লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম
বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স লিটারেচারের কথা উঠলে প্রথমেই সুকুমার রায়ের নাম মনে আসে। তাঁর ‘আবোল তাবোল’, ‘হযবরল’ কিংবা ‘পাগলা দাশু’র সৃষ্টিশীল উদ্ভটতা বাংলা ননসেন্স সাহিত্যের একপ্রকার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। ফলে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকে সাধারণত ননসেন্স লিটারেচারের আলোকে বিচার করা হয় না। নজরুলকে আমরা প্রধানত বিদ্রোহী কবি, সাম্যবাদী চেতনার শিল্পী, প্রেম ও যৌবনের কবি, সংগীতস্রষ্টা, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী লেখক এবং মানবমুক্তির কণ্ঠস্বর হিসেবে চিনি। কিন্তু তাঁর বিপুল সাহিত্যকর্মের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা শিশুসাহিত্য, হাস্যরসাত্মক কবিতা, ব্যঙ্গরচনা, প্রহসনধর্মী সংলাপ, শব্দের কৌতুকপূর্ণ ব্যবহার এবং অসম্ভব কল্পনার দিকে মনোযোগ দিলে দেখা যায়, ননসেন্স সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক সরল কিংবা একমাত্রিক নয়। নজরুল সুকুমার রায়ের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংসম্পূর্ণ ননসেন্স-জগৎ নির্মাণ করেননি; বরং ননসেন্সের কৌশলকে তিনি কখনো শিশুমনের আনন্দ প্রকাশে, কখনো ভাষার মুক্ত খেলায়, কখনো সামাজিক ব্যঙ্গের অস্ত্র হিসেবে এবং কখনো ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার গাম্ভীর্য ভাঙার কাজে ব্যবহার করেছেন। তাই নজরুল সাহিত্যে ননসেন্স অনুসন্ধান করতে হলে শুধু অর্থহীন শব্দ বা উদ্ভট প্রাণীর সন্ধান করলেই চলবে না; দেখতে হবে পরিচিত অর্থ, যুক্তি ও সামাজিক বিধিকে তিনি কোথায় এবং কীভাবে খেলাচ্ছলে স্থানচ্যুত করেছেন।
ননসেন্স লিটারেচার বলতে সাধারণভাবে এমন সাহিত্যকে বোঝানো হয়, যেখানে ভাষা ও যুক্তির পরিচিত কাঠামো বজায় রেখেও অর্থের স্বাভাবিক ধারাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিঘ্নিত করা হয়। বাক্য ব্যাকরণসম্মত হতে পারে, ছন্দ সুশৃঙ্খল হতে পারে, ঘটনা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বর্ণিত হতে পারে; কিন্তু সেখানে কারণ ও ফলের সম্পর্ক উল্টে যায়, অসম্ভব বস্তু স্বাভাবিক আচরণ করে, শব্দ নিজের প্রচলিত অর্থ ছেড়ে অন্য ভূমিকায় চলে যায় এবং সামাজিক নিয়ম হাস্যকর রূপ ধারণ করে। ননসেন্স তাই এলোমেলো শব্দের সমষ্টি নয়। শিল্পিত ননসেন্সে বিশৃঙ্খলার মধ্যেও ছন্দ, পুনরাবৃত্তি, প্রত্যাশা ও বিচ্যুতির একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনা থাকে। পাঠক বুঝতে পারেন যে কোনো কিছু ঠিকমতো মিলছে না, অথচ সেই না-মেলার মধ্যেই আনন্দ ও তাৎপর্য তৈরি হচ্ছে। এই অর্থে ননসেন্স অর্থের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়; বরং প্রচলিত অর্থের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ভাষার সৃজনশীল বিদ্রোহ। নজরুলের সমগ্র সাহিত্যিক মানসের সঙ্গে এই বিদ্রোহী প্রকৃতির গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।

নজরুলের সাহিত্যজীবনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিষ্ঠিত সীমারেখা অতিক্রম করার প্রবণতা। তাঁর কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত শব্দ, কথ্য বাংলার সঙ্গে শাস্ত্রীয় পরিভাষা, ধর্মীয় প্রতীকের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের উপাদান এবং উচ্চাঙ্গ কাব্যভাষার সঙ্গে লোকভাষা অনায়াসে মিলিত হয়েছে। এই ভাষিক সংকরতা সরাসরি ননসেন্স নয়, কিন্তু ননসেন্স সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় ভাষিক স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যে কবি ভাষাকে পবিত্র ও অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা বলে মানেন না, তিনিই শব্দের প্রচলিত শ্রেণি ভেঙে নতুন মিলন ঘটাতে পারেন। নজরুলের কাছে শব্দ কেবল তথ্য বহনের পাত্র নয়; শব্দের ধ্বনি, গতি, উচ্চারণ, দেহী শক্তি এবং নাটকীয় উপস্থিতি রয়েছে। তিনি কখনো শব্দকে ঢাকের বোলের মতো বাজিয়েছেন, কখনো সামরিক পদযাত্রার মতো চালিত করেছেন, কখনো শিশুর মুখের দুরন্ত উচ্চারণে ভেঙেচুরে নতুন রূপ দিয়েছেন। তাঁর বহু রচনায় অর্থের আগে ধ্বনি এসে পাঠককে আঘাত করে। এই ধ্বনিময়তা ননসেন্সের গুরুত্বপূর্ণ নন্দনভিত্তি।
