• মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • অ্যান্ড্রোয়েড অ্যাপ
Thursday, October 1, 2026
নবজাগরণ
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • অ্যান্ড্রোয়েড অ্যাপ
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • অ্যান্ড্রোয়েড অ্যাপ
No Result
View All Result
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
No Result
View All Result

মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড : অপরাধের অন্ধকার সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন

মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
September 30, 2026
in রাজনীতি
0
মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড: অপরাধের অন্ধকার সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন

চিত্রঃ এআই জেনারেটেড

Share on FacebookShare on Twitter

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম

মুম্বইকে বুঝতে গেলে তার উজ্জ্বল মুখটির দিকে তাকানোই যথেষ্ট নয়। সমুদ্রবন্দর, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, শেয়ারবাজার এবং চলচ্চিত্রের সমাবেশে যে নগর ভারতের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তার ভেতরেই দীর্ঘকাল ধরে বেড়ে উঠেছে অপরাধের আরেকটি সংগঠিত জগৎ। সেখানে টাকা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়, ক্ষমতা অর্জনের উপায়; জমি কেবল বাসস্থানের ভিত্তি নয়, দখল ও আধিপত্যের ক্ষেত্র; আর মানুষের নিরাপত্তা অনেক সময় নাগরিক অধিকার থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১১ সালের জনগণনায় মুম্বই নগর এলাকার জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি চব্বিশ লক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যাটি সেই সময়ের নির্দিষ্ট নগরসীমার হিসাব, বর্তমান জনসংখ্যা কিংবা বৃহত্তর মহানগর অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা নয়। এত মানুষের শ্রম, যাতায়াত, বাসস্থান ও জীবিকার সম্মিলিত ইতিহাসের মধ্যে অপরাধজগতের উত্থানকে দেখতে হয়। শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব যেমন বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করেছে, তেমনই সেই সম্পদে প্রবেশের অসম সুযোগ অপরাধী মধ্যস্থতাকারীদের জন্য জায়গা তৈরি করেছে। এই আলোচনার ভিত্তি আবদুল শাবানের গবেষণা, বিশেষত তাঁর মুম্বইয়ের অপরাধ ও নগরপরিসর সম্পর্কিত বিশ্লেষণ। (তথ্যসূত্র: Census of India. 2011. Primary Census Abstract: Maharashtra. New Delhi: Office of the Registrar General and Census Commissioner, Ministry of Home Affairs, Government of India; Abdul Shaban. 2010. Mumbai: Political Economy of Crime and Space. Hyderabad: Orient Blackswan.)

স্বপ্নের শহর হিসেবে মুম্বইয়ের যে পরিচয়, তার আকর্ষণ সমাজের সব স্তরে একইভাবে কাজ করে না। শিল্পপতির কাছে এই শহর বিনিয়োগের সম্ভাবনা, অভিনেতার কাছে পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে ক্রেতার সমাবেশ, আর গ্রামের কর্মহীন তরুণের কাছে অন্তত একটি কাজ জুটিয়ে নেওয়ার আশ্রয়। প্রত্যেকেই এখানে কিছু অর্জন করতে আসে, কিন্তু সবার হাতে একই পুঁজি, শিক্ষা, পরিচয় কিংবা নিরাপত্তা থাকে না। একদিকে চলচ্চিত্রের সাফল্য, বিলাসবহুল জীবনযাপন ও সম্পদের প্রকাশ্য প্রদর্শন; অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর ঘর, অনিশ্চিত মজুরি, কাজ হারানোর ভয় এবং প্রতিদিনের যাতায়াতে নষ্ট হয়ে যাওয়া সময়। এই পাশাপাশি অবস্থান শহরের বৈষম্যকে চোখের সামনে এনে দেয়। সম্পদশালী মানুষের জীবন তখন দূরের কোনো কল্পনা থাকে না; গরিব মানুষের প্রতিদিনের দৃশ্যমান অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। তবে সেই দৃশ্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। বরং প্রশ্নটি হলো, শহর তার অধিবাসীদের আকাঙ্ক্ষা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের ন্যায্য পথ কতটা খোলা রাখে। মুম্বইয়ের অপরাধের সামাজিক ইতিহাসে এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে।

বলিউড এই আকাঙ্ক্ষার বিশেষ এক বাহক। চলচ্চিত্র, গান, অভিনয় এবং তারকাদের জীবন ভারতের বহু ভাষা ও অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেছে। দেশের বাইরে বসবাসকারী ভারতীয়দের মধ্যেও এই সংস্কৃতি স্মৃতি, পরিচয় ও আবেগের সংযোগ রক্ষা করে। কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রকাশ্য জৌলুশের পেছনে থাকে অর্থ সংগ্রহ, কাজের অনিশ্চয়তা, বিতরণব্যবস্থা, পরিচিতির জাল এবং সাফল্যের তীব্র প্রতিযোগিতা। অপরাধী গোষ্ঠী যখন এই শিল্পের কাছে পৌঁছায়, তখন তাদের আগ্রহ শুধু তারকাদের সঙ্গে ছবি তোলা বা সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোয় সীমাবদ্ধ থাকে না। অর্থ বিনিয়োগ, চাঁদা আদায়, ভয় দেখানো এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারও তার অংশ হতে পারে। মূল লেখায় চলচ্চিত্রজগৎ ও আবাসন ব্যবসাকে অপরাধী অর্থের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সম্পর্কের অর্থ বুঝতে হলে শিল্পের সৃজনশীল চরিত্র এবং তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আলাদা করে দেখতে হয়। কোনো শিল্পক্ষেত্রে অপরাধী প্রভাবের উপস্থিতি সেই ক্ষেত্রের সব কর্মীকে অপরাধের অংশীদার করে না; বরং অনেক কর্মী নিজেরাই সেই প্রভাবের চাপ ও আতঙ্ক বহন করেন।

মুম্বইয়ের অপরাধজগৎ সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনায় কয়েকজন শক্তিশালী নেতার নামই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। অথচ একটি শহরের ওপর অপরাধী প্রভাব কেবল কয়েকজন ব্যক্তির সাহস, নিষ্ঠুরতা বা কৌশলের ফল হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন অর্থের চলাচল, তথ্যের আদানপ্রদান, আশ্রয়, পরিবহন, স্থানীয় সহযোগিতা এবং কখনো প্রশাসনিক প্রশ্রয়। মূল পাঠে অভিযোগ করা হয়েছে, একসময় বড় বিনিয়োগ ও নির্মাণসংক্রান্ত সিদ্ধান্তেও অপরাধী নেতাদের অনুমোদন নেওয়ার প্রবণতা ছিল। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পুলিশকর্মীদের একাংশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথাও সেখানে এসেছে। এই বিবরণকে সর্বব্যাপী নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না; প্রতিটি অভিযোগের নিজস্ব প্রমাণ ও প্রেক্ষাপট আছে। তবু এর মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট হয়। অপরাধজগৎ শহরের বাইরে দাঁড়িয়ে শহরকে আক্রমণ করছিল না, শহরের ব্যবসা, প্রশাসন ও সামাজিক সম্পর্কের ফাঁক দিয়েই নিজের অবস্থান শক্ত করছিল। সেই কারণে অপরাধের ইতিহাস এবং নগরের অর্থনৈতিক ইতিহাসকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি কাহিনি হিসেবে পড়া যায় না। 

মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড: অপরাধের অন্ধকার সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন
চিত্রঃ ডাউদ ইব্রাহিম

শহরটির সামাজিক বিভাজনও এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে। ধর্ম, অঞ্চল, জাতপাত ও শ্রেণির পার্থক্য এখানে শুধু ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয় নয়; কোথায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে, কোন পাড়ায় নিরাপদ মনে হবে, কার সঙ্গে ব্যবসার সম্পর্ক গড়ে উঠবে কিংবা বিপদের সময় কার সাহায্য পাওয়া যাবে, এসবের ওপরও তার প্রভাব পড়ে। মুসলিম এবং দলিত জনগোষ্ঠীর বসতিকে অবমাননাকর পরিচয়ে চিহ্নিত করার প্রবণতা নগরপরিসরের ওপর সামাজিক সন্দেহের ছায়া ফেলে। কোনো এলাকা সম্পর্কে একবার বিপজ্জনক বা বহিরাগত হওয়ার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানকার সাধারণ অধিবাসীরাও তার বোঝা বহন করেন। তাঁদের ঠিকানা চাকরির আবেদন, বাড়ি খোঁজা কিংবা প্রশাসনের কাছে সাহায্য চাওয়ার সময় অঘোষিত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বিভাজনকে কেবল ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ফল বললে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি আড়াল হয়। আবাসনের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ মানুষকে পরিচিত গোষ্ঠীর মধ্যে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য করে; পরে সেই ঘনবসতিকেই আবার বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। 

আঞ্চলিক রাজনীতির বিকাশ এই বিভাজনে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। শিবসেনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘son-of-the soil movement’ স্থানীয় মানুষের কাজ ও অধিকার রক্ষার ভাষা ব্যবহার করলেও তার সঙ্গে বহিরাগতবিরোধী মনোভাব এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করার প্রবণতা জড়িয়ে ছিল। মূল লেখায় ১৯৬৬ থেকে ২০০০ সালের সময়পর্বকে এই আন্দোলনের বিশেষ প্রভাবের সময় হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার উদ্বেগ বাস্তব হতে পারে, কিন্তু সেই উদ্বেগের দায় অন্য অঞ্চলের দরিদ্র শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার অর্থনৈতিক উৎস বদলায় না। বরং একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়। অপরাধী পৃষ্ঠপোষকেরা এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে সামনে আসার সুযোগ পান। যাঁরা আইনগত বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ওপর ভরসা হারান, তাঁরা কখনো স্থানীয় শক্তিমান ব্যক্তির কাছে যান। এখানেই আঞ্চলিক বর্জন, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অপরাধী কর্তৃত্বের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক তৈরি হয়। (তথ্যসূত্র: Jayant Lele. 1995. Saffronization of the Shiv Sena: The Political Economy of City, State and Nation. In Sujata Patel and Alice Thorner, eds., Bombay: Metaphor for Modern India. New Delhi: Oxford University Press, pp. 185–212; Ashok Dhawale. 2000. The Shiv Sena: Semi-fascism in Action. The Marxist, 16(2).)

মূল পাঠে পরিচিত বহু অপরাধী নেতার সামাজিক উৎস হিসেবে প্রান্তিক ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে। করিম লালা, হাজি মস্তান, দাউদ ইব্রাহিম, ছোট শাকিল কিংবা আবু সালেমের নাম যেমন সেখানে রয়েছে, তেমনই অরুণ গাওলি, ছোট রাজন এবং অন্য কয়েকজনের পরিচয়ও আলোচনায় এসেছে। এই তালিকার উদ্দেশ্য কোনো ধর্ম বা জাতপাতকে অপরাধপ্রবণ বলে ঘোষণা করা হতে পারে না। ব্যক্তির অপরাধের দায় তার নিজের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত; বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর সেই দায় চাপানো অন্যায় এবং বিশ্লেষণগতভাবেও ভুল। বরং তালিকাটি থেকে বোঝার বিষয় হলো, আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার বাইরে থাকা কিছু মানুষ কোন পথে বিকল্প ক্ষমতার সন্ধান করেছেন। শহরের প্রান্তিক এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালিয়েছেন, ছোট ব্যবসা গড়েছেন এবং সন্তানদের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁদের জীবনকে বাদ দিয়ে কেবল অপরাধী নেতাদের জীবন দেখলে প্রান্তিক সমাজের একটি বিকৃত ছবি তৈরি হয়। অপরাধী নেতৃত্বের উত্থান ব্যাখ্যা করতে হলে একই পরিবেশে অধিকাংশ মানুষ কেন অপরাধে যুক্ত হননি, সেই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বে রাখতে হয়।

দারিদ্র্য ও অপরাধের সম্পর্ক তাই সরল নয়। কম মজুরি, অস্থায়ী কাজ ও সামাজিক অপমান মানুষের জীবনকে সংকুচিত করে, কিন্তু এগুলো অপরাধের অবধারিত কারণ নয়। সমাজ যখন অর্থ, মর্যাদা ও ভোগের উচ্চ মানদণ্ড সামনে রাখে, অথচ সেই মানদণ্ডে পৌঁছানোর স্বীকৃত পথ সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত রাখে না, তখন কিছু মানুষের মধ্যে হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে। রিচার্ড ক্লোয়ার্ড ও লয়েড ওহলিনের আলোচনায় বৈধ সুযোগের পাশাপাশি অবৈধ সুযোগের বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তরুণ শুধু চাকরি না পাওয়ার কারণে সংগঠিত অপরাধে ঢুকে পড়েন না; অপরাধী দলের সঙ্গে পরিচয়, কাজ শেখার পরিবেশ, স্থানীয় যোগাযোগ এবং সেখানে আয় বা নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিও ভূমিকা রাখে। মুম্বইয়ের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি সহায়ক, কারণ এখানে অপরাধী সংগঠন অনেক সময় তরুণদের কাছে প্রস্তুত একটি যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে উপস্থিত ছিল। এই ব্যাখ্যা অপরাধকে সমর্থন করে না; বরং তার পুনরুৎপাদনের সামাজিক পথটি বোঝায়। (তথ্যসূত্র: Richard A. Cloward and Lloyd E. Ohlin. 1960. Delinquency and Opportunity: A Theory of Delinquent Gangs. New York: Free Press.)

আবাসনের সংকট এই সুযোগহীনতাকে আরও তীব্র করে। যে মানুষ শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখতে শ্রম দেন, তাঁর আয় যদি শহরের স্বাভাবিক আবাসনব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখে, তবে তাঁকে অনিরাপদ ও ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় ঠাঁই নিতে হয়। বস্তি কিংবা চাল তখন ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চিহ্ন নয়, নগরের অর্থনৈতিক বিন্যাসের একটি ফল। চালের ঘর, ভাগাভাগি ব্যবহার করা জল ও শৌচাগার, অনিশ্চিত ভাড়ার সম্পর্ক এবং উচ্ছেদের আশঙ্কা মানুষের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। এমন জায়গায় স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী কখনো ঘর জোগাড় করে দেন, কখনো জল বা বিদ্যুতের সংযোগে সাহায্য করেন, কখনো বিরোধ মেটান। তাঁর ক্ষমতার উৎস যদি জনসম্মতি ও জবাবদিহির পরিবর্তে ভয় ও নিয়ন্ত্রণ হয়, তবে সাধারণ সহায়তাও নির্ভরতার সম্পর্কে পরিণত হতে পারে। শহরের আবাসনব্যবস্থা বোঝা ছাড়া এই স্থানীয় ক্ষমতা বোঝা কঠিন। (তথ্যসূত্র: R. N. Sharma. 2007. The Housing Market in Mumbai Metropolis and Its Irrelevance to the Average Citizen. In Annapurna Shaw, ed., Indian Cities in Transition. Chennai: Orient Longman, pp. 283–313; Shaban, Mumbai: Political Economy of Crime and Space, 2010.)

অভিবাসন মুম্বইয়ের শক্তির উৎস, আবার অভিবাসীদের অনিশ্চয়তা শহরের ক্ষমতার সম্পর্ককে প্রকাশ করে। নতুন আসা মানুষ সাধারণত আত্মীয়, গ্রামের পরিচিত ব্যক্তি, একই ভাষাভাষী শ্রমিক কিংবা পূর্বপরিচিত কারও সাহায্যে কাজ ও বাসস্থান খোঁজেন। এই যোগাযোগ তাঁদের বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু সব যোগাযোগ সমান নিরাপদ নয়। কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, সহজ আয়ের প্রলোভন কিংবা বিপদে সুরক্ষা দেওয়ার আশ্বাসের মধ্য দিয়ে অপরাধী সংগঠনও নতুন মানুষকে নিজের দিকে টানতে পারে। মূল পাঠে কর্মহীন তরুণদের অপরাধী দলের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা এইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিবাসনকে অপরাধের সমার্থক করা যাবে না। নতুন শ্রমিকের আগমন শহরের উৎপাদন ও সেবাকে চালু রাখে; সমস্যাটি তাঁদের উপস্থিতি নয়, তাঁদের শ্রমকে গ্রহণ করেও অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার প্রবণতা। দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনের প্রবাহ এবং অপরাধী নিয়োগের বিশেষ পরিস্থিতি পৃথক করে দেখা প্রয়োজন। (তথ্যসূত্র: D. P. Singh. 2007. Migration in Mumbai: Trends in Fifty Years. Demography India, 36(2), pp. 315–327; S. Nair. 2006. Busting Crime in City Slums. Indian Express, Mumbai, 1 January.)

এই ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহেও বিশেষ সতর্কতা দরকার। অপরাধী সংগঠন নিজেদের কাজের স্বচ্ছ নথি রাখে না, আর পুলিশ, সংবাদমাধ্যম, স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিবরণ সবসময় একরকম হয় না। কেউ তথ্য গোপন করেন আত্মরক্ষার জন্য, কেউ নিজের গুরুত্ব বাড়িয়ে বলেন, কেউ আবার বহুবার শোনা গল্পকেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলে মনে করেন। আবদুল শাবান তাঁর গবেষণায় পুলিশকর্মী, স্থানীয় তথ্যদাতা, সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিবাসী, সংবাদপত্র এবং অন্যান্য লেখার সাহায্য নিয়েছেন। এই বিভিন্ন উৎসকে মিলিয়ে পড়ার প্রয়োজন আছে; একটি আকর্ষণীয় গল্পকে প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। সুকেতু মেহতার নগরবর্ণনাও শহরের জটিল অভিজ্ঞতা বুঝতে সহায়ক, কিন্তু সাহিত্যিক বয়ান ও বিচারিক প্রমাণের কাজ এক নয়। অপরাধের ইতিহাসে জনপ্রিয় কিংবদন্তি যত বেশি, তথ্যের স্তরভেদ তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সম্পর্কের দাবি, কোনো অপরাধের অভিযোগ এবং আদালতে প্রতিষ্ঠিত দায়কে একই ভাষায় লেখা হলে পাঠক প্রকৃত অবস্থাটি বুঝতে পারেন না। (তথ্যসূত্র: Suketu Mehta. 2004. Maximum City: Bombay Lost and Found. New Delhi: Penguin Viking; Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017, pp. 115–134.)

মুম্বইয়ের সংগঠিত অপরাধের প্রাথমিক বিস্তার মূল পাঠে চল্লিশের দশকের চোরাচালান, অবৈধ মদের ব্যবসা, জুয়ার আড্ডা এবং মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বন্দরের অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পণ্য আসে, গুদামে জমা হয়, শ্রমিকের হাত দিয়ে নড়ে এবং পরিবহনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বাজারে পৌঁছায়। এই চলাচলের কোথাও নজরদারির দুর্বলতা বা অসাধু সহযোগিতা থাকলে গোপন লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়। নিষিদ্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রিত পণ্যের বাজারে লাভের পরিমাণ বেশি হলে সেই সুযোগকে ঘিরে সংগঠনও গড়ে ওঠে। প্রথমে ছোট পরিসরে কাজ করা ব্যক্তিরা পরে পরিবহন, মজুত, বিক্রি ও সুরক্ষার জন্য অন্যদের যুক্ত করেন। অপরাধের এই বিস্তারে কেবল পেশিশক্তি নয়, বাজার সম্পর্কে জ্ঞান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যবহার করার দক্ষতাও প্রয়োজন হয়। ফলে বন্দরের কুলি বা ছোট দালালের জীবন থেকে বড় অপরাধী ব্যবসায়ীর জীবন পর্যন্ত যে পথ দেখা যায়, তার মধ্যে শহরের বাণিজ্যিক অবকাঠামোর ছাপ থাকে।

ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অপরাধী ব্যবসার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয় বলে মূল লেখায় উল্লেখ আছে। ব্যবসায়ী, নির্মাতা, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পেশাজীবীর কাছ থেকে অর্থ আদায় এই বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চোরাচালানের ক্ষেত্রে লাভ আসে পণ্যের গোপন চলাচল থেকে; চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে লাভ আসে অন্যের বৈধ আয়কে ভয় দেখিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার মাধ্যমে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে অপরাধী ক্ষমতার চরিত্রও বদলায়। পণ্য সরবরাহের জন্য যতটুকু প্রভাব প্রয়োজন, নিয়মিত চাঁদা আদায়ের জন্য তার চেয়ে বেশি দৃশ্যমান আতঙ্ক ও দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দরকার হতে পারে। একজন ব্যবসায়ী তখন শুধু নিজের পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের খরচ হিসাব করেন না, নিরাপত্তার অনিশ্চয়তাকেও হিসাবের মধ্যে আনেন। শহরের অর্থনীতিতে এই ভয় অদৃশ্য ব্যয়ের মতো কাজ করে। তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যবসার স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন আস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অপরাধী সংগঠন নিজের লাভ বাড়ালেও সেই লাভের বোঝা অন্য মানুষের ওপর ছড়িয়ে পড়ে।

করিম লালা এই প্রাথমিক যুগের অন্যতম পরিচিত মুখ। আফগানিস্তানের কুনার অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই পশতুন ব্যক্তির নাম মুম্বইয়ের অপরাধের ইতিহাসে জুয়ার ব্যবসা, অবৈধ মদ, চাঁদাবাজি এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মূল পাঠে তাঁর জন্ম ১৯১১ সালে এবং পেশোয়ার হয়ে মুম্বইয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। সেখানে মৃত্যুসাল ২০১২ লেখা থাকলেও সমকালীন মৃত্যুসংবাদে ২০০২ সালের উল্লেখ পাওয়া যায়; অতএব সেই ভুল পুনরাবৃত্তি করা চলে না। মুম্বইয়ের বন্দরে কাজ করার অভিজ্ঞতার পর তিনি ধীরে ধীরে স্থানীয় অপরাধী পরিসরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। নাগপাড়া, বাইকুল্লা, পায়ধুনি ও কামাঠিপুরার মতো অঞ্চলে তাঁর কার্যকলাপের কথা মূল লেখায় এসেছে। এসব এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাঁর প্রভাব বিস্তারের পটভূমি তৈরি করেছিল। তবে কোনো পাড়ায় একজন অপরাধী নেতার উপস্থিতি সেই পাড়ার সব বাসিন্দার পরিচয় নয়। নেতার নামের আড়ালে সেখানে শ্রমিক, দোকানি, পরিবারের সদস্য এবং প্রতিদিন বেঁচে থাকার চেষ্টা করা অসংখ্য মানুষের জীবনও রয়েছে। (তথ্যসূত্র: Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017; The Times of India. 2002. Karim Lala’s Death Marks End of Old-guard Mafia. Mumbai edition, February.)

করিম লালার প্রভাব কেবল অবৈধ ব্যবসা থেকে আসেনি। মূল লেখায় বিরোধ মেটানোর জন্য তাঁর পেশিশক্তি ব্যবহারের কথাও রয়েছে। এই ধরনের মধ্যস্থতায় দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় বলে কিছু মানুষ আকৃষ্ট হতে পারেন, বিশেষত আনুষ্ঠানিক প্রতিকার যদি ব্যয়বহুল, বিলম্বিত বা দুর্লভ বলে মনে হয়। কিন্তু দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি একই বিষয় নয়। যার হাতে ভয় দেখানোর শক্তি আছে, সে নিজের পছন্দের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে; দুর্বল পক্ষের সম্মতি সেখানে প্রকৃত সম্মতি কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। করিম লালার গড়ে তোলা জিরগা সংগঠনের কথাও মূল পাঠে আছে। খান আবদুল গফ্ফর খানের আশীর্বাদ পাওয়ার প্রসঙ্গটি গবেষকের সাক্ষাৎকারদাতাদের বক্তব্য হিসেবে এসেছে, স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়। এই ধরনের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, অপরাধী নেতৃত্ব নিজের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সম্মানিত ব্যক্তি, সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠান কিংবা সাহায্যের কাজের সঙ্গে সম্পর্ক দেখাতে আগ্রহী হতে পারে। সেই সম্পর্কের দাবি মূল্যায়ন করার সময় তার উৎসটি মনে রাখা দরকার।

বরদারাজন মুদালিয়ার, যিনি বরদাভাই নামে পরিচিত ছিলেন, এই একই যুগের আরেক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তামিলনাড়ু থেকে আসা তাঁর জীবন সম্পর্কে মূল পাঠে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসে কুলির কাজ করার বিবরণ পাওয়া যায়। পরে অবৈধ মদের ব্যবসা, মটকা জুয়া, বন্দরের মাল চুরি এবং অন্যান্য অপরাধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হয়। করিম লালার পর তাঁর আলোচনা এলেও তাঁদের ইতিহাসকে এক ব্যক্তির আসন অন্য ব্যক্তির হাতে যাওয়ার সরল উত্তরাধিকার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁদের প্রভাবের ক্ষেত্র, যোগাযোগ এবং কাজের সময়পর্ব পরস্পরকে আংশিকভাবে অতিক্রম করেছে। বরদাভাইয়ের ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে ছোট গোষ্ঠীগুলি বিতরণকারী বা সহযোগী হিসেবে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বলে মূল লেখায় বলা হয়েছে। এর মধ্যে সংগঠিত অপরাধের একটি পরিচিত কৌশল দেখা যায়। বড় নেতৃত্ব সব কাজ নিজে না করে স্থানীয় গোষ্ঠীর সাহায্যে প্রভাব বাড়ায়, আর ছোট গোষ্ঠী বড় সংগঠনের আশ্রয়ে আয় ও নিরাপত্তার সম্ভাবনা খোঁজে। এই নির্ভরতা পরে আনুগত্য, বিরোধ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বও তৈরি করতে পারে।

বরদাভাইয়ের প্রভাব বোঝার জন্য তামিল অভিবাসীদের অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হয়। ভাষা ও অঞ্চলের পরিচয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত মানুষ নতুন শহরে কাজ, ঘর এবং সামাজিক ভরসার সন্ধান করেন। মূল লেখায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ ভারতীয়দের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ ও পুলিশের পক্ষপাতের অভিজ্ঞতার মধ্যে বরদাভাই নিজের জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। এই পরিচিতির সত্যতা এবং অপরাধী কাজের দায় আলাদা করে বিচার করা প্রয়োজন। বিপদে সাহায্য পাওয়া মানুষ সাহায্যদাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারেন, কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতা তাঁর সব কর্মকাণ্ডকে বৈধ করে না। একইভাবে অপরাধী নেতার সাহায্য গ্রহণকারী কোনো দরিদ্র পরিবারকে তাঁর অপরাধের সহযোগী বলা যায় না। এখানে নাগরিক সুরক্ষার অভাব কীভাবে ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার মূল্য বাড়ায়, তা দেখা যায়। আশির দশকে পুলিশের অভিযানে তাঁর গোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তিনি চেন্নাই চলে যান বলে মূল পাঠে উল্লেখ আছে। ১৯৮৮ সালে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর জীবন তাই অভিবাসী শ্রম, স্থানীয় কর্তৃত্ব ও অপরাধী ব্যবসার জটিল সংযোগের একটি উদাহরণ।

ধারাভি এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়, কারণ বরদাভাইয়ের অপরাধী ব্যবসার প্রসঙ্গের পাশাপাশি সেখানে শ্রম ও উৎপাদনের বিস্তৃত ইতিহাসও রয়েছে। জায়গাটিকে কেবল মদের আড্ডা, জুয়া কিংবা অপরাধের ঠিকানা হিসেবে দেখলে তার বাস্তব জীবন আড়াল হয়। জলাভূমির প্রান্তে আশ্রয় গড়ে তোলা দরিদ্র মানুষ, অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিক এবং ছোট উৎপাদকেরা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে যে বসতি তৈরি করেছেন, তা পরবর্তী সময়ে বহু কাজের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চামড়াজাত পণ্য, পোশাক, খাদ্যপণ্য ও হস্তশিল্পের উৎপাদন ধারাভির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজের জায়গা ও বাসস্থানের ঘনিষ্ঠতা সেখানে উৎপাদনকে সম্ভব করেছে, যদিও সেই একই ঘনত্ব স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সংকটও সৃষ্টি করে। ধারাভির মানুষকে নিয়ে সহানুভূতিশীল বর্ণনা এই দ্বৈত বাস্তবতাকে সামনে আনে। দারিদ্র্যের মধ্যে উদ্যোগকে দেখতে হবে, কিন্তু উদ্যোগের প্রশংসা করতে গিয়ে অনিরাপদ জীবনযাপনের দায় ভুলে গেলে চলবে না। (তথ্যসূত্র: Kalpana Sharma. 2000. Rediscovering Dharavi: Stories from Asia’s Largest Slum. New Delhi: Penguin Books; Jeb Brugmann. 2009. Urban Revolution. Noida: HarperCollins, মূল পাঠে উদ্ধৃত ভারতীয় সংস্করণ.)

হাজি মস্তানের জীবনেও বন্দরশ্রম থেকে বিপুল অর্থ ও পরিচিতির দিকে যাওয়ার কাহিনি পাওয়া যায়। মূল লেখায় তাঁর জন্ম ১৯২৬ সালে তামিলনাড়ুর পানাইকুলম গ্রামে বলে উল্লেখ আছে। অল্প বয়সে মুম্বইয়ে এসে বন্দরে কুলির কাজ করার পর চোরাচালানের মাধ্যমে তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তাঁকে কখনো অপরাধী নেতা, কখনো অত্যন্ত দক্ষ চোরাকারবারি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই পার্থক্য ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নে যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তাঁর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেআইনি চরিত্র তাতে বদলায় না। তাঁর উত্থানে পণ্যের চাহিদা, আমদানির নিয়ন্ত্রণ এবং সেই নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে লাভ করার সুযোগ ভূমিকা রেখেছিল বলে মূল পাঠে বলা হয়েছে। করিম লালা ও বরদাভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনৈতিক মহলে তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়। শ্রমিক হিসেবে শুরু করা একজন মানুষের এই বিপুল সামাজিক অগ্রগতি জনকল্পনাকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু সেই আকর্ষণকে অনুসরণ করতে গিয়ে আয় কোথা থেকে এল, কার সহযোগিতায় ব্যবসা চলল এবং তার সামাজিক মূল্য কে দিল, এসব প্রশ্ন হারিয়ে ফেললে ইতিহাস কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পে পরিণত হয়।

হাজি মস্তানকে ঘিরে চলচ্চিত্রের স্মৃতি তাঁর পরিচিতিকে আরও স্থায়ী করেছে। ‘দিওয়ার’ ছবির চরিত্র ও তাঁর জীবনের মধ্যে সম্পর্কের কথা বহুল প্রচলিত, আর ২০১০ সালের ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বই’ ছবির প্রসঙ্গও মূল লেখায় এসেছে। তবে কোনো চলচ্চিত্রের চরিত্রকে বাস্তব ব্যক্তির নির্ভুল জীবনী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। চলচ্চিত্র নাটকীয়তার প্রয়োজনে ঘটনাকে সাজায়, চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বাড়ায় বা কমায় এবং সময়ের ব্যবধান সংকুচিত করে। একটি দৃশ্য মনে গেঁথে যায় বলে সেটি ইতিহাসের প্রমাণ হয়ে ওঠে না। মূল পাঠে অভিনেতার সঙ্গে হাজি মস্তানের সম্পর্ক এবং অভিনয়ের জন্য তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার কথাও শোনা বিবরণ হিসেবে রয়েছে। সেগুলিকে সেই সীমা মেনেই পড়তে হবে। অপরাধীর দৃশ্যমান বিলাস, পোশাক, কথাবার্তা ও সামাজিক যোগাযোগ অনেক সময় তাঁর সহিংস অর্থনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে বেশি আলোচিত হয়। এর ফলে দর্শকের কাছে তিনি ভয় এবং আকর্ষণের মিশ্র প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন, অথচ তাঁর কার্যকলাপের শিকার সাধারণ মানুষ পর্দার বাইরে থেকে যান।

জরুরি অবস্থার সময় হাজি মস্তানকে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ ও চোরাচালান প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনের আওতায় গ্রেপ্তারের কথা মূল পাঠে আছে। পরবর্তী সময়ে তিনি দলিত মুসলিম সুরক্ষা মহাসংঘ নামে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে মুম্বইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এই জীবনপর্বগুলি একত্রে দেখলে বোঝা যায়, অপরাধী অর্থনৈতিক প্রভাব এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে কখনো যোগাযোগ তৈরি হয়। সামাজিক সাহায্য কিংবা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ একজন ব্যক্তির পরিচয়ে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে, কিন্তু তাঁর আগের অবৈধ কাজকে তা মুছে দেয় না। অপরাধের ইতিহাসে দানশীলতার বিবরণ তাই সতর্কভাবে পড়তে হয়। কেউ দুঃসময়ে সাহায্য করেছেন, এই অভিজ্ঞতা বাস্তব হতে পারে; আবার তাঁর সম্পদ অর্জনের পদ্ধতি অন্য মানুষের ক্ষতির কারণও হতে পারে। দুটি সত্য পাশাপাশি থাকার সম্ভাবনাকে স্বীকার করলেই ব্যক্তিত্বের জটিলতা বোঝা যায়। একটিকে দিয়ে অন্যটি অস্বীকার করলে বিচার দুর্বল হয়।

করিম লালা, বরদাভাই ও হাজি মস্তানকে ঘিরে যে যুগের কথা বলা হয়, সেখানে স্থানীয় শিকড় ও ব্যক্তিগত পরিচিতির গুরুত্ব ছিল বিশেষ। মূল লেখার ভাষায় তাঁরা নিজেদের সম্প্রদায়ের স্বার্থ দেখতেন, পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতেন। এর বিনিময়ে স্থানীয় আনুগত্য ও আশ্রয় লাভ করতেন। এই সম্পর্কের মধ্যে সুবিধা ও বাধ্যতার সীমারেখা সবসময় স্পষ্ট থাকে না। একজন মানুষ সাহায্য চাইতে পারেন স্বেচ্ছায়, কিন্তু একবার কোনো শক্তিমান ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হলে তাঁর দাবি প্রত্যাখ্যান করা কঠিন হতে পারে। পৃষ্ঠপোষকতা তখন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় রূপ নেয়। অপরাধী নেতৃত্বের স্থানীয় জনপ্রিয়তা বুঝতে হলে এই বিনিময়কে দেখতে হয়, কিন্তু জনপ্রিয়তাকে বৈধতার বিকল্প ধরে নেওয়া চলে না। সমাজের আনুগত্য সবসময় অপরাধের অনুমোদন নয়; অনেক সময় তা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বেঁচে থাকার একটি কৌশল। আর সেই কৌশলের দায় প্রধানত দুর্বল মানুষের ওপর চাপালে ক্ষমতার প্রকৃত উৎস আড়ালে থেকে যায়।

ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে নির্মাণ ও আবাসন ব্যবসা অপরাধী অর্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠার কথা মূল পাঠে বলা হয়েছে। জমির মূল্য বাড়লে তার মালিকানা, দখল, ভাড়া এবং পুনর্বিকাশের প্রশ্নে বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হয়। শহরে বাসস্থানের প্রয়োজন যত তীব্র, জমির ওপর নিয়ন্ত্রণের মূল্যও তত বেশি। কিন্তু জমির কাগজপত্র, বসবাসের ইতিহাস এবং বাস্তব দখলের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে জটিল হতে পারে। এই জটিলতায় ভয় দেখানো কিংবা দ্রুত সমঝোতা করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে অপরাধী মধ্যস্থতাকারী প্রবেশ করেন। মূল লেখায় ইউসুফ প্যাটেলের প্রসঙ্গে নির্মাতাদের জন্য বস্তির ঘর অধিগ্রহণে সহযোগিতা এবং তাঁদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিবরণ আছে। এটিই সংযুক্ত অংশের শেষ ঐতিহাসিক বিবরণ। এখানে দেখা যায়, অপরাধী সংগঠন শুধু ব্যবসার ওপর বাইরের চাপ নয়, কখনো ব্যবসার কোনো ধাপ সম্পন্ন করার অনানুষ্ঠানিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এই সম্ভাবনা শহরের উন্নয়নের ভাষার আড়ালে ক্ষমতার অন্য হিসাবকে প্রকাশ করে।

বস্তির জমিকে নির্মাণের উপযোগী সম্পদ হিসেবে দেখার সময় সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন প্রায়ই দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়। অথচ একটি ঘর শুধু দেয়াল ও ছাদের সমষ্টি নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে কাজের জায়গার দূরত্ব, শিশুদের বিদ্যালয়, প্রতিবেশীর সাহায্য, ঋণ পাওয়ার পরিচিত পথ এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক। বসতি বদলালে এই সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প বাসস্থানের হিসাব থাকলেও মানুষের জীবিকার এই সম্পর্কগুলি সহজে সংখ্যায় ধরা পড়ে না। ভয় দেখিয়ে ঘর ছাড়ানো কিংবা দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে সম্মতি আদায় করা হলে সেই অদৃশ্য ক্ষতি আরও বাড়ে। তাই পুনর্বিকাশের প্রশ্নে জমির বাজারমূল্যের সঙ্গে বসবাসের অধিকার, তথ্য জানার সুযোগ এবং সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের ক্ষমতাও বিবেচনা করতে হয়। অপরাধী মধ্যস্থতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অর্থ কেবল একজন দালালকে সরানো নয়; এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সাধারণ বাসিন্দা নিজের দাবি জানাতে নিরাপদ বোধ করেন এবং তাঁর আপত্তিকে অপরাধী প্রতিরোধ বলে দাগানো না হয়।

পুলিশের ভূমিকা এই ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলির একটি। আইন রক্ষা, অপরাধ তদন্ত ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো পুলিশকর্মীর অসাধু সম্পর্ক তৈরি হলে সেই দায়িত্বের ভিত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল পাঠে সরাসরি বা পরোক্ষ সহযোগিতা, ঘুষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কথা এসেছে। এর অর্থ সব পুলিশকর্মী একইভাবে জড়িত ছিলেন, এমন নয়; প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কাজ করা মানুষের ভূমিকা ও দায় পৃথকভাবে বিচার করতে হয়। তবু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা জরুরি, কারণ একজন অসাধু কর্মকর্তার কাজ তখন কেবল ব্যক্তিগত অনিয়ম থাকে না। তিনি তদন্তের তথ্য, গ্রেপ্তারের ক্ষমতা বা মামলা পরিচালনার সুযোগ অপব্যবহার করতে পারেন। এতে নাগরিকের পক্ষে আইন ও অপরাধের সীমা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধী নেতার কাছে সাহায্য চাওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে, যদি মানুষের মনে হয় যে আনুষ্ঠানিক সুরক্ষার পথে গেলে উল্টো বিপদ ঘটবে। এই আস্থাহীনতা অপরাধী ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রশ্নে জনমতের আবেগ এবং আইনের দায়িত্বকে আলাদা রাখা প্রয়োজন। ভয়াবহ অপরাধের পর দ্রুত প্রতিকার চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার প্রমাণ, নিয়ম ও জবাবদিহির অধীন না থাকলে নির্দোষ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সংযুক্ত অংশে এই বিষয়ে পরবর্তী আলোচনার ঘোষণা আছে, বিস্তারিত ঘটনার বিবরণ নেই। তাই নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার দায় এখানে প্রমাণিত বলে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। সাধারণভাবে বলা যায়, অপরাধী গোষ্ঠী নিজের ভয় দেখানোর ক্ষমতার ওপর দাঁড়ায়; রাষ্ট্র যদি একইভাবে ভয়কে প্রধান ভিত্তি করে তোলে, তবে নাগরিকের কাছে দুটির মধ্যে নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য দুর্বল হয়। পুলিশের কার্যকর কাজের জন্য ক্ষমতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা আসে নিয়ম মেনে ব্যবহার থেকে। অপরাধ দমন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষাকে পরস্পরের বিরোধী কাজ হিসেবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তার ভিত্তি দুর্বল হতে পারে।

বিদ্রোহী কবিতার ইংরেজি অনুবাদ : তথ্য ও বিশ্লেষণ
দেওবন্দ আন্দোলন, বিজ্ঞাপনের জন্য

অপরাধের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক পরিচয় যুক্ত হওয়ার বিপদও গভীর। মূল লেখায় সংগঠিত অপরাধের পরবর্তী রূপান্তরের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের সম্পর্কের প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু সব অপরাধী গোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যের সংগঠন হিসেবে দেখলে বাস্তব পার্থক্য হারিয়ে যায়। চোরাচালান, চাঁদাবাজি, জমি দখল, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাসী হামলার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং সাংগঠনিক কাঠামো এক নয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় তাদের মধ্যে সংযোগ থাকতে পারে, কিন্তু সেই সংযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। ধর্মীয় পরিচয় সেখানে প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। একটি অপরাধের জন্য গোটা সম্প্রদায়কে সন্দেহের আওতায় আনা নাগরিক আস্থা নষ্ট করে এবং প্রকৃত তদন্তকেও বিভ্রান্ত করতে পারে। একইভাবে অপরাধী সংগঠনের আর্থিক স্বার্থকে ধর্মীয় আবেগের আড়ালে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রবণতাও বিপজ্জনক। শহরের ইতিহাস পড়ার সময় এই দুই ধরনের সরলীকরণ এড়িয়ে চলা দরকার।

ধারাবাহিক বিস্ফোরণ এবং বৃহৎ সহিংসতার প্রসঙ্গে মূল লেখক তথ্যের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অপরাধী গোষ্ঠীর সম্পর্ক কতটা, তা প্রমাণ করা কঠিন বলে তিনি জানিয়েছেন। এই সতর্কতা ইতিহাসচর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বড় ঘটনার পর সন্দেহ, গুজব ও সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু দ্রুত ছড়ানো তথ্য সবসময় নির্ভরযোগ্য হয় না। তদন্তের দাবি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই ঘটনার বিবরণ লেখার সময় ভাষায় সেই পার্থক্য বজায় রাখতে হয়। যেখানে কেবল অভিযোগ আছে, সেখানে নিশ্চিত ঘোষণা; যেখানে তথ্য অসম্পূর্ণ, সেখানে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা; আর যেখানে বহু সম্ভাবনা, সেখানে একমাত্র কারণ স্থির করে দেওয়া অনুচিত। এই আলোচনায় নির্দিষ্ট বিস্ফোরণের নতুন তালিকা যোগ করার চেয়ে অপরাধী অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার সম্পর্ক বিচার করার পদ্ধতি স্পষ্ট করা বেশি প্রয়োজন। এতে পাঠক আকর্ষণীয় গল্পের পাশাপাশি প্রমাণের গুরুত্বও উপলব্ধি করেন।

সংযুক্ত লেখাটি বৃহত্তর একটি অধ্যায়ের প্রথম অংশ। সেখানে পরবর্তী পর্যায়ে শিল্পের সঙ্গে অপরাধী সম্পর্ক, পুলিশের ভূমিকা, বিস্ফোরণ এবং অন্যান্য সংগঠনের আলোচনা করার পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। সেই পরিকল্পনাকে ইতিমধ্যে উপস্থাপিত বিস্তারিত গবেষণা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। একইভাবে নারী সহযোগী ও নারী অপরাধী নেতৃত্বের প্রসঙ্গ মূল অংশের শুরুতে উল্লেখ থাকলেও তাঁদের জীবন ও কর্মকাণ্ডের নির্দিষ্ট বিবরণ এই সংযুক্ত পাঠে নেই। কোনো ব্যক্তির অজানা কাহিনি কল্পনা করে যোগ করা তথ্যসমৃদ্ধ রচনা তৈরি করে না। বরং উপলব্ধ তথ্য থেকে যে বৃহত্তর প্রশ্নগুলি উঠে আসে, সেগুলিকে বিস্তারিত করা যায়। অপরাধী ক্ষমতার ঘরোয়া ও স্থানীয় সম্পর্ক, নির্ভরতার সামাজিক মূল্য এবং দৃশ্যমান নেতৃত্বের আড়ালে থাকা শ্রমের প্রশ্ন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের ফাঁককে গল্প দিয়ে পূরণ করার বদলে প্রশ্নের জায়গা হিসেবে রাখা লেখার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায় এবং পাঠককে তথ্যের সীমা সম্পর্কে সচেতন রাখে।

মুম্বইয়ের অপরাধী অর্থনীতিতে ভয় একটি লেনদেনযোগ্য সম্পদের মতো কাজ করতে পারে। ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হয়, বিরোধ মেটানো হয় এবং আনুগত্য নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু সেই ভয় সবসময় প্রকাশ্য হামলার মাধ্যমে তৈরি করতে হয় না। একজন নেতার পরিচিতি, আগের ঘটনার স্মৃতি কিংবা তাঁর যোগাযোগের কথা জানাই অনেক সময় যথেষ্ট। ফলে অপরাধী প্রভাবের দৃশ্যমানতা এবং প্রকৃত ব্যাপ্তি এক নয়। কোনো এলাকায় সহিংসতা কম দেখালেও সেখানে নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক শক্ত থাকতে পারে; আবার প্রতিটি স্থানীয় বিরোধও সংগঠিত অপরাধের প্রমাণ নয়। এই পার্থক্য বুঝতে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, ব্যবসার নিয়ম এবং সাহায্য চাওয়ার পথগুলি পর্যবেক্ষণ করা দরকার। শহরের অপরাধের মানচিত্র তাই কেবল ঘটনার স্থান দেখিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। কোথায় মানুষ অভিযোগ করতে ভয় পান, কোথায় কাউকে টাকা না দিলে কাজ আটকে যায় এবং কোথায় আইনের বদলে ব্যক্তিগত নির্দেশ মানতে হয়, সেসবও নগরের ক্ষমতার মানচিত্রের অংশ।

অপরাধী নেতৃত্বের উদারতার গল্প মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকে। কেউ চিকিৎসার খরচ পেয়েছেন, কেউ ঘর খুঁজে পেয়েছেন, কেউ বিরোধের সময়ে সহায়তা পেয়েছেন। এই অভিজ্ঞতাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিলে স্থানীয় আনুগত্যের কারণ বোঝা যায় না। আবার শুধু এই গল্প শুনে অপরাধী নেতাকে জনকল্যাণের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর ক্ষমতার উৎস এবং অন্য মানুষের ক্ষতি আড়াল হয়। সাহায্যের অধিকার ও সাহায্যের অনুগ্রহের মধ্যে এখানে মৌলিক পার্থক্য আছে। নাগরিক অধিকার পাওয়া যায় ব্যক্তির আনুগত্য ছাড়াই; পৃষ্ঠপোষকের অনুগ্রহ অনেক সময় সম্পর্ক বজায় রাখার শর্তে আসে। শহরের দরিদ্র মানুষের জন্য এই পার্থক্য খুব বাস্তব। আজ সাহায্য পাওয়া গেলেও আগামীকাল সেই সাহায্যের বিনিময়ে কী দাবি আসবে, তা তাঁরা সবসময় জানেন না। তাই অপরাধী দানশীলতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আসলে রাষ্ট্রীয় সেবা ও নাগরিক সুরক্ষার ঘাটতির কথাও বলে। সেই ঘাটতি পূরণ না করে শুধু জনপ্রিয়তার নিন্দা করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না।

নগরের প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে অপরাধের ইতিহাস পড়লে নীতির প্রশ্নও বদলে যায়। তখন লক্ষ্য কেবল অপরাধী নেতার গ্রেপ্তার নয়, অপরাধী নিয়োগের পথ সংকুচিত করা, আবাসনের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং ন্যায়সংগত প্রতিকার সহজ করা। কাজের সুযোগ মানে শুধু যেকোনো কাজ নয়; নিয়মিত মজুরি, দক্ষতা অর্জনের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুটা নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। বাসস্থান মানে শুধু দূরের একটি ঘর নয়; জীবিকা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করার সুযোগও জরুরি। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর পথ এমন হতে হবে, যেখানে দরিদ্রতা, ধর্ম, ভাষা বা ঠিকানা কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্দেহভাজন না করে। এসব পরিবর্তন অপরাধ পুরোপুরি দূর করে দেবে, এমন দাবি করা যায় না। তবে এগুলি ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরতার প্রয়োজন কমাতে পারে। মুম্বইয়ের ইতিহাস যে প্রশ্ন তোলে, তার উত্তর তাই কেবল দমনমূলক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; শহরের অধিকার ও সুযোগের বণ্টনেও তা খুঁজতে হয়।

অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গেও একমাত্রিক ব্যাখ্যা এড়িয়ে চলা দরকার। মূল লেখায় আমদানি ও পণ্যের ওপর বিধিনিষেধকে চোরাচালানের সুযোগ সৃষ্টির একটি কারণ বলা হয়েছে। কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি অথচ বৈধ সরবরাহ সীমিত হলে গোপন বাজারে তার দাম বাড়তে পারে। সেই অতিরিক্ত লাভ অপরাধী ব্যবসায়ীকে ঝুঁকি নিতে উৎসাহ দেয়। তবে এই যুক্তি থেকে সব নিয়ন্ত্রণ অপ্রয়োজনীয় কিংবা সব অপরাধের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিই দায়ী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং বাজারের বাস্তব অবস্থা পৃথকভাবে দেখতে হয়। ঘুষ, প্রশাসনিক প্রশ্রয় ও অসাধু ব্যবসায়িক সহযোগিতা ছাড়া বড় চোরাচালান টিকিয়ে রাখা কঠিন। ফলে অপরাধী ব্যবসার ইতিহাসে রাষ্ট্রের নীতির পাশাপাশি সেই নীতি ভঙ্গ করে লাভবান হওয়া মানুষের ভূমিকাও রয়েছে। নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত অপরাধের দায়কে আলাদা করে বুঝলেই আলোচনার ভারসাম্য বজায় থাকে। এতে গরিব শ্রমিক থেকে ধনী ক্রেতা পর্যন্ত পণ্যের গোপন বাজারে যুক্ত বিভিন্ন অবস্থানের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়।

শহরের অভ্যন্তরে অপরাধী ক্ষমতার বিস্তার বোঝার সময় স্থান ও সময়ের পার্থক্যও জরুরি। একই দশকে একটি এলাকায় কোনো নেতার প্রভাব প্রবল থাকতে পারে, অন্য এলাকায় অন্য গোষ্ঠী সক্রিয় হতে পারে। কোনো ব্যবসায় চাঁদাবাজি বাড়লেও অন্য ব্যবসা তুলনামূলক স্বাধীন থাকতে পারে। জনপ্রিয় বর্ণনায় পুরো শহর একজনের নির্দেশে চলত, এমন ধারণা সহজে তৈরি হয়, কারণ তা গল্পকে সংহত করে। বাস্তবে বড় শহরের অর্থনীতি ও প্রশাসন বহু প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়ায়। অপরাধী নেতা সেই সম্পর্কের কিছু অংশে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন, কিন্তু শহরের প্রতিটি কাজ তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে ধরে নেওয়া অতিরঞ্জন। এই সতর্কতা অপরাধী প্রভাবকে ছোট করে দেখার জন্য নয়। বরং কোন ক্ষেত্রে তা কার্যকর ছিল, কীভাবে কার্যকর হয়েছিল এবং কোথায় তার সীমা ছিল, তা নির্দিষ্ট করে বোঝার জন্য। নির্দিষ্টতার অভাব ইতিহাসকে নাটকীয় করে, কিন্তু প্রতিকারের পথ খুঁজতে সাহায্য করে না।

নাম ও খ্যাতির বাইরেও অপরাধী সংগঠনের টিকে থাকার জন্য প্রতিদিনের বহু ছোট কাজ প্রয়োজন। খবর সংগ্রহ, যোগাযোগ রক্ষা, অর্থ পৌঁছে দেওয়া কিংবা স্থানীয় গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মতো কাজ দৃশ্যমান নেতৃত্বের আড়ালে থাকে। কোনো সংগঠন সম্পর্কে আলোচনা যদি শুধু তার প্রধান ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হয়, তবে এই দৈনন্দিন কাঠামো অনালোচিত থেকে যায়। আবার সেই কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত সব মানুষকে একই অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করাও ঠিক নয়। কেউ বাধ্য হয়েছেন, কেউ লাভের আশায় যুক্ত হয়েছেন, কেউ হয়তো সম্পর্কের প্রকৃতি সম্পূর্ণ বোঝেননি। দায় নির্ধারণের জন্য ব্যক্তির কাজ, উদ্দেশ্য ও প্রমাণের পার্থক্য বিচার করতে হয়। সামাজিক গবেষণার কাজ এই বিভিন্ন অবস্থান বুঝতে সাহায্য করা; বিচারব্যবস্থার কাজ নির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা স্থির করা। দুটি কাজ পরস্পরের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু একটির সিদ্ধান্ত অন্যটির বিকল্প নয়। এই সীমা বজায় রাখলে অপরাধের সামাজিক ব্যাখ্যা এবং ব্যক্তিগত দায় উভয়ই যথাযথ গুরুত্ব পায়।

একই কারণে শহরের স্মৃতিকে মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। বহু বছর পরে কোনো প্রবীণ বাসিন্দা অতীতের অপরাধী নেতাকে বর্তমানের তুলনায় কম নিষ্ঠুর বলে মনে করতে পারেন। তাঁর স্মৃতিতে সাহায্যের ঘটনা স্পষ্ট থাকে, অন্য কারও ওপর হওয়া অত্যাচার হয়তো থাকে না। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের স্মৃতিতে সেই নেতার নাম ভয় ও অপমানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এই বিপরীত অভিজ্ঞতার কোনোটিকে সরাসরি বাতিল করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়। অতীতের প্রতি মমতা কখনো পুরোনো ক্ষমতাকে কোমল করে দেখায়, বর্তমানের উদ্বেগ কখনো পুরোনো সহিংসতাকে অতিরিক্ত বড় করে তোলে। তাই সাক্ষাৎকারের ভাষা, বক্তার অবস্থান এবং ঘটনার সময়ের ব্যবধান বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। স্মৃতি শুধু তথ্য দেয় না, মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে অর্থ দেন, তাও জানায়। নগরের ইতিহাসে এই অর্থ নির্মাণের প্রক্রিয়া বুঝতে পারলে অপরাধী নেতার জনপ্রিয়তা এবং নাগরিকের অসহায়তার মধ্যে সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অপরাধী ক্ষমতার আকর্ষণ বুঝতে তাই মানুষের কৃতজ্ঞতা, ভয়, ক্ষোভ এবং প্রতিদিনের প্রয়োজনকে একসঙ্গে দেখতে হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলির মধ্যে যে টানাপোড়েন রয়েছে, তাকে স্বীকার করলেই শহরের ইতিহাস কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির গল্প ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

এই আলোচনার কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত কয়েকজন “dons” নন, শহরের অগণিত সাধারণ মানুষ। তাঁদের শ্রমে বন্দর সচল হয়েছে, কারখানা চলেছে, চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে, ঘর উঠেছে এবং প্রতিদিনের নগরজীবন সম্ভব হয়েছে। তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা যখন অনিশ্চিত থাকে, তখন শহরের বাহ্যিক সমৃদ্ধি নিজের ভেতরেই দুর্বল ভিত্তি বহন করে। করিম লালা, বরদাভাই, হাজি মস্তান কিংবা ইউসুফ প্যাটেলের জীবন সেই দুর্বলতার বিভিন্ন দিক প্রকাশ করে, কিন্তু তাঁদের কাহিনিই মুম্বইয়ের সম্পূর্ণ ইতিহাস নয়। অপরাধের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন কিছু মানুষ, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন অন্যরা, আর বিপুল সংখ্যক অধিবাসী দুইয়ের মধ্যবর্তী চাপের মধ্যে নিজেদের জীবন সামলেছেন। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে দেখলেই শহরটি পরিচিত কিংবদন্তির বাইরে স্পষ্ট হয়। মুম্বইয়ের স্বপ্নকে অর্থবহ করার প্রশ্ন আসলে তার সম্পদ কত উঁচুতে পৌঁছাল, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি তার সাধারণ মানুষ কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুযোগ পেলেন, সেই প্রশ্নও। শহরের উজ্জ্বলতা তখনই গভীর হয়, যখন সেই উজ্জ্বলতার নিচে বসবাসকারী মানুষের জীবনও আলো পায়।

সত্তরের দশকের গোড়ায় মুম্বইয়ের অপরাধজগতের পুরোনো ভারসাম্য বদলাতে শুরু করে। চোরাচালান, অবৈধ মদের ব্যবসা ও জুয়ার আড্ডাকে ঘিরে যে প্রভাবশালী নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল, তার পাশাপাশি এমন কিছু তরুণ অপরাধীর উত্থান ঘটে, যাঁরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে আরও আক্রমণাত্মক পথ বেছে নেন। তাঁদের কাছে স্থানীয় প্রভাব যথেষ্ট ছিল না; প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দেওয়া, বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করা এবং শহরের লাভজনক ব্যবসায় প্রবেশ করাই হয়ে ওঠে ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে পরিচিত নাম দাউদ ইব্রাহিম। তাঁর জীবনকে শুধু একজন অপরাধীর উত্থানের কাহিনি হিসেবে দেখলে মুম্বইয়ের বৃহত্তর রূপান্তর চোখ এড়িয়ে যায়। শহরের দ্রুত বেড়ে ওঠা সম্পদ, অনিশ্চিত শ্রমজীবন, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং পণ্যের গোপন বাজারের মধ্যে তাঁর সংগঠন নিজের জায়গা তৈরি করে। আবদুল শাবানের গবেষণায় এই উত্থানকে অপরাধী গোষ্ঠী, ব্যবসা, পুলিশ ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে বিচার করা হয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করলে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নগরের ক্ষমতার কাঠামোর যোগসূত্রও স্পষ্ট হয়। 

১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া দাউদের পরিবার কোঙ্কণ উপকূলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তাঁর বাবা মুম্বই পুলিশের একজন কনস্টেবল ছিলেন, যাঁর কাজের সূত্রে অপরাধ তদন্তের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ পরিবারের পরিচিত পরিসরের বাইরে ছিল না। এই পারিবারিক পরিচয় অপরাধী জীবনের ব্যাখ্যা নয়, কিন্তু দাউদের কাহিনিকে একটি তীব্র বৈপরীত্য দেয়। যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা, সেই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মীর সন্তানই পরে পুলিশের অন্যতম বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত হন। ছোটবেলায় বা কৈশোরে মানুষের সামনে থাকা সম্ভাবনা এবং পরবর্তী জীবনে তার সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনো সরল অনিবার্যতা নেই। দাউদের ক্ষেত্রেও তাঁর বাবার পেশা দিয়ে তাঁর অপরাধের দায় ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং দেখতে হয়, তিনি কোন যোগাযোগের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন, অর্থ ও প্রভাব অর্জনের জন্য কী পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং সেই পথকে সংগঠিত করার ক্ষমতা কীভাবে অর্জন করেছিলেন। তাঁর পারিবারিক পরিচয় এই ইতিহাসের একটি অংশ, সম্পূর্ণ কারণ নয়।

দাউদের অপরাধী জীবনের গোড়ার কাজ বোঝাতে স্থানীয় বাম্বাইয়া কথ্য ভাষার “ultapalti” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ক্রফোর্ড মার্কেটে “imported” ঘড়ি বিক্রির সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত ছিল; এখানে আমদানিকৃত পণ্যের আকর্ষণের আড়ালে চোরাচালানের বাজারের কথা বলা হচ্ছে। সেই বাজারে পণ্যের বিদেশি পরিচয় ক্রেতার কাছে মর্যাদা ও মানের প্রতিশ্রুতি বহন করত। বৈধ সরবরাহের সীমা এবং ক্রেতার চাহিদার ব্যবধান গোপন ব্যবসার জন্য লাভের জায়গা তৈরি করতে পারত। তবে একটি ঘড়ির দোকান থেকে বড় অপরাধী সংগঠনের পথে যাত্রা কেবল পণ্য বিক্রির দক্ষতা দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন ছিল সরবরাহকারীর সঙ্গে সম্পর্ক, পুলিশি নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা, স্থানীয় সুরক্ষা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সমঝোতা বা সংঘাত সামলানোর ক্ষমতা। দাউদের প্রাথমিক ব্যবসার বিবরণ তাই শহরের বৃহত্তর অবৈধ অর্থনীতির একটি ছোট প্রবেশদ্বার। এখান থেকেই তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যোগাযোগ এবং সংঘবদ্ধ কাজের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রবণতা বুঝতে সুবিধা হয়।

সত্তরের দশকের রাজনৈতিক সময়পর্বে দাউদের ইয়ং পার্টি নামে একটি স্থানীয় সংগঠন গড়ে তোলার কথাও শাবানের আলোচনায় রয়েছে। এই সংগঠনের কয়েকজন সদস্য, বিশেষত কিছু পাঠান সহযোগী, চোরাচালান ও সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত ছিলেন বলে সেখানে বলা হয়েছে। স্থানীয় সংগঠনের নাম থাকলেই তাকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল কিংবা নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অপরাধী পরিসরে নাম, পরিচিতি এবং দলবদ্ধ উপস্থিতি অনেক সময় সামাজিক প্রভাব তৈরির উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। একসঙ্গে থাকা তরুণেরা পরস্পরের জন্য যোগাযোগ, আশ্রয় ও শক্তির জোগান দেন। কিন্তু স্বার্থের মিল চিরস্থায়ী আনুগত্যের নিশ্চয়তা নয়। দাউদের সঙ্গে পাঠান সহযোগীদের একাংশের বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে নতুন মিত্র খোঁজার প্রয়োজন তৈরি করে। এই ভাঙন থেকেই বোঝা যায়, সংগঠিত অপরাধের সম্পর্ককে ধর্মীয় বা আঞ্চলিক পরিচয়ের স্থায়ী বন্ধন হিসেবে দেখা যায় না। অর্থের ভাগ, নেতৃত্বের অধিকার এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব বদলালে পুরোনো সম্পর্কও বদলে যেতে পারে।

