শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রাপথ পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতির সবচেয়ে নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলির অন্যতম। কাঁথির অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি মেদিনীপুর বলয়ে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত। তাঁর পিতা শিশির অধিকারী কংগ্রেস ও পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। ২০০৬-২০০৮ সালের নন্দীগ্রামের রক্তাক্ত জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান সেনাপতি হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী বামফ্রন্ট সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলন তাঁকে রাজ্য রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য গণনেতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসার পেছনে মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল বলয়ে তাঁর সাংগঠনিক নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল প্রশ্নাতীত।
২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শুভেন্দু অধিকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। তিনি পরিবহণ, সেচ ও জলসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন সাংগঠনিক জেলার পর্যবেক্ষক হিসেবে দলের প্রায় প্রতিটি জেলাস্তরের সমীকরণে তাঁর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। তবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক উত্থান এবং প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন ‘আই-প্যাক’ (I-PAC)-এর আগমনের পর শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের নীতিগত ও কর্তৃত্বের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৯ ডিসেম্বর মেদিনীপুরে অমিত শাহের উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগদান করেন।
এই দলবদল শুধু একজন প্রভাবশালী নেতার দল পরিবর্তন ছিল না; এটি পরিণত হয় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বে। ২০২১ সালের মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে খোদ তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মাত্র ১,৯৫৬ ভোটের ব্যবধানে শুভেন্দুর জয় রাজ্য রাজনীতির সংঘাতকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈরিতায় রূপ দেয়। শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় রাজ্য বনাম বিরোধী দলনেতার এক নজিরবিহীন আইনি ও পুলিশি যুদ্ধ। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হতে থাকে একের পর এক ফৌজদারি মামলা, দুর্নীতি ও বিশ্বাসভঙ্গের এফআইআর এবং উসকানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগ। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সারদা ও নারদার মতো পুরনো আর্থিক কেলেঙ্কারিতে শুভেন্দুকে গ্রেফতার না করার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রচার শুরু করে।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI ও ED)-র আওতাধীন আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির তদন্ত
শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলির মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং জাতীয় স্তরে আলোচিত হলো নারদ ও সারদা কাণ্ড। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর এই দুই মামলায় তাঁর আইনি অবস্থান নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
১. নারদ স্টিং অপারেশন কাণ্ড (২০১৬)
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘নারদ নিউজ’-এর সিইও ম্যাথু স্যামুয়েল একটি স্টিং অপারেশনের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেন। ২০১৪ সালে চিত্রায়িত এই গোপন ভিডিওগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেসের বহু শীর্ষ সাংসদ, বিধায়ক ও তৎকালীন মন্ত্রীকে নগদ অর্থের বান্ডিল গ্রহণ করতে দেখা যায়। এদের মধ্যে তৎকালীন তমলুকের সাংসদ শুভেন্দু অধিকারীর একটি দৃশ্যও রয়েছে বলে দাবি করা হয়, যেখানে তাঁকে একটি সাদা তোয়ালে মোড়ানো পাঁচ লক্ষ টাকার বান্ডিল নিতে দেখা যায়।