নজরুলের শিশুসাহিত্যে ননসেন্স প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তাঁর শিশুতোষ কবিতা ও ছড়ায় শিশুকে কেবল নীতিশিক্ষার নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে দেখা হয় না। সেখানে শিশু দৌড়ায়, চুরি করে, কল্পনা করে, প্রাণীর সঙ্গে কথা বলে, বড়দের নিয়ম অমান্য করে এবং নিজের ভাষায় পৃথিবীকে নতুন করে সাজায়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের গোড়ার অনেক শিশুসাহিত্যে শিশুকে বাধ্য, ভদ্র ও পরিশ্রমী নাগরিক করে তোলার উদ্দেশ্য প্রবল ছিল। নজরুল এই নীতিবাদী কাঠামোকে পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও তার মধ্যে দুরন্তপনা, দেহী আনন্দ এবং কৌতুকের জন্য বিস্তৃত স্থান তৈরি করেন। তাঁর শিশুচরিত্রেরা প্রায়ই ভুল করে, বিপদে পড়ে, অতিরঞ্জিত গল্প বলে কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব মনে করে। এই অবস্থান থেকেই ননসেন্সের জন্ম হয়।
‘লিচু-চোর’ নজরুলের শিশুতোষ রচনার মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং ননসেন্সধর্মী পাঠের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কবিতাটির কাহিনি আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ: একটি ছেলে লিচু চুরি করতে গিয়ে নানা বিপত্তিতে পড়ে এবং নিজের অভিজ্ঞতা নাটকীয়ভাবে বর্ণনা করে। কিন্তু এই সাধারণ ঘটনার বর্ণনায় অতিরঞ্জন, দ্রুত ছন্দ, ধ্বনিগত উত্তেজনা এবং ঘটনা-পরম্পরার অপ্রত্যাশিততা এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে বাস্তব অভিজ্ঞতা একপ্রকার হাস্যকর মহাকাব্যে পরিণত হয়। একটি লিচু চুরির অভিযান শিশুবক্তার কল্পনায় জীবন-মরণ সংগ্রাম হয়ে ওঠে। গাছ, ডাল, কুকুর, তাড়া, পড়ে যাওয়া এবং পালিয়ে বাঁচার প্রতিটি মুহূর্ত বাস্তব অনুপাত হারিয়ে ফেলে। ক্ষুদ্র অপরাধের সঙ্গে বিপুল বিপদের এই অসমতা ননসেন্সের পরিচিত কৌশল।
‘লিচু-চোর’-এর আসল শক্তি শুধু তার কাহিনিতে নয়, কথনের গতিতে। বক্তা যেন এক নিঃশ্বাসে নিজের দুর্দশা জানাচ্ছে। বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই পরবর্তী ঘটনা এসে পড়ে; ধ্বনি ও ছন্দ শিশুর দৌড়, আতঙ্ক এবং উত্তেজনাকে অনুকরণ করে। পাঠক জানেন যে বর্ণনায় অতিরঞ্জন আছে, কিন্তু সেই অতিরঞ্জনের ভেতরেই শিশুমনের সত্য প্রকাশিত। শিশুর কাছে ধরা পড়ার ভয় সত্যিই বিশাল, কুকুরের তাড়া মহাবিপর্যয় এবং লিচু প্রায় যুদ্ধজয়ের পুরস্কার। এখানে ননসেন্স বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না; বরং শিশুর অনুভূতির মাপে বাস্তবতার আকার বদলে দেয়। প্রাপ্তবয়স্কের যুক্তিতে যা তুচ্ছ, শিশুর কল্পনায় তা বিরাট। এই দৃষ্টিকোণের স্থানান্তরই কবিতাটিকে নিছক হাসির ছড়া থেকে শিল্পিত ননসেন্সের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
কবিতাটির কথ্যভাষাও তাৎপর্যপূর্ণ। বক্তা কোনো মার্জিত সাহিত্যিক বিবরণ দিচ্ছে না; সে মুখে মুখে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করছে। কথার মধ্যে আত্মপক্ষসমর্থন, আতঙ্ক, গর্ব এবং কৌশলী অতিরঞ্জন একত্রে কাজ করে। শিশুটি একই সঙ্গে অপরাধী, অভিযাত্রী, নায়ক ও কৌতুকের পাত্র। এই বহুমুখী অবস্থান ননসেন্সের একটি মৌল গুণ প্রকাশ করে: পরিচয় স্থির থাকে না। যে চোর, সে-ই নিজের গল্পে সাহসী যোদ্ধা; যে ব্যর্থ, সে-ই নাটকীয় বর্ণনার মাধ্যমে বিজয়ী কথক। সামাজিক নৈতিকতা বলে চুরি খারাপ, কিন্তু কবিতার ছন্দ ও কৌতুক পাঠককে সাময়িকভাবে চোরের পক্ষ নিতে বাধ্য করে। এই সাময়িক নৈতিক উলটপালট শিশুসাহিত্যের কার্নিভালধর্মী স্বাধীনতার উদাহরণ।
‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ নজরুলের আরেকটি বহুল পরিচিত কবিতা, যেখানে শিশু ও প্রাণীর সম্পর্ক বাস্তবতার পরিচিত সীমা অতিক্রম করে। খুকি কাঠবেড়ালির সঙ্গে এমনভাবে কথা বলে যেন প্রাণীটি তার সমবয়সী সঙ্গী, দরকষাকষির অংশীদার এবং গোপন সম্পদের মালিক। কাঠবেড়ালির খাদ্য, আচরণ ও চলাফেরা শিশুর কৌতূহলে মানবীয় অর্থ পায়। শিশুটি তাকে অনুরোধ করে, প্রশ্ন করে, প্রলোভন দেখায় এবং সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। বাস্তবে কাঠবেড়ালি মানুষের ভাষায় উত্তর দেয় না; কিন্তু কবিতায় তার নীরব উপস্থিতিই সংলাপের অংশ হয়ে ওঠে। শিশুমন একতরফা কথোপকথনকে পূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে গ্রহণ করে। ননসেন্সের জগতে প্রাণী ও মানুষের সীমানা এভাবেই নমনীয় হয়।