দাউদ নিজের সংগঠন শক্ত করতে মুম্বইয়ের অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। অরুণ গাওলি, অমর নায়েক, অশ্বিন নায়েক এবং রাজন নায়ার, যিনি বড়া রাজন নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁদের গোষ্ঠীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতার কথা পাওয়া যায়। এই সহযোগিতা সবসময় এক ধরনের সম্পর্ক ছিল, এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়। কারও সঙ্গে যৌথ ব্যবসা, কারও সঙ্গে স্থানীয় সমঝোতা, কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা পারস্পরিক প্রয়োজনের সম্পর্ক থাকতে পারে। চোরাচালান, সুরক্ষার নামে অর্থ আদায় এবং বিরোধ নিষ্পত্তির মতো কাজে ছোট গোষ্ঠীকে যুক্ত করার ফলে বড় নেতৃত্বের নাগাল বাড়ে। শহরের প্রতিটি এলাকায় সরাসরি উপস্থিত না থেকেও সে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে ছোট গোষ্ঠী বড় সংগঠনের নাম ও আশ্রয় থেকে সুবিধা পায়। এই বিনিময়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ বিরোধের বীজও থাকে, কারণ যে স্থানীয় নেতা নিজের লোক ও আয় ধরে রাখেন, তিনি কখনো স্বাধীনভাবে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করতে পারেন।

এই বিস্তৃত যোগাযোগের সমষ্টিই পরে ডি কোম্পানি বা ডি গ্যাং নামে পরিচিত হয়। কোম্পানি শব্দটি এখানে আইনসম্মত কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নয়; অপরাধী সংগঠনের পরিসর ও কাজের বহুমুখিতা বোঝানোর একটি প্রচলিত নাম। সংগঠনটির ক্ষমতা শুধু প্রধান ব্যক্তির নির্দেশে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থ সংগ্রহ, তথ্য পাওয়া, স্থানীয় বিরোধ সামলানো এবং বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার জন্য বহু স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন হতো। বড় সংগঠন যত বিস্তৃত হয়, তার মধ্যে দায়িত্ব ভাগ এবং স্থানীয় সিদ্ধান্তের পরিসরও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই কাঠামো একদিকে তাকে স্থায়িত্ব দেয়, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। কোনো প্রভাবশালী সহযোগী নিজের আয় ও যোগাযোগ গড়ে তুললে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর তাঁর নির্ভরতা কমতে পারে। ডি কোম্পানির ইতিহাসে উত্থান ও ভাঙনকে পাশাপাশি দেখতে হয়, কারণ যে সম্পর্ক তাকে শক্ত করেছিল, সেই সম্পর্কের পরিবর্তনই পরে প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের জন্ম দেয়।

রাজন সদাশিব নিকালজে, অর্থাৎ ছোট রাজনের যোগদান দাউদের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে বলে শাবান উল্লেখ করেছেন। চলচ্চিত্রের টিকিটের কালোবাজারির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর প্রাথমিক পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। এই ব্যবসা দেখতে ক্ষুদ্র হলেও তার জন্য স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ, দলবদ্ধ উপস্থিতি এবং নিয়ম ভেঙে বাজারে প্রবেশের সামর্থ্য প্রয়োজন ছিল। ছবির জনপ্রিয়তা বাড়লে টিকিটের চাহিদা বেড়ে যায়; সেই চাহিদাকে ব্যবহার করে অতিরিক্ত দাম আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে প্রতিবাদ দমন কিংবা পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনাও থাকে। ছোট রাজনের উত্থানে এই স্থানীয় অভিজ্ঞতার গুরুত্ব ছিল। বড়া রাজনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং পরে দাউদের সঙ্গে যোগদান দেখায়, অপরাধী নেতৃত্ব অনেক সময় আগে থেকে থাকা সংগঠনের মধ্যেই দক্ষতা ও পরিচিতি অর্জন করে। পরে নিজের ক্ষমতা বাড়লে সে নেতৃত্বের অন্য স্তরে উঠে যায়। এই প্রক্রিয়াকে ব্যক্তিগত সাহসের গল্পে সীমাবদ্ধ করলে স্থানীয় অপরাধী কাঠামোর ভূমিকা আড়ালে থাকে।

বড়া রাজনের হত্যাকাণ্ড এবং আবদুল কুঞ্জুর সঙ্গে বিরোধ এই সময়ের সংঘাতকে তীব্র করে। ১৯৮৩ সালে বড়া রাজন নিহত হন; তাঁর একসময়ের সহযোগী আবদুল কুঞ্জুর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগের কথা শাবানের বিবরণে রয়েছে। ১৯৮৫ সালে কুঞ্জু নিহত হওয়ার ঘটনায় ছোট রাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাগুলি থেকে অপরাধী আনুগত্যের অস্থিরতা বোঝা যায়। একই সংগঠনের ভেতরে একসময় কাজ করা মানুষও পরবর্তী সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন। তবে কোনো হত্যাকাণ্ডে কার ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে সংবাদবিবরণ, স্থানীয় বিশ্বাস এবং আদালতে প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে এক করে লেখা যায় না। অপরাধী গোষ্ঠীর ইতিহাসে প্রতিশোধের ভাষা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কারণ তা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে একটি ধারাবাহিক কাহিনিতে বাঁধে। কিন্তু বাস্তব ঘটনার উদ্দেশ্য সবসময় একটি নয়। ব্যক্তিগত শত্রুতা, অর্থের ভাগ, এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই ঘটনাগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার করতে হলেও দায়ের ভাষা সতর্ক রাখতে হয়।

দাউদের বড় ভাই শাবিরের হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। শাবির ১৯৮১ সালে নিহত হন; ঘটনাটিকে ১৯৮৫ সালের কাছাকাছি ঘটনার সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে পরবর্তী সংঘাতের সময়ক্রম অস্পষ্ট হয়। পাঠান গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই হত্যার অভিযোগের পর দাউদের প্রতিশোধমূলক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যু অপরাধী নেতৃত্বের কাছে ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি কর্তৃত্বের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বীকে পাল্টা আঘাত করতে না পারলে নিজের সহযোগীদের চোখে নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ একটি ব্যক্তিগত আবেগ থেকে সংগঠনের কৌশলে পরিণত হয়। কিন্তু তার মূল্য দেয় কেবল সরাসরি প্রতিপক্ষ নয়। আশপাশের মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন পরিবারও আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বহন করেন। অপরাধী সংঘর্ষের কাহিনিতে এই সাধারণ মানুষের অবস্থান প্রায়ই অনুল্লেখিত থেকে যায়। (তথ্যসূত্র: Nishant Sarvankar. 2026. Karim Lala Dawood Ibrahim: Goshta Mumbaichya Underworldchi: Karim Lalane Jyala Bedam Marle, Tya Dawoodne Mumbai Kashi Kabij Keli? Bhag 4. Loksatta, 7 September; Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017.)

দাউদের দুবাইয়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও মুম্বইয়ের অপরাধী ক্ষমতার নতুন পর্যায় নির্দেশ করে। তাঁর দেশত্যাগের সাল নিয়ে বিভিন্ন বিবরণে অসংগতি আছে; একাধিক ঐতিহাসিক বর্ণনায় আশির দশকের মাঝামাঝি, বিশেষত ১৯৮৬ সালের উল্লেখ পাওয়া যায়। সাল নির্ধারণে মতভেদ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, শহর ছেড়ে যাওয়ার পরও তাঁর সংগঠন কার্যকর ছিল। স্থানীয় সহযোগী, পারিবারিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্পর্ক তাঁকে দূর থেকে নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। নাগপাড়ার তেমকার মহল্লায় তাঁর ভাই আনিস ও নুরার কার্যকলাপের প্রসঙ্গ শাবান উল্লেখ করেছেন। এতে অপরাধী সংগঠনের একটি পরিবর্তিত চরিত্র দেখা যায়। নেতা আর প্রতিদিন শহরের রাস্তায় উপস্থিত না থাকলেও তাঁর নাম, নির্দেশ এবং আর্থিক সম্পর্ক স্থানীয় কাজকে প্রভাবিত করতে পারে। অপরাধী ক্ষমতার ভৌগোলিক কেন্দ্র তখন এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। স্থানীয় ভিত্তির সঙ্গে বিদেশে অবস্থান মিলিয়ে একটি বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়। (তথ্যসূত্র: S. Hussain Zaidi. 2012. Dongri to Dubai: Six Decades of the Mumbai Mafia. New Delhi: Roli Books; শাবান, ২০১৭.)

বিদেশে অবস্থান মানেই স্থানীয় সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং সংগঠনের প্রধান ব্যক্তি সরাসরি গ্রেপ্তারের ঝুঁকি কমাতে পারলে স্থানীয় সহযোগীদের ওপর দায়িত্ব বাড়তে পারে। এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিটি লেনদেন প্রধানের চোখের সামনে ঘটে না। অর্থের হিসাব, লোকের আনুগত্য এবং বিরোধের খবর মধ্যস্থ ব্যক্তিদের মাধ্যমে পৌঁছায়। ফলে তথ্য গোপন করা কিংবা নিজের স্বার্থকে সংগঠনের স্বার্থ বলে দেখানোর সুযোগও থাকে। দূর থেকে পরিচালিত অপরাধী সংগঠন শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু তার শক্তির ভেতরেই দুর্বলতা থাকে। কোনো স্থানীয় সহযোগী নিজস্ব দল গড়ে তুললে কেন্দ্রীয় নির্দেশ অমান্য করার সম্ভাবনা বাড়ে। আবার নেতৃত্ব যদি শুধু ভয় দিয়ে সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, তবে সাময়িক আনুগত্য পাওয়া গেলেও দীর্ঘস্থায়ী আস্থা তৈরি হয় না। ডি কোম্পানির বিস্তার এবং পরবর্তী বিচ্ছেদ এই দিক থেকে বোঝার চেষ্টা করলে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের পেছনে সাংগঠনিক কারণগুলিও সামনে আসে।

বিদ্রোহী কবিতার ইংরেজি অনুবাদ : তথ্য ও বিশ্লেষণ
বিজ্ঞাপনের জন্য

আশির দশকের শেষভাগে দাউদের প্রভাব অত্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল বলে গবেষণায় বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং বিভিন্ন ছোট সংগঠনের সমর্থন তাঁকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। কিন্তু পুরো শহর তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল, এমন বাক্যকে আক্ষরিকভাবে পড়লে মুম্বইয়ের বহুমাত্রিক বাস্তবতা সংকুচিত হয়। ব্যাংক, শিল্প, পরিবহন, প্রশাসন এবং অসংখ্য দৈনন্দিন ব্যবসা বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে চলত। অপরাধী প্রভাব সেই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু তা শহরের প্রতিটি কাজের ওপর সর্বময় কর্তৃত্বের সমান নয়। প্রভাবের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন: কোথায় চাঁদা আদায় হতো, কোন ব্যবসায় অনানুষ্ঠানিক অর্থ ঢুকত এবং কোন বিরোধে অপরাধী মধ্যস্থতা কার্যকর ছিল। এই নির্দিষ্টতা অপরাধী ক্ষমতাকে ছোট করে না। বরং তার প্রকৃত কার্যপদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করে এবং কিংবদন্তির বদলে পর্যালোচনাযোগ্য ইতিহাস তৈরি করে।

ডি কোম্পানির প্রথম পর্যায়ের সম্পর্ক ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করেছিল। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সহযোগী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষ অবৈধ ব্যবসায় একসঙ্গে কাজ করেছেন বলে শাবান লিখেছেন। এই সহযোগিতাকে সামাজিক সম্প্রীতির আদর্শ হিসেবে দেখা চলে না, কারণ তার ভিত্তি ছিল অপরাধী স্বার্থ। তবু এটি দেখায়, অপরাধী অর্থনীতি সবসময় প্রকাশ্য রাজনীতির পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন অনুসরণ করে না। অর্থ, যোগাযোগ ও কাজের প্রয়োজন কখনো ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে একত্র করে। আবার এই স্বার্থের ঐক্য বাইরের রাজনৈতিক অভিঘাতে ভেঙেও যেতে পারে। ধর্মীয় পরিচয় তখন পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নতুন অর্থ আরোপ করে। একই সহযোগীকে আগে বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে দেখা হলেও পরে তাঁকে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা শুরু হতে পারে। মুম্বইয়ের নব্বইয়ের দশকের ইতিহাসে এই পরিবর্তন অপরাধী সংগঠনের ভেতরের সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মুম্বইয়ের সামাজিক জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। মানুষের মৃত্যু, সম্পত্তির ধ্বংস এবং প্রতিবেশীর প্রতি আস্থার ভাঙন শুধু ঘটনার সময়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী সময়ে বাসস্থান, চলাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগের সিদ্ধান্তেও নিরাপত্তার উদ্বেগ কাজ করেছে। এই আবহে ১৯৯৩ সালের ধারাবাহিক বিস্ফোরণ শহরের অভিজ্ঞতাকে আরও বিপর্যস্ত করে। দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও বিপুল ধ্বংসের কথা শাবানের বিবরণে রয়েছে। বিস্ফোরণের পরিকল্পনায় দাউদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তাঁর সংগঠনকে সাধারণ অপরাধী ব্যবসার আলোচনার বাইরে সন্ত্রাসের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে। এই সংযোগ বিচার করতে হলে দাঙ্গা, প্রতিশোধের দাবি এবং নিরীহ মানুষের ওপর হামলার মধ্যে নৈতিক পার্থক্য বজায় রাখতে হয়। কোনো জনগোষ্ঠীর ক্ষতিকে অজুহাত করে অন্য নিরীহ মানুষের হত্যা ন্যায়সংগত হয় না। ইতিহাসের কারণ বোঝার চেষ্টা অপরাধের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে না। (তথ্যসূত্র: S. Hussain Zaidi. 2002. Black Friday: The True Story of the Bombay Bomb Blasts. New Delhi: Penguin Books; শাবান, ২০১৭.)

বিস্ফোরণের পরে ছোট রাজন ও দাউদের বিচ্ছেদ অপরাধজগতের পরিচিত মানচিত্র বদলে দেয়। ছোট রাজন দাউদকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে কাজ করার অভিযোগে ছেড়ে যান, এমন ব্যাখ্যা প্রচলিত হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং নিরাপত্তার হিসাবও এই বিচ্ছেদের সম্ভাব্য পটভূমি। একটি বড় সংগঠন ভাঙলে তার সহযোগীদের সিদ্ধান্ত শুধু আদর্শের ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাঁদের আয়ের ক্ষেত্র, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ অবস্থানও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ছোট রাজনকে হিন্দুদের প্রতিশোধের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা তাঁর অপরাধী পরিচয়কে রাজনৈতিক অর্থ দেয়। এই ধরনের প্রতীক নির্মাণে অপরাধী নেতা নিজেও লাভবান হতে পারেন, কারণ ব্যক্তিগত সংঘাত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু কোনো অপরাধী নেতাকে ধর্মীয় রক্ষক হিসেবে গ্রহণ করলে তাঁর চাঁদাবাজি, হত্যার অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আড়াল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিচয়ের ভাষা তখন অপরাধী ক্ষমতার জন্য সামাজিক ঢাল তৈরি করে।

দাউদ ও ছোট রাজনের বিচ্ছেদ আসলে সাজানো ছিল, এমন সন্দেহও কিছু বিবরণে পাওয়া যায়। এই ধারণা অপরাধজগতের গোপনীয়তা থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু স্বাধীন প্রমাণ ছাড়া তা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। একটি সংগঠনের প্রকাশ্য শত্রুতা, পারস্পরিক হামলা এবং পৃথক ব্যবসার সম্পর্ক একসঙ্গে যাচাই করতে হয়। শুধু দুই পক্ষই অপরাধী, এই যুক্তি দিয়ে তাদের সব বিরোধকে নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার প্রকাশ্য বিরোধ থাকলেই গোপন কোনো যোগাযোগ কখনো ছিল না, এমন দাবি করাও কঠিন। তথ্যের এই সীমা স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, যথাযথ ইতিহাসচর্চার অংশ। অপরাধী সংগঠন সম্পর্কে মানুষ যে কাহিনি শুনতে চান, তার সঙ্গে প্রমাণসমর্থিত ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকতে পারে। বিশেষত গোপন সমঝোতার গল্প সব বিরোধকে সহজে ব্যাখ্যা করে বলে আকর্ষণীয় হয়, কিন্তু সেই সহজ ব্যাখ্যা বাস্তব সম্পর্কের পরিবর্তন ও বহুমুখিতা আড়াল করতে পারে।

দাউদের সংগঠনের ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে মুম্বইয়ের বাইরের কয়েকটি রাজ্য এবং নেপাল, পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগের কথা শাবানের গবেষণায় এসেছে। এসব স্থানের উল্লেখ থেকে প্রত্যেক জায়গায় একই ধরনের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কোথাও অর্থনৈতিক যোগাযোগ, কোথাও আশ্রয়, কোথাও স্থানীয় সহযোগী এবং কোথাও পণ্য বা অর্থের চলাচলের সম্পর্ক থাকতে পারে। সংগঠিত অপরাধের বিস্তার বিচার করতে হলে এই ভিন্ন ভূমিকা বোঝা প্রয়োজন। মুম্বইয়ে নাগপাড়া সংগঠনটির স্থানীয় ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি পাড়ায় আত্মীয়তা, পুরোনো পরিচিতি এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক অপরাধী সংগঠনের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে। তবে সেই পাড়ার সাধারণ মানুষকে সংগঠনের অংশ বলে ধরে নেওয়া গুরুতর অন্যায়। একই এলাকায় বসবাস করা আর একই অপরাধে সহযোগিতা করা পৃথক বিষয়। নগরের ঠিকানাকে অপরাধের প্রমাণে পরিণত করলে প্রকৃত দায় নির্ধারণের কাজই দুর্বল হয়। (তথ্যসূত্র: A. Sharma and H. Mateen. 2007. Violence Once Ruled in at Nagpada. The Times of India, Mumbai, 24 May; Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017.)

ডি কোম্পানির ব্যবসার তালিকায় চোরাচালানের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, আবাসন এবং চলচ্চিত্রে বেআইনি অর্থের জোগানের প্রসঙ্গ রয়েছে। এই পরিবর্তনে অপরাধী অর্থনীতি বৈধ ব্যবসার আরও কাছে আসে। চোরাচালানের পণ্য গোপনে চলাচল করে, কিন্তু জমি কেনা, ভবন নির্মাণ বা চলচ্চিত্র তৈরি প্রকাশ্য অর্থনৈতিক কাজ। সেই কাজের অর্থায়ন বা নিরাপত্তার কোনো স্তরে অপরাধী সংগঠন প্রবেশ করলে বৈধ ও অবৈধ অর্থের সম্পর্ক জটিল হয়। একজন নির্মাতা হয়তো হুমকির শিকার, অন্য কেউ অপরাধী শক্তিকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করছেন; তাঁদের অবস্থান এক নয়। একইভাবে চলচ্চিত্রে কাজ করা সব মানুষ অর্থের উৎস জানেন বা নিয়ন্ত্রণ করেন, এমন ধারণা ভুল। অপরাধী প্রভাবের বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠান, অর্থদাতা, মধ্যস্থতাকারী এবং সাধারণ কর্মীর ভূমিকা পৃথক করতে হয়। এই পার্থক্য ছাড়া পুরো শিল্পক্ষেত্রকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা হয়, অথচ প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়া ব্যক্তির দায় অস্পষ্ট থেকে যায়।

ডি কোম্পানির সঙ্গে ছোট শাকিল এবং আবু সালেমের নামও আলোচনায় আসে। কিন্তু অপরাধী সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলায়; একটি সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে সব পরবর্তী সময়ের একই অবস্থানে দেখানো চলে না। আবু সালেমের ভারতীয় বিচারব্যবস্থার আওতায় ফিরে আসা এই ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পর্তুগাল থেকে তাঁর প্রত্যর্পণের মাধ্যমে বোঝা যায়, বিদেশে আশ্রয় পাওয়া মানেই চিরস্থায়ীভাবে বিচার এড়িয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। দেশান্তরিত অভিযুক্তকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং প্রত্যর্পণের শর্ত ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়া পুলিশের স্থানীয় অভিযানের চেয়ে ভিন্ন ধরনের কাজ। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধী যোগাযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় তথ্যের পাশাপাশি আইনি ও কূটনৈতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন হয়। আবু সালেমের ঘটনাকে ডি কোম্পানির ইতিহাসের মধ্যে রাখলে সংগঠনের সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার এই পরিবর্তিত পরিসর স্পষ্ট হয়।

ডি কোম্পানির বিরুদ্ধে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির হত্যার অভিযোগও শাবানের বিবরণে আছে। প্রেমকুমার শর্মা, রামদাস নায়েক, সেলিম বদগুজর, ভরত মাত্রে এবং জিতেন্দ্র দাভোলকরের মতো ব্যক্তিদের হত্যার সঙ্গে সংগঠনটির নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে। এই তালিকা অপরাধী সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু প্রতিটি ঘটনাকে এক উদ্দেশ্যের অংশ বলে ধরে নেওয়া যায় না। কোনো ঘটনায় দলীয় সম্পর্ক, কোনো ঘটনায় স্থানীয় বিরোধ, আবার কোনো ঘটনায় অর্থনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অপরাধী গোষ্ঠীর নামে প্রচলিত দাবি এবং নির্দিষ্ট মামলার বিচারিক ফল পৃথকভাবে দেখতে হয়। দাঙ্গা ও বিস্ফোরণের পরে রাজনৈতিক পরিচয়ের অর্থ বদলে গেলেও তার আগের সম্পর্কগুলি স্মরণযোগ্য। একসময় যে নেতা বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতা ছিল, পরে তার সঙ্গে বিরোধ হতে পারে। তাই রাজনীতি ও অপরাধের সম্পর্ককে স্থায়ী মিত্রতা কিংবা স্থায়ী শত্রুতার সরল রেখায় আঁকা কঠিন। (তথ্যসূত্র: P. Sharma. 2010. The Dark Face of Mumbai. Countercurrents, 25 October; Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017.)

ছোট রাজনের সংগঠন ডি কোম্পানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিতি পায়। মুম্বইয়ের পূর্ব উপনগর, বিশেষত চেম্বুরের সঙ্গে তার স্থানীয় সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্য জায়গায় যোগাযোগের প্রসঙ্গও এসেছে। এই সংগঠনের ব্যবসার মধ্যে চাঁদাবাজি, আবাসন এবং সুরক্ষার নামে অর্থ আদায় ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। এখানেও স্থানীয় ভিত্তি এবং আন্তর্জাতিক চলাচল পাশাপাশি কাজ করেছে। বিদেশে নেতা বা সহযোগীর অবস্থান স্থানীয় সংগঠনকে অদৃশ্য করে দেয় না; বরং মুম্বইয়ের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য স্থানীয় উপস্থিতি অপরিহার্য থাকে। ফলে অপরাধী ক্ষমতার একটি অংশ দূরে, অন্য অংশ খুব কাছেই অবস্থান করে। সাধারণ নাগরিকের কাছে দূরের নেতৃত্বের নাম ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তাঁর ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করেন স্থানীয় লোকেরা। এই স্তরভেদ অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশের বাবলু শ্রীবাস্তব গোষ্ঠীর সঙ্গে ছোট রাজনের যোগাযোগ এবং নেপালে সংঘটিত কয়েকটি হত্যার অভিযোগ শাবান উল্লেখ করেছেন। নেপালের সংসদ সদস্য মির্জা দিলশাদ বেগের ১৯৯৮ সালের হত্যাকাণ্ড সেই আলোচনার একটি অংশ। সেলিম কুরলা, মহম্মদ জিন্দ্রান ও মজিদ খানের হত্যার সঙ্গে ছোট রাজনের গোষ্ঠীর নামও যুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনাকে ১৯৯৩ সালের বিস্ফোরণের প্রতিশোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ছিল। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচার ছাড়াই হত্যা করা কোনো জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার নয়। অপরাধী গোষ্ঠী যখন প্রতিশোধের দায়িত্ব নিজের হাতে নেয়, তখন অভিযোগের সত্যতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং দায় নির্ধারণের নিয়ম সবই অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ভয় ও ব্যক্তিগত নির্দেশের ওপর দাঁড়ায়। ধর্মীয় বা জাতীয় আবেগ দিয়ে তাকে গ্রহণযোগ্য করা হলে অপরাধী সংগঠন নিজের ক্ষমতা বাড়ায়, অথচ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বাড়ে না।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংককে ছোট রাজনের ওপর হামলার ঘটনা দুই সংগঠনের সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে দৃশ্যমান করে। ছোট শাকিলের সহযোগীদের বিরুদ্ধে সেই হামলার অভিযোগ ওঠে। রাজন প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু তাঁর নিরাপত্তা এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একটি গোষ্ঠীর প্রধান ব্যক্তির ওপর হামলা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি ঘটায় না; সহযোগীদের আস্থাও নড়বড়ে করতে পারে। নেতা নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন কি না, তাঁর নির্দেশ কার্যকর থাকবে কি না এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর চাপ বাড়বে কি না, এসব প্রশ্ন সংগঠনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। গুরু সাটাম, বান্টি পাণ্ডে ও এজাজ লাকড়াওয়ালার মতো সহযোগীদের পৃথক হয়ে নিজস্ব গোষ্ঠী গড়ার কথা এই বৃহত্তর ভাঙনের সঙ্গে যুক্ত। অপরাধী নেতৃত্বের দীর্ঘস্থায়িত্ব তাই কেবল প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; নিজের সহযোগীদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা সামলানোর ক্ষমতাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৫ সালের অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়ায় ছোট রাজনের গ্রেপ্তার এবং নভেম্বরে ভারতে নিয়ে আসার ঘটনা তাঁর দীর্ঘ বিদেশবাসের গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি। এই ঘটনার পরে তদন্ত ও বিচার ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের আওতায় এগোয়। গ্রেপ্তার হওয়া এবং কোনো নির্দিষ্ট অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়; প্রত্যেক মামলায় প্রমাণ বিচার করার প্রয়োজন থাকে। অপরাধী সংগঠনের নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হলে তার প্রভাব অবশ্যই কমতে পারে, কিন্তু সব স্থানীয় যোগাযোগ সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয় না। দীর্ঘদিনের চাঁদা আদায়ের সম্পর্ক, পুরোনো সহযোগী এবং অন্য নামে কাজ করার চেষ্টা অবশিষ্ট থাকতে পারে। আবার নেতৃত্বের পতন ছোট গোষ্ঠীর স্বাধীন হওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। ফলে একটি বড় গ্রেপ্তার অপরাধজগতের শেষ অধ্যায় নয়, কখনো তার নতুন বিন্যাসের সূচনা। এই বাস্তবতা বুঝলে পুলিশের সাফল্যকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া যায়, পাশাপাশি সংগঠনের অবশিষ্ট সম্পর্কের দিকে নজর রাখার প্রয়োজনও বোঝা যায়। (তথ্যসূত্র: Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017; The Times of India. 2005. MumBhai, 23 October; Rise of Underworld in Mumbai, Crime, 4 October, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের জন্য।)

অরুণ গাওলির সংগঠন মুম্বইয়ের অপরাধী মানচিত্রে অন্য ধরনের অবস্থান তৈরি করে। দাউদের মতো তাঁর সংগঠনের প্রধান শক্তি বিদেশে বিস্তার ছিল না; স্থানীয় এলাকায় উপস্থিতি, পরিচিতি এবং নিজস্ব সমর্থনভিত্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দাউদ ও গাওলির তরুণ বয়সের পরিচয় এবং একসময় কাছাকাছি থাকার বিবরণ পাওয়া যায়। পরে সম্পর্ক বদলে যায় এবং সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়। গাওলি রামা নায়েকের সঙ্গে কাজ করতেন বলে শাবান জানিয়েছেন। রামা নায়েকের পুলিশি সংঘর্ষে মৃত্যুর পরে গাওলির স্বাধীন সংগঠন শক্ত হয়। এই ঘটনাকে ঘিরে প্রতিপক্ষের তথ্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, কিন্তু অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা চলে না। ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে সহযোগিতা এবং সহযোগিতা থেকে বিরোধে যাওয়ার এই পথ অপরাধী সংগঠনের ইতিহাসে বারবার দেখা যায়। একসঙ্গে বড় হওয়া কিংবা একই এলাকায় থাকা স্থায়ী আনুগত্যের নিশ্চয়তা দেয় না, যখন অর্থ ও কর্তৃত্বের হিসাব বদলে যায়।

গাওলি ও অমর নায়েকের গোষ্ঠীর বিরোধে বাইকুল্লা ও চিন্চপোকলির মটকা এবং অবৈধ মদের ব্যবসা থেকে সুরক্ষার নামে অর্থ আদায়ের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সুরক্ষার অর্থ দ্ব্যর্থক। কোনো ব্যবসায়ী অর্থ দিয়ে অন্য গোষ্ঠীর হামলা থেকে সাময়িক আশ্রয় পেতে পারেন, কিন্তু যাঁকে অর্থ দেওয়া হচ্ছে তিনিই অর্থ না পেলে বিপদের উৎস হয়ে উঠতে পারেন। ফলে সুরক্ষা একটি স্বাধীন সেবা নয়, বাধ্যতার সম্পর্কও হতে পারে। একাধিক গোষ্ঠী একই ব্যবসার ওপর দাবি জানালে ব্যবসায়ী দ্বিগুণ চাপের মধ্যে পড়েন। তিনি কোনো পক্ষকে বেছে নিলেও অন্য পক্ষের প্রতিশোধের ভয় থাকে। এই ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অপরাধী সংগঠনের কাছে আয়ের প্রশ্ন, কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে দৈনন্দিন নিরাপত্তার সংকট। শহরের অপরাধের ইতিহাসে সংঘর্ষের দৃশ্য বেশি আলোচিত হয়; সেই সংঘর্ষের মাঝখানে কাজ চালিয়ে যাওয়া দোকানি, শ্রমিক ও পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম স্থান পায়।