২০১৭ সালের মার্চ মাসে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ পুরো ঘটনার সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্টও এই রায় বহাল রাখে। ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল সিবিআই ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০বি (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র) এবং প্রিভেনশন অব করপশন অ্যাক্ট, ১৯৮৮ (পিসি অ্যাক্ট)-এর ৭, ১৩(২) ও ১৩(১)(ডি) ধারায় শুভেন্দু অধিকারীসহ ১২ জন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর (RC.4(A)/2017) দায়ের করে। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) একই সঙ্গে প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA)-এর আওতায় মামলা রুজু করে।
পরবর্তীকালে ২০২১ সালের মে মাসে সিবিআই তৃণমূল কংগ্রেসের চারজন হেভিওয়েট নেতা—ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় এবং তাঁদের গ্রেফতার করে। কিন্তু সেই চার্জশিটে শুভেন্দু অধিকারীর নাম রাখা হয়নি। সিবিআই-এর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, ম্যাথু স্যামুয়েল যখন স্টিং অপারেশনটি করেছিলেন, তখন শুভেন্দু অধিকারী লোকসভার সাংসদ ছিলেন। সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন আইনের ১৯(১) ধারা অনুযায়ী লোকসভার স্পিকারের অনুমোদন (Prosecution Sanction) ছাড়া চার্জশিট পেশ করা সম্ভব নয়। সিবিআই দাবি করে যে ২০১৯ সালেই লোকসভার স্পিকারের কাছে অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল, যা সংসদীয় জটিলতায় ঝুলে রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একে স্পষ্ট ‘দ্বিমুখী নীতি’ এবং ‘বিজেপির ওয়াশিং মেশিন পলিসি’ বলে তীব্র আক্রমণ করা হয়। তাঁদের বক্তব্য, তৃণমূলের নেতাদের ক্ষেত্রে বিধানসভার স্পিকারের অনুমোদন ছাড়াই রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের সম্মতি নিয়ে দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হলো, অথচ শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় কেন্দ্রীয় সংস্থা স্পিকারের অনুমোদনের দোহাই দিয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ আড়াল করছে। অপরপক্ষে, শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, নারদ টেপের ভিডিও ফরেনসিক পরীক্ষায় কতটা নিখুঁত এবং টাকাটি তিনি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নিয়েছিলেন কি না তা আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
২. সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি ও সুদীপ্ত সেনের বয়ান
সারদা গোষ্ঠীর বেআইনি আমানত সংগ্রহের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। শুভেন্দু অধিকারীর নাম এই মামলায় নতুন করে সামনে আসে যখন সারদা কর্ণধার সুদীপ্ত সেন প্রেসিডেন্সি ও জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সিবিআই ও আদালতকে একাধিক চিঠি দেন।
সুদীপ্ত সেন তাঁর ২০২০ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের চিঠিতে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, শুভেন্দু অধিকারী কাঁথি ও পূর্ব মেদিনীপুরে সারদার অফিস খোলা, জমি কেনাবেচা এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করার নামে কোটি কোটি টাকা নগদ নিয়েছেন। সুদীপ্ত সেন দাবি করেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা নিতেন। কাঁথির সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল এবং পুরসভার কাজের অনুমোদন দেওয়ার জন্য তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেছেন।’ ২০২২ সালের জুন মাসে আলিপুর কোর্টে দাঁড়িয়ে সুদীপ্ত সেন সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে চিৎকার করে বলেন যে শুভেন্দু অধিকারী বিপুল টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব সুদীপ্ত সেনের এই চিঠির প্রতিলিপি সিবিআই ডিরেক্টর এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠিয়ে শুভেন্দুর তাৎক্ষণিক গ্রেফতারের দাবি জানায়। কুণাল ঘোষ একাধিক সাংবাদিক সম্মেলন করে নথি পেশ করার দাবি করেন। বিপরীতে, শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সুদীপ্ত সেন একজন সাজাপ্রাপ্ত জেলবন্দি অপরাধী। শাসক দল পুলিশ ও কারাগার প্রশাসনকে ব্যবহার করে তাঁর কাছ থেকে জোরপূর্বক রাজনৈতিক চিঠি লিখিয়ে নিচ্ছে। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন যে, যদি কোনো লেনদেনের প্রমাণ থাকে তবে সিবিআই তা আদালতে পেশ করুক। আজ পর্যন্ত সিবিআই বা ইডি সারদা মামলায় শুভেন্দু অধিকারীকে সরাসরি অভিযুক্ত করে কোনো সম্পূরক চার্জশিট জমা দেয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও সিআইডি-র দায়ের করা ফৌজদারি মামলাসমূহ
২০২০ সালের ডিসেম্বরে বিজেপিতে যোগদানের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অধীনে শুভেন্দু অধিকারী, তাঁর পরিবার ও অনুগামীদের বিরুদ্ধে অন্তত ২৬টি পৃথক ফৌজদারি মামলা ও এফআইআর দায়ের করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলির চুলচেরা বিশ্লেষণ নিম্নে দেওয়া হলো:
১. ব্যক্তিগত দেহরক্ষী শুভব্রত চক্রবর্তীর রহস্যজনক মৃত্যু মামলা (FIR No. 248/2021)
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর কাঁথির পুলিশ ব্যারাকে শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী এবং রাজ্য পুলিশের সশস্ত্র কনস্টেবল শুভব্রত চক্রবর্তী নিজের সার্ভিস রিভলভার থেকে গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে প্রথমে কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে এবং পরে কলকাতার এএমআরআই হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। তৎকালীন সময়ে কাঁথি থানা এটিকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা আত্মহত্যার ঘটনা বলে রিপোর্ট দেয় এবং কেস ক্লোজ হয়ে যায়। কারণ শুভেন্দু তখন সরকারের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর মন্ত্রী ছিলেন।
পুনরায় এফআইআর (২০২১): শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার এবং নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার ঠিক দুই মাস পর, ২০২১ সালের জুলাই মাসে শুভব্রতর বিধবা স্ত্রী মহুয়া চক্রবর্তী কাঁথি থানায় নতুন করে অভিযোগ দায়ের করেন। মহুয়া দেবীর অভিযোগ ছিল, তাঁর স্বামীর পেটে গুলি লাগার পর তাঁকে দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁথির সাধারণ হাসপাতালে ফেলে রাখা হয়েছিল, উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যেতে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, শুভব্রত অধিকারীদের ভেতরের অনেক গোপন ও বিপজ্জনক তথ্য জেনে ফেলেছিলেন, তাই তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
সিআইডি তদন্ত ও ধারা: রাজ্য সরকার অবিলম্বে তদন্তভার সিআইডি-র হাতে দেয়। সিআইডি ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (খুন), ৩০৪ (অনিচ্ছাকৃত হত্যা), ২০১ (তথ্যপ্রমাণ লোপাট) এবং ১২০বি (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র) ধারায় মামলা রুজু করে। সিআইডি আধিকারিকরা শুভেন্দুর শান্তিকুঞ্জের দফতরে তল্লাশি চালান এবং শুভেন্দুর তৎকালীন চালক ও সহযোগীদের ম্যারাথন জেরা করেন। এই মামলা চরম নাটকীয় রূপ নেয় যখন শুভেন্দু হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
২. কাঁথি পুরসভা ত্রিপল ও ত্রাণ তছরুপ কাণ্ড (FIR No. 201/2021)
২০২১ সালের মে মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকাকে লন্ডভন্ড করে দেয়। এই দুর্যোগের ঠিক পর কাঁথি পুরসভার প্রশাসক মণ্ডলীর পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয় যে, ২৯ মে দুপুরে সশস্ত্র একদল দুষ্কৃতী পুরসভার সরকারি গুদামে তালা ভেঙে প্রবেশ করে এবং কয়েক লক্ষ টাকার ত্রিপল ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী ট্রাকে করে লুট করে নিয়ে যায়।
অভিযোগে শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর ভাই সৌমেন্দু অধিকারীর (তৎকালীন কাঁথি পুরপ্রধান) নাম উল্লেখ করা হয়। পুলিশ ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৪৮ (অনধিকার প্রবেশ), ৩৮০ (চুরি), ৪০৯ (সরকারি কর্মচারীর দ্বারা বিশ্বাসভঙ্গ) এবং ১২০বি ধারায় এফআইআর দায়ের করে। শাসক দলের অভিযোগ ছিল, সরকারি ত্রাণসামগ্রী শুভেন্দু তাঁর দলের কর্মীদের মধ্যে বিলি করে রাজনৈতিক প্রচারের কাজে লাগিয়েছেন। বিরোধী পক্ষের বক্তব্য ছিল, এটি ছিল পুরসভার অনুমোদিত সাধারণ ত্রাণ বিতরণ এবং বিজেপি বিরোধিতার কারণে একটি বানোয়াট চুরির মামলা সাজানো হয়েছে।
৩. সেচ ও পরিবহণ দপ্তরের নিয়োগ ও টেন্ডার অনিয়মের তদন্ত
শুভেন্দু অধিকারী ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেচ ও পরিবহণ মন্ত্রী থাকাকালীন বিভিন্ন প্রকল্পের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে একাধিক জেলা থেকে অভিযোগ ওঠে।
- সেচ দপ্তরের টেন্ডার কারচুপি: পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন খাল সংস্কার, ড্রেজিং ও নদী বাঁধ মেরামতের টেন্ডারে শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের অতিরিক্ত অর্থ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে সিআইডি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে।
- চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়: মানিকতলা থানায় শুভেন্দুর প্রাক্তন আপ্তসহায়ক রাখাল বেরার বিরুদ্ধে এফআইআর হয় যে, সেচ দপ্তরে গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে কোটি কোটি টাকা তোলা হয়েছে। রাজ্য পুলিশ দাবি করে এই টাকার একাংশ প্রভাবশালী মহলে গেছে। শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ অনুগামী রাখাল বেরাকে পুলিশ গ্রেফতার করে, যদিও পরে তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভঙ্গ, উসকানিমূলক মন্তব্য ও দাঙ্গা প্ররোচনার অভিযোগ
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক শৈলী ও ভাষার আগ্রাসী রূপ নিয়ে বিরোধী দলগুলি, মানবাধিকার কর্মী ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলির তরফে নিয়মিত উসকানিমূলক ও দাঙ্গা প্ররোচনার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মূলত ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩এ (ধর্ম, বর্ণ, ভাষার ভিত্তিতে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি), ২৯৫এ (ধর্মীয় ভাবাবেগে ইচ্ছাকৃত আঘাত হানা) এবং ৫০৫(২) (বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসা বা ঘৃণা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বক্তব্য) ধারায় একাধিক থানায় মামলা হয়েছে।
১. নন্দীগ্রাম নির্বাচন (২০২১)-এ মেরুকরণের ভাষা ও ‘৭০ বনাম ৩০ শতাংশ’
২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের প্রচারে শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিটি জনসভা ছিল ধর্মীয় মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দু।
- ‘বেগম’ ও ‘মিনি পাকিস্তান’ আক্রমণ: তৃণমূল সুপ্রিমোকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে বলেন, ‘তৃণমূল জিতলে বাংলা মিনি পাকিস্তানে পরিণত হবে। নন্দীগ্রামকে সুফিয়ানদের তালিবানি রাজত্বে পরিণত হতে দেব না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেগম হয়ে গেছেন।’
- ‘৭০ বনাম ৩০ শতাংশ’ তত্ত্ব: শুভেন্দু তাঁর ভাষণে বারবার বলেন, এই নির্বাচন হলো ‘৭০ শতাংশ সনাতনী হিন্দুর সঙ্গে ৩০ শতাংশ তোষণভোগী সংখ্যালঘুর লড়াই।’ তিনি ভোটারদের সনাতনী পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন।
- নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ: নির্বাচন কমিশন (ECI) শুভেন্দুর এই ভাষণকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী এবং আদর্শ আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে তাঁকে শোকজ নোটিশ পাঠায় এবং ভবিষ্যতে এমন ধর্মীয় বিভাজনের ভাষা ব্যবহার না করার জন্য কড়া সতর্কবার্তা দেয়।
২. রামনবমী শোভাযাত্রা ও হাওড়া-হুগলি সংঘাত (২০২৩)
২০২৩ সালের মার্চ মাসে রামনবমীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে হাওড়ার শিবপুর ও কাজীপাড়া এবং হুগলির রিষড়ায় ব্যাপক পাথর নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়।
- শুভেন্দুর প্রতিক্রিয়া ও এফআইআর: সংঘর্ষ চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু অধিকারী সংবাদমাধ্যম ও এক্স (টুইটার)-এ একের পর এক ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেন যে, নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সশস্ত্র গুন্ডারা সনাতনীদের শান্ত শোভাযাত্রার ওপর পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশ কমিশনার হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন।
- উসকানির অভিযোগ: তৃণমূল কংগ্রেস শুভেন্দুর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করে বলে যে, তিনি একতরফা ধর্মীয় আবেগ উসকে দিয়ে হাওড়া ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর চক্রান্ত করছেন। কলকাতা ও হাওড়ার একাধিক থানায় তাঁর বিরুদ্ধে আইপিসি ১৫৩এ ও ৫০৫ ধারায় মামলা রুজু হয়। তবে শুভেন্দু উল্টে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে দাবি করেন যে রাজ্য পুলিশ মূল অপরাধীদের আড়াল করছে এবং হাইকোর্ট পুরো ঘটনার এনআইএ (NIA) তদন্তের আদেশ দেয়।
৩. পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংঘাতমূলক ভাষা
বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দুর আক্রমণাত্মক ভাষা রাজ্য পুলিশ প্রশাসনের ওপর বারবার বর্ষিত হয়েছে।
- তমলুকের এসপি-কে প্রকাশ্য হুমকি: এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক সভায় পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপারের উদ্দেশ্যে শুভেন্দু বলেন, ‘আমার কাছে আপনার সমস্ত কল রেকর্ড ও কার্যকলাপের তথ্য আছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সব নজর রাখছে। সীমা ছাড়াবেন না।’
- কোলাঘাট ও নন্দকুমারে জনবিক্ষোভ: বিজেপি কর্মীদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে তিনি পুলিশকে ‘তৃণমূলের ক্যাডার’ বলে উল্লেখ করে থানা ঘেরাও এবং সরকারি কাজ অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এই প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারীকে হুমকি ও কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৬, ১৮৯, ৩৫৩ ও ৫০৬ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।
৪. লোকসভা নির্বাচন-পরবর্তী ‘সবকা সাথ বন্ধ’ সংক্রান্ত বিতর্ক (২০২৪)
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কলকাতায় বিজেপির বর্ধিত রাজ্য কার্যকারিণী বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী একটি চরম বিতর্কিত মন্তব্য করেন। দলের নির্বাচনী ফলাফলের পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন:
‘যে আমাদের সাথে থাকবে, আমরা তার সাথে থাকব। নো নিড ফর মাইনরিটি মোর্চা। সবকা সাথ, সবকা বিকাশ বন্ধ করা উচিত। যো হামারে সাথ, হাম উনকে সাথ। আমরা সনাতনীদের ভোটেই বাঁচব।’
এই মন্তব্যটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি স্লোগান এবং সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর প্রতি আঘাত হিসেবে দেশজুড়ে নিন্দিত হয়। বাম, কংগ্রেস এবং তৃণমূল অভিযোগ করে যে বিরোধী দলনেতা প্রকাশ্যে সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গ করে বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের উসকানি দিচ্ছেন।
বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণ, ঐতিহাসিক রক্ষাকবচ ও এফআইআর খারিজ
শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে মামলাগুলির সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় রচিত হয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে। আদালত এই ক্ষেত্রে রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
১. বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার ঐতিহাসিক রক্ষাকবচ (সেপ্টেম্বর ২০২১ ও ডিসেম্বর ২০২২)
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার একক বেঞ্চ শুভেন্দু অধিকারীর রিট পিটিশনের শুনানি গ্রহণ করেন। শুভেন্দুর আইনজীবীরা আদালতে তথ্য তুলে ধরেন যে দলবদলের পর কীভাবে কয়েক মাসের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক এফআইআর করা হচ্ছে।
- আদালতের পর্যবেক্ষণ: বিচারপতি মান্থা রায় দেন যে, রাজ্য প্রশাসন কর্তৃক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা আদালতের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালত শুভেন্দুর বিরুদ্ধে তদন্তে কোনো চূড়ান্ত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ (গ্রেপ্তার) গ্রহণে স্থগিতাদেশ জারি করে।
- রক্ষাকবচের সীমা: ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর বিচারপতি মান্থা আরও এক ধাপ এগিয়ে নির্দেশ দেন যে, কলকাতা হাইকোর্টের পূর্বানুমতি ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে কোনো নতুন এফআইআর দায়ের করতে পারবে না। রাজ্য সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গেলেও দেশের শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের আদেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে এবং মামলাটি প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে পাঠায়।
২. বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক রায়: ১৫টি এফআইআর খারিজ (২০২৪-২০২৫)
শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য, হিংসা প্ররোচনা ও আইন অমান্য আন্দোলনের ১৫টি এফআইআর চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মামলায় বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত একটি ল্যান্ডমার্ক রায় দেন। আদালত সমস্ত নথি ও ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ১৫টি মামলাই সম্পূর্ণ খারিজ (Quash) করে দেয়।
- ‘বিদ্বেষমূলক গন্ধ’ (Stench of Malice): বিচারপতি সেনগুপ্ত তাঁর রায়ে স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, ‘রাজ্য পুলিশ কর্তৃক বিরোধী দলনেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলির প্রতিটি ছত্রে রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার স্পষ্ট গন্ধ (stench of malice) রয়েছে।’
- ধারা ১৫৩এ-এর প্রয়োগে আদালতের আইনি বিশ্লেষণ: আদালত ব্যাখ্যা করে যে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩এ ধারার অপব্যবহার হচ্ছে। একজন বিরোধী নেতা যখন সরকারের সংখ্যালঘু তোষণের নীতি বা রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তখন তাকে সরাসরি অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাঁধানোর অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের তীব্র সমালোচনা ও নিজ গোষ্ঠীর অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো বাকস্বাধীনতার (অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ক)) অন্তর্গত, যদি না তাতে সরাসরি শারীরিক রক্তপাত বা হিংসার তাত্ক্ষণিক উসকানি থাকে।
বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও সার্বিক মূল্যায়ন
শুভেন্দু অধিকারীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণকে নিছক ব্যক্তিগত অপরাধ বা নির্দোষিতার বাইনারিতে বিচার করা অসম্ভব। এটি পশ্চিমবঙ্গের গভীর রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর বহুমুখী সংকটের প্রতিফলন।
১. তৃণমূল ও বিরোধীদের যুক্তি ও অবস্থান:
- সিবিআই/ইডি-র পক্ষপাতিত্ব: তৃণমূলের মূল অভিযোগের ভিত্তি হলো নারদ ভিডিওতে হাতেনাতে টাকা নেওয়ার দৃশ্য থাকা সত্ত্বেও শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে কোনো কড়া পদক্ষেপ না হওয়া। একই মামলায় তাঁদের চার শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির বিশ্বাসযোগ্যতাকে কাঠগড়ায় তোলে।
- ক্রমাগত ধর্মীয় বিভাজন: শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রচার ক্রমাগত পশ্চিমবঙ্গকে ধর্মীয় ভিত্তিতে ভাগ করছে। ‘৭০ বনাম ৩০’, ‘মিনি পাকিস্তান’ এবং ‘সবকা সাথ বন্ধের’ মতো বক্তব্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ধূলিসাৎ করছে।
২. শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপির আইনি ও রাজনৈতিক আত্মপক্ষ:
- প্রশাসনিক ক্ষমতার নির্লজ্জ অপব্যবহার: শুভেন্দু যখন তৃণমূলে ছিলেন, তখন ২০১৮ সালে দেহরক্ষীর মৃত্যু বা পুরসভার কাজ নিয়ে কোনো মামলা হয়নি। কিন্তু বিজেপিতে গিয়ে মমতাকে হারানোর পরই রাতারাতি খুনের চেষ্টার ধারা এবং চুরির কেস সাজানো হয়েছে।
- আদালতের পর্যবেক্ষণই প্রমাণ: কলকাতা হাইকোর্টের একাধিক বিচারপতির রায়ে স্পষ্ট হয়েছে যে পুলিশ প্রশাসনকে বিরোধীদের হেনস্থা করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৫টি এফআইআর খারিজ হওয়া প্রমাণ করে যে বেশিরভাগ মামলাই ভিত্তিহীন ছিল।
শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে থাকা ক্রিমিনাল কেস ও অভিযোগগুলি মূলত ভারতের সমকালীন রাজনীতির দুটি বিপজ্জনক প্রবণতাকে দৃশ্যমান করে—একদিকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এজেন্সিকে বিরোধী দমনে ব্যবহার ও দলের নেতাদের সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে রাজ্যের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধী নেতাদের আইনি জালে বন্দি করার চেষ্টা। এই আইনি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কোনো একক রাজনৈতিক বয়ানে সম্ভব নয়; তা নির্ভর করছে দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ওপর।
সংক্ষিপ্ত সামগ্রিক রূপরেখা: শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে প্রধান মামলা ও অভিযোগ
| মামলা / অভিযোগের বিষয় | আইনি ধারা / সংস্থা | অভিযোগের মূল বক্তব্য | বর্তমান স্থিতি ও আদালতের পর্যবেক্ষণ |
| নারদ স্টিং অপারেশন | CBI (RC.4(A)/2017), IPC 120B, PC Act | তোয়ালে মুড়ে ৫ লক্ষ টাকা নগদ গ্রহণের স্টিং ফুটেজ। | লোকসভা স্পিকারের চার্জশিট অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে; সিবিআই হেফাজত চায়নি। |
| সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি | CBI / ED, IPC 420, 406, 120B | সুদীপ্ত সেনের অভিযোগ: নিয়মিত কোটি কোটি টাকা নগদ তোলা হয়েছে। | সুদীপ্ত সেনের চিঠির সত্যতা খতিয়ে দেখার কথা বলা হলেও কোনো চার্জশিটে শুভেন্দুর নাম ওঠেনি। |
| দেহরক্ষী শুভব্রতর মৃত্যু | CID / কাঁথি থানা, IPC 302, 120B | ২০১৮ সালে নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে মৃত্যুর পর চিকিৎসার অবহেলা ও খুনের অভিযোগ। | কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের চূড়ান্ত পদক্ষেপ ও গ্রেপ্তারে স্থগিতাদেশ বহাল। |
| কাঁথি পুরসভা ত্রাণ তছরুপ | কাঁথি থানা, IPC 448, 380, 409 | ঘূর্ণিঝড় ইয়াস-এর পর পুরসভার গুদাম থেকে ত্রিপল ও ত্রাণসামগ্রী লুটের অভিযোগ। | কলকাতা হাইকোর্টের সুরক্ষার আওতায় তদন্ত চলছে; চরম পদক্ষেপ নিষিদ্ধ। |
| উসকানিমূলক ভাষণ ও দাঙ্গা | রাজ্যের বিভিন্ন থানা, IPC 153A, 295A, 505 | ‘৭০ বনাম ৩০%’, ‘মিনি পাকিস্তান’, রামনবমী সংঘাত ও ‘সবকা সাথ বন্ধ’ সংক্রান্ত বিতর্কিত বক্তব্য। | বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের বেঞ্চে ১৫টি এফআইআর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সম্পূর্ণ খারিজ। |
নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা





নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা