নির্বাচিত পরিবর্তনে।
সতীর চরিত্র সুবোধের মতো দীর্ঘ একাকী স্বগতকথনে সম্পূর্ণ প্রকাশ পায় না। তার পাশে তারাপদ আছেন, তাঁর কথায় ও আচরণে সতীকে নিজের পছন্দ ব্যাখ্যা করতে হয়। ফলে চরিত্রটির আত্মপ্রকাশের ভিতর সম্পর্কের চাপ স্পষ্ট। কথার শুরুতে থিয়েটার ও সিনেমার প্রসঙ্গ শুনতে নিরীহ রুচিবিতর্ক মনে হতে পারে; অল্প পরেই বোঝা যায়, শিল্পকে উপভোগ করার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে তাদের ধারণা পৃথক। তারাপদ মনে করিয়ে দেন, সতী একসময় অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলেন। সতী তার পুরোনো ইচ্ছাকে অস্বীকার করেন না; বরং কোন ধরনের মঞ্চের জন্য তিনি কাজ করতে চাইতেন, সেই শর্ত জানান। এই শর্তে শিল্পের প্রতি মনোযোগ আছে, দ্রুততার প্রতি সংশয় আছে। তাই তার বক্তব্যকে কেবল গ্রাম ভালোবাসেন আর শহর ঘৃণা করেন, এমন সরল সিদ্ধান্তে নামানো যায় না। সে এমন অভিনয়ের ক্ষেত্র চান, যেখানে প্রস্তুতি, অপেক্ষা ও রূপ নির্মাণের সময় থাকবে।
তারাপদের আকর্ষণ থিয়েটার ও সিনেমার দিকে থাকলেও তাকে নিছক যন্ত্রপ্রেমী হিসেবে পড়া তাড়াহুড়ো। শিল্পমাধ্যমের দ্রুত কাজের গতি তার কাছে উত্তেজনাময় হতে পারে, সতীর কাছে একই গতি অনুভবের পরিসর কমিয়ে দেয়। শিল্প সম্পর্কে এই মতভেদ দাম্পত্যের ভাষায় প্রবেশ করেছে বলেই তীব্র। একজন অতীত ইচ্ছার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে অন্যজন বলেন, একই নামে পরিচিত কাজও পরিবেশ বদলালে আর আগের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মেলে না। তারাপদ কথাটি বুঝছেন কি না, গল্প সেখানেই সম্পর্কের দূরত্ব দেখায়। একটি স্বপ্নের নাম জানা এবং তার ভিতরের শর্ত বোঝা ভিন্ন কাজ। সতীর থিয়েটারে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল বলে সব থিয়েটার তার কাছে সমান হবে না; তারাপদের স্মরণ তাই তথ্যগতভাবে ঠিক হয়েও অনুভূতির কাছে অসম্পূর্ণ। এই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই কথোপকথনের শ্লেষ। জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩৫।
মেঠো ইঁদুর ও পেঁচার তুলনাটি এই রুচির অমিলের ভিতরে আসে। চিত্রটির উৎস পল্লির প্রাণীজগৎ, কিন্তু তার কাজ সরল গ্রামবন্দনা নয়। ইঁদুরের উপর পেঁচার আক্রমণে তাড়া খাওয়া, ভয় এবং অবিরাম সতর্কতার অনুভব আছে। সতীর কাছে কাজের সুযোগ যদি কেবল তাড়নার মধ্যে বেঁচে থাকা হয়, শিল্পের জন্য চাওয়া স্থিরতা সেখানে থাকে না। পেঁচা তাই এই নির্দিষ্ট কথায় শুভ পাখি অথবা জ্ঞানের অভিভাবক নয়। অন্য কবিতা বা গল্পে পেঁচা ভিন্ন আবহ আনতে পারে; পুনরাবৃত্ত প্রাণীচিহ্নের একটি স্থায়ী অর্থ ধরে নিলে দৃশ্যের বিশেষ কাজ হারায়। একইভাবে ইঁদুরকে দুর্বল মানুষ, পেঁচাকে যন্ত্রসভ্যতা বলে নিখুঁত সমীকরণ বানানোও যথেষ্ট নয়। তুলনাটি সতীর অনুভূতির গতি প্রকাশ করে। যে শিল্পক্ষেত্রে তিনি নিজেকে রূপ দিতে চাইতেন, সেখানে এখন কাজের তাড়ায় নিজেকে বিপন্ন ভাবছেন। প্রকৃতির দৃশ্য দিয়ে তিনি নিজের দাম্পত্য আলাপে একটি কঠিন অভিজ্ঞতা বোঝাতে চান।
‘বিস্ময়’ গল্পে প্রকৃতি শহরের বিপরীত এক প্রস্তুত নৈতিক ভূগোল নয়। সতী ও সুবোধ উভয়েই শহরের জীবন জানেন; তাদের অনুভব জাগার জন্য সব সময় গ্রামে যেতে হয় না। সিনেমা হল, স্টেশন, ট্যাক্সি কিংবা রাস্তার পাশে থেকেও বনচালতার গন্ধ মনে আসতে পারে। প্রকৃতি তখন ভিন্ন জায়গার খবরের চেয়ে অন্তর্জগতের অনুভবের ভাষা। শহুরে জীবনে গতি, ভিড় ও আলোর চাপ আছে; এই চাপের মধ্যেই স্মৃতি বা কল্পনায় ধীর, স্পর্শযোগ্য দৃশ্য উঠে আসে। কখনো এই দৃশ্য শান্তি দেয়, কখনো ক্ষতির আশঙ্কাও জাগায়। তাই প্রকৃতি মানেই নিরাপত্তা আর শহর মানেই অনিষ্ট, এমন ভাগ গল্পের সূক্ষ্মতা নষ্ট করে। শহরের যানবাহন মানুষকে বিচ্ছিন্নও করতে পারে, আবার হঠাৎ অপর মানুষের কাছে এসে যাওয়ার মুহূর্তও তৈরি করে। প্রকৃতির চিত্র সেই দ্বিমুখী অভিজ্ঞতাকে দেখা ও ঘ্রাণের ভাষায় ধারণ করে।
সতীর ভালো লাগার মুহূর্তে বনচালতার পাতা, ফুলের গন্ধ ও মৌমাছির উপস্থিতি আসে। ঘটনাটি কী, তার সংক্ষিপ্ত খবরের চেয়ে অনুভবটি তার কাছে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, বর্ণনায় সেটিই বড়। পাতা কেবল সবুজ নয়; তার খাঁজ, কোমলতা এবং আড়াল তৈরি করার ক্ষমতা আছে। ফুলের পাপড়িতে স্পর্শের গুণ, সুগন্ধে স্মৃতির গুণ যুক্ত হয়। মৌমাছির গুঞ্জনে চারপাশের দৃশ্য যেন সতীর প্রাণকে ঘিরে রাখে। এই অভিজ্ঞতাকে বাস্তবে তিনি বনচালতার বনে গেছেন, তার দলিল ভাবার দরকার নেই। মন নিজের ভালো লাগার ঘনত্ব প্রকাশ করতে পূর্বপরিচিত কিংবা কল্পিত দৃশ্য খুঁজে নিতে পারে। কিন্তু দৃশ্যটি শুধু সাজও নয়। দাম্পত্যের কথোপকথনে যা বলা গেল না, অনুভবের ভিতর তার অন্য পরিসর মেলে। শরীর ও প্রকৃতির একাধিক ইন্দ্রিয় মিলে সতীর নিজস্ব সাড়া পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩৭।)
বনচালতার পাশেই শ্মশানের উল্লেখে এই ভালো লাগার স্বর পাল্টায়। জীবনের শেষ গন্তব্য মনে করিয়ে দেয় যে স্থান, তার কাছে সতীর প্রাণময় অনুভব জন্মাচ্ছে। শ্মশানকে নিশ্চিত শান্তি অথবা শুধুই মৃত্যুর ভয় বলে পড়লে এই দ্ব্যর্থতা নষ্ট হয়। মানুষ মৃত্যুর পরিচিত স্থানেও গাছ, গন্ধ ও মৌমাছি দেখতে পারেন। বরং মৃত্যুর পাশে জীবনের স্পর্শ তীব্র হয়। সতীর কল্পনা সেই সংযোগকে অনুভবযোগ্য করে। শ্মশান গল্পে শুধু বেদনার সীমানা নয়; সেখানে জীবন্ত পাতা আছে, মানুষের স্মৃতিতে ফিরে আসার পথও আছে। তবে এর মানে তার দাম্পত্য সংকট মিটে গেছে, এমন নয়। ভালো লাগার ক্ষণিক আবহ এবং বাস্তব সম্পর্কের কঠিন প্রশ্ন পাশাপাশি থাকে। জীবনানন্দ রূপক দিয়ে সংকট মুছে দেন না; অনুভবের অন্য স্তর যোগ করেন। পাঠক বুঝতে পারেন, তারাপদের সঙ্গে তর্কের বাইরে সতীর একটি বিস্তৃত অন্তর্জগৎ আছে।
সুবোধের ট্যাক্সির পাশ দিয়ে অন্য গাড়ি চলে গেলে তিনি হঠাৎ মনে করেন, যাকে খুঁজছিলেন সে হয়তো ওই গাড়িতেই ছিল। কাউকে স্পষ্ট দেখেননি; তবু মনে হওয়ার তীব্রতা এত বেশি যে পিছনে যেতে চান। এই মুহূর্তে নগরের যান্ত্রিক যান বিচ্ছেদের সঙ্গে সম্ভাব্য সান্নিধ্যও তৈরি করে। দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলে, আর একটু পরেই তাদের পথ আলাদা। মানুষ কাছাকাছি এসে সত্যিই মিলেছেন কি না, জানা যায় না। সুবোধের বোধে পরিচিত বনচালতার স্মৃতি ফিরে আসে, ভালোলাগার ঘ্রাণ তার অনুমানকে গভীর করে। অনুভব সত্য হলেও ঘটনার পরিচয় অনিশ্চিত। গল্প এই দুটি অবস্থাকে গুলিয়ে দেয় না। সে সুবোধের হৃদয়ে হঠাৎ যে তীব্র সাড়া জন্মেছে, তা লিখে রাখে; সেই সাড়ার কারণ সম্পর্কে পাঠককে নিশ্চিত দলিল দেয় না। আধুনিক শহরে ভিড়ের মধ্যেও একাকিত্ব কীভাবে মুহূর্তের স্পর্শে আশার রূপ পায়, দৃশ্যটি তার অসামান্য উদাহরণ। (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩৮।)
স্টেশনের দৃশ্যে চলমান ট্রেন আলাদা ধরনের দূরত্ব তৈরি করে। গাড়ি ছেড়ে গেলে আর থামানো যায় না; ভিতরে থাকা ব্যক্তির জন্য সময়ের গতি শরীরের চেয়ে দ্রুত হয়ে ওঠে। সতীর কাতর চোখ চারদিক খোঁজে। বর্ণনায় সোনালি ধানগুচ্ছে বসা ইঁদুর এবং তাকে নিয়ে উড়ে যাওয়ার আশঙ্কার ছবি আসে। এই তুলনা অসহায়তার তীব্রতা দেয়, কিন্তু এটিকে প্রতিটি চরিত্রের স্থায়ী প্রতীক বলে বাঁধা যায় না। সতী ইঁদুর, তারাপদ পেঁচা, এই সমীকরণে দৃশ্যটির অনুভূতির পাশাপাশি সতীর সিদ্ধান্ত ও তারাপদের আলাদা জীবন সবই হারিয়ে যায়। বরং নরম আকর্ষণের মধ্যে হঠাৎ বিপদের অনুভব কীভাবে ঢুকে পড়ে, সে কথা ভাবা যায়। ধানের গন্ধের প্রতি ইঁদুরের আকর্ষণ যেমন, সতীর সামনে কোনো সম্ভাবনাময় অভিজ্ঞতা তেমনই ছিল; ট্রেনের চলা তা থেকে সরিয়ে নিচ্ছে বলে তার মনে হতে পারে। কিন্তু কার জন্য, কীভাবে, তার নিশ্চিত ব্যাখ্যা গল্পের সবখানে মেলে না।
সুবোধের শহরযাত্রায় সকালের আকাশ ও উড়োজাহাজ নতুন বিস্ময় আনে। একটি যন্ত্র চোখের সামনে স্পষ্ট, তবু তার উড্ডয়ন তাকে কেবল প্রযুক্তির কাজে সীমিত মনে হয় না। যে মানুষ শহরের যান্ত্রিক জীবন নিয়ে ক্লান্ত, তিনিই উড়োজাহাজ দেখে বিস্মিত হতে পারেন। এই বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্রসভ্যতা সব সময় অনুভবশূন্য নয়; মানুষের দেখার ভঙ্গিতে যন্ত্রও আকাশের নতুন অনুপাত তৈরি করে। উড়োজাহাজ কোথায় যাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর গল্পের জন্য দরকার নেই; যাত্রার সম্ভাবনা সুবোধের দৃষ্টি প্রসারিত করে। সকালের নীল আকাশের সঙ্গে যন্ত্রের চলন মিলে এক আশ্চর্য উল্লাস তৈরি হয়। ফলে প্রকৃতি এবং প্রযুক্তিকে দুটো অপরিবর্তনীয় প্রতিপক্ষ বানানো যায় না। সতী থিয়েটারের তাড়াহুড়ো পছন্দ করেন না বলে সুবোধ যন্ত্রের উড্ডয়নে আনন্দ পাবেন না, এমন নিয়ম নেই। দুই চরিত্রের দৃষ্টিও পৃথক। (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩৯।)
এই উড়োজাহাজের দৃশ্যে সুবোধের মন যে বিস্তার পায়, তা তার সাহিত্যিক ব্যর্থতার বিপরীত একটি ক্ষণিক অনুভব। প্রকাশক রচনা ফিরিয়ে দিলেও নতুন জিনিস দেখতে পারার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়নি। কখনো মানুষের সৃষ্ট বস্তুই তাকে নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার কল্পনা দেয়। কিন্তু ক্ষণিক উৎফুল্লতা জীবনযাত্রার কাঠামো পাল্টে দেয় না; পরের দৃশ্যে গ্লানি ফিরে আসতে পারে। গল্পের সময় এই ওঠানামায় গঠিত। স্থায়ী নৈরাশ্য কিংবা স্থায়ী মুক্তির কোনো একরঙা ছবি নেই। সকালের শহরে রোদ উঠেছে, সুবোধও সেই আলোয় জেগেছেন; তবে তার সঙ্গে রাতের অস্থির মানুষটির সম্পর্ক শেষ হয়নি। এক ব্যক্তির নানা মুহূর্ত আলাদা রং নিয়ে আসে। জীবনানন্দের গদ্য সেই রং বদলকে মনের অসংগতির দোষ বানায় না; মানুষের সময়যাপনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবে বহির্দৃশ্য চরিত্রের সহজ পরিচয়ের বাইরে নতুন সম্ভাবনা খুলে দেয়।
মহিষের লেজ থেকে কাদা ও ময়লা ছিটকে পড়ার দৃশ্য বিপরীত দিকে নিয়ে যায়। সুবোধের শরীরে সরাসরি গ্লানির স্পর্শ লাগে। রোমান্টিক মনোজগত তাকে শহরের মাটি ও পশুর দৈনন্দিনতা থেকে রক্ষা করে না। এই স্পর্শের পরে হঠাৎ চাঁদ, নারকেলপাতা এবং বসন্তের বাতাসের দিকে দৃষ্টি গেলে পরিবর্তনটি আরও তীক্ষ্ণ হয়। ঘৃণার ভেতর থেকে আনন্দে যাওয়ার পথ কোন যুক্তিতে তৈরি, গল্প সরল ব্যাখ্যা দেয় না। মানুষের অনুভবও সব সময় পরিষ্কার ক্রমে বদলায় না। একটি অপ্রীতিকর শরীরী ঘটনা বড় দৃশ্যের প্রতি মনোযোগ ফিরিয়ে দিতে পারে। সুবোধ ময়লা মুছে রাস্তায় হাঁটছেন; তার চোখে নতুন করে দৃশ্য খুলছে। এই পুনর্দর্শন বাস্তব দূর করে না। কাদা ও চাঁদ একই যাত্রার অংশ। সুখের অনুভব তখন পরিচ্ছন্ন নিখুঁত পরিবেশের পুরস্কার নয়, অপূর্ণ বিশ্বের মাঝেই জন্ম নেওয়া বিস্ময়।
চাঁদের আলোতে স্নান সেরে ফেরা নারীদের মুখ সুন্দর লাগলেও সুবোধ তাদের অনুসরণ করতে চান না। এই না চাওয়া তার রোমান্টিক কল্পনার প্রতি আনুগত্য হতে পারে, আবার অপরিচিত নারীদের নিজেদের পথে থাকতে দেওয়ার সাধারণ সিদ্ধান্তও। গল্পের বৃহত্তর ধারায় দেখা যায়, সুবোধ কোনো এক অনির্দিষ্ট সঙ্গের আকাঙ্ক্ষায় চলেছেন। পথের প্রত্যেক সুন্দর মুখ সেই সঙ্গের উত্তর দিতে পারে না। তবু বাস্তব নারীদের চেহারা কল্পনার নারীর তুলনায় কম অর্থবহ, এ সিদ্ধান্ত নিলে তাদের মানুষসত্তা মুছে যায়। সুবোধ যা অনুভব করছেন, সেটি তার নির্দিষ্ট অবস্থার কথা। তিনি তাদের পিছু নেন না, নিজের পথে যান; এই পৃথক পথে চলার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। তার কল্পনা এখনও জীবন্ত, কিন্তু প্রত্যক্ষ আকর্ষণকে অনধিকার দাবি বানাচ্ছেন না। সে মুহূর্তে প্রকৃতি ও পথচলার অনুভবই তাকে চালাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত শ্মশানের কাছে পৌঁছে তিনি যে খাটিয়ার পাশে থামেন, তার দিকে মন দেন না। মৃত্যু দৃশ্যমান অবস্থায় আছে, কিন্তু সুবোধের অনুভব অন্যদিকে। এই অন্যমনস্কতা নিষ্ঠুরতা নয়; মানুষের মন সব দৃশ্যকে এক সময়ে ধারণ করতে পারে না। তার কাছে চাঁদ, বাতাস ও নদীর গন্ধের মধ্যে জীবনের নতুন স্বাদ এসে গেছে। শ্মশানের পাশে এই স্বাদ আরও বৈপরীত্যময়। মৃত্যু ও জীবনকে পৃথক দুই অঞ্চলে না রেখে গল্প তাদের পাশাপাশি রাখে; মড়ার খাটিয়া তথ্য হিসেবে রয়ে যায়, অথচ সুবোধের অভ্যন্তরীণ মুহূর্ত অন্য আবহে পূর্ণ। ফলে দৃশ্যের নৈতিক ও নান্দনিক দুটি রং আছে। পাঠক মৃত্যু দেখেন, সুবোধ বিশ্রাম পান। এই ফারাক তার অনুভূতিকে মিথ্যা করে না; তাকে সীমিত করে। জীবনানন্দ গল্পে প্রিয় চরিত্রের দৃষ্টিও সম্পূর্ণতার সমার্থক নয়, সে কথা স্মরণে রাখতে বলেন। (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৪১।)
এই নানা মুহূর্তের মাঝে সুবোধের দৈনন্দিন লেখার চেষ্টা চলেছে। একদিন ঠিক করেন লিখবেন, নিজের মন প্রস্তুত রাখেন, অন্য আড্ডায় যান না। পরে অন্য একটি খবর অথবা ফিরে আসা পুরোনো লেখা মনোযোগ বদলে দেয়। কয়েকদিন যেন সাধারণভাবে কেটে যায়, আবার কোনো রাতে লেখা শুরু হয়। লেখকের দিনযাপন এমন ভাঙা সময়েই হয়: চাইলেই পুরো দিনের শ্রম একটানা সৃষ্টিতে বদলায় না। ব্যর্থতার অনুভবের পাশাপাশি কাজের প্রস্তুতিও সত্য। গল্পের ছোট ছোট সময়লাফ এই সত্যটিকে দ্রুত দৃশ্যমান করে। প্রতিটি দিনের প্রতিটি ঘণ্টা লিখলে চরিত্রের নির্দিষ্ট সংকট ঢাকা পড়ত। জীবনানন্দ যে মুহূর্তগুলিতে ইচ্ছা, বাধা ও পুনরারম্ভের ফারাক প্রকাশিত, সেগুলিই বেছে নেন। তাই সময় বাদ দেওয়া মানে জীবন বাদ দেওয়া নয়; কাজের অনিশ্চিত গতি বোঝানোর জন্য বাছাই করা। সুবোধের শিল্পীপরিচয় কেবল অপ্রকাশিত উপন্যাসের দুঃখে সীমাবদ্ধ নয়, লিখতে বসার পুনঃপ্রচেষ্টাতেও। (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩৭।)
স্বপ্নে মৃত ভাইয়ের ফিরে আসা গল্পের সময়কে আরও গভীর করে। বাস্তবে ভাইয়ের আসা, চলে যাওয়া এবং রোগে মৃত্যু ঘটেছিল; স্বপ্ন সেই ঘটনাকে পুনরায় উপস্থিত করে। ঘুম ভেঙে সুবোধ বোঝেন, একই দৃশ্য বারবার দেখেছেন যেন। স্মৃতি এখানে সরল অতীতকাহিনি নয়; বর্তমান ঘুমের ভিতর অতীত নতুন অনুভবে ফিরে আসে। ভাইয়ের জীবন এবং সুবোধের বর্তমান এক মুহূর্তে কাছাকাছি হয়ে যায়, যদিও মৃত্যুর দূরত্ব অতিক্রম হয় না। যে মানুষ আর নেই, তার মুখ মনে ফেরা শোকের স্বাভাবিক জটিলতা। জীবনানন্দ বাস্তব ঘটনার সঙ্গে স্বপ্নের দৃশ্য মেলান, কিন্তু মৃত ভাই বাস্তবে ফিরে এসেছেন বলে গল্প দাবি করে না। বরং বাস্তবে অনুপস্থিত মানুষের স্মৃতি মনের ভিতর কত বাস্তবভাবে কাজ করে, তা দেখায়। এই পার্থক্য না রাখলে স্বপ্নের শিল্পিত সত্যকে অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ ভাবার ভুল হয়।
বিলুপ্ত নদী, তার শুকিয়ে যাওয়া তল এবং বহু দূর থেকে ফিরে আসা জলের শব্দ ভাইয়ের স্মরণের গভীরতা বাড়ায়। নদী সত্যিই কোথায় ছিল, সেই ভূগোল জানা দরকার নেই। একটি জীবন নিঃশেষ হয়েছে বলে তার স্মৃতি সম্পূর্ণ নিঃশব্দ হয়ে যায় না; শুকনো খাতের নীচে যেন পুরোনো প্রবাহের শব্দ রয়ে যায়। স্বপ্ন থেকে জেগেও সুবোধ সেই শব্দ শুনতে পান মনে। এই ছবিতে নদী মৃত্যুর সরল চিহ্ন নয়, ফিরে আসার অসম্ভব ইচ্ছার ভাষা। ভাইকে জীবিত করার ক্ষমতা তার নেই, কিন্তু দৃশ্যকে মনে ফেরত আনার ক্ষমতা আছে। তাতে যেমন সান্ত্বনা, তেমনি নতুন ব্যথা। ছবির বহুমাত্রা উপমাটিকে উজ্জ্বল করে। সময়ের এক বিন্দু থেকে বহু বছর আগের যাত্রা, তারপর অনাদি নদীর কল্পনা, সব এক আবেগে গাঁথা। গল্পের সময় এভাবে চরিত্রের স্মরণ অনুযায়ী প্রসারিত হয়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিস্ময়’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, অষ্টম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৪১।)
সতীর প্রকৃতিচিত্র, সুবোধের রাত্রিযাত্রা এবং মৃত ভাইয়ের স্বপ্ন একই শিল্পপদ্ধতির যান্ত্রিক ব্যবহার নয়। সতীর ক্ষেত্রে আলাপের অমিলের পাশে গন্ধ ও কোমলতার অনুভব আসে। সুবোধের ক্ষেত্রে প্রকাশে ব্যর্থতা এবং শহুরে একাকিত্বের ভিতর রাস্তা, যান ও শ্মশানের দৃশ্য জাগে। ভাইয়ের স্মরণে স্বপ্ন অতীতের ক্ষতকে বর্তমান করে। তিনটির কেন্দ্র আলাদা: সম্পর্কের শূন্যতা, কাজের অসফলতা এবং মৃত্যুতে বিচ্ছেদ। একই লেখক প্রকৃতি ও স্বপ্ন ব্যবহার করেন বলে প্রতিবার একই প্রতীকী অভিধান প্রয়োগ করা যায় না। বরং মানুষের অভিজ্ঞতার কোন স্তর প্রকাশের জন্য কোন রূপটি নেওয়া হয়েছে, সেই নির্দিষ্ট প্রশ্ন জরুরি। সতীর বনচালতা সুবোধের নদী নয়; উড়োজাহাজ মহিষের লেজের বিপরীত দৃশ্য হলেও কোনোটিই অন্যটির অর্থ মুছে দেয় না। বিচিত্র উপাদান একত্রে গল্পের বিস্ময়বোধ তৈরি করে।
‘মেয়েমানুষ’ গল্পের বয়নকৌশল এই নিবিড় চিত্ররূপের পাশে অন্য চেহারা দেখায়। এখানে হেমেন, চপলা, লীলা এবং দ্বিজেন পরস্পরের সামনে বসে কথা বলেন; শরীরের ভঙ্গি ও আকস্মিক হস্তক্ষেপ আলাপের গতি বদলায়। দৃশ্যটির শক্তি অনেকখানি নাট্যধর্মী। কেউ অভিযোগ করেন, কেউ উত্তর না দিয়ে কাজ শুরু করেন, কেউ হাত ধরে থামান, অন্যজন চেয়ার সরিয়ে দেন। চরিত্রগুলি নিজের সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তৃতা না দিলেও তাদের পরস্পরের প্রতি মনোভাব ক্রিয়ায় ধরা পড়ে। গল্পের শিরোনামের শব্দটিকেও সতর্কভাবে পড়া প্রয়োজন। ‘মেয়েমানুষ’ কার চোখে কী অর্থে আসে, তা দৃশ্য দেখে বিচার করতে হবে; শব্দটি দিয়ে নারীদের স্থির প্রকৃতি নির্ধারণ করা যাবে না। গল্পের পুরুষ এবং নারীরা একে অন্যকে ব্যবহার, আকর্ষণ ও অপমানের দৃষ্টিতে দেখতে পারেন। সেই দৃষ্টির অসংগতি গল্পে ব্যঙ্গ তৈরি করে।
শুরুতে হেমেন ও চপলার শরীরের বর্ণনায় এক ধরনের তীক্ষ্ণ শ্লেষ আছে। কোট ও টাই পরা পুরুষের সঙ্গে কোলা ব্যাঙের তুলনা, মোটা হতে থাকা শরীর এবং মুখের নিস্তেজতা এক ধরনের রূপগত অতিরঞ্জন। সেই অতিরঞ্জনকে বয়স বাড়লেই মানুষ স্বপ্নশূন্য হয়ে যায়, এমন নীতি হিসেবে পড়া অন্যায়। কথকের দৃষ্টি বিশেষ এক দম্পতির জীবনযাপনে অসন্তোষ খুঁজছে; এই দেখায় সামাজিক শ্রেণি সম্পর্কে বিদ্রূপ থাকলেও বয়স ও শরীর সম্পর্কে তার নিজের কঠোরতাও আছে। শরীরের পরিবর্তন থেকে মানুষের হৃদয়ের সমস্ত ইতিহাস জানা যায় না। গল্পের শ্লেষ পাঠককে হেমেন চপলার ভোগাসক্ত পরিবেশ দেখতে সাহায্য করে; একই সঙ্গে বর্ণনাকারীর চোখ কতখানি নির্বাচিত, তাও স্মরণ করায়। স্থূল প্রতিকৃতি নাট্যদৃশ্যের আগাম আবহ তৈরি করে। পরে যখন তারা কথা বলেন, সেই মুখাবয়বের প্রথম ছাপের সঙ্গে আচরণের যোগ ও ফারাক উভয়ই বিচার করা যায়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘মেয়েমানুষ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, চতুর্থ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ১৮৫–১৮৬।)
হেমেন চপলার চলাফেরায় মোটর, সিনেমা ও রেসের মতো নগরজীবনের উপকরণ আছে। এগুলি ধনসম্পদ ও অবসর ব্যবহারের পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু উপকরণগুলি নিজেরা অন্তঃসারশূন্যতার কারণ নয়। মানুষের সম্পর্ক কেমন, অন্যের শ্রমকে কীভাবে দেখেন এবং আনন্দের মধ্যে কতটা স্বাতন্ত্র্য আছে, তার উপর জীবনযাপনের অর্থ নির্ভর করে। মোটর এক গল্পে বিচ্ছেদের ক্ষণ তৈরি করে, অন্য গল্পে তা মানুষের চলার দৈনন্দিন পদ্ধতি। সিনেমা সতীর কাছে তাড়াহুড়োর শিল্প হতে পারে, অন্য দর্শকের কাছে গভীর অভিজ্ঞতা। তাই জীবনানন্দের দুটি গল্পে শহুরে উপকরণ ফিরেছে বলে তার প্রতিবার একই সামাজিক রায় আছে, এমন ধরে নেওয়া চলে না। ‘মেয়েমানুষ’ গল্পে উপকরণের পাশে চরিত্রদের কথাবার্তা ও পরস্পরের ব্যবহার বিচার করলে তাদের ভোগের ধরন বোঝা যায়। একটি শ্রেণির সমালোচনা তখন বস্তু নয়, সম্পর্কের দৃষ্টিতে দাঁড়ায়।
চপলা দ্বিজেনের খাবারের ব্যবস্থা করতে চাইলে লীলা প্রতিবাদ করেন। প্রথমে মনে হতে পারে, সাধারণ আতিথেয়তার বিষয় নিয়ে অযথা উত্তেজনা। কিন্তু লীলার প্রশ্নে আগের সম্পর্কের সংশয় এবং চপলা দ্বিজেনের নৈকট্য নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ পায়। রান্না বা স্টোভ জ্বালানো তখন কেবল গৃহস্থ কাজ থাকে না; কে কাকে যত্ন করতে পারবেন, তার সামাজিক অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। চপলা সরাসরি জবাব না দিয়ে স্টোভের দিকে এগোন। এই না বলা কথাও দৃশ্যের অর্থ তৈরি করে। লীলা তার কব্জি ধরেন; কথা থেকে সংঘাত শরীরের দিকে যায়। পাঠক শুধু বক্তব্য শুনছেন না, কার চলা কে থামাচ্ছেন দেখছেন। জীবনানন্দের দৃশ্যরচনায় এই ছোট কাজগুলি সম্পর্কের ইতিহাসের আভাস দেয়। দীর্ঘ অতীত বর্ণনার বদলে একটি কব্জি চেপে ধরার ভঙ্গি বর্তমানের শক্তিসম্পর্ক প্রকাশ করে।
চপলা ব্যথা পেয়ে বসলে দ্বিজেন পাখার নিচে চেয়ার সরিয়ে দেন এবং মাথায় হাত রাখেন। এই পরিচর্যার অর্থ নিয়ে লীলা ক্ষুব্ধ হন। দ্বিজেনের কাছে কাজটি সহায়তা হতে পারে; লীলার কাছে তা অস্বীকৃত অন্তরঙ্গতা। চপলার অভিজ্ঞতা আবার আলাদা। কে কাকে ছুঁতে পারেন, কখন সহায়তা কাম্য, কখন তা অন্য সম্পর্কের সন্দেহ জাগায়, দৃশ্যটি এসব প্রশ্ন এক মুহূর্তে তোলে। সাহায্যের নৈতিক অর্থ শুধু সাহায্যকারীর উদ্দেশ্যে স্থির হয় না। স্পর্শ গ্রহণকারীর ইচ্ছা এবং উপস্থিত অন্যদের ইতিহাসও তার অর্থে যোগ হয়। লীলার কড়া প্রতিক্রিয়া অযৌক্তিক বলে সরিয়ে দিলে সেই ইতিহাস বোঝা যায় না; দ্বিজেনের সামান্য সেবাকে নিশ্চিত অপরাধ বললেও যথার্থতা থাকে না। গল্পের নাটকীয়তা মতভেদের সমাধানে নয়, এক কাজের বহু অর্থ একসঙ্গে সামনে আসায়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘মেয়েমানুষ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, চতুর্থ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ১৯১।)
এই মুহূর্তে হেমেন নড়ে উঠলেও চপলার চোখের ইশারায় থামেন। চোখের ভাষা কথার বিকল্প হয়ে ওঠে। চপলা কী চান, তা একটি দীর্ঘ বক্তব্যে প্রকাশিত নয়; হেমেনের হস্তক্ষেপ যে পরিস্থিতি আরও জটিল করবে, তা হয়তো তিনি বুঝেছেন। কিন্তু তার ইশারার সব অর্থ পাঠকও জানেন না। যারা কথা বলছেন, তাদের পাশাপাশি নীরব চরিত্রও দৃশ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। জীবনানন্দ সংলাপের মধ্যবর্তী কাজকে এভাবে স্বাধীন গুরুত্ব দেন। একজনের হাত, অন্যজনের পাখা, কারও বসা এবং কারও চোখের ইশারা নিয়ে দৃশ্যটি যেন মঞ্চে ঘটে; তবু কথাসাহিত্যের সুবিধায় চরিত্রের মনের আভাসও মেলে। এই মিশ্র পদ্ধতি গল্পটিকে চাক্ষুষ করে, অথচ নাটকের সরাসরি সংলাপেই সীমাবদ্ধ রাখে না। কে কী বলছেন, তার সঙ্গে কে কখন থামছেন, সেটিও বর্ণনার অংশ।
পরের উত্তেজনায় হেমেনের অপমানবোধ সামনে আসে। লীলার কথায় তার পৌরুষ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে মনে করে তিনি টেবিলে আঘাত করেন এবং উচ্চকণ্ঠ হন। এই চিৎকারকে শুধু সত্য প্রকাশের সাহস বললে ভুল হবে; আঘাতপ্রাপ্ত অহংকারও তার ভাষা চালাচ্ছে। অন্য নারীদের পরিচয় বা গোপন খবর ফাঁস করার হুমকিতে ক্ষমতার প্রদর্শন আছে। সমাজের যে নৈতিকতা তিনি অবজ্ঞা করছেন বলে মনে হয়, সেই সমাজেরই লজ্জা দেওয়ার ক্ষমতা তিনি ব্যবহার করতে চান। কথার মধ্যে তাই দ্বিমুখী শ্লেষ। নিজেকে নিয়মভাঙা পুরুষ বলে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি নারীদের সামাজিক বিপন্নতাকে হাতিয়ার করেন। চপলা থামাতে চান, দ্বিজেন সরে যাওয়ার ব্যবস্থা বলেন; কিন্তু হেমেনের ভাষা ততক্ষণে সভার নিয়ন্ত্রণ অন্য পথে নিয়ে গেছে। সামান্য স্পর্শ নিয়ে শুরু হওয়া দৃশ্য বড় পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দাবিতে পৌঁছায়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘মেয়েমানুষ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, চতুর্থ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ১৯৩–১৯৪।)
হেমেনের কর্কশ শব্দ, কথার অনিয়ন্ত্রিত পুনরাবৃত্তি এবং লোকমুখে চলিত উচ্চারণ তার মানসিক অবস্থার কাজ করে। পরিশীলিত ভাষা দিয়ে চরিত্রটির ক্ষোভ লেখা হলে সে ক্ষোভের সামাজিক ও শরীরী স্বর হারাত। তবু অশোভন শব্দ ব্যবহৃত হলেই তা গল্পকারের ব্যক্তিগত বিদ্বেষের সরল প্রমাণ নয়। নির্দিষ্ট মুহূর্তে নির্দিষ্ট বক্তা অন্যকে আহত করতে কোন শব্দ বেছে নেন, সেই বাছাই দেখা দরকার। চরিত্রের ভাষায় শ্রেণিগত অবস্থান, উত্তেজনার মাত্রা এবং নিজের পক্ষে শক্তি দেখানোর কৌশল একসঙ্গে আসে। চপলা বা দ্বিজেনের সংক্ষিপ্ত উত্তরও তাই গুরুত্বপূর্ণ; হেমেন যত জোরে বলছেন, অন্যরা তত সংকুচিতভাবে পরিস্থিতি সামলাতে চান। কথার পরিমাণের অসমতাই দৃশ্যের ভারসাম্য বদলে দেয়। যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি শব্দ ব্যবহার করছেন, তিনিই সবচেয়ে স্পষ্ট সত্য বলছেন, এমন নয়। কথার আধিক্য কখনো ভিতরের অস্থিরতাও প্রকাশ করে।
হেমেনের কোনো ভৌগোলিক জায়গার নাম উচ্চারণকে নিশ্চিত যৌনপ্রতীক বলে ধরার আগে কথার পরিস্থিতি বোঝা চাই। তিনি রাগের উত্তাপে নিজের ক্ষমতার বিস্তার দেখাতে চাইছেন। অতিরঞ্জিত দাবি, অন্যকে ভয় দেখানো এবং শুনতে থাকা মানুষদের উপর প্রভাব ফেলার ইচ্ছা তার বক্তব্যে কাজ করে। কথাটি ব্যক্তিগত স্মৃতি, কুৎসিত গর্ব অথবা নিছক প্রলাপের কতটা, গল্পের সম্পূর্ণ তথ্য না দেখে স্থির করা যায় না। একটি স্থানের নাম এসেছে বলেই তাকে প্রকৃতির শিকারক্ষেত্র বা অবচেতন কামনার অব্যর্থ চিহ্ন করলে পাঠে অনুমান বাড়ে, দৃশ্যের সরাসরি নৈতিক সমস্যা হারায়। এখানে হেমেন অন্য মানুষের সম্মানকে নিজের আঘাত সারানোর হাতিয়ার করছেন, এই কথাটি স্পষ্ট। তার কণ্ঠকে প্রশ্ন করার জন্য দূরবর্তী প্রতীকের চেয়ে দৃশ্যের মধ্যে বলা হুমকিই যথেষ্ট। জীবনানন্দের তীক্ষ্ণ শ্লেষ চরিত্রটিকে তার নিজের ভাষায় প্রকাশ পেতে দেয়।