গাওলির গোষ্ঠীর সদস্য সংগ্রহে মহারাষ্ট্রীয় তরুণদের ভূমিকা এবং বাইকুল্লা ও কাঞ্জুরমার্গের স্থানীয় যোগাযোগের কথা গবেষণায় এসেছে। সংগঠনটির মুম্বইকেন্দ্রিক চরিত্রের পাশাপাশি আহমেদাবাদ, নাসিক, পুণে ও থানেতে সীমিত উপস্থিতির উল্লেখও রয়েছে। এই স্থানীয় ভিত্তি তাকে সামাজিক পরিচিতি দেয়, কিন্তু স্থানীয় পরিচিতি নিজে অপরাধের বৈধতা তৈরি করে না। কোনো নেতা এলাকার মানুষের ভাষা বলেন, তাঁদের সমস্যা জানেন এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য করেন বলে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁর সংগঠন ভয়, চাঁদাবাজি বা সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এই দুটি দিককে একসঙ্গে দেখতে হয়। সাহায্য পাওয়া মানুষের কৃতজ্ঞতাকে উপেক্ষা করলে জনপ্রিয়তা বোঝা যায় না, আর জনপ্রিয়তা দিয়ে অপরাধের দায় মুছে দিলে ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা অস্বীকার করা হয়। স্থানীয় অপরাধী নেতৃত্বের স্থায়িত্ব অনেক সময় এই জটিল দ্বৈত সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

শিবসেনার সঙ্গে গাওলির সম্পর্কও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সহযোগিতার বিবরণ থাকলেও পরে বিরোধ তৈরি হয়। ১৯৯৭ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় গাওলি গ্রেপ্তার হলে স্থানীয় সাংসদ মোহন রাওলের অনশনের কথা শাবান উল্লেখ করেছেন। এই ঘটনা অপরাধী নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন কীভাবে প্রকাশ্য রূপ পেতে পারে, তা দেখায়। সমর্থনের কারণ বিচার করতে হলে স্থানীয় ভোটের হিসাব, দলীয় প্রতিযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রভাব বিবেচনা করতে হয়। রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধী গোষ্ঠীকে জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার ভাষা দেয়, আর অপরাধী সংগঠনের স্থানীয় শক্তি রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এই বিনিময় সর্বত্র একইভাবে কাজ করে না, কিন্তু মুম্বইয়ের ইতিহাসে তার উদাহরণ রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভোটের সমর্থন এবং আইনসম্মত আচরণের বাধ্যবাধকতা পৃথক বিষয়। কোনো ব্যক্তির জনসমর্থন থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার বন্ধ হয়ে যায় না।

অখিল ভারতীয় সেনা গড়ে তোলার মাধ্যমে গাওলি প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয় অর্জন করেন। ১৯৯৭ সালের মিছিল এবং পরে গ্রেপ্তার ও সহযোগীদের মৃত্যুর ফলে সংগঠনের দুর্বল হয়ে পড়ার প্রসঙ্গ গবেষণায় আছে। ২০০৪ সালে চিন্চপোকলি থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়া তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নির্বাচনে জয় পাওয়া মানুষের প্রত্যাশা, স্থানীয় সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক বিকল্পের সংকট সম্পর্কে তথ্য দেয়, কিন্তু তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডের স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন নয়। কেউ নাগরিক সমস্যার সমাধান আশা করে ভোট দিতে পারেন, কেউ ব্যক্তিগত সাহায্যের কারণে সমর্থন করতে পারেন, কেউ প্রচলিত দলের প্রতি অসন্তোষ জানাতে পারেন। এই বিভিন্ন কারণকে একসঙ্গে অপরাধের সমর্থন বলে দেখানো সাধারণ ভোটারের অভিজ্ঞতাকে সরল করে। একইভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ার পরিচয় দিয়ে অপরাধের দায় অস্বীকার করা যায় না। গাওলির রাজনৈতিক উত্থান তাই সমাজের প্রতিনিধিত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে জটিল প্রশ্ন তোলে।

কমলাকর জামসন্দেকরের হত্যার মামলায় গাওলির সাজা ঘোষণার সঠিক সাল ২০১২। হত্যাকাণ্ডটি ২০০৭ সালে ঘটে; ফলে ২০০২ সালে সেই অপরাধের সাজা হওয়ার বিবরণ কালানুক্রমিকভাবে অসম্ভব। বোম্বে হাইকোর্টের ২০১৯ সালের রায়ে বিশেষ আদালতের ৩১ আগস্ট ২০১২ সালের সিদ্ধান্তের উল্লেখ রয়েছে। এই মামলায় বিচারিক সিদ্ধান্তকে অন্য হত্যার অভিযোগের তালিকার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। জিয়াউদ্দিন বুখারি, জয়ন্ত যাদব কিংবা আসলাম পাটনির হত্যার সঙ্গে গাওলির গোষ্ঠীর নাম বিভিন্ন বিবরণে যুক্ত হলেও প্রত্যেকটির নিজস্ব তদন্ত ও প্রমাণ আছে। পরবর্তী সময়ে গাওলির আইনি অবস্থানেও পরিবর্তন ঘটে; ২০২৫ সালে জামিনে মুক্তির সংবাদ পাওয়া যায়। জামিনে মুক্তি এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়া এক বিষয় নয়। অতএব তাঁকে অনির্দিষ্ট বর্তমান কালে কারাগারে রয়েছেন বলে বর্ণনা না করে ঘটনাগুলির সালসহ উল্লেখ করা প্রয়োজন। (তথ্যসূত্র: Bombay High Court. Arun Gulab Gawli v. State of Maharashtra, judgment dated 9 December 2019, Criminal Appeal No. 1157 of 2012 and connected appeals; R. Samervel. 2012. Ex-MLA Arun Gawli Goes from Dagdi Chawl to Life in Jail. The Times of India, 1 September; The Times of India, Nagpur edition, 4 September 2025.)

অমর নায়েকের গোষ্ঠী নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় মুম্বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অপরাধী সংগঠনগুলির একটি হয়ে ওঠে। বাপট গ্যাং নামে প্রাথমিক পরিচিতি এবং চিন্চপোকলি থেকে কার্যকলাপ পরিচালনার কথা শাবান উল্লেখ করেছেন। মধ্য মুম্বইয়ের তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই সংগঠনের ব্যবসায় চাঁদাবাজি ও সুরক্ষার নামে অর্থ সংগ্রহ ছিল। পরে মাদক চোরাচালান ও ভাড়াটে হত্যার অভিযোগও তার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। গাওলির সংগঠনের সঙ্গে বিরোধ এই গোষ্ঠীর ইতিহাসে বিশেষ স্থান পায়। একই অঞ্চলের আয়ের উৎস নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থানীয় সম্পর্ককে সহিংস করে তুলতে পারে। সংগঠনের প্রতিটি হামলা তখন শুধু প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা নয়, নিজের সহযোগীদের সামনে শক্তি দেখানোর উপায়ও হয়ে ওঠে। কিন্তু এই শক্তি প্রদর্শনের সামাজিক মূল্য সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতায় জমা হয়। অপরাধী গোষ্ঠীর নাম যত বড় হয়, তার প্রভাবের নিচে থাকা মানুষের স্বাধীনতা তত সংকুচিত হতে পারে।

অমর নায়েক ১৯৯৬ সালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পরে তাঁর ভাই অশ্বিন নায়েক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। অশ্বিনের বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গ্রেপ্তারের কথাও বিভিন্ন বিবরণে আছে। তাঁদের শিক্ষাগত পরিচয় সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অশ্বিনকে প্রকৌশল শিক্ষায় স্নাতক বলে সংবাদপ্রতিবেদন সমর্থন করে, কিন্তু দুই ভাইই প্রকৌশলী ছিলেন বলে প্রচলিত বিবরণকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়। শিক্ষিত মানুষের অপরাধে যুক্ত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন, কারণ তা অপরাধকে শুধু দারিদ্র্য বা অশিক্ষার ফল হিসেবে দেখার সীমা প্রকাশ করে। শিক্ষা দক্ষতা ও সুযোগ বাড়াতে পারে, কিন্তু ব্যক্তির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে না। আবার একজন শিক্ষিত অপরাধীর উদাহরণ দিয়ে প্রান্তিক মানুষের সুযোগহীনতার প্রশ্নও বাতিল করা যায় না। অপরাধের ব্যাখ্যায় ব্যক্তিগত পছন্দ, সামাজিক পরিবেশ এবং সংগঠিত স্বার্থের সম্পর্ক একসঙ্গে বিচার করতে হয়।

অশ্বিনের স্ত্রী নীতা নায়েক শিবসেনার পৌর প্রতিনিধি ছিলেন। এই পরিচয় নায়েক পরিবারের সঙ্গে প্রকাশ্য রাজনীতির সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে। ২০০০ সালের নভেম্বরে নীতার হত্যাকাণ্ডে অশ্বিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে, কিন্তু ২০০৯ সালে বিশেষ আদালত তাঁকে সেই মামলায় খালাস দেয়। অতএব তিনি কারাগার থেকে স্ত্রীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, এমন বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে লেখা যায় না। অভিযোগের সময় সংবাদমাধ্যমে যে বিবরণ প্রচারিত হয়েছিল, তার পরে বিচারিক সিদ্ধান্ত এসেছে; ইতিহাসের দায়িত্ব সেই সিদ্ধান্তও পাঠককে জানানো। একই মামলায় অন্য অভিযুক্তের দণ্ড হওয়া অশ্বিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। প্রত্যেকের দায় আলাদা প্রমাণের ওপর নির্ভর করে। এই ঘটনা অপরাধী পরিচয়ের শক্তি এবং তার বিপদের কথাও মনে করিয়ে দেয়। কোনো ব্যক্তি বহু অভিযোগে পরিচিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ সহজে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে, কিন্তু আদালতের কাজ সেই পরিচিতির বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ বিচার করা। (তথ্যসূত্র: Express News Service. 2009. Wife’s Murder: Gangster Ashwin Naik Acquitted. The Indian Express, Mumbai, 31 January.)

বড় সংগঠনের পাশাপাশি ছোট গোষ্ঠীর উত্থানও মুম্বইয়ের অপরাধজগতকে পরিবর্তিত করেছে। সুরেশ মঞ্চেকর, সুভাষ সিং ঠাকুর, রবি পূজারি এবং অন্যান্য নেতার নাম বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় পাওয়া যায়। এসব সংগঠন একই সময়ে একই শক্তিতে সক্রিয় ছিল, এমন ধরে নেওয়া যায় না। কোনো গোষ্ঠী বড় সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৈরি হয়েছে, কোনোটি স্থানীয় ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, আবার কোনোটি নেতার মৃত্যু বা গ্রেপ্তারের পরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রধান তিনটি গোষ্ঠী কিংবা কয়েকটি ছোট গোষ্ঠীর তালিকা নির্দিষ্ট সময়ের একটি ছবি দেয়, অপরিবর্তিত বর্তমানের বিবরণ নয়। অপরাধী মানচিত্রে নাম টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সদস্য, যোগাযোগ ও আয় বদলে যেতে পারে। একটি পুরোনো নাম কখনো নতুন লোকেরা ব্যবহার করেন পরিচিত ভয়কে কাজে লাগানোর জন্য। তাই সংগঠনকে শুধু নাম দিয়ে চেনা যথেষ্ট নয়; তার বাস্তব কাজ ও সম্পর্কও অনুসন্ধান করতে হয়।

রবি পূজারির সঙ্গে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের প্রসঙ্গ শাবানের লেখায় রয়েছে। নবি মুম্বইয়ের নির্মাতা সুনীল লাহোরিয়ার হত্যাকে ঘিরে তাঁর গোষ্ঠীর নাম সংবাদে আসে। আইনজীবী শাহিদ আজমির হত্যার বিষয়ে একাধিক গোষ্ঠীর দাবি বা সংশ্লিষ্টতার সন্দেহও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব বিবরণ একত্রে পড়লে অপরাধী সংগঠনের প্রতিযোগিতামূলক প্রচারের দিকটি বোঝা যায়। কোনো ঘটনা ঘটলে তার দায় দাবি করা নিজের ক্ষমতা দেখানোর উপায় হতে পারে, আবার অন্য পক্ষের নাম ছড়িয়ে দেওয়াও কৌশল হতে পারে। ফলে প্রচারিত দাবি সরাসরি প্রমাণ নয়। শাহিদ আজমির পেশাগত কাজকে কোনো অভিযুক্তের পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করে তাঁকে অপরাধীর সহযোগী ভাবাও ভুল। ন্যায়বিচারের জন্য অভিযুক্ত মানুষের আইনজীবী পাওয়ার অধিকার প্রয়োজন। সেই অধিকার কার্যকর করা আইনজীবীর দায়িত্ব, অভিযুক্তের অভিযোগের দায় গ্রহণ করা নয়। (তথ্যসূত্র: S. A. Ali. 2013. Lahoria Killing: Son Gets Threat Calls from Ravi Pujari Gang. The Times of India, Mumbai, 19 April; J. Dey. 2010. 3 Gangs Claim They Killed 26/11 Lawyer. Mid-Day, Mumbai, 13 February.)

সাংবাদিক জে দে ২০১১ সালের জুনে নিহত হন। তাঁর হত্যার মামলায় ২০১৮ সালে ছোট রাজন দোষী সাব্যস্ত হন, কিন্তু একই মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিক জিগনা ভোরা খালাস পান। ২০১৯ সালে বোম্বে হাইকোর্ট তাঁর খালাসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এই পরবর্তী বিচারিক তথ্য ছাড়া পুরোনো অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করলে পাঠকের কাছে জিগনার অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল বলে সমস্ত সাংবাদিক ও অপরাধী সংগঠনের যোগসাজশ প্রতিষ্ঠিত হয়, এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদসংগ্রহের জন্য অপরাধসংক্রান্ত তথ্যদাতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং কোনো অপরাধে সক্রিয় সহযোগিতা পৃথক বিষয়। সাংবাদিকতার কাজ কখনো বিপজ্জনক সম্পর্কের মধ্যে তথ্য খোঁজা, কিন্তু সেই যোগাযোগের প্রকৃতি প্রমাণের সাহায্যে বিচার করতে হয়। জে দের মৃত্যু সংবাদসংগ্রহের ঝুঁকির কথা বলে; জিগনার খালাস অভিযোগের পরবর্তী ফল স্মরণ রাখার প্রয়োজন দেখায়। (তথ্যসূত্র: Press Trust of India. 2019. J Dey Murder Case: Bombay HC Upholds Acquittal of Ex-scribe Jigna Vora. The New Indian Express, 27 August.)

পুলিশের সাফল্য ও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগকে একই আলোচনায় রাখার প্রয়োজন আছে। বড় নেতা গ্রেপ্তার, প্রত্যর্পণ এবং সংগঠনের আর্থিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে আনা অপরাধ দমনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আবার কোনো পুলিশকর্মী একটি গোষ্ঠীর হয়ে অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, এমন অভিযোগ থাকলে তা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। সব পুলিশকর্মীকে একই দায়ে ফেলা অন্যায়, কিন্তু ব্যক্তিগত অনিয়মের প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতিও উপেক্ষা করা যায় না। তদন্তের তথ্য ফাঁস করা, প্রতিদ্বন্দ্বীর বিষয়ে নির্বাচিত ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার অপরাধী প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। এতে আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য থেকে কাজ সরে গিয়ে কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নাগরিক তখন বুঝতে পারেন না, তিনি অভিযোগ জানালে নিরাপত্তা পাবেন, নাকি নতুন বিপদে পড়বেন। এই আস্থাহীনতা অপরাধী পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে পারে। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2010. Mumbai: Political Economy of Crime and Space. Hyderabad: Orient Blackswan; Mumbai Mirror. 2006. Daya Nayak III, 3 February; Speed Up the Probe against Daya Nayak, 11 January.)

মুম্বইয়ের অপরাধী সংগঠনগুলির সদস্য সংগ্রহে স্থানীয় সম্পর্কের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনো এলাকার তরুণদের সামগ্রিক পরিচয় অপরাধ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একই পরিবেশে অনেকে সংগঠিত অপরাধে যোগ দিয়েছেন, আবার বিপুল সংখ্যক মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে জীবন চালিয়েছেন। কাজের অনিশ্চয়তা, দ্রুত অর্থের প্রলোভন, পরিচিত দলের চাপ এবং নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি কোনো কোনো তরুণের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব কারণ বুঝলে প্রতিরোধের প্রশ্নও স্পষ্ট হয়। শুধু নেতা গ্রেপ্তার করলেই সদস্য সংগ্রহের পথ বন্ধ হয় না, যদি একই এলাকার তরুণেরা আগের মতো সুযোগহীন থাকেন। তবে সামাজিক পরিবেশের আলোচনা ব্যক্তির অপরাধের দায় মুছে দেয় না। একজন মানুষ কী করেছেন, সেই প্রশ্নের সঙ্গে তিনি কোন পরিবেশে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নও বিচার করতে হয়। অপরাধের সামাজিক ইতিহাস এই দুটি স্তরকে পাশাপাশি রাখে এবং কোনো একটিকে অন্যটির বিকল্প হতে দেয় না।

চাঁদাবাজি ও ভয়ের অর্থনীতি শহরের সাধারণ ব্যবসাকে দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যে রাখে। কোনো প্রতিষ্ঠান অর্থ দিলে তার লাভ কমে, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বদলায় এবং কর্মীর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়। আবার অর্থ দিতে অস্বীকার করলে হামলার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এই অদৃশ্য ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম, কাজের সুযোগ কিংবা ব্যবসার স্বাধীনতায় প্রভাব ফেলতে পারে। অপরাধী সংগঠনের আয় তাই শহরের অন্য মানুষের শ্রম থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্পদ। আবাসন ব্যবসায় সেই চাপ আরও জটিল, কারণ জমি ও ঘরের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যুক্ত থাকে। অপরাধী মধ্যস্থতায় বিরোধ মিটলে দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু দুর্বল পক্ষের ন্যায্য অধিকার সুরক্ষিত হলো কি না, তা আলাদা প্রশ্ন। শহরের উন্নয়নকে শুধু নতুন ভবনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে এই ভয়, বাধ্যতা এবং অধিকার হারানোর অভিজ্ঞতা অদৃশ্য থেকে যায়।

দাউদ, ছোট রাজন, গাওলি ও নায়েক গোষ্ঠীর ইতিহাস একত্রে পড়লে মুম্বইয়ের অপরাধজগতকে স্থির কোনো সাম্রাজ্য বলে মনে হয় না। সেখানে সহযোগিতা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্থানীয় ব্যবসা থেকে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং অপরাধী পরিচয় থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে যাওয়ার বহু পথ রয়েছে। নেতা বদলালে সংগঠন বদলায়, কিন্তু অর্থ ও ক্ষমতার কিছু সম্পর্ক অন্য নামে টিকে থাকতে পারে। এই ইতিহাসে ধর্মীয় পরিচয়ের ব্যবহার যেমন আছে, তেমনই ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতাও আছে। পুলিশের সাফল্য আছে, আবার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও আছে। সবচেয়ে বেশি মনে রাখা প্রয়োজন সেই সাধারণ মানুষদের, যাঁরা এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নন, অথচ তার মূল্য দেন। তাঁদের নিরাপত্তা, কাজের স্বাধীনতা এবং বিচার পাওয়ার অধিকারকে কেন্দ্রে না রাখলে অপরাধের আলোচনা কয়েকজন পরিচিত নেতার কাহিনিতে আটকে যায়। মুম্বইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অর্থবহ প্রশ্ন হলো, শহরের সম্পদ ও সুযোগ কতটা এমন নাগরিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করছে, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য কাউকে অপরাধী শক্তির আশ্রয় নিতে হয় না। এই লক্ষ্য পূরণে নির্ভরযোগ্য তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার, নিরাপদ কর্মসংস্থান এবং নাগরিকের অভিযোগ জানানোর সুযোগ একসঙ্গে প্রয়োজন। মানুষের আস্থা ফিরে এলে ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার বাধ্যতা কমে এবং শহরের প্রকাশ্য প্রতিষ্ঠানগুলি দৈনন্দিন জীবনে আরও কার্যকর আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

মুম্বইয়ের অপরাধজগতের বিস্তার শুধু কয়েকজন বড় নেতার উত্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁদের চারপাশে ছোট গোষ্ঠী, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী, অর্থ সংগ্রহকারী এবং বিভিন্ন কাজের সহযোগীদের নিয়ে একটি বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। বড় সংগঠনের নাম ভয় তৈরি করত, কিন্তু সেই ভয়কে দৈনন্দিন লেনদেনে কার্যকর করতেন অনেক সময় স্থানীয় লোকেরা। শহরের কোনো এলাকায় দোকান, নির্মাণ, পরিবহন বা অবৈধ ব্যবসা থেকে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হলে ছোট গোষ্ঠীও সেখানে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করত। ফলে অপরাধী ক্ষমতার ইতিহাস পড়তে হলে দৃশ্যমান নেতৃত্বের পাশাপাশি এই ছড়িয়ে থাকা সম্পর্কগুলিকেও দেখতে হয়। নারী সহযোগীদের ভূমিকা, শিল্পের সঙ্গে অর্থের আদানপ্রদান এবং পুলিশের ক্ষমতার ব্যবহার সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবদুল শাবান মুম্বইয়ের অপরাধকে নগরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে বিচার করেছেন। তাঁর আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, অপরাধী সংগঠন কীভাবে প্রকাশ্য নগরজীবনের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করে এবং পরে সেই জীবনকেই নিজের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai. In N. Jayaram, ed., Social Dynamics of the Urban: Studies from India. Exploring Urban Change in South Asia. New Delhi: Springer, pp. 115–134. DOI: 10.1007/978-81-322-3741-9_7.)

ছোট অপরাধী গোষ্ঠীর গুরুত্ব বোঝার জন্য তার আকারের চেয়ে কার্যক্ষেত্র দেখা প্রয়োজন। একটি গোষ্ঠী পুরো শহরে পরিচিত না হলেও নির্দিষ্ট বাজার বা এলাকায় মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সুরেশ মঞ্চেকরের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মধ্য মুম্বই এবং থানে অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও সুরক্ষার নামে অর্থ আদায়ের প্রসঙ্গ শাবান উল্লেখ করেছেন। গুরু সাটামের গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধের কথাও তাঁর বিবরণে রয়েছে। এই সম্পর্কগুলি নির্দিষ্ট সময়ের ইতিহাস, অপরিবর্তিত বর্তমানের বিবরণ নয়। কোনো নেতা নিহত বা গ্রেপ্তার হওয়ার পরে তাঁর সংগঠন দুর্বল হতে পারে, আবার পুরোনো সহযোগীরা অন্য নামে কাজ চালাতে পারেন। অপরাধী সংগঠনের নাম টিকে থাকলেও তার সদস্য, আয়ের উৎস এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ বদলে যায়। তাই ছোট গোষ্ঠীকে বড় গোষ্ঠীর ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে দেখার বদলে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হয়। তাদের প্রভাবের সীমা ছোট হলেও সেই সীমার মধ্যে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বড় হতে পারে।

সুভাষ সিং ঠাকুরের গোষ্ঠীর প্রসঙ্গও এই স্থানীয় ও বিস্তৃত যোগাযোগের সম্পর্ককে সামনে আনে। থানে, মুম্বইয়ের উপনগর এবং অন্য কয়েকটি শহরে তাঁর যোগাযোগের কথা বিভিন্ন বিবরণে এসেছে। ডি কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরে স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রবণতা অপরাধী সংগঠনের ভাঙন বোঝার একটি উদাহরণ। কারাগারে থাকলেও কোনো নেতার পুরোনো যোগাযোগ পুরোপুরি মুছে যায় না, এমন অভিযোগ এই ইতিহাসে বারবার পাওয়া যায়। তবে বন্দি অবস্থায় সংগঠন পরিচালনার দাবি এবং নির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ আলাদা বিষয়। ঠাকুরের দণ্ডের প্রসঙ্গও শুধু অস্পষ্ট অস্ত্রের মামলা বলে সীমিত করা যথেষ্ট নয়; ১৯৯২ সালের জে জে হাসপাতালের গুলিকাণ্ডের বিচারিক ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িত। হাসপাতালের মতো আশ্রয় ও চিকিৎসার জায়গায় সংঘটিত সহিংসতা দেখায়, গোষ্ঠীগত প্রতিশোধ নাগরিক নিরাপত্তার সাধারণ সীমাও ভেঙে দিতে পারে। (তথ্যসূত্র: The Indian Express. 2025. From JJ Hospital Shootout to Babaji: The Return of Mumbai Underworld’s Notorious Shooter Subhash Singh Thakur. Mumbai edition, December; শাবান, ২০১৭.)

ছোট শাকিলের উত্থানে দৈনন্দিন কাজ থেকে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছানোর একটি পথ দেখা যায়। শাবানের বিবরণে তাঁর প্রাথমিক জীবন, ভিডিওর দোকানে কাজ এবং ছোট পরিসরের চাঁদাবাজি ও বিরোধ মেটানোর প্রসঙ্গ আছে। পরে ডি কোম্পানির কার্যকলাপে তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বড় সংগঠনের ভেতরে কোনো সহযোগীর নিজস্ব দল গড়ে ওঠা তার ক্ষমতা বাড়াতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করে। কে অর্থ সংগ্রহ করবেন, কে স্থানীয় যোগাযোগ সামলাবেন এবং সিদ্ধান্তের শেষ অধিকার কার থাকবে, এসব প্রশ্ন তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়। এই দায়িত্ববণ্টনকে নিয়মমাফিক প্রতিষ্ঠানের কাজের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না, কারণ তার ভিত্তিতে আইনসম্মত চুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আনুগত্য ও ভয় কাজ করে। তবু কাজের বহুমুখিতা এবং দায়িত্বের স্তর অপরাধী সংগঠনকে দীর্ঘদিন কার্যকর রাখার একটি কারণ হতে পারে।

আবু সালেমের প্রাথমিক কর্মজীবনে আন্ধেরির একটি ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার বিবরণ পাওয়া যায়। পরে ডি কোম্পানিতে যোগ দিয়ে তাঁর ভূমিকা বদলে যায়। ১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালের দাঙ্গার সময় তিনি সংগঠনের জন্য “doing something” করতে চেয়েছিলেন, এমন একটি বিবরণ শাবানের লেখায় আছে। এই আগ্রহের সঙ্গে অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ এবং সঞ্জয় দত্তের নাম যুক্ত হয়েছে। ঘটনাটি যে অপরাধী যোগাযোগের আলোচনায় এসেছে, তা মনে রাখতে হবে; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ বা সব মামলার ফল একই ছিল না। সংগঠনের জন্য কাজ করার ইচ্ছা, নির্দিষ্ট অস্ত্র সরবরাহ এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের দায় প্রত্যেকটি পৃথক প্রমাণের প্রশ্ন। আবু সালেম পরে আনিস ইব্রাহিমের হয়ে এবং নিজের উদ্যোগে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে চাঁদা দাবির কাজে যুক্ত হন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পরিবর্তন বড় সংগঠনের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা একজন সহযোগীর স্বাধীন ক্ষমতা অর্জনের প্রবণতা প্রকাশ করে।

গুলশন কুমারের ১৯৯৭ সালের হত্যাকাণ্ডের পরে আবু সালেম ও ডি কোম্পানির সম্পর্কের অবনতির ব্যাখ্যা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। দাউদের অনুমতি ছাড়া হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এমন দাবিও রয়েছে। কিন্তু অপরাধী নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ নির্দেশের বিষয়ে প্রচলিত গল্পকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বলে গ্রহণ করা যায় না। যেটুকু স্পষ্ট, তা হলো চলচ্চিত্র ও সংগীতের ব্যবসায় ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ এই সময় জনপরিসরে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। আবু সালেম ২০০২ সালে পর্তুগালে গ্রেপ্তার হন এবং ২০০৫ সালে ভারতে প্রত্যর্পিত হন। এই ঘটনাক্রমে আন্তর্জাতিক আশ্রয়, পরিচয়সংক্রান্ত অপরাধ এবং বিভিন্ন দেশের আইনি সহযোগিতার প্রশ্ন সামনে আসে। বিদেশে অবস্থান অপরাধী নেতাকে সাময়িক নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু বিচার এড়িয়ে যাওয়ার স্থায়ী নিশ্চয়তা নয়। প্রত্যর্পণের শর্ত, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং পরবর্তী ভারতীয় বিচার পৃথকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। (তথ্যসূত্র: Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017; The Indian Express. 2026. Supreme Court Dismisses Gangster Abu Salem’s Plea for Early Release. September, প্রত্যর্পণের সাল ও পরবর্তী বিচারিক প্রেক্ষাপটের জন্য।)

মুম্বইয়ের অপরাধজগতের পুরুষ নেতাদের বোঝাতে “bhais” এবং নারী সহযোগীদের বোঝাতে “behens” শব্দের ব্যবহার হয়েছে। ভাই ও বোনের এই ভাষা অপরাধী সম্পর্ককে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার আবরণ দেয়। সেখানে আনুগত্য, সাহায্য এবং রক্ষার প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পায়, যদিও সম্পর্কের অন্তরালে ভয় ও বাধ্যতাও থাকতে পারে। নারী সহযোগীদের কেবল কোনো নেতার প্রেমিকা, স্ত্রী বা বোন হিসেবে পরিচয় দিলে তাঁদের নিজস্ব ভূমিকা আড়াল হয়। আবার পারিবারিক সম্পর্ক আছে বলেই কেউ অপরাধে যুক্ত, এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ অর্থ পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ আছে, কেউ তথ্য সংগ্রহে যুক্ত ছিলেন, কেউ হয়তো ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সন্দেহের মধ্যে পড়েছেন। এই ভিন্ন অবস্থান আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। নারীকে নিষ্ক্রিয় সহযোগী হিসেবে দেখার অভ্যাস যেমন ভুল, তেমনই পরিচিত অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে তাঁর দায় নির্ধারণ করাও ভুল। ব্যক্তি কী করেছেন, তার প্রমাণই শেষ পর্যন্ত বিচার্য। (তথ্যসূত্র: S. Hussain Zaidi and Jane Borges. 2011. Mafia Queens of Mumbai: Stories of Women from the Ganglands. Chennai: Tranquebar Press; শাবান, ২০১৭.)

অর্চনা শর্মার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রে কাজ পাওয়ার চেষ্টা থেকে অপরাধী যোগাযোগে প্রবেশের একটি বিবরণ পাওয়া যায়। ভোপাল থেকে মুম্বইয়ে আসা, অভিনয়ে সফল না হওয়া এবং পরে দুবাইয়ে বাবলু শ্রীবাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কের কথা শাবান উল্লেখ করেছেন। ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করা, ব্ল্যাকমেল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগও তাঁর আলোচনায় রয়েছে। এই ধরনের জীবনীকে সরল পতনের গল্পে পরিণত করা সহজ, কিন্তু তা যথাযথ বিশ্লেষণ নয়। বিনোদনশিল্পে প্রবেশের অনিশ্চয়তা, পরিচিতির ওপর নির্ভরতা এবং ব্যক্তিগত ক্ষমতার সম্পর্ক মানুষের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। তা থেকে অপরাধে যোগ দেওয়ার অনিবার্যতা তৈরি হয় না। ব্যর্থ শিল্পী কিংবা শহরে আসা নারীকে সন্দেহের চোখে দেখা এই বিবরণের গ্রহণযোগ্য পাঠ হতে পারে না। অর্চনার বিরুদ্ধে উল্লিখিত অভিযোগের নিজস্ব প্রমাণ ও বিচারিক ইতিহাস আছে; তাঁর জীবনের সামাজিক পটভূমি সেই দায়ের বিকল্প নয়।

মনিকা বেদির চলচ্চিত্রজীবন এবং আবু সালেমের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে জনপরিসরে বিশেষ পরিচিত করে তোলে। এই ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রে কাজ পাওয়া ও তথ্য সরবরাহের নানা অভিযোগ প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে চাঁদাবাজিতে অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাঁর বিরুদ্ধে পাসপোর্টসংক্রান্ত মামলার বিচারিক তথ্য তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১০ সালের রায়ে অন্ধ্রপ্রদেশের মামলায় তাঁর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে এবং সাজা ইতিমধ্যে ভোগ করা সময় পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে ভোপালের পৃথক মামলায় তাঁর খালাসের সিদ্ধান্ত ছিল। একই ব্যক্তির এক মামলার দণ্ডকে অন্য সব অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এই পার্থক্য না রাখলে একটি নারীজীবনের জটিল ইতিহাস কেবল পরিচিত অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্কের গল্পে আটকে যায়। তাঁর কাজ, অভিযোগ এবং আদালতের পৃথক সিদ্ধান্তগুলি নিজস্ব সীমা মেনেই পড়তে হয়। (তথ্যসূত্র: Supreme Court of India. Monica Bedi v. State of A.P., judgment dated 9 November 2010, Criminal Appeal No. 782 of 2007 and connected appeals; The Times of India. 2007. Monica Acquitted in Fake Passport Case. 17 July.)

লক্ষ্মী সোনি, প্রিয়া রাজপুত, শামিম পল, কাজল মেঘনানি, তবস্সুম এবং পল্লবী যাদবের মতো নারীদের নামও অপরাধী গোষ্ঠীর সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন সময়ের বিবরণে পাওয়া যায়। কারও সঙ্গে গুরু সাটাম, কারও সঙ্গে বান্টি পাণ্ডে, ছোট শাকিল কিংবা অন্য গোষ্ঠীর যোগাযোগের অভিযোগ ছিল। শাবানের আলোচনায় অর্থ আদায়, যোগাযোগ রক্ষা এবং সম্ভাব্য লক্ষ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের মতো কাজের প্রসঙ্গ এসেছে। এই তালিকা থেকে নারীদের একটি অভিন্ন অপরাধী শ্রেণি তৈরি করা অনুচিত। প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন ও প্রমাণ পৃথক। একই সঙ্গে তালিকাটি অপরাধী সংগঠনের কাজের অদৃশ্য স্তরগুলিও দেখায়। প্রকাশ্য হামলার পেছনে তথ্য, অর্থ এবং যোগাযোগের বহু ছোট কাজ থাকে। সেসব কাজ কারা করছেন, তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংবাদে নাম পাওয়া এবং অপরাধে দোষী হওয়া সমার্থক নয়। ইতিহাসের ভাষায় এই পার্থক্য বজায় রাখলে ব্যক্তির প্রতি ন্যায় এবং গবেষণার নির্ভুলতা একসঙ্গে রক্ষা পায়।

রুবিনা সিরাজ সাইয়েদের নাম অর্থ সংগ্রহ, সংগঠনের সদস্যদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া এবং কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজন সামলানোর অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাঁকে ২০০৪ সালে গ্রেপ্তার ও সংগঠিত অপরাধসংক্রান্ত আইনের আওতায় অভিযুক্ত করার প্রসঙ্গ শাবান উল্লেখ করেছেন। আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কিংবা বন্দির পরিবারের প্রয়োজন দেখার কাজ নিজে অপরাধ নয়। কিন্তু সেই কাজ যদি অপরাধী অর্থ পরিচালনা বা সংগঠনের অবৈধ কার্যকলাপ বজায় রাখার অংশ হয়, তবে তার আইনি প্রশ্ন আলাদা। অভিযোগের ভাষায় এই সম্পর্ক স্পষ্ট করতে হয়। কোনো বন্দি আইনি সাহায্য পাচ্ছেন বলে সাহায্যদাতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী সহযোগী বলা যায় না। আবার আইনসম্মত কাজের আবরণ ব্যবহার করে অর্থ বা নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া হলে সেটিও তদন্তের বিষয়। রুবিনার প্রসঙ্গে আলোচিত ভূমিকা দেখায়, সংগঠনের দৃশ্যমান নেতৃত্বের বাইরে অর্থ ও সহায়তার ব্যবস্থাপনা তার স্থায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। (তথ্যসূত্র: R. Khan and R. Srivastava. 2006. Women Held for Links to Dawood. Mumbai Mirror, Mumbai, 16 April.)

পরভিন সুলতানার বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে জাল নোট আনা এবং অন্য সহযোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও একই প্রতিবেদনে এসেছে। উপহারের মোড়কে অর্থ বহনের বিবরণ অপরাধী লেনদেনের গোপনীয়তা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু অভিযোগের বাইরে তার সত্যতা পৃথক প্রমাণের প্রশ্ন। হাসিনা পারকরের ক্ষেত্রে দাউদের বোন হওয়ার পরিচয় তাঁকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রভাবশালী অবস্থান দিয়েছে বলে শাবান লিখেছেন। পরিচিত নামের পারিবারিক সম্পর্ক নিজেই ভয় সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি প্রত্যেক লেনদেনে সরাসরি হুমকি না থাকলেও। তবে পরিবারের সদস্য হওয়া আর অপরাধের দায় বহন করা পৃথক বিষয়। তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিচার সেই অভিযোগের প্রমাণ দিয়েই হতে হবে। হাসিনার জীবনকে অনির্দিষ্ট বর্তমান কালে বর্ণনা করাও ঠিক নয়; তিনি ২০১৪ সালে মারা যান। এই তথ্য তাঁর প্রভাবের ঐতিহাসিক সময়সীমা বুঝতে সাহায্য করে। (তথ্যসূত্র: Khan and Srivastava, Women Held for Links to Dawood, 2006; India Today. 2014. Dawood Sister Haseena Parkar Dead: How Godmother Rose to Crime World. 6 July.)

নারী সহযোগীদের এই বিবরণগুলিকে অপরাধের রোমাঞ্চকর কাহিনি হিসেবে পড়ার প্রবণতা আছে। কিন্তু পরিচিত পুরুষ নেতার সঙ্গে সম্পর্ক, পোশাক, প্রেম কিংবা ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিলে কাজের প্রকৃতি ও ক্ষমতার সম্পর্ক আড়াল হয়। কেউ অর্থের হিসাব সামলালে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা বোঝা প্রয়োজন, কেউ চাপের মুখে কাজ করলে সেই বাধ্যতা বিবেচ্য, আর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁকে অপরাধী বলে স্থির করা চলে না। নারীর সক্রিয় ভূমিকা স্বীকার করা মানে অপরাধের প্রশংসা নয়; বরং পুরুষকেন্দ্রিক ইতিহাসের অসম্পূর্ণতা সংশোধন করা। একইভাবে সহানুভূতির অর্থ দায় অস্বীকার করা নয়। একটি যথাযথ বর্ণনায় ব্যক্তি, সম্পর্ক, কাজ এবং প্রমাণকে পৃথকভাবে দেখা হয়। এতে নারীকে একদিকে নিষ্ক্রিয় ছায়া, অন্যদিকে অতিরঞ্জিত রহস্যময় চরিত্র হিসেবে দেখার দুই প্রবণতাই কমে। অপরাধী অর্থনীতি তখন মানুষের বাস্তব সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বের ইতিহাস হিসেবে সামনে আসে।

শিল্পের সঙ্গে অপরাধজগতের সম্পর্ক বোঝার জন্য অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি সীমিত থাকা, কিছু পণ্য নিষিদ্ধ হওয়া কিংবা বৈধ সরবরাহে জটিলতা গোপন বাজারের লাভ বাড়াতে পারে। গুজরাটে নিষিদ্ধ মদের সরবরাহকে বড় “business” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ আনার ক্ষেত্রে চোরাচালানের সাহায্য নেওয়ার কথাও নব্বইয়ের দশকের প্রতিবেদনে রয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, নিষেধ ও চাহিদার ব্যবধানকে অপরাধী ব্যবসা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু আইনই অপরাধ সৃষ্টি করে, এমন সর্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক নয়। নীতির উদ্দেশ্য, প্রয়োগের দুর্বলতা, ঘুষ এবং ক্রেতার চাহিদা একসঙ্গে বিচার করতে হয়। একটি নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর হতে পারে, আবার তার সুযোগ নিয়ে লাভবান হওয়ার জন্য সচেতন অপরাধী সিদ্ধান্তও প্রয়োজন। অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা এবং অপরাধীর দায় পৃথক বিষয়। এই পার্থক্য বজায় রাখলে আইন সংস্কারের প্রয়োজন বোঝা যায়, অপরাধকে অনিবার্য বলে গ্রহণ করতে হয় না। (তথ্যসূত্র: S. Menezes and S. Ghosh. 1995. Crime–Business Nexus. Outlook, 29 November; শাবান, ২০১৭.)

মুম্বইয়ের নির্মাণ ও আবাসন ব্যবসায় জমির মূল্য, মালিকানার জটিলতা এবং ঘর খালি করানোর প্রশ্ন অপরাধী মধ্যস্থতার সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কিংবা বিরোধ নিষ্পত্তির বিলম্ব ব্যবসায়ীর কাছে বিরক্তিকর হতে পারে, কিন্তু সেই কারণে ভয় দেখিয়ে অধিকার কেড়ে নেওয়া বৈধ হয়ে যায় না। একজন নির্মাতার বক্তব্য ছিল, “If construction laws were simpler, builders wouldn’t have gone to the underworld”। এই মন্তব্য নির্মাণব্যবস্থার জটিলতা নিয়ে একটি পক্ষের অভিজ্ঞতা জানায়, পুরো সমস্যার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। আইন সহজ হলে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে, কিন্তু সহজ আইনও অসাধু ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য ভাঙতে পারেন। জমির দখল, ভাড়াটিয়ার অধিকার এবং বসবাসের ইতিহাসের মতো প্রশ্নে দুর্বল পক্ষের সুরক্ষা প্রয়োজন। অপরাধী সংগঠন দ্রুত ফল দিতে পারে বলে তাকে গ্রহণ করলে সেই সুরক্ষা হারানোর আশঙ্কা থাকে। ফলে সংস্কারের লক্ষ্য শুধু দ্রুত অনুমোদন নয়, ন্যায়সংগত ও নিরাপদ সিদ্ধান্তের পথও তৈরি করা। (তথ্যসূত্র: Menezes and Ghosh, Crime–Business Nexus, 1995.)

নির্মাণক্ষেত্রে অপরাধী গোষ্ঠীর প্রবেশের জন্য কিছু নির্মাতার সক্রিয় ভূমিকার কথাও গবেষণায় এসেছে। জমি বা ফ্ল্যাট খালি করানো, বিরোধ মেটানো এবং স্থানীয় অপরাধীর হাত থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য তাঁরা গোষ্ঠীর সাহায্য নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই সম্পর্কই অর্থ আদায় ও নিয়ন্ত্রণের উৎস হয়ে ওঠে। এখানে সুরক্ষা চাওয়ার সঙ্গে অন্যের ওপর ভয় প্রয়োগের সম্পর্ক মিলেমিশে যেতে পারে। কোনো নির্মাতা নিজে হুমকির শিকার, অন্য কেউ প্রতিপক্ষকে সরাতে অপরাধী শক্তি ব্যবহার করছেন; তাঁদের অবস্থান একই নয়। গোষ্ঠীকে দেওয়া অর্থ আবার নির্মাণব্যবসায় বিনিয়োগ হলে সম্পর্ক আরও জটিল হয়। তখন অপরাধী সংগঠন বাইরে থেকে অর্থ আদায়কারী এবং ভেতরের অর্থদাতা, দুই ভূমিকাতেই উপস্থিত থাকতে পারে। ব্যবসায়িক বিরোধও গোষ্ঠীগত সংঘাতে রূপ নেয়। এই বিন্যাসে বৈধ কাজের সঙ্গে অবৈধ ক্ষমতার মিশ্রণ শহরের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। (তথ্যসূত্র: S. Balakrishnan. 2005. Mafia Calls Trigger Panic among Mumbai Builders. The Times of India, Mumbai, 12 May.)

ওমপ্রকাশ কুকরেজা ও নটবরলাল দেশাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সম্পর্কের অভিযোগ এই বিপদের উদাহরণ। কুকরেজার ক্ষেত্রে ছোট রাজনের ঘনিষ্ঠতার কারণে ডি কোম্পানির হামলার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। দেশাইয়ের ক্ষেত্রে ডি কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কের কারণে গাওলির গোষ্ঠীর ভূমিকার অভিযোগ এসেছে। এসব ঘটনার প্রতিটির নিজস্ব তদন্ত ও বিচার আছে; ব্যবসায়িক সম্পর্ক থেকেই হত্যার দায় নিশ্চিত করা যায় না। তবু এক গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচিতি অন্য গোষ্ঠীর কাছে লক্ষ্য হয়ে ওঠার আশঙ্কা নির্মাণব্যবসার পরিবেশকে অনিরাপদ করে। ব্যবসায়ী হয়তো প্রথমে সুবিধা পাওয়ার জন্য সম্পর্ক গড়েছেন, পরে সেই সম্পর্ক থেকে বেরোনো কঠিন হয়েছে। অপরাধী বিনিয়োগ ফেরত দিতে না পারার কারণে শিল্পপতি বল্লভ ঠক্করের হত্যার যে ব্যাখ্যা প্রচলিত, তাও এই নির্ভরতার বিপদ বোঝায়। অর্থ নেওয়া তখন সাধারণ ঋণের সম্পর্ক থাকে না; তার সঙ্গে প্রাণের ঝুঁকি যুক্ত হতে পারে। (তথ্যসূত্র: Express News Service. 1997. Top Builder Shot Dead at Nariman Point. Financial Express, 20 August; Zaidi and Borges, Mafia Queens of Mumbai, 2011.)

সুনীত খটাউয়ের ১৯৯৪ সালের হত্যাকাণ্ড শিল্প, শ্রম ও অপরাধী শক্তির সম্পর্ককে বিশেষভাবে সামনে আনে। শ্রমিক সংগঠনের নেতা প্রভাত সাঞ্জগিরির মন্তব্য ছিল, “During the 1980s textile strike, Khatau had used criminal gangs to break the strike. He has paid with his life”। এই বক্তব্য একজন রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতার মূল্যায়ন হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে; একে আদালতের সিদ্ধান্তের ভাষা বলে গ্রহণ করা যায় না। খটাউয়ের সঙ্গে গাওলির গোষ্ঠীর যোগাযোগ এবং অমর নায়েকের গোষ্ঠীর হামলার বিবরণ শাবানের আলোচনায় রয়েছে। শ্রমবিরোধে অপরাধী শক্তি ব্যবহার করা হলে শ্রমিকের দাবি, মালিকের সিদ্ধান্ত এবং আলোচনার নিয়ম সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে বিরোধ আইন, আলোচনা ও প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে মেটানো উচিত, তা ভয় ও সহিংসতার হাতে চলে যায়। পরে সেই শক্তি নিয়োগকারী ব্যক্তির ওপরও ফিরে আসতে পারে। শিল্পের ভেতরে অপরাধী মধ্যস্থতার বিপদ তাই কোনো এক পক্ষের নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। (তথ্যসূত্র: Menezes and Ghosh, Crime–Business Nexus, 1995; শাবান, ২০১৭.)

মুম্বইয়ের বস্ত্রকলগুলির জমি অপরাধী গোষ্ঠীর আগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। কারখানার জমিকে শুধু সম্ভাব্য আবাসন বা বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে দেখলে সেখানে বহু বছরের শ্রমের ইতিহাস আড়াল হয়। কলের সঙ্গে শ্রমিকের কাজ, আশপাশের বাসস্থান, ছোট দোকান এবং সামাজিক যোগাযোগ যুক্ত থাকে। উৎপাদনের পরিবর্তন বা জমির পুনর্ব্যবহার এই সম্পর্কগুলিকে বদলে দিতে পারে। ফলে জমির মূল্যবৃদ্ধি একদিকে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধী গোষ্ঠী দ্রুত সমঝোতা বা বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু উন্নয়নের গতি বাড়লেই তার ফল ন্যায়সংগত হয় না। শ্রমিকের প্রাপ্য, বসবাসের অধিকার এবং সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানার সুযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন। জমির বাজারমূল্য ও মানুষের জীবনের মূল্যকে একই হিসাবে নামিয়ে আনা যায় না। এই সীমা ভুলে গেলে উন্নয়নের ভাষার ভেতরেই বর্জনের ইতিহাস তৈরি হয়।

নবি মুম্বইয়ের নির্মাতা সুনীল লাহোরিয়ার ২০১৩ সালের হত্যাকাণ্ডের আলোচনায় নির্মাতা, অপরাধী যোগাযোগ, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশকর্মী এবং পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের অভিযোগ এসেছে। ঘটনাটিকে একটি বৃহত্তর যোগসাজশের প্রশ্ন হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির দায় নির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ একত্র হলে অপরাধী মধ্যস্থতার সুযোগ বাড়তে পারে। একইভাবে গুটখা ব্যবসায়ী রসিকলাল ধারিওয়াল ও জগদীশপ্রসাদ জোশির সঙ্গে ডি কোম্পানির যোগাযোগের দাবি এবং ইস্ট ওয়েস্ট এয়ারলাইনসের থাকিয়ুদ্দিন ওয়াহিদ ও হোটেল ব্যবসায়ী রামনাথ পায়্যাদের হত্যার অভিযোগ শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে আলোচনায় আনে। এই তালিকা থেকে সব শিল্পপতিকে অপরাধী সম্পর্কের অংশ বলা যাবে না। বরং দেখতে হবে, কোন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ভুক্তভোগী, কোন ক্ষেত্রে সহযোগী এবং কোন ক্ষেত্রে সম্পর্কের দাবি প্রমাণিত হয়নি। এই পার্থক্য ছাড়া অর্থনৈতিক ইতিহাস দোষারোপের সাধারণ তালিকায় পরিণত হয়। (তথ্যসূত্র: S. A. Ali. 2013. Navi Mumbai Builder Murder Case: Two More Arrested. The Times of India, Mumbai, 6 March; শাবান, ২০১৭.)

চলচ্চিত্রের সঙ্গে অপরাধজগতের সম্পর্ক আরও জটিল, কারণ এখানে অর্থনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাও রয়েছে। অপরাধী নেতার জীবন থেকে গল্প তৈরি হয়, অভিনেতার চরিত্রে তাঁর ভঙ্গি বা প্রভাবের ছাপ দেখা যায় এবং দর্শকের কল্পনায় ভয় ও আকর্ষণ পাশাপাশি কাজ করে। কিন্তু পর্দার অপরাধী চরিত্র বাস্তব অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগের প্রমাণ নয়। গল্পের উৎস এবং অর্থের উৎস পৃথক প্রশ্ন। হাজি মস্তান, করিম লালা ও ইউসুফ প্যাটেলের সময় থেকে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট যোগাযোগের বিবরণ পাওয়া গেলেও সব ছবি বা সব কর্মী একই ব্যবস্থার অংশ ছিলেন না। চলচ্চিত্র তৈরি করতে প্রযোজক, পরিবেশক, অভিনেতা, প্রযুক্তিকর্মী এবং বহু অস্থায়ী কর্মীর কাজ প্রয়োজন হয়। অর্থের উৎস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের সবার সমান নয়। তাই অপরাধী প্রভাবের অভিযোগ বিচার করতে গেলে শিল্পক্ষেত্রের ভেতরের এই দায়িত্ববণ্টন মনে রাখতে হয়। সাধারণ কর্মীর শ্রম এবং অর্থদাতার সিদ্ধান্ত এক করে দেখা অন্যায়।

চলচ্চিত্রে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা অনানুষ্ঠানিক অর্থের গুরুত্ব বাড়াতে পারে। কাজ শুরু হওয়ার পরেও খরচ বাড়ে, মুক্তির সময় বদলায় এবং আয় নির্ভর করে দর্শকের সাড়া ও পরিবেশনের ওপর। স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ সীমিত থাকলে প্রযোজক ব্যক্তিগত অর্থদাতার কাছে যেতে পারেন। সেই জায়গায় অপরাধী অর্থ প্রবেশ করলে ঋণের সম্পর্ক ভয় ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কে বদলে যায়। কোনো অর্থদাতা অভিনেতা নির্বাচন বা অন্য সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারেন, তবে সেই সম্ভাবনাকে সব ছবির নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। অপরাধী অর্থের দ্রুত লাভ সবসময় নিশ্চিত নয়; চলচ্চিত্র ব্যর্থও হতে পারে। বরং নগদ অর্থের চলাচল, হিসাবের অস্বচ্ছতা এবং পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে চুক্তি এই ক্ষেত্রকে আকর্ষণীয় করতে পারে। অর্থের উৎস যাচাই, লিখিত শর্ত এবং নির্ভরযোগ্য আর্থিক ব্যবস্থা তাই শুধু ব্যবসার সুবিধা নয়, সৃজনশীল স্বাধীনতা রক্ষারও উপায়।

চলচ্চিত্রের আর্থিক ব্যবস্থাকে অপরিবর্তিত বলে দেখানো ঠিক নয়। ১৯৯৮ সালের মে মাসে চলচ্চিত্রকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার পরে ব্যাংকের অর্থায়নের সুযোগ প্রসারিত হয় বলে সরকারি নিরীক্ষার নথিতে উল্লেখ আছে। প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন বাড়লে অনানুষ্ঠানিক অর্থদাতার ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়, যদিও তা একদিনে সব অস্বচ্ছতা দূর করে না। পরবর্তী সময়ে বলিউডের রূপান্তরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক বাজার, প্রবাসী দর্শক এবং নতুন যোগাযোগপ্রযুক্তির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। ফলে নব্বইয়ের দশকের অপরাধী প্রভাবের বিবরণকে বর্তমান চলচ্চিত্রের সম্পূর্ণ ছবি হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত। ইতিহাসের একটি সময়পর্বে যে সমস্যা তীব্র ছিল, পরে তার রূপ ও মাত্রা বদলাতে পারে। পরিবর্তন বোঝার জন্য পুরোনো অভিযোগের পাশাপাশি অর্থায়নের নতুন কাঠামোও দেখতে হয়। এতে চলচ্চিত্রকে স্থায়ীভাবে অপরাধী অর্থের ওপর নির্ভরশীল শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করার বদলে তার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বোঝা সম্ভব। (তথ্যসূত্র: Comptroller and Auditor General of India. 2011. Performance Audit of Taxation of Assessees Engaged in the Film and Television Industry. Report No. 36 of 2010–11. New Delhi: Government of India; Aswin Punathambekar. 2013. From Bombay to Bollywood: The Making of a Global Media Industry. New York: New York University Press.)

গুলশন কুমারের হত্যার সঙ্গে সংগীতপরিচালক নাদিম সাইফির নাম যুক্ত হওয়ার ঘটনাটি অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পার্থক্য স্মরণ করিয়ে দেয়। শাবানের বিবরণে নাদিম, আবু সালেম এবং ডি কোম্পানির যোগাযোগসংক্রান্ত দাবি রয়েছে। কিন্তু নাদিমকে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে নিশ্চিত ঘোষণা করা যায় না। যুক্তরাজ্যে তাঁকে ভারতে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল; সেই বিচারিক ইতিহাস উল্লিখিত অভিযোগের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং ভারতের কোনো মামলায় পূর্ণাঙ্গ বিচার শেষে খালাস পাওয়া একই বিষয় নয়, আবার অভিযোগ ওঠা এবং দোষী হওয়াও এক নয়। ইতিহাসের ভাষায় এই পৃথক অবস্থানগুলি বজায় রাখা প্রয়োজন। প্রযোজক মুকেশ দুগ্গলের হত্যাকে গোষ্ঠী পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং অন্য চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার প্রতিশোধমূলক ব্যাখ্যাও একই সতর্কতার দাবি রাখে। প্রতিটি ঘটনার প্রমাণ পৃথক; প্রচলিত কাহিনি দিয়ে দায় স্থির করা চলে না। (তথ্যসূত্র: The Times of India. 2013. How India Broke the UK Extradition Jinx. 29 March; শাবান, ২০১৭.)

হাওয়ালার প্রসঙ্গে অপরাধী অর্থের সীমান্ত অতিক্রমের প্রশ্ন আসে। চাঁদাবাজির অর্থ বিদেশে থাকা নেতার কাছে পৌঁছানোর জন্য অনানুষ্ঠানিক আর্থিক যোগাযোগ ব্যবহারের অভিযোগ গবেষণায় রয়েছে। কিন্তু হাওয়ালা শব্দ ব্যবহার করলেই নির্দিষ্ট কোনো লেনদেনের অপরাধ প্রমাণিত হয় না। অর্থের উৎস, গন্তব্য, হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজ জানতে হয়। অপরাধী সংগঠন যখন মধ্যস্থ ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ পাঠায়, তখন নগদের সরাসরি চলাচল এবং হিসাবের সমন্বয় ভিন্ন জায়গায় ঘটতে পারে। এই ব্যবস্থার গোপনীয়তা তদন্তকে কঠিন করে, কারণ দৃশ্যমান অর্থের পথ সবসময় প্রকৃত স্বার্থের পথ দেখায় না। চলচ্চিত্র, আবাসন বা অন্য ব্যবসার আয়কে অপরাধী অর্থের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলে সমস্যা আরও বাড়ে। ফলে অপরাধ দমনে শুধু অস্ত্র বা হামলার তদন্ত যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক সম্পর্ক বোঝাও জরুরি। এই প্রবাহ বুঝতে পারলে স্থানীয় ব্যবসার চাপ এবং বিদেশে থাকা নেতৃত্বের ক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

১৯৯৩ সালের ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পরে মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমনের তৎপরতা বাড়ে। বহু অপরাধী গোষ্ঠীর ওপর অভিযান এবং সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনা জনপরিসরে পুলিশের বিশেষ কিছু কর্মকর্তাকে পরিচিত করে তোলে। তাঁদের সাফল্য প্রায়ই নিহত মানুষের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা হয়েছে। এই পরিমাপের সীমা গভীর। কোনো ঘটনায় আত্মরক্ষার জন্য বলপ্রয়োগ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু মানুষের মৃত্যু নিজে আইন প্রয়োগের মানের প্রমাণ নয়। গ্রেপ্তার, নির্ভরযোগ্য তদন্ত, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং আদালতে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার কাজও পুলিশের দায়িত্ব। শুধু দ্রুত ফলকে গুরুত্ব দিলে এই দীর্ঘ কাজগুলি আড়ালে চলে যায়। অপরাধী সংগঠনের ভয় থেকে মুক্তি চাওয়া নাগরিকের আকাঙ্ক্ষা বাস্তব, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা তুলে দেয় না। নিরাপত্তা তখনই স্থায়ী হয়, যখন আইন প্রয়োগ নাগরিকের আস্থা বাড়ায় এবং নির্দোষ মানুষের ওপর একই ভয় সৃষ্টি করে না।

পুলিশের এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞদের একসময় “heroes” এবং পরে “villains” হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তন জনমতের অস্থিরতা প্রকাশ করে। এই দুই পরিচয়ই মানুষের বাস্তব কাজকে সংকুচিত করতে পারে। কোনো কর্মকর্তার সাহস বা কার্যকর অভিযান প্রশংসনীয় হতে পারে, আবার তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও তদন্তযোগ্য। প্রশংসা দিয়ে অভিযোগ বাতিল করা যায় না, অভিযোগ দিয়ে প্রতিটি কাজকে একভাবে বিচার করাও ঠিক নয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্রাইম ব্রাঞ্চ কর্মকর্তার বক্তব্য ছিল, “Nobody asked whether they were following legal procedures, neither did the team care to follow any standing order or manual”। এই মন্তব্য পরিচয় গোপন রাখা একজন সূত্রের সমালোচনা হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। তার গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু তা প্রত্যেক সংঘর্ষের পৃথক তদন্তের বিকল্প নয়। বরং এটি প্রশ্ন তোলে, দ্রুত সাফল্যের জনসমর্থন কি নিয়ম মানার প্রয়োজনকে দুর্বল করে দিয়েছিল। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রতিষ্ঠানের নির্দেশ, তদন্তের নথি এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত দেখতে হয়। (তথ্যসূত্র: D. Panigrahi. 2010. Heroes Once, Now in City Police’s Hall of Shame. Hindustan Times, 10 January.)

খ্বাজা ইউনুসের ঘটনা এই আলোচনার অন্যতম গুরুতর উদাহরণ। মহারাষ্ট্রের পরভণির সাতাশ বছর বয়সি এই প্রকৌশলীকে ২০০২ সালের ঘাটকোপার বিস্ফোরণের তদন্তে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে পুলিশি হেফাজত থেকে তাঁর নিখোঁজ হওয়া এবং হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলে। পুলিশ প্রথমে পালিয়ে যাওয়ার বিবরণ দিয়েছিল, কিন্তু নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ সেই বিবরণকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। তাঁর দেহ নষ্ট করা বা লুকোনোর বিষয়ে যে বিস্তারিত দাবি প্রচারিত হয়েছে, তা অভিযোগের সীমা মেনেই লিখতে হয়। প্রত্যেক অভিযুক্ত কর্মকর্তার ভূমিকা আলাদা প্রমাণের বিষয়। একটি পরিবারের কাছে এই ইতিহাস শুধু আইনি বিরোধ নয়; প্রিয়জনের মৃত্যু সম্পর্কে সত্য জানার অপেক্ষা এবং প্রতিকার পাওয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্বের ব্যর্থতার অভিযোগ বিশেষ গুরুত্বে তদন্ত করা প্রয়োজন। (তথ্যসূত্র: K. Tare. 2012. Ghatkopar Blast Case: Khwaja Yunus Died of Cold Water, Reveals Encounter Specialist. India Today, 1 March; The Indian Express. 2021. Explained: Sachin Waze and the Alleged Khwaja Yunus Custodial Death Case. 15 March.)

প্রদীপ শর্মা, বিজয় সালাসকর, রবীন্দ্রনাথ আঙ্গ্রে, প্রফুল ভোসলে এবং দয়া নায়েকের মতো কর্মকর্তাদের নাম সংঘর্ষে বহু মৃত্যুর বিবরণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রদীপ শর্মার ক্ষেত্রে ১০৭, বিজয় সালাসকরের ক্ষেত্রে ৫০, আঙ্গ্রের ক্ষেত্রে ৫২ এবং দয়া নায়েকের ক্ষেত্রে ৮৬ জনের মৃত্যুর দাবি বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে এসেছে। এগুলি সংবাদে প্রচারিত সংখ্যা, প্রত্যেক ঘটনার বৈধতা সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়। একইভাবে অমর নায়েক বা সুরেশ মঞ্চেকরের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিচিতি গড়ে উঠলেও ঘটনাগুলি মূল্যায়ন করতে নির্দিষ্ট তদন্ত প্রয়োজন। এক ব্যক্তির নামে বেশি মৃত্যু নথিভুক্ত হওয়া তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ বা অপরাধী, কোনো পরিচয়েই স্থির করে না। প্রশ্ন হলো, বলপ্রয়োগ প্রয়োজনীয় ছিল কি না, নিয়ম মানা হয়েছিল কি না এবং মৃত্যুর পরে নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছিল কি না। সংখ্যার পরিবর্তে এই প্রশ্নগুলি কেন্দ্রে আনলেই আইন প্রয়োগের মান বিচার করা সম্ভব। (তথ্যসূত্র: Panigrahi, Heroes Once, Now in City Police’s Hall of Shame, 2010; Mumbai Mirror. 2006. Speed Up the Probe against Daya Nayak. 11 January.)

দয়া নায়েকের জনপ্রিয়তা এবং তাঁকে ঘিরে চলচ্চিত্রের উপস্থাপন পুলিশের কাজকে জনকল্পনায় বিশেষ স্থান দেয়। ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘কাগার’, ‘আন’ এবং অন্যান্য ছবির সঙ্গে তাঁর পরিচিতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চলচ্চিত্র বাস্তব ব্যক্তির কিছু বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু পর্দার চরিত্র কোনো কর্মকর্তার কাজের নির্ভুল নথি নয়। বাস্তবে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও পরিচিত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ ওঠে, ২০০৬ সালে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা ঘটে এবং ২০১২ সালে সেই আদেশ প্রত্যাহারের বিবরণ পাওয়া যায়। অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্ত এবং চাকরিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত প্রত্যেকটি পৃথক অবস্থান। একটিকে অন্য সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে দেখা যায় না। জনপ্রিয় চরিত্রের প্রতি দর্শকের আবেগ কখনো বাস্তব কর্মকর্তার মূল্যায়নকে প্রভাবিত করে। তাই চলচ্চিত্রের স্মৃতি থেকে দূরে দাঁড়িয়ে নথি ও প্রমাণের সাহায্যে কাজ বিচার করা প্রয়োজন। (তথ্যসূত্র: P. Marpakwar. 2009. Daya Nayak to Remain out of Office. The Times of India, Mumbai, 11 January; শাবান, ২০১৭.)

সচিন ওয়াজে, অরুণ বরুদে, রাজরাম ভানমানে, হেমন্ত দেশাই এবং অশোক খোটের নাম খ্বাজা ইউনুসের ঘটনাসংক্রান্ত অভিযোগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁদের সবাইকে একই ভূমিকায় অভিযুক্ত কিংবা একইভাবে দোষী বলে লেখা যাবে না। কে তদন্তে সন্দেহভাজন, কার বিরুদ্ধে মামলা চলেছে এবং কার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আসলাম মোমিনের ক্ষেত্রে অপরাধী যোগাযোগের অভিযোগে চাকরিচ্যুতির বিবরণ এবং প্রকাশ ভান্ডারির ক্ষেত্রে বেআইনি সম্পদের অভিযোগে বদলির প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। পুরোনো প্রতিবেদনের অবস্থানকে অনির্দিষ্ট বর্তমান কালে বহাল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রশাসনিক শাস্তি, ফৌজদারি বিচার এবং পরবর্তী আপিলের পথ আলাদা। এসব ঘটনার মূল তাৎপর্য হলো, পুলিশের ক্ষমতার ব্যবহারও অনুসন্ধান ও জবাবদিহির বাইরে নয়। একজন কর্মকর্তার পরিচিতি বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ পরীক্ষা বন্ধ করতে পারে না। (তথ্যসূত্র: S. A. Ali. 2006. Central Intelligence Unit under Scanner. The Times of India, Mumbai, 24 January; Marpakwar, 2009.)

নিতিন ভিচারের বিরুদ্ধে স্ট্যাম্প পেপার জালিয়াতির ঘটনায় যোগাযোগের অভিযোগ, রাজেশ ধনওয়াড়ের বিরুদ্ধে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের অনুসন্ধান এবং শিবরাম কদমের সম্পদসংক্রান্ত বিবরণ পুলিশের ভেতরে অর্থনৈতিক অনিয়মের প্রশ্ন তোলে। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগের সময়, তদন্তের ধাপ এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত আলাদা করে দেখতে হয়। শাবানের আলোচনায় শিবরাম কদমের মাসিক বেতন ও বিপুল সম্পদের তুলনা ব্যবহার করা হয়েছে। এই তুলনা অনুসন্ধানের কারণ হতে পারে, কিন্তু সম্পদের বৈধতা স্থির করতে আয়ের উৎস, সম্পত্তির হিসাব এবং প্রযোজ্য প্রমাণ পরীক্ষা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো কর্মকর্তা নির্মাণব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন বলে সব আয় বেআইনি হয়ে যায় না; কর্তৃত্বের অপব্যবহার হয়েছে কি না, সেটিই বিচার্য। পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ ক্ষোভের মধ্যে নির্দিষ্ট তথ্যের গুরুত্ব আরও বাড়ে। তথ্যনির্ভর অনুসন্ধান ছাড়া একদিকে অভিযোগ অতিরঞ্জিত হয়, অন্যদিকে প্রকৃত অনিয়মও অস্পষ্ট সাধারণ কথার আড়ালে হারিয়ে যায়। (তথ্যসূত্র: S. A. Ali. 2010. Yunus Death: Fate Catches up with Cops. The Times of India, Mumbai, 7 December; S. A. Ali. 2012. Senior Inspector Suspended in Illegal Assets Case. The Times of India, Mumbai, 27 June; Mumbai Mirror, 11 January 2006.)

দোকানি, ফেরিওয়ালা কিংবা গাড়ির চালকের কাছ থেকে বেআইনি অর্থ আদায়ের অভিযোগ পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ককে সবচেয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। ছোট অঙ্কের অর্থও কম আয়ের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, আইন রক্ষাকারীর উপস্থিতি নিরাপত্তার বদলে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে শুরু করে। কেউ কাজের জায়গায় টিকে থাকার জন্য অর্থ দেন, কেউ হয়রানি এড়াতে দেন, কেউ অভিযোগ করার পথ জানেন না। এই অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমায় এবং ব্যক্তিগত মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন বাড়াতে পারে। কিন্তু পুলিশকে সামগ্রিকভাবে অপরাধী প্রতিষ্ঠান বলে ঘোষণা করলে সৎ কর্মীদের কাজ ও বাস্তব নিরাপত্তার দায়িত্ব আড়াল হয়। যথাযথ সমালোচনায় নির্দিষ্ট অনিয়ম চিহ্নিত করতে হয় এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পথ রাখতে হয়। এতে জনআস্থা রক্ষা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা পরস্পরের সহায়ক হয়। প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার কার্যকর উপায় অভিযোগ গোপন করা নয়, সেগুলির নিরপেক্ষ পরীক্ষা। (তথ্যসূত্র: R. Shrinivasan. 2005. Tainted Cops Go Scot-free While Police Carry out Token Reforms. The Times of India, Mumbai, 6 September.)

পুলিশি সংঘর্ষে মৃত্যু সম্পর্কে বিচারিক নির্দেশ এই জবাবদিহির ভিত্তিকে স্পষ্ট করেছে। ২০১৪ সালে পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ বনাম মহারাষ্ট্র মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন ও কার্যকর তদন্তের জন্য নিয়ম নির্ধারণ করে। ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করা, মামলা রুজু, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচারিক অনুসন্ধানের মতো বিষয় সেখানে গুরুত্ব পায়। এগুলি পুলিশের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ নয়; বলপ্রয়োগের সত্যতা যাচাই এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা। অপরাধী সন্দেহে থাকা মানুষও আইনের সুরক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান না। আত্মরক্ষার প্রয়োজন থাকলে তার প্রমাণ থাকতে হবে, আর অতিরিক্ত বা সাজানো বলপ্রয়োগ হলে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে। এই নিয়ম মেনে তদন্ত পুলিশের বৈধ কাজকেও বিশ্বাসযোগ্য করে, কারণ তখন অভিযোগের উত্তর কেবল প্রতিষ্ঠানের নিজের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আইন প্রয়োগের শক্তি ও তার ওপর নিয়ন্ত্রণ তাই পরস্পরের বিরোধী নয়। (তথ্যসূত্র: Supreme Court of India. People’s Union for Civil Liberties v. State of Maharashtra, judgment dated 23 September 2014, Criminal Appeal No. 1255 of 1999.)

অপরাধসংক্রান্ত পরিসংখ্যান ব্যবহার করার সময়ও একই সতর্কতা প্রয়োজন। সংঘর্ষে নিহত মানুষ, গোষ্ঠীর হামলায় নিহত মানুষ, অন্য অপরাধে মৃত্যু এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা আলাদা সূচক। একটির বৃদ্ধি থেকে অন্যটির কারণ সরাসরি বোঝা যায় না। বেশি গ্রেপ্তার কার্যকর পুলিশি তৎপরতার লক্ষণ হতে পারে, আবার অপরাধের বিস্তারও নির্দেশ করতে পারে; মামলার ফল ও ঘটনার প্রকৃতি ছাড়া সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ থাকে। নিহত মানুষের সংখ্যাকে সাফল্যের তালিকায় রাখলে তদন্ত ও ন্যায়বিচারের মান আড়াল হতে পারে। মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের ঐতিহাসিক তথ্য অপরাধী সংঘাতের মাত্রা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংখ্যার শ্রেণিবিভাগ ও সময়সীমা অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়। কোনো বছরের আংশিক হিসাবকে পূর্ণ বছরের সঙ্গে একইভাবে তুলনা করা চলে না। তাই পরিসংখ্যানের কাজ শুধু নাটকীয় বৃদ্ধি বা হ্রাস দেখানো নয়; কী গণনা করা হয়েছে এবং কী বাদ গেছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনা। (তথ্যসূত্র: Crime Branch, Mumbai Police. Crimes Involving Gangsters in Mumbai, 1993–2005. Reproduced in Shaban, Underworld and the Police in Mumbai, 2017, Table 7.1, p. 128.)

শিল্পপতি, চলচ্চিত্রকর্মী, নারী সহযোগী এবং পুলিশকর্মীর এই বিভিন্ন ইতিহাস একত্রে পড়লে অপরাধী ক্ষমতার সামাজিক গভীরতা বোঝা যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থ, পরিচিতি এবং ভয় ভিন্নভাবে কাজ করেছে। কোথাও ব্যবসায়ী অপরাধী শক্তিকে ব্যবহার করেছেন, কোথাও নিজেই তার শিকার হয়েছেন। কোথাও নারী সংগঠনের কাজ সামলেছেন বলে অভিযোগ আছে, কোথাও ব্যক্তিগত সম্পর্কই সন্দেহের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। কোথাও পুলিশ অপরাধ দমন করেছে, কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এই ভিন্ন অবস্থানগুলিকে এক করে দিলে ইতিহাস সহজ হয়, কিন্তু সত্যের কাছাকাছি আসে না। বরং সম্পর্কের প্রকৃতি, সময় এবং প্রমাণ পৃথকভাবে বিচার করতে হয়। এতে অপরাধকে কেবল প্রান্তিক এলাকার সমস্যা হিসেবে দেখার সীমাও স্পষ্ট হয়। সংগঠিত অপরাধ দীর্ঘদিন টিকে থাকলে তার সঙ্গে ধনী ব্যবসা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার যোগাযোগ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

মুম্বইয়ের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে কেন্দ্রে রাখলে এই ইতিহাসের তাৎপর্য বদলে যায়। তখন অপরাধী নেতার খ্যাতি বা কোনো কর্মকর্তার মৃত্যুসংখ্যা আলোচনার শেষ কথা থাকে না। প্রশ্ন হয়, দোকানি ভয় ছাড়া কাজ করতে পারেন কি না, শ্রমিকের দাবি বলপ্রয়োগে চাপা পড়ে কি না এবং চলচ্চিত্রকর্মী নিজের পেশায় স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি না। কারও পরিবারের সদস্য গ্রেপ্তার হলে তাঁর অবস্থান জানা যায় কি না, অভিযোগ জানালে প্রতিকার পাওয়া যায় কি না এবং বিচার বিলম্বিত হলে মানুষ কীভাবে অপেক্ষা করেন, সেসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা শুধু দৃশ্যমান অপরাধ কমার নাম নয়; তা প্রতিদিনের জীবনে অধিকার ব্যবহার করার নিশ্চয়তা। অপরাধী পৃষ্ঠপোষকের কাছে সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন কমাতে হলে প্রকাশ্য প্রতিষ্ঠানকে নির্ভরযোগ্য হতে হয়। সেই নির্ভরযোগ্যতা গড়ে ওঠে নিয়মিত সেবা, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার ব্যবহারে জবাবদিহি থেকে।

অপরাধী মধ্যস্থতা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ব্যবসার দৈনন্দিন নিয়মও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিরোধের লিখিত নথি না থাকলে কিংবা অর্থের শর্ত অস্পষ্ট হলে শক্তিমান ব্যক্তির কাছে যাওয়ার প্রলোভন বাড়তে পারে। কিন্তু সেই সহজ পথ ভবিষ্যতে নতুন দাবি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। স্বচ্ছ চুক্তি, হিসাবের ধারাবাহিকতা এবং সময়মতো ন্যায়সংগত প্রতিকার ব্যবসায়ীকে নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে। এখানে বড় ও ছোট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা সমান নয়। ক্ষুদ্র দোকানি বা নতুন প্রযোজকের পক্ষে দীর্ঘ মামলা চালানো কঠিন হতে পারে। তাই আনুষ্ঠানিক প্রতিকারকে শুধু কাগজে খোলা রাখলে যথেষ্ট হয় না; খরচ, সময় ও নিরাপত্তার দিক থেকেও তা ব্যবহারযোগ্য হতে হয়। মানুষের এই বাস্তব বাধাগুলি কমানো গেলে অপরাধী সমঝোতার চাহিদাও সংকুচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সৎ পুলিশকর্মীর কাজ এই পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য। তাঁকে প্রতিদিন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তথ্য যাচাই করতে হয় এবং কখনো সীমিত উপকরণে দায়িত্ব সামলাতে হয়। অপরাধী গোষ্ঠীর ভয়, রাজনৈতিক চাপ কিংবা সহকর্মীর অসাধু যোগাযোগ তাঁর কাজকেও কঠিন করতে পারে। ফলে জবাবদিহির ব্যবস্থার সঙ্গে যথাযথ প্রশিক্ষণ, স্পষ্ট নির্দেশ এবং কাজের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও প্রয়োজন। নিয়ম মেনে কাজ করা কর্মকর্তাকে যদি ধীর বা অকার্যকর বলে অবজ্ঞা করা হয়, তবে দ্রুত ফল দেখানোর চাপ বাড়ে। আবার নিয়ম ভাঙার সাফল্য পুরস্কৃত হলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ভুল প্রত্যাশা তৈরি হয়। কার্যকর মূল্যায়নে তদন্তের মান, অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং নাগরিকের সঙ্গে আচরণকে গুরুত্ব দিতে হয়। এতে সৎ কাজের স্বীকৃতি এবং অনিয়মের বিচার একই প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যের অংশ হয়ে ওঠে।

ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা এই আলোচনাকে আরও নির্দিষ্ট করে। একই ঘটনায় কেউ অর্থ হারান, কেউ কাজের স্বাধীনতা হারান, কেউ পরিবারের সদস্য হারিয়ে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় আটকে যান। অপরাধী সংগঠনের শক্তি কিংবা পুলিশের অভিযানের পরিসংখ্যানে এই ক্ষতির সব দিক ধরা পড়ে না। একজন সাক্ষী ভয় পেলে তাঁর নীরবতা মামলাকে দুর্বল করে, কিন্তু সেই নীরবতা সম্মতির প্রমাণ নয়। একজন ব্যবসায়ী অর্থ দিলে সেটিও সবসময় স্বেচ্ছায় সহযোগিতা নয়। এই পার্থক্য বুঝতে মানুষের কথা নিরাপদে শোনার পরিবেশ প্রয়োজন। ঘটনার পরে তাঁদের জীবিকা ও সামাজিক অবস্থান কীভাবে বদলেছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বিচার শুধু অভিযুক্তের পরিচয় নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়ারও একটি পথ। এই স্বীকৃতি তাঁদের ক্ষতি ফিরিয়ে দেয় না, কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠার পথে তাঁদের অবস্থানকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।

অপরাধজগতের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নগরের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের ইতিহাসও। বৈধ ব্যবসা যদি ভয়কে নিজের সুবিধার হাতিয়ার করে, রাজনীতি যদি অপরাধী প্রভাবকে সমর্থনের বিনিময়ে গ্রহণ করে এবং পুলিশ যদি নিয়মের বাইরে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে, তবে অপরাধ শুধু গোপন গোষ্ঠীর মধ্যে থাকে না। তা প্রকাশ্য জীবনের স্বাভাবিক সম্পর্ককে বদলে দেয়। এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে নির্দিষ্ট অপরাধের বিচার প্রয়োজন, পাশাপাশি সেই অপরাধকে কার্যকর করা সুযোগ ও নির্ভরতাও কমাতে হয়। স্বচ্ছ অর্থায়ন, শ্রমিক ও বাসিন্দার অধিকার, অভিযোগ জানানোর নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত এই কাজের বিভিন্ন দিক। কোনো এক ব্যবস্থায় সব সমস্যার সমাধান হবে না, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়মের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব। মুম্বইয়ের সমৃদ্ধির মূল্য তখনই গভীর হয়, যখন সেই সমৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণ মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সম্পর্ক দৃঢ় হয়। শহরের আলো কেবল উঁচু ভবন ও পর্দার জৌলুশে নয়, মানুষের নির্ভয়ে বেঁচে থাকার সুযোগেও প্রকাশ পায়।

মুম্বইয়ের পরিচয় তার সমুদ্রতীর, চলচ্চিত্র, বাণিজ্য কিংবা রাতের আলোকোজ্জ্বল ব্যস্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই শহরের ইতিহাসে পাশাপাশি লেখা আছে অভিবাসী শ্রমিকের সংগ্রাম, পাড়ার সহাবস্থান, অপরাধচক্রের বিস্তার এবং বারবার ফিরে আসা সহিংসতার অভিজ্ঞতা। যে মহানগর নানা ভাষা, ধর্ম ও অঞ্চল থেকে আসা মানুষকে কাজের সূত্রে কাছাকাছি এনেছে, সেই মহানগরই কখনো সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সন্ত্রাসের আঘাতে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। বোমা বিস্ফোরণ এখানে শুধু জনজীবন থামায়নি; মানুষের পরিচিত পথ, যাতায়াতের অভ্যাস এবং প্রতিবেশীর প্রতি আস্থাকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। অন্যদিকে, অপরাধজগতের সঙ্গে রাজনীতি, ব্যবসা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশের যোগাযোগ শহরের নিরাপত্তাকে আরও জটিল করেছে। ফলে মুম্বইয়ের অন্ধকার ইতিহাস বুঝতে হলে বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিবরণ ছাড়িয়ে দেখতে হয় ক্ষমতার বণ্টন, জীবিকার সংকট এবং ন্যায়বিচারের নাগাল কতটা অসমভাবে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আবদুল শাবানের আলোচনা এই বৃহত্তর সামাজিক পরিসরের মধ্যেই অপরাধজগতের বিকাশকে বিচার করার সুযোগ দেয়। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai. In N. Jayaram, ed., Social Dynamics of the Urban: Studies from India. Exploring Urban Change in South Asia. New Delhi: Springer, pp. 115–134. DOI: 10.1007/978-81-322-3741-9_7.)

শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা বলতে কেবল পুলিশের সংখ্যার ঘাটতি বা প্রশাসনিক তৎপরতার অভাব বোঝালে এই সমস্যার সম্পূর্ণ চেহারা ধরা পড়ে না। অভিযোগ গ্রহণে অনীহা, তদন্তে পক্ষপাত, রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার এবং বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষাও নাগরিক নিরাপত্তার ভিত দুর্বল করে। কোনো এলাকায় মানুষ যদি মনে করে বিপদের সময় রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে না, তবে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অপরাধী গোষ্ঠীর কাছে আশ্রয় খোঁজার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সেই আশ্রয় কখনো সাময়িক সুরক্ষা দিলেও বিনিময়ে আনুগত্য, অর্থ বা নীরবতা দাবি করে। এইভাবে অপরাধচক্র রাষ্ট্রের অনুপস্থিত জায়গা দখল করে এবং নাগরিকের অধিকারকে ব্যক্তিগত অনুগ্রহে নামিয়ে আনে। ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়। তখন নিরাপত্তার প্রশ্ন সাধারণ মানুষের সমান অধিকার থেকে সরে গিয়ে কোনো গোষ্ঠীকে রক্ষা ও অন্য গোষ্ঠীকে সন্দেহ করার সংকীর্ণ কাঠামোয় আটকে পড়ে।

অপরাধজগৎ ও ধর্মীয় চরমপন্থার সম্পর্কও সতর্কভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। অর্থ উপার্জন, এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়িক আধিপত্য সাধারণত সংগঠিত অপরাধের প্রধান লক্ষ্য; মতাদর্শগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টি সন্ত্রাসী সংগঠনের উদ্দেশ্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিন্তু অর্থের প্রবাহ, যোগাযোগ, অস্ত্র কিংবা স্থানীয় সহযোগিতার প্রয়োজন কোনো কোনো ঘটনায় এই পৃথক জগতকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। তাই তাদের যোগাযোগের সম্ভাবনা বোঝা জরুরি, আবার প্রতিটি বিস্ফোরণকে একই অপরাধচক্রের কাজ বলে ধরে নেওয়াও ভুল। একইভাবে একটি অপরাধী সংগঠনের সদস্যদের ধর্মীয় পরিচয় থেকে কোনো বৃহত্তর সম্প্রদায়ের দায় নির্ধারণ করা যায় না। অপরাধের দায়িত্ব ব্যক্তির কাজ, সংগঠনের ভূমিকা এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হয়। এই পার্থক্য বজায় না রাখলে সহিংসতার ব্যাখ্যাই নতুন বিদ্বেষের ভাষা হয়ে উঠতে পারে এবং যে বহুধর্মীয় জীবনকে রক্ষা করার কথা বলা হচ্ছে, সেই জীবন আরও সংকুচিত হয়।

মুম্বইয়ের ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ইতিহাসে ১২ মার্চ ১৯৯৩ একটি ভয়াবহ বাঁক। সরবরাহ করা ছকে প্রথম ঘটনাটির তারিখ ২ মার্চ ১৯৯২ লেখা হলেও বিচারিক নথি অনুযায়ী সঠিক তারিখ ১২ মার্চ ১৯৯৩। শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিস্ফোরণ ঘটে এবং অসংখ্য মানুষ নিহত ও আহত হন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি পরবর্তী রায়ে এই ঘটনায় ২৫৭ জনের মৃত্যু ও ৭১৩ জনের আহত হওয়ার উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং দাউদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এই ঘটনাকে শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। তবে তদন্তে কোনো নাম উঠে আসা, অভিযুক্ত হওয়া এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া পৃথক অবস্থা। ঘটনাটির আলোচনা করতে গিয়ে এই পার্থক্য মুছে দেওয়া চলে না। বিস্ফোরণের নৃশংসতা ও নিহত মানুষের স্মৃতির প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানোর একটি উপায় হলো তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা। (তথ্যসূত্র: Supreme Court of India. C.B.I. v. Karimullah Osan Khan. Judgment dated 4 March 2014, available at https://indiankanoon.org/doc/180041906/; S. Hussain Zaidi. 2002. Black Friday: The True Story of the Bombay Bomb Blasts. New Delhi: Penguin Books.)

এই হামলার আগে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে শহর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। সেই সহিংসতার স্মৃতি, ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতা বিস্ফোরণের পরবর্তী প্রতিক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। কিন্তু কোনো পূর্ববর্তী অন্যায় পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের নৈতিক বা আইনি অনুমোদন হয়ে উঠতে পারে না। দাঙ্গায় নিহত মানুষ এবং বিস্ফোরণে নিহত মানুষ উভয়েই রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের অধিকারী। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতিতে পরিণত করলে অপরাধীদের জবাবদিহি দুর্বল হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির দাবি রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় আটকে যায়। শহরের ইতিহাসে এই দুটি ঘটনার সম্পর্ক বোঝার প্রয়োজন আছে, তবে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা এবং প্রতিশোধকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ। একটি দায়িত্বশীল বিবরণ তাই সহিংসতার সামাজিক পটভূমি তুলে ধরে, একই সঙ্গে প্রত্যেক নিরপরাধ মানুষের জীবনের সমান মূল্য স্বীকার করে। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2012. Ethnic Politics, Muslims and Space in Contemporary Mumbai. In Abdul Shaban, ed., Lives of Muslims in India: Politics, Exclusion and Violence. New Delhi: Routledge, pp. 208–225.)

১৯৯৩ সালের পরে শহর যে স্থায়ী শান্তিতে ফিরে গিয়েছিল, পরবর্তী ঘটনাপঞ্জি তা বলে না। ২০০২ সালের ২ ডিসেম্বর ঘাটকোপারে একটি বাসে বিস্ফোরণ ঘটে। সরবরাহ করা সংকলনে এই ঘটনায় দুজন নিহত ও ৩১ জন আহত হওয়ার হিসাব রয়েছে। একই বছরের ৬ ডিসেম্বর মুম্বই সেন্ট্রাল রেলস্টেশনের খাবারের চত্বরে আরেকটি বিস্ফোরণে ২৫ জন আহত হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর ২০০৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ভিলে পার্লে রেলস্টেশনের বাইরে একটি বাণিজ্যিক এলাকার কাছে রাখা সাইকেলকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরণের খবর আসে। সংশ্লিষ্ট সংকলনে সেখানে মৃত্যুর উল্লেখ না থাকলেও ৩৫ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই ঘটনাগুলির স্থান নির্বাচন লক্ষ করলে বোঝা যায়, হামলার আঘাত পড়ছিল সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের চলাচলের পরিসরে। বাস, স্টেশন বা কেনাকাটার জায়গা মানুষের কাছে অভ্যাসের নিরাপত্তা বহন করে; সেখানেই বিস্ফোরণ ঘটলে শহরের পরিচিত জীবন আচমকা সন্দেহের মধ্যে পড়ে। (তথ্যসূত্র: The Times of India. 2003. Chronology of Mumbai Blasts Since Dec 2002. 25 August; Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai, in Social Dynamics of the Urban: Studies from India. New Delhi: Springer, Table 7.2, p. 130.)

২০০৩ সালের ১৩ মার্চ মুলুন্ড রেলস্টেশনে একটি লোকাল ট্রেনে বিস্ফোরণ এবং ২৫ আগস্ট গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া ও জাভেরি বাজারে বিস্ফোরণ শহরের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। সরবরাহ করা ছকে মুলুন্ডের ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত এবং আগস্টের হামলায় ৪৬ জন নিহত ও ১৬০ জন আহত হওয়ার উল্লেখ রয়েছে। এসব সংখ্যাকে সংশ্লিষ্ট সংকলনের হিসাব হিসেবে পড়তে হবে; ঘটনার পরপর প্রকাশিত খবর ও পরবর্তী হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। জাভেরি বাজারের মতো ঘন বাণিজ্যিক অঞ্চল এবং গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ার মতো পরিচিত পর্যটনস্থল শহরের দুই ভিন্ন মুখকে একসঙ্গে সামনে আনে। একদিকে প্রতিদিনের ব্যবসা ও জীবিকা, অন্যদিকে দেশের বাইরে পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা নগরের পরিচিতি। সেখানে হামলা জীবনহানির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রতীকী আতঙ্ক তৈরি করে। নিহতের সংখ্যা সেই আঘাতের অপরিহার্য মাপকাঠি, কিন্তু জীবিকা হারানো পরিবার ও আহত মানুষের দীর্ঘ চিকিৎসার অভিজ্ঞতাও তার অংশ। (তথ্যসূত্র: Outlook. 2011. Chronology of Major Bomb Blasts in Mumbai. 13 July; reproduced in Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai. New Delhi: Springer, Table 7.2, p. 130.)

২০০৬ সালের ১১ জুলাই লোকাল ট্রেনে সাতটি বিস্ফোরণ মুম্বইয়ের দৈনন্দিন জীবনকে আবার বিপর্যস্ত করে। লোকাল রেল এই শহরের শ্রম, সময় এবং দূরত্বকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। দূরের বসতি থেকে কাজের জায়গায় পৌঁছানোর জন্য অসংখ্য মানুষের কাছে এর বিকল্প অল্প। ফলে ট্রেনে হামলা শুধু যাত্রীদের ওপর আক্রমণ নয়, শহরের শ্রমজীবনের চলমান অবকাঠামোর ওপরও আঘাত। সরবরাহ করা ছকে এই ঘটনায় ১৮১ জন নিহত ও প্রায় ৭০০ জন আহত হওয়ার পুরোনো হিসাব আছে। এই সংখ্যাকে সেই প্রকাশনার সময়কার তথ্য হিসেবেই উল্লেখ করা উচিত। পরবর্তী নথি ব্যবহার করলে তার সময় ও উৎসও আলাদা করে দেখাতে হয়। বিস্ফোরণের মুহূর্তে যাঁরা প্রাণ হারান, তাঁদের পাশাপাশি বেঁচে থাকা আহত যাত্রীদের জীবনেও স্থায়ী পরিবর্তন আসে। কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, চিকিৎসার খরচ এবং ট্রেনে উঠতে ভয় পাওয়া অনেক পরিবারের কাছে বিপর্যয়ের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai. In N. Jayaram, ed., Social Dynamics of the Urban: Studies from India. New Delhi: Springer, Table 7.2, p. 130.)

এই মামলার পরবর্তী বিচারিক ইতিহাস দেখায়, ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রেও তদন্তের মান ও প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই বোম্বে হাইকোর্ট মামলার বারোজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে খালাস দেয়। একই বছরের ২৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় অন্য মামলায় নজির হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়ে সীমিত স্থগিতাদেশ দেয়; মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আবার কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়নি। এই নির্দিষ্ট তারিখের অবস্থানকে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বলে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। তবে ঘটনাপ্রবাহ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: অপরাধের ভয়াবহতা কি দুর্বল প্রমাণকে শক্তিশালী করে দিতে পারে? বিচারব্যবস্থার উত্তর হওয়া উচিত, পারে না। নিহত মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচারের অধিকার পরস্পরের বিরোধী নয়। প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করার জন্যই নির্ভুল তদন্ত প্রয়োজন; ভুল ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হলে ন্যায়বিচার এবং জননিরাপত্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (তথ্যসূত্র: Bar & Bench. 2025. Supreme Court Stays Bombay HC Judgment on 7/11 Blasts; No Stay on Release of Acquitted Persons. 24 July. https://www.barandbench.com/news/supreme-court-stays-bombay-hc-judgment-on-711-blasts-no-stay-on-release-of-acquitted-persons.)

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর শুরু হওয়া হামলার ধরন আগের বহু বিস্ফোরণের তুলনায় আলাদা ছিল। একাধিক জায়গায় গুলি, গ্রেনেড ও বিস্ফোরণের মাধ্যমে আক্রমণ চলে এবং অভিযান শেষ হয় ২৯ নভেম্বর। রেলস্টেশন, হোটেল, ক্যাফে ও আবাসিক ভবনে আঘাত পড়ায় সাধারণ যাত্রী থেকে পর্যটক পর্যন্ত নানা অবস্থানের মানুষ আক্রান্ত হন। ২০০৮ সালের ১১ ডিসেম্বর লোকসভায় দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতিতে ১৬৪ জন নিহত ও ৩০৮ জন আহত হওয়ার হিসাব দেওয়া হয়েছিল। সরবরাহ করা ছকের সংখ্যাও সেই প্রাথমিক সরকারি হিসাবের সঙ্গে মেলে। পরবর্তী স্মারক বিবৃতিতে ১৬৬ জন নিহতের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে দুটি সংখ্যার পার্থক্য বোঝাতে উৎসের সময় জানানো জরুরি। ওই সরকারি বিবৃতিতে পাকিস্তান থেকে আসা লস্কর ই তৈবার সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়। এই হামলাকে শুধু স্থানীয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর আন্তর্দেশীয় সংগঠন ও নিরাপত্তাগত মাত্রা আড়াল হয়ে যায়। (তথ্যসূত্র: Ministry of Home Affairs, Government of India. 2008. HM Announces Measures to Enhance Security. Statement in the Lok Sabha, 11 December. Press Information Bureau, Release ID 45446. https://www.pib.gov.in/newsite/erelcontent.aspx?lang=2&reg=3&relid=45446; United States Department of State. 2018. Remarks at the Embassy of India on the Tenth Anniversary of the November 2008 Mumbai Terror Attacks. 26 November.)

এই হামলা শহরের ভৌগোলিক নিরাপত্তার প্রশ্নও নতুনভাবে সামনে আনে। মুম্বইয়ের সমুদ্র অর্থনৈতিক যোগাযোগ, জীবিকা এবং নগরের সৌন্দর্যের উৎস; একই সঙ্গে বিস্তৃত উপকূলের নজরদারি একটি বিশেষ প্রশাসনিক দায়িত্ব। নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তাই শুধু রাস্তা ও স্টেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তবে নজরদারির বিস্তার তখনই কার্যকর হয়, যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব স্পষ্ট থাকে এবং পাওয়া তথ্য সময়মতো প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছায়। সম্ভাব্য বিপদের সংবাদ গ্রহণ, মূল্যায়ন এবং অনুসরণ করার ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নতা থাকলে উন্নত সরঞ্জামও যথেষ্ট হয় না। ২০০৮ সালের সরকারি বিবৃতিতে গোয়েন্দা তথ্যের আদানপ্রদান ও বাহিনী মোতায়েনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে আলোচনা ছিল, তা এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের গুরুত্ব তুলে ধরে। সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপত্তার অর্থ কেবল আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা নয়; বিপদের সময় সাহায্য কত দ্রুত আসে, হাসপাতাল কতটা প্রস্তুত থাকে এবং পরিবার প্রয়োজনীয় খবর কত সহজে পায়, সেগুলিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০১১ সালের ১৩ জুলাই অপেরা হাউস, জাভেরি বাজার ও দাদরে বিস্ফোরণ শহরের পুরোনো ভয়কে আবার ফিরিয়ে আনে। সরবরাহ করা সংকলনে ২৬ জন নিহত ও ১৩০ জন আহত হওয়ার উল্লেখ রয়েছে এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের নাম রাখা হয়েছে। সন্দেহভাজন পরিচয়কে নিশ্চিত অপরাধী পরিচয়ে বদলে দেওয়া যায় না; প্রমাণ ও বিচারিক সিদ্ধান্তের জায়গা সেখানে আলাদা। এই ঘটনাসহ ছকে নির্বাচিত নয়টি বড় হামলার সময়সীমা মূলত ১৯৯৩ থেকে ২০১১। প্রথম তারিখের ভুল সংশোধন না করে এগুলিকে ১৯৯২ থেকে ২০১২ সালের সম্পূর্ণ তালিকা বলা বিভ্রান্তিকর হবে। আবার নির্বাচিত তালিকা মানেই শহরের সব সহিংসতার পূর্ণ হিসাব নয়। ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীলতা সংখ্যার পাশাপাশি এই সীমাও স্বীকার করে। ঘটনাপঞ্জি আমাদের আক্রমণের পুনরাবৃত্তি দেখায়, আর তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে শহরের রাজনীতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতা বিচার করতে হয়। (তথ্যসূত্র: Outlook. 2011. Chronology of Major Bomb Blasts in Mumbai. 13 July; Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai, Table 7.2, p. 130. মূল ছকের সম্পূরক উৎস: Wikipedia, 2011 Mumbai Bombings এবং 2008 Mumbai Attacks, দেখা হয়েছিল 13 July 2014.)

বোমা বিস্ফোরণ ও দাঙ্গা একই ধরনের সহিংসতা নয়, কিন্তু একটি শহরের নিরাপত্তাহীনতার ইতিহাসে তাদের অভিজ্ঞতা পরস্পরকে প্রভাবিত করতে পারে। বিস্ফোরণে অপরিচিত আক্রমণকারীর আশঙ্কা তৈরি হয়; দাঙ্গায় পরিচিত পাড়া, দোকান বা প্রতিবেশীর সম্পর্কও হঠাৎ বিপদের উৎস হয়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় মেরুকরণ এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে সন্দেহের সেতু তৈরি করলে নির্দোষ মানুষ নিজেদের পরিচয়ের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য হন। কাজ খোঁজা, বাড়ি ভাড়া নেওয়া কিংবা যাতায়াতের মতো সাধারণ সিদ্ধান্ত তখন নিরাপত্তার হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এই পরিবর্তন শহরের বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রকে সরাসরি আঘাত করে। সহাবস্থান মানে শুধু পাশাপাশি বসবাস নয়; অপরিচিত মানুষের সঙ্গে লেনদেন এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের অধিকার স্বীকার করার দৈনন্দিন অভ্যাস। সহিংসতা সেই অভ্যাস নষ্ট করলে নগরের আর্থিক কার্যকলাপ চালু থাকলেও তার সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2012. Ethnic Politics, Muslims and Space in Contemporary Mumbai. In Lives of Muslims in India: Politics, Exclusion and Violence. New Delhi: Routledge, pp. 208–225.)

১৯২৭ থেকে ২০০৮ সালের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত দাঙ্গার সংকলিত ছক এই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেখানে মোট ৮৪টি ঘটনা, ২৩৮ দিনের সহিংসতা, ১,৮৭০ জন নিহত এবং ৮,৪৬৩ জন আহত হওয়ার হিসাব দেওয়া হয়েছে। ঘটনাপ্রতি গড় স্থায়িত্ব প্রায় ২.৮ দিন। এই সংকলন তৈরি হয়েছে স্টিভেন উইলকিনসনের সম্পাদিত গবেষণা এবং মুম্বইয়ের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেকুলারিজমের তথ্যের ভিত্তিতে। সংখ্যাগুলি একটি নির্দিষ্ট তথ্যসমষ্টির পরিচয় বহন করে; শহরের প্রতিটি ক্ষতি বা প্রতিটি অপ্রকাশিত ঘটনার সর্বাঙ্গীণ হিসাব হিসেবে এগুলিকে পড়া উচিত নয়। অনেক মানুষের বাড়িছাড়া হওয়া, কাজ বন্ধ থাকা কিংবা আতঙ্কে দিন কাটানো হতাহতের ঘরে ধরা পড়ে না। তবু এই ছক দেখায়, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মুম্বইয়ের ইতিহাসে কেবল সাম্প্রতিক কোনো ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন দশকে তার পুনরাবির্ভাব হয়েছে, এবং প্রতিবারই সাধারণ মানুষের জীবন তার মূল্য দিয়েছে। (তথ্যসূত্র: Steven I. Wilkinson, ed. 2005. Religious Politics and Communal Violence. New Delhi: Oxford University Press; Centre for the Study of Society and Secularism, Mumbai. তথ্য সংকলিত হয়েছে Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai, Table 7.3, p. 131.)

ছকের কয়েকটি বছর আলাদা করে দেখলে সহিংসতার তীব্রতার পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। ১৯২৯ সালে চারটি ঘটনায় ২০৪ জন নিহত ও ১,০৯৮ জন আহত হওয়ার উল্লেখ আছে। ১৯৩২ সালে পাঁচটি ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ২২৪ এবং আহতের সংখ্যা ২,৮৩০। আবার ১৯৪৬ সালে ছয়টি ঘটনায় ২৬৪ জন নিহত ও ৭৯৭ জন আহত হন বলে সংকলনটি জানায়। সংখ্যাগুলির মধ্যে আহত মানুষের বিপুল উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মৃত্যু চূড়ান্ত ক্ষতি, কিন্তু গুরুতর আঘাত দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, কর্মহীনতা এবং পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণও হতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্ব এবং স্বাধীনতার আগের রাজনৈতিক উত্তেজনার বৃহত্তর ইতিহাসের মধ্যে এই ঘটনাগুলিকে রাখতে হয়। তবে জাতীয় পর্যায়ের ব্যাখ্যা স্থানীয় পাড়ার সম্পর্ক, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সংগঠিত উসকানির গুরুত্ব মুছে দেয় না। একই সময়ে সব এলাকায় সমান সহিংসতা ঘটেনি; এই ভিন্নতা বুঝতে হলে শুধু বছরের নামের বাইরে গিয়ে স্থানীয় পরিস্থিতিও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

পরবর্তী দশকগুলির হিসাব আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা শেখায়। কোনো বছরে মৃত্যুর উল্লেখ না থাকা মানেই সেখানে সহিংসতা তুচ্ছ ছিল না। আহত মানুষ, সম্পত্তির ক্ষতি এবং দৈনন্দিন জীবনের বিঘ্ন মৃত্যুহীন ঘটনাতেও গুরুতর হতে পারে। সংকলনে ১৯৮৪ সালের তিনটি ঘটনায় ৯৫ জন নিহত হওয়ার উল্লেখ রয়েছে। ১৯৯২ সালে একটি ঘটনায় ২০২ জন নিহত ও ৫৩৬ জন আহত এবং ১৯৯৩ সালে পাঁচটি ঘটনায় ৫৬৪ জন নিহত ও ১,০৩৩ জন আহত হওয়ার তথ্য আছে। এই দুটি বছরের যোগফল ওই ছকের হিসাবে ৭৬৬ জন নিহত ও ১,৫৬৯ জন আহত। এ হিসাবকে অন্য তদন্ত বা বিস্তৃত সময়সীমার হিসাবের সঙ্গে সরাসরি এক করে ফেলা উচিত নয়। ঘটনার সীমানা, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং গণনার সময় আলাদা হলে মোট সংখ্যাও বদলায়। ফলে সংখ্যার পার্থক্য দেখা মাত্র একটি উৎস বাতিল করার বদলে জানতে হয়, প্রতিটি উৎস আসলে কী গণনা করেছে।

দাঙ্গার ইতিহাসে পুলিশের ভূমিকা একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন, কারণ বিপদের সময় নাগরিক রাষ্ট্রকে প্রথমে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের মাধ্যমে চিনতে পারেন। দ্রুত উপস্থিতি, নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ এবং আক্রান্ত মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া আস্থা তৈরি করে। বিপরীতে, সাহায্যের আবেদন অগ্রাহ্য করা বা পরিচয় দেখে আচরণ বদলানো সেই আস্থার গভীর ক্ষতি করে। ১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালের মুম্বই দাঙ্গা নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের অনুসন্ধানের আলোচনায় এই পক্ষপাতের প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জ্যোতি পুনওয়ানি তাঁর বিশ্লেষণে পুলিশের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্যকে সরাসরি কমিশনের হুবহু বক্তব্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়া ঠিক নয়; তিনি কমিশনের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজস্ব মূল্যায়ন উপস্থাপন করছেন। উদ্ধৃতির উৎস এবং বক্তার পরিচয় স্পষ্ট রাখা তাই জরুরি। এতে বক্তব্যের শক্তি কমে না, বরং পাঠক বুঝতে পারেন কোন দাবিটি কোন ধরনের নথির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

পুনওয়ানির বক্তব্যটি মূল ভাষায় অপরিবর্তিত রাখা হলো: “during the riots, the police conduct was consciously partisan, pro-Hindu and anti-Muslim. From the stage of preventing violence to controlling it—whether arrests of miscreants or investigation of riot offences—at every level, the Mumbai Police revealed itself to be a highly communal force, not worthy of the trust reposed in it nor of the power it commanded. What made it worse was that this unprofessional conduct wasn’t just displayed by lowly constables bearing the brunt of mob violence, but also by senior officers. The bias existed right from the top—the Police Commissioner”। এই সমালোচনায় পুলিশের নিচের স্তরের আচরণের সঙ্গে নেতৃত্বের দায়ও যুক্ত হয়েছে। ফলে সমস্যাটি কয়েকজন কর্মীর বিচ্যুতি হিসেবে সীমিত থাকে না; প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা এবং সংস্কৃতির প্রশ্নও সামনে আসে। (তথ্যসূত্র: Jyoti Punwani. 2012. Police Conduct During Communal Riots: Evidence from 1992–93 Mumbai Riots and Its Implications. In Abdul Shaban, ed., Lives of Muslims in India: Politics, Exclusion and Violence. New Delhi: Routledge, pp. 187–207; উদ্ধৃত অংশ p. 187.)

এই বক্তব্যের তাৎপর্য বোঝার জন্য পুলিশি ক্ষমতার প্রকৃতি মনে রাখা প্রয়োজন। সাধারণ নাগরিক কাউকে আটক করতে, তল্লাশি চালাতে বা বলপ্রয়োগ করতে পারেন না; রাষ্ট্র নির্দিষ্ট শর্তে পুলিশকে সেই ক্ষমতা দেয়। তাই পুলিশের পক্ষপাত কেবল ব্যক্তিগত পূর্বধারণা নয়, ক্ষমতার অসম প্রয়োগের প্রশ্ন। কোনো সম্প্রদায়ের অভিযোগ বারবার গুরুত্ব না পেলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে আইন সমান সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি হারায়। তার ফল বিচ্ছিন্ন ঘটনার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, কারণ পরবর্তী বিপদেও মানুষ সাহায্য চাইতে দ্বিধা করতে পারেন। একই সঙ্গে পুলিশের মধ্যে দায়িত্বশীল ও সাহসী সদস্যদের কাজ মূল্যায়ন করাও জরুরি। প্রতিষ্ঠানকে সংশোধনের দাবি এবং সৎ সদস্যদের অবদান স্বীকার করা পাশাপাশি সম্ভব। বরং নিরপেক্ষ অনুসন্ধান তাঁদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে, কারণ এতে প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যক্তিগত প্রশংসা বা সামগ্রিক নিন্দার জায়গা নেয় এবং পেশাগত দায়বদ্ধতার মানদণ্ড স্পষ্ট হয়।

বিচার অধরা থেকে গেলে সহিংসতার ক্ষতও দীর্ঘস্থায়ী হয়। নিহতের পরিবার শুধু শাস্তি চায় না; কী ঘটেছিল, কার দায়িত্ব ছিল এবং রাষ্ট্র কেন সুরক্ষা দিতে পারেনি, তার বিশ্বাসযোগ্য উত্তরও চায়। অভিযোগ গ্রহণ, সাক্ষ্য সংরক্ষণ এবং মামলা এগিয়ে নেওয়ার প্রতিটি ধাপ সেই উত্তরের অংশ। দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা পরিবারগুলিকে বারবার ঘটনার স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আর যখন তারা দেখে অপরাধের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা প্রভাব বজায় রাখছেন, তখন আইনের প্রতি অনাস্থা আরও বাড়ে। এই অভিজ্ঞতা কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিশোধের ভাষা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে, যদিও প্রতিশোধ কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়। তাই বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা শুধু অতীত অপরাধের নিষ্পত্তি করে না; ভবিষ্যৎ সহিংসতা প্রতিরোধের সামাজিক ভিত্তিও তৈরি করে। ন্যায়বিচারের দৃশ্যমানতা বলতে এখানে প্রচার নয়, নাগরিকের কাছে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানের আচরণের ধারাবাহিকতা বোঝায়। (তথ্যসূত্র: Jyoti Punwani. 2012. Police Conduct During Communal Riots, in Lives of Muslims in India: Politics, Exclusion and Violence. New Delhi: Routledge, pp. 187–207.)

অপরাধচক্রের সঙ্গে রাজনীতি ও পুলিশের কিছু সদস্যের যোগাযোগের আলোচনা এই জায়গায় বিশেষ তাৎপর্য পায়। কোনো গ্যাং স্থানীয় প্রভাব ধরে রাখতে চাইলে শুধু শক্তি প্রদর্শন যথেষ্ট নয়; অভিযোগ ঠেকানো, প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বজায় রাখার সুবিধাও প্রয়োজন হয়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার সহায়তা সেই সুবিধা দিতে পারে। আবার নির্বাচনী প্রভাব বা স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি অপরাধী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে পারেন। এই সম্পর্ক সবসময় একই রকম নয়, এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রে প্রমাণের প্রয়োজন আছে। কিন্তু এর সামাজিক ফল স্পষ্ট: আইন মানা মানুষের তুলনায় প্রভাবশালী অপরাধী বাড়তি সুযোগ পায়। তখন শহরের নিরাপত্তা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। নাগরিক বুঝতে পারেন, আনুষ্ঠানিক নিয়মের পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য ব্যবস্থা কাজ করছে, যেখানে অধিকার নয়, পরিচয় ও ক্ষমতা সিদ্ধান্তের মূল্য নির্ধারণ করছে।

মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিস্তার ব্যাখ্যা করতে শাবান তিনটি প্রধান বিষয় সামনে আনেন: দরিদ্র যুবকদের শহরমুখী অভিবাসন, গভীর সামাজিক অসমতা ও ক্ষমতার অন্যায্য বণ্টন, এবং কার্যকর শাসন ও বিচারব্যবস্থার ঘাটতি। এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপরাধীকে শুধু বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে না দেখা। তবে অভিবাসনকে অপরাধের সমার্থক করা এর উদ্দেশ্য নয়। শহরে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ কঠোর পরিশ্রমে বৈধ জীবিকা গড়ে তোলেন এবং তাঁদের শ্রমেই নগরের অনেক কাজ চলতে থাকে। প্রশ্ন হলো, যাঁদের সামনে স্থিতিশীল কাজ, নিরাপদ বাসস্থান এবং সামাজিক উন্নতির পথ সংকীর্ণ, তাঁদের একটি অংশকে অপরাধচক্র কীভাবে নিজেদের কাজে টানে। সম্ভাবনা ও বাধার এই অসম বণ্টন বুঝতে না পারলে অপরাধের সামাজিক ব্যাখ্যা সহজেই দরিদ্র মানুষকে দোষারোপ করার ভাষায় বদলে যায়। ফলে বিশ্লেষণে পরিবেশের প্রভাবের পাশাপাশি ব্যক্তির সিদ্ধান্ত এবং সংগঠনের সক্রিয় নিয়োগপ্রক্রিয়াও বিবেচনা করতে হয়। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2010. Mumbai: Political Economy of Crime and Space. Hyderabad: Orient Blackswan; Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai. New Delhi: Springer, pp. 132–134.)

দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রায় সব শ্রেণির সমাজেই দেখা যায়, কিন্তু তা পূরণের বৈধ সুযোগ সমানভাবে বণ্টিত নয়। কোনো তরুণ যদি দেখে শিক্ষা, দক্ষতা বা পরিশ্রমের পথ দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত, অথচ স্থানীয় অপরাধী অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন করছেন, তবে সেই দৃশ্য তার ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। রিচার্ড ক্লোয়ার্ড ও লয়েড ওহলিনের গবেষণা এই আলোচনায় অপরাধমূলক সুযোগের পার্থক্য বোঝার একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়। বৈধ সুযোগের ঘাটতি থাকলেই সবাই অপরাধী হয় না; অপরাধী নেটওয়ার্কে প্রবেশের পথও সামাজিকভাবে তৈরি হয়। কে কার সঙ্গে পরিচিত, কোথায় কার প্রভাব এবং কোন কাজের বিনিময়ে কী পাওয়া যায়, এসব স্থানীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু ব্যক্তিগত লোভের কথা বললে সংগঠিত অপরাধের কাঠামো অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার কেবল সামাজিক বঞ্চনার কথা বললেও সংগঠনের পরিকল্পিত প্রলোভন, ভয় দেখানো এবং আনুগত্য আদায়ের ভূমিকা আড়াল হতে পারে। (তথ্যসূত্র: Richard A. Cloward and Lloyd E. Ohlin. 1960. Delinquency and Opportunity: A Theory of Delinquent Gangs. New York: Free Press.)

চওল ও বস্তির পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতেও একই সতর্কতা দরকার। অপর্যাপ্ত জায়গা, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, অনিশ্চিত আয় এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিসরের অভাব পরিবারকে চাপে রাখে। কিন্তু এসব বসতির মানুষকে অপরাধের জন্মদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা অন্যায্য। একই পরিবেশে পারিবারিক সহায়তা, প্রতিবেশীর সহযোগিতা এবং শ্রমজীবী সংগঠনের শক্তিও গড়ে ওঠে। সমস্যা তখন গভীর হয়, যখন এসব সহায়তার ভিত দুর্বল হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রীয় পরিষেবার ঘাটতি অপরাধী প্রভাবের সুযোগ তৈরি করে। ফ্রেডেরিক থ্র্যাশারের শিকাগোর গ্যাংসম্বন্ধীয় গবেষণায় দরিদ্র ও পরিবর্তনশীল নগরাঞ্চলের সামাজিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুম্বইয়ের সঙ্গে তার তুলনা সম্ভাব্য মিল খুঁজতে সাহায্য করে, তবে দুই শহরের ইতিহাস এক নয়। ঔপনিবেশিক বন্দর, শ্রমবাজার, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ধর্মীয় রাজনীতির বিশেষ পরিস্থিতি মুম্বইয়ের অভিজ্ঞতাকে আলাদা করে। ফলে তুলনা বিশ্লেষণের সহায়ক হতে পারে, প্রস্তুত সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না। (তথ্যসূত্র: Frederic M. Thrasher. 1927. The Gang: A Study of 1,313 Gangs in Chicago. Chicago: University of Chicago Press.)

শাবানের আলোচনায় সত্তরের দশকের শুরু থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রথম ভাগ মুম্বইয়ের গ্যাং বিস্তারের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। সে সময়ের নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু পণ্যের চাহিদা এবং বৈধ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, অবৈধ বাণিজ্য সেই জায়গা ব্যবহার করে। নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ নিজে অপরাধ সৃষ্টি করে না; কিন্তু বাজারে লাভজনক সুযোগ এবং দুর্বল প্রয়োগব্যবস্থা একত্র হলে চোরাচালান ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হতে পারে। অবৈধ আয় পরে সংগঠনের লোকবল, প্রভাব এবং যোগাযোগ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ অপরাধ থেকে পাওয়া সম্পদ পরবর্তী অপরাধের ক্ষমতা বাড়ায়। এই ধারাবাহিকতা বুঝলে দেখা যায়, গ্যাংয়ের শক্তি শুধু নেতা বা অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়; তার অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং সহযোগিতার পরিসরও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অপরাধ দমনের উদ্যোগে প্রকাশ্য সহিংসতার পাশাপাশি লাভের উৎস ও পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai. In Social Dynamics of the Urban: Studies from India. New Delhi: Springer, pp. 115–134.)

আশির দশকে বস্ত্রকলের কর্মসংস্থানের সংকোচন শহরের শ্রমজীবী পরিবারগুলির জন্য বড় বিপর্যয় হয়ে ওঠে। কারখানার কাজ শুধু মাসিক আয়ের উৎস ছিল না; তার সঙ্গে বাসস্থান, পাড়ার সম্পর্ক এবং শ্রমিক পরিচয়ের মর্যাদাও যুক্ত ছিল। কাজ হারালে পরিবারকে নতুন আয়ের পথ খুঁজতে হয়, অনেক সময় কম স্থিতিশীল ও অনিয়মিত কাজে প্রবেশ করতে হয়। তরুণ প্রজন্মের সামনে পূর্ববর্তী প্রজন্মের পরিচিত কর্মজীবনের পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিকে গ্যাংয়ের নিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখানো হয়েছে শাবানের গবেষণায়। তবে বস্ত্রকলের সংকট থেকে অপরাধে প্রবেশের সরল রেখা টানা চলে না। অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাঁদের সন্তান অপরাধে যুক্ত হননি। বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন, সামাজিক সুরক্ষা, পুনরায় প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কাজের ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে অপরাধী সংগঠন কীভাবে একটি সীমিত অংশকে আকর্ষণ করতে পেরেছিল। এই প্রশ্ন শ্রমনীতিকে নগর নিরাপত্তার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করে। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2010. Mumbai: Political Economy of Crime and Space. Hyderabad: Orient Blackswan.)

এই পটভূমিতে ডি কোম্পানি, অমর নায়েকের গ্যাং, ছোট রাজনের গ্যাং, মানচেকর গ্যাং এবং আবু সালেমের অপরাধী নেটওয়ার্কের মতো নাম শহরের আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু পরিচিত নামের তালিকাই অপরাধজগতের সম্পূর্ণ ইতিহাস নয়। নেতৃত্বের চারপাশে ছোট সহযোগী, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী এবং ভয় বা সুবিধার কারণে যুক্ত মানুষদের বিস্তৃত সম্পর্ক থাকে। কোনো নেতা কারাগারে গেলে বা নিহত হলে সেই সম্পর্কের সব অংশ সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয় না। আবার বিভিন্ন সময়ের সংগঠনকে একই পর্যায়ের শক্তি বা একই উদ্দেশ্যের দল হিসেবে দেখাও বিভ্রান্তিকর। অপরাধী নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভাঙন এবং ব্যবসায়িক পরিবর্তন তার ক্ষমতার মানচিত্র বদলায়। ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাহিনি আকর্ষণীয় হলেও সামাজিক বিশ্লেষণকে দেখতে হয় সংগঠন কীভাবে টিকে থাকে, তার ওপর কারা নির্ভর করে এবং তার লাভের মূল্য সাধারণ মানুষ কীভাবে দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধী নেতার রোমাঞ্চকর ভাবমূর্তি থেকে আলোচনাকে নাগরিক অভিজ্ঞতার দিকে ফিরিয়ে আনে।

নারীদের উপস্থিতিও এই ইতিহাসে গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা প্রয়োজন। সরবরাহ করা আলোচনায় অর্চনা শর্মা, প্রিয়া রাজপুত, লক্ষ্মী সোনি, শামিম পল, কাজল মেঘনানি, তাবাসসুম, পল্লবী যাদব, রুবিনা এবং সুশীলার নাম এসেছে, যাঁদের প্রসঙ্গে “sisters” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই উল্লেখ নারীদের অপরাধজগতের বাইরে কল্পনা করার অভ্যাসকে প্রশ্ন করে। কিন্তু কোনো নারীর নাম অপরাধী নেটওয়ার্কের আলোচনায় পাওয়া গেলেই তাঁর ভূমিকা, অপরাধ বা বিচারিক অবস্থান সম্পর্কে অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। প্রত্যেক ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য জীবনবিবরণ ও নথি প্রয়োজন। নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাস কখনো ক্ষমতা অর্জনের, কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের, আবার কখনো চাপ ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই ভিন্নতা অনুসন্ধান না করে তাঁদের শুধু ব্যতিক্রমী চরিত্র হিসেবে দেখলে সামাজিক ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থাকে। নারীকে নিছক শিকার কিংবা নিছক রোমাঞ্চকর অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করার বদলে নির্দিষ্ট কাজ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা অধিক যথার্থ। (তথ্যসূত্র: Abdul Shaban. 2017. Underworld and the Police in Mumbai, pp. 132–133; S. Hussain Zaidi and Jane Borges. 2011. Mafia Queens of Mumbai: Stories of Women from the Ganglands. Chennai: Tranquebar Press.)

১৯৯৩ সালের বিস্ফোরণের পরে অপরাধী সংগঠনগুলির মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে ভাঙনের কথা শাবান উল্লেখ করেছেন। এই পরিবর্তন দেখায়, অপরাধজগত সমাজের রাজনৈতিক আবহ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কও বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় নতুন ভাষা পেতে পারে। তবু ঘোষিত পরিচয় এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য সবসময় এক নয়। কোনো গোষ্ঠী নিজের সহিংসতাকে ধর্মীয় প্রতিশোধ বা দেশপ্রেমের দাবিতে বৈধ করতে চাইলে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ক্ষমতার লড়াই আড়াল হয়ে যেতে পারে। এই ধরনের ভাষা সাধারণ মানুষকে আবেগের ভিত্তিতে অপরাধী পক্ষ বেছে নেওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। অথচ একটি গ্যাংয়ের বিরোধী আরেকটি গ্যাং হলেই সেটি নাগরিক নিরাপত্তার প্রতিনিধি হয়ে ওঠে না। শহরের পক্ষে জরুরি হলো প্রতিটি সংগঠনের কাজকে একই আইনি মানদণ্ডে বিচার করা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের দায় হারিয়ে যেতে না দেওয়া।

পুলিশের অভিযান, গ্রেপ্তার এবং সংঘর্ষে নিহত হওয়ার ঘটনাগুলির ফলে বহু পরিচিত গ্যাং দুর্বল হয়েছে বা শহরের প্রকাশ্য পরিসর থেকে সরে গেছে বলে আলোচনায় উঠে আসে। এতে কিছু এলাকায় তাৎক্ষণিক আতঙ্ক কমতে পারে, ব্যবসায়ী বা বাসিন্দা সাময়িক স্বস্তিও পেতে পারেন। কিন্তু অপরাধী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং অপরাধের সামাজিক ভিত্তির অবসান এক বিষয় নয়। অর্থের প্রবাহ, দুর্নীতি এবং স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা টিকে থাকলে নতুন ব্যক্তি পুরোনো জায়গা নিতে পারে। তাই দমনমূলক সাফল্যের মূল্যায়নে শুধু কতজন ধরা পড়ল বা নিহত হলো, সেই সংখ্যা যথেষ্ট নয়। অভিযোগ কতটা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে, আদালতে কতটি মামলা প্রমাণিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা স্থায়ীভাবে বেড়েছে, সেগুলিও দেখতে হয়। জননিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন অপরাধী সংগঠনের দৃশ্যমান মুখের পাশাপাশি তার পুনরুৎপাদনের সুযোগও সংকুচিত হয়।

পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে একটি গ্যাংকে সুবিধা দেওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের সদস্যদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর অভিযোগ এই আলোচনার আরেকটি কঠিন দিক। শাবানের প্রকাশকালীন বিবরণে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও সম্পদের অনুসন্ধানের উল্লেখ আছে। সেই সময়ের বক্তব্যকে বর্তমানেও একই তদন্ত চলছে বলে লেখা উচিত নয়। ইতিহাসের সময়সীমা স্পষ্ট রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সঙ্গে এক করে দেখাও চলে না। তবু অভিযোগগুলি যে নীতিগত প্রশ্ন তোলে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ যদি অপরাধী পক্ষের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষমতাই অপরাধের সম্পদে পরিণত হতে পারে। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানের ভেতরের জবাবদিহি, স্বাধীন অনুসন্ধান এবং সম্পদের বৈধ উৎস যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। সৎ সদস্যদের মর্যাদা রক্ষারও কার্যকর পথ হলো অভিযোগ চাপা না দিয়ে নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা।

অপরাধীকে হত্যা করার ঘটনাকে জনপ্রিয় বিনোদন বা দ্রুত ন্যায়বিচারের প্রতীক বানানো হলে এই জবাবদিহির প্রশ্ন আড়াল হয়ে যায়। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পুলিশকে কখনো বলপ্রয়োগ করতে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পরিস্থিতি ও বৈধতা পরীক্ষা করার দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্র মুক্ত হয় না। কোনো ব্যক্তি অপরাধের সন্দেহভাজন হলেই তাঁর জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণের সীমা বিলুপ্ত হয় না। বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ বলে তার বিকল্প হিসেবে অনিরীক্ষিত সহিংসতা গ্রহণযোগ্য করে তুললে ভুলের প্রতিকার কঠিন হয়। একই সঙ্গে অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের সুযোগও হারিয়ে যেতে পারে। ফলে আইনের শাসন এবং কার্যকর নিরাপত্তা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। যথাযথ তদন্ত, সাক্ষীর সুরক্ষা ও সময়মতো বিচার পুলিশের কাজকে দুর্বল করে না; বরং তার ফলকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে। শক্তিশালী রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু বলপ্রয়োগের ক্ষমতায় নয়, সেই ক্ষমতার ব্যবহার ব্যাখ্যা করতে প্রস্তুত থাকার মধ্যেও নিহিত।

সহিংসতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করে পরিবার। কোনো উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু সংসারের আয়, সন্তানের পড়াশোনা এবং প্রবীণের পরিচর্যা একসঙ্গে বিপন্ন করতে পারে। আহত মানুষ বেঁচে ফিরলেও দীর্ঘ চিকিৎসা, চলাফেরার অসুবিধা বা মানসিক আঘাতের কারণে আগের জীবন ফিরে নাও পেতে পারেন। সংবাদে নিহত ও আহতের সংখ্যা দ্রুত প্রকাশিত হয়, কিন্তু পরবর্তী মাস ও বছরের এই পরিবর্তন অনেক সময় আলোচনার বাইরে থাকে। ক্ষতিপূরণ তাই প্রয়োজনীয় হলেও এককালীন অর্থ দিয়ে সমস্ত ক্ষতি পূরণ হয় না। চিকিৎসা, পুনর্বাসন, প্রয়োজনীয় নথি এবং সামাজিক সহায়তার ধারাবাহিক ব্যবস্থা দরকার। পরিবারকে বারবার নিজের দুর্ভোগ প্রমাণ করতে বাধ্য করা হলে সহায়তাপ্রক্রিয়াই নতুন যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়। একটি মানবিক প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রে রেখে সেবা সাজায় এবং সাহায্যকে কোনো পরিচয় বা রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্তে সীমিত করে না।

শহরের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে প্রচলিত প্রশংসাও এই বাস্তবতার আলোকে বিচার করা দরকার। বিস্ফোরণের পরদিন মানুষ কাজে ফিরে গেলে সেটি সাহসের প্রকাশ হতে পারে, আবার আয় হারানোর সুযোগ না থাকার ফলও হতে পারে। দৈনিক মজুরির শ্রমিক, ছোট দোকানি কিংবা অনিশ্চিত চাকরির মানুষ দীর্ঘ বিরতি নিতে পারেন না। তাঁদের কাজে ফেরা দেখে ক্ষত সেরে গেছে বলে ধরে নেওয়া তাঁদের বাস্তবতা ছোট করে। নগরের গতিশীলতা অনেক সময় ব্যক্তিগত শোককে প্রকাশের সময় দেয় না। ফলে স্বাভাবিক চলাচল ফিরে আসা এবং মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসা আলাদা ঘটনা। সত্যিকারের পুনরুদ্ধার বলতে প্রয়োজন জীবিকার ধারাবাহিকতা, মানসিক সহায়তা এবং ন্যায়বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি। শহর চলতে থাকবে, কিন্তু সেই চলার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কোথায় দাঁড়াচ্ছেন, তার প্রশ্ন হারিয়ে গেলে সহনশীলতার ভাষা প্রশাসনিক দায় এড়ানোর সুবিধাজনক উপায় হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিও মুম্বইয়ের অপরাধজগতের পরিচয় তৈরি করে। গ্যাংনেতার উত্থান, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পতনের কাহিনি আকর্ষণীয় হওয়ায় অনেক সময় সাধারণ মানুষের ক্ষতি তার পেছনে চলে যায়। চলচ্চিত্র বা দীর্ঘ প্রতিবেদন ইতিহাস বোঝার দরজা খুলতে পারে, কিন্তু নাটকীয় উপস্থাপনকে বিচারিক নথির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা চলে না। বিশেষ করে কোনো ঘটনার পরে অনিশ্চিত তথ্য দ্রুত ছড়ালে সন্দেহভাজন পরিচয় স্থায়ী অপবাদে পরিণত হতে পারে। দায়িত্বশীল প্রতিবেদন তাই উৎসের সীমা জানায়, অভিযোগের ভাষা যথাযথ রাখে এবং প্রয়োজন হলে পুরোনো তথ্য সংশোধন করে। একইভাবে সমাজবিষয়ক লেখার দায়িত্ব হলো অপরাধীর ব্যক্তিগত জাঁকজমককে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে শ্রমিক, দোকানি, যাত্রী এবং আক্রান্ত পরিবারের অভিজ্ঞতা সামনে আনা। এই মানুষগুলিই নগরের প্রকৃত জীবন বহন করেন, অথচ অপরাধের রোমাঞ্চকর বিবরণে তাঁদের উপস্থিতি সবচেয়ে সহজে মুছে যায়।

মুম্বইয়ের বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র রক্ষার কাজ শুধু আনুষ্ঠানিক সৌহার্দ্যের অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ হয় না। পাড়ার দোকানে সমান আচরণ, ভাড়াবাড়ির বাজারে বৈষম্য কমানো, স্কুলে নিরাপদ পরিবেশ এবং নাগরিক অভিযোগে নিরপেক্ষ সাড়া সহাবস্থানের বাস্তব ভিত্তি। ধর্মীয় মেরুকরণ মানুষকে আলাদা বাসস্থান বা সীমিত যোগাযোগের দিকে ঠেলে দিলে শহরের মধ্যে অদৃশ্য দূরত্ব বাড়ে। সেই দূরত্ব গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য এবং অপরিচিত মানুষকে সন্দেহের পাত্র করে তুলতে পারে। বিপরীতে, নিয়মিত লেনদেন ও সহযোগিতা অন্যের জীবনকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগ দেয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের সদিচ্ছাকে রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প করা যায় না। সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি বজায় রাখার উদ্যোগ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রশাসন পক্ষপাতহীন থাকে এবং অপরাধীর রাজনৈতিক প্রভাব বিচারকে থামাতে পারে না। সহাবস্থান তাই সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সমান অধিকার ও প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

অপরাধ প্রতিরোধের সামাজিক পথও এই সমান সুযোগের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। নিরাপদ বাসস্থান, বিদ্যালয়ে টিকে থাকার সহায়তা, দক্ষতা অর্জন এবং স্থিতিশীল কাজের সুযোগ কোনো তাৎক্ষণিক অপরাধ দমনের অভিযান নয়; তবু দীর্ঘমেয়াদে এগুলি অপরাধী নিয়োগের আকর্ষণ কমাতে পারে। তরুণকে শুধু সন্দেহের চোখে দেখা হলে সে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, আর নিজের উন্নতির বাস্তব পথ দেখতে পেলে বিকল্প ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে। তবে সামাজিক উন্নয়ন ঘটলেই সংগঠিত অপরাধ অদৃশ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অপরাধ, আর্থিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা একই সঙ্গে প্রয়োজন। অপরাধের দায় দরিদ্র বসতিতে কেন্দ্রীভূত করে ওপরের স্তরের লাভবান মানুষদের আড়াল করলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হয়। ন্যায়সংগত নিরাপত্তানীতি তাই সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষমতাবান ব্যক্তির জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে চায়।

দাঙ্গা বা সন্ত্রাসের পরে জনপরিসরের স্মৃতি কীভাবে সংরক্ষিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। স্মারক, গবেষণা এবং পারিবারিক সাক্ষ্য ঘটনার মানবিক অর্থ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু স্মৃতি যদি শুধু কোনো একটি পক্ষের যন্ত্রণাকে স্বীকৃতি দেয়, তবে অন্য আক্রান্ত মানুষের অভিজ্ঞতা আবারও প্রান্তে সরে যায়। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক স্মৃতিচর্চা সব ঘটনার পার্থক্য বজায় রেখেও নিরপরাধ মানুষের ক্ষতির সমান মর্যাদা দেয়। এখানে ইতিহাসের দায়িত্ব ক্ষমতার সুবিধামতো বিস্মৃতি তৈরি করা নয়, বরং যাচাইযোগ্য সত্য এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে পাশাপাশি রাখা। আক্রান্ত পরিবারের বক্তব্য শুনতে পারলে সংখ্যার আড়ালে থাকা সম্পর্ক ও জীবনের পরিবর্তন বোঝা যায়। একই সঙ্গে সাক্ষ্যের সীমা, স্মৃতির পরিবর্তন এবং নথির পার্থক্যও বিবেচনা করতে হয়। এই সতর্কতা অতীতকে অস্পষ্ট করে না; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

নাগরিক নিরাপত্তার মূল্যায়নে স্থানভেদেও পার্থক্য দেখা দরকার। পরিচিত পর্যটনস্থলের ঘটনা দ্রুত আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়, অথচ দূরের শ্রমজীবী এলাকায় দীর্ঘদিনের ভয় তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান হতে পারে। তাই সংবাদে উপস্থিতির পরিমাণকে ক্ষতির গুরুত্বের মাপকাঠি করা অনুচিত। হাসপাতাল, যোগাযোগ ও আইনি সহায়তা শহরের সব অংশে সমান সহজলভ্য না হলে বিপর্যয়ের পরে মানুষের পুনরুদ্ধারের সুযোগও অসম হয়। যে পরিবার আগে থেকেই ঋণ, অনিশ্চিত বাসস্থান বা অসুস্থতার চাপে রয়েছে, তাদের ওপর একটি সহিংস ঘটনার আঘাত আরও ভারী হতে পারে। ফলে সহায়তার পরিকল্পনায় শুধু ঘটনার স্থান নয়, আক্রান্ত মানুষের পূর্ববর্তী অবস্থাও দেখতে হয়। সমান মর্যাদা কখনো সবার জন্য একই ব্যবস্থা নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়েই অনেক সময় তার বাস্তব অর্থ তৈরি হয়।

প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে নাগরিকের অংশগ্রহণের সুযোগও প্রয়োজন। অভিযোগ কোথায় জানাতে হবে, তদন্তের অগ্রগতি কীভাবে জানা যাবে এবং সাহায্যের জন্য কোন দপ্তরের দায়িত্ব রয়েছে, এসব বিষয় সহজ ভাষায় স্পষ্ট থাকা দরকার। অস্পষ্ট নিয়ম ও বারবার দপ্তর বদলানোর অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ক্লান্ত করে এবং মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। বিপরীতে, নিয়মিত তথ্য, মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার এবং ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা প্রশাসনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এখানে প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মানুষের কথা শোনার দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। যাঁদের পড়াশোনা বা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ কম, তাঁদের জন্যও ব্যবস্থা ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। এই দৈনন্দিন সংস্কার বড় ঘোষণার তুলনায় কম আলোচিত হলেও রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই আস্থা তৈরি হয় ধীরে ধীরে তবে তার ফল নাগরিক জীবনে দীর্ঘদিন থাকে এবং সংকটের সময়ে বিশেষভাবে অনুভূত হয়।

মুম্বইয়ের অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত একটি জটিল নাগরিক সত্য সামনে আনে: সমৃদ্ধি, আধুনিক অবকাঠামো এবং বিশ্বজোড়া পরিচিতি থাকলেই একটি শহর সবার জন্য নিরাপদ হয় না। বন্দর, বাজার, শিল্প ও চলচ্চিত্র তার অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানুষের আস্থা তৈরি হয় নিত্যদিনের ন্যায়সংগত আচরণে। বিস্ফোরণ ও দাঙ্গার ইতিহাস সেই আস্থার ক্ষয় দেখায়; অপরাধী সংগঠনের বিস্তার দেখায় অসমতা ও প্রভাব কীভাবে নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে। আবার শ্রমজীবী মানুষের পরিশ্রম, প্রতিবেশীর সাহায্য এবং বিপদের সময় দায়িত্ব পালন করা কর্মীদের সাহস শহরের অন্য সম্ভাবনাও প্রকাশ করে। সেই সম্ভাবনাকে স্থায়ী করতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ পুলিশ, নির্ভরযোগ্য বিচার, মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা এবং পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সমান সুরক্ষা। মুম্বইয়ের ভবিষ্যৎ বিচার করার যথার্থ মানদণ্ড হবে কত উঁচু ভবন উঠল, তার পাশাপাশি কত সাধারণ মানুষ ভয় ছাড়াই নিজের পাড়া, কর্মক্ষেত্র ও যাতায়াতের পথকে আপন বলে ভাবতে পারলেন।

 

গ্রন্থপঞ্জি

  • ১। আলি, এস. এ. “সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আন্ডার স্ক্যানার।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ২৪ জানুয়ারি ২০০৬। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://articles.timesofindia.indiatimes.com/2006-01-24/mumbai/27812284_1_encounter-specialist-ketan-tirodkar-daya-nayak.
  • ২। আলি, এস. এ. “ইউনুস ডেথ: ফেট ক্যাচেস আপ উইথ কপস: মোস্ট পুলিশমেন রিলেটেড টু কেস চার্জড উইথ ভেরিয়াস ক্রাইমস।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ৭ ডিসেম্বর ২০১০।
  • ৩। আলি, এস. এ. “সিনিয়র ইন্সপেক্টর সাসপেন্ডেড ইন ইলিগ্যাল অ্যাসেটস কেস।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ২৭ জুন ২০১২। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://articles.timesofindia.indiatimes.com/2012-06-27/mumbai/32440568_1_sting-operation-assets-case-acb.
  • ৪। আলি, এস. এ. “নভি মুম্বই বিল্ডার মার্ডার কেস: টু মোর অ্যারেস্টেড।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ৬ মার্চ ২০১৩। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://articles.timesofindia.indiatimes.com/2013-03-06/mumbai/37498482_1_navi-mumbai-builder-crime-branch-absconder.
  • ৫। আলি, এস. এ. “লাহোরিয়া কিলিং: সন গেটস থ্রেট কলস ফ্রম রবি পূজারি গ্যাং।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ১৯ এপ্রিল ২০১৩। প্রবেশের তারিখ ১৪ মে ২০১৩। http://articles.timesofindia.indiatimes.com/2013-04-19/mumbai/38673319_1_crime-branch-emmanual-amolik-navi-mumbai.
  • ৬। বালকৃষ্ণন, এস. “মাফিয়া কলস ট্রিগার প্যানিক অ্যামং মুম্বই বিল্ডার্স।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ১২ মে ২০০৫।
  • ৭। ব্রুগম্যান, জেব। ওয়েলকাম টু দি আরবান রেভলিউশন: হাউ সিটিজ আর চেঞ্জিং দ্য ওয়ার্ল্ড। নয়ডা: হার্পারকলিন্স, ২০০৯।
  • ৮। সেনসাস অব ইন্ডিয়া। প্রাইমারি সেনসাস অ্যাবস্ট্র্যাক্ট: মহারাষ্ট্র। নয়াদিল্লি: অফিস অব দ্য রেজিস্ট্রার জেনারেল অ্যান্ড সেনসাস কমিশনার, মিনিস্ট্রি অব হোম অ্যাফেয়ার্স, গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, ২০১১।
  • ৯। ক্লোয়ার্ড, আর. এ., এবং এল. ই. ওহলিন। ডেলিনকোয়েন্সি অ্যান্ড অপরচুনিটি: আ থিওরি অব ডেলিনকোয়েন্ট গ্যাংস। নিউইয়র্ক: ফ্রি প্রেস, ১৯৬০।
  • ১০। দে, জে. “৩ গ্যাংস ক্লেম দে কিল্ড ২৬/১১ লইয়ার।” মিড ডে (মুম্বই), ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১০। প্রবেশের তারিখ ১৫ মে ২০১৩। http://www.mid-day.com/news/2010/feb/130210-lawyer-Chhota-Rajan-gangs-Shahid-Azmi.htm.
  • ১১। ধাওয়ালে, এ. “দ্য শিব সেনা: সেমি ফ্যাসিজম ইন অ্যাকশন।” দ্য মার্ক্সিস্ট ১৬, নং ২ (২০০০)। প্রবেশের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০০৮। http://cpim.org/marxist/200002_marxist_sena_dhawle.htm.
  • ১২। এক্সপ্রেস নিউজ সার্ভিস। “টপ বিল্ডার শট ডেড অ্যাট নরিম্যান পয়েন্ট।” ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২০ আগস্ট ১৯৯৭। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://www.financialexpress.com/old/ie/daily/19970820/23250763.html.
  • ১৩। খান, আর., এবং আর. শ্রীবাস্তব। “উইমেন হেল্ড ফর লিংকস টু দাউদ।” মুম্বই মিরর (মুম্বই), ১৬ এপ্রিল ২০০৬।
  • ১৪। লেলে, জয়ন্ত। “স্যাফ্রনাইজেশন অব দ্য শিব সেনা: দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব সিটি, স্টেট অ্যান্ড নেশন।” বোম্বে: মেটাফর ফর মডার্ন ইন্ডিয়া গ্রন্থে, সম্পাদনা এস. প্যাটেল এবং এ. থর্নার, ১৮৫–২১২। নয়াদিল্লি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৫।
  • ১৫। মারপাকওয়ার, পি. “দয়া নায়েক টু রিমেইন আউট অব অফিস।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ১১ জানুয়ারি ২০০৯। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://articles.timesofindia.indiatimes.com/2009-01-11/mumbai/28046200_1_ips-official-cid-daya-nayak.
  • ১৬। মেহতা, সুকেতু। ম্যাক্সিমাম সিটি: বোম্বে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড। নয়াদিল্লি: পেঙ্গুইন ভাইকিং, ২০০৪।
  • ১৭। মেনেজেস, এস., এবং এস. ঘোষ। “ক্রাইম বিজনেস নেক্সাস।” আউটলুক, ২৯ নভেম্বর ১৯৯৫। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://www.outlookindia.com/article.aspx?200287.
  • ১৮। মুম্বই মিরর। “দয়া নায়েক III।” মুম্বই মিরর (মুম্বই), ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৬।
  • ১৯। মুম্বই মিরর। “স্পিড আপ দ্য প্রোব এগেইনস্ট দয়া নায়েক।” মুম্বই মিরর (মুম্বই), ১১ জানুয়ারি ২০০৬।
  • ২০। নায়ার, এস. “বাস্টিং ক্রাইম ইন সিটি স্লামস।” ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (মুম্বই), ১ জানুয়ারি ২০০৬। প্রবেশের তারিখ ৮ জুলাই ২০০৮। http://cities.expressindia.com/fullstory.php?newsid=163641.
  • ২১। আউটলুক। “ক্রোনোলজি অব মেজর বম্বব্লাস্টস ইন মুম্বই।” ১৩ জুলাই ২০১১। http://news.outlookindia.com/items.aspx?artid=727627.
  • ২২। পাণিগ্রাহী, ডি. “হিরোজ ওয়ান্স, নাউ ইন সিটি পুলিশের হল অব শেম।” হিন্দুস্তান টাইমস, ১০ জানুয়ারি ২০১০। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://www.hindustantimes.com/India-news/Mumbai/Heroes-once-now-in-city-police-s-hall-of-shame/Article1-495753.aspx.
  • ২৩। পুনওয়ানি, জ্যোতি। “পুলিশ কন্ডাক্ট ডিউরিং কমিউনাল রায়টস: এভিডেন্স ফ্রম ১৯৯২–৯৩ মুম্বই রায়টস অ্যান্ড ইটস ইমপ্লিকেশনস।” লাইভস অব মুসলিমস ইন ইন্ডিয়া: পলিটিকস, এক্সক্লুশন অ্যান্ড ভায়োলেন্স গ্রন্থে, সম্পাদনা আবদুল শাবান, ১৮৭–২০৭। নয়াদিল্লি: রাউটলেজ, ২০১২।
  • ২৪। সামেরভেল, আর. “এক্স এমএলএ অরুণ গাওলি গোজ ফ্রম দাগড়ি চওল টু লাইফ ইন জেল।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ১ সেপ্টেম্বর ২০১২। প্রবেশের তারিখ ১৩ মে ২০১৩। http://articles.timesofindia.indiatimes.com/2012-09-01/mumbai/33534848_1_arun-gawli-life-imprisonment-dagdi-chawl.
  • ২৫। শাবান, আবদুল। মুম্বই: পলিটিক্যাল ইকোনমি অব ক্রাইম অ্যান্ড স্পেস। হায়দরাবাদ: ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান, ২০১০।
  • ২৬। শাবান, আবদুল। “এথনিক পলিটিকস, মুসলিমস অ্যান্ড স্পেস ইন কনটেম্পোরারি মুম্বই।” লাইভস অব মুসলিমস ইন ইন্ডিয়া: পলিটিকস, এক্সক্লুশন অ্যান্ড ভায়োলেন্স গ্রন্থে, সম্পাদনা আবদুল শাবান, ২০৮–২২৫। নয়াদিল্লি: রাউটলেজ, ২০১২।
  • ২৭। শাবান, আবদুল। “পভার্টি, আনএমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড হাউজিং ডিস্ট্রেস অ্যামং মুসলিমস ইন মুম্বই।” মুসলিমস ইন আরবান ইন্ডিয়া: ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এক্সক্লুশন গ্রন্থে, সম্পাদনা আবদুল শাবান এবং এস. খান, ১২৩–১৫১। নয়াদিল্লি: কনসেপ্ট পাবলিশিং, ২০১৩।
  • ২৮। শরণ, প্রভাত। “দ্য ডার্ক ফেস অব মুম্বই।” কাউন্টারকারেন্টস, ২৫ অক্টোবর ২০১০। প্রবেশের তারিখ ১৪ মে ২০১৩। http://www.countercurrents.org/sharan251010.htm.
  • ২৯। শর্মা, অর্চনা, এবং মতিন হাফিজ। “ভায়োলেন্স ওয়ান্স রুলড ইন অ্যাট নাগপাড়া।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ২৪ মে ২০০৭।
  • ৩০। শর্মা, আর. এন. “দ্য হাউজিং মার্কেট ইন মুম্বই মেট্রোপলিস অ্যান্ড ইটস ইরেলেভ্যান্স টু দি অ্যাভারেজ সিটিজেন।” ইন্ডিয়ান সিটিজ ইন ট্রানজিশন গ্রন্থে, সম্পাদনা এ. শ, ২৮৩–৩১৩। চেন্নাই: ওরিয়েন্ট লংম্যান, ২০০৭।
  • ৩১। শ্রীনিবাসন, আর. “টেইন্টেড কপস গো স্কট ফ্রি হোয়াইল পুলিশ ক্যারি আউট টোকেন রিফর্মস।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৫।
  • ৩২। সিং, ডি. পি. “মাইগ্রেশন ইন মুম্বই: ট্রেন্ডস ইন ফিফটি ইয়ার্স।” ডেমোগ্রাফি ইন্ডিয়া ৩৬, নং ২ (২০০৭): ৩১৫–৩২৭।
  • ৩৩। তারে, কে. “ঘাটকোপার ব্লাস্ট কেস: খোয়াজা ইউনুস ডায়েড অব কোল্ড ওয়াটার, রিভিলস এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট।” ইন্ডিয়া টুডে, ১ মার্চ ২০১২। প্রবেশের তারিখ ১৫ মে ২০১৩। http://indiatoday.intoday.in/story/2002-ghatkopar-bomb-blast-khwaja-yunus-encounter-custodial-death/1/176011.html.
  • ৩৪। থ্র্যাশার, ফ্রেডেরিক এম. দ্য গ্যাং: আ স্টাডি অব ১,৩১৩ গ্যাংস ইন শিকাগো। শিকাগো: ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস, ১৯২৭।
  • ৩৫। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। “মুমভাই।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ২৩ অক্টোবর ২০০৫।
  • ৩৬। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। “রাইজ অব আন্ডারওয়ার্ল্ড ইন মুম্বই, ক্রাইম।” দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (মুম্বই), ৪ অক্টোবর ২০০৫।
  • ৩৭। উইলকিনসন, স্টিভেন আই., সম্পা. রিলিজিয়াস পলিটিকস অ্যান্ড কমিউনাল ভায়োলেন্স। নয়াদিল্লি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৫।
  • ৩৮। জাইদি, এস. হুসেন, এবং জেন বর্জেস। মাফিয়া কুইনস অব মুম্বই: স্টোরিজ অব উইমেন ফ্রম দ্য গ্যাংল্যান্ডস। চেন্নাই: ট্র্যাঙ্কুইবার প্রেস, ২০১১।
Post Views: 21
Tags: Bombay MafiaCrime EmpireGang War MumbaiIndia MafiaIndian UnderworldMumbai Crime HistoryMumbai Crime WorldMumbai DonMumbai GangstersMumbai MafiaMumbai UnderworldMumbai Underworld HistoryUnderworld DonUnderworld EmpireUnderworld Historyগ্যাংস্টার ইতিহাসমুম্বাই অপরাধ জগৎমুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড ইতিহাসমুম্বাই গ্যাংস্টারমুম্বাই মাফিয়ামুম্বাইয়ের অন্ধকার ইতিহাসমুম্বাইয়ের ডন
ADVERTISEMENT

Related Posts

শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে আইনি মামলা, ফৌজদারি অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংঘাত
রাজনীতি

শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে আইনি মামলা, ফৌজদারি অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংঘাত

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রাপথ পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতির সবচেয়ে নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলির অন্যতম। কাঁথির অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি মেদিনীপুর...

by নবজাগরণ
September 28, 2026
উমর খালিদ মামলা এবং বিচারের অপেক্ষায় বিচারব্যবস্থা
রাজনীতি

উমর খালিদ মামলা এবং বিচারের অপেক্ষায় বিচারব্যবস্থা

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম গত কয়েক বছরে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো একটি নাম অসংখ্যবার উচ্চারণ করেছে—উমর খালিদ। কখনো প্রশ্ন তোলা...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
September 12, 2026
বাংলা ভাগে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা: ইতিহাস ও বিতর্ক
ভারতবর্ষের ইতিহাস

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাংলা ভাগে ভূমিকা: ইতিহাস ও বিতর্ক

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম ২৩ জুন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি ঘিরে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
August 22, 2026
এসআইআর (SIR) : ভারতীয় গণতন্ত্রের সংকট
রাজনীতি

এসআইআর (SIR) : ভারতীয় গণতন্ত্রের সংকট

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম রাষ্ট্র যখন কোনো নীতিকে “প্রশাসনিক প্রক্রিয়া” বলে ঘোষণা করে, তখন সেটি প্রায়শই নাগরিককে আশ্বস্ত করার...

by মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
September 7, 2026

Facebook Page

নবজাগরণ

ADVERTISEMENT
No Result
View All Result

Categories

  • English (9)
  • অন্যান্য (11)
  • ইসলাম (28)
  • ইসলামিক ইতিহাস (23)
  • ইহুদী (3)
  • কবিতা (37)
  • খ্রিস্টান (6)
  • ছোটগল্প (6)
  • নাস্তিকতা (20)
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (24)
  • বিশ্ব ইতিহাস (26)
  • ভারতবর্ষের ইতিহাস (204)
  • রাজনীতি (44)
  • সাহিত্য আলোচনা (75)
  • সিনেমা (18)
  • হিন্দু (19)

Pages

  • Cart
  • Checkout
    • Confirmation
    • Order History
    • Receipt
    • Transaction Failed
  • Checkout
  • Contact
  • Donation to Nobojagaran
  • Homepage
  • No Access
  • Order Confirmation
  • Order Failed
  • Privacy Policy
  • Purchases
  • Services
  • অ্যান্ড্রোয়েড অ্যাপ
  • লেখা পাঠানোর নিয়ম
  • হোম

  • jasa gestun terdekat
  • https://www.harikami.id/
  • https://premiumnesia.id/
No Result
View All Result
  • মূলপাতা
  • ইতিহাস
    • ইসলামিক ইতিহাস
    • ভারতবর্ষের ইতিহাস
    • বিশ্ব ইতিহাস
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • খ্রিস্টান
    • হিন্দু
    • ইহুদী
    • অন্যান্য ধর্ম
  • নাস্তিকতা
  • রাজনীতি
  • সিনেমা
  • সাহিত্য
    • কবিতা
    • ছোটগল্প
    • উপন্যাস
    • সাহিত্য আলোচনা
  • অন্যান্য
  • ই-ম্যাগাজিন
    • নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা
  • অ্যান্ড্রোয়েড অ্যাপ

©Nobojagaran 2020 | Designed & Developed with ❤️ by Adozeal

Login to your account below

Forgotten Password?

Fill the forms bellow to register

All fields are required. Log In

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা
Welcome back
Sign In
Sign in to access your downloads, manage your account, and continue where you left off.
Login Account
Enter your credentials to access your account
Forgot Password?
Don't have an account? Register Now
error: Content is protected !!
1
WhatsApp
Hi, how can I help you?
Open chat
Powered by Joinchat
wpDiscuz
0
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
| Reply