এখানে অসম্ভবতা কোনো জাদুকাহিনির বিস্ময় হিসেবে হাজির হয় না। কবিতার বক্তা মনে করে না যে কাঠবেড়ালির সঙ্গে কথা বলা অস্বাভাবিক। তার কাছে প্রাণীটি প্রতিবেশী জীব, যার সঙ্গে বাদাম বা ফল নিয়ে আলোচনা করা যায়। এই স্বাভাবিকীকৃত অসম্ভবতা ননসেন্সের একটি প্রধান কৌশল। অদ্ভুত ঘটনাকে যদি চরিত্রেরা অদ্ভুত বলে চিহ্নিত করে, তবে তা ফ্যান্টাসি কিংবা বিস্ময়কাহিনির দিকে যায়। কিন্তু অদ্ভুত ঘটনাই যখন জগতের স্বাভাবিক বিধি হিসেবে গৃহীত হয়, তখন ননসেন্সের রস তৈরি হয়। ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’তে শিশুর প্রাণবাদী কল্পনা প্রকৃতির সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এর মধ্যে পরিবেশচেতনারও আভাস আছে: প্রাণী এখানে মানুষের অধীন বস্তু নয়, নিজস্ব ইচ্ছা ও সম্পদসম্পন্ন সত্তা।
নজরুলের শিশুতোষ কবিতায় পাখি, ফুল, প্রজাপতি, কাঠবেড়ালি, পুতুল এবং নানা প্রাকৃতিক উপাদান প্রায়ই মানবীয় আচরণ লাভ করে। তবে সব মানবীকরণ ননসেন্স নয়। রূপকথা, রূপক কিংবা গীতিকবিতাতেও প্রকৃতিকে মানবীয় গুণ দেওয়া হয়। নজরুলের ক্ষেত্রে ননসেন্স তখনই তৈরি হয়, যখন এই মানবীকরণ পরিচিত যুক্তিকে কৌতুকপূর্ণভাবে স্থানচ্যুত করে এবং শিশু সেই স্থানচ্যুতিকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই গ্রহণ করে। ফুল যদি হাসে, পাখি যদি খবর আনে কিংবা পুতুল যদি সংসার করে, তবে শিশুর কল্পনায় বাস্তবতার বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে অবাধ যাতায়াত সম্ভব হয়। এই চলাচল প্রাপ্তবয়স্ক জগতের কঠোর শ্রেণিবিভাগকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
‘পুতুলের বিয়ে’ নজরুলের শিশুসাহিত্যে খেলা, অভিনয়, সামাজিক অনুকরণ এবং কৌতুকের এক উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। শিশুরা বড়দের বিবাহানুষ্ঠান অনুকরণ করে পুতুলের বিয়ে আয়োজন করে। এখানে পুতুল জড় বস্তু হয়েও সামাজিক ব্যক্তিতে পরিণত হয়; তার আত্মীয় আছে, বিয়ে আছে, আচার আছে, আনন্দ ও গোলযোগ আছে। কিন্তু বড়দের সামাজিক অনুষ্ঠান যখন শিশুদের ক্ষুদ্র জগতে পুনর্নির্মিত হয়, তখন তার গাম্ভীর্য ভেঙে যায়। বিবাহের নিয়ম, আনুষ্ঠানিকতা, আত্মীয়তার দাবি, আপ্যায়ন এবং সামাজিক মর্যাদাবোধ খেলার উপাদান হয়ে ওঠে। শিশুরা বড়দের সমাজকে অনুকরণ করলেও সেই অনুকরণ নিখুঁত নয়; ভুল, অতিরঞ্জন ও অসম্পূর্ণতার কারণে তা প্যারডিতে রূপ নেয়।
এই পুতুল-সংসারে ননসেন্সের রাজনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে। বড়দের জগৎ নিজেকে স্বাভাবিক, অপরিহার্য এবং গম্ভীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। শিশু যখন সেই জগতকে খেলায় পরিণত করে, তখন সামাজিক বিধির নির্মিত চরিত্র প্রকাশ পায়। বিয়ে, পরিবার ও আচারকে ক্ষুদ্র খেলনার স্তরে নামিয়ে আনা মানে সেগুলোকে ধ্বংস করা নয়; বরং দেখানো যে এগুলোও অভিনয়, পুনরাবৃত্তি ও সামাজিক সম্মতির মাধ্যমে টিকে থাকে। শিশুর পুতুলবিয়ে তাই বড়দের সমাজের এক অনিচ্ছাকৃত ব্যঙ্গচিত্র। নজরুলের কৌতুক এই ব্যঙ্গকে কোমল রাখে; তবু পাঠক বুঝতে পারেন, শিশুদের ‘ভুল’ অনুকরণের মধ্যে বড়দের সঠিক বলে দাবি করা আচরণের হাস্যকর দিক উন্মোচিত হচ্ছে।
নজরুলের ছড়ায় ধ্বনির ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ননসেন্স সাহিত্যে শব্দের অভিধানগত অর্থের চেয়ে তার উচ্চারণগত আনন্দ অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। দ্রুত উচ্চারণযোগ্য ধ্বনি, অনুপ্রাস, অন্ত্যমিল, পুনরাবৃত্তি, ধাক্কাধাক্কি করা ব্যঞ্জনবর্ণ এবং হঠাৎ ছন্দভঙ্গ পাঠককে অর্থ বোঝার আগেই শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্ত করে। নজরুল সংগীতজ্ঞ ও ছন্দসচেতন কবি ছিলেন বলে শব্দের এই দেহী ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর অনুভব ছিল গভীর। তাঁর কবিতা কেবল চোখ দিয়ে পড়ার নয়; মুখে উচ্চারণ, কানে শোনা এবং দেহে তাল অনুভব করার বিষয়। শিশুতোষ রচনায় তিনি এই সংগীতধর্মিতাকে আরও মুক্তভাবে ব্যবহার করেছেন।
ননসেন্স ছড়ার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা উচ্চারণের সময় বক্তার জিহ্বাকে খেলায় যুক্ত করে। দ্রুত ধ্বনিসংঘর্ষ, একই রকম শব্দের পুনরাবৃত্তি কিংবা সামান্য বদলে যাওয়া ধ্বনি শিশুকে ভাষার ভৌত রূপ সম্পর্কে সচেতন করে। নজরুলের ছড়ায় কথ্য উচ্চারণ, আঞ্চলিকতা এবং মুখের ভাষার গতিশীলতা এই অভিজ্ঞতা তৈরি করে। ভাষা তখন কেবল অর্থ জানায় না; নিজেই খেলার বস্তু হয়। শিশুপাঠক কোনো শব্দের সম্পূর্ণ অর্থ না বুঝলেও তার ধ্বনি উপভোগ করতে পারে। এই আনন্দ ভাষাশিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। শিশু প্রথমে ধ্বনি অনুকরণ করে, পরে তার অর্থ শেখে। ননসেন্স সেই প্রাথমিক ধ্বনিমুগ্ধতাকে সাহিত্যের মর্যাদা দেয়।
নজরুলের কাব্যভাষায় আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, দেশজ ও ইংরেজি উৎসের শব্দের সহাবস্থান প্রায়ই বিস্ফোরক প্রভাব সৃষ্টি করে। তাঁর রাজনৈতিক ও বিদ্রোহী কবিতায় এই মিশ্রণ সাংস্কৃতিক সাম্য ও উপনিবেশবিরোধী আত্মপ্রতিষ্ঠার অংশ। হাস্যরসাত্মক ও শিশুতোষ রচনায় একই প্রবণতা কখনো শব্দের কৌতুক তৈরি করে। ভিন্ন ভাষিক বংশের শব্দ পাশাপাশি এসে প্রচলিত ভদ্র কাব্যভাষার প্রত্যাশা ভেঙে দেয়। পাঠকের কানে অপ্রত্যাশিত ধ্বনিসংযোগ সৃষ্টি হয়। ভাষাকে শুদ্ধতার বেড়ায় বন্দী না রেখে নজরুল যে বহুভাষিক স্বাধীনতা দিয়েছেন, তা ননসেন্সের সংকর সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে নজরুলের বহুভাষিকতা এবং ননসেন্সকে এক করে দেখা উচিত নয়। বিদেশি বা অপ্রচলিত শব্দ পাঠকের কাছে অপরিচিত হলেই তা অর্থহীন হয় না। প্রতিটি শব্দের নিজস্ব ইতিহাস ও অর্থ আছে। কিন্তু কবি যখন বিভিন্ন ভাষার শব্দকে এমন ছন্দে ও প্রসঙ্গে স্থাপন করেন যেখানে তাদের ধ্বনি অর্থের চেয়ে অগ্রবর্তী হয়ে ওঠে, তখন ননসেন্সধর্মী অনুভূতি জন্ম নিতে পারে। বিশেষত শিশু বা এমন পাঠকের কাছে, যে শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ জানে না, ধ্বনিই প্রথম অর্থের ভূমিকা পালন করে। এই পরিস্থিতিতে শব্দের সাংস্কৃতিক উৎস, শ্রুতিমাধুর্য এবং প্রসঙ্গগত ইঙ্গিত মিলিয়ে একটি আংশিক অর্থ গড়ে ওঠে। ননসেন্সের মতোই এখানে পাঠককে সক্রিয়ভাবে অর্থ নির্মাণ করতে হয়।
নজরুলের ননসেন্সধর্মী প্রবণতা তাঁর ব্যঙ্গসাহিত্যে আরও রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। ঔপনিবেশিক শাসন, আমলাতন্ত্র, সামাজিক ভণ্ডামি, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং পদমর্যাদার আত্মগম্ভীরতা আক্রমণ করার সময় তিনি প্রায়ই অতিরঞ্জন, বিদ্রূপ, অপ্রত্যাশিত তুলনা এবং ভাষিক অসামঞ্জস্য ব্যবহার করেছেন। ক্ষমতা নিজের ভাষাকে স্বাভাবিক ও যুক্তিসংগত হিসেবে উপস্থাপন করে। সরকারি আদেশ, আইন, বিচার, পুলিশি ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক পরিভাষা এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যেন সেগুলো প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। নজরুল এই গাম্ভীর্যের মধ্যে অসংগতি দেখিয়ে দেন। শাসকের যুক্তি যদি এমন হয় যে স্বাধীনতা চাইলে মানুষ অপরাধী, ন্যায়ের কথা বললে রাষ্ট্রদ্রোহী এবং শোষণের প্রতিবাদ করলে শান্তিভঙ্গকারী, তবে সেই যুক্তি নিজেই ননসেন্সের কাছাকাছি পৌঁছায়।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় ননসেন্স শুধু কল্পনার খেলা নয়; শাসনের অযৌক্তিকতা প্রকাশের পদ্ধতি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নিজেকে আইন, সভ্যতা ও শৃঙ্খলার প্রতিনিধি বলে দাবি করলেও তার কার্যক্রম ছিল বৈষম্য, দমন ও সহিংসতায় পূর্ণ। নজরুলের ব্যঙ্গ এই দাবি ও বাস্তবতার ফাঁককে বড় করে দেখায়। কখনো তিনি ক্ষমতার ভাষাকে অতিরঞ্জিত করে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান যেখানে তা নিজের বিরোধিতা প্রকাশ করে। কখনো শাসক, নেতা বা ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীর আচরণকে শিশুসুলভ কিংবা পশুসুলভ রূপে নামিয়ে আনেন। এতে গম্ভীর কর্তৃত্ব হাসির বস্তু হয়ে ওঠে। ননসেন্সের কার্নিভালধর্মী শক্তি এখানেই: সাময়িকভাবে উঁচু ও নিচুর স্থান বদলে যায়।
নজরুলের সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ এবং তাঁর অন্যান্য সাময়িকপত্রকেন্দ্রিক রচনায় যে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ দেখা যায়, তার পেছনেও ভাষার গাম্ভীর্য ভাঙার প্রবণতা কাজ করেছে। সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক ভাষা সাধারণত নিজেকে তথ্যনির্ভর, গুরুতর এবং কর্তৃত্বপূর্ণ হিসেবে সাজায়। নজরুল সেই ভাষায় কবিত্ব, কৌতুক, নাটকীয়তা এবং অতিরঞ্জন প্রবেশ করান। ফলস্বরূপ রাজনৈতিক বক্তব্যও একধরনের সাহিত্যিক অভিনয়ে পরিণত হয়। সরাসরি অভিযোগের পাশাপাশি বিদ্রূপ ও কৌতুক শাসকের মর্যাদাকে ক্ষয় করে। কোনো ক্ষমতার বিরুদ্ধে ভয় কাটানোর প্রথম ধাপ অনেক সময় তাকে নিয়ে হাসতে পারা। নজরুলের হাস্যরস সেই মানসিক স্বাধীনতার অংশ।