‘বিস্ময়’ এবং ‘মেয়েমানুষ’ পাশাপাশি পড়লে জীবনানন্দের রচনাপদ্ধতির বিস্তার বোঝা যায়। প্রথম গল্পে অনেক ছবি চরিত্রের অন্তর থেকে উঠে আসে, দ্বিতীয়টিতে সংলাপ ও কাজের সংঘাতে চরিত্রগুলি পরস্পরকে দৃশ্যমান করেন। সতীর ভালোলাগা ভাষায় বনচালতার ঘ্রাণ হয়ে ওঠে; লীলার অস্বস্তি কব্জি চেপে ধরার ঘটনায় স্পষ্ট। সুবোধ কারও সম্ভাব্য উপস্থিতি অনুমান করেন; হেমেন নিজের উপস্থিতি উচ্চকণ্ঠে অন্যের উপর চাপান। একদিকে গন্ধ, কল্পনা ও স্মৃতির নমনীয় চলন, অন্যদিকে ঘরের নির্দিষ্ট বস্তু, শারীরিক কাজ ও কথার আঘাত। কোনো একটি কৌশলকেই জীবনানন্দের একমাত্র শৈলী ভাবলে অন্য রচনার অর্জন হারাবে। বরং একই লেখক বিষয়ের প্রয়োজনে দৃষ্টিকোণ ও বর্ণনার মাত্রা বদলাতে পারেন, এই বোধে গল্পগুলি বিচার করা দরকার। উভয় রচনায় চরিত্রের অসম জানাশোনা সক্রিয় থাকলেও তা প্রকাশের পথ ভিন্ন।
দুটি গল্পেই নারীচরিত্রকে কোনো পুরুষের উপলব্ধির নিছক প্রতীক বানানোর বিপদ আছে। সতীর বনচালতা সুবোধের আশ্রয়প্রার্থনার সরাসরি উত্তর নয়; তার নিজের দাম্পত্য আলাপ ও রুচির ইতিহাস আছে। চপলা দ্বিজেনের পরিচর্যা অথবা হেমেনের গর্বের বস্তু নন; তার নীরব ইশারা ও স্টোভ জ্বালানোর উদ্যোগও অবস্থান প্রকাশ করে। লীলাকে শুধু ঈর্ষাপরায়ণা বললে তার সামনে ঘটতে থাকা সীমা লঙ্ঘনের ভয় হারায়। আবার তার কব্জি ধরা কাজটিও প্রশ্নের বাইরে নয়। সম্পর্কের যে জটিলতা জীবনানন্দ দৃশ্যমান করেন, তা প্রতিটি মানুষকে আলাদা ইচ্ছার অধিকারী ভাবলেই স্পষ্ট হয়। সুবোধের কল্পনার নারীর সঙ্গে বাস্তব নারীদের অসম তুলনাতেও এই সতর্কতা জরুরি। গল্পের ভাষা যত রূপময়, জীবন্ত মানুষের অবস্থান তত সহজে অলংকারে ঢাকা পড়তে পারে। পাঠককে সেই আড়াল চিনতে হয়।
সময়ের বাছাইয়েও দুই গল্পের পার্থক্য। সুবোধের দিনযাপন দীর্ঘ হলেও লেখক কেবল কিছু সন্ধ্যা, রাত, ভোর এবং স্বপ্ন বেছে আনেন। সতীর ট্রেন ছাড়া কিংবা ট্যাক্সির পাশ দিয়ে গাড়ি যাওয়া, দুটিই ক্ষণিক ঘটনা; মনে তাদের অভিঘাত দীর্ঘ। ‘মেয়েমানুষ’ গল্পে ঘরের আলাপ কিছু সময়ের মধ্যে ঘনীভূত হয়। রান্নার উদ্যোগ থেকে হেমেনের চিৎকার পর্যন্ত গতি দ্রুত, শরীরী কাজ ক্রমে কথার বিস্ফোরণ ডেকে আনে। এই পৃথক সময়বোধ ছাড়া শৈলীর বৈশিষ্ট্য বোঝা যায় না। এক গল্প ভাবনা ও স্মৃতিতে মুহূর্ত প্রসারিত করে, অন্য গল্পে মুহূর্তের পর মুহূর্ত সংঘাতে যোগ করে। উভয় ক্ষেত্রেই সময়কে ক্যালেন্ডারের হিসাবে নয়, অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। একটি দিন বহু পৃষ্ঠা নিতে পারে, কয়েকদিন এক বাক্যে চলে যেতে পারে। গল্পের প্রকৃত গতি এই নির্বাচনে।
জীবনানন্দের ব্যবহৃত ঘ্রাণ, রং এবং স্পর্শের সমাবেশকে ‘কাব্যিক গদ্য’ বললে একটি সত্য ধরা পড়ে, কিন্তু বিশ্লেষণ সেখানেই থামলে চলে না। কোন গন্ধ সতীর অনুভবকে আশ্রয় দেয়, কোন ময়লা সুবোধের শরীরে লাগে, কোন কব্জির চাপ চপলার অভিজ্ঞতাকে আঘাত করে, তা পৃথক করে দেখতে হবে। ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি উপাদান একই রকম সৌন্দর্য আনে না। বনচালতার সুগন্ধে কোমলতা, মহিষের কাদায় অপ্রীতি, লীলার হাতে জোরের স্পর্শে ক্ষমতার প্রশ্ন আছে। গল্পকার এই ভিন্ন অনুভবকে একই শব্দসম্পদে গড়েন না। কোথাও দীর্ঘ বাক্যে রং ও গন্ধ জমে, কোথাও সংক্ষিপ্ত সংলাপের পরে এক কাজ দৃশ্য বদলে দেয়। শৈলীর স্বাতন্ত্র্য ভাষার সৌন্দর্যের পাশাপাশি বেদনাদায়ক ও কদাকার অভিজ্ঞতাকেও যথার্থ রূপ দেওয়ায়।
বিশেষত ‘মেয়েমানুষ’ গল্পের দেহবর্ণনায় পাঠকের অস্বস্তি হলে সেই অস্বস্তিও বিশ্লেষণের উপাদান। হেমেন চপলার বয়স, স্থূলতা ও মুখ নিয়ে কঠিন কৌতুক মানবিক দৃষ্টি সংকুচিত করছে কি না, এই প্রশ্ন করা যায়। শিল্পে বিদ্রূপের ক্ষমতা আছে; বিদ্রূপ যাকে লক্ষ্য করে তার সামাজিক অবস্থানও বিচার্য। ধনিক অভ্যাসের সমালোচনা করতে গিয়ে বৃদ্ধ হওয়া শরীরকে লজ্জার উপকরণ বানানো হলে দুটি ভিন্ন বিচার এক হয়ে যেতে পারে। জীবনানন্দের রচনাকে ভালোবাসা মানে এই টানাপড়েন উপেক্ষা করা নয়। কোথায় গল্পকার চরিত্রের লোভ দেখাতে সফল, কোথায় শরীর সম্পর্কে তার কঠোর বর্ণনা পাঠকের প্রশ্ন জাগায়, উভয় দিক পড়তে হবে। সমালোচনার এই সতর্কতা ‘বিস্ময়’ গল্পেও প্রযোজ্য, যেখানে কল্পিত নারীর বিপরীতে বাস্তব নারীদের শরীরকে কখনো অতিরিক্ত সহজে বিচার করা হয়। গভীর গদ্যের ভিতরেও সীমিত দৃষ্টি থাকতে পারে।
সুবোধের স্বপ্নে মৃত ভাই ফিরে আসার পর গল্পকে শুধুই রহস্যপ্রেমের দিকে টানা যায় না। ভাইয়ের মৃত্যু পরিবার, স্মৃতি ও শোকের এমন একটি স্তর আনে, যা অজানা নারীর ডাকের চেয়ে পৃথক। সাহিত্যিক ব্যর্থতা ছাড়াও সুবোধ মানুষের বিচ্ছেদের ইতিহাস বহন করছেন। তাই তার অপরিচিত আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে জড়াতে পারে। কিন্তু মৃত ভাইয়ের স্বপ্নের প্রতিটি উপাদানকে যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে নামিয়ে দিলে শোকের স্বাধীন সত্য হারায়। স্বপ্ন কখনো আকাঙ্ক্ষা, কখনো স্মৃতি, কখনো ব্যথা, কখনো পরস্পর মিশে থাকা অসম্পূর্ণ অনুভব। জীবনানন্দ তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দেন না বলেই পাঠকের স্বাধীনতা আছে; স্বাধীনতার সঙ্গে প্রমাণের দায়ও থাকে। যে তথ্য গল্পে নেই, তা নির্দিষ্টভাবে বলে ফেলা নয়; দেওয়া দৃশ্যগুলির সম্পর্ক দেখে সম্ভাব্য অর্থ বিচার করা সমালোচকের কাজ।
এই দায় গল্পের তথ্যসূত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সতীর থিয়েটার প্রসঙ্গ, বনচালতার অনুভব, ট্যাক্সির পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়ি, স্টেশনের ট্রেন, সকালের উড়োজাহাজ এবং শ্মশানের আলো ‘বিস্ময়’ গল্পের অষ্টম খণ্ডের ৩৫ থেকে ৪১ পৃষ্ঠায় ছড়ানো। হেমেন চপলার বর্ণনা ও পরের উত্তপ্ত আলাপ ‘মেয়েমানুষ’ গল্পের চতুর্থ খণ্ডের ১৮৫ থেকে ১৯৪ পৃষ্ঠায় আছে। প্রতিটি দৃশ্যের কাছে পৃষ্ঠা দিলে পাঠক মূল পাঠে ফিরে গিয়ে ব্যাখ্যা যাচাই করতে পারেন। উদ্ধৃতি দীর্ঘ করে প্রতিলিপি না করে ঘটনাগুলিকে নিজের ভাষায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কারণ চরিত্রের একটি বাক্য আলাদা করে টেনে নিলে তার পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। মূল পাঠের শব্দ ও সমালোচকের ব্যাখ্যা পৃথক রাখা সাহিত্যপাঠে দরকারি। তবে ব্যাখ্যার সত্যতা শেষ পর্যন্ত গল্পের দৃশ্যের সঙ্গেই বিচার করতে হবে।
জীবনানন্দের গল্পে বাস্তবতা ভেঙে যায়, এমন কথা বলার আগে তাই কোন বাস্তবতা নিয়ে কথা হচ্ছে জিজ্ঞেস করতে হবে। সুবোধের রাস্তা, কাদা, কলেজ ও মৃত ভাইয়ের জীবনের তথ্য রয়ে গেছে; বদলায় সেগুলিকে দেখার পদ্ধতি। সতীর বনচালতা বাস্তব জঙ্গলের ভূগোল নাও হতে পারে, কিন্তু তার ভালোলাগা বাস্তব অনুভব। হেমেনের ঘরের স্টোভ ও টেবিল স্পর্শযোগ্য বস্তু, অথচ সেগুলি সম্পর্কের ক্ষমতার লড়াইয়ে নতুন অর্থ পায়। বাস্তব ও মনোজগত পরস্পরকে বাতিল না করে যুক্ত হয়। এই যোগ কখনো কোমল, কখনো তীক্ষ্ণ শ্লেষময়। লেখকের কৌশল দুই জগতকে যন্ত্রের মতো মিশিয়ে একটি অস্পষ্ট অলৌকিকতা তৈরি নয়; নির্দিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতায় দৃশ্য কেন বদলে গেল, তা পাঠককে অনুভব করতে দেওয়া। এই উপলব্ধি গল্পদুটির বোধনির্মাণে কেন্দ্রীয়।
সতী ও তারাপদের তর্কে কোনো স্পষ্ট জয়ী নেই, ‘মেয়েমানুষ’ গল্পের ঘরোয়া সংঘাতেও চিৎকার শেষে পরস্পরের জীবন নিখুঁত সমাধান পায় না। সুবোধ হয়তো এক ক্ষণের শান্তি অনুভব করেন, মৃত ভাইয়ের শোক তাতে মুছে যায় না। জীবনানন্দের গল্প মানুষের ভিতর চলমান অসম্পূর্ণতা ধরে রাখে। কিন্তু সমাপ্তি অমীমাংসিত মানেই রচনা অগোছালো নয়। যে মুহূর্তগুলি বেছে নেওয়া হয়েছে, তাতে সম্পর্কের মূল চাপ, সময়ের গতি ও ভিন্ন ভাষার সংঘাত অনুভব করা যায়। একজন মানুষ থিয়েটারের তাড়াহুড়োতে নিজেকে তাড়া খাওয়া প্রাণী ভাবেন; অন্যজন উড়োজাহাজ দেখে যন্ত্রেও বিস্ময় খুঁজে পান; তৃতীয় ব্যক্তি একটি ঘরের মধ্যে নিজের পৌরুষ নিয়ে অকারণ উচ্চকণ্ঠ হন। এসব দৃশ্য পাশাপাশি পড়লে সময়ের একমাত্র ছবি নয়, মানুষের বহুবিধ সাড়া মেলে। এই বহুস্বর ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ত পরিসরকে বৃহৎ করে।
পরিশেষে সতী ও সুবোধের মধ্যে যে অদেখা আত্মীয়তা অনুভূত হয়, তাকে পরস্পরের নির্ধারিত ভাগ্য বানানো দরকার নেই। তাদের জীবন আলাদা, কিন্তু গল্পের ভাষায় নিঃসঙ্গতার অনুরণন আছে। হেমেন, চপলা, লীলা ও দ্বিজেন আবার সরাসরি একই ঘরে থেকেও একে অন্যকে ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। দূরত্ব কখনো অপরিচয়ে, কখনো খুব কাছের সম্পর্কেও। জীবনানন্দ এই দুই দূরত্বের জন্য পৃথক রূপ বেছে নিয়েছেন: কোথাও বনচালতার গন্ধ, ট্রেনের গতি ও স্বপ্নের নদী; কোথাও সংলাপ, হাতের চাপ, পাখার নিচে সরানো চেয়ার এবং হঠাৎ চিৎকার। গল্পের বিষয়বস্তু ও শৈলী তাই বিচ্ছিন্ন নয়। যে জীবনকে তিনি দেখতে চান, তার প্রয়োজন অনুযায়ী বাক্যের গতি ও দৃশ্যের পরিমাণ বদলান। পাঠককে কখনো নীরব অনুভবের সঙ্গে, কখনো অস্বস্তিকর সামাজিক কৌতুকের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। এই দুই অভিজ্ঞতায় তাঁর গদ্যের সত্যিকার ব্যাপ্তি প্রকাশিত।
শ্মশানের পুনরাবির্ভাব নিয়ে এই আলোচনায় আরও সতর্ক হওয়া যায়। সতীর বনচালতার দৃশ্যে শ্মশান আছে, সুবোধের রাতের পথেও শ্মশান আছে। একই স্থান দুই মানুষের কাছে একই ছবি তৈরি করে না। সতীর অনুভবে নরম পাতা ও ফুলের আড়ালে মৃত্যুর স্থানটি যেন জীবনের ঘনত্ব বাড়ায়। সুবোধ যখন খাটিয়ার পাশে পৌঁছান, মৃত্যুর বাস্তব বস্তু সামনে থাকে, কিন্তু তার মন চাঁদ ও বাতাসে বিশ্রাম নিচ্ছে। দুটি দৃশ্যের যোগ মৃত্যু অনিবার্য বলেই মানুষ প্রেম খোঁজেন, এমন একমাত্র দার্শনিক সূত্রে নেই। বরং জীবনের বিপরীত অনুভব একটি স্থানের কাছে এসে কেমন পাশাপাশি দাঁড়ায়, তা দেখা যায়। একজনের অনুভব আরেকজনের অদেখা দৃশ্যকে প্রতিধ্বনি দিতে পারে, অথচ তাদের একত্র থাকার ঘটনার প্রমাণ লাগে না। শ্মশান তখন ভাবগত সংযোগের স্থান। জীবনানন্দ এক বাস্তব পরিসরকে দুই দৃষ্টিতে ব্যবহার করে গল্পের বিন্যাসে আড়াল থাকা সম্পর্ক তৈরি করেন।
ট্রেনের চলা ও উড়োজাহাজের উড়ানকেও একই ভাবে আলাদা রাখতে হয়। ট্রেনে সতী যে দূরত্ব অনুভব করেন, তা তার শরীরকে নির্দিষ্ট পথে নিয়ে যাচ্ছে; থামার ক্ষমতা সীমিত। আকাশের উড়োজাহাজ সুবোধের সামনে অন্যের যাত্রা হলেও তাকে বিস্ময় দেয়। দুটিই যন্ত্র, দুটিই গতি, কিন্তু একটিতে জোরপূর্বক বিচ্ছেদের অনুভব, অন্যটিতে অনির্দিষ্ট প্রসারের স্বাদ। তাই জীবনানন্দ আধুনিক প্রযুক্তিকে একরৈখিকভাবে নিন্দা করেছেন, এমন সিদ্ধান্ত দৃশ্যগুলি সমর্থন করে না। যন্ত্রের অর্থ স্থির হয় মানুষের অবস্থান ও দেখার ভঙ্গিতে। মহিষের লেজ থেকে উড়ে আসা কাদা আবার পূর্ব আধুনিক কোনো নির্মল জগতের প্রমাণ নয়; প্রাণীজগতও মানুষের শরীরে অস্বস্তি আনতে পারে। শহর ও গ্রাম, প্রকৃতি ও যন্ত্রের প্রস্তুত বিরোধ ভেঙে এই বহুবিধ সম্পর্ক পড়লে গল্পটি আরও প্রাঞ্জল হয়। সতী ও সুবোধের পৃথক অভিজ্ঞতা জটিলতা হারায় না।
‘মেয়েমানুষ’ গল্পের কেন্দ্রের স্টোভও এই রকম একটি দৈনন্দিন বস্তু, যার অর্থ সম্পর্কের মুহূর্তে বদলায়। চা বা খাবারের ব্যবস্থা করা এক প্রকার অতিথিসেবা। কিন্তু চপলা কাজটি শুরু করতে চাইলে লীলা প্রশ্ন করেন, কার সেবায় কার অধিকার। পরিচর্যাকে প্রেমের দাবি বলে ধরে নিলেই বিপদ, আবার স্পর্শকে সম্পূর্ণ নিরীহ বলেও দৃশ্য মুছে ফেলা যায় না। যে ঘরে বহু মানুষ উপস্থিত, সেখানে সাধারণ কাজ হঠাৎ প্রকাশ্য পরীক্ষার মতো হয়ে ওঠে। কথার ভিতরে যত পুরোনো সন্দেহ থাকুক, পাঠক তাকে বর্তমান কাজের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করেন। লীলার ক্ষোভের স্পষ্টতা এবং চপলার সংকুচিত ইশারা দুটি ভিন্ন ভাষা। দ্বিজেনের সহায়তা তৃতীয় অর্থ আনে, হেমেনের চিৎকার চতুর্থ। একটি স্টোভের দিকে যাওয়া থেকে চারটি চরিত্রের সম্পর্কের এত দিক দৃশ্যমান হওয়া জীবনানন্দের নাট্যবোধের পরিচয়। দীর্ঘ বর্ণনায় যে জটিলতা ছড়িয়ে পড়ত, ক্ষুদ্র কাজের ক্রমে তা ঘনীভূত হয়েছে।
এই নাট্যবোধের সঙ্গে ‘বিস্ময়’ গল্পের অপেক্ষাকৃত ধীর অভ্যন্তরীণ সময়ের গভীর যোগ আছে। দুই গল্পেই চরিত্রের পূর্ণ জীবনী আগে সাজিয়ে দেওয়া হয় না। পাঠক আগে একটি সংলাপ বা অনুভব দেখেন; পরে অতীত ও পারিপার্শ্বিকতার প্রয়োজনীয় অংশ বুঝতে পারেন। যে তথ্য কম, তার চারপাশে অকারণ রহস্য সৃষ্টি করাই উদ্দেশ্য নয়। বরং জীবনে মানুষ অন্যকে প্রথমে একটি ভঙ্গি, স্বর কিংবা মুহূর্তে দেখেন, তারপর ক্রমে তার সম্পর্কের ইতিহাস আন্দাজ করেন। সুবোধের অজানা ডাকের ক্ষেত্রে সেই আন্দাজ অপূর্ণ থাকে। লীলা চপলার কব্জি ধরলে তাদের আগেকার সন্দেহ পুরো জানা না থাকলেও সংঘাতের গুরুত্ব ধরা পড়ে। শৈলীর দুটি আলাদা পথ এই একই মানবিক সীমার দিকে নিয়ে যায়: আমরা অন্যের অতীত ও মন সম্পূর্ণ জেনে সাক্ষাৎ শুরু করি না। গল্পও সেই অসম্পূর্ণ জানা থেকেই নির্মিত হতে পারে।
এই কারণে জীবনানন্দের চিত্রময় গদ্য ও নাট্যধর্মী সংলাপকে পৃথক দক্ষতার প্রদর্শনী ভাবা যায় না। দুটির লক্ষ্য মানুষের সম্পর্কের ভিন্ন চাপকে অনুভবযোগ্য করা। সতীর ভিতরে যে অনুভব কথায় মেলে না, বনচালতার গন্ধ তাকে স্থান দেয়। সুবোধের হারানো ভাই স্বপ্নের নদীতে ফিরে আসে। চপলার নীরব ইশারা এবং হেমেনের অতিরিক্ত শব্দ একই ঘরে ক্ষমতার অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে। গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী ভাষা কখনো ঘন, কখনো সংযত, কখনো রুক্ষ। এই পরিবর্তনেই জীবনানন্দের ছোটগল্প জীবন্ত। শৈলী সেখানে কাহিনির উপর চাপানো সৌন্দর্য নয়; চরিত্র কী জানেন, কী বোঝেন না এবং অন্যকে কীভাবে আঘাত বা আশ্রয় দেন, তার রূপ।
সেই রূপ পড়তে গেলে ছবির সৌন্দর্যের পাশাপাশি কথার আঘাত, শরীরের শ্রম এবং অপরের নীরবতাও সমান মনোযোগ পায়।
এতেই গল্পের জীবন স্পষ্ট হয়।
জীবনানন্দ দাশের ছোটগল্পে দুজন মানুষ কথা বললেই সমান পরিমাণে নিজের কথা জানান না। একজন হয়তো আড্ডার সমস্ত জায়গা দখল করেন, অন্যজন সামান্য উত্তর দিয়ে শুনতে থাকেন। আবার অনেক সময় নীরব ব্যক্তির মন সম্পর্কে পাঠক কিছু জানতে পারেন, অথচ উচ্চকণ্ঠ বক্তা নিজেই নিজের কথা পুরো বোঝেন না। সংলাপ তখন তথ্য আদানপ্রদানের সহজ পথ নয়; কে অন্যের সামনে কী প্রকাশ করতে চান এবং কী চাপা রাখেন, তার দৃশ্য। ‘মেয়েমানুষ’ গল্পে হেমেন ও দ্বিজেনের আলাপ এই অসম বিনিময়ের একটি দৃষ্টান্ত। ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পে আবার একজন কথক স্ত্রীকে চিঠি লিখে বহুসংখ্যক মানুষের কথা বলেন; প্রাপক উত্তর দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় চিঠির ভিতরেও কথোপকথন একতরফা থাকে। একটি গল্পে মুখোমুখি আলাপের অস্বস্তি, অন্যটিতে দূরত্ব থেকে লেখা দীর্ঘ আত্মব্যাখ্যা। দুই রচনায় চরিত্রের নিঃসঙ্গতা ভিন্ন রূপে আসে, অথচ ভাষা ও নীরবতার যোগসূত্র পাঠককে একই প্রশ্নে ফেরায়: অন্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাওয়া আর তাকে সত্যিই শোনা, এ দুটি কি সমান কাজ?
হেমেন যখন দ্বিজেনের প্রেমজীবন ও লীলার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন, কথার উপরিতলে বন্ধুসুলভ ঠাট্টা শোনা যায়। একটু পরেই বোঝা যায়, ঠাট্টাটি হেমেনের নিজের অপ্রাপ্তির ভার বহন করছে। দ্বিজেন কত নারীর কাছে আকর্ষণীয়, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে করতে তিনি নিজের দিকে ফিরে আসেন। কথোপকথনের উদ্দেশ্য দ্বিজেনের সত্যিকার জীবনের হিসাব নেওয়া নয়; দ্বিজেনের কল্পিত সাফল্যের সামনে নিজের ব্যর্থতা স্পষ্ট করা। এই কারণেই উত্তর শোনার অপেক্ষা না করে হেমেন নিজেই পরের কথা বলেন। অন্য মানুষটি এখানে সহচর, একই সঙ্গে আয়না। হেমেন সেই আয়নায় নিজের বয়স, শরীর এবং কাঙ্ক্ষিত প্রেম না পাওয়ার হতাশা দেখতে পান। ফলে আলাপের গতিশীলতা বাহ্যিক দ্বন্দ্ব থেকে নয়, একটি কণ্ঠের ভিতরেই বদলে যাওয়া সুর থেকে তৈরি হয়। প্রথমে কৌতুক, পরে অভিযোগ, শেষে আত্মসমালোচনার কাছাকাছি বিষাদ। দ্বিজেনের নীরবতা এই পরিবর্তনকে জায়গা দেয়।
হেমেন দ্বিজেনের জীবন সম্পর্কে যা বলেন, তার সবটুকু সত্য ধরে নেওয়া যায় না। লীলার সঙ্গে দ্বিজেনের অমিল থেকে অন্য নারীদের দিকে তিনি নিশ্চয়ই গেছেন, অথবা তার কাছে বহু নারী নিজে থেকে এসেছেন, এসব অনুমানে হেমেনের ঈর্ষাও মিশে আছে। দ্বিজেন কী ভাবছেন, তা আলাপের একমাত্র বর্ণনা থেকে সম্পূর্ণ জানা যায় না। তাই উচ্চারিত অভিযোগকে চরিত্রের ইতিহাসের নির্ভুল দলিল হিসেবে পড়া বিপজ্জনক। হেমেন দ্বিজেনকে যেমন দেখতে চাইছেন, তার মধ্যে নিজের অনুপস্থিত সুযোগের কল্পনা আছে। বন্ধুর সাফল্যকে বাড়িয়ে দেখলে নিজের ব্যর্থতার ব্যাখ্যাও সহজ হয়: অন্যের চেহারা, সামাজিক স্বভাব অথবা ভাগ্য ভালো, নিজের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এই চিন্তা মানুষকে কিছুক্ষণ সান্ত্বনা দিতে পারে, আবার আরও ক্ষতিও করে। হেমেনের মুখে দ্বিজেন সম্পর্কে এত কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত পাঠক হেমেনকেই বেশি জানেন। দ্বিজেনের নীরবতা হেমেনের উচ্চারণের উপর অনিশ্চয়তার হালকা ছায়া রাখে।
আলাপের এক জায়গায় হেমেন সরাসরি জানতে চান, তার জীবনে ভালোবাসার অভাব কেন। কথাটির মধ্যে গভীর যন্ত্রণা আছে। এতক্ষণ যিনি নিজের আভিজাত্য বা পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে চাইছিলেন, তিনি হঠাৎ অনুরোধের ভঙ্গিতে উত্তর চান। অথচ দ্বিজেনের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা আসে না। প্রেম পাওয়া কিংবা না পাওয়া কোনো একক কারণের হিসাব নয়। নিজের চেহারাকে দোষ দেওয়ার ভাবনাটিও হেমেনের আত্মরক্ষার পথ হতে পারে; কেবল বাহ্যিক রূপে সম্পর্কের জটিলতা শেষ হয় না। তিনি যে ধরনের মনোযোগ চান, অন্য মানুষের কাছে তা কতখানি দিয়েছেন, প্রশ্নটি তার বক্তব্যেই সুপ্ত। কিন্তু গল্প তাকে প্রস্তুত নৈতিক পাঠ শুনিয়ে থামায় না। মানুষ নিজের সীমা বুঝতে চেয়েও পরমুহূর্তে আক্ষেপে ফিরে যেতে পারেন। হেমেনের আত্মপ্রকাশ এই অসম গতি নিয়ে সত্য। (জীবনানন্দ দাশ, ‘মেয়েমানুষ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, চতুর্থ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ১৯৯–২০০।)
হেমেনের কথায় যৌন আকর্ষণের ইঙ্গিত আছে, কিন্তু সেগুলি শুধুই শরীরের হিসাব নয়। তিনি ভালোবাসা, প্রণয়, ক্ষণিক সম্পর্ক এবং সামাজিক নিয়ম ভাঙার দম্ভকে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলেন। কারও স্ত্রীকে ঘিরে কেলেঙ্কারিতে জড়ালেও নিজের জীবনে ঘটনার তীব্রতা আসত, এমন ভাবনা তার নিঃসঙ্গতার করুণ দিক প্রকাশ করে। সেখানে অন্য মানুষের সম্মতি বা ক্ষতির গুরুত্ব কম, নিজের জীবনে কিছু একটা ঘটার আকাঙ্ক্ষা বেশি। এই দৃষ্টিকে সোজাসুজি সমর্থন করা যায় না; তবু তার ভিতরের শূন্যতাও উপেক্ষিত থাকে না। গল্পকার হেমেনকে কথা বলতে দিয়ে পাঠককে তার আত্মকরুণার পাশাপাশি অন্যকে ব্যবহারের প্রবণতাও শুনতে দেন। সংলাপের নৈতিক জটিলতা এখানেই। একটি মানুষ অসহায় হতে পারেন, একই সময়ে নিজের অসহায়তা কাটাতে অন্যের জীবনকে উপকরণ ভাবতেও পারেন। সাহিত্য এই বিপরীত সত্য পাশাপাশি রাখে, তাকে এক বিশেষণে শেষ করে না।
দ্বিজেন যত কম কথা বলেন, হেমেন ততই নিজের জীবনের বিচারে ডুবে যান। এই নীরবতা কৌশল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। দুজন সমান জোরে তর্ক করলে আলাপের লক্ষ্য জয়পরাজয়ের দিকে সরে যেত। দ্বিজেন শুনছেন বলে হেমেনের বক্তব্য বারবার নিজের দিকে ফিরে আসতে পারে। তবু দ্বিজেন কেবল শূন্যস্থান নন। তার সামনে বলছেন বলেই হেমেন নিজের তুলনাটি তীব্র করে তোলেন। যে মানুষকে প্রেমে সফল কল্পনা করেন, তার নীরব উপস্থিতি হেমেনকে ক্রমাগত উসকে দেয়। পাঠক দ্বিজেন সম্পর্কে হেমেনের বক্তব্যের সীমা দেখেন, আর দ্বিজেনের শ্রোতা থাকা দিয়ে পরিস্থিতির চাপ বোঝেন। সংলাপের মধ্যে কথক যখন হেমেনের মনের কথাও জানিয়ে দেন, তখন প্রকাশ্য বক্তৃতা ও অপ্রকাশ্য আত্মবিচার পরস্পরকে সম্পূরক করে। একজনের উচ্চারণের বিরতি আরেক স্তরের ভাষার সুযোগ আনে।
চুরুট টানার ভঙ্গিতে হেমেনের কথার গতি থামে। দীর্ঘ অভিযোগের পরে নীরবতা এসে বসে; মানুষটি নিজের কথার বোঝা নিয়ে থাকেন। চুরুট কেবল আড্ডার অভ্যাস নয়, অস্বস্তির মুহূর্তে হাতে ধরা বস্তু। শরীর নড়ছে, ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। জীবনানন্দ এই ক্ষুদ্র বাহ্যিক কাজ দিয়ে ভেতরের অবস্থা ধরেন। হেমেনের মনের আত্মকামড়ানোর অনুভবকে কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাবিদ্যার রোগে নামিয়ে আনার দরকার নেই। হতাশা শরীরেও চাপ সৃষ্টি করে, নিজের ব্যর্থতার ধারণা চিন্তাকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করে, এই অভিজ্ঞতা বোঝাতে ভাষা তীক্ষ্ণ হয়। যে মানুষ কিছুক্ষণ আগেও অন্যের জীবন নিয়ে অনায়াসে রসিকতা করছিলেন, তিনি শেষে নিজের জীবনকেই সহ্য করতে পারছেন না। দৃশ্যটির শ্লেষ ও করুণা এই স্থানান্তরে। পাঠক তাকে নিয়ে হাসতে পারেন, আবার হাসির ভিতর বিষাদ অনুভব করেন।
হেমেনের মোটরগাড়ি অথবা পোশাকি শহুরে অভ্যাস নিয়ে যে বিদ্রূপ আসে, তা সহজ শ্রেণিচিহ্ন হিসেবে পড়তে হবে। আর্থিক সুবিধা চলাফেরার অবসর দিতে পারে, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা নিশ্চিত করে না। গাড়িতে একা ঘুরে বেড়ানোর ছবি তাই গতি ও স্থবিরতার দ্বৈত অনুভব তৈরি করে। রাস্তা বদলাচ্ছে, মানুষের ভিতরের আকাঙ্ক্ষা একই স্থানে আটকে। ক্লান্ত ঘোড়ার সঙ্গে তুলনায় যান্ত্রিক গতির একটি কৌতুকপূর্ণ বিপরীতও আছে। কিন্তু মোটরগাড়ি নিজেই প্রেমহীনতার কারণ নয়; হেমেন যে মানুষকে পৌঁছাতে চাইছেন তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পারছেন না, তাই যাত্রার তীব্রতা ফাঁকা লাগে। শহরের আলো বা অন্ধকার সামাজিক আবহ তৈরি করে, তার ভিতর দিয়ে এক ব্যক্তির অতৃপ্তি দেখানো হয়। সমস্ত সমাজের স্থবিরতা একটি গাড়ির শব্দে চূড়ান্ত প্রমাণিত, এমন সিদ্ধান্তের চেয়ে নির্দিষ্ট চরিত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে দৃশ্যটি মিলিয়ে দেখা অধিক সঙ্গত।
‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পে যে চিঠি লেখা হচ্ছে, তার উদ্দেশ্যই দূরে থাকা স্ত্রী অনুপমা। পত্রের রীতি নিজস্ব একটি সময় তৈরি করে: লেখক এখন বলছেন, প্রাপক পরে পড়বেন; সরাসরি উত্তর তৎক্ষণাৎ নেই। ফলে কথক নিজের অনুভব দীর্ঘ করে সাজানোর অবকাশ পান। পাশাপাশি বিপদও আছে। যার কাছে অভিযোগ, তার জবাব না শুনেই তার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা সহজ হয়। গল্পের প্রথম পুরুষ এই সুবিধা ও সীমা দুইই বহন করেন। তিনি বাড়ির অবস্থা, রান্নার অসুবিধা, মা বা পিসিমার সহায়তা এবং চাকর অর্জুনের কথা নিজের ভাষায় বলেন। পাঠক তার নিঃসঙ্গতা জানেন, কিন্তু এই ঘরের প্রতিটি মানুষের সমান পূর্ণ জবানবন্দি পান না। চিঠিটি তাই শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, সম্পর্কের ভিতরে কথকের অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা। লেখা যত দীর্ঘ হয়, তত বোঝা যায় তিনি সঙ্গ চান, আবার সঙ্গের দাবির কাছে নিজেকে দিতে দ্বিধা করেন।
পত্রলেখা মাঝপথে থেমে গেলে বাইরে থেকে ঘুঘুর ডাক আসে। গাছপালার ভিতর পাখির শব্দ শুনে কথক অন্যমনস্ক হন, কলম রেখে বসে থাকেন, পরে আবার লেখেন। এই বিরতি পত্রের সময়কে দৃশ্যমান করে। যে লেখা পাঠক হাতে পাচ্ছেন, তা এক নিশ্বাসে তৈরি হয়নি। মানুষটির চারদিকে দুপুর চলছে, বাইরে প্রাণের শব্দ আছে, তার মন আবার চিঠির কথায় ফিরছে। পাখির ডাককে নিঃসঙ্গতার একটি নির্দিষ্ট সংকেত ভাবা যায়, কিন্তু ঘুঘু চিরকাল শুধু বিষাদের পাখি নয়। নির্দিষ্ট সময়ে একা বসে থাকা মানুষের কাছে পুনরাবৃত্ত ডাক নিজের নীরবতাকে বেশি স্পষ্ট করে। পাখির প্রকৃত শব্দ এবং মন যে অর্থ শুনছে, দুটির যোগেই আবহ জন্মায়। প্রকৃতি কথকের মনকে কেবল প্রতিফলিত করে না; কখনো তার চিন্তার গতি থামিয়ে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৭–২৯৮।)
কলম থামানোর মুহূর্তটি গল্পের কাঠামোয়ও জরুরি। কথক চিঠির মধ্যে নিজের কথা লিখছিলেন, হঠাৎ লিখতে থাকা নিজের শরীর ও চারপাশ সম্পর্কে জানান। পাঠক চিঠির বিষয় থেকে চিঠি তৈরির ঘটনার দিকে তাকান। পত্রের অন্তরঙ্গ স্বর তখন আরও জটিল হয়: অনুপমাকে যা জানানো হচ্ছে, তা লেখার সময় কথক নিজেও বদলাচ্ছেন। যে অনুভব নিয়ে প্রথম বাক্য শুরু করেছিলেন, দুপুরের পাখি শুনে একই সুরে ফিরতে পারেন কি না, প্রশ্নটি ওঠে। জীবনানন্দ পত্ররীতির এই সুযোগ ব্যবহার করেছেন। কাহিনি কেবল চিঠিতে উল্লেখিত ঘটনার সমষ্টি নয়; লেখার বিরতি, পুনরারম্ভ এবং অন্যমনস্কতাও তার অংশ। এমন রচনায় গল্পের বর্তমান সময় প্রাপককে উদ্দেশ্য করে লেখা বাক্যের ভিতরে লুকিয়ে থাকতে পারত; কথক কলম রাখার খবর দিয়ে তাকে প্রকাশ করেন। পাঠক উপলব্ধি করেন, লেখার কাজটিও তার নিঃসঙ্গতার একটি প্রতিক্রিয়া।
চিঠিতে চাকর অর্জুনের উল্লেখে কথকের পর্যবেক্ষণের রসিকতা প্রকাশ পায়। অর্জুন মাঝেমধ্যে যত্ন নিয়ে ছোট কাজ করেন, আবার কাজ ছেড়ে তাস, ঘুম অথবা যাত্রার আসরে চলে যান। কথক তার অনিয়ম দেখে বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু বর্ণনায় মৃদু কৌতুকও আছে। পৌরাণিক অর্জুন ও শিখণ্ডীর নাম নিয়ে তাকে দুই বীরের মাঝের কোনো অবস্থানে বসানোর চেষ্টা আসলে নামের সঙ্গে আচরণের অসংগতি থেকে জন্মানো রসিকতা। তবে এতে অর্জুনের স্বাধীন জীবনও আভাস পায়। চাকর হিসেবে কেবল শ্রম দিলেই তার পরিচয় শেষ নয়; খেলা দেখতে, গাছতলায় ঘুমোতে এবং নিজের আনন্দের পথে যেতে তিনি চান। কথক সেই দিকটিকে বিদ্রূপ করেও লক্ষ্য করেন। চাকরের কাজের অনিয়মকে শুধু অলসতা বলে শেষ করলে শ্রেণিসম্পর্কের প্রশ্ন হারায়। অন্যের জন্য কাজ করা মানুষটির নিজের অবসরের প্রয়োজনও গল্পের ভিতর দৃশ্যমান। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৮।)
অর্জুনের সঙ্গে কথকের কোনো সাদৃশ্য থাকলে তা প্রমাণ করতে তাদের অবস্থানের পার্থক্যও মনে রাখা দরকার। কথক নিজের নিঃসঙ্গতা নিয়ে দীর্ঘ চিঠি লিখতে পারেন, চাকরের ব্যর্থতা ও অভ্যাসের ভাষা নির্ধারণ করতে পারেন। অর্জুনের সেই ক্ষমতা গল্পে নেই। তবু উভয়েই কাজের মধ্যে অনিয়মিত মনোযোগ, বিশ্রামের আকাঙ্ক্ষা এবং দূরে যাওয়ার ইচ্ছা বহন করতে পারেন। এক জনের আলস্য রোমান্টিক নিঃসঙ্গতা, অন্য জনের আলস্য চরিত্রদোষ, এমন শ্রেণিগত দ্বিমুখী বিচারের বিপদ আছে। কথকের কৌতুক পড়ে পাঠক অর্জুনকে হাস্যকর ভাবতে পারেন; আবার বুঝতে পারেন, নিজের মতো সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা কথকের স্বপ্নেও প্রবল। এই মিল পত্রের ভিতর অপ্রত্যাশিত আত্মসমালোচনার সুযোগ খুলে দেয়। অর্জুন কথকের ‘আত্মার সহোদর’ কিনা নিশ্চিত বলা যায় না, কিন্তু তার সম্পর্কে বলা কথায় কথকের নিজের বিরতিপ্রিয় স্বভাব প্রতিফলিত হতে পারে। এই সম্ভাবনাই চরিত্রের সম্পর্ককে একমুখী বর্ণনার চেয়ে গভীর করে।
রান্নার কথা উঠলে চিঠির স্বর বদলে যায়। মসলাহীন তরকারি, অতিরিক্ত নরম ভাত, নোনা কম কিংবা বেশি হওয়ার অভিযোগে গৃহস্থ জীবনের বাস্তব অভাব আছে। কথক অনুপমাকে এই দৃশ্য দেখিয়ে সহানুভূতি চান। একই সঙ্গে বলেন, স্ত্রীর জীবন রান্না করায় সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত নয়। কথার এই দ্বিমুখী চলন লক্ষণীয়। তিনি প্রথাগত প্রত্যাশাকে অস্বীকার করেন, কিন্তু নিজের খাবারের কষ্টের তালিকা এমনভাবে দেন যে অনুপমা এসে রান্নার ব্যবস্থা করলে ভালো হত, সে ইঙ্গিতও প্রবল। এতে তাকে কেবল ভণ্ড বলা যথেষ্ট নয়। মানুষ বিশ্বাসে এক কথা বলতে পারেন, অভ্যাসে অন্য চাহিদা বহন করতে পারেন। পত্রের অন্তরঙ্গতায় সেই ফারাক অজান্তে বেরিয়ে আসে। রাঁধুনি হিমাংশুর মায়ের শরীরের ক্লান্তি বা রান্নার উপকরণের সীমা কথকের বিবরণে কতখানি স্থান পায়, সেটিও পাঠক ভাবতে পারেন। অভিযোগের অধিকার আছে, অন্যের শ্রমের ইতিহাসও আছে। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৯।)
অনুপমার প্রতি কথকের অভিমান কতটা ন্যায্য, চিঠিটি একা তার পূর্ণ বিচার করতে পারে না। বহুদিন খবর না নেওয়ার কথা তিনি নিজেও স্বীকার করতে পারেন; নীরবতা দুই পক্ষের হতে পারে। তবু চিঠিতে তিনি নিজের অভাবের দৃশ্য সাজাচ্ছেন, অনুপমার অনুপস্থিতির মূল্য বোঝাতে চাইছেন। এই চেষ্টায় অভিযোগের পাশাপাশি কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। যদি সত্যিই অনুপমাকে প্রয়োজন না হত, খাবারের প্রতিটি ছোট কষ্টের বিস্তারিত বর্ণনা তাকে উদ্দেশ্য করে কেন লিখতেন? কথক সঙ্গ চাইতে গিয়েও নিজের একাকিত্বের গৌরব রক্ষা করেন। তিনি যেন বলতে চান, অনুপমা না এলেও থাকতে পারেন; আবার সঙ্গ না পাওয়ার তীব্রতা জানাতেও চান। এই দোদুল্যমানতায় পত্রের সত্য। স্ত্রী কী ভাবেন, তার উত্তর না থাকায় কথকের বক্তব্যকে তার চরিত্রের নিশ্চিত রায় হিসেবে না পড়াই ভালো। পাঠক কেবল একটি দিকের ব্যথা শুনেছেন।
পিসিমা খাবার পাঠালে চিঠিতে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ছোট্ট এক অস্বস্তিও আসে। খাবার আসে সুন্দর ডিশে, ফেরত দেওয়ার সময় যত্ন নিতে হয়। পিসিমা নিজে উপস্থিত থেকে পরিবেশনের রীতি দেখেন। কথক হয়তো এই দৃষ্টিকে দূরত্ব ভাবছেন, কিন্তু পিসিমার বস্তু যত্ন এবং আত্মীয়কে খাবার দেওয়া একই সঙ্গে সম্ভব। ডিশ ভাঙার ভয় মানেই খাবার পাঠানোর সহানুভূতি মিথ্যা, এমন নয়। কথক যেভাবে ক্ষুদ্র ভঙ্গিতে সম্পর্কের ব্যবধান অনুভব করেন, সেটিই দৃশ্যটির আসল বিষয়। তিনি যত্ন পান, কিন্তু নিঃশর্ত ঘনিষ্ঠতা পান কি না, সে নিয়ে নিশ্চিত নন। অন্যের সাহায্যেও তিনি বিধিনিষেধের ছায়া দেখেন। পিসিমার অবস্থান জানতে তার নিজের ভাষা দরকার, যা চিঠিতে নেই। তাই সামান্য ডিশ একাধিক অর্থ বহন করে: পারিবারিক সেবা, সম্পত্তির যত্ন এবং সাহায্য নিতে গিয়ে কথকের সংকোচ। জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩০২।
গল্পের সময়ে দুপুর, সন্ধ্যা এবং রাত ফিরে আসে, কিন্তু প্রতিটি একই রকম নিঃসঙ্গতার সংকেত নয়। দুপুরে ঘুঘুর ডাক লেখাকে থামায়; অশ্বত্থতলায় কাটানো দুপুর কাজ ও অবসরের মাঝের অস্পষ্ট জায়গা; সন্ধ্যায় ফিরে ক্ষুধা পাওয়ার সময় শরীরের প্রয়োজন সামনে আসে। সময়ের নাম একই হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী অর্থ বদলায়। দিনতারিখ না থাকায় সব দুপুর সমার্থক হয়ে যায় না। কথক কখন কী করেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়, কোথায় একা বসেন, এসব ক্রিয়া সময়কে বিশেষ করে। জীবনানন্দ অনেক ঘটনার নির্ভুল তারিখ বাদ দিয়ে দিনের আবহ রাখেন। এতে পত্রের স্বর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার মতো হয়: একটি দিনের ঘটনা, আবার অনেক দিনের পুনরাবৃত্তির স্মৃতি। পাঠক ভেবে দেখতে পারেন, বারবার একইরকম দুপুর কাটলে মানুষের নিজের জীবন সম্পর্কে কী ধরনের গল্প তৈরি হয়। সময় তার চরিত্রে কাজ করে, কেবল পটভূমি নয়।
বার লাইব্রেরি এবং অশ্বত্থতলার ব্যবধানেও কথকের পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত আশ্রয়ের পার্থক্য দেখা যায়। পেশার নির্দিষ্ট স্থানে অল্প সময়, গাছতলায় বেশি সময় কাটানোর কথা বললে কাজের দায়ের সঙ্গে দূরত্ব বোঝা যেতে পারে। কিন্তু অশ্বত্থতলা নিছক কর্মবিমুখতার স্থান নয়; সেখানে বসার জায়গা, অন্য মানুষের সম্ভাব্য উপস্থিতি এবং খোলা বাতাস আছে। কথক গৃহের অসন্তোষ থেকে বেরিয়ে এমন একটি মধ্যবর্তী পরিসরে থাকেন, যা পুরোপুরি সমাজছাড়া নয়। গাছের নীচে বসে তিনি মানুষজন দেখতে পারেন, নিজের ভাবনাও ধরে রাখতে পারেন। ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা সব সময় বন্ধ ঘরের দাবি করে না। জনসমাগমের ধারেও মন একা থাকতে পারে। জীবনানন্দ স্থানবর্ণনায় এই সূক্ষ্ম ভেদ আনেন। পেশার ঘর, গৃহের ভিতর এবং খোলা গাছতলা কথকের কাছে তিন রকম সময় ও সম্পর্ক তৈরি করে। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩০০।)

বাড়ির ভাঙা দেয়াল, ফাটা মেঝে এবং আগাছার বিবরণে পরিবারের ইতিহাস দৃশ্যমান হয়। পাথর, ইট অথবা ভাঙা আসবাব নিজে থেকেই নৈতিক পতনের প্রমাণ নয়; কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্ন, টাকার অভাব ও পুরোনো মর্যাদা ধরে রাখার অসুবিধা দৃশ্যের মধ্যে জমে। কথক হেঁটে চলতে চলতে আগের মানুষদের স্মরণ করেন। তাই ভাঙা বাড়ি তার কাছে একদিকে বাস্তব বাসস্থানের সমস্যা, অন্যদিকে স্মৃতির গন্ধে ভরা স্থান। সাপ বা ইঁদুরের উপস্থিতি অনিরাপত্তা আনে; আবার পরিত্যক্ততার মধ্যেও জীবন থেমে নেই। সাপ মানেই সৃষ্টিশীল শক্তি অথবা শুধু মৃত্যুভয়, কোনোটিই স্থির করা যায় না। কথকের চোখে তা কখনো বিপদের স্মৃতি, কখনো গোপন চলাচলের আভাস। বাড়ির প্রতিটি বস্তু ব্যবহারিক সত্য রেখে প্রতীকী সম্ভাবনাও পায়। স্মৃতি এবং ক্ষয়ের সংযোগে কথকের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পায়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৮।)
এই ভাঙা বাড়ি থেকে বেরিয়ে কথক এক নির্জন গ্রামীণ ঘরের স্বপ্ন লেখেন। কাঁটাঝোপ, ঘাস, পোকামাকড়, প্রজাপতি এবং অশ্বত্থের ছায়া নিয়ে দীর্ঘ বাক্য ছড়িয়ে যায়। দৃশ্যগুলির মধ্যে হাঁটার মতো গতি আছে; একটি গাছ থেকে অন্য গাছে, দৃশ্য থেকে গন্ধে, গন্ধ থেকে নীরব বসার স্থানে পৌঁছায়। এই কল্পনা বর্তমানের দুঃখ মুছে দেয় না, কিন্তু তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার অন্য রূপ দেয়। বাস্তবে তিনি এমন ঘর তুলতে পারবেন কি না, গল্প জানায় না। স্বপ্নের শক্তি তার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তায় নয়; যে জীবন এখন সহ্য করতে কঠিন, তার বিপরীতে কোন ধরনের গতি, শ্রম ও নির্জনতা তিনি চান, তা স্পষ্ট করায়। তবু নির্জনতার এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে স্ত্রীকে লেখা চিঠির আকাঙ্ক্ষা বিরোধ তৈরি করে। তিনি কি সত্যিই একা থাকতে চান, নাকি চাপমুক্ত সঙ্গের স্থান চান? দীর্ঘ প্রকৃতিবর্ণনা সেই প্রশ্নের ভিতরেই পড়তে হয়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৬।)
প্রকৃতির এত নাম একসঙ্গে আসা শুধু অলংকার নয়। কথক নিজের কল্পিত জীবনের দৈর্ঘ্য বাড়াতে চান, যেন শাদা পথের পাশের প্রতিটি পোকা ও ফুল দেখার সময় থাকবে। বর্তমান সংসারের রান্না, ফাটা দেয়াল, কাজের সময় এবং আত্মীয়দের শর্তযুক্ত সহায়তা তার দিনকে খণ্ডিত করে; প্রকৃতির দীর্ঘ বর্ণনা সেই খণ্ডনের মধ্যে বিস্তারের অনুভব। ভাষার তাল এতে বদলে যায়। অভিযোগে যেখানে কথার কাঁটা, স্বপ্নে সেখানে একটি জিনিস অন্যটির দিকে খুলে যায়। ইন্দ্রিয়ের রং, গন্ধ ও স্পর্শ চিঠির প্রাপকের কাছে শুধু তথ্য পাঠায় না; কথকের আকাঙ্ক্ষিত শান্তির অভিজ্ঞতাও পৌঁছাতে চায়। অনুপমা এই দৃশ্য পড়ে কী অনুভব করবেন, জানা যায় না। পত্রের শিল্পিত শক্তি এখানেই, প্রাপক অনুপস্থিত হলেও তার দিকে একটি সম্পূর্ণ অনুভব পাঠানোর চেষ্টা চলছে। চিঠি একতরফা বলে এর যোগাযোগের বাসনা মিথ্যা নয়।
স্ত্রী জীবনে আসার পরে কথকের মনের ভিতর যে অচেনা সুর জন্মেছিল, তার কথা লিখতে গিয়ে ভাষা আরও প্রসারিত হয়। তিনি জানতে চান, সে সুর কি অনুপমার, নিজের, নাকি দিনের আলো, পথ, নদী ও বহু রূপের সম্মিলিত কোনো অভিজ্ঞতা। এই প্রশ্নে স্ত্রীর ব্যক্তিগত উপস্থিতি কখনো বৃহত্তর প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। রচনার সৌন্দর্য এতে উজ্জ্বল, তবে অনুপমার নিজস্ব মুখ কল্পনার সুরের আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে। যে চিঠি তাকে লেখা, তাতেই কথক অনুভবটিকে এক সময়ে ‘তুমি’ এবং ‘আমি’ উভয়ের বাইরে নিয়ে যান। তা প্রেমের প্রসার হতে পারে, আবার পারস্পরিক বোঝাপড়ার বাস্তব সমস্যাটি পাশ কাটানোর পথও। জীবনানন্দের কাব্যিক গদ্য এই দ্বিধা বহন করে। প্রকৃতির অসংখ্য দৃশ্য এক অনুভবকে বিশাল করে, কিন্তু যার কাছে চিঠি পৌঁছবে তার জবাব এখনো অজানা। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৭।)
এই বিস্তৃত বাক্যে নদী, রোদ, পাখির ডানা, মৃত মানুষের চিহ্ন এবং কুয়াশা পরস্পরের পাশে আসে। একটি স্থির সময়ে সব ঘটনা ঘটছে না। স্মৃতি, বর্তমানের অনুভব এবং বহু যুগের ভাবনা একই সুরে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাকে চেতনাপ্রবাহের কোনো একটি প্রস্তুত সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাক্যের কাজ দেখা ভালো। কথক প্রথমে উৎস জানতে চান, তারপর সম্ভাব্য উৎসের তালিকা যত বাড়ে, প্রশ্নটিও প্রসারিত হয়। উত্তর অনির্দিষ্ট, কিন্তু সেই অনির্দিষ্টতা থেকে ভাষার গতি জন্মায়। সাধারণ বর্ণনা বলত, স্ত্রীকে দেখে তার মনে ভালোবাসা হয়েছিল; কথক তা যথেষ্ট মনে করেন না। তিনি নিজের অনুভূতির বিস্তার বোঝাতে এমন সব দৃশ্য আনেন, যা নির্দিষ্ট দাম্পত্য ঘটনাকে ছাড়িয়ে যায়। এই ছাড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তিগত সত্য, কিন্তু অনুপমার সঙ্গে সম্পর্কের চূড়ান্ত সত্য নয়। পাঠক গদ্যের সংগীত এবং মানুষের অসম্পূর্ণ সাক্ষাৎ দুইই অনুভব করতে পারেন।
পরে বাড়িটি ভবিষ্যতে কার হবে, এই প্রশ্ন ওঠে। কথক বিশ বা পঞ্চাশ বছর পরের জঙ্গল, পাখি ও রাত ভাবেন। যে ঘর এখন নিজের, সময়ের পরে সে অন্য মানুষ অথবা অন্য প্রাণীর আশ্রয় হবে। সম্পত্তির স্থায়িত্ব নিয়ে তার বিশ্বাস কম; বাড়ির দেয়াল ভাঙছে, মানুষও চিরদিন থাকে না। চিত্রটি বিষাদময়, তবু লক্ষ্মীপেঁচা ও জোনাকির জীবন দিয়ে বাড়ির ভবিষ্যৎ পুরো নিঃস্ব হয় না। মানুষের বসতি সরে গেলে প্রকৃতি স্থানটিকে অন্য ব্যবহারে নিয়ে যাবে, এমন কল্পনা আছে। এটিকে মানুষের জীবন অর্থহীন বলার ঘোষণা করা যায় না। বরং নিজের ক্ষণস্থায়ী অবস্থান বোঝার মধ্যে অন্য প্রাণীর দীর্ঘ চলা উপলব্ধ হয়। কথকের ‘আমার বাড়ি’ বলার অধিকারের সীমানা সময়ে এসে ক্ষীণ হয়। জীবনের এই পরিমাপ তাকে নিঃসঙ্গও করে, আবার বৃহত্তর পৃথিবীর অংশ হিসেবেও ভাবায়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৮–২৯৯।)
এই গল্প সাধুভাষায় লেখা, কিন্তু সাধুভাষা মানেই স্থির আনুষ্ঠানিক দূরত্ব নয়। কথক চিঠি লিখছেন; দৈনন্দিন রান্নার অভিযোগ থেকে সামান্য পরেই তাঁর বাক্য প্রকৃতির দীর্ঘ সুরে যায়। ভাষার ক্রিয়ারূপ পুরোনো রীতির, অভিজ্ঞতার পরিবর্তন বর্তমান ও ঘনিষ্ঠ। কোনো কোনো জায়গায় কথ্য ভঙ্গির কাছাকাছি কৌতুক, অন্য জায়গায় উচ্চকিত চিত্রকল্প; একই ভাষার ভিতরে এই নমনীয়তা আছে। চরিত্র যাকে বলেন আর নিজের কাছে যেভাবে ভাবেন, তার মধ্যে ভেদ থাকলেও পত্ররীতি সেই দুই স্বর কাছাকাছি আনে। সাধুভাষার দীর্ঘ বাক্যে গাছপালার নাম, গন্ধ ও স্মৃতির স্তর সহজে জমে, কিন্তু গদ্য বোধগম্য রাখার জন্য কোথাও ক্ষুদ্র ব্যবহারিক বাক্যও লাগে। জীবনানন্দের ভাষার বিচিত্রতা বানান বা ক্রিয়ারূপের বাহ্যিক পার্থক্যে নয়; দৈনন্দিন বস্তু আর অনির্ণীত অনুভবকে একই চিঠিতে ধারণ করায়।
পত্রের পরিণামে অর্জুনের বেদনা উল্লেখিত হলে গল্পের কেন্দ্র সরে যায় বলে মনে হতে পারে। এতক্ষণ স্ত্রীকে লেখা দাম্পত্যের অভিমান ও নিজের প্রকৃতিপ্রীতি চলছিল, এখন চাকরের ব্যক্তিগত দুঃখ সামনে আসে। এই পরিবর্তনকে অসংযত বিষয়ান্তর বলার আগে দেখতে হয়, কথক অন্যের দুঃখ শুনতে বা দেখতে কতটা প্রস্তুত। অর্জুন প্রথমে কৌতুকের চরিত্র ছিলেন; পরে তাঁরও বিচ্ছেদবেদনা থাকলে কথকের নিজের নিঃসঙ্গতার তুলনায় এক নতুন মানুষ দৃশ্যমান হন। তবে অর্জুনের দুঃখ কথকের ব্যথার অলংকার হয়ে গেলে তার স্বাধীন অভিজ্ঞতা হারায়। জীবনানন্দ পরিণামে যে স্থানান্তর ঘটান, তা পাঠককে এই প্রশ্নে দাঁড় করায়: এক জন নিজের দীর্ঘ চিঠির শেষে অন্যের জীবনের দুঃখকে কীভাবে জায়গা দেন? সামান্য এই সম্প্রসারণেই গল্পের সম্পর্কের পরিসর বদলায়।
‘মেয়েমানুষ’ গল্পে হেমেনের আলাপ এবং ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পে চিঠির কথকতা পাশাপাশি রাখলে অন্যকে সম্বোধনের দুটি ভিন্ন ভঙ্গি দেখা যায়। হেমেনের সামনে দ্বিজেন আছেন, অথচ উত্তর পাওয়ার চেয়ে নিজের আক্ষেপ শোনানোই তার প্রধান প্রয়োজন। চিঠির কথকের সামনে অনুপমা নেই, তবু প্রতিটি অভিযোগ তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার জন্য সাজানো। দুক্ষেত্রেই অন্য মানুষটি পুরোপুরি অনুপস্থিত নন, আবার পূর্ণ উত্তরদাতাও নন। একটিতে শারীরিক উপস্থিতির মধ্যে শ্রবণের ফাঁক, অন্যটিতে শারীরিক দূরত্বের মধ্যে কল্পিত আলাপ। সংলাপের অসমতা চরিত্রের বিচ্ছিন্নতা প্রকাশ করে। তবে তা যোগাযোগের অনিবার্য ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। কথকরা চেষ্টা করছেন, ভুল করছেন, নিজের কথা বাড়িয়ে বলছেন। এই প্রচেষ্টার বাস্তব রূপই গল্পের শক্তি। নিঃসঙ্গতা কখনো কথা কমায়, কখনো আরও বেশি কথা বলায়।
দুটি গল্পের হাসির সুরও আলাদা। হেমেনের আত্মবিরোধে পাঠক বিরক্তি ও করুণার মাঝামাঝি হাসেন। দ্বিজেনকে অভিযুক্ত করতে করতে তিনি নিজের ব্যর্থতা প্রকাশ করেন; সামাজিক পুরুষত্বের দাবির সঙ্গে ব্যক্তিগত অসহায়তা মেলে না। পত্রের কথক রান্না, ডিশ অথবা চাকরের অলসতা নিয়ে লিখলে স্বর অনেক সময় কোমল কৌতুকে ভরে ওঠে। তবু সেই হাসির নিচে একটি দাবি আছে, কেউ যেন তার অভাব বুঝতে পারেন। এক ধরনের শ্লেষ প্রকাশ্য আঘাত থেকে আসে, অন্যটি নরম অভিমান থেকে। জীবনানন্দ উভয় ক্ষেত্রেই বক্তাকে নিজের ভাষায় উন্মোচিত হতে দেন। সমালোচকের কাজ হাসির লক্ষ্য নির্ধারণে সতর্ক থাকা। অর্জুনের উপর হাসি মানে তার মানুষসত্তা মুছে দেওয়া নয়, হেমেনের উপর হাসি মানে তার অপ্রাপ্তি অস্বীকার করা নয়। কৌতুকের ভিতর এই দ্বৈততা গল্পগুলিকে মানবিক রাখে।
সামাজিক শ্রেণির প্রশ্নে কথক ও হেমেনের অবস্থান আলাদা হলেও দুজনই অন্য মানুষের শ্রম অথবা মনোযোগ নিজের জীবনের মানদণ্ডে মাপেন। হেমেন নারীদের কাছ থেকে আকর্ষণ না পেয়ে নিজের চেহারার বিচার করেন, কিন্তু নারীরা তাকে কীভাবে দেখেন, খুব কম ভাবেন। চিঠির কথক রান্না নিয়ে স্ত্রী এবং রাঁধুনির সম্ভাব্য ভূমিকা বিচার করেন, কিন্তু তাদের প্রতিদিনের কাজের অবস্থা পুরো দেখেন না। এই সীমা চরিত্রদের বেদনাকে অসত্য করে না; পাঠককে বেদনার পাশাপাশি অধিকারবোধও দেখতে বলে। প্রত্যাশা না পূরণ হলেই অন্য মানুষ ব্যর্থ, এমন সহজ পথে গল্পগুলি শেষ হয় না। বরং কার প্রত্যাশা বলার ভাষা পায়, কার শ্রমকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়, প্রশ্ন উঠতে পারে। জীবনানন্দের গদ্য প্রায়ই সংবেদনশীল পুরুষচেতনার কাছে যায়; সেই নৈকট্যের ভিতর থেকেই তার সামাজিক অন্ধস্থানগুলি বোঝা সম্ভব।
স্থান ও সময়ের ব্যবহারে আবার মিল আছে। হেমেনের গাড়িতে চলার সুযোগ থাকলেও মনের প্রশ্নে তিনি আটকে যান। পত্রের কথক গৃহে, বার লাইব্রেরিতে বা অশ্বত্থতলায় যান, তবু স্ত্রী অনুপমার দূরত্ব সঙ্গে নিয়ে চলেন। বাহ্যিক চলাচল এবং ভেতরের একাকিত্ব অভিন্ন নয়। এক সময়ে হেমেনের বন্ধুর সঙ্গে বসা আর কথকের দুপুরে একা চিঠি লেখা দৃশ্যগত বিপরীত, মনস্তাত্ত্বিকভাবে কিছুটা আত্মীয়। দুজনেই অন্যের কাছ থেকে নিজস্ব উত্তর চান। কিন্তু উত্তর না পাওয়ার কারণ এক নয়। দ্বিজেন হয়তো সচেতনভাবে কম বলেন, অনুপমা তো উপস্থিতই নেই। তাই এক গল্পের নীরবতা অন্যটির নীরবতার প্রতিরূপ নয়। কথক কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, অন্যজনের বলার সুযোগ কতখানি, এই বাস্তব দিক দেখে নিঃসঙ্গতার অর্থ বিচার করতে হয়।
চিঠির প্রকৃতিবর্ণনা এবং হেমেনের কর্কশ অন্তর্কথনের তুলনায় ভাষার প্রসার ও সংকোচ দেখা যায়। কথক কল্পিত মাঠে যেতে যেতে গাছ ও পাখির নাম জমিয়ে দেন; তার বাক্য দীর্ঘ, যেন অবসরের দাবি ভাষাতেই বাস্তব। হেমেনের মন নিজেকেই প্রশ্ন করে, বাক্য ক্রমে ক্ষোভে তীক্ষ্ণ হয়। দুটি ভাষার কোনোটিই বিশুদ্ধ হৃদয়ের মাপকাঠি নয়। সুন্দর প্রকৃতিবর্ণনা করেও কথক স্ত্রী সম্পর্কে একপাক্ষিক বিচার করতে পারেন; কদর্য শব্দ ব্যবহার করেও হেমেনের ব্যথা সত্য হতে পারে। ভাষা চরিত্রের অনুভব প্রকাশ করে, তার নৈতিক সমাপ্তি নিশ্চিত করে না। জীবনানন্দের গল্পে শব্দ ও নীরবতার দ্বৈত ব্যবহার এই পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। কোথাও নামের দীর্ঘ তালিকা জীবনকে প্রসারিত করে, কোথাও একটি প্রশ্ন উত্তর না পেয়ে অন্ধকার বাড়ায়। শৈলী তখন ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জড়িত।
পরিণতির দিকে তাকালেও চিঠিকে সম্পূর্ণ আত্মস্বীকারোক্তি ভাবা যায় না। পত্র লেখার সময় মানুষ প্রাপকের কাছে নিজের একটি গ্রহণযোগ্য রূপ নির্মাণ করেন। কথক কষ্ট দেখান, সঙ্গে নিজের নিস্তব্ধতা ভালোবাসার কথাও বলেন; স্ত্রীর অভাব মনে করান, আবার নিঃসঙ্গ ঘরের স্বপ্ন দেখান। এই দ্বন্দ্ব সাহিত্যিক নির্মাণের অংশ এবং সম্পর্কের সত্যও। অনুপমা চিঠি পড়লে হয়তো ভিন্ন উত্তর লিখতেন; সেই উত্তর নেই বলে চিঠির বর্ণনাকে অভ্রান্ত ইতিহাস বলা চলে না। ঠিক যেমন দ্বিজেনের নীরবতায় হেমেনের বক্তব্য নিঃশর্ত সত্য হয় না। দুই গল্পই পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়, কোন সম্পর্কের কতখানি অংশ কথকের হাতে আছে। ভাষার সৌন্দর্য বা ব্যথার তীব্রতা কোনো বক্তাকে সর্বজ্ঞ বানায় না। বক্তার সীমা স্বীকার করলেই অন্য চরিত্রের অসম্পূর্ণ উপস্থিতিও পাঠে গুরুত্ব পায়।
‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ নামের দুটি শব্দের মধ্যে যে টান, তা গল্পের প্রতিটি স্তরে কাজ করে। কথক সঙ্গ চান, কিন্তু অন্যের কাছে ঋণী হতে অথবা নিজের পরিসর ছাড়তে চান কি না, সন্দেহ থাকে। তিনি একা দুপুর ভালোবাসেন, আবার ঘুঘুর ডাকের মাঝে চিঠি লিখে অনুপমাকে দূর থেকে ডাকেন। পরিবারের সাহায্য পান, সাহায্যের শর্তে দূরত্ব অনুভব করেন। অর্জুনের সঙ্গে হাসির সম্পর্ক রাখেন, শেষে তার ব্যথাও লক্ষ্য করেন। সঙ্গ এবং নিঃসঙ্গতা দুটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থা নয়; একটির ভিতর অন্যটির ছায়া থাকে। এই রূপ বুঝতে শিরোনামের দ্বন্দ্বকে গল্পের কোনো এক ঘটনার সমাধান বলে পড়া যাবে না। বরং পত্রের দীর্ঘ গতিতে মানুষ কখন কাছে যেতে চান এবং কখন সরে আসেন, তা দেখা দরকার। নিঃসঙ্গতার কাব্যিক আবহের সঙ্গে দৈনন্দিন সম্পর্কের হিসাবও তাতে থাকবে।
অর্জুনকে নিয়ে গল্পের শেষ প্রবণতা বিশেষ মূল্যবান, কারণ তা চিঠির কেন্দ্র থেকে পাঠককে একটু বাইরে নিয়ে যায়। কথকের আত্মবিশ্লেষণ এত দীর্ঘ যে অন্য চরিত্ররা তার বর্ণনার অধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অর্জুনের ব্যক্তিগত ক্ষতির ইঙ্গিতে বোঝা যায়, প্রত্যেকের নিজের আলাদা ব্যথা আছে। কথক সেটি পুরো জানতে পারেন না, তবু এক মুহূর্তে দেখেন। এতে তার নিঃসঙ্গতা মুছে যায় না; নিঃসঙ্গতার পৃথিবী বিস্তৃত হয়। হেমেন দ্বিজেনকে নিজের অপূর্ণতার মাপকাঠি করছিলেন, পত্রের কথক শেষ দিকে অর্জুনের স্বাধীন বিষাদের কাছেও পৌঁছতে পারেন কি না, গল্পের খোলা প্রশ্ন। এই প্রশ্নে সমাপ্তির আকস্মিকতা অর্থ পায়। গল্প কোনো জয় বা পরাজয়ের রায়ে থামে না; পাঠককে নিজের ব্যথার সঙ্গে অপরের ব্যথার দূরত্ব নতুন করে ভাবতে দেয়।
জীবনানন্দের সংলাপ ও পত্ররীতির কৌশল শেষ পর্যন্ত মানুষের ভেতরে লুকোনো একাধিক কণ্ঠকে দৃশ্যমান করে। হেমেন দ্বিজেনকে ডাকেন, আসলে নিজের হারানো প্রেমের সঙ্গে কথা বলেন; পত্রের কথক অনুপমাকে লেখেন, একই সঙ্গে নিজের নির্জন ভবিষ্যৎ আঁকেন। দুজনের ভাষায় অভিযোগ আছে, সঙ্গের প্রয়োজনও আছে। অন্য মানুষটি যেহেতু সম্পূর্ণ উত্তর দেন না, পাঠকের সামনে ব্যাখ্যার জায়গা খোলা থাকে। এই উন্মুক্ততা বিশৃঙ্খলা নয়। কোথায় বক্তা থামছেন, কোন বস্তুর দিকে তাকাচ্ছেন, কোন সময়ে প্রকৃতির ছবি ফিরছে এবং কাকে নিয়ে হাসছেন, রচনার বিন্যাস সে সব বেছে রাখে। শব্দ ও বিরতি মিলিয়ে সম্পর্কের অসম বাস্তবতা ধরা পড়ে। জীবনানন্দের গল্পে আত্মপ্রকাশ তাই কখনো পূর্ণ আত্মজ্ঞান নয়; অন্যের অনুপস্থিতি বা নীরবতার কাছে পৌঁছানোর অসমাপ্ত চেষ্টা।
চিঠির প্রাপক অনুপমাকে কেন্দ্র করে আরও একটি প্রশ্ন ওঠে: একজন মানুষকে উদ্দেশ্য করে লেখা দীর্ঘ বর্ণনা কি সত্যিই সেই মানুষটির সঙ্গে আলাপ? কথক তাকে স্মরণ করেন, তার সম্ভাব্য সহানুভূতি অনুমান করেন, কখনো তার না আসার অভিযোগ জানান। কিন্তু অনুপমার বর্তমান দিন কেমন কাটছে, কী কারণে তিনি দূরে আছেন, সে খবর খুব কম আসে। ফলে পত্রের সম্বোধন একদিকে সান্নিধ্যের পথ, অন্যদিকে প্রাপকের জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতার সাক্ষ্য। লেখক চাইলে স্ত্রীকে সরাসরি দৃশ্যে আনতে পারতেন; এখানে অনুপস্থিত রাখায় কথকের অপেক্ষা এবং অনুমান বেশি স্পষ্ট হয়েছে। পাঠক চিঠি পড়ে অনুপমার উত্তর কল্পনা করতে পারেন, কিন্তু সেই কল্পনাকে মূল কাহিনির তথ্য ঘোষণা করতে পারেন না। অনুপমাকে নিজের প্রশ্নের উত্তরে হাজির করিয়ে দেওয়া পাঠকের সুবিধা হতে পারে; গল্পের সীমা সে সুবিধা দেয় না। সীমাটিই সম্পর্কের দূরত্ব বুঝতে সাহায্য করে।
রান্নার অভিযোগের সূক্ষ্মতা এই প্রাপকের অনুপস্থিতির সঙ্গে জড়িত। কথক নির্দিষ্ট স্বাদ, রান্নার উপাদান এবং খাবারের রূপ এত বিস্তারিত লিখছেন যেন অনুপমা নিজের চোখে দেখে বিচার করতে পারেন। তথ্যের আধিক্য অনুপমার সম্ভাব্য অনুভব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হতে পারে। তবু তথ্যগুলি নিজের কষ্ট জানানোর সরল বাসনাও বহন করে। পত্রের ভাষা এই দ্বৈত কাজ করে: যা ঘটেছে জানায়, আবার প্রাপক তা কীভাবে বুঝবেন তার পথও দেখাতে চায়। এখানে একটি গৃহস্থ তালিকা শিল্পিত হয়ে ওঠে, কারণ প্রতিটি খাবারেই অভাবের চেয়ে বড় সম্পর্কগত প্রশ্ন জমা হয়। স্ত্রী যদি থাকতেন, কি সত্যিই রান্নার ফল আলাদা হত, নাকি একা না থাকার অনুভবেই খাবারের স্বাদ বদলাত? কথক নিজেও এই প্রশ্নে পুরো স্থির নন। ব্যবহারিক দরকার ও সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষা একে অন্যের ভাষা ধার করে।
চিঠিতে কথকের মায়ের অনুপস্থিতিও খাবারের স্মৃতির ভিতর ফিরে আসে। পরিচিত রান্নার সঙ্গে সম্পর্কের অভ্যাস জড়িত; ফলে নতুন রান্নার ত্রুটি যতটা স্বাদের, ততটাই হারিয়ে যাওয়া গৃহপরিবেশের। মা আগে কীভাবে কাজ করতেন, সে স্মৃতি বর্তমান রাঁধুনির উপর এক অদৃশ্য মানদণ্ড চাপায়। হিমাংশুর মা সেই তুলনায় বিচারিত হন, কিন্তু তার নিজের অবস্থা গল্পে খুব কম জানা যায়। কথক যখন স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতি চাইছেন, তখন অন্য এক নারীর কাজকে কত সহজে অপ্রতুল বলেন, সেটিও দেখা দরকার। এই দ্বৈততা তার চরিত্রকে জটিল করে। তিনি নিজেকে সংবেদনশীল মানুষ ভাবতে পারেন, অথচ কাছের শ্রমের প্রতি একই মনোযোগ দিতে পারেন না। জীবনের এই অসমতা নৈতিক উপদেশে নয়, রান্নার তালিকার মধ্যেই প্রকাশ পায়। জীবনানন্দের সংক্ষিপ্ত কৌতুক তাই সামাজিক প্রশ্নও বহন করে।
হেমেনের ক্ষেত্রেও পরিচিত সম্পর্কের সঙ্গে কল্পিত সম্পর্কের সংঘাত প্রবল। দ্বিজেনের কাছে নারীরা অনায়াসে আসেন, এমন একটি ছবি হেমেন নিজের মনে সাজিয়েছেন। সে ছবিতে দ্বিজেনের বিয়ের জটিলতা, অন্য নারীদের স্বাধীন ইচ্ছা কিংবা প্রকৃত ঘটনার অসুবিধা কম জায়গা পায়। নিজের জীবনের শূন্যতা থেকে অন্যের জীবনকে সহজ সাফল্যের কাহিনি মনে হওয়া পরিচিত মানবিক দুর্বলতা। হেমেন যখন দ্বিজেনের চেহারা বা ব্যবহার নিয়ে রসিকতা করেন, তার হাসির নিচে এই অসম তুলনা কাজ করে। নিজের জন্য আকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি না ঘটলে তিনি ভাবেন, অন্যের কাছে নিশ্চয় তা প্রচুর। দ্বিজেনের নীরবতা এই কল্পনাকে সংশোধনও করে না, পুরো সমর্থনও করে না। পাঠক তাই হেমেনের কথায় এক ধরনের মিথ্যা নিশ্চয়তা শুনতে পান। নিঃসঙ্গ মানুষের আত্মপ্রকাশ অন্যের জীবন সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তও তৈরি করতে পারে।
গল্পের চরিত্রগুলিকে সহমর্মী ও বিরোধী এই দুই ঘরে ফেললে তাদের চলমান সম্পর্কের সূক্ষ্মতা হারায়। অর্জুন কথকের সঙ্গে কিছু অভ্যাসে মিল রাখলেও তার কাজের সামাজিক অবস্থান আলাদা; পিসিমার সাহায্যে দূরত্ব আছে, তবু সাহায্য বাস্তব; অনুপমা অনুপস্থিত বলেই সংবেদনহীন, এমন বলা যায় না। হেমেন দ্বিজেনকে একই সঙ্গে বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতে পারেন। মানুষের সম্পর্ক এক সময়ে একাধিক ভূমিকা ধারণ করে। জীবনানন্দের গল্প এই বহুভূমিকাকে সংলাপের মাঝখানে অথবা বর্ণনার সামান্য ফাঁকে প্রকাশ করে। যে কোনো চরিত্রকে এক গুণে চিহ্নিত করা সমালোচকের সুবিধা, গল্পের সত্য নয়। কথকের গোপন শ্লেষ যেমন অপরকে খাটো করে, তেমনি তার নিজের অভাবও জানায়। এই দ্বিগুণ কাজ বুঝলেই সম্পর্কের স্তরগুলি বোধগম্য হয়।
বাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে পত্রলেখকের কল্পনায় বস্তুগত ইতিহাসও আছে। জীর্ণ দেয়াল কেবল তার একাকিত্বের প্রতিরূপ নয়; পরিবারের আর্থিক ক্ষমতা ক্ষীণ হচ্ছে, মেরামতের কাজ থেমে আছে, আগামী প্রজন্মের বাসস্থান অনিশ্চিত, এমন সম্ভাবনার চিহ্ন। এই ভিত্তি বাদ দিলে গাছ, সাপ ও জোনাকির রূপক শূন্য সৌন্দর্য হয়ে যায়। কথক যখন বহু বছর পরে বাড়ি ভেঙে যাওয়ার কথা ভাবেন, তখন নিজস্ব জীবনকাল এবং সম্পত্তির স্থায়িত্বের সীমা একসঙ্গে অনুভব করেন। প্রকৃতি বাড়ি দখল করলে মানুষের ব্যর্থতা যেমন দেখা যায়, তেমনি অন্য জীবনের অব্যাহত চলাও দেখা যায়। এই দুই অর্থ পরস্পরকে বাতিল করে না। তাঁর ভাষা বিষণ্ন, কিন্তু কল্পনায় প্রাণের আলোও আছে। জীর্ণতার বাস্তব চিহ্ন থেকে বৃহত্তর সময়ের ভাবনা ওঠে। জীবনানন্দের গদ্যের বিস্তার সেই বাস্তব ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য।
চিঠির ভিতর যত মানুষ প্রবেশ করেন, লেখার একক ‘আমি’ তত পরীক্ষা পায়। মা ও স্ত্রী তার ঘরের অভাব স্মরণ করান; রাঁধুনি তার প্রতিদিনের নির্ভরতা জানান; পিসিমা সাহায্যের সঙ্গে দূরত্ব আনেন; অর্জুন নিজের আনন্দ ও দুঃখের চিহ্ন রাখেন। কথক সকলকে নিজের ভাষায় আঁকেন, তবু তাদের ভিন্নতা পুরো মুছে ফেলতে পারেন না। একটি পত্রের মধ্যে এতগুলি মানুষের অসম উপস্থিতি থাকা গল্পটির সামাজিক পরিধি বাড়ায়। আত্মজৈবনিক মনে হলেও রচনা একক মানুষের মানসিক ঘরে বন্ধ নয়। বরং তিনি যত নিজের কথা বলতে চান, অন্যদের কাজ, নীরবতা ও অজানা আকাঙ্ক্ষা তত সামনে আসে। প্রথম পুরুষের আখ্যানের সার্থকতা কখনো এখানেই: নিজের সীমিত দৃষ্টি লিখতে গিয়ে দৃষ্টির বাইরে থাকা জীবনগুলির অস্তিত্বও অনিচ্ছায় প্রকাশিত হয়।
এইভাবে দৃশ্যের ছোট ফাঁকগুলি কথকের ঘোষিত অভিপ্রায়ের বাইরে অর্থ তৈরি করে। পাঠক কথাগুলি শোনেন, আবার কারা উত্তর দিতে পারলেন না তাও মনে রাখেন। নিঃসঙ্গতার শিল্পিত গভীরতা সেই দ্বৈত শ্রবণেই।
জীবনানন্দ দাশের গদ্যে একটি দৃশ্য কখনো কেবল দেখা জিনিসের বিবরণে শেষ হয় না। রং, গন্ধ কিংবা দূরের পাখির উপস্থিতি চরিত্রের মনে পূর্বস্মৃতি জাগায়; একই সময়ে তার বর্তমান সংকটও নতুন আকার পায়। এই রূপান্তরকে প্রতীকের ব্যবহার বলে চিহ্নিত করা যায়, কিন্তু প্রতীকগুলির স্থির অভিধান বানালে গল্পের চলমান অভিজ্ঞতা হারায়। একটি শকুন সব সময় মৃত্যুর চিহ্ন নয়, একটি সাপ কেবল যৌনতার ইঙ্গিত নয়, আর কুয়াশা সর্বত্র অস্পষ্টতার সমার্থক নয়। কে দৃশ্যটি দেখছেন, দেখার আগে কী ঘটেছে এবং পরে তিনি কী বলেন, সেই সম্পর্কেই অর্থ জন্মায়। ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পের চিঠি ও ‘এক এক রকম পৃথিবী’ গল্পের সন্ধ্যাভ্রমণ এ দিক থেকে পাশাপাশি পড়ার মতো। প্রথমটিতে একা পত্রলেখকের ভাষায় ঘর, নদী, গাছ ও প্রান্তর বদলে যায়; দ্বিতীয়টিতে অবিনাশ এবং তার সঙ্গীদের ভিন্ন দৃষ্টিতে একই পৃথিবীর রূপ নিয়ে তর্ক শুরু হয়। উভয় গল্পে দৃশ্য আর মানুষের অন্তর্জগত পরস্পরকে সক্রিয় করে।
‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পের কথক স্ত্রীকে লিখতে গিয়ে ভালোবাসার একটি প্রচলিত ছবিই প্রথমে কল্পনা করেন। কেউ তাকে কেন্দ্র করে নিবিষ্ট সেবা করবেন, নিজের মনের সৌন্দর্যে চারপাশ ভরিয়ে তুলবেন, এই প্রত্যাশার মধ্যে আকর্ষণ আছে। কিন্তু কল্পনাটি যত বিশদ হয়, কথকের অস্বস্তিও তত বাড়ে। যত্ন পাওয়া, দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা কিংবা কারও জীবনের কেন্দ্র হওয়া তার কাছে শুধু আশ্রয় নয়; অন্যের সমস্ত চাহিদার ভার বহনের আশঙ্কাও। এই দ্বিধা রঙিন প্রকৃতিচিত্রের ভিতরে প্রকাশ পায়। সোনালি ও রুপোলি উজ্জ্বলতার পরে ঘাসের সবুজ আর আকাশের নীল এলেও রংগুলি কোনো সহজ মুক্তির সিঁড়ি তৈরি করে না। ছবিটি বড় হতে হতে কথকের পালাতে ইচ্ছা হয়। সৌন্দর্যের প্রসার আর ব্যক্তিগত ভয়ের পাশাপাশি উপস্থিতিই দৃশ্যটির মূল। তাই উজ্জ্বল রং মানেই সার্থক প্রেম, নীল আকাশ মানেই পলায়নে উদ্ধার, এমন সরল সমীকরণ চলে না।
এই কল্পনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: যে মানুষটি কথকের পরিচর্যায় নিজেকে সমর্পণ করবেন, তার নিজের জীবন কোথায় থাকবে? কথক হয়তো ভালোবাসার অপরিমেয়তা ভাবছেন, কিন্তু সেই অপরিমেয়তার মধ্যে অন্য মানুষটির স্বাধীন পথ সংকুচিত হতে পারে। আবার কথকের ভয়টিও সত্য: এমন নিরন্তর সেবার প্রতিদান দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে জটিল করে। চিঠিতে অনুপমা সরাসরি উত্তর দেন না বলে এই সমস্ত উদ্বেগ এক পক্ষের চিন্তা হিসেবেই আসে। সাহিত্যিক গদ্যের দীর্ঘ রঙিন বাক্য কথকের ভিতরের ভয়কে নান্দনিক রূপ দেয়; পাঠক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ক্ষমতা ও নির্ভরতার প্রশ্নও শুনতে পারেন। ব্যক্তিগত অস্বস্তির এই দৃশ্যকে কোনো নির্দিষ্ট মনোব্যাধির লক্ষণ বলে ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। সম্পর্ক গভীর হলে স্বাতন্ত্র্য কতখানি থাকবে, সেই সাধারণ মানবিক জিজ্ঞাসাই রূপকল্পটির ভিতরে কাজ করছে। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৭।)
কথক পরে মধ্যাহ্নের ময়ূরাক্ষীর জলের কথা তুলে স্থির জীবনের আকাঙ্ক্ষা জানান। নদীর জল স্থির দেখালেও তার নিজস্ব প্রবাহ আছে; অশ্বত্থের ছায়া জলের উপর পড়ে যে দৃশ্য তৈরি করে, তাতে আলো, গাছ ও স্রোত একসঙ্গে। কথক সেই ছবিতে অবসানের বদলে ভারসাম্য খুঁজছেন বলেও পড়া যায়। তিনি জীবনের বহির্মুখ দৌড় কমাতে চান, কিন্তু জীবনের সব গতি বন্ধ করতে চান কি না, গল্পে তা নিশ্চিত নয়। ‘অন্তর্মুখী’ হওয়ার ইচ্ছা আত্মপরিত্যাগ নয়; নিজের অনুভবকে মনোযোগ দিয়ে দেখার বাসনা। তবু তার স্বপ্নে পরিবার, পেশা এবং অন্যদের প্রতি দায় কোথায় থাকবে, সে প্রশ্ন খোলা। একটি নদীর দুপুরের ছবি এই জটিল বাসনাকে স্পষ্ট ব্যাখ্যার বদলে অনুভবের স্থান দেয়। পাঠক ছবিটি দেখেন এবং বোঝেন, কথক তার অস্থির জীবনের সমান্তরালে অন্য ছন্দের জীবন কল্পনা করছেন। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩০০।)
দুপুরের প্রান্তরে শকুন দেখা এই শান্তির ভাবনায় ভিন্ন স্বর আনে। কথক খাবারের অসুবিধা থেকে চোখ সরিয়ে দূরে তাকান। তার দৃষ্টি ছড়ানো মাঠে স্থির হয়, কয়েকটি শকুন সেই মাঠের মধ্যে আছে। পাখিটির সঙ্গে মৃত্যু বা পচনের পরিচিত সম্পর্ক পাঠকের মনে আসতে পারে; কিন্তু কথকের অনুভবে সেখানে অদ্ভুত স্থায়িত্ব ও নবীনতার সম্ভাবনাও জাগে। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকতে চান। এই চাওয়া জীর্ণ জীবনের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; নিজের তুচ্ছ দৈনন্দিন উদ্বেগ থেকে দূরে একটি বৃহত্তর পরিসরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। শকুনকে সুন্দর পাখি বলে বদলে দেওয়া হয়নি, তার কঠিন বাস্তব চেহারাও আড়াল হয়নি। বরং যে দৃশ্য সাধারণ রুচিতে অস্বস্তিকর, সেই দৃশ্য থেকেও মানুষ নিজের জীবনের অন্য মাত্রা অনুভব করতে পারেন। প্রতীকের শক্তি এই অনির্ধারিত জায়গায়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩০১।)
প্রান্তর থেকে ‘তেপান্তর’ মনে পড়লে দৃশ্যটির ভাষাও বদলে যায়। একটি মাঠের অবস্থান জানা থাকতে পারে; তেপান্তর রূপকথার দূরত্ব, যেখানে পৌঁছানোই সম্ভব কি না অনিশ্চিত। কথক বাস্তব মাঠের দিকেই তাকিয়ে আছেন, কিন্তু দেখার ভিতরে শৈশবে শোনা দূরের জগৎ, নিঃসঙ্গতার বিস্তার এবং পালিয়ে যাওয়ার বাসনা একসঙ্গে আসতে পারে। এর মানে আদালতের কাছাকাছি প্রান্তর বাস্তবে নেই, কেবল তার মনে আছে, এমনও নয়। যে বাস্তব দৃশ্য চোখে পড়ছে, কল্পনা তাকে নতুন দূরত্ব দিচ্ছে। এই দ্বিস্তরীয় দেখাই গদ্যের বিশেষ ক্ষমতা। ভৌগোলিক তথ্য রক্ষা করেও একটি শব্দ দৃশ্যকে অসীম করে তুলতে পারে। বাস্তব আর কল্পনাকে পরস্পরের বিরোধী বলে সাজানোর চেয়ে শব্দের ভিতর তাদের যোগ লক্ষ্য করা বেশি ফলপ্রসূ। কথকের একাকী বসে থাকার মুহূর্তে এই যোগই তার সীমিত দিনকে প্রসারিত করে।

নক্ষত্রমাখা রাতে বটগাছ ও জীর্ণ মঠের তুলনায় কথক যোগের পাশাপাশি বিয়োগের মূল্য নিয়ে ভাবেন। পূর্ণ ডালপালার বট জীবন ধারণের দৃশ্য; ভাঙা অথবা রিক্ত মঠ মানুষের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের আভাস দিতে পারে। কিন্তু একটি স্থিরভাবে সমৃদ্ধি, অন্যটি কেবল শূন্যতা, এই অর্থে দৃশ্যগুলি পুরো শেষ হয় না। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা বটেও ক্ষয়ের চিহ্ন থাকতে পারে, জীর্ণ মঠেও স্মৃতি রয়ে যায়। কথক যা উপলব্ধি করছেন, তা যোগফলের ভাষায় জীবন মাপার অসুবিধা। মানুষ যা পেলেন, তার পাশাপাশি যা হারালেন, সেই অভিজ্ঞতাও মনের গভীরতা তৈরি করে। রাত্রির নক্ষত্র দৃশ্যটিকে ঐতিহাসিক স্তরের বাইরে আরও বিস্তৃত সময়ে রাখে। পূর্বপুরুষদের কথা তুলে তিনি নিজের বর্তমানকে প্রাচীন জীবনের প্রশ্নের সঙ্গে মেলান। এই মিল কল্পিত ভাবনা; তবু মানুষের ক্ষয় ও স্মরণের অনুভব পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়। (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৩০৩।)
এই চারটি দৃশ্যকে একটি ধারাবাহিক আত্মোন্নতির গল্পে বেঁধে ফেললে তাদের ভিন্ন আবেগ হারায়। ভালোবাসার কল্পনায় ভয়, নদীর দুপুরে স্থিরতা, শকুনের প্রান্তরে আকর্ষণ এবং রাত্রির মঠে বিয়োগের চিন্তা রয়েছে। কথকের মন সব সময় একই অবস্থায় নেই। দিনযাপনের বিবরণ, ঘরের খাবার, স্ত্রী থেকে দূরত্ব ও অনাগত জীবনের সংশয় তার দেখার ভঙ্গি বদলায়। গদ্যের ছবি তার অবস্থা প্রকাশ করে, আবার নতুন অনুভূতির পথও খুলে দেয়। ফলে ভাষা কাহিনির অভাব পূরণ করার বাহ্যিক সাজ নয়। চিঠির মধ্যে কাহিনি আছে: লেখক লিখছেন, থামছেন, বাইরে দেখছেন, নিজের ভবিষ্যৎ ভাবছেন এবং প্রাপকের সঙ্গে দূরত্ব বুঝছেন। এই ঘটনার গতি অভ্যন্তরীণ হলেও বাস্তব সময়ে ঘটে। প্রকৃতিচিত্র তাকে রং ও পরিসর দেয়। জীবনানন্দের বাক্য কখনো দীর্ঘ হয়, কারণ একটি বর্তমান মুহূর্তে বহু স্মৃতি ও কল্পনার অনুপ্রবেশ ঘটছে।
‘এক এক রকম পৃথিবী’ গল্পের শুরু একটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন দিয়ে। আটত্রিশ বছরে এসে অবিনাশ যা পেলেন, তা কি এটাই? প্রশ্নের বক্তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত না থাকায় শুরুতে তা বর্ণনাকারী অথবা চরিত্রের নিজের বিস্ময় বলে শোনা যায়। এই অস্পষ্টতা পাঠককে অবিনাশের জীবনের কাছে টানে। পরের বর্ণনায় জানা যায়, তিনি সন্ধ্যায় প্রায়ই হাঁটতে যান, একা ফেরেন, সঙ্গের মানুষ খুব কম। তথ্যগুলি আলাদা বাক্যে আসে; একটির পরে আরেকটি যোগ হয়ে নিঃসঙ্গতার আবহ তৈরি হয়। বর্ণনাকারী সব ব্যাখ্যা প্রথমেই দেন না। অবিনাশ একা হাঁটতে চান, নাকি তার সঙ্গে বেরোতে কেউ চান না, সম্ভাবনা দুটি পাশাপাশি রাখেন। ব্যক্তির ইচ্ছা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে যে তফাত, তা নিশ্চিত না করে উপস্থাপনই দৃশ্যটির সততা। এই সূচনায় গল্পের বাকি প্রশ্নের বীজ আছে। (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬০।)
সন্ধ্যার হাঁটায় হাসপাতালের লাল বাড়ি চোখে পড়ে। অসুস্থ মানুষদের খাট, খোলা জানালা এবং বাইরে আকাশের আলো অবিনাশকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। হাসপাতাল সরাসরি মৃত্যু নয়; সেখানে চিকিৎসা, অপেক্ষা এবং বাঁচার চেষ্টা আছে। তবু কারও কাছে শোয়া মানুষের দৃশ্য জীবনের ভঙ্গুরতা মনে করায়। অবিনাশ ভাবেন, তিনিও কি এমন শয্যায় যেতে চান, না অন্য কোথাও হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার ভিতর কাজ করছে। নক্ষত্রে মিলিয়ে যাওয়ার কল্পনা মৃত্যুর সঙ্গে আকাশের দূরত্ব যোগ করে। গল্প তার চিন্তাকে পাঠকের সামনে আনে, কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে অবিনাশের আত্মহত্যার স্থির ইচ্ছা প্রমাণ করা যায় না। মানুষ চলতে চলতে নিজের জীবনের শেষসীমা কল্পনা করতে পারেন, পরমুহূর্তে আবার দিনের কোমলতার সম্ভাবনা ভাবতে পারেন। এই ওঠানামায় তার মনোজগতের মানবিক জটিলতা আছে। (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬০–৬১।)
অন্ধকারের রাস্তার ভিতর কোমলতা আছে কি না, অবিনাশের প্রশ্ন দৃশ্যটির অর্থ বদলায়। তিনি বেদনা জানেন, তবু ভবিষ্যতের রঙিন সম্ভাবনা একেবারে বাদ দিতে চান না। হাসপাতালের পাশ দিয়ে হাঁটার পরে এমন প্রশ্ন আসায় জীবনের ক্ষয় এবং বেঁচে থাকার ইচ্ছা একই মানুষে পাশাপাশি দেখা যায়। শহরের অন্ধকারকে একমাত্র বিষাদের প্রতীক বলা তখন ভুল। অন্ধকার দৃষ্টি সীমিত করে, একই সঙ্গে কাছের শব্দ বা দূরের আলোর প্রতি মনোযোগ বাড়াতেও পারে। অবিনাশ সেই দ্বৈত অবস্থায় চলছেন। বর্ণনাকারী তার ভাবনার কাছে এসে কখনো প্রশ্নের স্বর গ্রহণ করেন; ফলে সর্বজ্ঞ বিবরণের সঙ্গে চরিত্রের নিজের দৃষ্টি মিশে যায়। কে ঠিক কোন বাক্য মনে বলছেন, সব জায়গায় পৃথক চিহ্ন নেই। এই মিশ্রণে গল্পের ভাষা মনস্তাত্ত্বিক হয়, কিন্তু বাহ্যিক রাস্তা অদৃশ্য হয় না। দুটি পরিসর একসঙ্গে অগ্রসর।
সরোজবাবুর সঙ্গে আলাপে অবিনাশের নিঃসঙ্গ হাঁটার অন্যরকম প্রতিপক্ষ আসে। নতুন বাড়ির পরিকল্পনা, চা খাওয়ার অভ্যাস এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরোজবাবু স্বচ্ছন্দ কথায় জানান। অবিনাশ কথায় পরিহাস শুনতে পারেন। বিশেষত মানুষের কণ্ঠস্বরকে বৃষ্টি শুরু হয়ে থেমে যাওয়ার ইশারার সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, পরিচিত মানুষটির আচরণ তার কাছে খানিক অদ্ভুত। তবে সরোজবাবুকে কেবল বিত্তবান বাচাল মানুষ বলে থামলে তার নিজের আকাঙ্ক্ষা বোঝা যায় না। বাড়ি নির্মাণ তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা, যেমন অবিনাশ পথ হাঁটতে হাঁটতে আরেক ভবিষ্যৎ ভাবছেন। দুজনের পদ্ধতি আলাদা। একজন স্থাপত্যের পরিকল্পনায় নিরাপত্তা চান, অন্যজন অন্ধকারের ভিতর অনিশ্চিত কোমলতা খোঁজেন। এই বৈপরীত্যেই আলাপের সুর তৈরি; কোনোটিকে মানবজীবনের একমাত্র বৈধ পথ ঘোষণা করে গল্প চলে না। (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬১।)
বৃষ্টির ফোঁটা ও কণ্ঠস্বরের তুলনাটি গল্পের গদ্যরীতি বুঝতে সাহায্য করে। কোনো মানুষের কণ্ঠ ঠিক বৃষ্টির মতো, এ তথ্য নয়; অবিনাশ বা বর্ণনাকারীর কাছে তার হঠাৎ শুরু এবং নিঃশব্দে থেমে যাওয়ার অনুভব। শোনার অভিজ্ঞতা দৃশ্যের আকার নিচ্ছে। বৃষ্টির ইঙ্গিত দিয়ে কণ্ঠের গতিকে অনুভব করা যায়, সরোজবাবুর পুরো চরিত্রকে বৃষ্টির স্থির প্রতীকে বেঁধে ফেলা যায় না। জীবনানন্দ প্রায়ই এক ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতা অন্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে দেখান। এতে বস্তু হারায় না, তার গ্রহণের পথ বদলায়। সরোজবাবুর বক্তব্যের বাস্তব অর্থ আছে; তার শব্দ শুনে অবিনাশের মনে যে আবহ তৈরি হয়, সেটিও গল্পে সত্য। বর্ণনার এই দুই স্তর কেবল সৌন্দর্যের খেলা নয়। সংলাপে ভদ্রতার সঙ্গে যে মানসিক দূরত্ব থাকে, তুলনাটি তাকে অনুভবযোগ্য করে।
কুঞ্জবাবু ও রামজীবনের সঙ্গে অবিনাশের কথোপকথনে তিনটি ভিন্ন মনোযোগ পাশাপাশি চলে। অবিনাশ পাখির উড়ান, নক্ষত্র, নীড় এবং জীবনের অদ্ভুত প্রেম নিয়ে কথা বলেন। অন্যরা চাকরি, ফুটবল অথবা বাস্তব সংসারের দিকে প্রশ্ন ঘোরান। এই সংলাপ শুনে প্রথমে মনে হতে পারে, কেউ কারও কথা শুনছেন না। কিন্তু সবাই সম্পূর্ণ বন্ধও নন; কখনো একজন আরেকজনের ভাষা ধার করেন, কখনো অবিনাশকে প্রশ্ন করে তার কল্পনার পরিসর বাড়িয়ে দেন। আলাপের অসম গতি জীবনানন্দের গল্পে জয়ী বা পরাজিত নির্বাচন করে না। কোনো একটি বিষয়ের প্রশ্ন অন্য বিষয়ের উত্তরের পাশে দাঁড়ালে যে কৌতুক জন্মায়, সেটিই কথোপকথনের প্রাণ। আবার কৌতুকের ভিতরে মানুষ একে অন্যের পৃথিবী সম্পর্কে কতটা কৌতূহলী, তা বোঝা যায়। যার কাছে পাখির নীড় জরুরি, তার সঙ্গে ফুটবলের মাঠ নিয়ে কথা বলা সহজ নয়; তবু সেই অসামঞ্জস্য থেকেই আলাপ চালু থাকে।
পাখি ও মোটরের পার্থক্য অবিনাশ কোথায় দেখেন, তা শিল্পতাত্ত্বিক বা প্রযুক্তিবিরোধী একক সিদ্ধান্ত নয়। পাখির চলায় প্রাণীজ অভ্যাস, বাসার দিকে ফেরা এবং সম্পর্কের ইতিহাস আছে; মোটরে মানুষ চলেন, কিন্তু যন্ত্রের নিজের অনুভব নেই। এই পার্থক্য বললেও মোটর ব্যবহারকারী মানুষের প্রেম নেই, এমন বলা যায় না। অবিনাশের উক্তিতে অতিরঞ্জন আছে, কারণ তিনি নিজস্ব মূল্যবোধকে তীক্ষ্ণ ভাষায় তুলে ধরতে চান। অন্যদিকে চাকরি বা খেলাধুলার প্রশ্ন করা মানুষটিও সব সময় অগভীর নন; তিনি অবিনাশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, দৈনন্দিন জীবনে কী করেন, জানতে চাইতে পারেন। কথোপকথনের সার্থকতা এক পক্ষের কবিমন অন্য পক্ষের স্থূলতা প্রমাণে সীমাবদ্ধ নয়। ভিন্ন রুচি ও প্রয়োজনের মানুষ একই সন্ধ্যায় কথা বললে ভাষা কোথায় আটকে যায়, কোথায় নতুন পথ পায়, গল্প সেটি শোনায়।
অবিনাশের নিজের সময়বোধ অদ্ভুতভাবে প্রসারিত। তিনি যে বাড়িতে থাকেন বা কোনো রাস্তা ধরে হাঁটেন, সেখানে নিজের জীবনের বহু হাজার বছরের অনুভব পান। বাস্তবে তার বয়স আটত্রিশ; অভ্যন্তরীণ সময়ের এই বিস্তার বাস্তব বয়স অস্বীকার করে না। পুরোনো বাড়ি, গাছের গন্ধ এবং অন্ধকারে দেখা সাপ তাকে এমন স্মৃতি বা কল্পনা দেয়, যা দৈনন্দিন ঘড়ির মাপে ধরা যায় না। এক মুহূর্তে বহুদিনের শূন্যতা জমে থাকতে পারে। তবে ‘হাজার বছর’ বললেই আদিম স্মৃতির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেল, এমন ভাবা ভুল। অতিরঞ্জিত কাল চরিত্রের অনুভবের গভীরতা এবং বর্তমান জীবন থেকে দূরে যাওয়ার ইচ্ছা জানায়। জীবনানন্দ এই কল্পনাকে রচনার ভাষা করেন। অন্য চরিত্রেরা সেই ভাষা কখনো বুঝতে চান, কখনো প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেন। গল্পের সময় তাই ঘড়ির সন্ধ্যা এবং মনের দীর্ঘ রাত একসঙ্গে।
কামিনীর গন্ধ, নির্জন গাছপালা ও সাপের উপস্থিতি অবিনাশের কাছে ভয়ের সঙ্গে আকর্ষণও আনে। অন্য কারও কাছে সাপ দেখলে প্রথম কাজ হতে পারে দূরে সরা বা মেরে ফেলা। অবিনাশ তার শরীরের রূপ দেখেন, অন্ধকারে তার চলন অনুভব করেন। এই মনোযোগকে বাস্তবে সাপ নিরাপদ, এমন পরামর্শ ধরে নেওয়া যাবে না। শিল্পে বিপজ্জনক প্রাণীর সৌন্দর্য দেখা এবং প্রাণীর কাছ থেকে নিজের শরীর রক্ষা করা ভিন্ন কাজ। তার সাপিনীমূর্তির সঙ্গে নারীসৌন্দর্যের তুলনা আকর্ষণের ভাষা, কিন্তু এতে বাস্তব নারীকে সাপের স্থির প্রকৃতিতে নামিয়ে আনার ঝুঁকিও আছে। চরিত্রের কল্পনা সম্মোহক হতে পারে, সমালোচকের তা প্রশ্ন ছাড়াই গ্রহণ করার বাধ্যতা নেই। জীবনানন্দের গদ্য এই বিপদ ও সৌন্দর্যের একত্র উপস্থিতি থেকেই শক্তি পায়। সাপ তখন অপরিচিত জীবনের প্রতি অবিনাশের তীব্র কৌতূহল, একমাত্র কোনো যৌনতাতত্ত্বের সংকেত নয়।
রামজীবন কথোপকথনকে বারবার ব্যবহারিক বিষয়ের দিকে আনতে চান। তাকে কল্পনার শত্রু বললে অবস্থানটি ছোট হয়। যে মানুষ চাকরি, সাপের ঝুঁকি বা পৃথিবীর বাস্তব কাজ নিয়ে প্রশ্ন করছেন, তিনিও জীবনরক্ষার জরুরি দিক স্মরণ করাচ্ছেন। অবিনাশের ছবি বাস্তবের সীমা ভুলে গেলে বিপদ থাকতে পারে; অন্য দিকে কেবল উপযোগের হিসাবে বাঁচলে তার অনুভবের অংশ হারায়। গল্প কোনো একটি দিকের নিঃশর্ত বিজয় স্থির করে না। রামজীবন অবিনাশকে থামাতে চান, আবার শেষের দিকে তিনিও সাপিনী দেখার কল্পনায় ঢুকে পড়েন। এই পরিবর্তন দেখায়, ভাবনার জগৎ সংক্রমিত হতে পারে। অবিনাশের ভাষা অন্যের ভাবনা বদলায়, অন্যের প্রশ্ন অবিনাশকে নিজের কল্পনা ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করে। আলাপের আদি অবস্থান আর শেষ অবস্থান সমান নয়, যদিও কেউ পরাজয় স্বীকার করেননি। গল্পের গতিশীলতা এই সূক্ষ্ম স্থানান্তরে।
কুঞ্জবাবু মাঝে মাঝে অবিনাশের কথার পক্ষে দোভাষীর ভূমিকা নেন। তিনি অন্যদের বলেন, মানুষের পৃথিবী এক রকম নয়। কিন্তু অবিনাশের অনুভব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনিও নিজের কল্পনা যোগ করেন। সাপিনী ও নারীর মিল, পুরোনো বাড়ির পালঙ্ক এবং বহু যুগের রাত তার বক্তব্যে অন্য রং পায়। ফলে কুঞ্জ অবিনাশের নির্ভুল অনুবাদক নন। সহানুভূতি মানুষের কথাকে কাছাকাছি আনে, একই সঙ্গে নিজের ভাষায় বদলেও দেয়। অবিনাশের মতো মানুষকে শ্রদ্ধা করতে গিয়ে তাকে রহস্যময় ব্যতিক্রম বানানোর ঝুঁকি থাকে। কুঞ্জের সহমর্মিতায় সেই সম্ভাবনা আছে, রামজীবনের ব্যবহারিক প্রশ্নে ভিন্ন সীমা। অবিনাশ উভয়ের মাঝখানে নিজের অনুভব নিয়ে থাকেন। আলাপের এই তিন কণ্ঠে জীবনানন্দ শুধু দার্শনিক তর্ক লেখেননি; অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে গিয়ে মানুষ কতখানি নিজের ভাবনা আরোপ করেন, তা দেখিয়েছেন।
অন্ধকারে অপরিচিতকে দেখার সময় অবিনাশের দৃষ্টিকে মাছের চোখের সঙ্গে মিলিয়ে বর্ণনা করা হয়। মাছের চোখের প্রকৃত রূপের সঙ্গে মানুষের চোখ মেলানো সহজ নয়; তুলনাটির কাজ তাই তথ্য দেওয়া নয়। আলো কম হলে একদিকে তাকিয়ে থেকেও মানুষ কতটা দেখছেন, সে বিষয়ে দ্বিধা থাকে। জল ও অন্ধকারের আলাদা পরিবেশ মিলে অবিনাশের দৃষ্টি অনভ্যস্ত মনে হয়। অপরিচিত মানুষটিও তার কাছে কতখানি নির্ধারিত, প্রশ্নটি ওঠে। উপমার অদ্ভুততা পাঠককে থামিয়ে দেখে নিতে বলে। পরিচিত ‘তাকাল’ ক্রিয়ায় নতুন সংকোচ ও সজাগতা আসে। কিন্তু এই এক তুলনা দিয়ে অবিনাশকে ঠান্ডা রক্তের অথবা অনুভূতিহীন বলা যাবে না। পরের সংলাপ তার কল্পনার গভীরতা দেখায়। মুহূর্তের দৃষ্টিকে সেই মুহূর্তেই বুঝতে হবে। (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬২।)
কুঞ্জের চোখে সহানুভূতির সঙ্গে কুয়াশার তুলনাও দ্ব্যর্থক। সহানুভূতি স্পষ্ট আলো নয়; অন্যের বেদনা বোঝার চেষ্টা যতই থাক, অভিজ্ঞতার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। কুয়াশা একদিকে কোমল আচ্ছাদন, অন্যদিকে দৃষ্টির সীমা। কুঞ্জ অবিনাশের পাশে দাঁড়াতে চান, কিন্তু নিজের জানা পৃথিবী থেকেই তার জন্য ভাষা খোঁজেন। এই অসম্পূর্ণতার জন্য সহানুভূতি মিথ্যা হয় না; বরং মানুষের কাছে পৌঁছানোর বাস্তব সীমাটি ধরা পড়ে। ধোঁয়ার মধ্যে বিড়ি টানার ভঙ্গি আর চোখের কুয়াশা, দুটি দৃশ্য কাছাকাছি এসে পাঠকের মনে একধরনের আবহ তৈরি করে। তবু শব্দগুলি কেবল সাজ নয়। গল্পে কুঞ্জের বক্তৃতার আগে তার দৃষ্টির অবস্থান চিহ্নিত হয়, ফলে পরে তিনি অবিনাশের কল্পনাকে কীভাবে সমর্থন করছেন, তার একটি মানসিক প্রস্তুতি পাঠক পান। (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬৪।)
‘এক এক রকম পৃথিবী’ বাক্যটি বারবার ফিরে আসে। পুনরাবৃত্তি প্রথমে ভিন্ন রুচির মানুষের সহাবস্থান বোঝায়। পরে বাক্যটি এক ধরনের সহজ আশ্রয়ও হয়ে যেতে পারে: অন্যকে না বুঝলে বলি, তার পৃথিবী আলাদা। কিন্তু গল্পের কথোপকথন তাতে থামে না। কুঞ্জ আরও ব্যাখ্যা করেন, রামজীবন আরও প্রশ্ন করেন, অবিনাশ নিজের ছবিকে নতুন উপমায় সাজান। অর্থাৎ পৃথক পৃথিবীর স্বীকৃতি যোগাযোগের শেষ কথা নয়; যোগাযোগ শুরু করার শর্ত। অন্যের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ নিজের মতো হবে না মেনে নিয়ে তবেই শুনতে হয়। সাপের রূপে সৌন্দর্য পাওয়া আর সাপের কামড় এড়াতে চাওয়ার ভেদ থাকতে পারে; ভিন্ন অবস্থান নিয়েও একই দৃশ্য নিয়ে কথা চলতে পারে। গল্পের শিরোনাম এই চলমান বহুত্ব ধরে রাখে। পৃথকত্ব মানে চির বিচ্ছেদ নয়, কখনো অপরের ভাষায় প্রবেশের কৌতূহলও। (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬৬–৬৯।)
আষাঢ়ের অস্পষ্ট জ্যোৎস্না, ভেজা কামিনী গাছ এবং সাপিনী নারীর ছবিতে অবিনাশের বাক্য দীর্ঘ হয়। একটি উপমা শেষ হওয়ার আগে আরেকটি আসে; ঝিনুকের ম্লানতা, বৃষ্টির কোমলতা, আহত পাখির শব্দ এক নারীমূর্তির কাছে মিলতে চায়। এই সমাবেশে প্রত্যক্ষ দেখা কোনো একটি নারীকে নিখুঁতভাবে আঁকার চেষ্টা নেই। বরং মানুষের মনে সৌন্দর্য, ভয় ও আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে উঠলে ভাষা কত পথ ঘুরতে পারে, তা প্রকাশিত। রামজীবন বয়স জানতে চান, কুঞ্জ জানতে চান, সে কি মানুষীর রূপ নিল। প্রশ্নগুলি ছবিটিকে দেহ ও সময়ের বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে চায়। অবিনাশ আবার বহু যুগের বয়সের সঙ্গে প্রথম জন্মের দীপ্তি মেলান। সংলাপে ছবি স্থির থাকে না; প্রশ্নে প্রশ্নে তার অর্থ বদলায়। দীর্ঘ বাক্যের রঙ এবং ছোট প্রশ্নের চাপ মিলিয়ে দৃশ্যের শৈল্পিক গতি তৈরি। (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬৮–৬৯।)
সাপিনী রূপকটি নিয়ে সতর্কতা জরুরি। নারীকে সাপের সঙ্গে তুলনা বাংলা এবং বৃহত্তর সাহিত্যিক কল্পনায় বহু অর্থ বহন করতে পারে, কিন্তু এখানে নির্দিষ্ট চরিত্ররা কীভাবে তা বলছেন, আগে দেখতে হবে। অবিনাশের কাছে প্রাণীর বিপজ্জনক সৌন্দর্য কামনার এক ভাষা, কুঞ্জের কাছে অবিনাশকে বুঝিয়ে বলার সুযোগ, রামজীবনের কাছে কল্পনায় সামিল হওয়ার নতুন রাস্তা। কেউ বাস্তব নারীর স্বতন্ত্র জীবন জানাচ্ছেন না। ফলে রূপককে নারীর স্বভাব সম্পর্কে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া যাবে না। আবার শুধু বর্জন করলেও চরিত্রের অনুভবের অদ্ভুত শক্তি বোঝা যায় না। শিল্পের চিত্রটি গ্রহণ এবং তার সীমা বোঝা দুটোই সম্ভব। পুরোনো মিথের স্মৃতি জাগতে পারে, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট পুরাণের সরাসরি অনুবাদ এটি, প্রমাণ ছাড়া বলা উচিত নয়। গল্পে প্রধানত দৃশ্যমান হয় তিন মানুষের কল্পনা ও আলোচনার কাজ।