তাঁর ব্যঙ্গের লক্ষ্য শুধু ব্রিটিশ শাসক নয়; দেশীয় সমাজের নেতা, ভণ্ড সংস্কারক, ধর্মীয় গোঁড়া এবং সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তও। এদের ভাষায় আদর্শের দাবি থাকলেও কাজে স্বার্থপরতা ও অসংগতি দেখা যায়। নজরুল এই বৈপরীত্যকে অতিরঞ্জিত করেন। যে ব্যক্তি মুখে সাম্যের কথা বলে কিন্তু সামাজিক মর্যাদায় কঠোর ভেদ মানে, যে ধর্মগুরু মানবতার কথা বলে কিন্তু অন্য সম্প্রদায়কে ঘৃণা করে, কিংবা যে নেতা ত্যাগের বক্তৃতা দিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা খোঁজে—তাদের আচরণ বাস্তবের মধ্যেই একধরনের ননসেন্স। কবি শুধু কাল্পনিক উদ্ভটতা তৈরি করেন না; বাস্তব সমাজের উদ্ভট যুক্তিকে দৃশ্যমান করেন।

এই দিক থেকে নজরুলের ননসেন্স সুকুমার রায়ের ননসেন্স থেকে পৃথক। সুকুমার রায় প্রায়ই সম্পূর্ণ কল্পিত প্রাণী, অসম্ভব আইন, উদ্ভট প্রতিষ্ঠান এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষিক জগৎ সৃষ্টি করেন। নজরুলের ক্ষেত্রে বাস্তব সামাজিক সংঘাত অধিক প্রত্যক্ষ। তাঁর কৌতুকের নিচে ক্ষুধা, ঔপনিবেশিক দমন, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণিবৈষম্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন সক্রিয় থাকে। সুকুমারের ননসেন্সে অর্থ বারবার পিছলে গিয়ে ভাষার স্বাধীন খেলা সৃষ্টি করে; নজরুলের ননসেন্সধর্মী ব্যঙ্গে অর্থ শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিকে ফিরে আসে। তিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, কিন্তু সেই বিশৃঙ্খলার মধ্য থেকে স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবমর্যাদার দাবি উত্থাপিত হয়।
তবু দুই কবির মধ্যে কয়েকটি মৌল সাদৃশ্য রয়েছে। উভয়েই ভাষার শুদ্ধতাবাদ অস্বীকার করেছেন, কথ্য রীতিকে গ্রহণ করেছেন, ছন্দকে দেহী গতিতে পরিণত করেছেন এবং গম্ভীর প্রতিষ্ঠানের ভাষাকে হাসির মুখে দাঁড় করিয়েছেন। উভয়ের শিশুসাহিত্যে বড়দের সমাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। শিশুর দৃষ্টি তাদের রচনায় এক বিকল্প বিচারক্ষমতা তৈরি করে। বড়রা যে নিয়মকে যুক্তিসংগত বলে মানে, শিশু তার অসংগতি সহজেই দেখতে পারে। উভয় কবির রচনাই উচ্চারণ ও পরিবেশনে নতুন প্রাণ পায়। তবে সুকুমারের জগৎ বেশি আত্মসম্পূর্ণ ও
ভাষাকেন্দ্রিক, নজরুলের জগৎ বেশি আবেগময়, সংগীতনির্ভর এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।
নজরুলের ননসেন্সধর্মী রচনায় শিশুমনের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তাঁর কাছে শিশু নিষ্পাপতার স্থির প্রতীক নয়। শিশু দুরন্ত, কৌতূহলী, লোভী, ভীত, সাহসী, কল্পনাপ্রবণ এবং কখনো চতুর। এই বহুমাত্রিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিবাদী শিশুসাহিত্য শিশুকে প্রায়ই আদর্শ আচরণের নমুনায় পরিণত করে; সেখানে শিশুর ভুল ও বিশৃঙ্খলা সংশোধনযোগ্য ত্রুটি। নজরুলের কাছে দুরন্তপনা জীবনীশক্তির প্রকাশ। লিচু চুরি নৈতিকভাবে সমর্থিত না হলেও চোরের দৌড়, ভয় ও আত্মরক্ষার গল্প আনন্দের সঙ্গে বলা যায়। শিশুর ক্ষুদ্র অপরাধকে এমন অপরিমেয় গাম্ভীর্যে বিচার করা হয় না যে তার কল্পনার স্বাধীনতা ধ্বংস হয়ে যায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি নজরুলের সামগ্রিক বিদ্রোহী চেতনার সঙ্গে সংযুক্ত। তিনি এমন সমাজ চেয়েছেন যেখানে মানুষ জন্ম, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা লিঙ্গের কঠোর পরিচয়ে বন্দী থাকবে না। শিশুর খেলার জগতে পরিচয়ের এই কঠোরতা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল। একটি পুতুল মানুষ হয়, একটি কাঠবেড়ালি বন্ধু হয়, ক্ষুদ্র চোর অভিযাত্রী হয় এবং অসম্ভব ঘটনা দৈনন্দিন হয়ে ওঠে। ননসেন্স সেই মুক্ত সমাজের ক্ষুদ্র নান্দনিক নমুনা, যেখানে পরিচিত শ্রেণিবিভাগ সাময়িকভাবে কার্যকারিতা হারায়। অবশ্য শিশুতোষ কল্পনা সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; কিন্তু স্বাধীনতার অনুভূতি রাজনৈতিক কল্পনার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
নজরুলের সংগীতধর্মী প্রতিভাও তাঁর ননসেন্স প্রবণতার আলোচনায় অপরিহার্য। সংগীতে অর্থ সব সময় শব্দের আভিধানিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে না। সুর, তাল, লয়, পুনরাবৃত্তি এবং কণ্ঠের আবেগ এমন অর্থ তৈরি করে যা গদ্যে অনুবাদ করা যায় না। নজরুলের ছড়া ও শিশুতোষ গানে শব্দ অনেক সময় বাদ্যযন্ত্রের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। অনুকারধ্বনি, দ্রুত তাল এবং পুনরাবৃত্ত শব্দসমষ্টি একটি পরিবেশনমূলক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। পাঠক বা শ্রোতা অর্থ বিশ্লেষণের আগেই তালে অংশ নেয়। ননসেন্সের ক্ষেত্রেও এই অংশগ্রহণ জরুরি; যুক্তির অসংগতি তখন দেহী আনন্দের দ্বারা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
লোকসংস্কৃতির সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁর ননসেন্সের আরেকটি উৎস। বাংলা লোকছড়া, লেটো গান, পালাগান, ধাঁধা, মুখের কৌতুক এবং তাৎক্ষণিক ছন্দ নির্মাণের ঐতিহ্যে অর্থের চেয়ে ধ্বনি ও পরিবেশনের গুরুত্ব অনেক। লেটো দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা নজরুলকে ভাষার নাটকীয় ও তাৎক্ষণিক ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত করেছিল। লোকপরিবেশনে দর্শকের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী কৌতুক, অতিরঞ্জন ও শব্দের রূপ বদলাতে পারে। এখানে সাহিত্য স্থির মুদ্রিত পাঠ নয়; একটি জীবন্ত সামাজিক ঘটনা। নজরুলের অনেক ছড়ায় সেই মুখে-মুখে বলা ভাষার তেজ রয়েছে।
বাংলা লোকছড়ায় ‘আগডুম বাগডুম’-জাতীয় ধ্বনি, অসম্ভব আত্মীয়তা, পশুপাখির মানবীয় কাজ, উল্টো দেশের কাহিনি এবং গণনার অর্থহীন শব্দ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। নজরুল এই ঐতিহ্য থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শক্তি পেয়েছেন। তাঁর ননসেন্সকে শুধু ইউরোপীয় সাহিত্যধারার অনুকরণ মনে করলে তাই ভুল হবে। এডওয়ার্ড লিয়ার কিংবা লুইস ক্যারলের সাহিত্যিক ননসেন্সের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব হলেও নজরুলের ভাষিক খেলার পেছনে বাংলা লোকজ পরিবেশ, বহুভাষিক জনজীবন এবং ঔপনিবেশিক সমাজের বিশেষ ইতিহাস কাজ করেছে। তাঁর রচনায় ননসেন্স একটি দেশীয় প্রাণশক্তির সঙ্গে যুক্ত।
নজরুলের হাস্যরস প্রায়ই দেহকেন্দ্রিক। দৌড়, পড়ে যাওয়া, ধাক্কা, খাওয়া, চুরি, ভয় পাওয়া, চিৎকার করা এবং পালিয়ে যাওয়ার মতো কাজ ছড়ার গতি তৈরি করে। ননসেন্সে দেহের এই উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক ভদ্রতা মানুষকে নিয়ন্ত্রিত, শিষ্ট ও গম্ভীর দেহে পরিণত করতে চায়। শিশুর দেহ সেই নিয়ন্ত্রণ মানে না; সে দৌড়ায়, গাছে ওঠে, পড়ে যায় এবং উচ্চস্বরে কথা বলে। নজরুলের ছড়ায় এই অনিয়ন্ত্রিত দেহ হাসির উৎস এবং স্বাধীনতার চিহ্ন। কবিতার ছন্দও যেন শরীরের গতিকে অনুসরণ করে।
এখানে বাখতিনের কার্নিভাল ধারণার সঙ্গে নজরুলের ননসেন্সধর্মী রচনার সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কার্নিভালে সামাজিক পদমর্যাদা সাময়িকভাবে উল্টে যায়, গম্ভীর ক্ষমতা হাসির বস্তু হয় এবং দেহের খাওয়া, দৌড়ানো, পড়া ও বেড়ে ওঠা উদ্যাপিত হয়। নজরুলের শিশুতোষ কৌতুক এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গেও এই কার্নিভালধর্মী শক্তি আছে। লিচু-চোর সামাজিক নৈতিকতার ক্ষুদ্র সীমা ভেঙে সাময়িক নায়ক হয়; পুতুলের বিয়েতে বড়দের অনুষ্ঠান শিশুর খেলায় নেমে আসে; ব্যঙ্গরচনায় নেতা বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি মর্যাদার উচ্চ আসন হারিয়ে হাস্যকর চরিত্রে পরিণত হন। এই উলটপালট স্থায়ী বিপ্লব না ঘটালেও ক্ষমতার স্বাভাবিকতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নজরুল সাহিত্যে ননসেন্সের সঙ্গে আবেগের একটি আকর্ষণীয় সম্পর্ক আছে। প্রচলিত ননসেন্সে কখনো আবেগকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে রাখা হয়, যাতে ভাষার খেলা ও যুক্তির ফাঁদ স্পষ্ট হয়। নজরুলের ক্ষেত্রে আবেগ প্রায় সর্বত্র প্রবল। তাঁর হাসির মধ্যে সহানুভূতি, দুরন্তপনার মধ্যে স্নেহ এবং ব্যঙ্গের মধ্যে ক্ষোভ থাকে। ফলে তাঁর ননসেন্স খুব কম ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ অর্থনিরপেক্ষ খেলা হয়ে ওঠে। তিনি উদ্ভটতা তৈরি করেন, কিন্তু চরিত্রের জীবন ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রতি আগ্রহ হারান না। এই আবেগময়তা তাঁর ননসেন্সকে স্বতন্ত্র বাংলা স্বর দেয়।
তাঁর শিশুতোষ রচনায় প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্যও দ্বিতীয় স্তরের অর্থ থাকে। শিশু ঘটনা ও ধ্বনির আনন্দ পায়, আর প্রাপ্তবয়স্ক শিশুমনের স্বাধীনতা, সামাজিক নিয়মের হাস্যকরতা কিংবা নিজের হারানো কল্পনাশক্তি অনুভব করে। ‘লিচু-চোর’ শিশুদের কাছে দুরন্ত অভিযানের গল্প, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছে তা শৈশবের স্মৃতি, সম্পত্তিবোধের সামাজিক নিয়ম এবং আত্মপক্ষসমর্থনের কৌতুক হিসেবেও ধরা পড়ে। ‘পুতুলের বিয়ে’ শিশুদের খেলা, আবার বড়দের বিবাহানুষ্ঠানের অভিনয় ও বাহুল্যের কোমল প্যারডি। বহুস্তরীয় পাঠের এই ক্ষমতা উৎকৃষ্ট ননসেন্স সাহিত্যের লক্ষণ।
নজরুলের রচনাকে ননসেন্সের আলোকে পড়ার সময় কিছু সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করতে হবে। তাঁর সব হাস্যরসাত্মক বা শিশুতোষ লেখা ননসেন্স নয়। সাধারণ কৌতুক, ব্যঙ্গ, প্রাণীর মানবীকরণ কিংবা দ্রুত ছন্দ থাকলেই কোনো রচনা ননসেন্স হয়ে যায় না। কঠোর অর্থে ননসেন্সের জন্য অর্থ ও অনর্থের টানাপোড়েন, যুক্তির নিয়ন্ত্রিত বিচ্যুতি এবং ভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণ খেলা প্রয়োজন। নজরুলের অধিকাংশ রচনায় শেষ পর্যন্ত অর্থ, আবেগ বা সামাজিক বক্তব্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। তাই তাঁকে বাংলা ননসেন্স সাহিত্যের প্রধান প্রতিনিধি বলা ঐতিহাসিকভাবে অতিরঞ্জিত হবে। অধিক যথার্থ হলো বলা যে তাঁর সাহিত্যে একটি শক্তিশালী ননসেন্সধর্মী প্রবণতা আছে, যা বিশেষত শিশুসাহিত্য, ছড়া, প্রহসন ও ব্যঙ্গের মধ্যে প্রকাশিত।
এই পার্থক্য নজরুলের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য বুঝতে সাহায্য করে। তিনি ননসেন্সকে চূড়ান্ত গন্তব্য করেননি; একে ব্যবহার করেছেন মুক্ত ভাষা, মুক্ত কল্পনা ও মুক্ত মানুষের বৃহত্তর প্রকল্পে। তাঁর কাছে শব্দের খেলা শুধু শব্দের আনন্দে শেষ হয় না; তা সামাজিক শ্রেণি, ভাষিক শুদ্ধতা, প্রজন্মগত কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে। ননসেন্স তাঁর হাতে কখনো বাঁশির সুর, কখনো শিশুর দৌড়, কখনো বিদ্রূপের চাবুক। একই কবির মধ্যে এই বহুমুখিতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
নজরুলের ননসেন্সধর্মী রচনার অনুবাদেও বিশেষ সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাঁর কথ্য বাংলা, ধ্বনির দ্রুততা, অন্ত্যমিল, বহুভাষিক শব্দ এবং সাংস্কৃতিক ইঙ্গিত অন্য ভাষায় হুবহু স্থানান্তর করা কঠিন। ‘লিচু-চোর’-এর কাহিনি অনুবাদ করা গেলেও শিশুবক্তার দমহীন উচ্চারণ ও মুখের ভাষার প্রাণশক্তি সহজে রক্ষা করা যায় না। ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’র স্নেহপূর্ণ দরকষাকষি অনুবাদে অতিরিক্ত মার্জিত হয়ে গেলে শিশুস্বর হারাতে পারে। ননসেন্স অনুবাদে তাই আক্ষরিক বিশ্বস্ততার চেয়ে প্রভাবের বিশ্বস্ততা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনুবাদককে নতুন ছন্দ, সমতুল্য কথ্যতা এবং প্রয়োজনে নতুন শব্দকৌতুক সৃষ্টি করতে হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে নজরুলের এই রচনাগুলো বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। শিশু ‘লিচু-চোর’ আবৃত্তি করতে গিয়ে ছন্দ, গতি, বিরতি ও কথ্যভাষার নাটকীয়তা শেখে। ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ পড়ে মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ক নিয়ে কল্পনা করতে পারে। ‘পুতুলের বিয়ে’র অভিনয় সামাজিক আচরণ কীভাবে অনুকরণ ও অভিনয়ের মাধ্যমে শেখা হয়, তা উপলব্ধির সুযোগ দেয়। শিক্ষক যদি শুধু নৈতিক শিক্ষা খোঁজেন—চুরি করা উচিত নয়, প্রাণীকে ভালোবাসতে হবে—তবে রচনার ননসেন্সধর্মী স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। বরং শিশুদের নতুন প্রাণীর নাম বানানো, অসম্ভব সংলাপ লেখা, পরিচিত নিয়ম উল্টে গল্প তৈরি করা কিংবা একই ঘটনা অতিরঞ্জিতভাবে বলার সুযোগ দিলে নজরুলের সৃজনপদ্ধতি জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।
সমকালীন ডিজিটাল সংস্কৃতিতেও নজরুলের ননসেন্সধর্মী ভাষা নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক। সামাজিক মাধ্যমে শব্দ ভেঙে নতুন শব্দ তৈরি, পরিচিত সংলাপের প্যারডি, রাজনৈতিক ঘোষণাকে আক্ষরিক করে কৌতুক এবং ছোট ভিডিওতে দেহী অতিরঞ্জন—এসবের সঙ্গে তাঁর ছড়া ও ব্যঙ্গের কৌশলের দূরবর্তী মিল রয়েছে। তবে দ্রুত তৈরি ডিজিটাল কৌতুক অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী এবং লক্ষ্যহীন। নজরুলের রচনা মনে করিয়ে দেয়, শব্দের দুরন্ত খেলাও গভীর মানবিক ও সামাজিক বোধের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কৌতুক তখন শুধু হাসায় না; ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়েও ভাবায়।
আজকের পৃথিবীতে প্রশাসনিক ভাষা, রাজনৈতিক প্রচার, বিজ্ঞাপন এবং অ্যালগরিদমিক বক্তব্য প্রায়ই এমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে যেন তাদের দাবিই একমাত্র সত্য। বাস্তবতার সঙ্গে সেই ভাষার দূরত্ব কখনো এত বেশি যে তা অনিচ্ছাকৃত ননসেন্সে পরিণত হয়। নজরুলের ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টি আমাদের এই অসংগতি শনাক্ত করতে সাহায্য করে। যে সমাজে ক্ষুধার্ত মানুষকে ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া হয়, বৈষম্যকে শৃঙ্খলা বলা হয় এবং প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সেখানে ক্ষমতার ভাষার যুক্তিই মূলত উদ্ভট। নজরুল সেই উদ্ভটতাকে হাসি, ক্রোধ ও ছন্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
তাঁর ননসেন্সের সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য সম্ভবত ভাষার গণতন্ত্রীকরণে। তিনি কাব্যভাষাকে কোনো এক শ্রেণি, ধর্ম বা সংস্কৃতির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে দেননি। রাস্তাঘাটের শব্দ, সৈনিকের আওয়াজ, শিশুর চিৎকার, লোকগানের বোল, আরবি-ফারসি উচ্চারণ, সংস্কৃত যৌগ এবং ইংরেজি ঔপনিবেশিক পরিভাষা তাঁর কবিতায় সংঘর্ষ ও মিলনের মাধ্যমে নতুন শক্তি পেয়েছে। এই মিশ্র ভাষা কখনো অতিরঞ্জিত, কখনো কৌতুকপূর্ণ, কখনো প্রায় বিস্ফোরক। ননসেন্সের স্বাধীনতা এখানেই সামাজিক স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়: কোনো শব্দ জন্মপরিচয়ের কারণে অচ্ছুত নয়, কোনো ভাষা একাই সাহিত্যিক মর্যাদার অধিকারী নয়।
সবশেষে বলা যায়, নজরুল সাহিত্যে ননসেন্স লিটারেচার কোনো বিচ্ছিন্ন কিংবা আকস্মিক উপাদান নয়; এটি তাঁর বৃহত্তর বিদ্রোহী নন্দনের একটি খেলাময় শাখা। তিনি প্রধানত ননসেন্স কবি নন, কিন্তু তাঁর ভাষার মুক্তি, ছন্দের দুরন্ত গতি, শিশুমনের স্বীকৃতি, পরিচিত শ্রেণির মিশ্রণ, গম্ভীর প্রতিষ্ঠানের ব্যঙ্গ এবং বাস্তবতার অযৌক্তিকতা প্রকাশের মধ্যে ননসেন্সের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সক্রিয়। তাঁর শিশুসাহিত্যে অসম্ভব স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, ক্ষুদ্র ঘটনা মহাকাব্যিক আকার পায়, প্রাণী মানুষের কথোপকথনের অংশ হয় এবং বড়দের সমাজ শিশুর খেলায় নেমে এসে নিজের হাস্যকর মুখ দেখায়। তাঁর ব্যঙ্গসাহিত্যে শাসন, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক ভণ্ডামির যুক্তি নিজের অসংগতিতে ভেঙে পড়ে।
নজরুলের ননসেন্স তাই অর্থহীনতার সাহিত্য নয়। এটি এমন অর্থের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যা নিজেকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শিশু যখন কাঠবেড়ালির সঙ্গে কথা বলে, তখন মানুষ ও প্রাণীর কঠোর সীমা নরম হয়; লিচু-চোর যখন নিজের ব্যর্থ অভিযানকে বীরত্বের কাহিনিতে পরিণত করে, তখন প্রাপ্তবয়স্ক বাস্তবতার অনুপাত বদলে যায়; পুতুলের বিয়েতে সামাজিক আচার খেলায় পরিণত হলে প্রতিষ্ঠিত নিয়মের অভিনয়ধর্মী চরিত্র প্রকাশ পায়; আর রাজনৈতিক ব্যঙ্গে শাসকের গাম্ভীর্য কৌতুকের মুখে ভেঙে গেলে ভয়ের ওপর স্বাধীন কল্পনার প্রথম বিজয় ঘটে। এই সবকিছুর মধ্যে নজরুলের মৌল বিশ্বাস কাজ করে—মানুষের জীবন, ভাষা ও কল্পনা কোনো স্থির বিধির কারাগারে বন্দী নয়।
এই কারণেই নজরুল সাহিত্যে ননসেন্সের অনুসন্ধান তাঁর পরিচিত বিদ্রোহী ভাবমূর্তিকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও সম্পূর্ণ করে। বিদ্রোহ শুধু বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা নয়, কখনো শিশুর হাসিও বিদ্রোহ। ক্ষমতার বিরুদ্ধে তলোয়ারের পাশাপাশি ঠাট্টা কার্যকর, কঠোর যুক্তির পাশাপাশি উদ্ভট কল্পনাও মুক্তির পথ খুলতে পারে। নজরুলের ননসেন্সধর্মী সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা মানে শুধু রাজনৈতিক শৃঙ্খল ভাঙা নয়; ভাষার অভ্যাস, সামাজিক গাম্ভীর্য এবং বাস্তব বলে মেনে নেওয়া সীমারেখাকেও প্রশ্ন করা। তাঁর হাসি তাই হালকা হলেও তুচ্ছ নয়, শিশুসুলভ হলেও অপরিণত নয় এবং উদ্ভট হলেও অর্থশূন্য নয়। সেই হাসির মধ্যে বাংলা ভাষার দুরন্ত প্রাণ, শিশুমনের স্বাধীনতা এবং শোষণহীন মানবসমাজের কল্পনা একসঙ্গে ধ্বনিত হয়েছে।
নবজাগরণ (ষাণ্মাসিক) – জীবনানন্দ ১২৫ তম জন্ম সংখ্যা – মননশীল সাহিত্য পত্রিকা





নবজাগরণ - জ্ঞান অর্জনের বিস্বস্থ সংস্থা