রামজীবনের ‘বিষয়ের ভিতর’ ফেরার অনুরোধ এবং পরে কল্পনায় অংশগ্রহণ গল্পের পরিণতিকে বিশেষ করে। তিনি বাস্তব সংসারের কথা ছাড়তে চাননি; অবিনাশের আবহ শুনে একসময় অন্যভাবে দেখতে রাজি হন। এই পরিবর্তন ব্যবহারিক জগতের পরাজয় নয়। দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাওয়া মানুষও রহস্য অনুভব করতে পারেন, কল্পনায় মগ্ন মানুষও চাকরির কথা বলেন। প্রথম দিকের মতভেদ শেষ পর্যন্ত কঠিন শ্রেণিবিভাগে আটকে থাকে না। আলোচনার সময় প্রত্যেকে নিজের ভাষা খানিক বদলান। তাই গল্পটিকে শুধু বাস্তব ও স্বপ্নের অনন্ত দ্বন্দ্ব বলা যথেষ্ট নয়; তাদের অস্থায়ী মেলামেশার অভিজ্ঞতাও আছে। একটি সন্ধ্যার মধ্যে মানুষ একে অন্যকে পুরো জানেন না, কিন্তু কিছু নতুন ছবি ভাগ করে নেন। জীবনানন্দের সংলাপ এই সীমিত যৌথতা নির্মাণ করে।
অবিনাশের কাজের কথাও আলোচনায় আসে। অনুবাদ করে জীবিকা চালান তিনি, তার জীবনের সময় ও পরিশ্রমের বাস্তব দিক আছে। তাকে শুধু স্বপ্নচারী ধরে নিলে দৈনন্দিন আয়ের ব্যবস্থা অদৃশ্য হয়। অন্য ভাষার বই বাংলায় আনার কাজ নিজেই দুই জগতের মধ্যে যাতায়াত; তবে গল্পে তিনি যা অনুবাদ করেন, তার প্রকৃতি নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে কাজটিকে তাঁর কল্পনার অব্যর্থ উৎস বলা যায় না। কাজের বাস্তবতা এবং সাপিনী রূপক একই চরিত্রের জীবনে থাকে, এতটুকুই গুরুত্বপূর্ণ। রামজীবনের প্রশ্ন তাই অসংবেদনশীল অনধিকার নয়; এই মানুষের দিন কীভাবে চলে, তা জানতে চাওয়া। অবিনাশের রহস্যময় ছবি শুনে যেমন সম্মান জন্মায়, কাজের স্থিতি শুনে জীবনের অন্য পরিমাপও জানা যায়। শৈল্পিক পাঠে এই দুই পরিমাপ রাখাই প্রয়োজন।
গল্পের এক সন্ধ্যা বহু সময়ের দরজা খোলে। অবিনাশের আটত্রিশ বছরের জীবন, অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের হাসপাতাল, হাজার বছরের সাপিনী এবং বর্তমান রাস্তা, সব একই কথোপকথনের মধ্যে। ক্যালেন্ডারের সময় একদিকে এগোয়; স্মৃতি ও কল্পনা অন্যদিকে প্রসারিত হয়। তবু গল্পকে সময়হীন বলা যাবে না। বৃষ্টি আসার ইঙ্গিত, বিড়ি জ্বালানো, হাঁটা এবং প্রশ্নোত্তরের ক্রম দৃশ্যের বর্তমান ধরে রাখে। বর্তমান মজবুত বলেই তার ভিতর দীর্ঘ কল্পিত সময় প্রবেশ করতে পারে। জীবনানন্দের গদ্যে একটি সন্ধ্যা অতীত ও ভবিষ্যৎ বহন করে, কিন্তু সেই সন্ধ্যার দৃশ্য কখনো পুরো লুপ্ত হয় না। এই ভারসাম্য গল্পটির গঠন বুঝতে সাহায্য করে। কেবল প্রতীক খুঁজলে বর্তমানের হাঁটা হারায়, কেবল ঘটনাক্রম দেখলে বিস্তৃত সময়ের অভিজ্ঞতা হারায়।
দুটি গল্পে লেখকের দৃষ্টিকোণের ব্যবধানও লক্ষণীয়। ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ কথকের লেখা চিঠির ভিতর দিয়ে মানুষের খবর দেয়, তাই তার অজ্ঞতা ও অভিমান পাঠককে বুঝে নিতে হয়। ‘এক এক রকম পৃথিবী’তে বর্ণনাকারী অবিনাশের বাইরে দাঁড়াতে পারেন, আবার কখনো তার ভাবনার খুব কাছে আসেন; সংলাপে অন্যদের মতও শোনা যায়। ফলে একটি গল্পে এক কণ্ঠের ভিতর বহুমুখী অনুপস্থিতি, অন্যটিতে একাধিক কণ্ঠের মধ্যেও অবিনাশের গভীর নিঃসঙ্গতা। বর্ণনার স্বাধীনতা বেশি বলেই দ্বিতীয় গল্প সব মন জানিয়ে দেয় না। সরোজবাবু কী চান, কুঞ্জের সহানুভূতির সীমা কোথায়, রামজীবনের মত কতখানি বদলাল, এসব প্রশ্ন থেকে যায়। দৃষ্টিকোণ লেখকের কাছাকাছি বা দূরে যাওয়ার কৌশল, পূর্ণ জ্ঞান বিতরণের ব্যবস্থা নয়। উভয় রচনায় পাঠকের কাজ নীরব অংশও খেয়াল করা।
পত্রের কথক প্রকৃতির দিকে সরে গেলে অনুপমার সঙ্গে যোগাযোগের প্রশ্ন কখনো আড়াল হয়। অবিনাশ সাপিনী ও নক্ষত্রের কথা বলতে বলতে সামনে বসা মানুষদের কাছেই নিজের ভাষার অনুবাদ চান। দুটি অভিজ্ঞতায় কল্পনা সঙ্গের বিকল্প এবং সঙ্গের আহ্বান, দুই ভূমিকায় থাকে। নিঃসঙ্গ কথক প্রান্তর ভাবেন, চিঠি লেখা বন্ধ করেন না। অবিনাশ ভিন্ন পৃথিবীর কথা বলেন, তবু আলাপ ছাড়েন না। এই দ্বৈততা তাদের শিল্পিত আত্মীয়তা। প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেলে সামাজিক প্রশ্ন শেষ হত; গল্পের মানুষেরা তা পারেন না, হয়তো চানও না। তারা অন্যকে নিজেদের দেখার ধরন জানাতে চান, যদিও তাতে অন্যের সঙ্গে দূরত্ব আরও স্পষ্ট হতে পারে। ভাষা তাই আশ্রয়, আবার সম্পর্কের পরীক্ষা। যে দৃশ্য সবচেয়ে ব্যক্তিগত, তাকে উচ্চারণ করেই মানুষ অপরের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
জীবনানন্দের বিশেষণগুলিকে পড়ার সময়ও একই সতর্কতা কাজে লাগে। ‘ধূসর’, ‘ম্লান’ অথবা ‘ব্যথিত’ শব্দ বারবার ফিরে এলেই তারা প্রতি বাক্যে একই বিষাদ দেয় না। ধূসর জ্যোৎস্না সাপিনীর প্রথম আবির্ভাবকে অদ্ভুত কোমলতা দিতে পারে; ম্লান ঝিনুক তাতে জীর্ণতার পাশাপাশি সূক্ষ্ম দীপ্তিও আনে। ব্যথিত পাখির শব্দ আকর্ষণকে অস্বস্তিকর করে। কোন বিশেষণ কোন বিশেষ্যের পাশে, কোন চরিত্রের কণ্ঠে এবং কোন প্রশ্নের পরে এসেছে, অর্থ তার উপর নির্ভর করে। শুধু পুনরাবৃত্ত শব্দের তালিকা দিয়ে জীবনানন্দীয় শৈলী নির্ধারণ করা যায় না। শব্দের স্থানান্তরও দেখতে হয়। ‘কুয়াশা’ এক জায়গায় মানুষের দৃষ্টিতে সহানুভূতির আচ্ছাদন, অন্য গল্পে শীতের মাঠে স্মৃতির ঘনত্ব। ভাষার স্বাতন্ত্র্য অভিধানে নয়, দৃশ্যের ভিতর শব্দের কর্মে।
চিঠির রঙিন বিস্তার এবং সন্ধ্যার সংলাপের চিত্রময়তা তুলনা করলে গদ্যের তাল আলাদা শোনা যায়। চিঠিতে এক ব্যক্তি বাক্য বাড়াতে বাড়াতে নিজের অনুভব ঘিরে জগৎ নির্মাণ করেন। উপমা ও দৃশ্যের ক্রম নিয়ন্ত্রণ তার হাতে, প্রাপক তখন অনুপস্থিত। সন্ধ্যার আলাপে অবিনাশ একটি দীর্ঘ ছবি তৈরি করতেই কুঞ্জ বা রামজীবন প্রশ্ন করেন; ফলে চিত্রের রং অন্যের মুখে পাল্টায়। এক গল্পে ভাষার ঢেউ প্রায় নিরবচ্ছিন্ন, অন্যটিতে প্রতিবার বাধা পেয়ে নতুন বাঁক নেয়। একই ধরনের সাপ, গাছ, রাত অথবা ম্লান আলো থাকলেও তাদের গল্পগত কাজ ভিন্ন। চরিত্রের ভেতরের জগৎ প্রকাশে একা বলার সময় ও অপরের সঙ্গে বলার সময়ের পার্থক্য শৈলীকে গড়ে। জীবনানন্দ শব্দকে চরিত্রের সামাজিক অবস্থানের বাইরে স্বাধীন অলংকার করেন না; বলার পরিস্থিতি অনুসারে তার গতি নির্ধারণ করেন।
এই রচনাগুলিতে কবিতার প্রভাব খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক, তবে গল্পকে কবিতার দীর্ঘ সংস্করণ বলা ঠিক নয়। পত্রের প্রাপক আছেন, তিনি কীভাবে পড়বেন সে চিন্তা বাক্যের অন্তরে কাজ করে। অবিনাশের পাশে প্রশ্নকারী মানুষ আছেন, তারা তার কল্পনার রং পরিবর্তন করেন। গদ্যচিত্র তাই সম্পর্কের ভিতরে অর্থ পায়। গল্প যদি কেবল সুন্দর দৃশ্যের সমাহার হত, অনুপমার নীরবতা কিংবা রামজীবনের ব্যবহারিক প্রশ্নের প্রয়োজন থাকত না। কথাসাহিত্যের নিজস্ব শক্তি মানুষের ভিন্ন সময় ও ভাষাকে পাশাপাশি রাখায়। জীবনানন্দের চিত্রকল্প এই শক্তিকে তীব্র করে; কখনো ভিন্নতা আড়াল করার ঝুঁকিও তৈরি করে। পাঠককে তাই দৃশ্যের সৌন্দর্যের সঙ্গে সেই দৃশ্যের বক্তা ও শ্রোতার সম্পর্ক দেখতে হয়। গল্পের মানবিক জটিলতা সেখানেই।
প্রতীকের ব্যাখ্যায় বিস্তৃত সামাজিক দাবি করতেও সংযম দরকার। অবিনাশ মোটরের বদলে পাখি ভালোবাসেন বলে সমগ্র যন্ত্রসভ্যতা প্রেমহীন, এ সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয় না। কথক শকুন দেখতে চান বলে অনিবার্য মৃত্যুকামনা আছে, তাও নয়। ভাঙা মঠ শূন্যতার ভাব জাগায়, কিন্তু বাস্তব বাড়ির ক্ষয় অর্থনৈতিক ও পারিবারিক ইতিহাসও জানায়। নির্দিষ্ট মানুষ একটি বস্তুতে যে মানে পান, তা সমাজের সব মানুষের অভিজ্ঞতায় একই ভাবে কার্যকর হবে না। জীবনানন্দ প্রতীক ব্যবহার করে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়েছেন; পাঠক প্রতিটি সম্ভাবনাকে স্থায়ী বিধি বানালে সেই গতিই থেমে যায়। নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা ও পরিস্থিতির দিকে ফিরে যাওয়া তাই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষণ তখন রচনার তথ্য ও নিজের অনুমানকে পৃথক রাখতে পারে। এতে প্রতীকের রহস্য কমে না, তার বাস্তব ভিত্তি স্পষ্ট হয়।
‘এক এক রকম পৃথিবী’ গল্পের শেষে কুঞ্জ ও রামজীবন যে অবিনাশের কথায় কিছুটা টান অনুভব করেন, তা অন্যের অনুভব সম্পূর্ণ আয়ত্ত করার সাফল্য নয়। খানিকটা শুনেছেন, নিজের মতো কল্পনা করেছেন, আবার ব্যবহারিক জীবনে ফিরবেন। এই সাময়িক সংযোগের মূল্য কম নয়। ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পের চিঠিও অনুপমার কাছে পৌঁছালে কথকের দীর্ঘ রং ও গন্ধ হয়তো সবটুকু সমান অর্থ পাবে না; তবু লেখা তার একাকিত্বকে অপরের দিকে পাঠানোর কাজ করে। দুটি গল্প যোগাযোগের এই সীমিত সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে আছে। মানুষ আলাদা পৃথিবীতে থাকেন, কিন্তু সেই আলাদা থাকার কথা বলা যায়। কখনো কেউ বোঝেন, কখনো অন্যভাবে বোঝেন, তাতেই সম্পর্কের নতুন স্তর জন্মায়। জীবনানন্দের শৈলী এই অসম্পূর্ণ আদানপ্রদানকে গদ্যের রূপ দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রতীকের রং অথবা রূপকের সাহস নয়, মানুষের দেখার ভঙ্গির পরিবর্তনই গল্পদুটির স্থায়ী শক্তি। পত্রলেখক যে সঙ্গের প্রত্যাশায় পালাতে চান, আবার স্ত্রীর কাছে লিখতে থাকেন, সেই দ্বিধা দৃশ্যগুলিকে চালায়। অবিনাশ একা হাঁটতে হাঁটতে অন্যের মুখোমুখি হন, নিজের অদ্ভুত ছবিগুলি তাদের সামনে রাখেন এবং পাল্টা প্রশ্ন শুনে তাদের নতুনভাবে বলেন। ঘরের ভিতরের জীর্ণতা, নদীর শান্ত জল, শকুনের দূর প্রান্তর, হাসপাতালের লাল বাড়ি, ম্লান জ্যোৎস্না ও সাপের চলন একটিমাত্র দর্শনের চিহ্ন নয়। তারা পৃথক মুহূর্তে পৃথক প্রশ্ন জাগায়। গল্পের গঠন সেই প্রশ্নগুলিকে এমনভাবে সাজায় যে ব্যক্তির সঙ্কীর্ণ দিনেও বিস্তৃত সময় ও অন্য মানুষের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। জীবনানন্দ দাশের চিত্রময় ভাষা তখন ঘটনার বিকল্প হয়ে থাকে না; ঘটনা ও অনুভবের অন্তরঙ্গ যোগকে দৃশ্যমান করে।
অবিনাশের সঙ্গে কুঞ্জবাবু ও রামজীবনের কথোপকথন আরও একটি কারণে লক্ষ করার মতো। সেখানে সম্মতি ও অসম্মতির মধ্যবর্তী অসংখ্য ক্ষুদ্র ভঙ্গি আছে। কেউ বক্তার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, কেউ প্রসঙ্গ বদলে দেয়, কেউ নিজের প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই অন্য বিষয়ে সরে যায়। বাস্তব জীবনের আড্ডায় এমন অসম্পূর্ণ বিনিময় স্বাভাবিক হলেও সাহিত্যে তার শিল্পগত তাৎপর্য আলাদা। কথোপকথনকে যুক্তিতর্কের সুশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা হিসেবে সাজালে প্রত্যেক চরিত্রের বক্তব্য একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে এগোত। এখানে তা ঘটে না। অবিনাশের সর্পবিষয়ক আকর্ষণ শুনে রামজীবনের উদ্বেগ দূর হয় না; কুঞ্জের সহানুভূতিও অবিনাশের কল্পনাকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে পারে না। অথচ এই অসম্পূর্ণতাই তাদের একসঙ্গে থাকার শর্ত। অপরের অভিজ্ঞতার নাগাল পুরোপুরি না পেয়েও তার কথা শোনা যায়, তার ব্যবহৃত ছবি নিজের মতো বুঝে নেওয়া যায়। জীবনানন্দের গল্পে মানুষের মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগের এমন সংযত ধারণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একাকিত্বকে তিনি অবিনাশের স্থায়ী নিয়তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন না; আবার কয়েকটি সদয় বাক্যেই তা দূর হয়েছে বলেও দাবি করেন না। সন্ধ্যার আড্ডাটুকু মানুষটির জীবনে একটি অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করে। পরস্পরের কথায় আশ্রয় পাওয়ার এই মুহূর্তটিই কাহিনির স্বল্প পরিসরকে গভীরতা দেয়। গল্পের সংশ্লিষ্ট সংলাপ ও বর্ণনার সঙ্গে এই পাঠ মিলিয়ে দেখা যায় (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬২ থেকে ৬৯)।
এই প্রসঙ্গে গল্প দুটির কথকের অবস্থান তুলনা করা যায়। ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পে লেখার মধ্যস্থতায় নিজের জীবনকে পরখ করার সুযোগ কথকের হাতে। যে মানুষটির উদ্দেশে চিঠি লেখা হচ্ছে, তার প্রত্যুত্তর পাঠকের সামনে নেই; ফলে কথকের বিবরণ অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হতে পারে। কিন্তু নিজের আকাঙ্ক্ষা বোঝাতে গিয়েই সে বারবার এমন দৃশ্যের কাছে পৌঁছায় যা তার আগের বক্তব্যকে জটিল করে। ভালোবাসার বাসনা প্রকাশের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠতার ভয়, শান্তির আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি শকুনের দিকে আকর্ষণ, পারিবারিক পরিসরের পাশাপাশি তেপান্তরের স্বপ্ন এসে দাঁড়ায়। তার বক্তব্যের ভেতরেই তাই একাধিক স্বর শোনা যায়। অন্যদিকে ‘এক এক রকম পৃথিবী’ গল্পে অবিনাশ নিজের জগতের একমাত্র ভাষ্যকার হয়ে থাকতে পারে না। কুঞ্জবাবু তার অভিজ্ঞতাকে নিজের উপমায় প্রকাশ করেন, রামজীবন তাকে দৈনন্দিন প্রশ্নের সামনে ফেরান, সরোজবাবুর উপস্থিতি দেখায় জীবনযাপনের আরেক রকম রীতি। প্রথম গল্পে বিভেদ প্রধানত একজন মানুষের আত্মবর্ণনার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে; দ্বিতীয় গল্পে তা মানুষের মুখোমুখি কথাবার্তায় দৃশ্যমান হয়। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে দুটি গল্পের চিত্রকল্পে মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও তাদের আঙ্গিকগত স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে না (জীবনানন্দ দাশ, ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, প্রথম খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ২৯৭ থেকে ৩০৩; ‘এক এক রকম পৃথিবী’, একই গ্রন্থ, একাদশ খণ্ড, পৃ. ৬০ থেকে ৬৯)।
প্রকৃতির উপস্থিতিও এই দুই কথনপদ্ধতিতে আলাদা কাজ করে। পত্রলেখকের সামনে নদী, প্রান্তর, শকুন কিংবা বৃক্ষ প্রায়ই তার নিজের অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষাকে বোঝার অবকাশ তৈরি করে। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে প্রশ্ন করে, নিজের অস্বস্তিকে অন্য রকম দূরত্বে স্থাপন করে। অবিনাশের ক্ষেত্রে কামিনী গাছ ও সাপের উল্লেখ অন্যের সঙ্গে আলাপ শুরু করার উপাদান হয়ে ওঠে। তার ব্যক্তিগত অনুভূতি কুঞ্জবাবুর ভাষায় নতুন ব্যাখ্যা পায়, আবার রামজীবনের কথায় সেই ব্যাখ্যার সীমা ধরা পড়ে। একটি উপমা তাই যার মুখে উচ্চারিত হয়েছে শুধু তার সম্পত্তি হয়ে থাকে না। শ্রোতার স্মৃতি, ভয় এবং কৌতূহলও তাতে মিশে যায়। সাহিত্যিক প্রতীকের অর্থ কীভাবে কথোপকথনের মধ্যে বদলায়, গল্পটি তার সূক্ষ্ম দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে সাপিনীকে ঘিরে অবিনাশের স্মৃতিময় আকর্ষণ এবং রামজীবনের শেষের দিকে তাকে দেখার আগ্রহ একই অভিজ্ঞতা নয়। একজনের অভ্যস্ত নিঃসঙ্গতার মধ্যে যে ছবি জন্মেছে, অন্যজন তা সাময়িক বিস্ময়ের চোখে দেখতে চাইছে। কুঞ্জবাবু তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রূপটির অর্থ অনুমান করেন। এই তিনটি অবস্থান একসঙ্গে রাখার কারণেই গল্পের নামটি সংলাপের বাইরে গিয়েও গভীর হয়ে ওঠে (জীবনানন্দ দাশ, ‘এক এক রকম পৃথিবী’, দেবেশ রায় সম্পাদিত জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, কলকাতা: প্রতিক্ষণ, পৃ. ৬৪ থেকে ৬৯)।
পাঠের আরেকটি জরুরি দিক গল্পগুলোর ভাষায় মৃদু কৌতুকের উপস্থিতি। অবিনাশের স্বপ্নময় উচ্চারণের পাশে চাকরি, খেলা বা মোটরের প্রসঙ্গ এসে পড়লে কথাবার্তার ছন্দ বদলে যায়। এই বদলে যাওয়া ছন্দে কিছু অস্বস্তি আছে, আবার মানুষের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা চিনে নেওয়ার হাসিও আছে। অবিনাশের ভাবনাকে অমূল্য ঘোষণা করলেই অন্য চরিত্রদের কথা গুরুত্বহীন হয়ে যায়; তাদের বাস্তব জিজ্ঞাসাকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধরলেও অবিনাশের অনুভূতি শোনার অবকাশ থাকে না। জীবনানন্দ এমন কোনো সহজ বিচারের ব্যবস্থা করেননি। একই কারণে ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পের কথক যখন একান্ত আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখে, তখন তার পলায়নের ইচ্ছাটিকেও স্বপ্নের সৌন্দর্যের সঙ্গে পড়তে হয়। প্রকৃতির রঙে ভরা কল্পনা একটি কঠিন প্রশ্নও রেখে যায়: অন্য মানুষের ভালোবাসা গ্রহণ করা তার কাছে এত দুরূহ কেন? গল্প দুটি তাদের পাঠককে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, নির্দিষ্ট জবাব হাতে তুলে দেয় না। রং, ছায়া, গন্ধ, নৈঃশব্দ্য ও কথার অসম্পূর্ণতা মিলিয়ে জীবনানন্দ সেই জায়গাটি নির্মাণ করেন যেখানে মানুষ অন্যকে জানতে চায় এবং নিজের অপরিচিত অংশেরও আভাস পায়। তাঁর ছোটগল্পের স্থায়ী আবেদন এই সংবেদনশীল অনুসন্ধানের মধ্যেই নিহিত।
এই গল্পপাঠে প্রতিটি চিত্রের একটি স্থির অভিধান তৈরি করার প্রলোভন এড়ানো দরকার। শকুন দেখলেই মৃত্যু, সাপ দেখলেই কামনা, অন্ধকার দেখলেই হতাশা বোঝায়, এমন সূত্রে জীবনানন্দের গদ্য ধরা দেয় না। শকুনের উপস্থিতিতে কথকের দুপুর দীর্ঘ হয় এবং পরিচিত দৈনন্দিনতা থেকে তার মন সরে আসে। সাপের রূপে অবিনাশ একদিকে সম্ভাব্য বিপদ চেনে, অন্যদিকে প্রাণের বিচিত্র সৌন্দর্য অনুভব করে। অন্ধকার কখনো ভয়কে বাড়ায়, কখনো দিনের কঠিন দৃশ্যমানতা কমিয়ে অন্তরের কথা বলার সুযোগ আনে। প্রতীকের এই পরিবর্তনশীলতা গল্পের চরিত্রগুলোর পরিবর্তনশীল অনুভূতির সঙ্গেই যুক্ত। রং ও বস্তুর অর্থ তাই ঘটনাস্থল, বক্তা এবং সংলাপের মুহূর্ত বিবেচনা করে বুঝতে হয়। ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ গল্পের একাকী পত্রলেখক প্রকৃতিতে যে আত্মীয়তা খোঁজে, ‘এক এক রকম পৃথিবী’ গল্পের অবিনাশ তা কথার মধ্যে অন্যের কাছে পৌঁছাতে চায়। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাখ্যার খানিকটা অংশ অধরা থাকে। পাঠককে সেই অবশিষ্ট অনুভূতির কাছে ফেরানোই গদ্যের কৃতিত্ব। চরিত্রের অপ্রাপ্তিকে কেবল বিষাদ হিসেবে দেখলে এই সক্রিয় অনুসন্ধান চোখ এড়ায়। তাদের বাসনা কোনো চূড়ান্ত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু প্রচলিত জীবনবোধের বাইরে অনুভবের নতুন পরিসর উন্মুক্ত করে। জীবনানন্দের গল্পের ভাষা সেই পরিসরে পৌঁছানোর জন্যই কখনো সংযত, কখনো বিস্তৃত, কখনো প্রশ্নমুখর; তার সৌন্দর্য এই স্বরবৈচিত্র্যে।
এই কারণেই গল্প দুটির শেষেও কথোপকথন থামে, কিন্তু মানুষের দেখা ও বোঝার সম্ভাবনা পাঠকের মনে জাগ্রত থাকে।
জীবনানন্দ দাশের ছোটগল্পে মানুষ ঘরবাড়ি, কাজকর্ম, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন সময়ের মধ্যে বাস করেও সব সময় সেই পরিসরে নিজেকে সম্পূর্ণ খুঁজে পায় না। দৃশ্যমান পৃথিবী তার কাছে পরিচিত, অথচ সেই পরিচয়ের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি লুকিয়ে থাকে। কখনো পথের আলো, কখনো পাখির ডাক, কখনো বন্ধুর গলার স্বর তাকে এমন এক অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়, যার নির্ভুল ঠিকানা দেওয়া যায় না। এই যাতায়াতের জন্যই তাঁর গল্পে বহির্জগৎ ও মনের জগৎ আলাদা দুটি বন্ধ কুঠুরি হয়ে থাকে না। একটি দৃশ্য চোখে পড়ে, তারপর স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষার স্পর্শে তার অর্থ বদলে যায়; আবার সেই বদলে যাওয়া দৃশ্য থেকেই ফিরে আসে জীবনের কঠিন তথ্য। ‘রক্তের ভিতর’ গল্পটি এই দ্বিমুখী গতির একটি দৃষ্টান্ত। বিনয় ও সুহাসের কয়েকটি সাক্ষাৎ, লেখার টেবিল, বৈশাখের সকাল ও দুপুর, স্ত্রীর এবং সন্তানের মৃত্যুর স্মৃতি মিলিয়ে গল্পটির জগৎ গড়ে উঠেছে। ঘটনাগুলো সংখ্যায় অল্প হলেও তাদের অভিঘাত ক্ষণস্থায়ী নয়। কোনো একটি মুহূর্তের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার ফলে যে অতীত জেগে ওঠে এবং কথার ভেতরে যে নীরবতা জমে, গল্পের প্রকৃত বিস্তার সেখানে। তাই এর গঠন বুঝতে হলে কেবল কী ঘটল সেই প্রশ্নের পাশাপাশি দেখতে হয়, একটি ঘটনা বিনয়ের অনুভবে কীভাবে রূপ বদলাল এবং সুহাসের উপস্থিতিতে সেই অনুভব কতখানি নতুন অর্থ পেল। গল্পের শুরুতে প্রকৃতি বিনয়ের বসবাসের বাইরের একটি সুন্দর পটভূমি হিসেবে আসে বলে মনে হতে পারে। টেবিলে বসে সে মাঠ, জামরুলগাছ, কৃষ্ণচূড়া, নারকেলের সারি, রোদ ও আকাশ দেখে। কিন্তু দেখার এই কাজেই তার মানসিক অবস্থার প্রথম পরিচয় মেলে। সে দীর্ঘ সময় নিশ্চুপ বসে আছে; চারদিকে সকালের কাজ শুরু হলেও তার নিজের কাজ স্থির হয়ে আছে। দৃষ্টির সামনে অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও হাতের কাছে থাকা লেখার কাগজে তার মন স্থির হয় না। রঙের ক্রমবিন্যাস, আকাশের চঞ্চলতা এবং চিলের ওড়া তখন নিছক প্রকৃতির বিবরণ থাকে না। চোখের সামনে থাকা মাঠ পেরিয়ে কল্পনা পৌঁছে যায় অদেখা প্রাসাদ ও রাজকন্যার কাছে। বিনয় বাইরে থেকে ঘরে ফেরে না; দৃশ্যটির ভেতর দিয়েই নিজের কাছে অন্য একটি পথ খুঁজে নেয়। এই পথ রূপকথার স্মৃতি ধারণ করলেও তার সূচনা বাস্তব সকালের আলোয়। দৃশ্য ও কল্পনার মাঝখানে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা না টানার ফলেই পাঠক বিনয়ের মনোজগতের পরিবর্তনটি অনুভব করতে পারেন। গল্পের এই সূচনাংশের পাঠের ভিত্তি জীবনানন্দের নিজস্ব প্রকৃতিবর্ণনা (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৩)।
জিনপুরী বা রাজকন্যার চিত্রকে সরাসরি সুখের প্রতিশ্রুতি ভাবলে বিনয়ের অনুভূতির একটি জরুরি দিক হারিয়ে যায়। তার কল্পনায় সৌন্দর্যের সঙ্গে কান্নাও জড়িয়ে আছে। চিলের ডানা রোদে ঝলমল করলেও সেই উড্ডয়নের মধ্যে সে বিচ্ছেদের সুর শুনতে পায়। রাজকন্যাকে ছুঁতে না পারা, দূরের দিকে তাকিয়ে থাকা, সোনালি আলোয় কান্নার উপস্থিতি এই কল্পনার সংবেদনশীল অস্থিরতা প্রকাশ করে। রূপকথার উপাদান এখানে শৈশবের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ফিরিয়ে আনে না; বরং নাগালের বাইরে থাকা জগতের জন্য তার আকুলতা প্রকাশ করে। এই আকুলতা লেখার টেবিলে বসা মানুষেরই। বাস্তবকে সাময়িক অতিক্রম করলেও সে বাস্তবের বাইরে নিরাপদ কোনো রাজ্য আবিষ্কার করে ফেলেনি। অদেখা প্রাসাদে যাত্রার অনুভূতি তার দৃষ্টিকে অন্যভাবে সংগঠিত করে, কিন্তু জীবনের ক্ষতি ও অভাব মুছে দেয় না। ফলে গল্পের প্রথম সকাল থেকেই আনন্দ ও বিষাদ একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে। জীবনানন্দের প্রকৃতিচিত্রের বিশেষত্ব এই মিলনে: সৌন্দর্য দেখার ক্ষমতা শোককে নাকচ করে না, আবার শোকের স্মৃতিও দৃশ্যমান পৃথিবীর সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে না।
সাদা মেঘের দিকে তাকানোর পর বিনয়ের অনুভূতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রং তার কাছে শুধু চোখে ধরা পড়া গুণ নয়; তার ভিতর দিয়ে যেন শব্দ শোনা যায়। সাদা, নীল ও সোনালি একটি স্থির চিত্রে থেমে থাকে না। মেঘ এগিয়ে যায়, আলো বদলায়, গাছের ডাল নড়ে, আর বিনয়ের অনুভব এক ইন্দ্রিয় থেকে অন্য ইন্দ্রিয়ে সরে যায়। দৃশ্যকে শব্দ হিসেবে অনুভব করার এই ক্ষমতা বাংলা গদ্যে নতুন ধরনের বাক্যসংগতি তৈরি করে। এখানে প্রকৃতির কোনো বৈজ্ঞানিক বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা নেই। যে মুহূর্তে মানুষ রঙের মধ্যে শব্দের অভিঘাত অনুভব করে, সেই মানসিক সত্যটিই ভাষায় ধরার চেষ্টা আছে। সিংহের পদক্ষেপ বা সিংহীর কণ্ঠের স্মৃতি এই সংবেদনে এসে যোগ হয়। ফলে মেঘ শুধু হালকা ভেসে চলা বস্তু থাকে না; তার মধ্যে শক্তি, গাম্ভীর্য, সম্ভাব্য বিপদ এবং অদ্ভুত মহিমা একসঙ্গে অনুভূত হয়। বিনয়ের চোখে দেখা এই মেঘের রূপান্তরই গল্পের ভাষার স্বাধীনতা বোঝায় (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৩ থেকে ১১৪)।
মেঘ চলে যাওয়ার পর বিনয় চারদিকে কাজের ব্যস্ততা লক্ষ করে। গাছ ফুল ফোটাচ্ছে, পাতা নাড়ছে, পাখিদের সঙ্গে যেন নিরন্তর সম্পর্ক স্থাপন করছে। মানুষের শ্রমের ভাষা প্রকৃতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করায় দৃশ্যটি প্রাণ পায়; কিন্তু তার সঙ্গে বিনয়ের স্থির বসে থাকার একটি নিঃশব্দ বৈপরীত্যও তৈরি হয়। গাছের ব্যস্ততা তার নিজের অক্ষমতা বা বিলম্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় কি না, গল্প তা সরাসরি বলে না। পাঠক বুঝতে পারেন, লেখার চেষ্টা করা মানুষটির চারপাশে জীবন এগিয়ে যাচ্ছে। তার টেবিল স্থির, অথচ পাতার চলাচল থামছে না। এই দৃশ্যের শক্তি বিরোধকে স্পষ্ট ঘোষণায় নয়, পাশাপাশি উপস্থিতিতে রাখার মধ্যে। বিনয় প্রকৃতির চলমানতার প্রশংসা করে, আবার সেই চলমানতার সামনে নিজের মনোযোগের সংকটও অনুভব করে। ফলে সকালের প্রাকৃতিক ব্যস্ততা কেবল প্রফুল্লতার প্রতীক নয়; নিজের অবস্থান মাপার একটি অস্পষ্ট মানদণ্ড। ভাষার মানবীকরণ এখানে গাছকে অলৌকিক চরিত্রে পরিণত করার জন্য ব্যবহৃত হয়নি। মানুষের চোখে প্রকৃতি কীভাবে নিজের অন্তরের সঙ্গী হয়ে ওঠে, তা দেখানোর জন্যই তার এই কর্মচাঞ্চল্য।
বৈশাখের কয়েকটি দিন পেরিয়ে যাওয়ার উল্লেখ গল্পে সময়ের একটি বিশেষ ছন্দ আনে। দিনগুলোর প্রত্যেকটির আলাদা ঘটনা জানানো হয় না। একই টেবিলে বসা, আকাশ দেখা, লেখার চেষ্টা, কথা ভাবা: এই পুনরাবৃত্তিতেই সময় জমা হয়। বাইরে থেকে দেখলে প্রায় কিছুই ঘটছে না। অথচ লিখতে চাওয়া এবং লিখতে না পারার মধ্যবর্তী অবস্থায় বিনয়ের মন প্রতিদিন কাজ করে চলেছে। সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে স্থবিরতার সম্পর্কটি এই সংক্ষিপ্ত সময়বর্ণনায় ধরা পড়ে। লেখার টেবিল তাই সাধারণ আসবাবের চেয়ে বেশি কিছু, যদিও তার বস্তুগত ইতিহাসও গল্পে আছে। সেগুন কাঠের টেবিলটি আগে কাকার দাপ্তরিক কাজের সুবিধার জন্য কেনা হয়েছিল। একই বস্তু উত্তরাধিকারসূত্রে বিনয়ের লেখার আশ্রয় হয়ে উঠেছে। অফিসের প্রয়োজন থেকে সৃষ্টিশীল মনোযোগে ব্যবহার বদলালেও কাঠের ভার, পুরোনো ঘর ও অতীতের স্মৃতি রয়ে গেছে। মানুষ একটি ব্যবহৃত জিনিসের কাছে বসে নিজের নতুন কাজ শুরু করতে চায়। সেই চেষ্টার মধ্যে পূর্বজীবনের বাস্তবতা যেমন আছে, তেমনি নিজের জায়গা তৈরি করার ব্যক্তিগত বাসনাও আছে (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৪)।
বৈশাখের দুপুরে দূর থেকে আসা সাইকেলের শব্দের ঘটনাটি এই অপেক্ষাকে অন্য দিকে নিয়ে যায়। বিনয় প্রথমে বাতাসে নারকেলপাতার শব্দ ভেবেছিল। পরে বুঝতে পারে, তার কাছে কেউ আসছে। শোনার ভুলটি ছোট হলেও গল্পে অর্থপূর্ণ। প্রকৃতি ও মানুষের আগমন একই শ্রুতিক্ষেত্রে মিলেছে; কোনটি পাতার সাড়া, কোনটি চাকার শব্দ, তা বুঝতে একটি মুহূর্ত লাগে। সুহাসের আবির্ভাবের আগে পাঠক বিনয়ের এই উপলব্ধিগত বিরতি অনুভব করেন। বন্ধুর আগমন যেন নিস্তব্ধ দুপুরকে হঠাৎ ভেঙে দেয় না; দুপুরের ধ্বনির ভিতর থেকেই ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে ওঠে। এই কৌশলে বহির্ঘটনা ও অন্তর্গত প্রস্তুতির মধ্যে সংযোগ ঘটে। পাঠক সুহাসকে দেখার আগেই তার উপস্থিতির দিকে বিনয়ের কান সজাগ হয়ে ওঠে। পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার দৃশ্য শুরু হয় তাই একটি অনিশ্চিত শব্দ থেকে। শোকের মতো গভীর বিষয় নিয়ে পরের কথোপকথনের জন্য এই সূক্ষ্ম প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনানন্দ কোনো ঘোষিত নাটকীয় সংকেত ব্যবহার না করেও পরিস্থিতির ভার তৈরি করতে পারেন (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৫)।
সুহাস সাইকেল রেখে দাঁড়ানোর সময় কৃষ্ণচূড়ার রঙও বদলে যায়। গাছের ফুল, পিছনের বটের ছায়া, আলো ও দুপুরের তাপ একত্রে এমন দৃশ্য সৃষ্টি করে যা কেবল উদ্ভিদের নিরপেক্ষ বর্ণনা নয়। গাঢ় লাল রঙের মধ্যে পানীয়ের ঘনত্ব এসে পড়ায় ফুলগুলি যেন স্পর্শযোগ্য, স্বাদযোগ্য হয়ে ওঠে। নীল ছায়াও সাধারণ ছায়া থাকে না; তার বস্ত্রের মতো পুরু উপস্থিতি অনুভূত হয়। শব্দ থেকে রং, রং থেকে স্বাদ ও স্পর্শের এই যাতায়াতে বিনয়ের দৃষ্টি আরও সচল হয়। অথচ আগন্তুক সুহাস গাছটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে থামে না। একই প্রাকৃতিক দৃশ্য একজনের অনুভবে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে, অন্যজনের জন্য প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। এখান থেকেই দুটি মনের বিচ্ছিন্নতা বোঝা শুরু করা যায়। বিনয় যার দিকে তাকিয়ে ভাষা খুঁজে পায়, সুহাস তার মধ্য দিয়ে তাকিয়ে নিজের ভিতরে পৌঁছায়। জীবনানন্দের দৃশ্যরচনা তাই দুজনের অভিজ্ঞতার তুলনার ক্ষেত্রও তৈরি করে। কৃষ্ণচূড়া নিছক সাজসজ্জা হলে এই পার্থক্য এত স্পষ্ট হতো না।
সুহাসের চোখ কৃষ্ণচূড়ার দিকে গেলেও তার ফুল দেখা হচ্ছে না বলে বিনয়ের মনে হয়। এই অনুমান পুরোপুরি প্রমাণ করা যায় না। অন্যের মনের ভিতরে সরাসরি প্রবেশের ক্ষমতা বিনয়ের নেই; তার আছে ভঙ্গি, নীরবতা ও দৃষ্টির দিক থেকে অর্থ আন্দাজ করার প্রবণতা। গল্পের কথক হিসেবে সে যা দেখেছে এবং যা মনে করেছে, দুটিকে পাশাপাশি রাখে। পাঠক তাই সুহাসের অন্তর্জীবনের সরাসরি নথি পান না; পান বিনয়ের দৃষ্টিতে গঠিত একটি প্রতিকৃতি। স্বচ্ছ কাচের মতো দৃশ্যের ভিতর দিয়ে নিজের মনের দিকে তাকানোর ধারণাটি এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই জন্মায়। বাইরের ফুল দেখা না দেখার প্রশ্নে বিনয় নিজের অভিজ্ঞতাও সুহাসের উপর আরোপ করে থাকতে পারে। বন্ধুদের মধ্যে গভীর সমধর্মিতা থাকলেও তাদের শোকের রূপ এক নয়। এই অনিশ্চয়তা গল্পের মনস্তাত্ত্বিক সততা বাড়ায়। কোনো মানুষের শূন্যতা অন্য মানুষ অনুভব করতে পারে, কিন্তু তার সম্পূর্ণ মালিক হতে পারে না। দৃশ্যমান মুখ ও অনুমিত মনোজগতের ব্যবধান গল্পটি সচেতনভাবে রেখে দেয় (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৫)।
স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠলে পরিচিত ঘর বিনয়ের কাছে অপরিচিত হয়ে যায়। টেবিল, আলো, আকাশ, যাদের সঙ্গে সে প্রতিদিন কাটায়, হঠাৎ অন্য এক অন্ধকারের সামগ্রী বলে মনে হয়। এই রূপান্তর বাস্তব ঘর বদলে যাওয়ার ঘটনা নয়; শোকের স্মৃতি সক্রিয় হলে পরিচিত বস্তু দেখার ক্ষমতাই বদলে যায়। যে টেবিল কিছুক্ষণ আগে লেখা শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, সেটিই এখন নিরাপদ আশ্রয় বলে বোধ হয় না। বন্ধু জিজ্ঞাসা করছে, এত বড় শূন্যতা নিয়ে সে কীভাবে বেঁচে আছে। প্রশ্নটি এত সরাসরি যে তার আঘাতে বহুদিনের অভ্যাসে গড়া স্বাভাবিকতার আবরণ সরে যায়। বস্তুর আকার তখন বিনয়ের কাছে ভারী ও ভয়াবহ ঠেকে। ঘর ছেড়ে কোথাও যাওয়ার দরকার হয় না; একটি বাক্যই তাকে এমন মানসিক স্থানে নিয়ে যায় যেখানে পরিচিত পৃথিবীর সংজ্ঞা আর আগের মতো কাজ করে না। শোকের এই প্রত্যাবর্তন গল্পের কেন্দ্রীয় অনুভব (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৬)।
এই দৃশ্যের ভাষায় অন্ধকার কোনো একক নেতিবাচক সংকেত নয়। সুহাসের স্বর যেন দূরের কোনো গভীর স্থান থেকে উঠে আসছে, আবার সেই স্বরই বিনয়কে নিজের রক্তের মধ্যে বহুদিন জমে থাকা স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে দেয়। দূরত্ব ও অন্তরঙ্গতা একই সঙ্গে কাজ করে। মৃত স্ত্রী ও সন্তানের জগৎ জীবিত মানুষের বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি বিনয়ের সবচেয়ে কাছের অভিজ্ঞতা। সে তাদের স্মরণ করতে চাইলেই স্মৃতি আসে না; কথোপকথনের একটি অনির্ধারিত মুহূর্তে শব্দের আঘাতে তা জেগে ওঠে। গল্পের নামের সঙ্গে এই অনুভূতির সম্পর্ক গভীর। রক্ত এখানে চিকিৎসাবিদ্যার বিষয় নয়; জীবিত দেহের মধ্যে অক্ষয় থেকে যাওয়া স্মৃতি, ক্ষতি ও প্রতিক্রিয়ার একটি আশ্রয়। বাইরে থেকে শোনা কথা ভেতরে এসে যে কম্পন তোলে, জীবনানন্দ তাকে দৃশ্যমান করতে চান। শোককে সাধারণ বিমূর্ত বিশেষণে বোঝানোর বদলে তিনি তার শরীরী অভিঘাত অনুভব করান।
সুহাসের মুখকে নির্জন মনে হওয়ার মধ্যেও অনুরূপ পদ্ধতি কাজ করে। নির্জনতা সাধারণত স্থান বা পরিস্থিতির গুণ; মুখের ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহার করলে দৃশ্যের সঙ্গে অনুভূতি মিশে যায়। বন্ধুর মুখের রেখা দেখে বিনয় এমন একটি অনুপস্থিতির আভাস পায়, যার নির্দিষ্ট বস্তু নেই। চোখ কৃষ্ণচূড়ার দিকে থাকলেও মন অন্যত্র, কথার মধ্যে বিরতি, মুখে স্বাভাবিক বিনিময়ের স্বচ্ছন্দতা অনুপস্থিত: সব মিলিয়ে নির্জনতার অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু এই বিশেষণ ব্যবহারে একটি সীমাও আছে। যে মুখকে বিনয় নির্জন বলে পড়ছে, সে মুখের মানুষটি নিজের অনুভূতিকে অন্যভাবে জানাতে পারে। জীবনানন্দ কথকের উপলব্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ করেছেন, তাকে সর্বজ্ঞ সাক্ষী বানাননি। তাই গল্প পড়তে পড়তে সুহাস সম্পর্কে প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে বিনয়ের দৃষ্টির যোগ মনে রাখতে হয়। বন্ধুর প্রতিকৃতি যতখানি সুহাসের, ততখানি বিনয়ের মানসিক অবস্থার প্রকাশ (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৭)।
মাছরাঙার ডাকের সঙ্গে সুহাসের স্বরের তুলনাটি এমনই এক অন্তরঙ্গ পাঠের উদাহরণ। হঠাৎ উচ্চারিত বাক্য বিনয়কে চমকে দেয়; তার কানে স্বরটি সন্ধ্যার আকাশে পাখির ডাকের মতো করুণ লাগে। অথচ কথোপকথনের সময় দুপুর। বর্তমান সময়ের উপর অন্য এক সময়ের অনুভূতি এসে পড়েছে। মানুষের শ্রবণস্মৃতি এভাবেই কাজ করে: এক মুহূর্তের শব্দ পূর্বে শোনা কোনো ভিন্ন পরিবেশের স্বরকে ফিরিয়ে আনে। এখানে সন্ধ্যার মাছরাঙা প্রকৃত সময়ের হিসাব পাল্টে দেয় না; বিনয়ের অভিজ্ঞতার ঘনত্ব বাড়ায়। পাখির ডাকের সঙ্গে বন্ধুর প্রশ্ন মিলে যাওয়ায় বাক্যের আক্ষরিক অর্থের পাশাপাশি তার অসহায়তা শোনা যায়। সুহাস যেন বিনয়কে শুধু তথ্য জানতে ডাকছে না; নিজের ভিতরের অনিশ্চয়তা নিয়ে তাকে ফিরে দেখতে বলছে। বিনয় এই আহ্বানকে পাখির করুণ ডাকের মধ্যে শুনেছে। ফলে বাস্তব কথোপকথন ও স্মৃতিনির্ভর শ্রুতিচিত্র একসঙ্গে বিন্যস্ত হয়েছে (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৭)।
তাদের কথাবার্তায় সরাসরি শোক প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিরোধও আছে। বিনয় কখনো প্রশ্নকে এড়িয়ে যায়, কখনো ঠাট্টার কাছাকাছি একটি ভঙ্গি খুঁজে পায়। নস্যির কৌটো টেনে নেওয়ার মতো ছোট কাজ মুহূর্তের উত্তেজনা সামলানোর চেষ্টা হতে পারে। আঙুলের কাজ তখন ভাষার বিরতি পূরণ করে। নিজের ভিতরে হাসি ফেনিয়ে ওঠার অনুভবও সরল আনন্দের লক্ষণ নয়। গভীর অস্বস্তির সময় মানুষের অপ্রত্যাশিত হাসি আসতে পারে; তা শোকের অস্বীকার যেমন নয়, শোকের সঙ্গে থাকার একটি অস্থায়ী উপায়। এই কারণেই দৃশ্যটিকে বেদনার মাঝখানে অনর্থক কৌতুক বলে বাদ দেওয়া যায় না। বিনয়ের প্রতিক্রিয়ার অসংগতি তার মানবিকতা বাড়ায়। লোকসমক্ষে স্থির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা এবং ভেতরে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা একসঙ্গে কাজ করে। জীবনানন্দের চোখ এই ক্ষুদ্র আচরণগুলিতেও থাকে। বৃহৎ ধারণা দিয়ে চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করার আগে তিনি হাতে ধরা বস্তু, চোখ ফিরিয়ে নেওয়া, সিগারেটের ধোঁয়া কিংবা দীর্ঘশ্বাসের দিকে তাকান (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৮)।
হাসির ফেনা মিলিয়ে গেলে বিনয়ের মধ্যে যে অস্পষ্ট উদাসীনতা আসে, তা সুহাসের কথা বোঝার ক্ষমতাকেও বদলে দেয়। সে হয়তো প্রত্যেকটি বাক্য গ্রহণ করছে না, কিন্তু স্বরের অভিঘাত অনুভব করছে। চিলের ডানা, মেঘের ছায়া এবং বুকের উপর এসে পড়া অনুভূতি একত্রে এই শ্রবণের রূপ তৈরি করে। এখানে ভাষার তথ্যগত অর্থের চেয়ে কণ্ঠস্বরের শরীরী উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কাছের মানুষ কোনো কঠিন প্রশ্ন করলে তার শব্দগুলো মনে না থাকলেও গলার টান দীর্ঘদিন মনে থাকতে পারে। জীবনানন্দ সেই অভিজ্ঞতাকে চিত্রকল্পের সাহায্যে ধরেছেন। চিলের ডানা দূরের আকাশের অংশ; বুক সবচেয়ে কাছের শরীরী স্থান। দূরের ছায়া বুক পর্যন্ত এসে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে বন্ধুর কণ্ঠস্বরের গতিপথ অনুভূত হয়। এই চিত্রে দৃশ্য ও শ্রুতি পরস্পরকে সাহায্য করে, একে অপরের বিকল্প হয় না। বিনয়ের পক্ষে সুহাসের বেদনা সম্পূর্ণ জানা অসম্ভব হলেও স্বরটির আঘাত এড়ানো সম্ভব নয় (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১১৮)।
দুটি চরিত্রের সম্পর্ককে একই দুঃখের সহজ প্রতিফলন বললে তাদের মধ্যে যে ফাঁক রয়ে গেছে তা দেখা যায় না। বিনয় স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়েছে; সুহাস তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করছে এবং মৃত্যুর পরেও কোনো উপস্থিতির সম্ভাবনা অনুভব করছে। দুজনের অভিজ্ঞতার সূত্র একই হলেও বিশ্বাস, ভাষা ও প্রত্যাশা আলাদা। সুহাস যখন সেই অনুপস্থিত মানুষটির ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়, বিনয়ের প্রতিক্রিয়ায় বিস্ময়ের পাশাপাশি সন্দেহও আছে। তার কাছে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ফিরে পাওয়ার ফল এক বিষয় নয়। বহুদিনের একাকিত্বে মানুষ নিজের বর্তমান জীবনযাত্রার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে যে কল্পিত পুনর্মিলনও তাকে নিঃশর্ত আনন্দ দেবে কি না সে নিশ্চিত থাকে না। এই দ্বিধা গল্পটিকে সহজ অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের কাহিনি হতে দেয় না। পাঠককে প্রশ্ন করতে হয়, সুহাস কী বিশ্বাস করে, বিনয় কেন নিজের অনুভূতি নিয়ে অনিশ্চিত এবং তাদের কথার মাঝখানে মৃত মানুষের স্মৃতি কোন অবস্থানে আছে। উত্তরের চেয়ে এই প্রশ্নগুলির পরস্পরসংযোগ বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
সুহাসের চোখের উপমা বিনয়ের দৃষ্টিতে কখনো মাছের দিকে সরে যায়। জলের ভিতর থেকে দেখা চোখের ধারণায় দূরত্ব, নিবিড়তা ও অস্পষ্টতা একসঙ্গে আছে। মানুষ চোখের দিকে তাকিয়ে অন্যের মন জানতে চায়; অথচ জল যেন সেই দেখার সামনে একটি স্বচ্ছ বাধা রাখে। বোঝা যায় সুহাস তাকিয়ে আছে, কিন্তু সে কী দেখে তা নিশ্চিত জানা যায় না। মাছের চোখের উল্লেখে নীরব প্রাণের এক ধরনের শীতল বিষাদও যুক্ত হয়। এই তুলনাটিকে স্থায়ী পরিচয় ভাবা ঠিক হবে না; কিছুক্ষণ পরই বিনয় অন্য পরিপ্রেক্ষিতে সুহাসকে পাখির ভঙ্গিতে দেখে। মানুষের মুখ এক উপমায় চিরকালের জন্য ধরা পড়ে না। মুহূর্তের আলো, কথার বিষয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন উপমা বদলে দেয়। জীবনানন্দের গদ্যে এই বদল কেবল বৈচিত্র্যের আকাঙ্ক্ষা নয়। চরিত্রকে একটিমাত্র ব্যাখ্যার অধীনে আটকে না রাখার একটি উপায়। সুহাস যখন রহস্যময় মনে হয়, জলের প্রাণী তাকে বোঝাতে সাহায্য করে; যখন তার ঘাড়ের নড়াচড়ায় সহজতা দেখা যায়, শালিখের ছবি সামনে আসে (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১২০)।
দুপুরের লাল কৃষ্ণচূড়া ও নীল ধোঁয়ার দৃশ্যে চোখের সামনে আরেক ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সুহাস চুরুট ধরালে ধোঁয়া ঘরের আলো পেরিয়ে জানালার দিকে যায়; বাইরে ফুলের রং তার আড়ালে কখনো দেখা দেয়, কখনো ঢাকা পড়ে। এই সহজ বস্তুগত ঘটনাকে জীবনানন্দ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে ধরেছেন। ধোঁয়া বাস্তবেই আলোকে আবছা করে, কিন্তু বিনয়ের চোখে সেই আচ্ছাদন সম্পর্কের অনিশ্চয়তারও অনুভব জাগায়। সামনে থাকা মানুষটিকে সে দেখছে, তবু পুরোপুরি বুঝতে পারছে না; ফুলের মতো সুস্পষ্ট রংও ক্ষণিকের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। দৃশ্যের ভাঙাগড়া বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনের ছন্দ অনুসরণ করে। সুহাস প্রতিটি কথার জবাব দেয় না; ধোঁয়ার স্তম্ভও স্থির ও অখণ্ড থাকে না। আলো, রং ও আড়ালের এই সাময়িক বিন্যাস ঘটনার নির্দিষ্ট তাৎপর্য ঘোষণা করে না, কিন্তু মুহূর্তটির টানাপোড়েনকে দৃশ্যমান করে। প্রকৃতিকে চরিত্রের সরল অনুবাদ না বানিয়েও কীভাবে মানসিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত রাখা যায়, তার একটি উদাহরণ এই বর্ণনা (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১২০)।
বিনয়ের আশঙ্কা, ফিরে পাওয়ার ঘটনাও একদিন তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় নাও হতে পারে, গল্পের একটি অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশ করে। ভালোবাসা কেবল আকাঙ্ক্ষার স্মৃতিতে বেঁচে থাকে না; সময় মানুষকে বদলে দেয়। যে ব্যক্তি শোকের প্রথম দিনে পুনর্মিলন চেয়েছিল, বহু বছর পরে সে অন্যভাবে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে পারে। এই পরিবর্তন মৃত মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা কি না, বিনয় স্পষ্ট করে বলে না। তবে তার সংশয় থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘকাল অনুপস্থিত ব্যক্তিকে কল্পনায় ফিরিয়ে আনা এবং বাস্তব জীবনে তার সঙ্গে আবার বসবাস করা আলাদা অভিজ্ঞতা। সুহাস এই কথার তৎক্ষণাৎ উত্তর না দেওয়ায় মুহূর্তটি আরও গভীর হয়। তাদের বন্ধুত্ব এত সহজ নয় যে একজনের জটিল স্বীকারোক্তি অন্যজন প্রস্তুত ব্যাখ্যায় মিটিয়ে দেবে। কখনো অনুত্তরই সম্পর্কের সত্য। বিনয় নিজের ভিতরের অসুবিধাজনক চিন্তাটি উচ্চারণ করে, সুহাস চুরুটের ধোঁয়ায় তাকিয়ে থাকে, আর পাঠক সেই বিরতির মধ্যে অপ্রকাশিত প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা অনুভব করেন।
গল্পের পরবর্তী অংশে সুহাস বিনয়ের স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় তার অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ তোলে। এই প্রশ্নের ওজন অন্য রকম। আগে শূন্যতা নিয়ে বেঁচে থাকার কথা ছিল; এখন মৃত্যুর নির্দিষ্ট মুহূর্তে পাশে না থাকার কথা। শোকের সঙ্গে অপরাধবোধ জড়িয়ে যেতে পারে, বিশেষত যখন শেষ সময়ে উপস্থিত থাকার সুযোগ মানুষ পায়নি। বিনয় স্ত্রীর পাশাপাশি সন্তানের মৃত্যুর তথ্য জানায়; কলেরার অভিঘাত একটি পরিবারের দুটি জীবন একই পরিসরে শেষ করেছে। রোগের নাম ও মৃত্যুর এই কঠিন তথ্য গল্পের কল্পনাময় ভাষাকে বাস্তবে ফেরায়। অতিপ্রাকৃত প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার মধ্যেও ইতিহাসের নির্দিষ্ট বিপর্যয় থেকে যায়। বিনয়ের পক্ষে মৃতদের উপস্থিতি কল্পনা করা সম্ভব হলেও তাদের অসুস্থতার সময়ের অনুপস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। সুহাসের প্রশ্ন এই অপরিবর্তনীয় সত্যে আঙুল রাখে। এখানেই দুই বন্ধুর আলাপ সবচেয়ে নিরাবরণ হয়ে ওঠে (জীবনানন্দ দাশ, ‘রক্তের ভিতর’, জীবনানন্দ সমগ্র, একাদশ খণ্ড, পৃ. ১২০ থেকে ১২১)।
তবে সুহাসের প্রশ্নকে সরল অভিযোগ হিসেবে পড়লে তার কণ্ঠস্বরের ভিন্নতা উপেক্ষিত হয়। বিনয় সেখানে বিষণ্নতা বা আনন্দের চেয়ে গভীরতর এক গাম্ভীর্য অনুভব করে। সে গাম্ভীর্য বোঝাতে ধর্মের সুর ও রঙের আশ্রয় নেয়। ধর্ম শব্দটির এখানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আচার বা বিধানের অর্থ চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের যে জিজ্ঞাসা দৈনন্দিন হিসাবকে অতিক্রম করে, বিনয় হয়তো তারই একটি সুর শুনছে। সুহাস নিজে ঠিক কী অভিপ্রায়ে প্রশ্ন করছে, গল্প নিশ্চিত করে না। কথক তার গলার মধ্যে যে গুরুতর অভিঘাত শুনেছে, সেটিই বর্ণিত হয়। এই ব্যবধান মনে রাখলে বাক্যের বহুমাত্রিকতা রক্ষা পায়। সুহাস নৈতিক বিচারের প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়ায় না, বিনয়ও কেবল বিচারের আসামি নয়। দুজনের মাঝখানে মৃত্যু, অনুপস্থিতি, স্মৃতি ও অনির্দিষ্ট বিশ্বাস উপস্থিত। ভাষা যখন মন্দির, অন্ধকার এবং রঙের অস্বাভাবিক সংযোগ সৃষ্টি করে, তখন এই জটিল পরিস্থিতিরই অনুভবযোগ্য আকার দেয়।
মন্দিরের চিত্রটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কারণ সেটি দৃশ্যমান স্থাপত্য হিসেবে গল্পে হাজির হয় না। বিনয়ের মনের সামনে অন্ধকার থেকে যেন বিশাল এক গম্ভীর পরিসর উঠে আসে। বন্ধুর স্বর শুনে নিজের ভেতরে সে এমন একটি স্থান কল্পনা করে যেখানে ব্যক্তিগত ব্যথা বৃহত্তর মানবিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এই অনুভূতিকে সহজ সান্ত্বনা বলা যায় না। মন্দিরের গাম্ভীর্য যতখানি আশ্রয়ের, ততখানি ভয়েরও; পরিচিত পৃথিবীর সব রং সেখানে নিভে যেতে পারে। মৃত্যুচিন্তায় মানুষের স্বাভাবিক ইচ্ছা, স্মৃতি ও নিরাপত্তাবোধ সাময়িকভাবে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। বিনয়ের বর্ণনায় মন্দির সেই অভিজ্ঞতার ছবি। জীবনানন্দ দৃশ্যটির ব্যাখ্যা নির্দিষ্ট না করায় পাঠকও তার ভেতরে একাধিক অনুভূতি নিয়ে প্রবেশ করেন। আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত থাকতে পারে, কিন্তু তাকে নিশ্চিত ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তে রূপান্তর করলে গল্পের দ্বিধা নষ্ট হবে। সুহাসের উচ্চারণ ও বিনয়ের মনের ছবি পরস্পরের স্পর্শে তৈরি; কোনটি একান্ত কার, তা পুরোপুরি আলাদা করা যায় না।
বিনয় নিজের অনুপস্থিতিকে শেষ পর্যন্ত কোনো দীর্ঘ আত্মপক্ষসমর্থনে ঢাকতে চায় না। স্ত্রী ও মেয়ে দুজনের শেষ সময়েই কাছে থাকতে পারেনি বলে জানায়। তথ্যটি ছোট, কিন্তু তার ভিতরে সম্ভাব্য কত প্রশ্ন আছে। তখন সে কোথায় ছিল, কেন পৌঁছাতে পারেনি, পরে কীভাবে এই দ্বিগুণ ক্ষতি নিয়ে বেঁচেছে: গল্প সব উত্তর দেয় না। এই সংযমকে কাহিনির অসম্পূর্ণতা বলে তাড়াহুড়ো করে বিচার করা যায় না। জীবনানন্দ ঘটনার পূর্ণ দলিল তৈরি করতে চাননি; বর্তমানে কথার আঘাতে অতীত কীভাবে ফিরে আসে সেটি ধরেছেন। অনুপস্থিতির কারণ জানা থাকলেও শোকের অনুভূতি সহজ হতো না। বরং কারণ নিয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা এই দৃশ্যের নীরবতাকে আড়াল করতে পারত। সুহাস কিছুক্ষণের মধ্যে শব্দ থামিয়ে চুরুট তুলে নেয়। বন্ধুর প্রত্যুত্তরের পরে মুখোমুখি থাকা দুই মানুষের জন্য আর কোনো প্রস্তুত বাক্য থাকে না। ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়ে গেলেও তার কম্পন পাঠকের মধ্যে চলতে থাকে। গল্পের শৈল্পিক সংহতি এই অসমাপ্ত অনুভূতির মধ্যে।
সুহাসের নীরবতার অর্থ একটিমাত্র নয়। সে হয়তো বন্ধুর বেদনা নতুনভাবে বুঝেছে; হয়তো নিজস্ব বিশ্বাসের সীমা টের পেয়েছে; হয়তো এমন স্মৃতি শুনেছে যার জবাব দেওয়ার অধিকার নিজের নেই। জীবনানন্দ পাঠককে এর একটি নির্বাচন করতে বাধ্য করেন না। নীরবতা এখানে কথার অভাব নয়; সম্পর্কের প্রতি এক ধরনের সংবেদনশীল সাড়া। সুহাস বিনয়ের কথার উপর আরেকটি কথার স্তর চাপিয়ে দেয় না। চুরুট তুলে নেওয়ার সাধারণ ভঙ্গি এই নীরবতাকে দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনে। মন্দিরের বিশাল অন্ধকার অনুভব করার পরেও মানুষকে টেবিলের কাছে বসতে হয়, ছোট জিনিস হাতে নিতে হয়। গল্পের মহৎ অনুভূতি সাধারণ অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত থাকে বলেই বিশ্বাসযোগ্য। অনির্বচনীয়তার দাবিতে সমস্ত বাস্তব উপকরণ সরিয়ে দিলে দৃশ্যটি বিমূর্ত হয়ে পড়ত। জীবনানন্দ সেই ভুল করেননি। রঙ, দৃষ্টি ও গভীর স্বরের পাশাপাশি চুরুট, সাইকেল, নস্যির কৌটো ও কাঠের টেবিলকে একই জীবনভূমিতে রেখেছেন।
গল্পের নাম ‘রক্তের ভিতর’ একাধিক স্তরে পড়া যায়। প্রথমত, শরীরের মধ্যে বাস করা স্মৃতি ও প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত আছে। শোক কেবল স্মরণ করার মানসিক সিদ্ধান্ত নয়; একটি স্বর বা প্রশ্ন শুনে আকস্মিক যে সাড়া ওঠে তারও বিষয়। দ্বিতীয়ত, পারিবারিক বন্ধনের অভিজ্ঞতা এখানে গভীর। স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পরে বিনয়ের জীবন আগের মতো থাকে না, কিন্তু জীবিত থাকার প্রতিদিনের কাজ থামেও না। এই বিচিত্র সহাবস্থান তার রক্তের ভিতরের জীবনে চলতে থাকে। তৃতীয়ত, গল্পে বন্ধু সুহাসের উপস্থিতি দেখায় ব্যক্তিগত ব্যথা অন্য মানুষের কথায় নতুনভাবে আন্দোলিত হতে পারে। রক্তের প্রতীককে একটি সংকীর্ণ শারীরবিদ্যাগত বা বংশপরিচয়গত অর্থে সীমাবদ্ধ রাখলে এই গতি ধরা পড়বে না। তবে তার যে একটিই চূড়ান্ত অর্থ আছে, এমন দাবিও গল্প সমর্থন করে না। নামটি পাঠককে বারবার চরিত্রের বাহ্যিক আচরণ থেকে অন্তরের সাড়া বুঝতে আহ্বান করে। এই আহ্বান গল্প শেষ হওয়ার পরেও জারি থাকে।
কৃষ্ণচূড়ার পুনরাবৃত্তিও গল্পের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে বিনয় প্রকৃতি দেখতে দেখতে অন্য একটি জগতের কথা ভাবে; সুহাসের আগমনে একই ফুল অন্য আবহ পায়; ধোঁয়ার ভিতর আবার তার লাল রং ভেঙে দেখা দেয়। বস্তুটি একই থাকলেও দৃষ্টির সময় বদলায়। পুনরাবৃত্তির ফলে পাঠক বুঝতে পারেন, প্রকৃতির অর্থ স্থির কোনো অভিধানে লেখা নেই। সকালে ফুলের পাশে লেখার প্রত্যাশা, দুপুরে বন্ধুর আগমন, পরে কথোপকথনের অস্বস্তি জড়ায়। লাল রঙকে তাই একবারেই রক্তের নিশ্চিত প্রতীক ঘোষণা করা সহজ হলেও যথেষ্ট নয়। গল্পের নাম ও ফুলের রং পাঠে সম্পর্ক গড়তে পারে, কিন্তু সে সম্পর্ক প্রতিটি দৃশ্যের আলাদা কাজ মুছে দিতে পারে না। কখনো রঙের ঘনত্ব চিত্রকে আনন্দদায়ক করে, কখনো ধোঁয়ায় আড়াল হয়ে ক্ষয়ের অনুভূতি আনে। এই পরিবর্তনশীলতা রক্ষা করলেই বিনয় ও সুহাসের মনের গতির সঙ্গে প্রকৃতিচিত্রের প্রকৃত সম্পর্ক ধরা পড়ে।
একইভাবে চিলের উপস্থিতি প্রথম সকালের মুক্ত আকাশে এবং পরে কণ্ঠস্বরের ছায়ার তুলনায় ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করে। প্রথমবার ডানার বিস্তার দূরের রূপকথার দেশে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা জাগায়। পরে তার ডানার সঙ্গে মেঘের ছায়া জুড়ে বিনয় বন্ধুর কথার চাপ বুকে অনুভব করে। উড়ে যাওয়া পাখি থেকে কাছে এসে পড়া ছায়া, এই গতিপরিবর্তন গল্পের আবেগগত পথও নির্দেশ করে। প্রথমে বিনয়ের মন বাইরের দিকে ছুটছিল; পরে কথোপকথন তাকে নিজের শরীরের দিকে ফেরায়। এই রূপান্তর কাহিনির সাদামাটা ঘটনাক্রমে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। পুনরাবৃত্ত ছবি ও তার পরিবর্তিত স্থান বুঝতে পারলেই গল্পের নির্মাণের সূক্ষ্মতা চোখে পড়ে। জীবনানন্দ পাখিকে একবারের জন্য বেছে নেওয়া সাজসজ্জা হিসেবে ব্যবহার করেননি। একই প্রাকৃতিক উপাদান বিভিন্ন মুহূর্তে চরিত্রের সঙ্গে ভিন্ন সম্পর্ক স্থাপন করে। জীবনের কোনো দুঃখ এক অবস্থায় থাকে না বলেই সেই উপাদানের অর্থও চলমান।
কথকের ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও আসে। বিনয় নিজের অনুভব জানায়, আবার সুহাসের চোখ, মুখ ও নীরবতার অর্থও বোঝাতে চায়। কিন্তু সে যেখানে নিশ্চিত নয়, সেখানে অনুমানের চিহ্ন রেখে দেয়। এই দ্বিধা দুর্বলতা নয়; গভীর মনস্তাত্ত্বিক বর্ণনার শর্ত। অন্য মানুষকে জানার ইচ্ছা যত প্রবল হয়, তার অজ্ঞেয়তার অনুভূতিও তত স্পষ্ট হতে পারে। বিনয় সুহাসের চোখে নিজের দিকে তাকানো দেখে, আবার সন্দেহ করে বন্ধু হয়তো ফুল দেখছে না। সে সুহাসের গলার মধ্যে গাম্ভীর্য শুনলেও তার বিশ্বাসের পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে না। ফলে পাঠক কথকের সঙ্গে একাত্ম হতে গিয়েও তাকে পরীক্ষা করেন। গল্পের ঘটনাগুলির বাইরে অন্য কোনো সর্বজ্ঞ বিচারক নেই যে ভুল ও ঠিক আলাদা করে দেবেন। এই উন্মুক্ততার মধ্যে বন্ধুত্বের সীমা ও সম্ভাবনা উভয়ই ধরা পড়ে। যতটা জানা যায়, ততটাই কথা বলা যায়; বাকিটুকু নীরবতা, উপমা ও অপেক্ষার মধ্যে থাকে।
সময়ের ব্যবহারে গল্পটি উল্লেখযোগ্য সংযম দেখায়। বৈশাখের একাধিক দিন এক বাক্যে পেরিয়ে যায়, অথচ বন্ধুর একটি বিরতি বা একটি প্রশ্নে দীর্ঘ অনুভূতিপূর্ণ পরিসর তৈরি হয়। ঘড়ির সময় এবং মনের সময়ের এই অমিল ছোটগল্পের পরিসরকে প্রসারিত করে। দিনগুলি সম্পর্কে সব বিবরণ দিলে বিনয়ের অপেক্ষার একঘেয়েমি হয়তো তথ্য হিসেবে জানা যেত, কিন্তু তার অনুভূতির ভার এত নিবিড় হতো না। উল্টো দিকে সুহাসের প্রশ্নের মুহূর্ত সংক্ষেপে শেষ করলে শোকের প্রত্যাবর্তন স্পষ্ট হতো না। জীবনানন্দ বর্ণনার দৈর্ঘ্যকে আবেগের চাপে পরিবর্তিত করেছেন। কোথাও সময় দ্রুত, কোথাও স্তব্ধ। অতীতের মৃত্যু বর্তমান কথোপকথনে ফিরে আসে বলে ঘটনাক্রম সরল রেখায় চলে না। আবার এই চলনকে খেয়ালখুশির বিচ্ছিন্নতা বলা যাবে না। বিনয়ের মনের জন্য কোন ঘটনা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, সেই অনুযায়ী বর্ণনার গতি তৈরি হয়। পাঠকও সেই গতিতে চলতে চলতে কোনো দিন বা ঘণ্টার দৈর্ঘ্যের চেয়ে মুহূর্তের অভিঘাত বেশি অনুভব করেন।
প্রকৃতিকে গল্পের আরেকটি চরিত্র বলা আকর্ষণীয় হলেও কথাটির অর্থ সাবধানে নির্ধারণ করা দরকার। গাছ বা আকাশ মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নেয় না, সংলাপে অংশও নেয় না। কিন্তু তারা বিনয়ের মনোযোগকে প্রভাবিত করে, দৃশ্যের ছন্দ বদলায় এবং সুহাসের আচরণ বুঝতে তুলনার ক্ষেত্র দেয়। এই অর্থে প্রকৃতি গল্পের নিষ্ক্রিয় পটভূমি নয়। কৃষ্ণচূড়ার ফুল সুহাসের দৃষ্টির ফাঁক বুঝতে সাহায্য করে, ধোঁয়া রঙের স্পষ্টতা বদলায়, আকাশের প্রসার বিনয়ের কল্পনার দূরত্ব তৈরি করে। প্রকৃতির এই সক্রিয়তা চরিত্রের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, তবে তাকে কেবল মনের আয়না বলা যায় না। প্রকৃতির নিজস্ব বস্তুগত উপস্থিতি থাকে বলেই তার সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতার নতুন সংযোগ সম্ভব হয়। গাছের পাতা নড়ে, পাখি ডাকে, মেঘ সরে যায়; মানুষ সেসব দেখে কখনো নিজের কথা বোঝে, কখনো আরও বিস্মিত হয়। এই দুই সম্ভাবনাই গল্পে সক্রিয়।
সুহাসের ভূমিকা তাই কেবল বিনয়ের আত্মপ্রকাশের বাহানা নয়। তার নিজের প্রশ্নের ধারাবাহিকতা আছে, বিশেষ এক বিশ্বাসের আভাস আছে, বন্ধুকে গভীরভাবে দেখার আকাঙ্ক্ষা আছে। সে কখনো স্বাভাবিক বিনিময় থেকে সরে গিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে, কখনো উত্তর না দিয়ে নীরব থাকে। এই স্বাধীনতা তার চরিত্রকে বিনয়ের প্রতিবিম্বে সীমাবদ্ধ হতে দেয় না। অবশ্য পাঠক সুহাসকে সব সময় বিনয়ের বর্ণনার মাধ্যমে দেখছেন। তবু সংলাপের চাপ থেকে বোঝা যায়, অন্য মানুষ হিসেবে সুহাস নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। বিনয় তাকে পুরোপুরি নিজের মতো ব্যাখ্যা করতে পারে না বলেই গল্পে সত্যিকার সাক্ষাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। যদি দুই বন্ধুর অনুভূতি সম্পূর্ণ এক হতো, তবে কোনো কথোপকথনের দরকার থাকত না। তাদের মিল শোকের কাছে পৌঁছায়; অমিল সেই শোক সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন জাগায়। এই দুই শক্তির সমাবেশই গল্পের মানবিক কেন্দ্র।
জীবনানন্দের বাক্যের দৈর্ঘ্যও এই কেন্দ্রকে অনুভবযোগ্য করে। প্রকৃতির দিকে তাকানোর সময় কোনো বাক্য বিস্তৃত উপমা ও পরপর দৃশ্য নিয়ে এগোয়। শোকের সরাসরি প্রশ্নে বাক্য ছোট হয়, বিরতি বাড়ে। কখনো একটি বিশেষণ স্বাভাবিক স্থান ছেড়ে অন্য বস্তুতে গিয়ে বসে; মুখ নির্জন হয়, জল অন্ধকার হয়, স্বরে রঙের অনুভূতি জাগে। এসব পরিবর্তনকে শুধুই অলংকারের সংগ্রহ ভাবলে বাক্যের কার্যকারিতা বোঝা যায় না। যে বিষয় সরল ব্যাকরণে বলা যায় না, তার চাপেই বাক্য স্বাভাবিক ব্যবহারের বাইরে এগোয়। তবে ভাষার দুরূহতা সব জায়গায় সমান নয়। সাইকেল রাখা কিংবা চুরুট তোলার মতো কাজের বিবরণে গদ্য সহজ। এই সহজ ও ঘন ভাষার পালাবদল পাঠকে শ্বাস নেওয়ার জায়গা দেয়। জীবনানন্দের কাব্যিক গদ্যের সৌন্দর্য কেবল ঘনীভূত চিত্রকল্পে নয়; প্রয়োজনমতো সাধারণ কথায় ফিরে আসার ক্ষমতাতেও।
রূপকথার প্রাসাদ এবং অন্ধকারের মন্দির গল্পে দূরবর্তী দুটি স্থাপত্যকল্প। প্রথমটি সকালের আলোয় বিনয়ের কল্পনাকে বহির্মুখী করে; দ্বিতীয়টি বন্ধুর প্রশ্নে তাকে গভীর আত্মসমীক্ষায় নিয়ে যায়। দুই স্থানের কোনোটিই বাস্তব ভ্রমণের গন্তব্য নয়। একটি হারানো স্বস্তির সম্ভাবনা, অন্যটি মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানোর গাম্ভীর্য বহন করে। এই দুটি প্রান্তের মাঝখানে আছে সত্যিকারের ঘর ও টেবিল। বিনয় একই দিনে বা একই অভিজ্ঞতায় তিন ধরনের স্থান অতিক্রম করে: বসবাসের জায়গা, আকাঙ্ক্ষার জায়গা, কঠিন প্রশ্নের জায়গা। গল্পটির স্থানবোধ তাই কেবল মানচিত্রে বোঝানো যায় না। বাইরে কোথাও না গিয়েও সে কত দূর চলে যায়, সেই গতিই গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব ঘরের কেন্দ্র হারিয়ে যায় না; প্রতিটি মনোজগৎ শেষে তার কাছেই ফিরে আসে। কল্পিত স্থাপত্যগুলোর সঙ্গে কাঠের টেবিলের এই সম্পর্ক জীবনানন্দের বর্ণনাকে একই সঙ্গে স্থির ও গতিশীল করে।
শোকের বর্ণনায় সংযম ও তীব্রতার পাশাপাশি থাকা গল্পটির স্বরকে আলাদা করেছে। বিনয় কখনো বিশাল, অস্বাভাবিক ছবির আশ্রয় নেয়; আবার স্ত্রী ও মেয়ের মৃত্যুর তথ্য খুব সাধারণ বাক্যে জানায়। কোনো একটি রীতিই যথেষ্ট নয়। অতি ঘন চিত্রকল্পে সমস্ত ঘটনা বললে ক্ষতির বাস্তব কারণ আড়াল হতো। শুধুমাত্র রোগ ও অনুপস্থিতির তথ্য দিলে সেই ক্ষতি জীবিত মানুষটির ভিতরে কীভাবে কাজ করছে, তা অনুভব করা যেত না। জীবনানন্দ দুটি রীতির মধ্যে যাতায়াত করেন। ফলে পাঠক একদিকে বুঝতে পারেন কী ঘটেছিল, অন্যদিকে দেখেন ঘটনার পরেও জীবন কীভাবে তার অভিঘাত বহন করে। এই ভারসাম্য গল্পটিকে অতিরঞ্জিত আবেগের দিকে ঠেলে দেয় না। বরং কঠিন তথ্য ও অস্থির অনুভূতি উভয়ের সামনে পাঠককে দাঁড় করায়। প্রতিটি তীব্র উপমার পাশে একটি ছোট কাজ বা থেমে যাওয়া বাক্য থাকায় মানসিক দৃশ্যগুলি মাটির সংযোগ হারায় না।
বন্ধুত্বের সাধারণ ধারণায় সান্ত্বনা দেওয়া, মন হালকা করা বা পরামর্শ দেওয়ার প্রত্যাশা থাকে। বিনয় ও সুহাসের সাক্ষাৎ সেই প্রস্তুত প্রত্যাশা পূরণ করে না। সুহাস যে প্রশ্নগুলি করে, সেগুলো বিনয়ের কষ্ট কমানোর বদলে বাড়িয়েও দিতে পারে। তবু প্রশ্ন করার মধ্যে অনাগ্রহ নেই; বন্ধুর গভীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার এক কঠিন পদ্ধতি আছে। বিনয়ও সব কথা স্পষ্ট বলে সুহাসকে শান্ত করে না। তাদের সম্পর্কের সার্থকতা তাই মীমাংসায় নয়, জটিল সত্যের সামনে একসঙ্গে কিছুক্ষণ থাকার সামর্থ্যে। যে মানুষ প্রিয়জনকে হারিয়েছে তাকে দ্রুত স্বস্তি দেওয়ার ভাষা প্রায়ই তার অনুপস্থিতির গভীরতা এড়িয়ে যায়। সুহাস অন্তত এড়ায় না। আবার সে বিনয়ের শোকের সম্পূর্ণ অধিকার দাবি করে না; শেষ পর্যন্ত নীরব থাকে। এই মেলবন্ধনে বন্ধুত্বের এক সংযত, বিশ্বাসযোগ্য রূপ পাওয়া যায়। সহমর্মিতা এখানে অন্যের দুঃখ ঠিক করে দেওয়ার ক্ষমতা নয়, সেই দুঃখের সামনে নিজের ভাষার সীমা মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি।
প্রকৃতি ও শোকের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গল্প কোনো সহজ চিকিৎসার ধারণা দেয় না। বৈশাখের সকাল সুন্দর বলেই বিনয় ভালো হয়ে যায় না। মাঠের রং তাকে কল্পনার অবকাশ দেয়, কিন্তু মৃত স্ত্রী ও সন্তানের স্মৃতি নিষ্প্রভ করে না। বন্ধুর উপস্থিতিও সেই ক্ষতি মুছে দেয় না। তবু প্রকৃতি, লেখা ও কথোপকথন তাকে জীবনের সঙ্গে সংযোগের তিনটি ভিন্ন পথ দেয়। সে বাইরে তাকাতে পারে, নিজের মনকে ভাষায় ধরতে চেষ্টা করতে পারে, অন্যের কঠিন প্রশ্ন শুনতে পারে। প্রতিটি পথ অসম্পূর্ণ, কিন্তু প্রতিটি তাকে বর্তমানের মধ্যে থাকতে সাহায্য করে। এই সূক্ষ্ম সম্ভাবনার কারণেই গল্পের বিষাদ একমাত্র অনুভূতি হয়ে থাকে না। জীবনের রূপ ও শব্দ অনুভব করার ক্ষমতা এখনও বিনয়ের মধ্যে আছে। তার শোক সেই ক্ষমতার সঙ্গে বিরোধে থাকে, কখনো তাকে ধারালোও করে। জীবনানন্দ মানুষটির জন্য কোনো চূড়ান্ত আরোগ্যের কাহিনি লেখেননি; বেঁচে থাকার জটিল বর্তমানকে দেখিয়েছেন।
‘রক্তের ভিতর’কে তাই একদিকে আত্মস্মৃতির, অন্যদিকে অপরের মুখোমুখি হওয়ার গল্প হিসেবে পড়া যায়। বিনয়ের অন্তরে বহন করা ক্ষতি সুহাসের প্রশ্ন না এলে হয়তো এভাবে উচ্চারিত হতো না। আবার সুহাস প্রশ্ন করলেও বিনয়ের নিজের দেখার ভাষা না থাকলে সকাল, ধোঁয়া, চোখ ও কণ্ঠস্বর এত গভীর অর্থ পেত না। তাদের সাক্ষাতে কথিত এবং অকথিত অভিজ্ঞতা পরস্পরের দিকে এগোয়। গল্পের দৃশ্যসংখ্যা কম, কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যে সময়ের স্তর, ইন্দ্রিয়ের স্মৃতি এবং সম্পর্কের সীমা জমা আছে। আকাশ থেকে ঘর, ঘর থেকে রক্তের অনুভব, তারপর আবার চুরুট হাতে বসে থাকা মানুষের কাছে ফিরে আসার এই বিন্যাসে জীবনানন্দ ছোটগল্পের সংহতি খুঁজেছেন। কাহিনির ঘটনার চেয়ে অনুভূতির ক্রমবিকাশ এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অথচ ঘটনাগুলি বাদ দিলে সেই বিকাশও বোঝা যাবে না। শিল্পটি এই পরস্পরনির্ভরতার। প্রকৃতির দিকে তাকানো, শব্দ ভুল শোনা, বন্ধুকে দেখতে পাওয়া, একটি প্রশ্ন শুনে চুপ করা: এসব ক্ষুদ্র কাজই মানুষের গভীর জীবনের দরজা খুলে দেয়।
জীবনানন্দ দাশের ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর কবিতার সুপরিচিত নিসর্গকে একমাত্র চাবিকাঠি ভাবার অভ্যাস থেকে সরে আসতে হয়। প্রকৃতির রং, স্বপ্নের দূরত্ব এবং নিঃসঙ্গ মানুষের মনোজগত তাঁর গল্পে আছে; সেই সঙ্গে আছে দপ্তরের পদমর্যাদা, প্রবন্ধের শব্দগণনা, সম্মানীর দরকষাকষি, মালিকের খেয়াল এবং শহুরে সম্পর্কের অস্বস্তিকর হিসাব। ‘বিলাস’ গল্পে এই দুটি অভিজ্ঞতা একই জীবনের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত। শান্তিশেখর একদিকে সৌন্দর্য, প্রেম ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের সম্ভাবনা ভাবতে চায়; অন্যদিকে কাজের শর্ত, অর্থের অভাব এবং ক্ষমতাবান মানুষের রুচি তার সময় ও শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। গল্পের নামটি প্রথমে সচ্ছল উপভোগের ধারণা জাগাতে পারে। কাহিনি এগোলে দেখা যায়, কে কোন অভিজ্ঞতাকে বিলাস বলছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। একজনের কাছে সম্পত্তি থেকে সাময়িক মুক্ত হয়ে মনকে অন্য দিকে ফেরানো বিলাস; অন্যজনের কাছে অর্থহীন মনোযোগ সময় নষ্ট। এই শব্দগত বিরোধ থেকেই গল্পের শ্লেষ তৈরি হয়েছে। ঘটনাগুলো শান্তিশেখরের চারপাশে আবর্তিত হলেও গল্পটি এক ব্যক্তির অসফল আকাঙ্ক্ষার সরল প্রতিবেদন নয়; জীবনের মূল্য নির্ধারণের প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি পদ্ধতির সাক্ষাৎ।
এই সাক্ষাৎকে বুঝতে গল্পটির ঐতিহাসিক আবহও মনে রাখা দরকার। আলোচ্য পাঠে দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, খাদ্যশস্য নিয়ে হিংসা এবং ব্রিটিশ শাসনের উপস্থিতি শান্তিশেখরের ভাবনায় আসে। ব্যক্তিগত ক্লান্তির পিছনে তাই বিপর্যস্ত জনজীবনের চাপ আছে। দুর্ভিক্ষের ইতিহাসকে কেবল তার অন্তরের বিষাদের রূপক বলে পড়লে মানুষের প্রকৃত ক্ষতি আড়াল হয়। আবার ইতিহাসের উল্লেখ আছে বলেই গল্পটিকে রাজনৈতিক ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ ভাবাও যথার্থ হবে না। জীবনানন্দ দেখান, বড় সামাজিক সংকট একজন কর্মজীবী মানুষের ভাবনায় কীভাবে ছায়া ফেলে। বাজারের দামে, কাজের অনিশ্চয়তায়, ভাষার তিক্ততায় সেই ছায়ার বিভিন্ন প্রকাশ। কলকাতার প্রতিষ্ঠান ও মফস্বলের স্মৃতির দূরত্বও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিশেখর যে নগরে উপার্জন করছে, সেখানে থাকার ইচ্ছা এবং থাকার অসুবিধা পাশাপাশি আছে। তার ভাবনার ভিতর দিয়ে শহরটি যেন স্থায়ী আশ্রয় হতে চেয়েও পারে না। যুদ্ধোত্তর পরিবেশের সঙ্গে গল্পের এই সম্পর্ক পাঠে প্রাসঙ্গিক; নির্দিষ্ট রচনাসাল নিয়ে মতভেদ থাকলে পাণ্ডুলিপি বা নির্ভরযোগ্য সংস্করণ দেখে তার নিষ্পত্তি করা উচিত। আলোচ্য ঐতিহাসিক উল্লেখ ও শান্তিশেখরের আত্মভাবনার সূত্র একই গ্রন্থে পাওয়া যায় (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৪৪ থেকে ৪৭)।
চুয়াল্লিশ বছর বয়সের শান্তিশেখর নিজের জীবন নিয়ে হিসাব করতে গিয়ে কেবল আয়ের ঘাটতি দেখে না। ঘর, চারপাশ, স্বাধীনতা ও সচ্ছলতা নিয়ে তার একটি প্রত্যাশা ছিল। নিজের ইচ্ছাগুলি যে বিরল নয়, সে কথাও সে বোঝে; বহু মানুষ একই রকম স্বস্তি চায়। তবু বুঝে নেওয়ার সঙ্গে মেনে নেওয়ার ব্যবধান থাকে। মন চাইলে শরীরের আঘাতকে উপেক্ষা করতে পারে কি না, সে প্রশ্নও তার ভিতরে ওঠে। এমন মানুষকে সে দেখেছে যাদের শরীর লাঞ্ছিত হলেও মনে তার স্থায়ী দাগ পড়ে না বলে মনে হয়। নিজের ক্ষেত্রে সে তা পারে না। এই স্বীকারোক্তি শান্তিশেখরকে সহজ আদর্শবাদীর প্রতিমা বানায় না। অর্থনৈতিক অভাবের বাইরে সে শরীরের ক্লান্তি, অপমানের স্মৃতি ও মনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছে। ব্যক্তিগত অস্বাচ্ছন্দ্যকে সে সাধারণ মানুষের অবস্থার সঙ্গে মেলায়, আবার সেখান থেকে নিজের বিশেষ অসহায়তায় ফিরে আসে। এই ভাবনার গতি প্রশ্ন, সম্ভাবনা এবং সংশোধনের মধ্য দিয়ে চলে। কথক তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার বদলে মানসিক হিসাবের প্রক্রিয়াটি সামনে আনেন (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৪৪)।
শরীর ও মনকে আলাদা রাখার এই চেষ্টা গল্পের পরবর্তী সংঘাতের পূর্বাভাস দেয়। কর্মক্ষেত্রে শান্তিশেখর শুধু দক্ষতা বিক্রি করছে না; নিজের সময়, মনোযোগ, মর্যাদা ও ক্লান্তিও সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। অধস্তন কর্মচারী হিসেবে ঊর্ধ্বতনের ভাষা তাকে শুনতে হয়, কখনো বিরক্তি প্রকাশ না করেই কাজ এগিয়ে নিতে হয়। বাইরে থেকে সংযত থাকা সম্ভব হলেও ভিতরে তার প্রতিক্রিয়া থামে না। তাই মন অপমানের ঊর্ধ্বে থাকতে পারলে ভালো হতো বলে যে ইচ্ছা, তার পেছনে আত্মরক্ষার আকাঙ্ক্ষা আছে। বাস্তবে মন ও শরীরের সীমা এত সহজে ভাগ করা যায় না। ধোঁয়ার গন্ধ, কাগজের স্তূপ, বিকেলের রোদ ও অসম্মানসূচক শব্দ একই মুহূর্তে মানুষের অভিজ্ঞতায় জমা হয়। জীবনানন্দের গল্পে অর্থনৈতিক চাপ কোনো বিমূর্ত সামাজিক সূত্র হয়ে থাকে না; শান্তিশেখরের শোনা, দেখা এবং নিজের সম্পর্কে ভাবার পদ্ধতিতে প্রবেশ করে। তার স্বপ্নের ভাষা যত দূরেই যাক, অফিসের এই বাস্তব স্পর্শ গল্প থেকে সরে যায় না।
স্বপ্নপর্বে মৃত শিক্ষক অপরেশবাবুর ফিরে আসা তাই আকস্মিক অলংকারের ব্যবহার নয়। শান্তিশেখরের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একজন মানুষ বর্তমান প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়। বাস্তব সময়ে তাদের মধ্যে বহু বছরের ব্যবধান; শিক্ষক আর বেঁচে নেই। স্বপ্নে এই তথ্য সাময়িকভাবে বাধা দেয় না। স্মৃতি সাধারণত ক্যালেন্ডারের শৃঙ্খলা মেনে ফিরে আসে না। অতীতের কোনো মুখ বর্তমানের চিন্তার সঙ্গে মিলে এত স্বাভাবিক হয়ে ওঠে যে মৃত্যুর তথ্যটিও এক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে যায়। জীবনানন্দ এই অভিজ্ঞতাকে স্বপ্নের যুক্তিতে গ্রহণ করেছেন। অপরেশবাবুর উপস্থিতি শান্তিশেখরের মনে থাকা শিক্ষার স্মৃতি, মূল্যবোধ এবং অসম্পূর্ণ আলাপের সম্ভাবনাকে জাগায়। তবে তাঁকে শান্তিশেখরের অবচেতনের নির্ভুল প্রতিরূপ বলে নির্ধারণ করাও তাড়াহুড়ো হবে। গল্পে তিনি একজন স্মরণীয় মানুষও, যাঁর ভাষা ও মূল্যবোধের কিছু স্বাতন্ত্র্য আছে। স্মৃতির ভিতর ফিরে আসা শিক্ষককে যেমন শান্তিশেখরের বর্তমান প্রয়োজন বদলে দেয়, তেমনি তাঁর পূর্বপরিচয় বর্তমানের হিসাবকে প্রশ্ন করে (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৪৬ থেকে ৪৯)।
স্বপ্নের একটি বিশেষ শক্তি হলো, তা জীবনের পৃথক সময়কে এক কথোপকথনে বসাতে পারে। ইস্কুলপড়ুয়া শান্তিশেখর ও মধ্যবয়স্ক কর্মজীবী শান্তিশেখর যেন একই সঙ্গে শিক্ষকের সামনে উপস্থিত। ফলে প্রশ্নটি শুধু পুরোনো স্মৃতি রোমন্থনের নয়। তার জীবন যে দিকে গিয়েছে, তা কিশোরবেলার সম্ভাবনার সঙ্গে মেলে কি না, সেই তুলনাও স্বপ্নে অপ্রকাশ্যে চলে। অতীতের শিক্ষক বর্তমানের অর্থকষ্ট সরাতে পারেন না; তবু তাঁর সঙ্গে কল্পিত সাক্ষাৎ শান্তিশেখরকে মূল্যবোধের অন্য একটি ভাষা দেয়। যে ভাষায় মানুষের মনোযোগ, রুচি ও প্রেমকে হিসাবের বাইরে ভাবা যায়। এই সাক্ষাতের কারণেই পরে সর্বেন ঘোষের সঙ্গে আত্মীয়তার তথ্য বিশেষ তাৎপর্য পায়। একই পরিবারের দুজন মানুষের মধ্যে জীবন দেখার এত পার্থক্য, অথচ একজন অন্যজনের প্রতিষ্ঠানগত উত্তরাধিকারী। আত্মীয়তার সূত্র মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে না। গল্পটির শ্লেষ এই অসম মিলনকে ব্যবহার করে আরও গভীর হয়।
শান্তিশেখরের নারীভাবনাও দ্বিধামুক্ত বা নিখুঁত নয়। আকাঙ্ক্ষিত নারীর চিত্র তার মনে নানা রূপে ভাগ হয়ে যায়। সময় যেন তাদের মাঝখানে মূল্যবান কিন্তু অনতিক্রম্য এক পাথর রেখেছে। আলোর প্রতিসরণ, দূরের আকাশ, সাদা সূর্য ও জলের স্বচ্ছতা সেই দূরত্ব বোঝানোর ভাষা। দেখতে পাওয়ার চেষ্টা আছে, কিন্তু কাছে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা নেই। অন্য মানুষকে নিজের অভাবের সমাধান হিসেবে ভাবার আকাঙ্ক্ষাও এতে জড়িয়ে আছে। শান্তিশেখরের প্রশ্ন, নিজের শরীর কোন সম্পর্কের মধ্যে অর্থ পাবে, প্রেমের সঙ্গে শরীরী জীবনকে যুক্ত করে। তার স্বপ্নকে শুধু নির্মল রোমান্টিকতা বলে প্রশংসা করলে এই অস্বস্তি হারিয়ে যাবে। সে নারীকে কীভাবে ভাবছে, তার কল্পনার ভিতরে নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্তের স্থান কতখানি, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। জীবনানন্দের বর্ণনা শান্তিশেখরের আকাঙ্ক্ষাকে সংবেদনশীল করেছে; আকাঙ্ক্ষাটি সব সময় নৈতিকভাবে প্রশ্নাতীত বলে প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং দূরত্বের ছবি দিয়ে তার অপূর্ণতা ও সীমা প্রকাশ করেছে (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৪৬)।
স্বপ্নে ঘরের অন্ধকার, আলমারি, ধূপের আভাস এবং অপরিচিত ধর্মীয় ধ্বনি মিলিয়ে পরিবেশ তৈরি হয়। এই উপাদানগুলি দৈনন্দিন দপ্তরের ঘরের পরিচিত বিন্যাস থেকে সরে যায়, আবার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কল্পনাও নয়। আলমারি ও টেবিলের মতো বস্তু রয়ে যায়; তাদের চারপাশের অনুভূতি বদলে যায়। অন্ধকারের সঙ্গে দূরের অঞ্চলের পবিত্রতার ধারণা জুড়ে শান্তিশেখর অতীতের শিক্ষকের পরিসরকে অন্যভাবে অনুভব করে। এই চিত্রগুলিকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় অভিজ্ঞতার দলিল ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং স্মৃতি যখন বর্তমান উদ্বেগের সঙ্গে মেশে, তখন চেনা ঘর কীভাবে অচেনা আবহ পায়, সেই পরিবর্তন লক্ষণীয়। স্বপ্নের অন্ধকার অফিসের ক্ষমতার অন্ধকারের মতো নয়। একদিকে অবকাশ ও রহস্য, অন্যদিকে অবমাননা ও চাপ; উভয় পরিসরেই আলো কম হতে পারে, কিন্তু অনুভূতির কাজ ভিন্ন। জীবনানন্দ দৃশ্যের রঙকে তাই স্থির প্রতীকতালিকায় আবদ্ধ করেননি (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৪৭)।
মালার্মের বই সরিয়ে রাখার অনুভূতির সঙ্গে আমলকীপাতা, শিশির এবং হেমন্তরাতের পাখির পালক যুক্ত হওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বই একটি বস্তু; তার সরানোর কাজটিও ক্ষুদ্র। অথচ শান্তিশেখরের স্মৃতিতে সেই কাজ নিঃশব্দ প্রাকৃতিক ঘটনার মতো হয়ে ওঠে। ফলে সাহিত্যপাঠের স্মৃতি, শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও প্রকৃতির সংবেদন একই বাক্যে মিলেছে। মালার্মের নাম এখানে আধুনিক কবিতার এক সম্ভাব্য অনুষঙ্গ, কিন্তু নামটির উপস্থিতি থেকে গল্পের সমস্ত শিল্পরীতিকে তাঁর অনুসারী ঘোষণা করা যায় না। পাঠকের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বইয়ের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মুহূর্ত কেন শান্তিশেখরের কাছে এত কোমল ও রহস্যময়। বাস্তব জীবনে কাজের লেখা শব্দসংখ্যা ও টাকার হিসাবে মূল্য পায়; স্বপ্নে বইয়ের চলাচল প্রায় শব্দহীন শ্রদ্ধার অনুভূতি তৈরি করে। একই মুদ্রিত বা লিখিত শব্দ দুটি পরিসরে দুই ধরনের মূল্য অর্জন করছে। পরে অফিসের লেখালেখি নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে এই চিত্র মিলিয়ে পড়লে গল্পের গঠন আরও স্পষ্ট হয় (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৪৭)।
তবে স্বপ্নের ভাষা সব সময় কোমল নয়। শান্তিশেখর নিজের শরীর, বয়স, প্রেম ও যৌনজীবনের সীমা নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে কথা বলে। শ্রমে শরীর ক্ষয় হয়েছে, উপার্জনের সুবিধা অন্যের হাতে গেছে, অথচ সম্পর্কের জন্য যে অবকাশ ও নিরাপত্তা দরকার, তা তার নেই। এই অনুভূতিতে হাস্যরস ও তিক্ততা মিশেছে। ঘোড়া, ষাঁড়, গাড়ি ও ঘানির উপমান তার জীবনকে অসংগত গতির ছবি দেয়। ইচ্ছা অনেক দূর যায়; শ্রমে ক্লান্ত দেহ সেই দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে না। নিজের অভাবকে সে কখনো অতিরঞ্জিত কৌতুকে প্রকাশ করে, যেন সরাসরি অভিযোগের চেয়ে তা বেশি সহনীয়। এই ভাষা আগের বিমূর্ত আলোকচিত্র থেকে আলাদা হলেও চরিত্রের বাইরে থেকে চাপানো নয়। একই মানুষ নিজের অভিজ্ঞতার ভিন্ন স্তরে ভিন্ন স্বর খুঁজে পায়। প্রেম নিয়ে উচ্চ কল্পনা এবং বাজারের অর্থনীতি নিয়ে নিচু স্বরের ক্ষোভ পাশাপাশি থাকাই শান্তিশেখরের মনস্তত্ত্বের সত্য (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৪৯)।
ঘানিতে ঘোরা শরীরের উল্লেখে কাজের পুনরাবৃত্তি ও ফলের অসম বণ্টন একসঙ্গে প্রকাশ পায়। শ্রমিকের সময় ক্ষয় হয়, মালিকের আয় বাড়ে। শান্তিশেখরের বক্তব্যকে নিছক ব্যক্তিগত হাহাকার ভাবলে এই সামাজিক উপলব্ধি চোখ এড়াবে। আবার তাকে প্রস্তুত অর্থনৈতিক তত্ত্বের মুখপাত্র বানালেও ভাষার তিক্ত আত্মরসিকতা হারিয়ে যাবে। সে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে হাসতে পারে, কিন্তু সেই হাসির মধ্যে অন্যায় বণ্টনের ক্ষোভ আছে। প্রেম ও অর্থের জটিল সম্পর্কও এখানে স্পষ্ট। দরিদ্র বা অনিশ্চিত অবস্থায় থাকার অর্থ এই নয় যে মানুষ ভালোবাসতে পারে না; কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার উপযুক্ত সময়, বাসস্থান ও স্বস্তি তার নাগালে কম আসে। শান্তিশেখর এই সীমাবদ্ধতা অনুভব করে। জীবনানন্দ তার কামনাকে অর্থনৈতিক পৃথিবী থেকে আলাদা কোনো বিশুদ্ধ বাগানে রাখেননি। স্বপ্নের শিক্ষক ও অপার্থিব আলোর পরেই শ্রমের ক্লান্ত শরীর সামনে আসে। ফলে গল্পে স্বপ্ন বাস্তবকে অস্বীকার করার জায়গা নয়, বাস্তবের ক্ষত বুঝে ওঠারও ক্ষেত্র।
অফিসপর্বে সর্বেন ঘোষের ভাষা গল্পের আবহ দ্রুত বদলে দেয়। তিনি অধস্তন শান্তিশেখরকে কাজ দেন, অন্য লেখকের প্রবন্ধ নিয়ে মন্তব্য করেন, ইংরেজি শব্দ ও অশিষ্ট কথার মিশ্রণে নিজের কর্তৃত্ব জানান। তাঁর বাক্যের গতি প্রায়ই প্রশ্নের উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না। মানুষ, লেখা ও প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছে ব্যবহারযোগ্য সম্পদের মতো। এই ভঙ্গি চরিত্রায়ণের মূল উপাদান। কেবল তিনি ব্যবসায়ী বলে তাঁর ভাষা রুক্ষ, এমন সরল ধারণা গল্পের পাঠে সাহায্য করে না। গল্পটি দেখায়, পদমর্যাদার সুবিধা নিয়ে কীভাবে কাউকে থামিয়ে, অন্যের দক্ষতাকে অবজ্ঞা করে, অর্থপ্রদানের হিসাবকে ব্যঙ্গের সঙ্গে মিশিয়ে কথা বলা যায়। ঘোষের মুখের ভাষা সেই ক্ষমতার ব্যবহার। শান্তিশেখর অনেক সময় তাঁর কথা শোনে, খুব অল্প উত্তর দেয়; এই অসাম্য সংলাপের মধ্যেই ধরা পড়ে। কথোপকথনের তুলনায় নির্দেশ বেশি, বিনিময়ের তুলনায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বেশি (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৫২ থেকে ৫৪)।
ডক্টর সেনের প্রতি ঘোষের অবমাননাকর সম্বোধন তাঁর রুচির নির্ভুল সারসংক্ষেপ নয়; একটি মুহূর্তে তিনি কীভাবে ভাষাকে অস্ত্র বানান, তার প্রমাণ। অন্যের নাম ও শিক্ষাগত পরিচয় উচ্চারণ করেই তিনি তা বিকৃত করেন। এই বিকৃতিতে বিদ্বেষ, আত্মপ্রদর্শন এবং কর্মক্ষেত্রে নিজের দাপট দেখানোর প্রবণতা আছে। শান্তিশেখর শ্রোতা হিসেবে সেই অবমাননার পরিবেশে উপস্থিত। অধস্তন কর্মীর পক্ষে সব কথা নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি তোলা সহজ নয়। গল্পের শ্লেষ এখানেই তীক্ষ্ণ: ঘোষ অন্যের মর্যাদা নিয়ে খেলেন, অথচ নিজের কথার অসংগত অমার্জিততা অনুভব করেন কি না সন্দেহ থাকে। জীবনানন্দ সেই অসংগতিকে দীর্ঘ নৈতিক ভাষণে প্রকাশ করেননি। বাক্যের ভঙ্গি, সম্বোধনের পরিবর্তন ও শ্রোতার নীরবতা থেকে পাঠক বিচার গড়ে নেন। এতে গল্পের ভাষা চরিত্রের সামাজিক আচরণের প্রত্যক্ষ উপাদান হয়। অশিষ্ট শব্দ শুধু বাস্তবতার সাজসজ্জা নয়; ক্ষমতার সম্পর্কেরও চিহ্ন।
প্রবন্ধের বিষয় নিয়ে ঘোষের ঠাট্টায় আরও একটি বিরোধ বেরিয়ে আসে। নদী ও অঞ্চল নিয়ে সুদূর তুলনার বৌদ্ধিক সম্ভাবনা তিনি কাজের আদেশের মধ্যে সংকুচিত করেন। তাঁর প্রয়োজন লেখাটি পাওয়া, তার আলোচনা কী গভীর প্রশ্ন তুলতে পারে তা বোঝা নয়। শব্দের সংখ্যা ও পারিশ্রমিক হিসাব করার সময়ও তিনি লেখকের শ্রমকে কখনো হাস্যকর কারসাজি বলে দেখান। অথচ সেই লেখাই তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য দরকার। প্রয়োজন ও অবজ্ঞার এই যুগপৎ অবস্থান একটি তীক্ষ্ণ শ্লেষ তৈরি করে। যদি কাজটির মূল্য সত্যিই না থাকে, তবে এত তাগিদ কেন? আর মূল্য থাকলে তার স্রষ্টাকে এভাবে ছোট করার অধিকার কোথায়? জীবনানন্দ প্রশ্নগুলি সরাসরি তোলেন না; অফিসের কথোপকথনে রেখে দেন। শান্তিশেখর সেই বিরোধ শুনে নিজের অবস্থানও চিনতে পারে। সে পাণ্ডিত্য, প্রুফ দেখা বা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু তার কাজের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা নিজের হাতে নেই (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৫৩ থেকে ৫৪)।
অফিসঘরের স্কাইলাইট দিয়ে বিকেলের রোদ প্রবেশের দৃশ্যটি কথোপকথনের ভিতরে আকস্মিক স্থিরতা আনে। সূর্যের আলো টেবিলে পড়ে, ধূলিকণায় ক্ষুদ্র বস্তু ভেসে থাকে। দৃশ্যটি একদিকে নিখুঁত পর্যবেক্ষণ, অন্যদিকে শান্তিশেখরের অনুভবে তীক্ষ্ণতার আভাস। ঘোষ যখন মানুষ ও লেখার দাম নিয়ে রুক্ষ ভাষায় কথা বলছেন, একই সময়ে আলো নিজের গতিতে ঘরটিকে অন্যভাবে দেখাচ্ছে। এই দুটি স্তর পরস্পরকে সরিয়ে দেয় না। বরং ঘোষের উত্তেজিত কথার পাশে দৃশ্যের স্থিরতা তাঁর স্বরকে আরও প্রকট করে। আলোকে একটিমাত্র আক্রমণের প্রতীক মানলে তার সূক্ষ্ম বাস্তবতা কমে যাবে। বর্শার স্মৃতিজাগানিয়া তীক্ষ্ণতা যেমন আছে, তেমনি রোদের মধ্যে ধুলোর দৃশ্যমান হওয়ার সাধারণ ঘটনা আছে। জীবনানন্দ এই দ্বৈততা অক্ষুণ্ণ রাখেন। চরিত্রের কথা চলার মাঝখানে পরিবেশের দিকে তাকানো শান্তিশেখরের নিজস্ব মানসিক দূরত্বও প্রকাশ করে। সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে সে দেখার মধ্য দিয়ে নিজেকে সামলায় (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৫৩ থেকে ৫৪)।
ঘোষের মুখে ইংরেজি ব্যবসায়িক পরিভাষা এবং লোকমুখের রূঢ় তুলনা পাশাপাশি আসে। এই মিশ্রণকে কেবল ভাষার বিকার বললে কথার সামাজিক কার্যকারিতা বোঝা যাবে না। উপনিবেশিক বাণিজ্যের দপ্তরে ইংরেজি শব্দ কাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা; তাতে তাঁর কর্তৃত্বের ছাপ আছে। অন্যদিকে লোকায়ত তিরস্কার কথাকে তৎক্ষণাৎ দেহী ও আক্রমণাত্মক করে। ঘোষ দুই ভাণ্ডার থেকেই যা সুবিধাজনক তা বেছে নেন। ফলে তাঁর কথায় শিক্ষিত ব্যবসায়িক পরিসর এবং বাজারের কর্কশ দরকষাকষি একই সঙ্গে শোনা যায়। শান্তিশেখরের ভাবনার বাক্য তুলনায় বেশি দ্বিধাগ্রস্ত ও আত্মপ্রশ্নমুখর। একই শহরে বসবাস করলেও ভাষার এই পার্থক্য জীবনদৃষ্টির পার্থক্য নির্দেশ করে। তবে কাব্যিক ভাষা মানেই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব, আর লোকায়ত ভাষা মানেই নৈতিক হীনতা, এমন সিদ্ধান্ত গল্পের পক্ষে অতিসরল। ঘোষের অমার্জিত শব্দ সমস্যার এক অংশ; বেশি গভীর সমস্যা অন্যের শ্রম ও মর্যাদার প্রতি তাঁর ব্যবহার। শব্দ সেই ব্যবহারের প্রকাশমাত্র।
আমেরিকান ও ইংরেজ মালিকানার পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির স্থায়িত্ব সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দেখা যায়। ব্যক্তিমালিক বদলালেও অধস্তন কর্মীর অবস্থান নিজের হাতে আসে না। ঘোষ এ পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য করতে পারেন, বিদেশি ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরকে নিজের অভিজ্ঞতায় তুলনা করতে পারেন; কিন্তু তাঁর কথাতেও এক ধরনের নির্ভরতার চিহ্ন থাকে। শান্তিশেখরের উপর কর্তৃত্ব দেখানো মানুষটিও বৃহত্তর ব্যবস্থার সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন না। এই স্তরিত ক্ষমতার কাঠামো গল্পের শহরচিত্রকে গভীর করে। সর্বেনকে একমাত্র দুষ্ট ব্যক্তি এবং শান্তিশেখরকে একমাত্র ভুক্তভোগী বানানোর চেয়ে দেখা জরুরি, কে কোন স্তরে ক্ষমতা ভোগ করছে এবং কোথায় আবার নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠান, উপনিবেশিক পুঁজি, মুদ্রিত লেখা, পারিশ্রমিক ও কর্মীর সম্পর্ক এই দপ্তরের ছোট দৃশ্যে এসে মিলেছে। গল্পের সামাজিক দৃষ্টি এখানেই স্পষ্ট। ব্যঙ্গ কোনো ব্যক্তির দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি নয়; ব্যবস্থার ভিতর ব্যক্তির ভাষা কীভাবে বদলে যায়, তারও অনুসন্ধান।
সুস্মিতার আগমনে অফিসের আবহ বদলায়, কিন্তু শ্রেণি ও ক্ষমতার প্রশ্ন মিলিয়ে যায় না। লবঙ্গের গন্ধ আগে আসে; শান্তিশেখর মুখ না তুলেও তার উপস্থিতি টের পায়। তারপর হাসি, ভঙ্গি ও কথাবার্তায় দৃশ্য বিস্তৃত হয়। গন্ধের মাধ্যমে প্রবেশের এই কৌশল সুস্মিতাকে শান্তিশেখরের অনুভবের অংশ করে তোলে। অথচ অনুভবের মানে সহজ আকর্ষণ নয়। তার মনে বিরক্তি, কৌতূহল, সাময়িক আনন্দ ও পরিহাস একসঙ্গে কাজ করে। সে প্রুফ দেখার কাজে মাথা রাখে; অর্থাৎ আলাপের ভিতরেও কাজের সময় চলমান। সুস্মিতাকে বেড়ালের সঙ্গে তুলনা তার অবলোকনের একটি ক্ষণিক ভঙ্গি। এটিকে সুস্মিতার প্রকৃত স্বভাবের নির্ভুল বিবরণ ভাবলে কথকের দৃষ্টির পক্ষপাত উপেক্ষিত হয়। সুস্মিতা নিজেও দৃশ্যের সক্রিয় বক্তা, শুধু শান্তিশেখরের উপমার বস্তু নন। এই দ্বিপাক্ষিক অবস্থান মনে রাখলে তাদের আলাপের শ্লেষ আরও স্পষ্ট হয় (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৫৫ থেকে ৫৬)।
লবঙ্গের গন্ধ থেকে দূরের দ্বীপের স্মৃতি জাগে; সেই রোমাঞ্চকর ইঙ্গিতের পাশে সুস্মিতার হাসি নিয়ে শান্তিশেখরের রুক্ষ তুলনা। মুহূর্তটির কৌতুক এই অসম মিলনে। বাস্তব মানুষ সামনে এলে কল্পনার সৌন্দর্য বজায় রাখা সব সময় সহজ হয় না। শান্তিশেখরের কাব্যিক মন তাই কখনো অন্যের উপস্থিতিকে অবজ্ঞার পর্দায় ঢাকে। এটি তার চরিত্রের দুর্বলতাও প্রকাশ করে। সর্বেন ঘোষের তাচ্ছিল্য সে অপছন্দ করে বলে তার নিজের তাচ্ছিল্য আর সমালোচনার বাইরে থাকে না। সুস্মিতা সম্পর্কে তার বক্তব্য পড়তে গেলে এই দ্বৈত মানদণ্ড বিবেচনা করা দরকার। গল্পটি শান্তিশেখরের দৃষ্টিকোণকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু সুস্মিতার প্রতি তার প্রতিটি বিচারকে নিরপেক্ষ সত্য বানায় না। ফলে পাঠক একই সঙ্গে তার অস্বস্তি বুঝতে এবং তার বিদ্রূপের সীমা দেখতে পারেন। সংবেদনশীল চরিত্রও অন্যকে বুঝতে ভুল করতে পারে; জীবনানন্দের ছোটগল্প এই মানবিক অসংগতিকে আশ্রয় দিয়েছে।
সুস্মিতার কথায় মোটর, বিনোদন ও মানুষের মিলনের প্রশ্ন উঠলে সংলাপের ভিতর আকাঙ্ক্ষার অন্য বিন্যাস দেখা যায়। সে শান্তিশেখরের কাছে পরিচিত সামাজিক হিসাবের বাইরে আলাপের সম্ভাবনা রাখে কি না, উত্তর নিশ্চিত নয়। তার নিজের ভাষায় হাসি ও আড়াল আছে। শান্তিশেখরও জবাবে আন্তরিকতা ও কৌতুকের মাঝামাঝি থাকে। একজন প্রশ্ন করে, অন্যজন উত্তর দেয়; কিন্তু প্রশ্নের গূঢ় উদ্দেশ্য ও উত্তরের আসল তাৎপর্য পুরোপুরি মেলে না। কথোপকথনের এমন চলনকে ব্যর্থ যোগাযোগ বলেই শেষ করা যায় না। পরস্পরকে মাপার একটি খেলা চলছে, যেখানে সরাসরি চাওয়া প্রকাশ করা ঝুঁকিপূর্ণ। শ্রেণি, সম্পর্ক ও পরিচিতির ভঙ্গি তাদের কথাকে নিয়ন্ত্রণ করে। শান্তিশেখর প্রুফ দেখতে থাকে বলে আলাপের অসম সময়ও স্পষ্ট হয়। কাজ থামিয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কথায় চলে যাওয়ার স্বাধীনতা তার নেই। সুস্মিতা যে অবকাশ নিয়ে কথা বলে, শান্তিশেখরের কাছে সেই অবকাশ সীমিত।
মনি অর্ডারের ফর্ম ঘিরে তাদের কথার খেলা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা, দক্ষতা ও দাম্পত্যে কার কাছে কী কাজের জন্য যেতে হয়, এই প্রশ্ন পরিহাসের ভিতর উঠে আসে। সামাজিক পরিচয়ের বাহ্যিক মর্যাদা এবং বাস্তব পারদর্শিতার ফাঁক নিয়ে শান্তিশেখর মজা করে। আবার সুস্মিতার উপস্থিতিকে সে একেবারে উপেক্ষাও করে না; হাসি দিয়ে পরিস্থিতির উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। সর্বেনের সামনে তার সংযমের সঙ্গে এ দৃশ্যের দ্রুত প্রত্যুত্তর তুলনা করলে কথার পরিবেশে ক্ষমতার ফারাক বোঝা যায়। যেখানে চাকরি ঝুঁকিতে, সেখানে নীরবতা; যেখানে ব্যক্তিগত আলাপের পরিসর, সেখানে বিদ্রূপ। অবশ্য সুস্মিতার সঙ্গে সে সমান ক্ষমতার অবস্থানে আছে এমন ভাবাও ভুল। সর্বেনের সঙ্গে সুস্মিতার ঘনিষ্ঠতা ও অফিসে তাঁর অবাধ যাতায়াত পরিস্থিতিকে জটিল করে। শান্তিশেখরের রসিকতা তাই স্বচ্ছন্দ বন্ধুত্বের যেমন লক্ষণ হতে পারে, তেমনি নিজের অস্বস্তি আড়াল করার উপায়ও (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৫৬)।
সুস্মিতাকে কেবল লোভী বা অগভীর চরিত্র বলে চিহ্নিত করলে গল্পের আলাপের প্রাণ কমে যায়। সে অন্যকে উত্তেজিত করতে পারে, নিজের সুখের কথা মজা করে বলে, আবার তার প্রশ্নে নিজস্ব অসন্তোষের আভাসও থাকতে পারে। কথকের ব্যবহৃত রসিক চিত্র এবং শান্তিশেখরের বিরক্ত দৃষ্টি মিলিয়ে যে প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছে, তার বাইরে সুস্মিতার অবস্থান সম্পর্কে গল্প সীমিত তথ্য দেয়। তাই বিচার করতে সংযম দরকার। সর্বেনের কাছাকাছি থাকায় তাঁর মতাদর্শ পুরোপুরি সুস্মিতারও, এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া নেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তাঁর কথার অনাবশ্যক অভিনয়, অবকাশপ্রিয়তা ও অন্যের কাজের সময়ে অনুপ্রবেশও উপেক্ষা করা যায় না। জীবনানন্দ চরিত্রকে এই অসম্পূর্ণ জ্ঞানের মধ্যেই দেখতে দেন। সুস্মিতার কণ্ঠস্বর যতটা শোনা যায়, শান্তিশেখরের ধারণা তার উপর ততটাই পর্দা ফেলে। কথনপদ্ধতির এই স্তরগুলি আলাদা করে পড়লে গল্পের বহুস্বরতার দাবি প্রমাণসহ করা যায়।
শান্তিশেখরের মৃত্যু জানা যাওয়ার পরে সর্বেন ও সুস্মিতার কথোপকথন নতুন আলোয় ধরা দেয়। যে মানুষকে নিয়ে আগে হাসাহাসি বা মূল্যায়ন চলছিল, সে আর উপস্থিত নেই। অনুপস্থিত ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে কীভাবে কথা বলা হচ্ছে, তা জীবিত বক্তাদেরও প্রকাশ করে। ঘোষের শরীরী কৌতুক, চেয়ারের নড়াচড়া, সুস্মিতার দীর্ঘ হাসি ও চোখে জল আসার বিবরণ পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। হাসির নিজস্ব জীবন আছে; মানুষ কখনো অনুচিত সময়েও হাসে। কিন্তু এই হাসি যদি শান্তিশেখরের জীবন ও মৃত্যুর প্রতি সংবেদনশীলতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে গল্পের শ্লেষ তীব্র হয়। জীবনানন্দ হাসিটিকে কেবল আনন্দের চিহ্ন করেননি। উচ্চারণ, দেহের নড়াচড়া ও থামতে না পারার পুনরাবৃত্তিতে তার অতিরিক্ততা দেখিয়েছেন। পাঠক অনুভব করেন, হাসির পরিমাণ এবং আলোচনার বিষয়ের মধ্যে এক গভীর অমিল আছে (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৬০ থেকে ৬১)।
চোখে জল এলেও সব জল শোকের প্রকাশ নয়। সুস্মিতার হাসির জল এই সাধারণ সত্যকে দৃশ্যমান করে। জীবিত মানুষের জন্য যারা অশ্রুপাত করছে বলে দূর থেকে মনে হতে পারে, তারা অন্য প্রসঙ্গে মত্তও থাকতে পারে। তবে এই পর্যবেক্ষণ থেকে সুস্মিতার সমগ্র ব্যক্তিত্বের চূড়ান্ত নৈতিক রায় দেওয়ার দরকার নেই। গল্পের শক্তি মুহূর্তটির অসংগতিতে। শান্তিশেখরের অনুপস্থিতি কথোপকথনের বিষয়, অথচ বক্তাদের দেহী আনন্দ দৃশ্যের কেন্দ্র দখল করে। নামের মধ্যে থাকা বিলাসের প্রশ্ন ফিরে আসে: কার জীবনকে অনর্থক বিলাস বলা হচ্ছিল, আর কার হাতে সময় ও অবকাশ এত সহজে ব্যয় হচ্ছে? এই প্রত্যাবর্তনে শিরোনামটি আগের চেয়ে তীক্ষ্ণ অর্থ পায়। গল্প কোনো নীতিবাক্য না বলেও পাঠককে বক্তাদের নির্ধারিত মূল্যবোধের সঙ্গে দৃশ্যমান আচরণ মিলিয়ে দেখতে বলে। শ্লেষ এখানে ভাষার একটি অলংকারের চেয়ে বেশি; গল্পের নির্মাণনীতি।
অপরেশবাবুর কথায় শান্তিশেখরের পাখি খোঁজার ছবি গল্পের শিরোনাম বোঝার আরেকটি দরজা। রাজহংসীর দূরবিস্তৃত মর্যাদা এবং কাদায় খাবার খোঁজা পাখির ছোট বাস্তবতা একই বক্তব্যে আসে। এই চিত্রকে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার স্থির শ্রেণিবিভাগে নামিয়ে আনা ঠিক নয়। অপরেশবাবু শান্তিশেখরের অসম্ভব প্রত্যাশা নিয়ে স্নেহমিশ্রিত পরিহাসও করতে পারেন। মন উঁচুতে উড়তে চায়, অথচ দৈনন্দিন জীবনের কাদা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়ার উপায় নেই। পাখিরা চোখ ফেরাতেই হারিয়ে যায় বলে যে অনুভব, তা অপ্রাপ্তির পাশাপাশি নিজস্ব কল্পনার অস্থায়িত্বও জানায়। রাজহংসী সত্যিই কোথাও অপেক্ষা করছে কি না, গল্প তার নিশ্চয়তা দেয় না। এই অনিশ্চয়তা শান্তিশেখরের অনুসন্ধানকে আরও মানবিক করে। আদর্শের আকাঙ্ক্ষা আছে, তার সীমা সম্পর্কে সামান্য আত্মবিদ্রূপও আছে। অপরেশবাবুর বক্তব্যকে তাই কেবল তাঁর পক্ষে রায় বা শিষ্যের প্রশংসা হিসেবে পড়া যথেষ্ট নয় (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৫৯)।
পরে সর্বেন ঘোষ যখন জ্যাঠামশায়ের বিলাস ধারণা ব্যাখ্যা করে, তখন একই শব্দের অর্থ বদলে যায়। তাঁর মনে হয়, বিষয়সম্পত্তির মোহ ছেড়ে দুর্বোধ্য বা অকাজের কিছুর দিকে মন দেওয়াকেই শিক্ষক বিলাস বলতেন। বক্তব্যে অবজ্ঞা আছে, কিন্তু তার ভিতর দিয়েই শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির একটি ইঙ্গিত বেরিয়ে আসে। যে অভিজ্ঞতা সর্বেনের কাছে অকাজের, অপরেশবাবুর কাছে সেটি মানুষ হয়ে ওঠার একটি দিক। এক পরিবারের দুটি প্রজন্মের মধ্যেও এই ব্যবধান। সর্বেন নিজের সাজ, কাজ ও উপার্জন নিয়ে তৎপর হলেও অপরেশবাবু তাঁর মনে কল্পনার অবকাশ দেখতেন না। আবার শান্তিশেখরের অস্থির মনকে তিনি বিলাসী বলার মধ্যে অন্য অর্থ রাখতেন। শব্দটি কার মুখে উচ্চারিত হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে সুর পাল্টায়। পাঠককে একাধিক উচ্চারণ স্মরণে রেখে শিরোনাম পড়তে হয়। এই বহুমাত্রিকতা না বুঝে বিলাসকে কেবল অর্থশালী জীবনের সমার্থক করলে গল্পের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিদ্রূপটি হারায় (জীবনানন্দ দাশ, ‘বিলাস’, সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের গল্প, পৃ. ৫৯ থেকে ৬০)।
শব্দটির আরও একটি দিক আছে। ন্যূনতম জীবিকা অনিশ্চিত হলে চিন্তার অবকাশকেও কেউ বিলাস বলে তাচ্ছিল্য করতে পারে। সর্বেনের ভাষা সেই সামাজিক মানদণ্ড বহন করে। কিন্তু যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে লেখার শব্দগণনা চলছে, সেখানে চিন্তার কাজও বাজারের সম্পদ। তাই একই ব্যক্তি অন্যের সৃষ্টিশীল শ্রম থেকে সুবিধা নিয়ে চিন্তার স্বাধীনতাকে অকাজ বলতে পারেন। এই অসংগতি কেবল ব্যক্তিগত রুচির পার্থক্য নয়; উৎপাদন ও মুনাফার সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। শান্তিশেখর যাকে জীবনযাপনের প্রয়োজন মনে করে, প্রতিষ্ঠান তাকে ততক্ষণই স্বীকার করে যতক্ষণ তার ব্যবহারযোগ্য ফল আছে। এই শর্তে প্রেম, শিল্প, স্মৃতি ও অবকাশ প্রশ্নবিদ্ধ। গল্পের শিরোনাম তাই অর্থনৈতিক হিসাব এবং মানসিক স্বাধীনতার সীমানায় দাঁড়িয়ে। বিলাস কার অধিকার, তার মূল্য কে নির্ধারণ করবে, আর কে সেটিকে তুচ্ছ বলার ক্ষমতা রাখে, এসব প্রশ্ন একটিমাত্র শব্দের ভিতরে জমা হয়। জীবনানন্দের সংযত নামকরণ গল্প শেষ হওয়ার পরেও পাঠককে আলোচনায় ফিরিয়ে আনে।
দৃষ্টিকোণের ব্যবহারে ‘বিলাস’কে একক চরিত্রের স্বগতোক্তি ভাবা যায় না। শান্তিশেখরের ভাবনার সঙ্গে পাঠকের নিবিড় পরিচয় হয়, কিন্তু তার বাইরেও অপরেশবাবুর মন্তব্য, সর্বেনের কাজের ভাষা এবং সুস্মিতার আলাপ নিজের নিজস্ব সুরে আছে। সর্বজ্ঞ কথকের বিবরণ কোথাও দৃশ্য সাজায়, কোথাও চরিত্রের কাছে সরে যায়। এই পরিবর্তন লক্ষ না করলে কার মূল্যায়ন কার, তা গুলিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সুস্মিতাকে নিয়ে শান্তিশেখরের মনে তৈরি তুলনাকে লেখকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মনে করা যথার্থ নয়। একইভাবে সর্বেনের ব্যাখ্যায় অপরেশবাবুর ধারণা পৌঁছেছে বলে সেটিই শিক্ষকের বক্তব্যের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। গল্পের শ্লেষ একাধিক মধ্যস্থতার উপর দাঁড়ায়। পাঠক সরাসরি সত্যের ঘোষণাপত্র পান না; বিভিন্ন মানুষের উচ্চারণ, স্মৃতি ও কাজ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত বিবেচনা করেন। এভাবেই চরিত্রের স্বরগুলি সংঘর্ষে আসে, কোনো একটি স্বর সব সময় অন্যদের উপর স্থায়ী আধিপত্য পায় না।
এই সতর্কতা জীবনানন্দের সমস্ত ছোটগল্পকে কয়েকটি কঠোর পর্বে ভাগ করার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সময়ের সঙ্গে তাঁর লেখায় নগর, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও ইতিহাসের উপস্থিতি বাড়তে পারে; তবু প্রথম দিকের লেখায় সমাজ একেবারে অনুপস্থিত ছিল বা পরের লেখায় নিসর্গ আর নেই, এমন সিদ্ধান্ত সরলীকরণ। ‘বিলাস’ গল্পেই তা দেখা যায়। দপ্তর ও বাজারের কঠিন উপস্থিতির মধ্যে শিশির, পাখির পালক, রোদ ও দূরের আকাশ ফিরে আসে। অন্যদিকে স্বপ্নপর্বে অর্থ এবং শরীরের ক্ষয়ের অভিযোগ অনুপস্থিত নয়। গল্পের বিষয়গুলি আলাদা যুগের সিলমোহর মেনে চলে না। রচনাকাল পাঠে সহায়তা করে, কিন্তু প্রতিটি শৈলীর একমাত্র কারণ হিসেবে রচনাকাল যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট গল্পে কোন দৃশ্য কী কাজ করছে তা আগে দেখা প্রয়োজন। তারপরই বৃহত্তর রচনাপ্রবণতা নিয়ে কথা বলা সঙ্গত। এভাবে পড়লে জীবনানন্দের শৈল্পিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছিন্ন আগ্রহগুলিও বোঝা যায়।
প্রচলিত কাহিনির মাপে গল্পটিকে বিচার করলেও কিছু বিভ্রান্তি হয়। এখানে ঘটনা নেই বলা ভুল: চাকরি, সাক্ষাৎ, স্বপ্ন, কাজের আদেশ, আলাপ এবং মৃত্যুর পর অন্যদের প্রতিক্রিয়া সবই ঘটনা। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার গুরুত্ব তার নাটকীয় বিস্ময়ে নয়। শান্তিশেখরের সঙ্গে ঘটনাটি ঘটার ফলে জীবনের অর্থ নিয়ে যে নতুন প্রশ্ন ওঠে, গুরুত্ব সেখানে। স্বপ্নের শিক্ষক বাস্তব ইতিহাস পাল্টান না, অফিসের দরকষাকষি কোনো গোয়েন্দা রহস্য খোলে না, সুস্মিতার আলাপ দাম্পত্যের নিশ্চিত সমাধান দেয় না। ঘটনাগুলি পরস্পরের অর্থ বদলে দেয়। শিক্ষক যে শব্দে মনকে মূল্য দিয়েছিলেন, সেই শব্দ সর্বেনের মুখে বিদ্রূপ হয়; যিনি শান্তিশেখরকে বিচার করছিলেন, তাঁর হাসিই শেষে বিচারের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই সম্পর্কের বিন্যাসই কাহিনির সংহতি। প্রচলিত চূড়ান্ত মোচড় না থাকলেও গল্পের শেষ পাঠককে শুরুর শিরোনাম নতুন করে পড়ায়।
কথোপকথনের নির্মাণে নীরবতা এবং অতিরিক্ত কথা সমান গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিশেখর কোথাও নিজের সম্পর্কে দীর্ঘ ভাবনায় ডুবে যায়, অথচ ঊর্ধ্বতনের সামনে অল্প কথা বলে। ঘোষ অবিরাম মন্তব্য করে অন্যদের কাজের মূল্য স্থির করতে চায়। সুস্মিতা রসিকতার মাধ্যমে সম্পর্কের দূরত্ব মাপে; অপরেশবাবুর স্বপ্নসাক্ষাৎ কম কথাতেও পুরোনো সম্পর্কের গভীরতা আনে। সবার বাক্যের দৈর্ঘ্য, শব্দভাণ্ডার ও বিরতি এক নয়। বহুস্বরতার বাস্তব প্রমাণ এই পার্থক্যগুলিতে। কোনো একজনের কথা অন্যজন নির্ভুলভাবে গ্রহণ করে না। সর্বেন শিক্ষকের বিলাস ধারণাকে নিজের সুবিধামতো অনুবাদ করে; শান্তিশেখর সুস্মিতার হাসিকে নিজের বিরক্তির মধ্যে বোঝে; পাঠক তাদের উভয়ের ব্যাখ্যাকে পরীক্ষা করেন। সংলাপ তাই পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের সাজানো বাহন নয়। একই শব্দ আলাদা মুখে এসে যে বদল ঘটায়, সেখানেই চরিত্র ও পরিস্থিতি জীবন্ত হয়।
গল্পের ভাষায় গীতিময় বাক্য এবং তীক্ষ্ণ কথ্য উচ্চারণের সহাবস্থান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। স্বপ্নের অন্ধকারে বই সরানোর নীরবতা অথবা প্রেমের দূরত্ব বোঝাতে বাক্য দীর্ঘ ও তরল হয়। অফিসে সংক্ষিপ্ত আদেশ, কটুকথা এবং ইংরেজি মিশ্রিত ব্যবহার তার বিপরীতে অন্য ছন্দ আনে। এই পার্থক্যকে দুটো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাষাজগৎ ভাবলে চলবে না। শান্তিশেখর নিজেও তিক্ত পরিহাস করতে পারে, আর ঘোষের কথার মাঝখানেই বিকেলের আলো এসে পড়ে। অর্থাৎ ভাষার পরিসরগুলি পরস্পরের সংস্পর্শে আছে। জীবনানন্দ চরিত্রভেদে রীতি বদলালেও সমগ্র গল্পের অনুভূতিকে বিচ্ছিন্ন টুকরো হতে দেননি। তাঁর বাক্য কখনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা অনুসরণ করে, কখনো সামাজিক আক্রমণের গতি ধরে। উভয় ক্ষেত্রেই পাঠককে শুধু বক্তব্য শুনলে হয় না; বক্তার অবস্থান ও বলার ভঙ্গিও বুঝতে হয়। এই দাবি গল্পের গদ্যকে বিশেষভাবে সক্রিয় করেছে।
পরিহাসের ব্যবহারেও পার্থক্য আছে। অপরেশবাবু শান্তিশেখরকে নিয়ে হাসলে তার মধ্যে স্নেহ ও সংশয়ের মিশ্রণ থাকে। শান্তিশেখর সুস্মিতাকে নিয়ে কৌতুক করলে তাতে নিজের অস্বস্তি ঢাকার চেষ্টা দেখা যায়। সর্বেন অন্য লেখকদের নিয়ে হাসলে ক্ষমতার আসন থেকে অবমাননার ঝোঁক প্রবল হয়। সর্বেন ও সুস্মিতার পরের হাসি শান্তিশেখরের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে আরও তীক্ষ্ণ লাগে। এই সব হাসিকে এক ধরনের তামাশা বলে ফেললে গল্পের নৈতিক সূক্ষ্মতা নষ্ট হবে। কে হাসছে, কাকে নিয়ে হাসছে, যার উপর হাসি পড়ছে সে উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কি না, সবই বিচার্য। শ্লেষের অবস্থানও সেই সঙ্গে বদলায়। গল্প কখনো চরিত্রের মুখে সরাসরি শ্লেষ দেয়, কখনো একটি দৃশ্যকে অন্য দৃশ্যের পাশে রেখে পাঠকের মনে শ্লেষ সৃষ্টি করে। ‘বিলাস’ নামটি এই দ্বিতীয় পদ্ধতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
সর্বেন ঘোষের অর্থলগ্ন জীবন সম্পর্কে গল্পের সমালোচনাকে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিন্দা ভাবা যাবে না। শান্তিশেখর নিজেই সচ্ছলতা চায়; ঘর, খাদ্য ও স্বাধীন সময়ের অভাব অনুভব করে। সমস্যা অর্থ উপার্জনের ইচ্ছায় নয়, অর্থের হিসাবকে মানুষের সব অভিজ্ঞতার একমাত্র মাপদণ্ড বানানোতে। কর্মীর কাজ দরকার, অথচ তার আত্মসম্মান তুচ্ছ; লেখকের প্রবন্ধ দরকার, অথচ তার মনোযোগ অবজ্ঞার বস্তু; সম্পর্কের কথা বলা হয়, অথচ অন্যের বাস্তব অবস্থায় আগ্রহ সীমিত। এই অসংগতিগুলি নিয়ে গল্পের প্রশ্ন। শান্তিশেখরের কাঙ্ক্ষিত জীবনও ভৌত শর্ত ছাড়া সম্ভব নয়। সে বিষয়সম্পত্তি ছেড়ে অবাধ স্বপ্নে সুখী হবে বলে কোনো সহজ উপসংহার গল্প দেয় না। বরং অর্থনৈতিক ন্যায্যতা ও সংবেদনশীল স্বাধীনতা একই জীবনের প্রয়োজন বলে বোঝায়। বিলাসের শ্লেষ তখন আরও জটিল: যে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনের অবকাশ চায়, তাকে বিলাসী বলা হচ্ছে।
যুদ্ধোত্তর নগরের ছবি নির্মাণেও গল্প কোনো সম্পূর্ণ শহরজরিপ করে না। কিছু নির্বাচিত দৃশ্য, মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বৃহত্তর পরিস্থিতির আভাস দেয়। কর্মক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নাম আসে; বাইরে দুর্ভিক্ষ ও হিংসার স্মৃতি; ব্যক্তিগত ঘরে অনিশ্চিত বাসস্থানের প্রশ্ন। এভাবে শহরের একাধিক স্তর শান্তিশেখরের অভিজ্ঞতায় প্রবেশ করে। প্রতিটি স্তরের পূর্ণ ইতিহাস গল্পে নেই। ছোটগল্পের সংকীর্ণ পরিসরে তার দরকারও নেই, যদি নির্বাচিত মুহূর্তগুলি পারস্পরিক সম্পর্ক জাগাতে পারে। ‘বিলাস’ গল্পে পাঠক বুঝতে পারেন, অর্থের চাপ কেবল অফিসের ভিতরে সীমাবদ্ধ নয়; প্রেম ও স্মৃতির ভাষাতেও তার প্রতিক্রিয়া আছে। একইভাবে কল্পনা শুধু কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মনোবাসনা নয়; কাজের মর্যাদা নিয়ে নতুন করে ভাবার উৎস। শহর এখানে একদিকে নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশ, অন্যদিকে এই ভিন্ন মূল্যবোধের সংঘাতের পরিসর।
শান্তিশেখরের মৃত্যুকে গল্পের সমস্ত দ্বন্দ্বের সমাধান বলে দেখা যায় না। একজন মানুষ সরে গেলে তার সম্পর্কে অন্যদের বক্তব্য শুরু হয়, এবং সেই বক্তব্যেই আগের সম্পর্কের নতুন অর্থ তৈরি হয়। মৃত্যুর পরে সে নিজের ব্যাখ্যা পেশ করতে পারে না। ফলে পাঠকের কাছে তার ভাবনা ও পরের হাসির ফারাক আরও দগদগে হয়। তবে তার জীবনকে নিখুঁত শহিদের জীবন বলে প্রতিষ্ঠা করলে স্বপ্নের কামনা, বিদ্রূপের সীমা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা আড়াল হবে। জীবনানন্দ তাকে ভাবনার অধিকার দিয়েছেন, নিষ্কলুষতার সনদ দেননি। তার অনুপস্থিতি অন্য চরিত্রদের মুখোশ খুলে দিতে পারে; একই সঙ্গে তার নিজের জীবনের অসমাপ্ততাও মনে করায়। ভালোবাসা, স্বাধীনতা, ন্যায্য সম্মান এবং নিজের মতো সময় কাটানোর যে ইচ্ছা ছিল, সেগুলোর পূর্ণ মীমাংসা ঘটে না। গল্পটি এই অমীমাংসাকে পাঠকের কাছে রেখে যায়।
জীবনানন্দের গল্পের পরিণাম সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতেও এই উদাহরণ সহায়ক। চূড়ান্ত সমাধান না থাকলেই একটি গল্প অনিয়ন্ত্রিত বা অসম্পূর্ণ হয়ে যায় না। কোথায় গল্প থামছে, থামার পরে কোন দৃশ্য মনে ফেরত আসে, কোন প্রশ্ন আগের শব্দের অর্থ বদলে দেয়, সেসব দিয়ে তার নির্মাণ বিচার করতে হয়। ‘বিলাস’ শেষ পর্যন্ত পাঠককে শিরোনাম, অপরেশবাবুর মন্তব্য, শান্তিশেখরের শ্রম এবং সর্বেনের হাসির মধ্যে যাতায়াত করায়। এই পুনর্পাঠই তার সমাপ্তির শক্তি। ঘটনার স্থায়ী সমাধানের চেয়ে বোধের নতুন বিন্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবার কেবল মনস্তাত্ত্বিক আবেশ দিয়ে ঘটনা প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলাও ঠিক নয়। মৃত্যুর ঘটনা এবং মৃত্যুর পরে বলা কথা আছে বলেই বোধের পুনর্বিন্যাস ঘটে। জীবনানন্দ ঘটনার গুরুত্ব অস্বীকার করেন না; ঘটনাকে একটি নির্দিষ্ট আঘাত হিসেবে ব্যবহার করে তার বহুদূর ছড়ানো প্রতিধ্বনি অনুসরণ করেন।
লেখকের ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করার সময় আরেকটি পার্থক্য জরুরি। রচনায় তাঁর পরিচিত রঙ, নিসর্গ এবং ভাবনার ধরন থাকলেও কোনো চরিত্রের বক্তব্যই সরাসরি লেখকের পূর্ণ মত নয়। লেখকের সৃষ্টিজগৎ অনেকগুলি সীমিত দৃষ্টি ও সম্পর্ক নিয়ে গড়ে ওঠে। শান্তিশেখর কেন্দ্রে থাকলেও অপরেশবাবুর স্নেহমিশ্রিত পর্যবেক্ষণ, সর্বেনের আত্মবিশ্বাস এবং সুস্মিতার জটিল উপস্থিতি পাঠকে অন্য দিকে টানে। এদের মধ্যে যে বিরোধ, সেটি একক বক্তব্যে সংকুচিত করা যায় না। আত্মজৈবনিক উপাদান থাকলেও পাণ্ডুলিপি, চিঠি বা সমকালীন দলিল ছাড়া নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে লেখকের জীবনের সরাসরি সমতা টানা অনুচিত। শিল্পের ভিতরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রূপান্তরিত হয়। গল্পের চরিত্রকে তাই প্রথমে গল্পের নিজস্ব ব্যবস্থায় বুঝতে হয়। এই পদ্ধতিতে জীবনানন্দের সংবেদনশীলতার গুরুত্ব কমে না; বরং তিনি কীভাবে বহু ভিন্ন কণ্ঠকে জায়গা দিয়েছেন, তা স্পষ্ট হয়।
জীবনানন্দের ছোটগল্পকে চিত্রকথা বলা যায়, যদি চিত্রের অর্থ স্থির দৃশ্যের সাজসজ্জা বলে না বুঝি। ‘বিলাস’ গল্পে শিশিরের অনুভব, বিকেলের রোদ, ধোঁয়া ও লবঙ্গের গন্ধ চরিত্রের ভাবনার সঙ্গে মিলে দৃশ্যকে পরিবর্তিত করে। শান্তিশেখরের স্মৃতি একটি বই সরানোর কাজকে নিঃশব্দ প্রকৃতিচিত্রে রূপ দেয়; অফিসের আলো কথোপকথনের কঠোরতা আরও স্পষ্ট করে; মৃত্যুর পরে উচ্চকিত হাসি শিরোনামের বিদ্রূপ ফিরিয়ে আনে। এই পরস্পরসংযোগই গল্পটির সংহতি। ঘটনাগুলি খণ্ডিত বলে মনে হলেও মনোযোগ দিয়ে পড়লে তাদের মধ্যে মূল্যবোধের এক প্রবহমান বিরোধ দেখা যায়। কাব্যিক বাক্য ও রুক্ষ কথ্য ভাষা, ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিষ্ঠানগত হিসাব, স্মৃতি ও সমকাল একে অন্যকে ব্যাখ্যা করে। জীবনানন্দ বস্তুজগৎ ভেঙে রহস্যের ভিতর হারিয়ে যাননি; পরিচিত বস্তুকে ভিন্ন আলোয় দেখিয়ে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব বুঝতে চেয়েছেন। তাই তাঁর গল্পে রূপময়তা অভিজ্ঞতার গভীরতা বাড়ায়, আর শ্লেষ পাঠককে অন্যের শ্রম, প্রেম ও স্বপ্নের মূল্য সম্পর্কে সতর্ক করে। শহরের ইতিহাসও ব্যক্তিগত অনুভবের ভিতর অনবরত উপস্থিত।
নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা





নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা